📄 হযরত শুয়াইব আলাইহিস সালামের দু'আ
আল্লাহ্ নবী হযরত শুয়াইব মাদায়ীন বাসীদেরকে তাদের দুর্নীতি ও দুষ্কৃতি বন্ধ করার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তিনি তাদের বলেন: তোমরা আল্লাহ্র দাসত্ব করো। ওজন ও পরিমাপের কমবেশি করোনা, লোকদেরকে তাদের দ্রব্যে ক্ষতিগ্রস্ত করোনা। যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করোনা। সহজ সরল পথকে বাঁকা করার কাজে ব্যস্ত হয়োনা। ঈমানদার লোকদেরকে তাদের পথ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করোনা। লোকদের ভীত সন্ত্রস্ত করোনা আর জীবনের প্রতিটি পথে ডাকাত হয়ে বসোনা। ৮
হযরত শুয়াইবের আহবান শুনে কওমের সরদাররা বললো: হে শুয়াইব! আমরা তোমাকে এবং তোমার প্রতি ঈমানদার লোকদেরকে এদেশ থেকে বহিষ্কার করে দেবো। অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মে ফিরিয়ে আনবো। ৯
কওমের এরূপ চরম বিরোধিতা ও হঠকারিতা মুকাবিলায় হযরত শুয়াইবের মুখে উচ্চারিত হলো:
وَمَا أُرِيدُ أَنْ أَخَالِفَكُمْ إِلَى مَا أَنْهُكُمْ عَنْهُ ، إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ ، وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ ، عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
অর্থ: আমি তো তোমাদের ক্ষতি চাইনা, আমি তো চাই কেবল আমার সাধ্য অনুযায়ী তোমাদের সংশোধন ও কল্যাণ করতে। আমার এ মহান উদ্দেশ্যের সাফল্য কেবল আল্লাহর ইচ্ছার উপরই নির্ভরশীল। তাঁরই উপর আমি ভরসা করেছি এবং তাঁরই দিকে আমি ফিরে যাবো। (সূরা ১১ হুদ : ৮৮)
কিন্তু কওমের বিরোধিতা বেড়েই চললো। অবশেষে আল্লাহ্ নবী চরম দু'আ করলেন:
عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا ، رَبَّنَا افْتَحْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ قَوْمِنَا بِالْحَقِّ وَأَنْتَ خَيْرُ الْفَاتِحِينَ .
অর্থ: আমরা আল্লাহ্র উপর তাওয়াককুল করেছি। পরওয়ারদিগার! 'আমাদের ও আমাদের জাতির লোকদের মধ্যে সঠিকভাবে ফায়সালা করে দাও। আর তুমিই তো সর্বোত্তম ফায়সালাকারী। (সূরা ৭ আরাফ: ৮৯)
টিকাঃ
৮. সূরা ৭ আল আ'রাফ: ৮৫-৮৬。
৯. সূরা ৭ আল আ'রাফ: ৮৮。
📄 হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালামের দু'আ
আল্লাহ্ নবী হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম কঠিন রোগে পীড়িত। দীর্ঘদিন থেকে রোগে তিনি সাংঘাতিক কষ্ট ভোগ করে আসছেন। নিদারুণ কষ্ট। আল্লাহ্র দেয়া দুঃখ মুসীবত ও পীড়া অসাধারণ ধৈর্য ও সবরের সাথে সইয়ে যাচ্ছেন তিনি। দীর্ঘ ও চরম ভোগান্তির পর আল্লাহ্র দরবারে তিনি এতোটুকু কেবল আরয করলেন:
اَنِّیْ مَسَّنِیَ الضُّرُّ وَاَنْتَ اَرْحَمُ الرّٰحِمِیْنَ
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমার অসুখ হয়েছে, আর তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া: ৮৩)
কতো মর্মস্পর্শী এ দু'আ! অতি সংক্ষিপ্তভাবে নিজের অসুখের কথা উল্লেখ করার পর শুধু এতোটুকু বলেই থেমে যান যে, "তুমিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান।” অতপর আর কোনো অভিযোগ নেই, নেই কোনো ফরিয়াদ। যেনো এ কথাগুলোর নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য নেই। যেনো নেই কোনো জিনিস পাওয়ার দাবি। মূলত এ ধরনের উচ্চাঙ্গ দোয়ায় যে মূল সুরটি ধ্বনিত হয়ে উঠে, তা হচ্ছে এই যে, যেনো কোনো অপরিসীম ধৈর্যশীল, অল্পে তুষ্ট, ভদ্র ও আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি সুদীর্ঘ অনশনে কাতর হয়ে পড়েছেন। আর তাঁর চাইতে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন সত্তার নিকট শুধু এতোটুকু বলেই থেমে যাচ্ছেন যে, "আমি অভুক্ত, ক্ষধাতুর আর আপনি তো মহান দাতা." ...এরপর আর কিছু তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হতে পারছেনা।
