📄 স্ত্রীর সাথে সহবাস না করার কসম করলে
لِلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِنْ نِسَائِهِمْ تَرَبُّصُ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ فَإِنْ فَأَؤُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ. وَإِنْ عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَإِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ .
অর্থ: যেসব লোক নিজেদের স্ত্রীদের সাথে সম্পর্ক না রাখার কসম খেয়ে বসে তাদের জন্য রয়েছে চার মাসের অবকাশ। যদি তারা রুজু করে (ফিরে আসে) তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। আর যদি তারা তালাক দেবার সংকল্প করে তাহলে জেনে রাখো আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন। (সূরা আল-বাকারা: আয়াত: ২২৬-২২৭)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: ফিক্বহ্ পরিভাষায় একে বলা হয়, 'ঈলা'। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সবসময় মধুর সম্পর্ক থাকা তো সম্ভব নয়। বিভিন্ন সময় সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার বহুবিধ কারণ সৃষ্টি হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর শরীয়াত এমন ধরনের সম্পর্ক ভাঙা পছন্দ করে না, যার ফলে উভয়ে আইনগতভাবে দাম্পত্য বাঁধনে আটকে থাকে কিন্তু কার্যত পরস্পর এমনভাবে আলাদা থাকে যেন তারা স্বামী-স্ত্রী নয়। এই ধরনের সম্পর্ক বিকৃতির জন্য আল্লাহ চার মাস সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই চার মাসের মধ্যে উভয়ের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত করতে হবে। অন্যথায় এই সম্পর্ক ছিন্ন করে দিতে হবে। তারপর উভয়ের স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছামতো বিয়ে করতে পারবে।
আয়াতে যেহেতু 'কসম খেয়ে বসা' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তাই হানাফী ও শাফেঈ ফকীহগণ এই আয়াতের যে অর্থ গ্রহণ করেছেন তা হচ্ছে এই যে, যেখানে স্বামী তার স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক না রাখার কসম খায় একমাত্র সেখানেই এই বিধানটি কার্যকর হবে। আর কসম না খেয়ে দাম্পত্য সম্পর্ক যত দীর্ঘকালের জন্য ছিন্ন করুক না কেন এই আয়াতের নির্দেশ সেখানে প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু মালেকী ফকীহদের মত হচ্ছে, কসম খাক বা না খাক উভয় অবস্থায় এই চার মাসের অবকাশ পাবে। ইমাম আহমাদের (র) একটি বক্তব্যও এর সমর্থনে পাওয়া যায়।
আলী, ইবনে আব্বাস ও হাসান বসরীর (র) মতে এই নির্দেশটি শুধুমাত্র বিকৃতির কারণে যে সম্পর্কচ্ছেদ হয় তার জন্য প্রযোজ্য। তবে কোনো অসুবিধার কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক থাকা অবস্থায় স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক বিচ্ছেদ করে তবে তার ওপর এই নির্দেশটি প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু অন্যান্য ফকীহদের মতে স্বামী-স্ত্রী মধ্যকার দৈহিক সম্পর্ক ছিন্নকারী প্রত্যেকটি শপথই 'ঈলা'র অন্তর্ভুক্ত এবং সন্তুষ্টির সাথে হোক বা অসন্তুষ্টির সাথে হোক চার মাসের বেশি সময় পর্যন্ত এই ধরনের অবস্থা অব্যাহত থাকা উচিত নয়।
কোনো কোনো ফকীহ এ বাক্যের অর্থ এভাবে গ্রহণ করেছেন যে, এই নির্দিষ্ট সময়- কালের মধ্যে যদি তারা নিজেদের কসম ভেঙে ফেলে এবং তাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে নেয়, তাহলে তাদের কসম ভাঙার কাফ্ফারা আদায় করতে হবে না। আল্লাহ তাদেরকে এমনিতেই মাফ করে দেবেন। কিন্তু অধিকাংশ ফকীহর মত হচ্ছে এই
যে, কসম ভাঙার জন্য কাফফারা আদায় করতে হবে। ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু বলার মানে এই নয় যে, কাফফারা মাফ করে দেয়া হয়েছে; বরং এর মানে হচ্ছে, আল্লাহ তোমাদের কাফ্ফারা কবুল করে নেবেন এবং সম্পর্কচ্ছেদের সময়ে তোমরা পরস্পরের ওপর যেসব বাড়াবাড়ি করেছিলে সেগুলো মাফ করে দেবেন।
