📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত মূসা আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত মূসা আলাইহিস সালামের দু'আ


পবিত্র তোয়া ময়দানে আল্লাহ্ তায়ালা মিসরের যালেম শাসক খোদাদ্রোহী ফেরাউনের নিকট দীনের দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার জন্য হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে নির্দেশ দেন। এ বিরাট দায়িত্বের কথা চিন্তা করে তাঁর দিল কেঁপে উঠলো, চোখের সামনে ভেসে উঠলো এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। কাতর কণ্ঠে নিজের সমস্ত দুর্বলতা তুলে ধরলেন হযরত মুসা বিশ্বজাহানের মালিকের দরবারে:
رَبِّ إِنِّي أَخَافُ أَن يُكَذِّبُونِ وَيَضِيقُ صَدْرِى وَلَا يَنْطَلِقُ لِسَانِي فَأَرْسِلْ إلى مرُونَ * وَلَهُمْ عَلَى ذَنْب فَأَخَافُ أَن يَقْتُلُونَ .
অর্থ: ওগো মওলা! আমার আশংকা হয় তারা আমাকে মিথ্যা মনে করে অমান্য করবে। আমার মন ছোট হয়ে আসছে আর আমার রসনা সঞ্চালিত হয়না। আপনি হারুনকেও রিসালাত দান করুন। একটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগও আমার বিরুদ্ধে তাদের রয়েছে। তাই আমার ভয় হয় তারা আমাকে হত্যা করবে। (সূরা ২৬ আশশোয়ারা: ১২-১৪)
সে সময়কার মিসরের ক্ষমতাসীন শাসকবর্গ ও হযরত মূসা আলাইহিস সালামের জাতি ক্ষমতাচ্যুত বনি ইসরাইলের ইতিহাস এবং হযরত মূসার প্রতিপালিত হওয়ার কাহিনী যাদের জানা আছে, তারা নিশ্চয়ই মূসা আলাইহিস সালামের উপর অর্পিত এ গুরুদায়িত্ব পালনের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারছেন। এখানে অবস্থার সংক্ষিপ্ত পটভূমি আলোচিত হলো:
ক. হযরত মূসার জাতি বনী ইসরাঈল মূলত মিসরীয় নয়। হযরত ইয়াকুবের পুত্র ইউসুফ আলাইহিস সালাম কর্তৃক মিসরে ক্ষমতা লাভের মাধ্যমে এরা মিসরে বসবাস শুরু করে। হযরত ইউসুফের সময় মিসরে রাজত্ব করতো রাখাল রাজারা। হযরত ইউসুফ এ বংশেরই এক রাজার অধীনে মন্ত্রীত্ব করেন। রাজা হযরত ইউসুফকে রাষ্ট্র চালাবার স্বাধীন ক্ষমতা প্রদান করেন। এ সময় হযরত ইউসুফ বনি ইসরাঈলকে প্রশাসনে ব্যাপক নিয়োগ দান করেন। হযরত ইউসুফের ইন্তেকালের পর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে যখন রাখাল রাজারা ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং মিসরীয় কিবতীরা ক্ষমতা দখল করে, তখন বনি ইসরাঈলও রাষ্ট্রীয় পদসমূহ থেকে বিতাড়িত হয় এবং কিবতীরা ইসরাঈলীদের চরম নির্যাতন, অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করতে থাকে। এমনকি এদের পক্ষ থেকে পুনরায় ক্ষমতা দখলের আশংকায় এদের পুত্র সন্তানদের হত্যা করার নির্দেশ জারি হয়। এ বংশের লোক হওয়ার কারণে হযরত মূসার মধ্যে এ আশংকা দেখা দেয়।
