📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার এবং সকল মানুষের সাথে সদাচরণের নির্দেশ

📄 পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার এবং সকল মানুষের সাথে সদাচরণের নির্দেশ


وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا اللَّهَ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسْكِينِ وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا وَأَقِيمُوا الصَّلوةَ وَاتُوا الزَّكَاةَ ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ إِلَّا قَلِيلًا مِّنكُمْ وَأَنْتُمْ مُعْرِضُونَ.
অর্থ: স্মরণ করো যখন ইসরাঈল সন্তানদের থেকে আমরা এই মর্মে পাকাপোক্ত অংগীকার নিয়েছিলাম যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারোর ইবাদাত করবে না, মা-বাপ, আত্মীয়-পরিজন, ইয়াতিম ও মিসকিনদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে, লোকদেরকে ভালো কথা বলবে, নামায কায়েম করবে ও যাকাত দেবে। কিন্তু সামান্য কয়েকজন ছাড়া তোমরা সবাই অংগীকার ভংগ করেছিলে এবং এখনো ভেঙে চলছো। (সূরা বাকারা: আয়াত-৮৩)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আল কুরআনের বহু স্থানে মানব জাতিকে আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদ মেনে নেয়ার নির্দেশের পর পরই নিজের মাতা ও পিতার সেবা-যত্ম করার প্রতি তাগিদ দেয়া হয়েছে; বরং বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ সরাসরি তাওহীদের পরেই মাতা ও পিতার প্রতি ইহসান করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন ইরশাদ হচ্ছে, وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِا الْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
অর্থ: তোমার প্রভু নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করো না, আর মাতা-পিতার সাথে ইহসান বা সদাচার করো। (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
সূরা লোকমানে বলেছেন, أَنِ اشْكُرْلِي وَلِوَالِدَيْكَ তুমি আমার প্রতি ও তোমার মাতা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।
এভাবে সৃষ্টিকর্তা রাব্বুল আলামীন নারীকেও অর্থাৎ মাতাকেও পিতার সাথে মর্যাদা দিয়ে নর-নারী সবাইকে নিজ নিজ মাতা ও পিতার খিদমত ও শোকর আদায় করতে নির্দেশ
দিয়েছেন। আর এ নির্দেশ হচ্ছে আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকৃতির সাথে মাতা-পিতার প্রতি কর্তব্য পালন করার।
বিশ্বনবী মুহাম্মদ তাঁর এক বাণীতে পিতার তুলনায় মাতা অর্থাৎ নারী জাতির সেবা শুশ্রূষার প্রতি অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। একদা জনৈক সাহাবী তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। আমি কার প্রতি সাদাচার প্রদর্শন করবো? তিনি বললেন, তোমার মায়ের প্রতি। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর? তিনি বললেন, তোমার মায়ের প্রতি। তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর? তিনি এবারও জবাব দিলেন তোমার মায়ের প্রতি। চতুর্থ বার জিজ্ঞাসিত হলে নবী করীম জবাব দিলেন, তোমার পিতার প্রতি। অন্য হাদীসে কিছু সংযোজন করা হয়েছে যে, অতঃপর তোমার রক্ত সম্পর্কের নিকটাত্মীয়ের প্রতি।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা মহাপাপ

📄 স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা মহাপাপ


فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ.