বস্তুত মহান মালিকের দরবারে মুমিন বান্দার দু'আ এরূপ মর্যাদাব্যঞ্জক হওয়াই উচিত। এমন মর্মস্পর্শী দু'আ আল্লাহ্ তায়ালা অবশ্যই কবুল করেন:
فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِنْ ضُرٍ
অর্থ: অতপর আমি তার দু'আ কবুল করলাম এবং তার কষ্ট দূর করে দিলাম। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া: ৮৪)
📄 হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামের দু'আ
হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম। কুরআন মজীদে তাঁকে 'যাননুন' এবং 'সাহিবুল হুত' অর্থাৎ 'মাছওয়ালা' বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। নিজ জাতিকে দীনের পথে আনার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। দীনের দাওয়াত গ্রহণ করা তো দূরের কথা বরং তারা এতো বেশি পরিমাণে আল্লাহ্র নাফরমানি করতে শুরু করলো যে, তাদের উপর আল্লাহ্র আযাব নাযিল হওয়া অবধারিত হয়ে পড়লো। কিন্তু আল্লাহ্র আযাব আসার পূর্বেই হযরত ইউনুস জনপদ ত্যাগ করে অন্যত্র রওয়ানা করলেন। আল্লাহ্র নবী ইউনুস আযাব আসার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত জনগণকে দীনের পথে আনার চেষ্টা না করে আল্লাহ্র অনুমতি ছাড়াই জনপদ ত্যাগ করেছেন। আল্লাহ্ পছন্দ হয়নি এ কাজ। তাই আল্লাহ্র ইচ্ছায় নদী অতিক্রমকালে তাঁকে মাছের পেটে যেতে হলো। একেতো সাগর তলের অন্ধকার। তার উপর মাছের অন্ধকার জঠর। কি করুণ ও দুর্বিষহ অবস্থায় পড়তে হলো নবী ইউনুসকে। নিজের ত্রুটি অত্যন্ত অনুশোচনার সাথে স্বীকার করে মালিকের দরবারে ফরিয়াদ করলেন আল্লাহ্ নবী ইউনুস আলাইহিস সালাম :
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَنَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّلِمِينَ
অর্থ : তুমি ছাড়া নেই কোনো ইলাহ! পবিত্র মহান তোমার সত্তা। আমি অবশ্যই অপরাধী। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া : ৮৭)
আল্লাহ্র মনোনীত পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী হযরত ইউনুসের এ করুণ অনুশোচনা আল্লাহ্ কবুল করেন :
فَاسْتَجَبْنَا لَهُ: وَنَجِّيْنَهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ تُنْجِي الْمُؤْمِنِينَ
অর্থ : অতপর আমি তার দু'আ কবুল করলাম এবং তাকে অন্ধকার থেকে উদ্ধার করলাম। এভাবেই আমি মুমিনদের রক্ষা করি। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া : ৮৮)
📄 হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের দু'আ
আল্লাহ্ তায়ালা হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামকে বিরাট রাজশক্তির নেয়ামত, পক্ষীকূলের কথা বুঝা ও জ্বীনদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দিয়েছিলেন। কুরআনের ভাষায়: 'আমরা দাউদ ও সুলাইমানকে ইলম দান করেছি। তারা বলেছে:
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي فَضَّلَنَا عَلَى كَثِيرٍ مِّنْ عِبَادِهِ الْمُؤْمِنِينَ
