📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দু'আ


আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে ইরাকের উর নগরীতে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের জন্ম। তাঁর পিতা আযর ধর্মীয় পুরোহিত হিসেবে শাসক নমরুদের সভাসদ ছিলেন। পৌত্তলিক ধর্মান্ধতার চরম জাহেলিয়াতের যুগে হযরত ইবরাহীমের জন্ম। সেই চরম জাহেলি সমাজে জন্মগ্রহণ করেও হযরত ইবরাহীম তাঁর সত্য সন্ধানী চিন্তা ও গবেষণার মাধ্যমে আল্লাহ্র পরিচয় লাভ করতে সক্ষম হন।
তিনি ছিলেন আল্লাহ্ তায়ালার খলীল- পরম বন্ধু। তাঁর সুকোমল হৃদয়, আল্লাহ্র প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সীমাহীন প্রেম এবং আল্লাহ্ত্র সন্তোষের খাতিরে তাঁর চরম ত্যাগ ও কুরবানীর কথা আল্লাহ্ তায়ালা কুরআন মজীদে অত্যন্ত প্রশংসার সাথে উল্লেখ করেছেন।
যুবক ইবরাহীম শিরকের সাথে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে তাঁর জাহেল কওমের নিকট শিরকের প্রতিবাদ ও তাওহীদের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। শুরু হলো বিরোধিতা। পিতা তাঁকে পরিত্যাগ করলো। জাতির নেতৃবৃন্দ তাঁকে অগ্নিকুণ্ডে ফেললো। তারা আল্লাহ্র খলীলের বিরুদ্ধে শাস্তি, ষড়যন্ত্র ও নির্যাতনের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে শুরু করলো। আল্লাহ্ নবী ইবরাহীম দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, অবস্থা যতো সংগীনই হোক না কেনো, তিনি তওহীদের আন্দোলন থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও নিবৃত হবেননা। অবস্থার জটিলতা বেড়ে চললো। এ চরম মুহূর্তে আল্লাহ্র খলীল যে দু'আ করেছিলেন তা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী :
رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ .
অর্থ: ওগো আমাদের অভিভাবক! আমরা তোমার উপর তাওয়াক্কুল করলাম, তোমার দিকে প্রত্যাবর্তন করলাম আর তুমিই তো আমাদের গন্তব্যস্থল। (সূরা ৬০ আল মুমতাহানা : ৪)
رَبَّنَا لا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا ، إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাদেরকে কাফিরদের জন্যে পরীক্ষার স্থল করোনা। ওগো মওলা! আমাদের অপরাধগুলো মাফ করে দাও। তুমি অবশ্যই মহাপরাক্রমশালী ও মহাবিচক্ষণ। (সূরা ৬০ আল মুমতাহানা: ৫)
এ সময় তিনি তাঁর মালিকের দরবারে আরো নিবেদন করলেন:
رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَالْحِقْنِي بِالصَّلِحِينَ وَاجْعَلْ لِي لِسَانَ صِدْqٍ فِي الْآخِرِينَ * وَاجْعَلْنِي مِنْ وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ * وَاغْفِرْ لِأَبِي إِنَّهُ كَانَ مِنَ الضَّالِّينَ . وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ . يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে জ্ঞান-বুদ্ধি দান করো এবং নেককার লোকদের সাথে আমার মিলন ঘটিয়ে দিয়ো; পরবর্তী লোকদের মধ্যে আমাকে সত্যিকারের খ্যাতি দান করো আর আমাকে নেয়ামতে ভরা জান্নাতের ওয়ারিসদের অন্তর্ভুক্ত ক'রো। আমার পিতাকে মাফ করে দাও। তিনিতো গুমরাহদের অন্তর্ভুক্ত। আমাকে সেদিন অপমানিত করোনা, যেদিন সব মানুষকে পুনরুত্থিত করা হবে, যেদিন ধন-সম্পদ কোনো কাজে লাগবেনা, কাজে আসবেনা আওলাদ-ফরযন্দ। যেদিন মুক্তি পাবে শুধু ঐ সমস্ত মানুষ, প্রশান্ত হৃদয় নিয়ে হাযির হবে যারা। (সূরা ২৬ আশ্‌শুয়ারা: ৮৩-৮৯)
শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্র ও নির্যাতনের মুখে আল্লাহ্র খলীলকে হিজরত করতে বাধ্য করা হলো। প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগের মুহূর্তে নিজেকে সঁপে দিলেন তিনি একমাত্র ভরসাস্থল রহমানের হাতে। তিনি বললেন:
إِنِّي ذَاهِبٌ إِلَى رَبِّي سَيَهْدِينِ .
