📄 চিন্তাশীল ও গবেষকদের দু'আ
আসমান ও যমীনের স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টি কৌশলের মধ্যে চিন্তাশীল ও গবেষকদের জন্যে ঈমানের বীজ পুঁতে রেখেছেন। তিনি বলেন: আসমান ও যমীনের সৃষ্টি কৌশলে এবং রাত ও দিনের আবর্তনের মধ্যে সে সব লোকদের জন্যে অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে, যারা উঠতে, বসতে, শুতে অর্থাৎ সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করবে আর আসমান ও যমীনের সৃষ্টি এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চিন্তা ও গবেষণা করবে, তারা স্বত:স্ফূর্তভাবেই বলে উঠবে:
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً سُبْحَنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ رَبَّنَا إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ ط وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ أَنْصَارِ رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلإِيْمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَأَمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْلَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفَرْعَنَّا سَيِّاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ . رَبَّنَا وَاتِنَا مَا وَعَدَتْنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلَا تُهْزِنَا يَوْمَ الْقِيمَةِ طَ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! এ সব কিছু তুমি অর্থহীন ও উদ্দেশ্যবিহীন সৃষ্টি করোনি। উদ্দেশ্যবিহীন কাজের বাতুলতা থেকে তুমি অতিশয় পবিত্র। তাই হে প্রভু! আমাদেরকে দোযখের আগুন থেকে বাঁচাও। তুমি যাকে দোযখে নিক্ষেপ করবে, তাকে বাস্তবিকই বড় অপমান ও লজ্জায় নিক্ষেপ করবে, তাছাড়া এসব যালেমদের সাহায্যকারীও কেউ হবেনা। পরওয়ারদিগার! আমরা একজন আহবানকারীর আহবান শুনতে পেয়েছি। তিনি ডেকে বলছিলেন: 'তোমরা তোমাদের প্রকৃত মওলাকে মেনে নাও।' আমরা তাঁর দাওয়াত কবুল করেছি। অতএব হে আমাদের মনিব! যে সব অপরাধ আমরা করেছি, তা তুমি ক্ষমা করে দাও। আমাদের মধ্যে যা কিছু অন্যায় ও দোষত্রুটি রয়েছে, তা তুমি দূর করে দাও। আর নেককার লোকদের সাথে আমাদের শেষ পরিণতি সম্পন্ন করো। পরওয়ারদিগার! তুমি তোমার রসূলের মাধ্যমে আমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছো তা পূর্ণ করো আর কিয়ামতের দিন আমাদেরকে লজ্জার সম্মুখীন করোনা। নি:সন্দেহে তুমি কখনো ওয়াদা খেলাপ করোনা। (সুরা ৩ আলে ইমরান ১৯১-১৯৪)
📄 সালেহীনদের দু'আ
আল্লাহ্ তাবারুকু ওয়া তায়ালা কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে তাঁর মুমিন ও সালেহ বান্দাদের দু'আর উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যাদের দিল আল্লাহ্র রজ্জুতে বাঁধা, পরকালের নাজাত আর দয়াময় রহমানের সন্তোষ লাভ যাদের জীবনোদ্দেশ্য, কী মধুর ডাকে তারা তাদের মনিবকে ডাকে। কি নিবিড় সান্নিধ্য তারা মওলার লাভ করে, তাদের দু'আয় সে প্রাণে স্পন্দন ফুটে ওঠে।
হেদায়েত লাভ করার পর, এ পথ থেকে যেন বিচ্যুত না হয়, তাই তারা আল্লাহ্র রহম কামনা করে :
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةٌ ، إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ .
অর্থ : পরওয়ারদিগার! তুমিই যখন আমাদের হেদায়েত দান করেছো, তখন আমাদের মনে তুমি কোনো প্রকার বক্রতা ও জটিলতা সৃষ্টি করোনা। তোমার মেহেরবানির ভাণ্ডার থেকে আমাদের অনুগ্রহ দান করো। কারণ, প্রকৃত দাতা তুমিই। (সূরা ৩ আলে ইমরান : ৮)
যে সব খোদাভীরু লোক আল্লাহ্র সন্তোষ ও জান্নাত লাভ করবেন তারা এভাবে আল্লাহ্র দরবারে ক্ষমা ও মুক্তি কামনা করেন :
رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْلَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ .
অর্থ : পরওয়ারদিগার! আমরা ঈমান এনেছি। তুমি আমাদের গুনাহখাতা মাফ করে দাও। আর জাহান্নামের আগুন থেকে আমাদের বাঁচাও। (সূরা ৩ আলে ইমরান : ১৬)
আল্লাহ্ পাক বলেন, কিছু লোক আছে, তারা দুনিয়াতেই সবকিছু পেতে চায়। এদের জন্যে আখিরাতে কোনো অংশ নেই। এমন কিছু লোকও আছে, যারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের কল্যাণই কামনা করে। তারা এভাবে দু'আ করে :
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! দুনিয়ায় আমাদের কল্যাণ দান করো এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করো আর আগুনের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও। (সূরা ২ আল বাকারা: ২০১)
- এঁদের সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন: এরা নিজেদের কাজ অনুযায়ী উভয় স্থানেই কল্যাণ লাভ করবে। আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, তারা এভাবে দু'আ করে:
رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرًا وَمُقَامًا .
অর্থ: ওগো আমাদের রব! জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও। এ আযাব তো সাংঘাতিক প্রাণান্তকরভাবে লেগে থাকে। আশ্রয়স্থল ও বাসস্থান হিসেবে এটা বড়ই জঘন্য। (সূরা ২৫ আল ফুরকান: ৬৫-৬৬)
এসব লোকের আরো বৈশিষ্ট এই যে, তারা সন্তান ও বিবিদের জন্যেও দু'আ করে:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাদের স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানদের দ্বারা আমাদের চক্ষুসমূহের শীতলতা দাও। আর আমাদের মুত্তাকি লোকদের অগ্রগামী বানাও। (সূরা ২৫ আল ফুরকান: ৭৪)
আল্লাহ্ তাঁর সালেহ বান্দাদের পিতামাতার জন্যেও নিম্নোক্ত ভাষায় দু'আ করতে নির্দেশ দিয়েছেন:
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا -
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমার পিতামাতার প্রতি রহম করো। যেমন করে মায়া-মমতা আর স্নেহ বিজড়িত হৃদয়ে তারা ছোটবেলায় আমাকে লালন-পালন করেছেন। (সূরা ১৭ বনি ইসরাঈল: ২৪)
সালেহ লোকদের আর একটি দু'আ এরূপ:
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ .
অর্থ: প্রভু আমার! আমাকে তৌফিক দাও, আমি যেনো তোমার সেসব নেয়ামতের শোকরিয়া আদায় করি, যা তুমি আমাকে এবং আমার পিতা-মাতাকে দান করেছো। আর যেনো এমন নেক আমল করি, যাতে তুমি সন্তুষ্ট হবে। আমার সন্তানদেরও সৎ বানিয়ে আমাকে সুখ-শান্তি দাও। তোমার সমীপে আমি তওবা করছি। আর আমি তোমার অনুগতদের একজন। (সূরা ৪৬ আল আহকাফ : ১৫)
পরম দয়াময় ক্ষমাশীল রাব্বুল আলামীন মুমিনদের এভাবেও দু'আ করতে শিখিয়েছেন:
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا : رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا : رَبَّnَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَالَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ ، وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا : أَنْتَ مَوْلَانَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! ভুলবশত, আমাদের যা কিছু ত্রুটি হয়, তার জন্যে আমাদের পাকড়াও করোনা। মওলা! আমাদের উপর সেরূপ বোঝা চাপিয়ে দিয়োনা, যেরূপ দিয়েছিলে পূর্ববর্তী লোকদের উপর। প্রভু ওগো! যে বোঝা বহন করার শক্তি আমাদের নেই, তা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়োনা। আমাদের প্রতি সদয় হও। আমাদের মাফ করে দাও। আর আমাদের প্রতি রহম করো। তুমিই তো আমাদের মওলা! কাফেরদের বিরুদ্ধে তুমি আমাদের সাহায্য করো। (সূরা ২ আল বাকারা: ২৮৬)