অর্থ: শোকর সেই আল্লাহ্! যিনি তাঁর বহুসংখ্যক মুমিন বান্দার উপর আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। (সূরা ২৭ আন্নামল: ১৫)
আর দাউদের উত্তরাধিকারী হয়েছে সুলাইমান। সে বললো: হে জনগণ! আমাকে পাখির ভাষা শিখানো হয়েছে এবং সর্ব প্রকারের সম্পদই দান করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহ্ সুস্পষ্ট অনুগ্রহ। সুলাইমানের জন্যে জ্বীন ও মানুষ আর পক্ষীকূলের সেনাবাহিনী একত্রিত করা হয়েছিল। এগুলোকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা হতো।
একবার সকলকে নিয়ে সুলাইমান যাত্রা করলো। যখন পিপীলিকার প্রান্তরে পৌঁছালো, তখন এক পিপীলিকা চেঁচিয়ে উঠলো : হে পিপীলিকার দল। তোমরা নিজ নিজ গর্তে ঢুকে পড়ো। এমন যেন না হয় যে, সুলাইমান এবং তাঁর সৈন্য সামন্তরা তোমাদের পিষে মেরে ফেলে অথচ তারা তা টেরও না পায়। ১০
আল্লাহ্ নবী সুলাইমান পিপীলিকার এ ভাষণ শুনলেন। তাঁর অন্তরে ভয় ঢুকলো- না জানি তাঁর দ্বারা আল্লাহ্ কোনো সৃষ্টির প্রতি যুলুম হয়ে যায়! তাই তো দেখি এ মহান শাসক নবী আল্লাহ্ প্রদত্ত ক্ষমতা ও রাজশক্তির মতো মহান নেয়ামতের সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের তৌফিক কামনা করে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনিবের দরবারে নিবেদন করলেন:
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَى وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّلِحِينَ
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখো। তুমি আমার ও আমার পিতা মাতার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছো, আমি যেন তার শোকর আদায় করি এবং এমন নেক আমল করি যা হবে তোমার পছন্দনীয়। আর তোমার অসীম অনুগ্রহে আমাকে তোমার সালেহ বান্দাদের মধ্যে শামিল করো। (সূরা ২৭ আন্নামল: ১৯)
সাবা সম্রাজ্ঞী হযরত সুলাইমানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলেন। হযরত সুলাইমান সিদ্ধান্ত নিলেন, সাবা সম্রাজ্ঞী এসে পৌঁছলে তাঁর (সম্রাজ্ঞীর) নিজ সিংহাসনেই তাঁকে বসতে দেবেন। কিন্তু সুলাইমানের রাজধানী দারুস সালাম থেকে সাবার দূরত্ব অন্তত দেড় হাজার মাইল। অন্যদিকে সম্রাজ্ঞী এসে পৌঁছার আগে তার সিংহাসনটা এনে পৌঁছতে হবে। একটা সাংঘাতিক সিদ্ধান্ত বটে। পরিষদবর্গের একজন বললেন: 'আপনি এখান থেকে উঠার আগেই আমি তা এনে হাজির করবো।' অপর এক ব্যক্তি, যার নিকট কিতাবের ইলম ছিলো- বললো: 'আমি আপনার চোখের পলকের মধ্যেই তা এনে হাজির করতে পারি।' সঙ্গে সঙ্গে হযরত সুলাইমান সাবা সম্রাজ্ঞীর সিংহাসনটি নিজের সম্মুখে দেখতে পেয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন:
هَذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ ، وَمَنْ شَكَرَ فَإِنَّهَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ ۖ وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ رَبِّي غَنِيٌّ كَرِيمٌ
অর্থ: এ হচ্ছে আমার দয়াময় প্রভুর অনুগ্রহ। তিনি আমাকে এর দ্বারা পরীক্ষা করতে চান, আমি কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি নাকি অকৃতজ্ঞ হই। বস্তুত যে শোকর গুযার হয়, তা তার নিজের জন্যেই কল্যাণ বয়ে আনে আর কেউ যদি অকৃতজ্ঞ হয়, (তবে তার জানা উচিত) আমার প্রভু মুখাপেক্ষাহীন, অতিশয় মহান। (সূরা ২৭ আন্নামল: ৪০)
টিকাঃ
১০. সূরা ২৭ আন্নামল: ১৫-১৮।