📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 বৈবাহিক সম্পর্ক শুধুমাত্র যৌন সম্পর্ক নয়

📄 বৈবাহিক সম্পর্ক শুধুমাত্র যৌন সম্পর্ক নয়


وَلَا تَنكِحُوا الْمُشْرِكَتِ حَتَّىٰ يُؤْمِنَّ وَلَأَمَةٌ مُّؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّىٰ يُؤْمِنُوا ۚ وَلَعَبْدٌ مُّؤْمِنٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ أُولَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ وَيُبَيِّنُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ.
অর্থঃ মুশরিক নারীদেরকে কখনো বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। একটি সম্ভ্রান্ত মুশরিক নারী তোমাদের মনহরণ করলেও একটি মু’মিন দাসী তার চেয়ে ভালো। আর মুশরিক পুরুষদের সাথে নিজেদের নারীদের কখনো বিয়ে দিয়ো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। একজন সম্ভ্রান্ত মুশরিক পুরুষ তোমাদের মুগ্ধ করলেও একজন মুসলিম দাস তার চেয়ে ভালো। তারা তোমাদের আহবান জানাচ্ছে আগুনের দিকে আর আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় তোমাদেরকে আহবান জানাচ্ছেন জান্নাত ও ক্ষমার দিকে। তিনি নিজের বিধান সুস্পষ্ট ভাষায় লোকদের সামনে বিবৃত করেন। আশা করা যায়, তারা শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করবে। (সূরা বাকারা: আয়াত-২২১)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: মুশরিকদের সাথে বিয়ে-শাদীর সম্পর্ক না রাখার ব্যাপারে উপরে যে কথা বলা হয়েছে এটি হচ্ছে তার মূল কারণ ও যুক্তি। নারী ও পুরুষের মধ্যে বিয়েটা নিছক একটি যৌন সম্পর্ক মাত্র নয়; বরং এটি একটি গভীর তামাদ্দুনিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও মানসিক সম্পর্ক। মু’মিন স্বামী বা স্ত্রীর প্রভাবে মুশরিক স্ত্রী বা স্বামী এবং তার পরিবার ও পরবর্তী বংশধররা ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস ও জীবন ধারায়
গভীরভাবে আকৃষ্ট ও প্রভাবিত হয়ে যেতে পারে, সেখানে অন্যদিকে মুশরিক স্বামী বা স্ত্রীর ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-ভাবনা ও আচার-ব্যবহারে কেবলমাত্র মু'মিন স্বামীর বা স্ত্রীরই নয়; বরং তার সমগ্র পরিবার ও পরবর্তী বংশধরদেরও প্রভাবিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ধরনের দাম্পত্য জীবনের ফলশ্রুতিতে ইসলাম কুফর ও শিরকের এমন একটি মিশ্রিত জীবন ধারা সেই গৃহে ও পরিবারে লালিত হবার সম্ভাবনাই বেশি, যাকে অমুসলিমরা যতই পছন্দ করুক না কেন ইসলাম তাকে পছন্দ করতে এক মুহূর্তের জন্যেও প্রস্তুত নয়। কোনো খাঁটি ও সাচ্চা মু'মিন নিছক নিজের যৌন লালসা পরিতৃপ্তির জন্য কখনো নিজ গৃহে ও পরিবারে কাফেরী ও মুশিরকী চিন্তা-আচার-আচরণ লালিত হবার এবং নিজের অজ্ঞাতসারে নিজের জীবনের কোনো ক্ষেত্রে কুফর ও শিরকে প্রভাবিত হয়ে যাবার বিপদ ডেকে আনতে পারে না। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেয়া হয় যে, কোনো মু'মিন কোনো মুশরিকের প্রেমে পড়ে গেছে তাহলেও তার ঈমানের দাবী হচ্ছে এই যে, সে নিজের পরিবার, বংশধর ও নিজের দীন, নৈতিকতা ও চরিত্রের স্বার্থে নিজের ব্যক্তিগত আবেগকে কুরবানী করে দেবে।