অর্থ : এরপরও তারা তাদের থেকে এমন জিনিস শিখতো, যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা এনে দিতো। (সূরা বাকারা : আয়াত-১০২)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা : সোলায়মান আলাইহিস সালামের যুগের একটি ঘটনা এখানে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে। তখন লোকদের নিকট অধিকতর চাহিদার বিষয় ছিল তাবিজ-তুমার বা যাদুর প্রভাবে অন্যের স্ত্রীকে তার থেকে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে নিজের দিকে আকৃষ্ট করা। হারূত ও মারূত নামের দু'জন ফেরেশতাকে আল্লাহ তা'আলা পরীক্ষার জন্যে দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা পরীক্ষায় টিকতে পারেনি। সেই বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল এমন তাবীজের যার সাহায্যে এক ব্যক্তি অন্য একজনের স্ত্রীকে তার স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে নিজের প্রতি প্রেমাসক্ত করতে পারে। তাদের মধ্যে নৈতিক পতন দেখা দিয়েছিল এটি ছিল তার নিকৃষ্টতম পর্যায়। যে জাতির সদস্যবৃন্দ পরকীয়া প্রেমে আসক্ত হওয়া ও অন্যের বিয়ে করা বউকে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়াকে নিজেদের সবচেয়ে বড় বিজয় মনে করে এবং এটিই তাদের দৈনন্দিন জীবনের সর্বাধিক আকর্ষণীয় কাজে পরিণত হয়, তার নৈতিক অধপতন যে ষোলকলায় পূর্ণ হয়ে গেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে।
আসলে দাম্পত্য সম্পর্ক হচ্ছে মানব সভ্যতা-সংস্কৃতির মূল। নারী ও পুরুষের সম্পর্কের সুস্থতার ওপর সমগ্র মানব সভ্যতার সুস্থতা এবং অসুস্থতার ওপর সমগ্র মানব সভ্যতার অসুস্থতা নির্ভরশীল। কাজেই যে বৃক্ষটির দৃঢ়ভাবে সংবদ্ধ থাকার ওপর ব্যক্তির ও সমগ্র সমাজের টিকে থাকা নির্ভর করে তার মূলে যে ব্যক্তি কুঠারঘাত করে তার চাইতে নিকৃষ্ট বিপর্যয় সৃষ্টিকারী আর কে হতে পারে? হাদীসে বলা হয়েছে, ইবলিস তার কেন্দ্র থেকে পৃথিবীর প্রত্যেক এলাকায় নিজের এজেন্ট পাঠায়। এজেন্টরা কাজ শেষে ফিরে এসে
নিজেদের কাজের রিপোর্ট শুনাতে থাকে। কেউ বলে আমি অমুক ফিতনা সৃষ্টি করেছি। কেউ বলে, আমি অমুক পাপের আয়োজন করেছি। কিন্তু ইবলিস প্রত্যেককে বলে যেতে থাকে, তুমি কিছুই করোনি। তারপর একজন এসে বলে, আমি এক জোড়া স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এসেছি। একথা শুনে ইবলিস তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। সে বলতে থাকে, তুমি একটা কাজের মতো কাজ করে এসেছো। এ হাদীসটি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করলে বনী ইসরাঈলদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যে ফেরেশতা পাঠানো হয়েছিল তাদের কেন যে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার 'আমল 'লোকদেরকে শিখাবার হুকুম দেয়া হয়েছিল তা সুস্পষ্টরূপে অনুধাবন করা যায়। আসলে তাদের নৈতিক অধঃপতনের যথাযথ পরিমাপের জন্য এটিই ছিল একমাত্র মানদণ্ড।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 হত্যাকারী নারী হলেও কিসাস প্রযোজ্য

📄 হত্যাকারী নারী হলেও কিসাস প্রযোজ্য


يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنثى بِالْأُنثى ، فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٍ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَادَاءُ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ ، ذَلِكَ تَخْفِيفٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ ، فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ .
অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য হত্যার ব্যাপারে কিসাসের বিধান লিখে দেয়া হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তি হত্যা করে থাকলে তার বদলায় ঐ স্বাধীন ব্যক্তিকেই হত্যা করা হবে, দাস হত্যাকারী হলে ঐ দাসকেই হত্যা করা হবে, আর নারী এই অপরাধ সংঘটিত করলে সেই নারীকে হত্যা করেই এর কিসাস নেয়া হবে। তবে কোনো হত্যাকারীর সাথে তার ভাই যদি কিছু কোমল ব্যবহার করতে প্রস্তুত হয়, তাহলে প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী রক্তপণ দানের ব্যবস্থা হওয়া উচিত এবং সততার সঙ্গে রক্তপণ আদায় করা হত্যাকারীর জন্য অপরিহার্য। এটা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে দণ্ড হ্রাস ও অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করবে তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা বাকারা: আয়াত-১৭৮)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: স্বাধীন ব্যক্তির হত্যাকারী কোনো স্বাধীন ব্যক্তি হলে যেমন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে, তেমনি কোনো ক্রীতদাস বা কোনো নারীকে হত্যার বদলেও হত্যাকারী স্বাধীন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। স্ত্রী হত্যার অপরাধে পুরুষকে এবং পুরুষ হত্যার অপরাধে স্ত্রীলোককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। কোনো প্রভাবশালী ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে যেমন, কোনো একজন প্রভাবশালী পুরুষ লোকের কিসাস স্বরূপ মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে, তেমনি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে একজন অসহায় নারী হত্যার কিসাসেও।
'কিসাস' হচ্ছে রক্তপাতের বদলা বা প্রতিশোধ। অর্থাৎ হত্যাকারীর সাথে এমন ব্যবহার করা যেমন সে নিহত ব্যক্তির সাথে করেছে। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, হত্যাকারী
যেভাবে নিহত ব্যক্তিকে হত্যা করেছে ঠিক সেভাবে তাকেও হত্যা করতে হবে; বরং এর অর্থ হচ্ছে, সে একজনকে হত্যা করেছে, তাকেও হত্যা করা হবে।
জাহেলী যুগের হত্যার বদলা নেয়ার ব্যাপারে একটি পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। কোনো জাতি বা গোত্রের লোকেরা তাদের নিহত ব্যক্তির রক্তকে যে পর্যায়ের মূল্যবান মনে করতো হত্যাকারীর পরিবার, গোত্র বা জাতির কাছ থেকে ঠিক সেই পরিমাণ মূল্যের রক্ত আদায় করতে চাইতো। নিহত ব্যক্তির বদলায় কেবলমাত্র হত্যাকারীর প্রাণ সংহার করেই তাদের কলিজা ঠাণ্ডা হতো না; বরং নিজেদের একজন লোক হত্যা করার প্রতিশোধ নিতে চাইতো তারা প্রতিপক্ষের শত শত লোককে হত্যা করে। তাদের কোনো অভিজাত ও সম্মানী ব্যক্তি যদি অন্য গোত্রের একজন সাধারণ ও নীচু স্তরের লোকের হাতে মারা যেতো, তাহলে এ ক্ষেত্রে তারা নিছক হত্যাকারীকে হত্যা করাই যথেষ্ট মনে করতো না; বরং হত্যাকারীর গোত্রের ঠিক সমপরিমাণ অভিজাত ও মর্যাদাশীল কোনো ব্যক্তির প্রাণ সংহার করতে অথবা তাদের কয়েকজনকে হত্যা করতে চাইত। বিপরীত পক্ষে নিহত ব্যক্তি তাদের দৃষ্টিতে যদি কোনো সামান্য ব্যক্তি হতো আর অন্যদিকে হত্যাকারী হতো বেশি মর্যাদাশীল ও অভিজাত, তাহলে এ ক্ষেত্রে তা নিহত ব্যক্তির প্রাণের বদলায় হত্যাকারীর প্রাণ সংহার করতে দিতে চাইতো না। এটা কেবল, প্রাচীন জাহেলী যুগের রেওয়াজ ছিল না। বর্তমান যুগেও যাদেরকে দুনিয়ার সবচেয়ে সুসভ্য জাতি মনে করা হয় তাদের সরকারী ঘোষণাবলিতেও অনেক সময় নির্লজ্জের মতো দুনিয়াবসীকে শুনিয়ে দেয়া হয়- আমাদের একজন নিহত হলে আমরা হত্যাকারীর জাতির পঞ্চাশজনকে হত্যা করবো। প্রায়ই আমরা শুনতে পাই, এ ব্যক্তিকে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করার জন্য পরাজিত ও অধীনস্থ জাতির আটককৃত বহু ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। এই বিশ শতকের একটি 'সুসভ্য' জাতি নিজেদের এক ব্যক্তির হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছে সমগ্র মিসরীয় জাতির ওপর। অন্যদিকে এই তথাকথিত সুসভ্য জাতিগুলোর বিধিবদ্ধ আদালতসমূহেও দেখা যায়, হত্যাকারী যদি শাসক জাতির এবং নিহত ব্যক্তি পরাজিত ও অধীনস্থ জাতির অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে তাদের বিচারকরা প্রাণদণ্ডের সিদ্ধান্ত দিতে চায় না। এসব অন্যায় ও অবিচারের পথ বন্ধ করার জন্য আল্লাহ এই আয়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নিহত ব্যক্তি ও হত্যাকারীর কোনো প্রকার মর্যাদার বাছ-বিচার না করে নিহত ব্যক্তির প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য শুধুমাত্র হত্যাকারীরই প্রাণ সংহার করা হবে।

