📄 মূসা আলাইহিস সালামের সংগি সাথি মযলুমদের দু'আ
আল্লাহ্ নবী মূসা আলাইহিস সালাম তৎকালীন বিশ্বের শক্তিধর শাসক ফেরাউনের নিকট আল্লাহ্ দীনের দাওয়াত দিয়ে তাকে আল্লাহ্র গোলামি করার আহবান জানালেন। তিনি ফেরাউনকে আরো বললেন যে, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে রসূল মনোনীত হয়েছেন এবং প্রমাণ স্বরূপ আল্লাহ্ দেয়া নিদর্শন পেশ করলেন। জনগণের উপর মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের প্রভাব লক্ষ্য করে ফেরাউন তার গদির ব্যাপারে আশংকাবোধ করলো। জনগণকে আশ্বস্ত করার জন্যে সে মূসা আলাইহিস সালামকে যাদুকর বলে আখ্যায়িত করে এবং হযরত মূসার মুকাবিলা করার জন্যে কোনো একটি জাতীয় উৎসবের দিন মিসরের সমস্ত যাদুকরদের একত্রিত করে। যাদুকররা তাদের সাধ্যানুযায়ী যাদু প্রদর্শন করলো। কিন্তু মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ্ প্রদত্ত নিদর্শন প্রদর্শন করতেই যাদুকরদের যাবতীয় যাদু সামগ্রী ও যাদু বিদ্যা সম্পূর্ণ ব্যর্থ ও ধূলিস্মাৎ হয়ে গেলো। যাদুকররা প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে পেরে তাদের মাথা সিজদায় অবনত করে দিয়ে বললো: "আমরা রাব্বুল আলামীনের প্রতি ঈমান আনলাম। যাকে মূসা ও হারূন উভয়েই মেনে চলে। "১১
যাদুকররা ঈমান আনার ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথেই ফেরাউনের দেহে ও মস্তিষ্কে আগুন জ্বলে উঠলো। নরপিশাচদের বেষ্টনীর মাঝখানে সবেমাত্র ঈমান আনয়নকারী নওমুসলিমদের প্রতি সে জিঘাংসায় মারমুখো হয়ে উঠলো। সে বলতে থাকে : "আমার অনুমতি ছাড়াই তোমরা ঈমান আনলে? বুঝা গেলো, মূসা তোমাদের গুরু। সে-ই তোমাদের যাদুবিদ্যা শিখিয়েছে। এখন আমি তোমাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেবো এবং খেজুর গাছে তোমাদের শূলে চড়াবো। তারপরই বুঝতে পারবে আমার শাস্তি কতো কঠিন!"১২
সাক্ষাত মৃত্যুর সামনে এ মযলুম নওমুসলিমরা যে ঈমানি দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছিলেন, তা আল্লাহ্ প্রেমিক প্রতিটি মযলুম মুসলিমের হৃদয়েরই কথা। শাহাদাতের পূর্ব মুহুর্তে অত্যাচারী শাসকের সম্মুখে দাঁড়িয়ে খোদার সান্নিধ্য লাভে প্রবল আকাঙ্খী মুজাহিদরা যে কথাগুলো বলেছিলেন, তা কতোই না প্রাণাকর্ষী :
لَا ضَيْرَ إِنَّا إِلَى رَبِّنَا مُنْقَلِبُونَ
অর্থ: মরণের পরোয়া আমাদের নেই। আমাদের তো মালিকের কাছে ফিরে যেতেই হবে। (সূরা ২৬ আশোয়ারা: ৫০)
فَاقْضِ مَا أَنْتَ قَاضٍ إِنَّمَا تَقْضِي هَذِهِ الْحَيَوةُ الدُّنْيَا .
অর্থ: তুমি যা কিছু করতে চাও করো। তুমি তো আমাদের এ দুনিয়ার জীবনের ফয়সালা ছাড়া কিছুই করতে পারবেনা। (সূরা ২০ তোয়াহা: ৭২)
إِنَّا ءَامَنَّا بِرَبِّنَا لِيَغْفِرَ لَنَا خَطَيَنَا .
অর্থ: আমরা তো আমাদের প্রভুর প্রতি এ জন্যই ঈমান এনেছি, যেনো তিনি আমাদের অপরাধ সমূহ ক্ষমা করে দেন। (সূরা ২০ তোয়াহা: ৭৩)
ربنا افرغ علينا صبرا وتوفنا مسلمين .
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের ধৈর্য ধারণের তৌফিক দাও এবং আমাদের ওফাত দান করো তোমার অনুগত অবস্থায়। (সূরা ৭ আল 'আরাফ: ১২৬)
ফেরাউন হযরত মূসা আলাইহিস সালাম এবং তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে জিঘাংসায় মেতে উঠে। মূসা আলাইহিস সালামকে হত্যা করার হুমকি প্রদান করে। সে মুহূর্তে কেউ হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে অনুসরণ করা মানেই নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া। সহায়-সম্বলহীন গুটি কয়েক মুমিনের বিরুদ্ধে রাজকীয় তাগুতি শক্তির চরম দমননীতি সৃষ্টি করছিলো এক ত্রাসের রাজত্ব। এমতাবস্থায় মূসা আলাইহিস সালামের আনীত দীন কবুল করা ছিলো জীবন বাজি রাখার ব্যাপার। কুরআন বলে "অতপর মূসাকে কওমের কয়েকজন যুবক ছাড়া কেউই মেনে নিলোনা ফেরাউন আর কওমের নেতৃস্থানীয় লোকদের ভয়ে। তারা ভয় করছিলো যে, ফেরাউন তাদের আযাবে নিমজ্জিত করবে। আর ফেরাউন তো ছিলো দুনিয়ার শক্তিমান ও প্রতিষ্ঠিত। সে ছিলো সীমা লঙ্ঘনকারীদের একজন। "১৩
এ সাংঘাতিক বিপদসংকুল অবস্থায় চরম অত্যাচার নির্যাতনের মুখে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর অনুসারী কতিপয় যুবককে কেবলমাত্র আল্লাহ্ তায়ালার উপর ভরসা করার নসীহত করেন। ঈমানদীপ্ত যুবকরা পরওয়ারদিগারের দরবারে প্রার্থনা করেন:
عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِلْقَوْمِ الظَّلِمِينَ .