যৌন সম্পর্ক অনেকটা পাশবিক আকর্ষণ। মানব জীবনে যৌন আকর্ষণ আল্লাহর সৃষ্টি কৌশলের একটা বিশেষ দিক মাত্র। পারিবারিক জীবনের ভিত্তি ও মানব বংশ রক্ষার জন্যে আল্লাহ তায়ালা নারী-পুরুষ সৃষ্টি করে তাদের বয়সের একটা সীমা পর্যন্ত যৌন আকর্ষণ দিয়েছেন। পরিবারের ভিত্তি স্থাপন করে মানব সমাজের শৃংখলা আনয়ন করে মানব বংশ বৃদ্ধি করে ও আধ্যাত্মিকতার উন্মোষ ঘটিয়ে পূর্ণ মানবতা হাসিলের জন্যে দাম্পত্য জীবনের নর-নারীর এক সুনিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের পেছনে এ যৌন আকর্ষণের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। অনেক সময় আধ্যাত্মিক প্রেম সাধনায় পাশবিক প্রেম প্রাথমিক সোপানের ন্যায় গণ্য হয়ে থাকে। 'ইশকে মাজাযী' থেকে মানুষ 'ইশকে হাকীকীর' স্তরে উপনীত হতে পারে।
সুতরাং যৌন ক্ষুধা নিবৃত্তই বিবাহের উদ্দেশ্য হতে পারে না। এটা তো যুবক-যুবতীর মনের সাময়িক-সম্পূর্ণ অস্থায়ী অবস্থা মাত্র। স্বামী-স্ত্রীর পূর্ণাঙ্গ সম্পর্কের একটা দিক মাত্র। একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলেও একমাত্র দিক এটা নয়। এক জোড়া দম্পত্তির পুরো জীবনের সফলতার জন্যে তাদের সার্বিক সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য। কাজেই দু'জনের চিন্তাধারা, মন-মানসিকতা ও আকীদা-বিশ্বাসে সামঞ্জস্য একান্ত অপরিহার্য। কোনো অমুসলিম নারী একজন মুসলিম নরের জন্যে উপযুক্ত নয়, যেমন করে একজন অমুসলিম পুরুষ একজন মুসলিম নারীর সাথী হওয়ার যোগ্য নয়। অমুসলিম নর-নারীর দৈহিক সৌন্দর্য ও আর্থিক সচ্ছলতা এ ক্ষেত্রে মোটেই গণ্য হতে পারে না।
আমাদের সমাজে দেখা যায়, সহশিক্ষার কারণে অনেক স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী যৌন আকর্ষণে পরস্পরকে ভালবেসে মাতা-পিতার প্রতি কলংক লেপন করে পালিয়ে বিয়ে করে। আর তাদের ঐ সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতায় রূপায়িত হতেও দেখা যায়। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী দেখা যায় লাভ মেরেজের প্রায় ৭০% শেষ পর্যন্ত বিবাহ
বিচ্ছেদের সম্মুখীন হয়। কারণসমূহের মধ্যে প্রধানত এর সাময়িক আকর্ষণ, বাহ্যিক ভালবাসা, আবেগ প্রবণতা, অদূরদর্শিতা এবং সর্বোপরি মাতা-পিতার সদিচ্ছার অভাবই এজন্য দায়ী বলে মনে করা হয়।
বিবাহে মানুষের পুরো দুনিয়ার জীবনের জন্য সাথী নির্বাচন করা হয়ে থাকে। তাই ইসলাম উভয়কে এখতিয়ার দিয়েছে পরস্পরকে দেখে শুনে নেয়ার জন্য। তা ছাড়া বর ও কনের সার্বিক সমতা (কুফু) হওয়ার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে ইসলামে। বিশেষতঃ দীনের ব্যাপারে সতর্কতা অত্যাবশ্যক। আদর্শিক মানসিকতা ও আমলী জিন্দেগীতে বর-কনে যেন অভিন্ন হয়, তারপ্রতি লক্ষ্য রাখা কর্তব্য।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 স্ত্রীর হায়েজ অবস্থায় স্বামীর আচরণ

📄 স্ত্রীর হায়েজ অবস্থায় স্বামীর আচরণ


وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ.