📘 আল কুরআনে নারীদের ২৫ সূরা > 📄 স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পোষাক স্বরূপ

📄 স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পোষাক স্বরূপ


أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنتُمْ تَخْتَانُونَ أَنْفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنْكُمْ فَالْانَ بَاشِرُوهُنَّ وَابْتَغُوا مَا kَتَبَ اللهُ لَكُمْ
অর্থ: রোযার সময় রাতের বেলা স্ত্রীদের কাছে যাওয়া তোমাদের জন্য হালাল করে দেয়া হয়েছে। তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক। আল্লাহ জানতে পেরেছেন, তোমরা চুপি চুপি নিজেরাই নিজেদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছিলে। কিন্তু তিনি তোমাদের অপরাধ মাফ করে দিয়েছেন এবং তোমাদের ক্ষমা করেছেন। এখন তোমরা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে রাত্রিবাস করো এবং যে স্বাদ আল্লাহ তোমাদের জন্য বৈধ করে দিয়েছেন তা গ্রহণ করো। (সূরা বাকারা: আয়াত-১৮৭)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আলোচ্য আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা, নৈকট্য ও অবিচ্ছেদ্যতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। দেহ ও পোশাক যেমন পরস্পরের একান্ত ঘনিষ্ট অবিচ্ছেদ, স্বামী-স্ত্রীও তেমনি একে অপরের জন্যে একান্ত আপনজন। পোশাক যেমন দেহকে হেফাজত করে ও তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, স্বামী-স্ত্রীও তেমনি পরস্পরকে সংরক্ষণ ও পরস্পরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। পোশাক যেমন শীত ও গরমের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে, স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্কও মানুষকে পদস্খলন ও জীবনের দুঃখ-দুর্দশা থেকে বাচিয়ে রাখে। সমস্যাটি তৎকালীন সাহাবায়ে কিরামের সিয়াম পালন ব্যাপদেশে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানকে কেন্দ্র করে দেখা দিয়েছিল। তখন ইফতার গ্রহণের পর থেকে নিদ্রা গমন পর্যন্ত কেউ পানাহার বা স্ত্রী সহবাস করতে পারতো না। আল্লামা ইবনে কাসীরের মতে ইসলামের প্রথম দিকে তা ছিল নিষিদ্ধ। এ আয়াতে তা হালাল করা হয়েছে। এ আয়াতে আল্লাহ মু'মিনদের মনের সংকীর্ণতা পরিহার করে বিবেকের পূর্ণ আশ্বস্তি ও পবিত্রতার অনুভূতিসহ স্ত্রীগমন করার নির্দেশ দিয়েছেন।
শুরুতে রমযান মাসের রাত্রিকালে স্ত্রীর সাথে রাত্রিবাস করার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ না থাকলেও লোকেরা এমনটি করা অবৈধ মনে করতো। তারপর এই অবৈধ বা অপছন্দনীয় হবার ধারণা মনে পোষণ করে অনেক সময় তারা নিজেদের স্ত্রীদের কাছে চলে যেতো। এটা যেন নিজের বিবেকের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হতো। এর ফলে তাদের মধ্যে একটি অপরাধ ও পাপ মনোবৃত্তির লালনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তাই মহান আল্লাহ প্রথমে তাদেরকে বিবেকের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন অতঃপর বলেছেন, এটা তোমাদের জন্য বৈধ। কাজেই এখন তোমরা খারাপ কাজ মনে করে একে করো না; বরং আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতের সুযোগ গ্রহণ করে মন ও বিবেকের পূর্ণ পবিত্রতা সহকারে করো।
আল্লামা ইবনে কাসীর (র) তাঁর তাফসীরে ইবনে কাসীরে অনেকগুলো বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন। এখানে সংক্ষিপ্ত একটি বর্ণনার উদ্ধৃতি দেয়া হলো-
একদিন ইবনে খাত্তাব দাঁড়িয়ে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! বিগত রাত্রে আমি আমার স্ত্রীর কাছে সেই অভিলাষ ব্যক্ত করেছিলাম যা সাধারণত একজন পুরুষ তার স্ত্রীর কাছে করে থাকে। আমার স্ত্রী জানালো, সে ঘুমিয়েছিল। কিন্তু তার সে কথাকে আমি বাহানা মনে করে তার সাথে সহবাস করেছি। এ ঘটনার পর উপরিউক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়।
أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ
এ ঘটনাটির আরেকটি দিক হলো কা'ব ইবনে মালেক -এর বর্ণনা। তিনি বলেন, পরদিন প্রত্যুষেই উমর ইবনে খাত্তাব রাসূলের খিদমতে হাজির হয়ে তাঁর অবস্থা (উপরোক্ত ঘটনা) বর্ণনা করেন। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাযিল করেন।
عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَخْتَانُونَ اَنْفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنْكُمْ فَالْتَنَ بَاشِرُوهُنَّ وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللهُ لَكُمْ .
