📄 মানব ইতিহাসের জঘন্যতম অধ্যায় পুত্র সন্তানকে হত্যা করে মেয়ে সন্তানকে জীবিত রাখা
وَإِذْ نَجَّيْنَاكُمْ مِنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَسُومُونَكُمْ سُوءَ الْعَذَابِ يُذَبِّحُونَ ابْنَاءَكُمْ وَيَسْتَحْيُونَ نِسَاءَكُمْ ، وَفِي ذَلِكُم بَلَاءٌ مِّن رَّبِّكُمْ عَظِيمٌ .
অর্থ: স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন আমরা ফেরাউনী দলের দাসত্ব থেকে তোমাদের মুক্তি দিয়েছিলাম। তারা তোমাদের কঠিন যন্ত্রণায় নিমজ্জিত করে রেখেছিল, তোমাদের পুত্র সন্তানদের যবেহ করতো এবং তোমাদের কন্যা সন্তানদের জীবিত রেখে দিতো। মূলত এ অবস্থায় তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য বড় কঠিন পরীক্ষা ছিল। (সূরা বাকারা: আয়াত-৪৯)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: মূসা-এর সময়কার মিসরের দ্বিতীয় ফিরাউন বাদশাহর আমলের ঘটনা। একদা ফেরাউন স্বপ্নে দেখল যে, বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে একটা অগ্নিপিণ্ড মিসরের ফিরাউন বংশীয় কিবতী লোকদের ঘরে ঘরে প্রবেশ করলো। ঐ স্বপ্নের ব্যাখ্যায় সে জানতে পারলো যে, বনী ইসরাঈল গোত্রের একটা লোকের হাতে তার রাজত্ব খতম হয়ে যাবে। আল্লামা ইবনে কাসির এভাবে বর্ণনা করেছেন। মুফতি শফি (র)-এর মতে কেউ তাকে একথার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। যাই হোক, এ স্বপ্ন বা ভবিষ্যদ্বাণীর প্রেক্ষিতে ফিরাউন তার রাজ্যের নবজাত পুত্র সন্তানদের হত্যা করতো আর কন্যা সন্তানদের জীবিত রাখতো। আল-কুরআনে ফিরাউনের এ আচরণকে বনী ইসরাঈলদের জন্য জঘন্যতম বিপদ ও পরীক্ষা বলে ঘোষণা করা হয়েছে। চারটি দৃষ্টি কোণ থেকে ইসরাঈলীদের জন্যে এটা মহাবিপদ ও পরীক্ষা ছিলঃ-
১. ফিরাউনী বংশের হাতে তাদের বংশের ধ্বংস হওয়া এবং তাদের ভবিষ্যত বংশ বিস্তার খতম হয়ে যাওয়া। এভাবে ইতিহাসে তাদের নাম-নিশানা শেষ হয়ে যাওয়া।
২. তাদের পুত্র সন্তানদের তাদেরই সামনে প্রকাশ্যে হত্যা করার কঠিন মর্মপীড়া।
৩. নর-নারীর প্রজন্মের ভারসাম্য লোপ পেয়ে মানবীয় পরিবেশ ক্ষতবিক্ষত হওয়া।
৪. পুরুষরা পরিবারের কর্তা। জন্মগতভাবে পুরুষদের উপার্জন করার ও কঠোর জীবন পরিচালনার যোগ্য করে সৃষ্টি করা হয়েছে। পুত্র সন্তানগণকে হত্যা করার পরিণামে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশকে ধ্বংস করা হতো। এটাও ইসরাঈলদের জন্য কঠিন অগ্নি পরীক্ষা ছিল।
মূসা-এর যুগে তৎকালীন ফিরাউন তার রাজত্ব ও ক্ষমতা ঠিক রাখার জন্য মানব হত্যার এ জঘন্যতম পন্থা অবলম্বন করেছিল। মানবেতিহাসের এ হচ্ছে এক অমানবিক ও নির্মম অধ্যায়। নারীদের জন্য পুরুষ হচ্ছে জীবন-যাপনের অপরিহার্য স্বাভাবিক উপাদান স্বরূপ। নারী-পুরুষ পরস্পরের জন্য পরিপূরক হলেও উভয়ের গঠন-প্রকৃতি আর আজকের সামাজিক পরিবেশের নিরিখে নারীর জন্য বরং পুরুষ অধিক কাম্য।
অথচ ফিরাউন তার তখত ঠিক রাখার জন্য সমাজের প্রধান সদস্য নরকে হত্যা করে নারীকে ছেড়ে দিত। ফলে নারীর জীবন এক ভয়াবহ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়ে পড়তো। এ ছিল নারীদের জন্য এক অসহনীয় যন্ত্রণা ও স্বাভাবিক জীবন-যাপনের পথে বিরাট প্রতিবন্ধকতা। এ যন্ত্রণা ও যুলুমকে আল্লাহ তায়ালা الْعَذَابِ السُّوْمَ (মর্মান্তিক যাতনা) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা মূসা-এর অনুসারীদেরকে ফিরাউনের সেই কঠোর শাস্তি থেকে উদ্ধারের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। আল্লাহ তা'আলার শেষ পর্যন্ত ফিরাউনকে নীল নদে নিমজ্জিত করে মূসা -এর সাথে বনী ইসরাঈলদের নাজাত দিয়েছিলেন।
📄 পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার এবং সকল মানুষের সাথে সদাচরণের নির্দেশ
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا اللَّهَ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسْكِينِ وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا وَأَقِيمُوا الصَّلوةَ وَاتُوا الزَّكَاةَ ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ إِلَّا قَلِيلًا مِّنكُمْ وَأَنْتُمْ مُعْرِضُونَ.