উসমান, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, যায়েদ ইবনে সাবেত প্রমুখ সাহাবীগণের মতে 'রুজু' করার অর্থ শপথ ভাঙার ও পুনরায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করার সুযোগ চার মাস সময়-কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই সময়টি অতিবাহিত হয়ে যাওয়া এই অর্থ বহন করে যে, স্বামী তালাক দেয়ার সংকল্প করেছে। তাই এ অবস্থায় এই নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হবার সাথে সাথেই আপনা আপনি তালাক অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে। সেটি হবে এক 'তালাক বায়েন'। অর্থাৎ ইদ্দত পালনকালে স্বামীর আর স্ত্রীকে গ্রহণ করার অধিকার থাকবে না। তবে তারা উভয়ে চাইলে আবার নতুন করে বিয়ে করতে পারবে। উমর, আলী, ইবনে আব্বাস ও ইবনে উমর থেকেও এ ধরনের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। হানাফী ফকীহগণ এই মতটিই গ্রহণ করেছেন।
সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেব, মাকহুল, যুহরী প্রমুখ ফীহগণ এই মতটির এই অংশটুকুর সাথে একমত হয়েছেন যে, চার মাস সময় অতিবাহিত হবার পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে তালাক অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে। কিন্তু তাঁদের মতে সেটা হবে এক 'তালাক রজঈ'। অর্থাৎ ইদ্দত পালন কালে স্বামী আবার স্ত্রীকে রুজু করার তথা দাম্পত্যা সম্পর্কে ফিরিয়ে নেয়ার অধিকারী হবে। আর যদি 'রুজু' না করে তাহলে ইদ্দত অতিবাহিত হবার পর দুই জন আবার চাইলে বিয়ে করতে পারবে।
📄 স্ত্রীকে তালাক দেওয়া : ইদ্দত ও প্রত্যাহারের সময়সীমা
وَالْمُطَلَّقَتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ ۚ وَلَا يَحِلُّ لَهُنَّ أَنْ يَكْتُمْنَ مَا خَلَقَ اللهُ فِي أَرْحَامِهِنَّ إِنْ كُنَّ يُؤْمِنَّ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِي ذَلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا.
অর্থ: তালাক প্রাপ্তাগণ তিনবার মাসিক ঋতুস্রাব পর্যন্ত নিজেদেরকে বিরত রাখবে। আর আল্লাহ তাদের গর্ভাশয়ে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তাকে গোপন করা তাদের জন্য বৈধ নয়। তাদের কখনো এমনটি করা উচিত নয়, যদি তারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হয়, তাদের স্বামীরা পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনে প্রস্তুত হয়, তাহলে তারা এই অবকাশ কালের মধ্যে তাদেরকে নিজের স্ত্রী হিসেবে ফিরিয়ে নেবার অধিকারী হবে। (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-২২৮)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: এই আয়াতে প্রদত্ত বিধানটির ব্যাপার ফকীহগণ বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের একটি দলের মতে, স্ত্রীর তৃতীয় ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাবার পর যতক্ষণ সে গোসল করে পাক-সাফ না হয়ে যাবে ততক্ষণ তালাকে বায়েন অনুষ্ঠিত হবে
না এবং ততক্ষণ স্বামীর রুজু করার অধিকার থাকবে। আবু বকর, উমর, আলী, ইবনে আব্বাস, আবু মূসা আশ'আরী, ইবনে মাসউদ এবং অন্যান্য বড় বড় সাহাবীগণ এই মত পোষণ করেন। হানাফী ফকীহগণও এই মত গ্রহণ করে নিয়েছেন। বিপরীত পক্ষে অন্য দলটি স্ত্রীর তৃতীয় ঋতুস্রাব শুরু হবার সাথে সাথেই স্বামীর 'রুজু' করার অধিকার খতম হয়ে যাবে। এই মত পোষণ করেন, আয়েশা, ইবনে উমর, যায়েদ ইবনে সাবেত, শাফেঈ ও মালেকী ফকীহগণ এই মত গ্রহণ করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই নির্দেশটি কেবলমাত্র যখন স্বামী তার স্ত্রীকে এক বা দুই তালাক দেয় তখনকার অবস্থার সাথে সম্পর্কিত। স্বামী তিন তালাক দেয়ার পর আর তার রুজু করা অধিকার থাকবে না।
📄 স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মর্যাদার ক্ষেত্রে মূলনীতি
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ.