অর্থ: তোমাকে জিজ্ঞেস করছে, হায়েয সম্পর্কে নির্দেশ কী? বলে দাও, সেটি একটি অশুচিকর ও অপরিচ্ছন্ন অবস্থা। এ সময় স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকো এবং তারা পাক- সাফ না হওয়া পর্যন্ত তাদের ধারে কাছেও যেয়ো না। তারপর যখন তারা পাক-পবিত্র হয়ে যায়, তাদের কাছে যাও যেভাবে যাবার জন্য আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা অসৎকাজ থেকে বিরত থাকে ও পবিত্রতা অবলম্বন করে। (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-২২২)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে স্ত্রীর হায়েজ অবস্থায় স্বামীর আচরণ বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। আনাস থেকে বর্ণিত আছে, ইয়াহুদীরা ঋতুবতী স্ত্রীদের তাদের সাথে খেতে দিতো না। এমনকি তাদের সাথে এক ঘরে ঘুমাতোও না। সাহাবায়ে কিরাম এ সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করলে উপরিউক্ত আয়াত নাযিল হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ বলেন, "তাদের সাথে সঙ্গম ছাড়া সবকিছুই জায়েয"।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আয়েশা হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হায়েজ অবস্থায় আমি হাড় চুষে দিলে তিনিও একই স্থানে মুখ দিয়ে চুষতেন। আমি পানি পান করে রেখে দিলে তিনি পাত্রের একই স্থানে মুখ দিয়ে ঐ পানি পান করতেন।
তিনি আরও বলেন, আমার হায়েজ অবস্থায় হুজুর গোসলের সময় আমাকে তাঁর মাথা ধুয়ে দিতে বলতেন। আমার ঐ অবস্থায় তিনি আমার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন।
হাদীসে এও রয়েছে যে, একদা হুজুর তাঁর কোনো ঋতুবতী স্ত্রীকে মসজিদ থেকে (জানালা দিয়ে) বিছানা এনে দিতে বললেন। তখন তিনি ঋতুবতী বলে ওজর পেশ করলে রাসূলুল্লাহ বলেন إِنَّ حَيْضَكِ لَيَسَتْ بِيَدِكِ “তোমার হায়েজ তো তোমার হাতে নয়।”
উপরিউক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহের বর্ণনায় স্ত্রীদের হায়েজ অবস্থায় স্বামীর ব্যবহার সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যার মূলকথা অন্যান্য জাতির ন্যায় মুসলিম জাতির স্ত্রীগণ হায়েজ অবস্থায় অস্পৃশ্য হয়ে যায় না। ঐ অবস্থায়ও স্ত্রীরা স্বামীদের সাথে একই বিছানায় শয়ন করতে ও একই পাত্রে খেতে পারে। ইসলাম নারীদের এ প্রাকৃতিক অবস্থায়ও তাদের সাথে স্বাভাবিক ব্যবহার করার রীতি বহাল রেখেছে। অপবিত্রতার কারণে স্ত্রীসংগম করা জায়েয না হলেও তাদের ঐ অবস্থায় অন্যান্য স্বাভাবিক আচার-ব্যবহার বৈধ। এভাবে ইসলাম নারীদের যথার্থ মূল্য ও মর্যাদা দিয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যায় পাশ্চাত্যের গবেষকদের নারী সম্পর্কিত মন্তব্যের কথা। তারা ভাবতেন নারীদের আত্মা আছে কিনা? থাকলে তা কী ধরনের? কোন জাতীয় তা কি মানুষের আত্মা?