খ. হযরত মূসার মুখে জড়তা ছিলো। স্পষ্টভাবে বক্তব্যের বিষয় বুঝাতে পারতেননা।
গ. ফেরাউনি জাতির এক ব্যক্তি তাঁর ঘুষি খেয়ে নিহত হয়। যদিও হত্যার উদ্দেশ্যে তিনি ঘুষি মারেননি। এ মার্ডার কেসে ফেরাউন প্রতিশোধোম্মুখ হয়ে উঠে। আত্মরক্ষার্থে হযরত মূসা মাদায়ানের দিকে চলে যান। এ ঘটনাও তাঁর আশংকার অন্যতম কারণ ছিলো।
জনৈক মিসরীয়কে হত্যার কারণে মূসা আলাইহিস সালাম যখন মাদায়েন অভিমুখে রওয়ানা করলেন এবং মাদায়েনে গিয়ে পৌঁছলেন, তখন দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি ও দানাপানিহীন অবস্থায় কাতর হয়ে পড়ছিলেন, এ অসহায় ও প্রায় অবসাদগ্রস্থ অবস্থায় দু'জন মহিলার পশুকে পানি পান করাতে সাহায্য করে গাছের ছায়ায় বসে পড়লেন আর দয়াময় দাতা প্রতিপালকের দরবারে কাতর কণ্ঠে নিবেদন করলেন:
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَى مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
অর্থ: ওগো প্রতিপালক-পরওয়ারদিগার! তুমি আমার জন্যে যে কল্যাণ ও মেহমানদারীরই ব্যবস্থা করবে, আমি তারই মুখাপেক্ষী। (সূরা ২৮ আল কাসাস : ২৪)
অতপর আল্লাহ্র ইচ্ছায় আলোচ্য মহিলাদের পিতা তাঁকে ডেকে পাঠালেন, তাঁকে আশ্রয় দান করলেন এবং এক কন্যাকে তাঁর সাথে বিয়ে দিলেন। দীর্ঘ কয়েক বছর এখানে অতিবাহিত করার পর ফেরার পথে আল্লাহ্ তায়ালা তাঁকে 'তোয়া' ময়দানে ফেরাউনের নিকট দীনের দাওয়াত নিয়ে যাবার নির্দেশ প্রদান করেন। এ নির্দেশের প্রেক্ষিতে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ্র নিকট প্রথমোক্ত নিবেদন করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ্ তাঁর নির্দেশ বলবত রাখেন এবং বলেন: “ফেরাউনের নিকট যাও, সে বিদ্রোহী হয়েছে।"
এখন একদিকে মূসা আলাইহিস সালামের মধ্যে উপরোক্ত দুর্বলতা সমূহ, অন্যদিকে সে ব্যক্তির নিকটই দীনের দাওয়াত নিয়ে যেতে হবে যে তাঁর খুনের পিয়াসী। সে ব্যক্তির নিকটই আনুগত্যের দাবি করতে হবে, গোটা জাতি যার আনুগত্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এমতাবস্থায় মূসা আলাইহিস সালামের অন্তর ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। পুনরায় তিনি রব্বুল আলামীনের দরবারে নিবেদন করলেন :
رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِى وَيَسِّرْ لِى أَمْرِى وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّنْ لِسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِى وَاجْعَلْ لِى وَزِيرًا مِّنْ أَهْلِي مُرُونَ أَخِي اشْدُدْ بِهِ ازرى وَأَشْرِكْهُ فِي أَمْرِي كَى نُسَبِّحَكَ كَثِيرًا وَنَذْكُرَكَ كَثِيرًا إِنَّكَ كُنْتَ بِنَا بَصِيرًا .
