📄 রসূলুল্লাহ সা.-কে শিখানো দু'আ সমূহ
কুরআন মজীদে আল্লাহ্ তায়ালা বিশেষভাবে রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কতিপয় দু'আ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতির মুকাবিলায় আল্লাহ্ তায়ালা তাকে এসব দু'আ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
কুরআনের ইল্ম যেনো সুন্দর ও যথার্থভাবে অন্তরে গেঁথে যায়, সেজন্য আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর রসূলকে শিখালেন, হে নবী! এরূপ দু'আ করো:
رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে আরো অধিক ইলম দান করুন। (সূরা ২০ তোয়াহা : ১১৪)
বিরুদ্ধবাদীদের চরম হঠকারিতা, সত্য অমান্য ও শয়তানি প্ররোচনার মুকাবিলায় নবী যেনো ধৈর্যহারা না হয়ে পড়েন, সেজন্য শয়তানের প্ররোচনা থেকে আল্লাহ্র কাছে পানাহ চাওয়ার দু'আ আল্লাহ্ শিখিয়ে দিলেন এভাবে হে নবী! নিবেদন করো:
رَبِّ أَعوذُ بِكَ مِنْ هَمَرْتِ الشَّيْطِينِ . وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحْضُرُونَ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! শয়তানের প্ররোচনা থেকে আমি আপনার আশ্রয় চাই। প্রভু! আমার নিকট শয়তানের উপস্থিতি থেকেও আপনার নিকট পানাহ চাই। (সূরা ২৩ আল মু'মিনুন: ৯৭-৯৮)
নবুওয়াতের মক্কী অধ্যায়ে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকলে মুশরিকরা তাঁর তীব্র বিরোধিতা করতে থাকে, যেনো তিনি ভিমরুলের চাকে ঢিল ছুঁড়েছেন। ঘরে ঘরে তাঁকে গালমন্দ দেয়া হয়। রাত্রিবেলা তাঁকে গোপনে হত্যা করার শলা পরামর্শ হতে থাকে। তাঁকে যাদুটোনা করার চেষ্টা করা হয়। মানুষ ও জ্বীন শয়তান তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র উপদ্রব শুরু করে। মোটকথা, চতুর্দিকে তাঁর বিরোধিতার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে থাকে। এ সাংঘাতিক সংঙ্কটাপন্ন অবস্থায় আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর হাবীবকে নিম্নোক্তভাবে তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দান করেন:
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ * مِن شَرِّ مَا خَلَقَ وَمِنْ شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ . وَ مِنْ شَرِّ النَّفْتِ فِي الْعُقَدِ * وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ .
অর্থ: হে নবী! আশ্রয় প্রার্থনা করো: আমি আশ্রয় চাই সকাল বেলার স্রষ্টা আল্লাহ্র নিকট সেসব জিনিসের অনিষ্ট থেকে যা তিনি সৃষ্টি করেছেন আর রাতের অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে, যখন তা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। আমি আরো আশ্রয় চাই গিরায় ফুঁদানকারী ও কারিণীর অনিষ্ট থেকে এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে। (সূরা ১১৩ আল ফালাক: ১-৫)
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ * مَلِكِ النَّاسِ إِلَهِ النَّاسِ مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ وَ الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ .
অর্থ: হে নবী! বলো, আমি আশ্রয় চাই মানুষের রব, মানুষের বাদশাহ ও মানুষের প্রকৃত ইলাহর নিকট। বার বার ফিরে আসা অসঅসা উদ্রেককারীর অনিষ্ট থেকে, যে মানুষের দিলে অসঅসার উদ্রেক করে। সে জ্বীনদের থেকে হোক কিংবা মানুষের মধ্য থেকে। (সূরা ১১৪ আন নাস: ১-৬)
হিজরতের পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যাদুটোনা করা হলে আল্লাহ্র নির্দেশে এ সূরা দ্বয়ের মাধ্যমেই যাদুর ক্রিয়া ব্যর্থ করে দেয়া হয়। বস্তুত যাবতীয় বিরোধিতা, ষড়যন্ত্র, প্রতিহিংসা এবং মানুষ ও জ্বীন শয়তানদের অসঅসার মুকাবিলায় আল্লাহ্র কাছে আশ্রয় চাওয়ার অতি উত্তম নির্দেশিকা এ সূরা দুটি।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তাঁর নবীকে সব সময় এরূপ দু'আ করতেও নির্দেশ দিয়েছিলেন। হে নবী দু'আ করো:
رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَأَنتَ خَيْرُ الرَّحِمِينَ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে মাফ করে দিন। আমার প্রতি সদয় হোন আর আপনিই তো সর্বাপেক্ষা রহম দিল। (সূরা ২৩ আল মুমিনুন: ১১৮)
হিজরতের কিছুকাল পূর্বের ঘটনা। মুমিনরা কাফেরদের অত্যাচারে জর্জরিত। কাফেররা চরম অত্যাচারের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করছে। হিজরত করা অবধারিত। হিজরতের পূর্বে আন্দোলনের নেতাকে আল্লাহ্র নিকট কিভাবে এবং কোন জিনিসের দু'আ করতে হবে, দয়াময় রহমান তাঁর নবীকে সে শিক্ষা দিয়েছেন। হে নবী! এভাবে দু'আ করো:
رَبِّ أَدْخِلْنِي مُدْخَلَ صِدْقٍ وَأَخْرِجْنِي مُخْرَجَ صِدْقٍ وَاجْعَلْ لِي مِن لَّدُنْكَ سُلْطَنًا نَصِيرًا
অর্থ: পরওয়ারদিগার! তুমি আমাকে যেখানেই নেবে, সত্যতা সহকারে নিয়ে যেয়ো আর যেখান থেকে আমাকে বের করবে, বের করে নিয়ো সত্যতা সহকারে। প্রভু! আর তোমার নিকট থেকে একটি রাষ্ট্র শক্তিকে তুমি আমার সাহায্যকারী বানিয়ে দাও। (সূরা ১৭ বনি ইসারাঈল: ৮০)
হিজরতের বছর তিনেক পরের কথা। মুসলমানরা নিজেদের সর্বস্ব ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করে আসেন। এ সময় একদিকে কাফের ও নাফরমান লোকেরা আল্লাহ্ দীনের আলোকে নিভিয়ে দেবার জন্যে যুদ্ধে লিপ্ত। অথচ দুনিয়ায় তারা ধন-সম্পদের গৌরবে স্ফীত এবং দিন দিন আরো বড়ো হচ্ছে। অন্যদিকে ঈমানদার লোকেরা খোদানুগত্যের পথে চরম ত্যাগ ও কুরবানির নজীর স্থাপন করছে। অথচ তাদেরকে দারিদ্র্য, অনশন, অর্ধানশন ও অসংখ্য প্রকার বিপদ-মুসীবত ও দুঃখ-ক্লেশ নিয়তই জর্জরিত করছে। তখন নিতান্ত স্বাভাবিকভাবেই তাদের মনে এক আশ্চর্য ধরনের দুঃখভরা জিজ্ঞাসা ঘুরপাক খেতে থাকে। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর দীন প্রতিষ্ঠাকামী মুজাহিদদের নেতাকে এমন কতোগুলো ঘোষণা শিক্ষা দিলেন, যার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যে ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও আলোকচ্ছটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আল্লাহ্ তাঁর নবীকে নির্দেশ দিলেন, তুমি বলো:
اللهم مَلِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ وَ وَتُعِزُّ مَنْ تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَنْ تَشَاءُ ، بِيَدِكَ الْخَيْرِ ، إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْ ءٍ قَدِيرٌ تُولِجُ الَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَتُولِجُ النَّهَارَ فِي الَّيْلِ ، وَتُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَتُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ ، وَتَرْزُقُ مَنْ تَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ
অর্থ: ওগো আল্লাহ্! সকল রাজ্য ও সাম্রাজ্যের মালিক! তুমি যাকে চাও রাজ্য দান করো আর যার থেকে চাও রাজ্য কেড়ে নাও। যাকে চাও সম্মান দান করো, যাকে ইচ্ছা অপমানিত ও লাঞ্ছিত করো। সকল মঙ্গল ও কল্যাণ তোমারই মুষ্টিবদ্ধে। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশক্তিমান। রাতকে তুমি দিনের মধ্যে শামিল করে দাও আর দিনকে শামিল করো রাতের মধ্যে। জীবন্ত জিনিস থেকে তুমি জীবনহীন জিনিস বের করো, আর জীবনহীন জিনিস থেকে বের করো জীবন্ত জিনিস। তুমি যাকে চাও বেহিসাব রিযিক দান করো। (সূরা ৩ আলে ইমরান: ২৬-২৭)
বিরুদ্ধবাদীদের কট্টর সমালোচনা ও বিরোধিতার মুকাবিলায় রসূলে করীমের দু'আ:
رَبِّ احْكُمُ بِالْحَقِّ وَرَبُّنَا الرَّحْمَنَ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! ইনসাফ ও সত্যতা সহকারে ফায়সালা করে দাও। (হে লোকেরা!) তোমরা যেসব কথা বানাও, তার মুকাবিলায় আমাদের দয়াময় প্রভুই আমাদের সাহায্যের একান্ত নির্ভর। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া: ১১২)
এক লা-শরীক আল্লাহ্র জন্যে নিজের সমস্ত ইবাদত-উপাসনা এমনকি জীবন ও মৃত্যু পর্যন্ত উৎসর্গ করার ফায়সালা করাই ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি কর্মীর আসল দায়িত্ব। আল্লাহ্ এ উৎসর্গের ঘোষণা পদ্ধতি তাঁর নবীকে এভাবে শিখিয়ে দেন। হে নবী! বলো:
إِن صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ وَ لَأَشْرِيكَ لَهُ : وَبِذلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ .
অর্থ: আমার নামায, আর সমস্ত ত্যাগ ও কুরবানি, আমার জীবন, আমার মৃত্যু সবই কেবলমাত্র আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের জন্যে। তাঁর কোনো শরীক নেই। এরি নির্দেশ আমাকে দেয়া হয়েছে এবং এ ব্যাপারে সর্বপ্রথম আনুগত্যের শির অবনতকারী হচ্ছি আমি নিজে। (সূরা ৬ আল আনয়াম : ১৬২-১৬৩)
📄 চিন্তাশীল ও গবেষকদের দু'আ
আসমান ও যমীনের স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টি কৌশলের মধ্যে চিন্তাশীল ও গবেষকদের জন্যে ঈমানের বীজ পুঁতে রেখেছেন। তিনি বলেন: আসমান ও যমীনের সৃষ্টি কৌশলে এবং রাত ও দিনের আবর্তনের মধ্যে সে সব লোকদের জন্যে অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে, যারা উঠতে, বসতে, শুতে অর্থাৎ সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করবে আর আসমান ও যমীনের সৃষ্টি এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চিন্তা ও গবেষণা করবে, তারা স্বত:স্ফূর্তভাবেই বলে উঠবে:
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً سُبْحَنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ رَبَّنَا إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ ط وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ أَنْصَارِ رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلإِيْمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَأَمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْلَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفَرْعَنَّا سَيِّاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ . رَبَّنَا وَاتِنَا مَا وَعَدَتْنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلَا تُهْزِنَا يَوْمَ الْقِيمَةِ طَ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! এ সব কিছু তুমি অর্থহীন ও উদ্দেশ্যবিহীন সৃষ্টি করোনি। উদ্দেশ্যবিহীন কাজের বাতুলতা থেকে তুমি অতিশয় পবিত্র। তাই হে প্রভু! আমাদেরকে দোযখের আগুন থেকে বাঁচাও। তুমি যাকে দোযখে নিক্ষেপ করবে, তাকে বাস্তবিকই বড় অপমান ও লজ্জায় নিক্ষেপ করবে, তাছাড়া এসব যালেমদের সাহায্যকারীও কেউ হবেনা। পরওয়ারদিগার! আমরা একজন আহবানকারীর আহবান শুনতে পেয়েছি। তিনি ডেকে বলছিলেন: 'তোমরা তোমাদের প্রকৃত মওলাকে মেনে নাও।' আমরা তাঁর দাওয়াত কবুল করেছি। অতএব হে আমাদের মনিব! যে সব অপরাধ আমরা করেছি, তা তুমি ক্ষমা করে দাও। আমাদের মধ্যে যা কিছু অন্যায় ও দোষত্রুটি রয়েছে, তা তুমি দূর করে দাও। আর নেককার লোকদের সাথে আমাদের শেষ পরিণতি সম্পন্ন করো। পরওয়ারদিগার! তুমি তোমার রসূলের মাধ্যমে আমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছো তা পূর্ণ করো আর কিয়ামতের দিন আমাদেরকে লজ্জার সম্মুখীন করোনা। নি:সন্দেহে তুমি কখনো ওয়াদা খেলাপ করোনা। (সুরা ৩ আলে ইমরান ১৯১-১৯৪)