অর্থ: নারীদের জন্যও ঠিক তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার আছে, যেমন পুরুষদের অধিকার আছে তাদের ওপর। তবে পুরুষদের তাদের ওপর একটি মর্যাদা আছে। আর সবার ওপরে আছেন আল্লাহ সর্বাধিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী, বিচক্ষণ ও জ্ঞানী। (সূরা আল-বাকারা: আয়াত ২২৮)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: নারীদের উপর যেমন পুরুষদের অধিকার রয়েছে। তেমনি পুরুষদের উপরও রয়েছে নারীদের অধিকার। আর উভয়কেই উভয়ের অধিকার প্রদান করা একান্ত কর্তব্য। তবে এতটুকু পার্থক্য আছে যে, পুরুষদের মর্যাদা নারীদের তুলনায় কিছুটা বেশি। এ আয়াতে সেই দিকেই ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةً অর্থাৎ নারীদের তুলনায় পুরুষদের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা।
সূরা নিসায় বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে: الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَلِهِمْ .
অর্থ: "পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল। কারণ, আল্লাহ তাদের একের উপর অপরকে বিশেষ মর্যাদার ভূষিত করেছেন এবং এ জন্যে যে পুরুষরা নারীদের পেছনে তাদের সম্পদ ব্যয় করেছে।" (সূরা নিসা: আয়াত-৩৪)
আল কুরআনে সূরা আল বাকারার এ ছোট আয়াতাংশে নর-নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিরাট বিষয়কে তুলে ধরা হয়েছে। এতে নারী-পুরুষের অধিকার সম্পর্কিত মূলনীতি বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে উভয়ের অধিকার ও কর্তব্য পালন সমভাবে ওয়াজিব করে
দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু আয়াতাংশে স্ত্রীলোকদের অধিকারের কথা পুরুষদের অধিকারের পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ পুরুষদের উচিত তারা যেন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নারীদের অধিকার প্রদান করে। কারণ, পুরুষ তো নিজের বাহুবলে ও আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদা বলে নারীর কাছ থেকে নিজের অধিকার আদায় করে নেয়। কিন্তু পুরুষদের উচিত নারীদের অধিকারের কথা চিন্তা করা। কেননা সাধারণত নারীরা শক্তি দিয়ে নিজ অধিকার আদায় করতে পারে না।
আল্লাহর বাণীর শব্দাবলি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে মুদল শব্দ দিয়ে স্বামী ও স্ত্রীর কর্তব্য ও অধিকারের সমতার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ উভয়ের প্রতি উভয়ের অধিকার সমান। তাই বলে এর মানে এ নয় যে, উভয়কেই একই ধরনের কাজ করতে হবে এবং তাদের কর্মস্থল অভিন্ন হবে। কারণ প্রকৃতিগতভাবেই তাদেরকে দৈহিক আকৃতি, গঠন, শক্তি ও সামর্থের পার্থক্য করা হয়েছে। যে কারণে তারা সামাজিক ও পারিবারিক কাজে পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং পরিপূরক বা সম্পূরক।