অর্থ: ওগো মালিক, ওগো মওলা! আমার অন্তরে শক্তি-সাহস বাড়িয়ে দাও। এ গুরুদায়িত্ব পালন করা আমার জন্যে সহজ করে দাও। আমার ভাষার জড়তা দূর করে দাও, যেনো ওরা আমার বক্তব্য স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে। আর আমার নিজ পরিবারের মধ্য হতে আমার একজন সহকর্মী নির্দিষ্ট করে দাও। আমার ভাই হারূনের দ্বারা আমার হাত মজবুত করো আর তাকে আমার দায়িত্বে শরীক বানিয়ে দাও, যেনো আমরা খুব বেশি করে তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করতে পারি এবং অধিক মাত্রায় তোমার চর্চা, আলোচনা ও স্মরণ করতে পারি। তুমি তো সব সময়ই আমাদের অবস্থার প্রতি দৃষ্টি রেখেছো। (সূরা ২০ তোয়াহা : ২৫-৩৫)
আসমান ও যমীনের মালিক তাঁর বান্দার অন্তরের আকুতিতে অবশ্যই সাড়া দিয়ে থাকেন। জবাবে তাঁর প্রতিপালক বলেন:
قَالَ قَدْ أُوتِيتَ سُؤلَكَ يَمُوسَى .
অর্থ: মূসা! যা চাইলে তা সবই তোমাকে দেয়া হলো। (সূরা ২০ তোয়াহা : ৩৬)
অতপর দু'ভাই মিসর এসে ক্ষমতাধর ফেরাউন, হামান ও কারুনদের আল্লাহ্র দাসত্ব ও নবীর আনুগত্যের প্রতি আহবান জানালেন। এ আহবানের প্রতিক্রিয়ায় ফেরাউনের গোটা তখতে তাউস থরথর করে কেঁপে উঠলো। সর্ব প্রকারের যুক্তি ও কৌশলে পরাজিত হয়ে শেষ রক্ষার জন্যে ফেরাউন দিশেহারা হয়ে বললো: "যারা ঈমান এনে মূসার দলে শামিল হয়েছে, তাদের সবার পুত্র সন্তানদের হত্যা করো এবং কন্যা সন্তানদের জীবিত রাখো।” সে আরো বাড়াবাড়ি করে বললো "তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও! আমি মূসাকে হত্যা করে ফেলি, সে তার রবকে ডেকে দেখুক। আমার আশংকা হয়, সে তোমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা পাল্টে দেবে অথবা দেশে বিপর্যয় ডেকে আনবে।"৭
খোদাদ্রোহী ফেরাউনের এসব অতিশয় দম্ভোক্তির মুকাবিলায় হযরত মূসা কলীমুল্লাহ যে জবাব দিয়েছিলেন, আল্লাহ্ দীনের মুজাহিদদের জন্যে সে এক শাশ্বত ঘোষণা। ফেরাউনের দম্ভোক্তির জবাবে মূসা বললেন:
إِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُم مِّن كُلِّ مُتَكَبِرِ لَّا يُؤْمِنُ بِيَوْمِ الْحِسَابِ ۞
অর্থ: পরকালের প্রতি ঈমান রাখেনা- এমনসব অহংকারীদের মুকাবিলায় আমি তো আশ্রয় নিয়ে নিয়েছি সেই মহান সত্তার যিনি আমার রব আর তোমাদেরও রব। (সূরা ৪০ আল মু'মিন: ২৭)
অবস্থা যখন সাংঘাতিক উত্তপ্ত হয়ে উঠলো, আল্লাহ্র নির্দেশে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ইসরাঈল সন্তানদের সাথে নিয়ে তখন সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সাইনা উপত্যকার দিকে অগ্রসর হন। দীর্ঘদিন মিসরীয়দের দাসত্বের জীবন যাপন করার পর বনি ইসরাঈল এখন মুক্ত স্বাধীন। কিন্তু মিসরের পৌত্তলিক সমাজের প্রভাব তাদের মন-মানসিকতায় জেঁকে বসেছিল। পথ চলতে চলতে তারা যখন একটি মূর্তিপূজক জাতির নিকট এসে পৌঁছালো, তখনই তারা মূসা আলাইহিস সালামকে বলে বসলো : ‘হে মূসা! আমাদের জন্যেও এমন মা'বুদ বানিয়ে দাও, যেমন এ লোকদের মা'বুদ রয়েছে।’