অর্থ: আমরা আল্লাহ্র উপর তাওয়াক্কুল করলাম। পরওয়ারদিগার! তুমি আমাদেরকে যালেম লোকদের জন্য ফেৎনা বানিয়োনা। (সূরা ১০ ইউনুস: ৮৫)
তারা আরো দু'আ করলো:
وَنَجِّنَا بِرَحْمَتِكَ مِنَ الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ .
অর্থ: প্রভু! তোমার নিজের রহমত দ্বারা আমাদেরকে কাফের লোকদের হাত থেকে মুক্তি দাও। (সূরা ১০ ইউনুস: ৮৬)
টিকাঃ
১১. সূরা ২৬ আশশোয়ারা: ৪৬-৪৮
১২. সূরা ২৬ আশশোয়ারা: ৪৯।
১৩. সূরা ১০ ইউনুস: ৮৩।
📄 আসহাবে কাহাফের দু'আ
আসহাবে কাহাফের দু'আতেও রয়েছে মযলুম মুমিনদের জন্যে পথ নির্দেশ। অত্যাচারী শাসকের চরম নির্যাতনের মুখে কতিপয় সহায়-সম্বলহীন যুবক তাদের ঈমান বাঁচানোর জন্যে শেষ পর্যন্ত গুহায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কালামে পাকে এ কাহিনীর উল্লেখ করে বলেন: গুহায় আশ্রয় নেবার কালে তারা এভাবে দু'আ করেছিলেন:
رَبَّنَا آتِنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا -
পরওয়ারদিগার! আমাদেরকে তোমার বিশেষ রহমত দ্বারা ধন্য করো। আর আমাদের গোটা ব্যাপারটা তুমি সুষ্ঠ ও সঠিকভাবে গড়ে দাও। (সূরা ১৮ আল কাহাফ : ১০)
📄 ফেরাউনের স্ত্রীর দু'আ
মিসরের তৎকালীন প্রতাপশালী কাফির শাসক ফেরাউন। তার স্ত্রী (আছিয়া) বিশ্ব জাহানের মালিক আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছেন। তিনি হয়েছেন আল্লাহ্র প্রতি আত্মসমর্পনকারী মুসলিম। আল্লাহ্র প্রতি ঈমান এনে মুসলিম হবার কারণে ফেরাউন তাঁর উপর চরম অত্যাচার নির্যাতনের স্টীম রোলার চালায়। কিন্তু চরম যুলুম-অত্যাচারের মুখেও তিনি ঈমানের পথ ত্যাগ করেননি।
তৎকালীন বিশ্বের সবচাইতে উন্নত এবং সবচাইতে শক্তিশালী রাষ্ট্রের একচ্ছত্র অধিপতি তার স্বামী ফেরাউন। তৎকালীন বিশ্বের সবচাইতে সুন্দর মনোরম রাজপ্রাসাদের তিনি রাণী। গোটা দেশের তিনি ফার্স্ট লেডি। আরাম-আয়েশ, সুখ-সম্ভোগ, শান-সওকত, সাজ-সরঞ্জামের সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি।
কিন্তু দুনিয়ার সবচাইতে বিচক্ষণ ব্যক্তির মতোই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এ পথ তার নয়। দুনিয়ার সুখ-শান্তি ও আরাম-আয়েশকে পদাঘাত করে তিনি দূরে নিক্ষেপ করলেন। দুনিয়ার রাজপ্রাসাদ তার কাছে অতি তুচ্ছ জিনিস। দুনিয়ার প্রাসাদ নয়, তিনি জান্নাতের প্রাসাদ চান। এজন্যে তিনি চরম অত্যাচার নির্যাতন ভোগ করেন। চরম যুলুমের চাকায় পিষ্ট হওয়া অবস্থায় আল্লাহ্র নিকট দু'আ করেন:
رَبِّ ابْنِ لِي عِنْدَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ -
অর্থ: পরওয়ারদিগার! তোমার নিকট জান্নাতে আমাকে একটি ঘর বানিয়ে দাও। (সূরা ৬৬ আত্তাহরীম: ১১)
ফেরাউনের হাত থেকে নাজাত পাওয়ার জন্যেও তিনি আল্লাহ্র নিকট দু'আ করেন:
وَنَجِّنِي مِنْ فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّلِمِينَ .
অর্থ: (পরওয়ারদিগার!) আর আমাকে ফেরাউন ও তাঁর কার্যকলাপ থেকে রক্ষা করো এবং এই যালেম লোকদের হাত থেকে আমাকে মুক্তি দাও। (সূরা ৬৬ আত্তাহরীম: ১১)