উক্ত আয়াতের মাঝের অংশে বলা হয়েছে, “যখন তারা পবিত্র হবে তখন আল্লাহর নির্দেশিত স্থানে তাদের কাছে যাও।” অর্থাৎ সহবাস কর। এখানে স্থান বলতে সঙ্গমস্থল অর্থাৎ স্ত্রীলিংগ বুঝানো হয়েছে। স্ত্রীলিংঙ্গ ছাড়া অন্য পথে সংগম করলে তা হবে সীমাসংঘন জনিত অপরাধ।
ইবনে আব্বাস ও অন্যান্যের মতে পায়খানার রাস্তায় রতিক্রিয়া হারাম বলে প্রমাণিত হয়েছে। আজকের পাশ্চাত্যের প্রগতিশীলদের (?) দেশে আইন করে সমকামিতা বৈধ করা হয়েছে। এভাবে তারা রুচী বর্জিত হয়ে পশুত্বের পর্যায়ে অবনত হয়েছে। আর অভূতপূর্ব রোগ বিস্তার লাভের পথ সুগম করছে। তথাকথিত সভ্য জাতির মাঝে এমনি ধরনের অসভ্য আচরণ চলছে।
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, “আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।” এখানে আল্লামা ইবনে কাসীরের মতে তাওবাকারী বলতে গুনাহ বর্জনকারী ও হায়েজ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত ব্যক্তিকে ঝুঝানো হয়েছে; আর অপবিত্রতা অবলম্বনকারী বলতে আল্লাহর নিষিদ্ধ যাবতীয় নোংরামী ও হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীসংগম থেকে বিরত ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে।
ভর্তা এর দু'টো অর্থ হতে পারে। এক. কষ্ট ও ক্ষতি; দুই. এমন অপবিত্রতা যা মানুষ অপছন্দ করে। হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীসহবাস করলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যেই কষ্টকর, ক্ষতি ও অপবিত্রতা। স্ত্রীর ক্ষতি হলো, হায়েজ জনিত ব্যাথার আঘাত লাগা, ব্যথিত শিরায় আঘাত লাগার কষ্ট, জুরায়ুর সংকোচন সম্প্রসারণ, হায়েজ অনিয়মিতা আর স্বামীর রোগের সৃষ্টি করে থাকে। এসব কারণে হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীসংগম নিষেধ করা হয়েছে। উত্তমরূপে পবিত্র হওয়ার পূর্বে স্ত্রীসংগম হারাম করে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা নর-নারীকে উপরিউক্ত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করেছেন।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 কেবল যৌন চাহিদা চরিতার্থ করাই স্ত্রীসহবাসের উদ্দেশ্য নয়

📄 কেবল যৌন চাহিদা চরিতার্থ করাই স্ত্রীসহবাসের উদ্দেশ্য নয়


نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَكُمْ - فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ وَقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّكُم مُّلَاقُوهُ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ.
অর্থ: তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের কৃষিক্ষেত। তোমরা যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের কৃষিক্ষেতে যাও। তবে নিজেদের ভবিষ্যতের চিন্তা করো এবং আল্লাহর অসন্তোষ থেকে দূরে থাকো। একদিন তোমাদের অবশ্যই তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে হবে, একথা ভালোভাবেই জেনে রাখো। আর হে নবী! যারা তোমার বিধান মেনে নেয় তাদেরকে সাফল্য ও সৌভাগ্যের সুখবর শুনিয়ে দাও। (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-২২৩)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: স্ত্রী জাতি সৃষ্টির উদ্দেশ্য এ নয় যে, তারা পুরুষের "বিহার ক্ষেত্র" হিসেবে ব্যবহৃত হবে; বরং দুনিয়ার জীবন-যাপনে নর-নারী হবে পরস্পরের সহযাত্রী। সহাবস্থানের ব্যাপদেশে বৈধ উপায়ে তাদের সংগমের অনুমতি য়েছে। প্রকৃতিগতভাবে তাদের মাঝে সেই স্পৃহাও রয়েছে। কিন্তু তাই বলে নারীদেরকে পুরুষের যৌন ক্ষুধা মিটানোর জন্যেই সৃষ্টি করা হয়নি, সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর পৃথিবীতে মানব বংশ বিস্তারসহ দুনিয়ার জীবন-যাপনে, পুরুষের সহগামী হিসেবে। বরং নর-নারী পারস্পরিক আকর্ষণ সৃষ্টির পেছনেও সৃষ্টির ক্রমধারা জারী রাখা তথা মানব বংশের বিস্তার সাধন করার উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। উদ্দেশ্য এ নয় যে, সহবাস বা সংগমের কারণে সন্তান হবে; বরং সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম ও প্রসেস হলো স্ত্রীসংগম। যে কারণে আল্লাহ তায়ালা স্ত্রীদেরকে পুরুষদের কৃষিক্ষেত্র বলে স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে ক্ষেত ও কৃষকের সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন।
