📄 হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালামের দু'আ
আল্লাহ্ নবী হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম কঠিন রোগে পীড়িত। দীর্ঘদিন থেকে রোগে তিনি সাংঘাতিক কষ্ট ভোগ করে আসছেন। নিদারুণ কষ্ট। আল্লাহ্র দেয়া দুঃখ মুসীবত ও পীড়া অসাধারণ ধৈর্য ও সবরের সাথে সইয়ে যাচ্ছেন তিনি। দীর্ঘ ও চরম ভোগান্তির পর আল্লাহ্র দরবারে তিনি এতোটুকু কেবল আরয করলেন:
اَنِّیْ مَسَّنِیَ الضُّرُّ وَاَنْتَ اَرْحَمُ الرّٰحِمِیْنَ
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমার অসুখ হয়েছে, আর তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া: ৮৩)
কতো মর্মস্পর্শী এ দু'আ! অতি সংক্ষিপ্তভাবে নিজের অসুখের কথা উল্লেখ করার পর শুধু এতোটুকু বলেই থেমে যান যে, "তুমিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান।” অতপর আর কোনো অভিযোগ নেই, নেই কোনো ফরিয়াদ। যেনো এ কথাগুলোর নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য নেই। যেনো নেই কোনো জিনিস পাওয়ার দাবি। মূলত এ ধরনের উচ্চাঙ্গ দোয়ায় যে মূল সুরটি ধ্বনিত হয়ে উঠে, তা হচ্ছে এই যে, যেনো কোনো অপরিসীম ধৈর্যশীল, অল্পে তুষ্ট, ভদ্র ও আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি সুদীর্ঘ অনশনে কাতর হয়ে পড়েছেন। আর তাঁর চাইতে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন সত্তার নিকট শুধু এতোটুকু বলেই থেমে যাচ্ছেন যে, "আমি অভুক্ত, ক্ষধাতুর আর আপনি তো মহান দাতা." ...এরপর আর কিছু তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হতে পারছেনা।
বস্তুত মহান মালিকের দরবারে মুমিন বান্দার দু'আ এরূপ মর্যাদাব্যঞ্জক হওয়াই উচিত। এমন মর্মস্পর্শী দু'আ আল্লাহ্ তায়ালা অবশ্যই কবুল করেন:
فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِنْ ضُرٍ
অর্থ: অতপর আমি তার দু'আ কবুল করলাম এবং তার কষ্ট দূর করে দিলাম। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া: ৮৪)
📄 হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামের দু'আ
হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম। কুরআন মজীদে তাঁকে 'যাননুন' এবং 'সাহিবুল হুত' অর্থাৎ 'মাছওয়ালা' বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। নিজ জাতিকে দীনের পথে আনার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। দীনের দাওয়াত গ্রহণ করা তো দূরের কথা বরং তারা এতো বেশি পরিমাণে আল্লাহ্র নাফরমানি করতে শুরু করলো যে, তাদের উপর আল্লাহ্র আযাব নাযিল হওয়া অবধারিত হয়ে পড়লো। কিন্তু আল্লাহ্র আযাব আসার পূর্বেই হযরত ইউনুস জনপদ ত্যাগ করে অন্যত্র রওয়ানা করলেন। আল্লাহ্র নবী ইউনুস আযাব আসার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত জনগণকে দীনের পথে আনার চেষ্টা না করে আল্লাহ্র অনুমতি ছাড়াই জনপদ ত্যাগ করেছেন। আল্লাহ্ পছন্দ হয়নি এ কাজ। তাই আল্লাহ্র ইচ্ছায় নদী অতিক্রমকালে তাঁকে মাছের পেটে যেতে হলো। একেতো সাগর তলের অন্ধকার। তার উপর মাছের অন্ধকার জঠর। কি করুণ ও দুর্বিষহ অবস্থায় পড়তে হলো নবী ইউনুসকে। নিজের ত্রুটি অত্যন্ত অনুশোচনার সাথে স্বীকার করে মালিকের দরবারে ফরিয়াদ করলেন আল্লাহ্ নবী ইউনুস আলাইহিস সালাম :
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَنَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّلِمِينَ
অর্থ : তুমি ছাড়া নেই কোনো ইলাহ! পবিত্র মহান তোমার সত্তা। আমি অবশ্যই অপরাধী। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া : ৮৭)
আল্লাহ্র মনোনীত পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী হযরত ইউনুসের এ করুণ অনুশোচনা আল্লাহ্ কবুল করেন :
فَاسْتَجَبْنَا لَهُ: وَنَجِّيْنَهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ تُنْجِي الْمُؤْمِنِينَ