অর্থ: স্মরণ করো যখন ইসরাঈল সন্তানদের থেকে আমরা এই মর্মে পাকাপোক্ত অংগীকার নিয়েছিলাম যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারোর ইবাদাত করবে না, মা-বাপ, আত্মীয়-পরিজন, ইয়াতিম ও মিসকিনদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে, লোকদেরকে ভালো কথা বলবে, নামায কায়েম করবে ও যাকাত দেবে। কিন্তু সামান্য কয়েকজন ছাড়া তোমরা সবাই অংগীকার ভংগ করেছিলে এবং এখনো ভেঙে চলছো। (সূরা বাকারা: আয়াত-৮৩)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: আল কুরআনের বহু স্থানে মানব জাতিকে আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদ মেনে নেয়ার নির্দেশের পর পরই নিজের মাতা ও পিতার সেবা-যত্ম করার প্রতি তাগিদ দেয়া হয়েছে; বরং বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ সরাসরি তাওহীদের পরেই মাতা ও পিতার প্রতি ইহসান করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন ইরশাদ হচ্ছে, وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِا الْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
অর্থ: তোমার প্রভু নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করো না, আর মাতা-পিতার সাথে ইহসান বা সদাচার করো। (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
সূরা লোকমানে বলেছেন, أَنِ اشْكُرْلِي وَلِوَالِدَيْكَ তুমি আমার প্রতি ও তোমার মাতা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।
এভাবে সৃষ্টিকর্তা রাব্বুল আলামীন নারীকেও অর্থাৎ মাতাকেও পিতার সাথে মর্যাদা দিয়ে নর-নারী সবাইকে নিজ নিজ মাতা ও পিতার খিদমত ও শোকর আদায় করতে নির্দেশ
দিয়েছেন। আর এ নির্দেশ হচ্ছে আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকৃতির সাথে মাতা-পিতার প্রতি কর্তব্য পালন করার।
বিশ্বনবী মুহাম্মদ তাঁর এক বাণীতে পিতার তুলনায় মাতা অর্থাৎ নারী জাতির সেবা শুশ্রূষার প্রতি অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। একদা জনৈক সাহাবী তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। আমি কার প্রতি সাদাচার প্রদর্শন করবো? তিনি বললেন, তোমার মায়ের প্রতি। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর? তিনি বললেন, তোমার মায়ের প্রতি। তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর? তিনি এবারও জবাব দিলেন তোমার মায়ের প্রতি। চতুর্থ বার জিজ্ঞাসিত হলে নবী করীম জবাব দিলেন, তোমার পিতার প্রতি। অন্য হাদীসে কিছু সংযোজন করা হয়েছে যে, অতঃপর তোমার রক্ত সম্পর্কের নিকটাত্মীয়ের প্রতি।
📄 স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা মহাপাপ
فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ.