📄 সালেহীনদের দু'আ
আল্লাহ্ তাবারুকু ওয়া তায়ালা কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে তাঁর মুমিন ও সালেহ বান্দাদের দু'আর উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যাদের দিল আল্লাহ্র রজ্জুতে বাঁধা, পরকালের নাজাত আর দয়াময় রহমানের সন্তোষ লাভ যাদের জীবনোদ্দেশ্য, কী মধুর ডাকে তারা তাদের মনিবকে ডাকে। কি নিবিড় সান্নিধ্য তারা মওলার লাভ করে, তাদের দু'আয় সে প্রাণে স্পন্দন ফুটে ওঠে।
হেদায়েত লাভ করার পর, এ পথ থেকে যেন বিচ্যুত না হয়, তাই তারা আল্লাহ্র রহম কামনা করে :
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةٌ ، إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ .
অর্থ : পরওয়ারদিগার! তুমিই যখন আমাদের হেদায়েত দান করেছো, তখন আমাদের মনে তুমি কোনো প্রকার বক্রতা ও জটিলতা সৃষ্টি করোনা। তোমার মেহেরবানির ভাণ্ডার থেকে আমাদের অনুগ্রহ দান করো। কারণ, প্রকৃত দাতা তুমিই। (সূরা ৩ আলে ইমরান : ৮)
যে সব খোদাভীরু লোক আল্লাহ্র সন্তোষ ও জান্নাত লাভ করবেন তারা এভাবে আল্লাহ্র দরবারে ক্ষমা ও মুক্তি কামনা করেন :
رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْلَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ .
অর্থ : পরওয়ারদিগার! আমরা ঈমান এনেছি। তুমি আমাদের গুনাহখাতা মাফ করে দাও। আর জাহান্নামের আগুন থেকে আমাদের বাঁচাও। (সূরা ৩ আলে ইমরান : ১৬)
আল্লাহ্ পাক বলেন, কিছু লোক আছে, তারা দুনিয়াতেই সবকিছু পেতে চায়। এদের জন্যে আখিরাতে কোনো অংশ নেই। এমন কিছু লোকও আছে, যারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের কল্যাণই কামনা করে। তারা এভাবে দু'আ করে :
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! দুনিয়ায় আমাদের কল্যাণ দান করো এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করো আর আগুনের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও। (সূরা ২ আল বাকারা: ২০১)
- এঁদের সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন: এরা নিজেদের কাজ অনুযায়ী উভয় স্থানেই কল্যাণ লাভ করবে। আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, তারা এভাবে দু'আ করে:
رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرًا وَمُقَامًا .
অর্থ: ওগো আমাদের রব! জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও। এ আযাব তো সাংঘাতিক প্রাণান্তকরভাবে লেগে থাকে। আশ্রয়স্থল ও বাসস্থান হিসেবে এটা বড়ই জঘন্য। (সূরা ২৫ আল ফুরকান: ৬৫-৬৬)
এসব লোকের আরো বৈশিষ্ট এই যে, তারা সন্তান ও বিবিদের জন্যেও দু'আ করে:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাদের স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানদের দ্বারা আমাদের চক্ষুসমূহের শীতলতা দাও। আর আমাদের মুত্তাকি লোকদের অগ্রগামী বানাও। (সূরা ২৫ আল ফুরকান: ৭৪)
আল্লাহ্ তাঁর সালেহ বান্দাদের পিতামাতার জন্যেও নিম্নোক্ত ভাষায় দু'আ করতে নির্দেশ দিয়েছেন:
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا -
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমার পিতামাতার প্রতি রহম করো। যেমন করে মায়া-মমতা আর স্নেহ বিজড়িত হৃদয়ে তারা ছোটবেলায় আমাকে লালন-পালন করেছেন। (সূরা ১৭ বনি ইসরাঈল: ২৪)
সালেহ লোকদের আর একটি দু'আ এরূপ:
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ .
অর্থ: প্রভু আমার! আমাকে তৌফিক দাও, আমি যেনো তোমার সেসব নেয়ামতের শোকরিয়া আদায় করি, যা তুমি আমাকে এবং আমার পিতা-মাতাকে দান করেছো। আর যেনো এমন নেক আমল করি, যাতে তুমি সন্তুষ্ট হবে। আমার সন্তানদেরও সৎ বানিয়ে আমাকে সুখ-শান্তি দাও। তোমার সমীপে আমি তওবা করছি। আর আমি তোমার অনুগতদের একজন। (সূরা ৪৬ আল আহকাফ : ১৫)
পরম দয়াময় ক্ষমাশীল রাব্বুল আলামীন মুমিনদের এভাবেও দু'আ করতে শিখিয়েছেন:
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا : رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا : رَبَّnَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَالَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ ، وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا : أَنْتَ مَوْلَانَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! ভুলবশত, আমাদের যা কিছু ত্রুটি হয়, তার জন্যে আমাদের পাকড়াও করোনা। মওলা! আমাদের উপর সেরূপ বোঝা চাপিয়ে দিয়োনা, যেরূপ দিয়েছিলে পূর্ববর্তী লোকদের উপর। প্রভু ওগো! যে বোঝা বহন করার শক্তি আমাদের নেই, তা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়োনা। আমাদের প্রতি সদয় হও। আমাদের মাফ করে দাও। আর আমাদের প্রতি রহম করো। তুমিই তো আমাদের মওলা! কাফেরদের বিরুদ্ধে তুমি আমাদের সাহায্য করো। (সূরা ২ আল বাকারা: ২৮৬)
📄 যানবাহনে উঠার দু'আ
যান বাহন চালানোর সময় এবং যান বাহনে আরোহণ করার সময় আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাহকে তাঁর নিকট দু'আ করার কথা বলেছেন। মানুষকে চিন্তা করা উচিত, যে মহান আল্লাহ্ তাকে উত্তাল তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে নৌকা, জাহাজ চালানোর সম্ভাবনা সৃষ্টি করে দিয়েছেন; কিছু জানোয়ারকে অধীন করে দিয়েছেন সেগুলোর পিঠে সওয়ার হবার জন্যে; আকাশ পথে ও স্থল পথে দ্রুতগামী যানবাহনকে তার নিয়ন্ত্রণের অধীন করে দিয়েছেন, সেই মহান আল্লাহ্ তায়ালা তার প্রতি কতো বড় করুণা করেছেন। এসব মহা মূল্যবান নিয়ামত ভোগ ব্যবহার করার সময় একজন জিন্দাদিল মানুষের অন্তর তো নিয়ামতের অনুভূতি এবং নিয়ামতের শোকর আদায়ের ভাব ধারায় ভরপুর হয়ে উঠা উচিত। এ জন্যেই আল্লাহ্ তায়ালা বলেন:
"তিনি সমস্ত জোড়া পয়দা করেছেন আর তিনিই তোমাদের জন্যে নৌযান ও জন্তু-জানোয়ারকে যান বাহন বানিয়েছেন যেনো তোমরা তার পিঠে আরোহণ করতে পারো। আর যখন তোমরা তার পিঠে আরোহণ করবে, তখন তোমাদের রবের অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো এবং বলো:
سُبْحَنَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ * وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ
অর্থ: মহান পবিত্র তিনি, যিনি এ জিনিসগুলোকে আমাদের জন্যে অধীন ও নিয়ন্ত্রিত করে দিয়েছেন। নতুবা আমরা তো এগুলোকে বশ করতে সক্ষম ছিলামনা। আর একদিন তো আমাদেরকে আমাদের রবের নিকট ফিরে যেতেই হবে।” (সূরা ৪৩ আয যুখরুফ: ১৩-১৪)