আল্লাহ সৃষ্ট প্রাকৃতিক নিয়ম নারীকে পুরুষের বিচরণক্ষেত্র হিসেবে তৈরি করেন নি এবং তাদের উভয়ের মধ্যে জমি ও কৃষকের মতো একটা সম্পর্ক রয়েছে। জমিতে কৃষক নিছক বিচরণ ও ভ্রমণ করতে যায় না। জমি থেকে ফসল উৎপাদন করার জন্যই সে সেখানে যায়। মানব বংশ ধারার কৃষককেও মানবতার এই জমিতে সন্তান উৎপাদন ও বংশধারাকে সুমন্নত রাখার লক্ষ্যেই যেতে হবে। মানুষ এই জমিতে কিভাবে ফসল উৎপাদন করবে সে সম্বন্ধে আল্লাহর শরীয়াতের কোনো বক্তব্য নেই। তবে তার দাবী কেবল এতটুকুন যে, তাকে জমিতেই যেতে হবে এবং সেখান থেকে ফসল উৎপাদন করার লক্ষ্যেই যেতে হবে।
আলোচ্য আয়াতে "তবে নিজেদের ভবিষ্যতের চিন্তা করো" দ্বারা ব্যাপক অর্থ বুঝানো হয়েছে। এর দু'টি অর্থ হয়। দু'টিরই গুরুত্ব সমান। এর একটি অর্থ হচ্ছে, তোমাদের বংশধারা রক্ষা করার চেষ্টা করো। তোমাদের দুনিয়া থেকে বিদায় নেবার আগেই যেন তোমাদের স্থান গ্রহণকারী তৈরি হয়ে যায়। দ্বিতীয় অর্থটি হচ্ছে, যে পরবর্তী বংশধরকে তোমরা নিজেদের স্থলাভিষিক্ত করে যাচ্ছো, তাকে দীন, ঈমান, চরিত্র, নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলিতে ভূষিত করার চেষ্টা করো। পরবর্তী বাক্যে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে, এই দু'টি দায়িত্ব পালনে তোমরা যদি স্বেচ্ছায় গাফলতি বা ত্রুটি করো তাহলে আল্লাহর কাছে তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 স্ত্রীর সাথে সহবাস না করার কসম করলে

📄 স্ত্রীর সাথে সহবাস না করার কসম করলে


لِلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِنْ نِسَائِهِمْ تَرَبُّصُ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ فَإِنْ فَأَؤُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ. وَإِنْ عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَإِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ .
অর্থ: যেসব লোক নিজেদের স্ত্রীদের সাথে সম্পর্ক না রাখার কসম খেয়ে বসে তাদের জন্য রয়েছে চার মাসের অবকাশ। যদি তারা রুজু করে (ফিরে আসে) তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। আর যদি তারা তালাক দেবার সংকল্প করে তাহলে জেনে রাখো আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন। (সূরা আল-বাকারা: আয়াত: ২২৬-২২৭)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: ফিক্বহ্ পরিভাষায় একে বলা হয়, 'ঈলা'। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সবসময় মধুর সম্পর্ক থাকা তো সম্ভব নয়। বিভিন্ন সময় সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার বহুবিধ কারণ সৃষ্টি হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর শরীয়াত এমন ধরনের সম্পর্ক ভাঙা পছন্দ করে না, যার ফলে উভয়ে আইনগতভাবে দাম্পত্য বাঁধনে আটকে থাকে কিন্তু কার্যত পরস্পর এমনভাবে আলাদা থাকে যেন তারা স্বামী-স্ত্রী নয়। এই ধরনের সম্পর্ক বিকৃতির জন্য আল্লাহ চার মাস সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই চার মাসের মধ্যে উভয়ের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত করতে হবে। অন্যথায় এই সম্পর্ক ছিন্ন করে দিতে হবে। তারপর উভয়ের স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছামতো বিয়ে করতে পারবে।