অতপর হযরত মূসা যখন আল্লাহ্র নির্দেশে ভাই হারুনকে স্থলাভিষিক্ত করে চল্লিশ দিনের জন্যে পাহাড়ে চলে গেলেন, এরি মধ্যে "তাঁর জাতির লোকেরা নিজেদের গয়না ও অলংকার দিয়ে একটি গো-বাছুরের মূর্তি তৈরি করে নিলো।” তারা একটা মা'বুদ বানালো। হযরত মূসা ফিরে এসে তাঁর জাতির উপর দারুণ ক্রোধান্বিত হলেন। ভাই হারূন তাঁর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলে "তিনি তাঁর মাথার চুল ধরে টান দিলেন।" হারূন জবাব দিলেন: হে আমার মায়ের পেটের ভাই, এ লোকগুলো আমাকে পরাভূত করে আমাকে মারতে উদ্যত হয়েছিল। তুমি শত্রুদেরকে আমায় ঠাট্টা করার সুযোগ দিয়োনা, আর আমাকে যালেমদের মধ্যে গণ্য করোনা। এ মুহূর্তে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর মনের ভাব এভাবে প্রকাশ করেন :
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ ۖ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ ۞
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা করে দাও। আর আমাদের তোমার রহমতের মধ্যে দাখিল করো। তুমিই তো সবচে' বড় দয়াবান। (সূরা ৭ আল আরাফ: ১৫১)
এরপর হযরত মূসা আলাইহিস সালাম জাতির সত্তরজন ব্যক্তিকে নিয়ে পুনরায় সাইনা পর্বতে গেলেন বাছুর বানানোর অপরাধ ক্ষমা চাওয়ার উদ্দেশ্যে। তারা যখন উপস্থিত হলেন, তখন একটি ভূ-কম্পন আরম্ভ হলো। এ ভূ-কম্পনকে খোদার কঠিন আযাবের আগমন মনে করে হযরত মূসা কাতর কণ্ঠে তাঁর মনিবের দরবারে আরয করলেন:
رَبِّ لَوْ شِئْتَ أَهْلَكْتَهُمْ مِنْ قَبْلُ وَإِيَّايَ ، أَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ السُّفَهَاءُ مِنَّا ، إِنْ هِيَ إِلَّا فِتْنَتُكَ ، تُضِلُّ بِهَا مَنْ تَشَاءُ وَتَهْدِي مَنْ تَشَاءُ ، أَنْتَ وَلِيُّنَا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ ۞
পরওয়ারদিগার! তুমি ইচ্ছে করলে আরো আগেই এদেরকে এবং আমাকে ধ্বংস করে দিতে পারতে। তুমি কি আমাদের মধ্যকার কয়েকজন নির্বোধের অপরাধের জন্য সবাইকে ধ্বংস করে দেবে? এতো ছিলো তোমার একটা পরীক্ষা। এ পরীক্ষার মাধ্যমে তুমি যাকে ইচ্ছে গোমরাহ করে দাও আর যাকে ইচ্ছে তাকে দান করো হেদায়েত। তুমিইতো আমাদের অভিভাবক। অতএব, আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও। তুমিই তো সর্বোত্তম ক্ষমাশীল। (সূরা ৭ আল আরাফ: ১৫৫)
হযরত মূসার জাতির সম্মুখে যখন মূর্তি পূজার গোলক ধাঁধা ছিন্ন হয়ে গেলো, তখন তারাও আল্লাহ্র দরবারে অপরাধীর বেশে হাযিরা দিলো। তারা অনুশোচনা করলো:
لَئِنْ لَّمْ يَرْحَمْنَا رَبُّنَا وَيَغْفِرْ لَنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ ۞
অর্থ: আমাদের পরওয়ারদিগার! যদি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ ও ক্ষমা প্রদর্শন না করেন আর আমাদের যদি মাফ না করে দেন, তাহলে তো আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো। (সূরা ৭ আল আরাফ: ১৪৯)

টিকাঃ
৭. সূরা ৪০ আল মু'মিন (সূরা গাফির) আয়াত: ২৫-২৬।

📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত শুয়াইব আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত শুয়াইব আলাইহিস সালামের দু'আ