অর্থ: তোমরা যে নিজেদের ব্যাপারে খেয়ানত করেছিলে তা আল্লাহ জানেন। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের তওবা কবুল করেছেন, আর তোমাদের ক্ষমা করেছেন। সুতরাং এখন থেকে তোমরা (সুবহে সাদেক পর্যন্ত) স্ত্রী সহবাস করতে পার। (আল বাকারা: আয়াত-১৮৭)
هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَهُنَّ.
অর্থ: স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য পোশাক আর তোমরাও তাদের জন্য পোশাক। উক্ত আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, সাঈদ ইবনে বুবাইর প্রমুখ বলেন:
هُنَّ سَكَنْ لَكُمْ وَأَنْتُمْ سَكَنْ لَهُنَّ.
অর্থ: স্ত্রীগণ তোমাদের মানসিক শান্তি ও তৃপ্তি স্বরূপ আর তোমরাও তাদের জন্যে শান্তি ও তৃপ্তি স্বরূপ।
রাবী ইবনে আনাস এর ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে:
هُنَّ لِحَافٌ لَكُمْ وَأَنْتُمْ لِحَافٌ لَّهُنَّ
অর্থ: তারা তোমাদের জন্যে লেপ স্বরূপ আর তোমরাও তাদের জন্যে লেপ স্বরূপ।
এসব ব্যাখ্যার সারকথা হলো স্বামী-স্ত্রী উভয়কে এক সাথে অহরহ মিলে-মিশে থাকতে হয় এবং পরস্পরের সান্নিধ্যে ও সংস্পর্শে জীবন কাটাতে হয়। একই শয্যায় শয়ন করতে হয়। সুতরাং রমযানের রাতের বেলায় রোযা যেন তাদের জন্যে পীড়াদায়ক না হয়, সে জন্যে রমযানের রাতে স্ত্রী সহবাস হালাল করে দেয়া হয়েছে।
মানব সৃষ্টির আদিকাল থেকেই স্বামী-স্ত্রী সহবাসকে আল্লাহ তা'আলা মানুষের স্বভাবগত ধর্মে পরিণত করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা যে কারণে প্রথম মানুষ আদম-এক সৃষ্টি করে বিবি হাওয়াকে তার জীবন সংগীনি (স্ত্রী) হিসেবে সৃষ্টি করে বেহেশতে শান্তিতে বসবাস করতে দিলেন। মানব বংশ রক্ষার জন্যে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ থেকে একজন পুরুষ ও একজন মহিলাকে দিয়ে সমাজ জীবনের ভিত্তি স্থাপিত করতেই ইসলামে বিবাহ নীতির প্রবর্তন করা হয়েছে। এটি হচ্ছে ফিতরাতের ধর্ম ইসলামের স্বাভাবিক পদ্ধতি।
আলোচ্য আয়াতে স্বামী-স্ত্রীকে পরস্পরের জন্যে পোশাক ঘোষণা দিয়ে মানব স্বভাবের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দেয়া হয়েছে। দু'জন পৃথক সত্ত্বা হলেও দু'জনেরই অবিচ্ছেদ্য হয়ে দুনিয়ায় জীবন যাপন করে থাকে। স্ত্রীদের সে জন্যেই অর্ধাঙ্গীনি বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। কিন্তু আজকের সমাজে মেকী ভালবাসার খপ্পরে পড়ে আল্লাহর ঘোষিত স্বামী-স্ত্রীর সেই অকপট মধুর সম্পর্ক আর বাকি নেই। অধিকন্তু আজকের সমাজে যৌতুকের প্রাধান্য এবং ঘোষিত ও অঘোষিত যৌতুক প্রথার দৌরাত্নে দাম্পত্য জীবনের সেই প্রাকৃতিক প্রেম-প্রীতি বিলীন প্রায়। শরীয়তী বিবাহের পরিবর্তে বাণিজ্যিক বিবাহ মুসলিম সমাজকেও আজ এক ভয়াবহ পর্যায়ে উপনীত করেছে। মুসলমানদের সমাজকেও আজ এক ভয়াবহ পর্যায়ে উপনীত করেছে। মুসলমানদের সচেতনতা ও খাঁটি শরয়তী রাষ্ট্রব্যবস্থা ছাড়া এ মারাত্মক পর্যায় অতিক্রম করা কি সম্ভব? আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে,
وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنْتُمْ عُكِفُونَ فِي الْمَسْجِدِ.