অর্থ : এরপরও তারা তাদের থেকে এমন জিনিস শিখতো, যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা এনে দিতো। (সূরা বাকারা : আয়াত-১০২)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা : সোলায়মান আলাইহিস সালামের যুগের একটি ঘটনা এখানে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে। তখন লোকদের নিকট অধিকতর চাহিদার বিষয় ছিল তাবিজ-তুমার বা যাদুর প্রভাবে অন্যের স্ত্রীকে তার থেকে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে নিজের দিকে আকৃষ্ট করা। হারূত ও মারূত নামের দু'জন ফেরেশতাকে আল্লাহ তা'আলা পরীক্ষার জন্যে দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা পরীক্ষায় টিকতে পারেনি। সেই বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল এমন তাবীজের যার সাহায্যে এক ব্যক্তি অন্য একজনের স্ত্রীকে তার স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে নিজের প্রতি প্রেমাসক্ত করতে পারে। তাদের মধ্যে নৈতিক পতন দেখা দিয়েছিল এটি ছিল তার নিকৃষ্টতম পর্যায়। যে জাতির সদস্যবৃন্দ পরকীয়া প্রেমে আসক্ত হওয়া ও অন্যের বিয়ে করা বউকে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়াকে নিজেদের সবচেয়ে বড় বিজয় মনে করে এবং এটিই তাদের দৈনন্দিন জীবনের সর্বাধিক আকর্ষণীয় কাজে পরিণত হয়, তার নৈতিক অধপতন যে ষোলকলায় পূর্ণ হয়ে গেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে।
আসলে দাম্পত্য সম্পর্ক হচ্ছে মানব সভ্যতা-সংস্কৃতির মূল। নারী ও পুরুষের সম্পর্কের সুস্থতার ওপর সমগ্র মানব সভ্যতার সুস্থতা এবং অসুস্থতার ওপর সমগ্র মানব সভ্যতার অসুস্থতা নির্ভরশীল। কাজেই যে বৃক্ষটির দৃঢ়ভাবে সংবদ্ধ থাকার ওপর ব্যক্তির ও সমগ্র সমাজের টিকে থাকা নির্ভর করে তার মূলে যে ব্যক্তি কুঠারঘাত করে তার চাইতে নিকৃষ্ট বিপর্যয় সৃষ্টিকারী আর কে হতে পারে? হাদীসে বলা হয়েছে, ইবলিস তার কেন্দ্র থেকে পৃথিবীর প্রত্যেক এলাকায় নিজের এজেন্ট পাঠায়। এজেন্টরা কাজ শেষে ফিরে এসে
নিজেদের কাজের রিপোর্ট শুনাতে থাকে। কেউ বলে আমি অমুক ফিতনা সৃষ্টি করেছি। কেউ বলে, আমি অমুক পাপের আয়োজন করেছি। কিন্তু ইবলিস প্রত্যেককে বলে যেতে থাকে, তুমি কিছুই করোনি। তারপর একজন এসে বলে, আমি এক জোড়া স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এসেছি। একথা শুনে ইবলিস তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। সে বলতে থাকে, তুমি একটা কাজের মতো কাজ করে এসেছো। এ হাদীসটি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করলে বনী ইসরাঈলদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যে ফেরেশতা পাঠানো হয়েছিল তাদের কেন যে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার 'আমল 'লোকদেরকে শিখাবার হুকুম দেয়া হয়েছিল তা সুস্পষ্টরূপে অনুধাবন করা যায়। আসলে তাদের নৈতিক অধঃপতনের যথাযথ পরিমাপের জন্য এটিই ছিল একমাত্র মানদণ্ড।
📄 হত্যাকারী নারী হলেও কিসাস প্রযোজ্য
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنثى بِالْأُنثى ، فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٍ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَادَاءُ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ ، ذَلِكَ تَخْفِيفٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ ، فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ .
অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য হত্যার ব্যাপারে কিসাসের বিধান লিখে দেয়া হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তি হত্যা করে থাকলে তার বদলায় ঐ স্বাধীন ব্যক্তিকেই হত্যা করা হবে, দাস হত্যাকারী হলে ঐ দাসকেই হত্যা করা হবে, আর নারী এই অপরাধ সংঘটিত করলে সেই নারীকে হত্যা করেই এর কিসাস নেয়া হবে। তবে কোনো হত্যাকারীর সাথে তার ভাই যদি কিছু কোমল ব্যবহার করতে প্রস্তুত হয়, তাহলে প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী রক্তপণ দানের ব্যবস্থা হওয়া উচিত এবং সততার সঙ্গে রক্তপণ আদায় করা হত্যাকারীর জন্য অপরিহার্য। এটা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে দণ্ড হ্রাস ও অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করবে তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা বাকারা: আয়াত-১৭৮)
সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা: স্বাধীন ব্যক্তির হত্যাকারী কোনো স্বাধীন ব্যক্তি হলে যেমন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে, তেমনি কোনো ক্রীতদাস বা কোনো নারীকে হত্যার বদলেও হত্যাকারী স্বাধীন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। স্ত্রী হত্যার অপরাধে পুরুষকে এবং পুরুষ হত্যার অপরাধে স্ত্রীলোককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। কোনো প্রভাবশালী ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে যেমন, কোনো একজন প্রভাবশালী পুরুষ লোকের কিসাস স্বরূপ মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে, তেমনি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে একজন অসহায় নারী হত্যার কিসাসেও।
'কিসাস' হচ্ছে রক্তপাতের বদলা বা প্রতিশোধ। অর্থাৎ হত্যাকারীর সাথে এমন ব্যবহার করা যেমন সে নিহত ব্যক্তির সাথে করেছে। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, হত্যাকারী
যেভাবে নিহত ব্যক্তিকে হত্যা করেছে ঠিক সেভাবে তাকেও হত্যা করতে হবে; বরং এর অর্থ হচ্ছে, সে একজনকে হত্যা করেছে, তাকেও হত্যা করা হবে।
জাহেলী যুগের হত্যার বদলা নেয়ার ব্যাপারে একটি পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। কোনো জাতি বা গোত্রের লোকেরা তাদের নিহত ব্যক্তির রক্তকে যে পর্যায়ের মূল্যবান মনে করতো হত্যাকারীর পরিবার, গোত্র বা জাতির কাছ থেকে ঠিক সেই পরিমাণ মূল্যের রক্ত আদায় করতে চাইতো। নিহত ব্যক্তির বদলায় কেবলমাত্র হত্যাকারীর প্রাণ সংহার করেই তাদের কলিজা ঠাণ্ডা হতো না; বরং নিজেদের একজন লোক হত্যা করার প্রতিশোধ নিতে চাইতো তারা প্রতিপক্ষের শত শত লোককে হত্যা করে। তাদের কোনো অভিজাত ও সম্মানী ব্যক্তি যদি অন্য গোত্রের একজন সাধারণ ও নীচু স্তরের লোকের হাতে মারা যেতো, তাহলে এ ক্ষেত্রে তারা নিছক হত্যাকারীকে হত্যা করাই যথেষ্ট মনে করতো না; বরং হত্যাকারীর গোত্রের ঠিক সমপরিমাণ অভিজাত ও মর্যাদাশীল কোনো ব্যক্তির প্রাণ সংহার করতে অথবা তাদের কয়েকজনকে হত্যা করতে চাইত। বিপরীত পক্ষে নিহত ব্যক্তি তাদের দৃষ্টিতে যদি কোনো সামান্য ব্যক্তি হতো আর অন্যদিকে হত্যাকারী হতো বেশি মর্যাদাশীল ও অভিজাত, তাহলে এ ক্ষেত্রে তা নিহত ব্যক্তির প্রাণের বদলায় হত্যাকারীর প্রাণ সংহার করতে দিতে চাইতো না। এটা কেবল, প্রাচীন জাহেলী যুগের রেওয়াজ ছিল না। বর্তমান যুগেও যাদেরকে দুনিয়ার সবচেয়ে সুসভ্য জাতি মনে করা হয় তাদের সরকারী ঘোষণাবলিতেও অনেক সময় নির্লজ্জের মতো দুনিয়াবসীকে শুনিয়ে দেয়া হয়- আমাদের একজন নিহত হলে আমরা হত্যাকারীর জাতির পঞ্চাশজনকে হত্যা করবো। প্রায়ই আমরা শুনতে পাই, এ ব্যক্তিকে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করার জন্য পরাজিত ও অধীনস্থ জাতির আটককৃত বহু ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। এই বিশ শতকের একটি 'সুসভ্য' জাতি নিজেদের এক ব্যক্তির হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছে সমগ্র মিসরীয় জাতির ওপর। অন্যদিকে এই তথাকথিত সুসভ্য জাতিগুলোর বিধিবদ্ধ আদালতসমূহেও দেখা যায়, হত্যাকারী যদি শাসক জাতির এবং নিহত ব্যক্তি পরাজিত ও অধীনস্থ জাতির অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে তাদের বিচারকরা প্রাণদণ্ডের সিদ্ধান্ত দিতে চায় না। এসব অন্যায় ও অবিচারের পথ বন্ধ করার জন্য আল্লাহ এই আয়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নিহত ব্যক্তি ও হত্যাকারীর কোনো প্রকার মর্যাদার বাছ-বিচার না করে নিহত ব্যক্তির প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য শুধুমাত্র হত্যাকারীরই প্রাণ সংহার করা হবে।