আল্লাহ্ নবী হযরত শুয়াইব মাদায়ীন বাসীদেরকে তাদের দুর্নীতি ও দুষ্কৃতি বন্ধ করার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তিনি তাদের বলেন: তোমরা আল্লাহ্র দাসত্ব করো। ওজন ও পরিমাপের কমবেশি করোনা, লোকদেরকে তাদের দ্রব্যে ক্ষতিগ্রস্ত করোনা। যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করোনা। সহজ সরল পথকে বাঁকা করার কাজে ব্যস্ত হয়োনা। ঈমানদার লোকদেরকে তাদের পথ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করোনা। লোকদের ভীত সন্ত্রস্ত করোনা আর জীবনের প্রতিটি পথে ডাকাত হয়ে বসোনা। ৮
হযরত শুয়াইবের আহবান শুনে কওমের সরদাররা বললো: হে শুয়াইব! আমরা তোমাকে এবং তোমার প্রতি ঈমানদার লোকদেরকে এদেশ থেকে বহিষ্কার করে দেবো। অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মে ফিরিয়ে আনবো। ৯
কওমের এরূপ চরম বিরোধিতা ও হঠকারিতা মুকাবিলায় হযরত শুয়াইবের মুখে উচ্চারিত হলো:
وَمَا أُرِيدُ أَنْ أَخَالِفَكُمْ إِلَى مَا أَنْهُكُمْ عَنْهُ ، إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ ، وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ ، عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
অর্থ: আমি তো তোমাদের ক্ষতি চাইনা, আমি তো চাই কেবল আমার সাধ্য অনুযায়ী তোমাদের সংশোধন ও কল্যাণ করতে। আমার এ মহান উদ্দেশ্যের সাফল্য কেবল আল্লাহর ইচ্ছার উপরই নির্ভরশীল। তাঁরই উপর আমি ভরসা করেছি এবং তাঁরই দিকে আমি ফিরে যাবো। (সূরা ১১ হুদ : ৮৮)
কিন্তু কওমের বিরোধিতা বেড়েই চললো। অবশেষে আল্লাহ্ নবী চরম দু'আ করলেন:
عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا ، رَبَّنَا افْتَحْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ قَوْمِنَا بِالْحَقِّ وَأَنْتَ خَيْرُ الْفَاتِحِينَ .
অর্থ: আমরা আল্লাহ্র উপর তাওয়াককুল করেছি। পরওয়ারদিগার! 'আমাদের ও আমাদের জাতির লোকদের মধ্যে সঠিকভাবে ফায়সালা করে দাও। আর তুমিই তো সর্বোত্তম ফায়সালাকারী। (সূরা ৭ আরাফ: ৮৯)

টিকাঃ
৮. সূরা ৭ আল আ'রাফ: ৮৫-৮৬。
৯. সূরা ৭ আল আ'রাফ: ৮৮。

📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালামের দু'আ


আল্লাহ্ নবী হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম কঠিন রোগে পীড়িত। দীর্ঘদিন থেকে রোগে তিনি সাংঘাতিক কষ্ট ভোগ করে আসছেন। নিদারুণ কষ্ট। আল্লাহ্র দেয়া দুঃখ মুসীবত ও পীড়া অসাধারণ ধৈর্য ও সবরের সাথে সইয়ে যাচ্ছেন তিনি। দীর্ঘ ও চরম ভোগান্তির পর আল্লাহ্র দরবারে তিনি এতোটুকু কেবল আরয করলেন:
اَنِّیْ مَسَّنِیَ الضُّرُّ وَاَنْتَ اَرْحَمُ الرّٰحِمِیْنَ
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমার অসুখ হয়েছে, আর তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া: ৮৩)