আল কুরআনে পুরুষদের বিশেষ মর্যাদা দানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةً অর্থাৎ পুরুষদের জন্যে নারীদের তুলনায় বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এখানে পুরুষদেরকে স্ত্রীদের তত্ত্বাবধায়ক ও জিম্মাদার ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন সূরা আন নিসায় قَوَّامُونَ বলে পুরুষদেরকে কর্তৃত্বশীল বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এ তত্ত্বাবধান ও কর্তৃত্ব দান এজন্যে যে, পুরুষদের দৈহিক গঠন ও মানসিকতার সৃষ্টিগত পার্থক্যের দরুন তারা কর্তৃত্ব করারই উপযোগী। তাছাড়া স্ত্রীদের যাবতীয় ভরণ পোষণের দায়িত্ব স্বামীরই উপর বর্তায়। আর স্ত্রীগণ হচ্ছে তাদের সহযোগী মাত্র। আল-কুরআনের ভাষায় স্ত্রীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যেমন জঘন্য অন্যায়, তেমনি তাদের বল্লাহীনভাবে পুরুষদের আওতা মুক্ত করে দেয়াও নিরাপদ নয়। বৈয়য়িক জীবনে স্ত্রীদের পুরুষদের সম্পূর্ণ আওতামুক্ত করা নিতান্ত ভয়ের কারণ। এতে করে পৃথিবীতে রক্তপাত, ফিতনা-ফাসাদ ও বিবাদ-বিষম্বাদের সৃষ্টি হয়ে থাকে। আর সমাজে বিস্তার লাভ করে লজ্জাহীনতা, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা। হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন সমাজকে করে কলুষিত।
আজকের বিশ্বে নারী প্রগতি ও নারীর অধিকারের নামে নারীকে পুরুষদের বিকল্প হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। অথচ সৃষ্টি রহস্যে নর-নারী হলো পরস্পরের পরিপূরক বা সম্পূরক। আল-কুরআন নারীকে তার স্বাভাবিক মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু তথাকথিত প্রগতিবাদীরা নারীকে তার স্বভাব-প্রকৃতির বিরুদ্ধে পুরুষদের কর্মস্থলে টেনে এনে সমান অধিকারের কথা বলে তাদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে দ্বিগুণ বোঝা। স্বভাব-প্রকৃতির দেয়া নারীত্বের দায়িত্ব আর তারই সাথে কথিত প্রগতিবাদীদের আরোপিত পুরুষের সমান পুরুষোচিত দায়িত্ব। এতে করে নারীদের প্রতি বাড়তি যুলুমই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে মাত্র। প্রকৃতিগতভাবে নারীত্ব ও মাতৃত্বের দায়িত্ব তাদের পালন করতেই হচ্ছে। আবার পুরুষদের কর্ম ক্ষেত্রে তাদের প্রতিযোগী হয়ে উপার্জনের দায়িত্ব তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে।
সামাজিক শান্তি শৃংখলা মানব চরিত্রের স্বাভাবিক প্রবণতা, সর্বোপরি স্ত্রীলোকদের সুবিধার্থেই পুরুষকে স্ত্রীদের উপর কিছুটা প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু তা পালন করা ফরয করেও দেয়া হয়েছে। এর অর্থ অবশ্যই এ নয় যে, পুরুষরা স্ত্রীদের সাথে যথেচ্ছ আচরণ করবে অথবা স্বামীরা স্ত্রীদের ঘরের আসবাবপত্র বা গৃহপালিত জন্তু-জানোয়ারের মত ব্যবহার করবে; বরং পুরুষদের ও বিশেষ মর্যাদাটুকু রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে এজন্যেই বরাদ্ধ করা হয়েছে যাতে পৃথিবীর 'জীব পরিবেশ' তথা মানব পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্য সংরক্ষিত হয়।
প্রসংগত উল্লেখ্য যে, একমাত্র ইসলামই নারীদের যথার্থ মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে। কথাটা এজন্যে প্রশ্নাতীত সত্য যে, ইসলাম তথা কুরআন সুন্নাহ সেই আল্লাহরই দেয়া বিধান, যে আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন- তাদের নর-নারীতে শ্রেণি বিন্যাস করেছেন। আর আল্লাহর চেয়ে তার সৃষ্টির কল্যাণ করার যোগ্যতা কার আছে?