অর্থ : অতপর আমি তার দু'আ কবুল করলাম এবং তাকে অন্ধকার থেকে উদ্ধার করলাম। এভাবেই আমি মুমিনদের রক্ষা করি। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া : ৮৮)
📄 হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের দু'আ
আল্লাহ্ তায়ালা হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামকে বিরাট রাজশক্তির নেয়ামত, পক্ষীকূলের কথা বুঝা ও জ্বীনদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দিয়েছিলেন। কুরআনের ভাষায়: 'আমরা দাউদ ও সুলাইমানকে ইলম দান করেছি। তারা বলেছে:
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي فَضَّلَنَا عَلَى كَثِيرٍ مِّنْ عِبَادِهِ الْمُؤْمِنِينَ
অর্থ: শোকর সেই আল্লাহ্! যিনি তাঁর বহুসংখ্যক মুমিন বান্দার উপর আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। (সূরা ২৭ আন্নামল: ১৫)
আর দাউদের উত্তরাধিকারী হয়েছে সুলাইমান। সে বললো: হে জনগণ! আমাকে পাখির ভাষা শিখানো হয়েছে এবং সর্ব প্রকারের সম্পদই দান করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহ্ সুস্পষ্ট অনুগ্রহ। সুলাইমানের জন্যে জ্বীন ও মানুষ আর পক্ষীকূলের সেনাবাহিনী একত্রিত করা হয়েছিল। এগুলোকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা হতো।
একবার সকলকে নিয়ে সুলাইমান যাত্রা করলো। যখন পিপীলিকার প্রান্তরে পৌঁছালো, তখন এক পিপীলিকা চেঁচিয়ে উঠলো : হে পিপীলিকার দল। তোমরা নিজ নিজ গর্তে ঢুকে পড়ো। এমন যেন না হয় যে, সুলাইমান এবং তাঁর সৈন্য সামন্তরা তোমাদের পিষে মেরে ফেলে অথচ তারা তা টেরও না পায়। ১০
আল্লাহ্ নবী সুলাইমান পিপীলিকার এ ভাষণ শুনলেন। তাঁর অন্তরে ভয় ঢুকলো- না জানি তাঁর দ্বারা আল্লাহ্ কোনো সৃষ্টির প্রতি যুলুম হয়ে যায়! তাই তো দেখি এ মহান শাসক নবী আল্লাহ্ প্রদত্ত ক্ষমতা ও রাজশক্তির মতো মহান নেয়ামতের সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের তৌফিক কামনা করে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনিবের দরবারে নিবেদন করলেন:
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَى وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّلِحِينَ
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখো। তুমি আমার ও আমার পিতা মাতার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছো, আমি যেন তার শোকর আদায় করি এবং এমন নেক আমল করি যা হবে তোমার পছন্দনীয়। আর তোমার অসীম অনুগ্রহে আমাকে তোমার সালেহ বান্দাদের মধ্যে শামিল করো। (সূরা ২৭ আন্নামল: ১৯)
সাবা সম্রাজ্ঞী হযরত সুলাইমানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলেন। হযরত সুলাইমান সিদ্ধান্ত নিলেন, সাবা সম্রাজ্ঞী এসে পৌঁছলে তাঁর (সম্রাজ্ঞীর) নিজ সিংহাসনেই তাঁকে বসতে দেবেন। কিন্তু সুলাইমানের রাজধানী দারুস সালাম থেকে সাবার দূরত্ব অন্তত দেড় হাজার মাইল। অন্যদিকে সম্রাজ্ঞী এসে পৌঁছার আগে তার সিংহাসনটা এনে পৌঁছতে হবে। একটা সাংঘাতিক সিদ্ধান্ত বটে। পরিষদবর্গের একজন বললেন: 'আপনি এখান থেকে উঠার আগেই আমি তা এনে হাজির করবো।' অপর এক ব্যক্তি, যার নিকট কিতাবের ইলম ছিলো- বললো: 'আমি আপনার চোখের পলকের মধ্যেই তা এনে হাজির করতে পারি।' সঙ্গে সঙ্গে হযরত সুলাইমান সাবা সম্রাজ্ঞীর সিংহাসনটি নিজের সম্মুখে দেখতে পেয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন:
هَذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ ، وَمَنْ شَكَرَ فَإِنَّهَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ ۖ وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ رَبِّي غَنِيٌّ كَرِيمٌ
অর্থ: এ হচ্ছে আমার দয়াময় প্রভুর অনুগ্রহ। তিনি আমাকে এর দ্বারা পরীক্ষা করতে চান, আমি কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি নাকি অকৃতজ্ঞ হই। বস্তুত যে শোকর গুযার হয়, তা তার নিজের জন্যেই কল্যাণ বয়ে আনে আর কেউ যদি অকৃতজ্ঞ হয়, (তবে তার জানা উচিত) আমার প্রভু মুখাপেক্ষাহীন, অতিশয় মহান। (সূরা ২৭ আন্নামল: ৪০)