"মসজিদে ই'তিকাফে থাকা অবস্থায় তোমরা স্ত্রী সহবাস করো না। রমযানের রাতে খানা-পিনা ও স্ত্রী সহবাস ইত্যাদি হালাল করা হয়েছে, কিন্তু রমযানের শেষ ১০ দিনে যে ই'তিকাফ এর বিধান রয়েছে সেই ই'তিকাফে থাকা অবস্থায় রাত্রী বেলায়ও স্ত্রী সহবাস জায়েয নেই। এখানে খানা-পিনা ও স্ত্রী সহবাসের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ ই'তিকাফকারী ব্যক্তি রমযানের রাতের বেলায় পানাহার করতে পারবে ঠিকই তবে স্ত্রীসঙ্গম করতে পারবে না। এ হুকুম কেবল ই'তিকাফকারী রোযাদারের জন্য মাত্র, আর ই'তিকাফ ছাড়া রোযাদারের জন্য এ হুকুম প্রযোজ্য নয়। আয়াতটির শেষাংশে বলা হয়েছে
وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنْتُمْ عُكِفُوْنَ فِي الْمَسْجِدِ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوْهَا .
"আর তোমরা স্ত্রী সহবাস করো না যখন তোমরা মসজিদসমূহে ই'তিকাফ অবস্থায় থাক। এসব হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা
সুতরাং তোমরা এসবের ধারের কাছেও যেও না। اِعْتِكَافُ )ই’তিকাফ) শব্দের অর্থ কোনো স্থানে অবস্থান করা। কুরআন সুন্নাহর পরিভাষায় কতগুলো বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে একটা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে মসজিদে অবস্থান করাকে ই’তিকাফ বলে।
فِي الْمَسْجِدِ মসজিদসমূহে (বহুবচন) বলে বুঝানো হয়েছে যে, এ ই’তিকাফ যে কোনো মসজিদে হতে পারে। অবশ্য মসজিদ বলতে যেসব মসজিদে নিয়মিত জামাআত হয়ে থাকে তাকেই বুঝানো হয়ে থাকে।
ই’তিকাফে থাকা অবস্থায় নিজের মানবিক ও প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করার জন্য মসজিদের বাইরে যাওয়া যায়, কিন্তু যৌন স্বাদ আস্বাদন করা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা একান্ত অপরিহার্য। রোযাদার ও ই’তিকাফকারীর জন্য এসব সীমারেখা বলে দেয়ার পর আল্লাহ তায়ালা সাবধান করে দিয়ে বলেছেন, এসব সীমারেখার ধারেও যেও না। অর্থাৎ যেখান থেকে গুনাহের সীমানা শুরু হচ্ছে ঠিক সেই শেষ প্রান্তের সীমানা লাইনে চলাফেরা করা বিপদজনক। সীমানা থেকে দূরে অবস্থান করাই নিরাপদ ব্যবস্থা। কারণ সীমানা বরাবর চলতে গেলে ভুলে সীমানার ওপারে পা চলে যেতে পারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00