📄 যানবাহনে উঠার দু'আ
যান বাহন চালানোর সময় এবং যান বাহনে আরোহণ করার সময় আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাহকে তাঁর নিকট দু'আ করার কথা বলেছেন। মানুষকে চিন্তা করা উচিত, যে মহান আল্লাহ্ তাকে উত্তাল তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে নৌকা, জাহাজ চালানোর সম্ভাবনা সৃষ্টি করে দিয়েছেন; কিছু জানোয়ারকে অধীন করে দিয়েছেন সেগুলোর পিঠে সওয়ার হবার জন্যে; আকাশ পথে ও স্থল পথে দ্রুতগামী যানবাহনকে তার নিয়ন্ত্রণের অধীন করে দিয়েছেন, সেই মহান আল্লাহ্ তায়ালা তার প্রতি কতো বড় করুণা করেছেন। এসব মহা মূল্যবান নিয়ামত ভোগ ব্যবহার করার সময় একজন জিন্দাদিল মানুষের অন্তর তো নিয়ামতের অনুভূতি এবং নিয়ামতের শোকর আদায়ের ভাব ধারায় ভরপুর হয়ে উঠা উচিত। এ জন্যেই আল্লাহ্ তায়ালা বলেন:
"তিনি সমস্ত জোড়া পয়দা করেছেন আর তিনিই তোমাদের জন্যে নৌযান ও জন্তু-জানোয়ারকে যান বাহন বানিয়েছেন যেনো তোমরা তার পিঠে আরোহণ করতে পারো। আর যখন তোমরা তার পিঠে আরোহণ করবে, তখন তোমাদের রবের অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো এবং বলো:
سُبْحَنَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ * وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ
অর্থ: মহান পবিত্র তিনি, যিনি এ জিনিসগুলোকে আমাদের জন্যে অধীন ও নিয়ন্ত্রিত করে দিয়েছেন। নতুবা আমরা তো এগুলোকে বশ করতে সক্ষম ছিলামনা। আর একদিন তো আমাদেরকে আমাদের রবের নিকট ফিরে যেতেই হবে।” (সূরা ৪৩ আয যুখরুফ: ১৩-১৪)
📄 ভুলে যাওয়া কথা স্মরণ হবার দু'আ
আল্লাহ্ তায়ালা কুরআন মজীদে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর অনুসারী ঈমানদারগণকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
যখন তুমি ভুলে যাও তখন তোমার রবকে স্মরণ করো এবং বলো:
عَسَى أَن يَهْدِيَنِ رَبِّي لِأَقْرَبَ مِنْ هَذَا رَشَدًا -
অর্থ: আশা রাখি, আমার রব এ ব্যাপারে সঠিক কথা ও কর্মনীতির দিকে আমাকে পরিচালিত করবেন। (সূরা ১৮ আল কাহাফ: ২৪)
• ইন্শাল্লাহ বলবে
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর নবীকে নির্দেশ দিচ্ছেন:
وَلَا تَقُوْلَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ .
অর্থ: মনে রেখো, কোনো জিনিস সম্পর্কে কখনো এমন কথা বলোনা যে: 'আমি কাল এ কাজ করবো।' (তুমি আসলে কিছুই করতে পারোনা) যদি আল্লাহ্ তা না চান। (সূরা ১৮ আল কাহাফ: ২৩-২৪)
এখানে আল্লাহ্ তায়ালা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং ঈমানদার লোকদেরকে এই হেদায়াত দান করেছেন যে, "কালই আমি অমুক কাজ করবো” এরূপ দাবি করে তোমরা কখনো কথা বলোনা। কেননা কাল তোমরা সে কাজ করতে পারবে কিনা তা তোমাদের কিছুই জানা নেই। তোমরা তো গায়েব জানোনা। আর নিজেদের কাজ-কর্মে তোমরা এতোটা স্বাধীন ও সেচ্ছানুসারীও নও যে, যাই করতে চাইবে, তাই করতে সক্ষম হবে। এ কারণে অসতর্কতাবশত এ ধরনের কথা কখনো মুখ থেকে বেরিয়ে পড়লে সংগে সংগেই তোমাদের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। অর্থাৎ এ ভুলের জন্যে আল্লাহকে স্মরণ করবে। আর যখনই ভবিষ্যতের করণীয় কোনো কিছু সম্পর্কে কথা বলবে, তখন অবশ্যই সেই সাথে إِن شَاءَ اللَّه 'ইনশাল্লাহ' (যদি আল্লাহ্ চান) বলবে।