নারীদের সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ আল কুরআনে বলা হয়েছে, وَعَاشِرُوْهُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ “তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদাচরণ করে জীবন-যাপন কর।" হাদীসে এসেছে خِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِكُمْ "তোমাদের মধ্যে উত্তম সে ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।" তা ছাড়া الْجَنَّةُ تَحْتَ أَقْدَامِ الْأُمَّهَاتِ অর্থ: " জান্নাত মায়েদের পদতলে" ইত্যাদি।
নারীদের অর্থনৈতিক অধিকার ইসলাম ছাড়া আর কোথাও নেই বললেই চলে। ইসলাম নারীকে তারই হাতে সমস্ত মোহরানার টাকা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। স্ত্রীর চাহিদা মোতাবেক মোহরের অর্থ তাকে দিতে হয়। আর মোহরের পরিমাণ হতে হবে মর্যাদার ভিত্তিতে। টাকা স্ত্রীকেই দিতে হয় আর তাতে স্বামীর কোনো অধিকারই থাকে না। আর তখন থেকে স্ত্রীর ভরণ-পোষণের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব স্বামীর উপরই ন্যস্ত। কসমেটিক্স থেকে শুরু করে সমস্ত ব্যয়ভার স্বামীকে বহন করতে হয়। এমনকি স্ত্রীর আয়ের উৎস কর সমস্ত ব্যয়ভার স্বামীর উপরই বর্তায়। তার আয়ের মালিক সেই হবে অথচ আর ব্যয়ভার সম্পূর্ণরূপে বহন করবে স্বামী। পিতা-মাতার সম্পত্তিতে ও স্বামীর সম্পত্তিতেও তার হিস্যা সংরক্ষিত আছে। নারীর এতবড় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিশ্বের অন্য কোনো জাতির মধ্যে নেই। মুসলিম মহিলারা ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই মতলববাজদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে এত সুন্দর ইলাহী ব্যবস্থা তথা ইসলামী জীবন পদ্ধতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করতে দেখা যায়। কতই না ভাল হতো! যদি শিক্ষিত মহিলারা দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনা করতো।
আজকের সমাজে আল্লাহর দেয়া উপরিউক্ত বিশেষ মর্যাদার অপব্যবহার করে পুরুষরা নারীদের উপর যেমন চালাচ্ছে নির্যাতন ও অত্যাচার; তেমনি এ নির্যাতন থেকে নিষ্কৃতির নামে এবং নারী স্বাধীনতার ধুয়া তুলে অবলা নারীদের নামিয়ে আনা হচ্ছে পুরুষদের
কর্মস্থলে। নারী মুক্তির আকর্ষণীয় যবনিকার অন্তরালে তাদের গণ্য করা হচ্ছে ভোগ্য পণ্যে বা ভোক্তার দ্রব্যে। মানব ইতিহাসের সামগ্রিক পরিণতির প্রতি লক্ষ্য রেখে এগুতে অক্ষম অসহায় নারী সমাজ অপরিণামদর্শী ও সামগ্রিক কল্যাণ সম্পর্কে অজ্ঞ প-িতমন্য কতিপয় পুরুষের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের চরম অবমাননা ও লাঞ্ছনা গঞ্জনার হাতে সঁপে দিচ্ছে। আজকের পাশ্চাত্যের নারী সভ্যতার ইতিহাস একথার জ্বলন্ত সাক্ষী। তবুও কি মুক্তিকামী নারী সমাজের বোধোদয় হবে না? অন্যথা অনাগত প্রজন্ম এদের কখনো ক্ষমার চোখে দেখবে না। তাদের আদালতে এদের দেখতে পাওয়া যাবে আসামীর কাঠ গড়ায়।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা নারীদের পুরুষদের বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন। তাই তাদের (পুরুষদের) অতি ধৈর্য ও সতর্কতা সহকারে চলা উচিত। যদি স্ত্রীর পক্ষ থেকে কর্তব্য পালনে কোনো প্রকার গাফলাতি বা ত্রুটি দেখা যায়, তবে তা সহ্য করে নেবে এবং স্ত্রীদের প্রতি নিজের কর্তব্য পালনে মোটেই অবহেলা করবে না।
পরিশেষে আল্লাহর নিজের বৈশিষ্ট্য প্রসংঙ্গে স্বয়ং তাঁরই কথা "আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী" বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, নর-নারীর বৈশিষ্ট্যের তারতম্য ও পুরুষদের কিছুটা অতিরিক্ত মর্যাদা দান কোনো প্রকারের বৈষম্য সৃষ্টি বা পক্ষপাতিত্বজনক নয়; বরং তাঁর অসীম জ্ঞান ও অনুপম ক্ষমতার কারণেই তিনি সৃষ্টিকূলের বৈশিষ্ট্য ও তারতম্য সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন বিধায় যা কল্যাণকর তাই করে থাকেন। সৃষ্টির সার্বিক মঙ্গল কোন পথে- তা একমাত্র স্রষ্টাই জানেন। তাই তিনি সেভাবেই সুশৃঙ্খল নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
📄 স্ত্রীকে ত্যাগ করতে হলে সহৃদয়তার সাথে করবে এবং তাদের দেয়া কোনো কিছু ফেরত নেয়া বৈধ নয়
الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ فَإِمْسَاكَ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ وَلَا يَحِلُّ لَكُمْ أَنْ تَأْخُذُوا مِمَّا أَتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا إِلَّا أَنْ يَخَافَا إِلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ فَإِنْ خِفْتُمُ إِلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللهِ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ .
অর্থ: তালাক দু'বার। তারপর সোজাসুজি স্ত্রীকে রেখে দিবে অথবা ভালোভাবে বিদায় করে দেবে। আর তাদেরকে যা কিছু দিয়েছ বিদায় করার সময় তা থেকে কিছু ফিরিয়ে নেয়া তোমাদের জন্য বৈধ নয়। তবে এটা স্বতন্ত্র, স্বামী-স্ত্রী যদি আল্লাহ নির্ধারিত সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না বলে আশঙ্কা করে, তাহলে এহেন অবস্থায় স্ত্রীর কিছু বিনিময় দিয়ে তার স্বামী থেকে বিচ্ছেদ লাভ করায় কোনো ক্ষতি নেই। এগুলো
আল্লাহ নির্ধারিত সীমারেখা, এগুলো অতিক্রম করো না। মূলত যারাই আল্লাহ নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করবে তারাই জালেম। (সূরা আল বাকারা: আয়াত-২২৯)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতটিতে জাহেলী যুগে আরবে প্রচলিত একটি বড় রকমের সামাজিক ত্রুটি সংশোধন করা হয়েছে। তদানীন্তন আরবে এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে অসংখ্যা তালাক দিতে পারতো। স্বামী স্ত্রীর প্রতি বিরূপ হয়ে গেলে তাকে বারবার তালাক দিতো এবং আবার ফিরিয়ে নিতো। এভাবে বেচারী স্ত্রী না স্বামীর সাথে ঘর- সংসার করতে পারতো আর না স্বাধীনভাবে আর কাউকে বিয়ে করতে পারতো। কুরআন মজীদের এই আয়াতটি এই জুলুমের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। এই আয়াতের দৃষ্টিতে স্বামী একটি বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে নিজের স্ত্রীকে বড় জোর দু'বার 'রজঈ তালাক' দিতে পারে। যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে দু'বার তালাক দেয়ার পর আবার তাকে ফিরিয়ে নিয়েছে সে তার জীবনকালে যখন তাকে তৃতীয়বার তালাক দেবে তখন সেই স্ত্রী তার থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
কুরআন ও হাদীস থেকে তালাকের যে সঠিক পদ্ধতি জানা যায় তা হচ্ছে এই- স্ত্রীকে 'তুহর' (ঋতুকালীন রক্ত প্রবাহ থেকে পবিত্র)- এর অবস্থায় তালাক দিতে হবে। যদি এমন সময় স্ত্রীর সাথে ঝগড়া হয় যখন তার মাসিক ঋতুস্রাব চলছে তাহলে তখনই তালাক দেয়া সংগত নয়; বরং ঋতুস্রাব বন্ধ হবার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তারপর এক তালাক দেয়ার পর চাইলে দ্বিতীয় 'তুহরে' আর এক তালাק দিতে পারে। অন্যথায় প্রথম তালাকটি দিয়ে ক্ষান্ত হওয়াই ভালো। এ অবস্থায় ইদ্দত অতিক্রান্ত হবার আগে স্বামীর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার থাকে। আর ইদ্দত শেষ হয়ে যাবার পরও উভয়ের জন্য পারস্পরিক সম্মতির মাধ্যমে পুনর্বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগও থাকে। কিন্তু তৃতীয় 'তুহরে' তৃতীয়বার, তালাক দেয়ার পর স্বামী আর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার বা পুনর্বার উভয়ের এক সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার কোনো অধিকার থাকে না। তবে একই সময় তিন তালাক দেয়ার ব্যাপারটি যেমন অজ্ঞ লোকেরা আজকাল সাধারণভাবে করে থাকে, শরীয়াতের দৃষ্টিতে তা কঠিন গোনাহ। নবী কঠোরভাবে এর নিন্দা করেছেন। এমনকি উমর থেকে এতদূর প্রমাণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি একই সময় স্ত্রীকে তিন তালাক দিতো তিনি তাকে বেত্রাঘাত করতেন।
