📄 হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামের দু'আ
হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম বনি ইসরাঈলের যে গোত্রের লোক ছিলেন সে গোত্রের দায়িত্ব ছিলো খোদার ঘর বায়তুল মুকাদ্দাসের রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির নেতৃত্ব দান করা। গোত্রীয় প্রধান হিসেবে হযরত যাকারিয়া এ দায়িত্ব পালন করতেন। বৃদ্ধ যাকারিয়া আলাইহিস সালাম আজীবন নিঃসন্তান। তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রী আজীবন বন্ধ্যা। একটা সন্তানের বড়ই আকাঙ্খা ছিলো তাঁদের। বিশেষ করে হযরত যাকারিয়ার মৃত্যুর পরে ধর্মীয় নেতৃত্ব শূন্য হয়ে যাওয়ার আশংকায় তিনি উত্তরাধিকারী হিসেবে একজন সন্তানের বড়ই আকাঙ্খী ছিলেন। তিনি রাব্বুল আলামীনের দরবারে দু'আ করেন:
رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا وَإِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ مِنْ وَرَائِي وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا فَهَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ وَاجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমার অস্তিমজ্জা গলে গেছে। আমার বার্ধক্য চিহ্নে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। প্রভু! তোমার নিকট কিছু চেয়ে আমি কখনো ব্যর্থকাম হইনি। আমার পরে আমার ভাই বন্ধুদের দুষ্কৃতির ভয় রয়েছে আমার মনে। আর আমার স্ত্রী হচ্ছে বন্ধ্যা। তুমি তোমার বিশেষ অনুগ্রহে আমাকে একজন উত্তরাধিকারী দান করো। যে আমার ও ইয়াকুবের বংশের উত্তরাধিকার লাভ করবে। পরওয়ারদিগার! আর তাকে একজন পছন্দসই মানুষ বানিয়ো। (সূরা ১৯ মরিয়াম: ৪-৬)
একদিন হযরত যাকারিয়া বায়তুল মুকাদ্দাসের মেহরাবে মরিয়ামের নিকট প্রবেশ করলেন। মরিয়মের নিকট তিনি জান্নাতের খাদ্য সামগ্রী দেখতে পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন : মরিয়ম! এ রিযিক কোথা থেকে এসেছে? মরিয়ম জবাব দিলেন:
قَالَتْ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ ، إِنَّ اللَّهَ يَرْزُقُ مَنْ يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ .
অর্থ: এ রিযিক আল্লাহ্র নিকট থেকে এসেছে। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে করেন, বেশুমার রিযিক দান করেন। (সূরা ৩ আলে ইমরান: ৩৭)
মরিয়মের জবাব শুনে হযরত যাকারিয়া তাঁর মনিবের নিকট নিবেদন করলেন:
رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةٌ ، إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ
অর্থ: মালিক আমার! মনিব আমার! তোমার বিশেষ কুদরতে আমাকে একটি উত্তম পবিত্র সন্তান দান করো। অবশ্যই তুমি দু'আ শ্রবণকারী। (সূরা ৩ আলে ইমরান: ৩৮)
পুত্রহীন যাকারিয়া আলাইহিস সালাম একটি সন্তানের জন্যে সব সময় মনিবের দরবারে বিনয়াবনত কণ্ঠে দু'আ করতেন :
رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে নিঃসন্তান ছেড়োনা। সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী তো তুমিই। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া: ৮৯)
فَنَادَتْهُ الْمَلَئِكَةُ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّى فِي الْمِحْرَابِ لَا أَنَّ اللَّهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحْيَى مُصَدِّقًا بِكَلِمَةٍ مِّنَ اللهِ وَسَيِّداً و حَصُورًا وَ نَبِيًّا مِنَ الصَّلِحِينَ
অর্থ: অতপর ফেরেশতা তাঁকে ডেকে বললো, যখন সে মেহরাবে নামায পড়ছিলো: আল্লাহ্ আপনাকে ইয়াহইয়ার সুসংবাদ দিচ্ছেন। তিনি ঈসার সমর্থনকারী হবেন, সরদার হবেন, উচ্চ স্তরের সুসভ্য, প্রবৃত্তি দমনকারী ও একজন সালেহ নবী হবেন। (সূরা ৩ আলে ইমরান: ৩৯)
📄 হযরত ঈসা আ.-এর সাহাবীদের দু'আ
আল্লাহ্র নবী হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম রসূল হিসেবে বনি ইসরাঈলের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন:
أَنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِنْ رَّبِّكُمْ إِنِّي أَخْلُقُ لَكُم مِّنَ الدِّينِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَانْفُخُ فِيْهِ فَيَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِ اللَّهِ ، وَأَبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَضَ وَأَحْيِ الْمَوْتَى بِإِذْنِ اللهِ ، وَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا تَأْكُلُونَ وَمَا تَدَّخِرُونَ لَا فِي بُيُوتِكُمْ ، إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ لَكُمْ إِن كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ وَمُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَى مِنَ التورية وَلَأُحِلَّ لَكُم بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ تَف فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ ، هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمُ فَلَمَّا أَحَسٌ عِيسَى مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللَّهِ . قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ اللَّهِ : أَمَنَّا بِاللَّهِ ، وَاشْمَلْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ .
অর্থ: তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে, আমি তোমাদের নিকট নিদর্শন নিয়ে এসেছি। (নিদর্শনগুলো হচ্ছে এই যে,) তোমাদের সামনেই আমি মাটি দিয়ে পাখির আকারে একটি মূর্তি বানাই এবং তাতে ফুঁ দিই, সাথে সাথেই আল্লাহর হুকুমে তা পাখি হয়ে যায়। আল্লাহর হুকুমে আমি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগিকে ভালো করে দিই এবং মৃতকে জীবিত করি। আমি তোমাদের বলে দিই নিজেদের ঘরে তোমরা কি খাও আর কি সঞ্চয় করে রাখো। এতে তোমাদের জন্যে যথেষ্ট নিদর্শন রয়েছে, অবশ্য তোমরা যদি ঈমান আনতে প্রস্তুত হয়ে থাকো। আর তাওরাতের যে শিক্ষা ও হেদায়াতের বাণী এখন আমার সামনে বর্তমান রয়েছে আমি তার সমর্থনকারী হিসেবে এসেছি। আমি এজন্যেও এসেছি যে, তোমাদের প্রতি হারাম করে দেয়া হয়েছে এমন কতিপয় জিনিসকে তোমাদের জন্যে হালাল ঘোষণা করে দেবো। জেনে রাখো, আমি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে তোমাদের নিকট নিদর্শন নিয়ে উপস্থিত হয়েছি। অতএব আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। আল্লাহ্ আমারও রব এবং তোমাদেরও রব। অতএব তোমরা তাঁরই দাসত্ব করো। প্রকৃতপক্ষে এটাই সঠিক ও সোজা পথ। কিন্তু ঈসা যখন অনুভব করলো তারা কুফরি ও অস্বীকৃতির পথেই উদ্বুদ্ধ হয়েছে তখন সে বললো: 'আল্লাহ্ পথে আমার সাহায্যকারী কে হবে?' জবাবে হাওয়ারীরা বললো: আমরা আল্লাহ্ (পথে আপনার) সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি। সাক্ষী থাকো, আমরা মুসলিম- আল্লাহ্র প্রতি আত্মসমর্থনকারী। (সূরা ৩ আলে ইমরান : ৪৯-৫২)
গোটা সমাজের বিরোধিতার মুখে মাত্র কয়েকজন ব্যক্তি আল্লাহ্ পথে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে সাহায্য করার, তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। চরম খোদাদ্রোহী যালেমদের নাকের ডগায় এ কতিপয় ব্যক্তি ঈমানের ঘোষণা দিয়ে তারা আল্লাহ্র নিকট দু'আ করলো:
رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنْزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّهِدِينَ .
অর্থ: ওগো আমাদের রব! তুমি যেসব ফরমান নাযিল করেছো আমরা তার প্রতি ঈমান এনেছি, তা আমরা মেনে নিয়েছি এবং রসূলকে অনুসরণ করার পন্থা কবুল করেছি। সত্যের সাক্ষ্যদাতাদের নামের সাথে তুমি আমাদের নাম লিখে নিও। (সূরা ৩ আলে ইমরান: ৫৩)
📄 রসূলুল্লাহ সা.-কে শিখানো দু'আ সমূহ
কুরআন মজীদে আল্লাহ্ তায়ালা বিশেষভাবে রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কতিপয় দু'আ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতির মুকাবিলায় আল্লাহ্ তায়ালা তাকে এসব দু'আ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
কুরআনের ইল্ম যেনো সুন্দর ও যথার্থভাবে অন্তরে গেঁথে যায়, সেজন্য আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর রসূলকে শিখালেন, হে নবী! এরূপ দু'আ করো:
رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে আরো অধিক ইলম দান করুন। (সূরা ২০ তোয়াহা : ১১৪)
বিরুদ্ধবাদীদের চরম হঠকারিতা, সত্য অমান্য ও শয়তানি প্ররোচনার মুকাবিলায় নবী যেনো ধৈর্যহারা না হয়ে পড়েন, সেজন্য শয়তানের প্ররোচনা থেকে আল্লাহ্র কাছে পানাহ চাওয়ার দু'আ আল্লাহ্ শিখিয়ে দিলেন এভাবে হে নবী! নিবেদন করো:
رَبِّ أَعوذُ بِكَ مِنْ هَمَرْتِ الشَّيْطِينِ . وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحْضُرُونَ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! শয়তানের প্ররোচনা থেকে আমি আপনার আশ্রয় চাই। প্রভু! আমার নিকট শয়তানের উপস্থিতি থেকেও আপনার নিকট পানাহ চাই। (সূরা ২৩ আল মু'মিনুন: ৯৭-৯৮)
নবুওয়াতের মক্কী অধ্যায়ে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকলে মুশরিকরা তাঁর তীব্র বিরোধিতা করতে থাকে, যেনো তিনি ভিমরুলের চাকে ঢিল ছুঁড়েছেন। ঘরে ঘরে তাঁকে গালমন্দ দেয়া হয়। রাত্রিবেলা তাঁকে গোপনে হত্যা করার শলা পরামর্শ হতে থাকে। তাঁকে যাদুটোনা করার চেষ্টা করা হয়। মানুষ ও জ্বীন শয়তান তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র উপদ্রব শুরু করে। মোটকথা, চতুর্দিকে তাঁর বিরোধিতার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে থাকে। এ সাংঘাতিক সংঙ্কটাপন্ন অবস্থায় আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর হাবীবকে নিম্নোক্তভাবে তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দান করেন:
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ * مِن شَرِّ مَا خَلَقَ وَمِنْ شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ . وَ مِنْ شَرِّ النَّفْتِ فِي الْعُقَدِ * وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ .
অর্থ: হে নবী! আশ্রয় প্রার্থনা করো: আমি আশ্রয় চাই সকাল বেলার স্রষ্টা আল্লাহ্র নিকট সেসব জিনিসের অনিষ্ট থেকে যা তিনি সৃষ্টি করেছেন আর রাতের অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে, যখন তা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। আমি আরো আশ্রয় চাই গিরায় ফুঁদানকারী ও কারিণীর অনিষ্ট থেকে এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে। (সূরা ১১৩ আল ফালাক: ১-৫)
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ * مَلِكِ النَّاسِ إِلَهِ النَّاسِ مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ وَ الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ .
অর্থ: হে নবী! বলো, আমি আশ্রয় চাই মানুষের রব, মানুষের বাদশাহ ও মানুষের প্রকৃত ইলাহর নিকট। বার বার ফিরে আসা অসঅসা উদ্রেককারীর অনিষ্ট থেকে, যে মানুষের দিলে অসঅসার উদ্রেক করে। সে জ্বীনদের থেকে হোক কিংবা মানুষের মধ্য থেকে। (সূরা ১১৪ আন নাস: ১-৬)
হিজরতের পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যাদুটোনা করা হলে আল্লাহ্র নির্দেশে এ সূরা দ্বয়ের মাধ্যমেই যাদুর ক্রিয়া ব্যর্থ করে দেয়া হয়। বস্তুত যাবতীয় বিরোধিতা, ষড়যন্ত্র, প্রতিহিংসা এবং মানুষ ও জ্বীন শয়তানদের অসঅসার মুকাবিলায় আল্লাহ্র কাছে আশ্রয় চাওয়ার অতি উত্তম নির্দেশিকা এ সূরা দুটি।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তাঁর নবীকে সব সময় এরূপ দু'আ করতেও নির্দেশ দিয়েছিলেন। হে নবী দু'আ করো:
رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَأَنتَ خَيْرُ الرَّحِمِينَ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে মাফ করে দিন। আমার প্রতি সদয় হোন আর আপনিই তো সর্বাপেক্ষা রহম দিল। (সূরা ২৩ আল মুমিনুন: ১১৮)
হিজরতের কিছুকাল পূর্বের ঘটনা। মুমিনরা কাফেরদের অত্যাচারে জর্জরিত। কাফেররা চরম অত্যাচারের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করছে। হিজরত করা অবধারিত। হিজরতের পূর্বে আন্দোলনের নেতাকে আল্লাহ্র নিকট কিভাবে এবং কোন জিনিসের দু'আ করতে হবে, দয়াময় রহমান তাঁর নবীকে সে শিক্ষা দিয়েছেন। হে নবী! এভাবে দু'আ করো:
رَبِّ أَدْخِلْنِي مُدْخَلَ صِدْقٍ وَأَخْرِجْنِي مُخْرَجَ صِدْقٍ وَاجْعَلْ لِي مِن لَّدُنْكَ سُلْطَنًا نَصِيرًا
অর্থ: পরওয়ারদিগার! তুমি আমাকে যেখানেই নেবে, সত্যতা সহকারে নিয়ে যেয়ো আর যেখান থেকে আমাকে বের করবে, বের করে নিয়ো সত্যতা সহকারে। প্রভু! আর তোমার নিকট থেকে একটি রাষ্ট্র শক্তিকে তুমি আমার সাহায্যকারী বানিয়ে দাও। (সূরা ১৭ বনি ইসারাঈল: ৮০)
হিজরতের বছর তিনেক পরের কথা। মুসলমানরা নিজেদের সর্বস্ব ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করে আসেন। এ সময় একদিকে কাফের ও নাফরমান লোকেরা আল্লাহ্ দীনের আলোকে নিভিয়ে দেবার জন্যে যুদ্ধে লিপ্ত। অথচ দুনিয়ায় তারা ধন-সম্পদের গৌরবে স্ফীত এবং দিন দিন আরো বড়ো হচ্ছে। অন্যদিকে ঈমানদার লোকেরা খোদানুগত্যের পথে চরম ত্যাগ ও কুরবানির নজীর স্থাপন করছে। অথচ তাদেরকে দারিদ্র্য, অনশন, অর্ধানশন ও অসংখ্য প্রকার বিপদ-মুসীবত ও দুঃখ-ক্লেশ নিয়তই জর্জরিত করছে। তখন নিতান্ত স্বাভাবিকভাবেই তাদের মনে এক আশ্চর্য ধরনের দুঃখভরা জিজ্ঞাসা ঘুরপাক খেতে থাকে। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর দীন প্রতিষ্ঠাকামী মুজাহিদদের নেতাকে এমন কতোগুলো ঘোষণা শিক্ষা দিলেন, যার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যে ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও আলোকচ্ছটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আল্লাহ্ তাঁর নবীকে নির্দেশ দিলেন, তুমি বলো:
اللهم مَلِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ وَ وَتُعِزُّ مَنْ تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَنْ تَشَاءُ ، بِيَدِكَ الْخَيْرِ ، إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْ ءٍ قَدِيرٌ تُولِجُ الَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَتُولِجُ النَّهَارَ فِي الَّيْلِ ، وَتُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَتُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ ، وَتَرْزُقُ مَنْ تَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ
অর্থ: ওগো আল্লাহ্! সকল রাজ্য ও সাম্রাজ্যের মালিক! তুমি যাকে চাও রাজ্য দান করো আর যার থেকে চাও রাজ্য কেড়ে নাও। যাকে চাও সম্মান দান করো, যাকে ইচ্ছা অপমানিত ও লাঞ্ছিত করো। সকল মঙ্গল ও কল্যাণ তোমারই মুষ্টিবদ্ধে। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশক্তিমান। রাতকে তুমি দিনের মধ্যে শামিল করে দাও আর দিনকে শামিল করো রাতের মধ্যে। জীবন্ত জিনিস থেকে তুমি জীবনহীন জিনিস বের করো, আর জীবনহীন জিনিস থেকে বের করো জীবন্ত জিনিস। তুমি যাকে চাও বেহিসাব রিযিক দান করো। (সূরা ৩ আলে ইমরান: ২৬-২৭)
বিরুদ্ধবাদীদের কট্টর সমালোচনা ও বিরোধিতার মুকাবিলায় রসূলে করীমের দু'আ:
رَبِّ احْكُمُ بِالْحَقِّ وَرَبُّنَا الرَّحْمَنَ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! ইনসাফ ও সত্যতা সহকারে ফায়সালা করে দাও। (হে লোকেরা!) তোমরা যেসব কথা বানাও, তার মুকাবিলায় আমাদের দয়াময় প্রভুই আমাদের সাহায্যের একান্ত নির্ভর। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া: ১১২)
এক লা-শরীক আল্লাহ্র জন্যে নিজের সমস্ত ইবাদত-উপাসনা এমনকি জীবন ও মৃত্যু পর্যন্ত উৎসর্গ করার ফায়সালা করাই ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি কর্মীর আসল দায়িত্ব। আল্লাহ্ এ উৎসর্গের ঘোষণা পদ্ধতি তাঁর নবীকে এভাবে শিখিয়ে দেন। হে নবী! বলো:
إِن صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ وَ لَأَشْرِيكَ لَهُ : وَبِذلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ .
অর্থ: আমার নামায, আর সমস্ত ত্যাগ ও কুরবানি, আমার জীবন, আমার মৃত্যু সবই কেবলমাত্র আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের জন্যে। তাঁর কোনো শরীক নেই। এরি নির্দেশ আমাকে দেয়া হয়েছে এবং এ ব্যাপারে সর্বপ্রথম আনুগত্যের শির অবনতকারী হচ্ছি আমি নিজে। (সূরা ৬ আল আনয়াম : ১৬২-১৬৩)
📄 চিন্তাশীল ও গবেষকদের দু'আ
আসমান ও যমীনের স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টি কৌশলের মধ্যে চিন্তাশীল ও গবেষকদের জন্যে ঈমানের বীজ পুঁতে রেখেছেন। তিনি বলেন: আসমান ও যমীনের সৃষ্টি কৌশলে এবং রাত ও দিনের আবর্তনের মধ্যে সে সব লোকদের জন্যে অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে, যারা উঠতে, বসতে, শুতে অর্থাৎ সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করবে আর আসমান ও যমীনের সৃষ্টি এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চিন্তা ও গবেষণা করবে, তারা স্বত:স্ফূর্তভাবেই বলে উঠবে:
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً سُبْحَنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ رَبَّنَا إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ ط وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ أَنْصَارِ رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلإِيْمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَأَمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْلَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفَرْعَنَّا سَيِّاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ . رَبَّنَا وَاتِنَا مَا وَعَدَتْنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلَا تُهْزِنَا يَوْمَ الْقِيمَةِ طَ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! এ সব কিছু তুমি অর্থহীন ও উদ্দেশ্যবিহীন সৃষ্টি করোনি। উদ্দেশ্যবিহীন কাজের বাতুলতা থেকে তুমি অতিশয় পবিত্র। তাই হে প্রভু! আমাদেরকে দোযখের আগুন থেকে বাঁচাও। তুমি যাকে দোযখে নিক্ষেপ করবে, তাকে বাস্তবিকই বড় অপমান ও লজ্জায় নিক্ষেপ করবে, তাছাড়া এসব যালেমদের সাহায্যকারীও কেউ হবেনা। পরওয়ারদিগার! আমরা একজন আহবানকারীর আহবান শুনতে পেয়েছি। তিনি ডেকে বলছিলেন: 'তোমরা তোমাদের প্রকৃত মওলাকে মেনে নাও।' আমরা তাঁর দাওয়াত কবুল করেছি। অতএব হে আমাদের মনিব! যে সব অপরাধ আমরা করেছি, তা তুমি ক্ষমা করে দাও। আমাদের মধ্যে যা কিছু অন্যায় ও দোষত্রুটি রয়েছে, তা তুমি দূর করে দাও। আর নেককার লোকদের সাথে আমাদের শেষ পরিণতি সম্পন্ন করো। পরওয়ারদিগার! তুমি তোমার রসূলের মাধ্যমে আমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছো তা পূর্ণ করো আর কিয়ামতের দিন আমাদেরকে লজ্জার সম্মুখীন করোনা। নি:সন্দেহে তুমি কখনো ওয়াদা খেলাপ করোনা। (সুরা ৩ আলে ইমরান ১৯১-১৯৪)