আয়াতে যেহেতু 'কসম খেয়ে বসা' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তাই হানাফী ও শাফেঈ ফকীহগণ এই আয়াতের যে অর্থ গ্রহণ করেছেন তা হচ্ছে এই যে, যেখানে স্বামী তার স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক না রাখার কসম খায় একমাত্র সেখানেই এই বিধানটি কার্যকর হবে। আর কসম না খেয়ে দাম্পত্য সম্পর্ক যত দীর্ঘকালের জন্য ছিন্ন করুক না কেন এই আয়াতের নির্দেশ সেখানে প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু মালেকী ফকীহদের মত হচ্ছে, কসম খাক বা না খাক উভয় অবস্থায় এই চার মাসের অবকাশ পাবে। ইমাম আহমাদের (র) একটি বক্তব্যও এর সমর্থনে পাওয়া যায়।
আলী, ইবনে আব্বাস ও হাসান বসরীর (র) মতে এই নির্দেশটি শুধুমাত্র বিকৃতির কারণে যে সম্পর্কচ্ছেদ হয় তার জন্য প্রযোজ্য। তবে কোনো অসুবিধার কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক থাকা অবস্থায় স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক বিচ্ছেদ করে তবে তার ওপর এই নির্দেশটি প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু অন্যান্য ফকীহদের মতে স্বামী-স্ত্রী মধ্যকার দৈহিক সম্পর্ক ছিন্নকারী প্রত্যেকটি শপথই 'ঈলা'র অন্তর্ভুক্ত এবং সন্তুষ্টির সাথে হোক বা অসন্তুষ্টির সাথে হোক চার মাসের বেশি সময় পর্যন্ত এই ধরনের অবস্থা অব্যাহত থাকা উচিত নয়।
কোনো কোনো ফকীহ এ বাক্যের অর্থ এভাবে গ্রহণ করেছেন যে, এই নির্দিষ্ট সময়- কালের মধ্যে যদি তারা নিজেদের কসম ভেঙে ফেলে এবং তাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে নেয়, তাহলে তাদের কসম ভাঙার কাফ্ফারা আদায় করতে হবে না। আল্লাহ তাদেরকে এমনিতেই মাফ করে দেবেন। কিন্তু অধিকাংশ ফকীহর মত হচ্ছে এই
যে, কসম ভাঙার জন্য কাফফারা আদায় করতে হবে। ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু বলার মানে এই নয় যে, কাফফারা মাফ করে দেয়া হয়েছে; বরং এর মানে হচ্ছে, আল্লাহ তোমাদের কাফ্ফারা কবুল করে নেবেন এবং সম্পর্কচ্ছেদের সময়ে তোমরা পরস্পরের ওপর যেসব বাড়াবাড়ি করেছিলে সেগুলো মাফ করে দেবেন।
উসমান, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, যায়েদ ইবনে সাবেত প্রমুখ সাহাবীগণের মতে 'রুজু' করার অর্থ শপথ ভাঙার ও পুনরায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করার সুযোগ চার মাস সময়-কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই সময়টি অতিবাহিত হয়ে যাওয়া এই অর্থ বহন করে যে, স্বামী তালাক দেয়ার সংকল্প করেছে। তাই এ অবস্থায় এই নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হবার সাথে সাথেই আপনা আপনি তালাক অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে। সেটি হবে এক 'তালাক বায়েন'। অর্থাৎ ইদ্দত পালনকালে স্বামীর আর স্ত্রীকে গ্রহণ করার অধিকার থাকবে না। তবে তারা উভয়ে চাইলে আবার নতুন করে বিয়ে করতে পারবে। উমর, আলী, ইবনে আব্বাস ও ইবনে উমর থেকেও এ ধরনের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। হানাফী ফকীহগণ এই মতটিই গ্রহণ করেছেন।
সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেব, মাকহুল, যুহরী প্রমুখ ফীহগণ এই মতটির এই অংশটুকুর সাথে একমত হয়েছেন যে, চার মাস সময় অতিবাহিত হবার পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে তালাক অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে। কিন্তু তাঁদের মতে সেটা হবে এক 'তালাক রজঈ'। অর্থাৎ ইদ্দত পালন কালে স্বামী আবার স্ত্রীকে রুজু করার তথা দাম্পত্যা সম্পর্কে ফিরিয়ে নেয়ার অধিকারী হবে। আর যদি 'রুজু' না করে তাহলে ইদ্দত অতিবাহিত হবার পর দুই জন আবার চাইলে বিয়ে করতে পারবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00