কতো মর্মস্পর্শী এ দু'আ! অতি সংক্ষিপ্তভাবে নিজের অসুখের কথা উল্লেখ করার পর শুধু এতোটুকু বলেই থেমে যান যে, "তুমিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান।” অতপর আর কোনো অভিযোগ নেই, নেই কোনো ফরিয়াদ। যেনো এ কথাগুলোর নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য নেই। যেনো নেই কোনো জিনিস পাওয়ার দাবি। মূলত এ ধরনের উচ্চাঙ্গ দোয়ায় যে মূল সুরটি ধ্বনিত হয়ে উঠে, তা হচ্ছে এই যে, যেনো কোনো অপরিসীম ধৈর্যশীল, অল্পে তুষ্ট, ভদ্র ও আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি সুদীর্ঘ অনশনে কাতর হয়ে পড়েছেন। আর তাঁর চাইতে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন সত্তার নিকট শুধু এতোটুকু বলেই থেমে যাচ্ছেন যে, "আমি অভুক্ত, ক্ষধাতুর আর আপনি তো মহান দাতা." ...এরপর আর কিছু তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হতে পারছেনা।
বস্তুত মহান মালিকের দরবারে মুমিন বান্দার দু'আ এরূপ মর্যাদাব্যঞ্জক হওয়াই উচিত। এমন মর্মস্পর্শী দু'আ আল্লাহ্ তায়ালা অবশ্যই কবুল করেন:
فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِنْ ضُرٍ
অর্থ: অতপর আমি তার দু'আ কবুল করলাম এবং তার কষ্ট দূর করে দিলাম। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া: ৮৪)

📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামের দু'আ


হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম। কুরআন মজীদে তাঁকে 'যাননুন' এবং 'সাহিবুল হুত' অর্থাৎ 'মাছওয়ালা' বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। নিজ জাতিকে দীনের পথে আনার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। দীনের দাওয়াত গ্রহণ করা তো দূরের কথা বরং তারা এতো বেশি পরিমাণে আল্লাহ্র নাফরমানি করতে শুরু করলো যে, তাদের উপর আল্লাহ্র আযাব নাযিল হওয়া অবধারিত হয়ে পড়লো। কিন্তু আল্লাহ্র আযাব আসার পূর্বেই হযরত ইউনুস জনপদ ত্যাগ করে অন্যত্র রওয়ানা করলেন। আল্লাহ্র নবী ইউনুস আযাব আসার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত জনগণকে দীনের পথে আনার চেষ্টা না করে আল্লাহ্র অনুমতি ছাড়াই জনপদ ত্যাগ করেছেন। আল্লাহ্ পছন্দ হয়নি এ কাজ। তাই আল্লাহ্র ইচ্ছায় নদী অতিক্রমকালে তাঁকে মাছের পেটে যেতে হলো। একেতো সাগর তলের অন্ধকার। তার উপর মাছের অন্ধকার জঠর। কি করুণ ও দুর্বিষহ অবস্থায় পড়তে হলো নবী ইউনুসকে। নিজের ত্রুটি অত্যন্ত অনুশোচনার সাথে স্বীকার করে মালিকের দরবারে ফরিয়াদ করলেন আল্লাহ্ নবী ইউনুস আলাইহিস সালাম :
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَنَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّلِمِينَ
অর্থ : তুমি ছাড়া নেই কোনো ইলাহ! পবিত্র মহান তোমার সত্তা। আমি অবশ্যই অপরাধী। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া : ৮৭)
আল্লাহ্র মনোনীত পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী হযরত ইউনুসের এ করুণ অনুশোচনা আল্লাহ্ কবুল করেন :
فَاسْتَجَبْنَا لَهُ: وَنَجِّيْنَهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ تُنْجِي الْمُؤْمِنِينَ
অর্থ : অতপর আমি তার দু'আ কবুল করলাম এবং তাকে অন্ধকার থেকে উদ্ধার করলাম। এভাবেই আমি মুমিনদের রক্ষা করি। (সূরা ২১ আল আম্বিয়া : ৮৮)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00