টিকাঃ
১০. সূরা ২৭ আন্নামল: ১৫-১৮।
📄 হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামের দু'আ
হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম বনি ইসরাঈলের যে গোত্রের লোক ছিলেন সে গোত্রের দায়িত্ব ছিলো খোদার ঘর বায়তুল মুকাদ্দাসের রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির নেতৃত্ব দান করা। গোত্রীয় প্রধান হিসেবে হযরত যাকারিয়া এ দায়িত্ব পালন করতেন। বৃদ্ধ যাকারিয়া আলাইহিস সালাম আজীবন নিঃসন্তান। তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রী আজীবন বন্ধ্যা। একটা সন্তানের বড়ই আকাঙ্খা ছিলো তাঁদের। বিশেষ করে হযরত যাকারিয়ার মৃত্যুর পরে ধর্মীয় নেতৃত্ব শূন্য হয়ে যাওয়ার আশংকায় তিনি উত্তরাধিকারী হিসেবে একজন সন্তানের বড়ই আকাঙ্খী ছিলেন। তিনি রাব্বুল আলামীনের দরবারে দু'আ করেন:
رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا وَإِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ مِنْ وَرَائِي وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا فَهَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ وَاجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমার অস্তিমজ্জা গলে গেছে। আমার বার্ধক্য চিহ্নে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। প্রভু! তোমার নিকট কিছু চেয়ে আমি কখনো ব্যর্থকাম হইনি। আমার পরে আমার ভাই বন্ধুদের দুষ্কৃতির ভয় রয়েছে আমার মনে। আর আমার স্ত্রী হচ্ছে বন্ধ্যা। তুমি তোমার বিশেষ অনুগ্রহে আমাকে একজন উত্তরাধিকারী দান করো। যে আমার ও ইয়াকুবের বংশের উত্তরাধিকার লাভ করবে। পরওয়ারদিগার! আর তাকে একজন পছন্দসই মানুষ বানিয়ো। (সূরা ১৯ মরিয়াম: ৪-৬)
একদিন হযরত যাকারিয়া বায়তুল মুকাদ্দাসের মেহরাবে মরিয়ামের নিকট প্রবেশ করলেন। মরিয়মের নিকট তিনি জান্নাতের খাদ্য সামগ্রী দেখতে পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন : মরিয়ম! এ রিযিক কোথা থেকে এসেছে? মরিয়ম জবাব দিলেন:
قَالَتْ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ ، إِنَّ اللَّهَ يَرْزُقُ مَنْ يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ .
অর্থ: এ রিযিক আল্লাহ্র নিকট থেকে এসেছে। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে করেন, বেশুমার রিযিক দান করেন। (সূরা ৩ আলে ইমরান: ৩৭)
মরিয়মের জবাব শুনে হযরত যাকারিয়া তাঁর মনিবের নিকট নিবেদন করলেন:
رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةٌ ، إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ
অর্থ: মালিক আমার! মনিব আমার! তোমার বিশেষ কুদরতে আমাকে একটি উত্তম পবিত্র সন্তান দান করো। অবশ্যই তুমি দু'আ শ্রবণকারী। (সূরা ৩ আলে ইমরান: ৩৮)
পুত্রহীন যাকারিয়া আলাইহিস সালাম একটি সন্তানের জন্যে সব সময় মনিবের দরবারে বিনয়াবনত কণ্ঠে দু'আ করতেন :
رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে নিঃসন্তান ছেড়োনা। সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী তো তুমিই। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া: ৮৯)
فَنَادَتْهُ الْمَلَئِكَةُ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّى فِي الْمِحْرَابِ لَا أَنَّ اللَّهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحْيَى مُصَدِّقًا بِكَلِمَةٍ مِّنَ اللهِ وَسَيِّداً و حَصُورًا وَ نَبِيًّا مِنَ الصَّلِحِينَ
অর্থ: অতপর ফেরেশতা তাঁকে ডেকে বললো, যখন সে মেহরাবে নামায পড়ছিলো: আল্লাহ্ আপনাকে ইয়াহইয়ার সুসংবাদ দিচ্ছেন। তিনি ঈসার সমর্থনকারী হবেন, সরদার হবেন, উচ্চ স্তরের সুসভ্য, প্রবৃত্তি দমনকারী ও একজন সালেহ নবী হবেন। (সূরা ৩ আলে ইমরান: ৩৯)