(তবুও একই সময় তিন তালাক দিয়ে চার ইমামের মতে তালাক অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে কিন্তু তালাকদাতা কঠিন গোনাহের অধিকারী হবে। আর শরীয়াতের দৃষ্টিতে এটি মুগাল্লাযা বা গর্হিত তালাক হিসেবে গণ্য হবে)।
মোহরানা, গহনাপত্র ও কাপড়-চোপড় ইত্যাদি, যেগুলো স্বামী ইতপূর্বে স্ত্রীকে দিয়েছিল। সেগুলোর কোনো একটি ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার তার নেই। এমনিতে কোনো ব্যক্তিকে দান বা উপহার হিসেবে কোনো জিনিস দিয়ে দেয়ার পর তার কাছ থেকে আবার তা ফিরিয়ে নিতে চাওয়া ইসলামী নৈতিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই ঘৃণ্য
কাজকে হাদীসে এমন কুকুরের কাজের সাথে তুলনা করা হয়েছে যে নিজে বমি করে আবার তা খেয়ে ফেলে। কিন্তু বিশেষ করে একজন স্বামীর জন্য নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তাকে বিদায় করার সময় সে নিজে তাকে এক সময় যা কিছু দিয়েছিল সব তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে নেয়া অত্যন্ত লজ্জাকর। বিপরীত পক্ষে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে বিদায় করার সময় কিছু না কিছু দিয়ে বিদায় করা নৈতিক আচরণ ইসলাম শিখিয়েছে।
অবশ্য স্ত্রী যদি স্বামীর কোনো অপরাধ ছাড়া তার থেকে অব্যাহতি চায় শরীয়াতের পরিভাষায় একে বলা হয় 'খুলা' তালাক। অর্থাৎ স্বামীকে কিছু দিয়ে স্ত্রী তার কাছ থেকে তালাক আদায় করে নেয়া। এ ব্যাপারে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ঘরোয়াভাবেই যদি কিছু স্থিরীকৃত হয়ে যায় তাহলে তাই কার্যকর হবে। কিন্তু ব্যাপারটি যদি আদালত পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে আদালত কেবল এতটুকু অনুসন্ধান করবে যে, এই ভদ্রমহিলা তার স্বামীর প্রতি যথার্থই এত বেশি বিরূপ হয়ে পড়েছে কিনা যার ফলে তাদের দু'জনের এক সাথে ঘর সংসার করা কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে সঠিক অনুসন্ধান চালিয়ে নিশ্চিত হবার পর আদালত অবস্থার প্রেক্ষিতে যে কোনো বিনিময় নির্ধারণ করার ক্ষমতা রাখে। এই বিনিময় গ্রহণ করে স্বামীর অবশ্যই তার স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে। স্বামী ইতোপূর্বে যে পরিমাণ সম্পদ তার ঐ স্ত্রীকে দিয়েছিল তার চেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ-সম্পদ বিনিময় হিসেবে তাকে ফেরত দেয়া সাধারণত ফকীহগণ পছন্দ করেননি।
'খুলা' তালাক 'রজঈ' নয়; বরং এটি 'বায়েন' তালাক। যেহেতু স্ত্রীলোকটি মূল্য দিয়ে এক অর্থে তালাকটি যেন কিনে নিয়েছে, তাই এই তালাকের পর আবার রুজু করার তথা ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার স্বামীর থাকে না। তবে আবার যদি তারা পরস্পরের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়, তাহলে এমনটি করা তাদের জন্য সম্পূর্ণ বৈধ।
অধিকাংশ ফিক্হ শাস্ত্রবিদের মতে 'খুলা' তালাকের ইদ্দতও সাধারণ তালাকের সমান। কিন্তু আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ইত্যাদি হাদীসগ্রন্থে এমন বহুতর হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে যা থেকে জানা যায় যে, নবী এক ঋতুকালকে এর ইদ্দত গণ্য করেছিলেন। উসমান এই অনুযায়ী একটি মামলার ফায়সালাও দিয়েছিলেন। (ইবনে কাসীর, ১ম খ-, ২৭৬ পৃষ্ঠা)।