অর্থ: আমি আমার পরওয়ারদিগারের দিকে চললাম। তিনিই আমাকে পথ দেখাবেন। (সূরা ৩৭ আস্সাফফাত : ৯৯)
এক স্ত্রী এবং ভাতিজা লূতকে সাথে নিয়ে তিনি রওয়ানা করলেন। হিজরতের সময় নিঃসন্তান ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দয়াময় দাতা আল্লাহ্র নিকট দু'আ করলেন:
ربِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّلِحِينَ
অর্থ: ওগো আমার রব! আমাকে একটি সালেহ পুত্র দান করো। (সূরা ৩৭ আস্সাফফাত : ১০০)
আল্লাহ্ তাবারুক ওয়া তায়ালা স্বীয় খলীলের দু'আ কবুল করলেন। তিনি তাঁকে বৃদ্ধ বয়সে সালেহ পুত্র দান করলেন। তিনি আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন। নিজের জন্যে ও বংশধরদের জন্যে দু'আ করলেন :
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَهَبَ لِى عَلَى الْكِبَرِ اسْمَعِيلَ وَاسْحَقَ ، إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاءِ رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلوةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلُ دُعَاء رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَى وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُوْمُ الْحِسَابُ .
অর্থ: শোকর সেই আল্লাহ্, যিনি এই বার্ধক্যাবস্থায় আমাকে ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। আসলে আমার মনিব অবশ্যই দু'আ শোনেন। পরওয়ারদিগার! আমাকে নামায কায়েমকারী বানাও আর আমার সন্তানদেরকেও। ওগো প্রভু! আমার দু'আ কবুল করো। ওগো দয়াময় অভিভাবক! আমাকে, আমার পিতা মাতা আর ঈমানদার লোকদের সেদিন মাফ করে দিও, যেদিন হিসাব কার্যকর হবে। (সূরা ১৪ ইবরাহীম: ৩৯-৪১)
সন্তানদের নিয়ে আল্লাহ্ খলীল আরবের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীন প্রচার করতে লাগলেন মক্কার দিকেও দীনের আবাদ শুরু করলেন। মক্কার সেই মরু বালুকার বুকে তিনি আল্লাহ্র ঘরের নির্মাণ কাজ আরম্ভ করলেন স্নেহ প্রতীম পুত্র ইসমাঈলকে সাথে নিয়ে। এ মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দেবার প্রাক্কালে পিতা-পুত্র দু'জনে দু'আ করলেন পরওয়ারদিগারের দরবারে:
وَإِذْ يَرْفَعُ ابْرِهِمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَاسْمَعِيلُ ، رَبَّنَا تَقَبَّلُ مِنَّا ، إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ . رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةٌ مُسْلِمَةٌ لكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا : إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ . رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَبَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ ، إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ .
অর্থ: হে পরওয়ারদিগার! আমাদের এ কাজ তুমি কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি সবকিছু শোনো ও সবকিছু জানো। প্রভু! আমাদেরকে তোমার অনুগত বানাও আর আমাদের বংশধরদের মধ্য থেকেও তোমার অনুগত একটি জাতির উত্থান করো। আমাদেরকে ইবাদাতের পন্থা শিখিয়ে দাও আর ক্ষমা করে দাও আমাদের দোষ ত্রুটি। নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল ও অনুগ্রহকারী। পরওয়ারদিগার! এ জাতির মধ্যে থেকে এদের প্রতি একজন রসূল পাঠিয়ো, যিনি তাদের তোমার আয়াত সমূহ পাঠ করে শুনাবেন; কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দিবেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন। প্রভু! নিশ্চয়ই তুমি বড় শক্তিমান ও বিজ্ঞ। (সূরা ২ আল বাকারা : ১২৯-১২৯)
হযরত খলীলুল্লাহর প্রচেষ্টায় মক্কায় গড়ে উঠলো কাবা কেন্দ্রিক একটি ছোট্ট শহর। এ প্রিয় শহর ও শহরবাসীদের জন্যে দু'আ করলেন আল্লাহ্র খলীল:
رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَنْ نَعْبُدَ الْأَمْنَامَ رَبِّ إِنَّهُ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ ، فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رحيم . رَبَّنَا إِنِّي أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلوةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِى إِلَيْهِمُ وارزقهم من الثَّمَرتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ .
অর্থ: প্রভু আমার! এ শহরটাকে শান্তি ও নিরাপত্তার শহর বানিয়ে দাও। আমাকে ও আমার সন্তানদের মূর্তি পূজার পংকিলতা থেকে বাঁচাও। প্রভু! এ মূর্তিগুলো বহুসংখ্যক মানুষকে গোমরাহীতে নিমজ্জিত করেছে। তাই যে আমাকে অনুসরণ করবে সেই আমার লোক। আর যে আমার বিরুদ্ধ পন্থা অনুসরণ করবে তুমি নিশ্চয়ই ক্ষমাশীল ও দয়াবান। পরওয়ারদিগার! আমি পানি ও তরুলতাশূন্য এক মরু প্রান্তরে আমার সন্তানদের একটি অংশকে তোমার মহা সম্মানিত ঘরের নিকট এনে পুনর্বাসিত করলাম। ওগো মওলা! এ কাজ আমি এ জন্যে করেছি যেনো এরা নামায কায়েম করে। অতএব তুমি মানুষের দিলকে এদের প্রতি অনুরক্ত বানিয়ে দাও। আর খাবার জন্যে এদেরকে ফল দান করো। সম্ভবত এরা শোকর গুযার হবে। (সূরা ১৪ ইবরাহীম: ৩৫-৩৭)

📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের দু'আ


আল্লাহ্ নবী হযরত ইয়াকুব। ধৈর্য ও প্রজ্ঞার এক জ্বলন্ত প্রতীক তিনি। বারজন পুত্র তাঁর। এক পক্ষে দু'জন- হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম এবং তাঁর ছোট ভাই বিন ইয়ামিন। অন্যান্য পক্ষের স্ত্রীদের ছিলো দশটি সন্তান। জ্ঞান, বুদ্ধি ও আমল-আখলাকের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের কারণে পিতা ইউসুফকে খুবই ভালোবাসতেন। কিন্তু অন্য দশ ভাইয়ের নিকট এটা ছিলো খুবই অসহনীয়। তারা ইউসুফকে সাংঘাতিকভাবে হিংসা করতে লাগলো। এমনকি তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে একদিন এসে পিতাকে বললো : আব্বাজান আপনার কি হয়েছে? ইউসুফের ব্যাপারে আপনি আমাদের বিশ্বাস করেননা কেনো? অথচ আমরা তো তার ভালোই চাই। আগামীকাল ওকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিন। সে কিছুটা ঘুরে ফিরে নেবে এবং খেলাধূলা করে নিজেকে খুশি করবে। আমরা তার পূর্ণ হেফাযতে নিয়োজিত থাকবো। হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম যদিও তাদের ব্যাপারে আশংকামুক্ত ছিলেননা; তবু তাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞার প্রেক্ষিতে আল্লাহ্র উপর ভরসা করে ইউসুফকে তাদের সাথে দিলেন। তারা ইউসুফকে নিয়ে গেলো এবং মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে এক অন্ধকূপে নিক্ষেপ করলো। সন্ধ্যায় তারা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এসে হযরত ইয়াকুবকে বললো : আব্বাজান! আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করছিলাম আর ইউসুফকে আমাদের জিনিস-পত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম। এরি মধ্যে নেকড়ে এসে তাকে খেয়ে ফেলেছে। আমরা যদিও সত্যি কথা বলছি; কিন্তু আপনি তো আমাদের কথা বিশ্বাস করবেননা। তারা ইউসুফের জামায় মিথ্যা মিথ্যি রক্ত মেখেও এনেছিলো। ৫
এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা শুনে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আঁধার, ধৈর্য ও সহনশীলতার মূর্তপ্রতীক হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এভাবে অতি সংক্ষেপে তাঁর মনের বেদনা প্রকাশ করেছিলেন:
بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنْفُسُكُمْ أَمْرًا ۖ فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ۖ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَىٰ مَا تَصِفُونَ
অর্থ: বরং তোমাদের নফস তোমাদের জন্যে একটা বিরাট কাজকে সহজ বানিয়ে দিয়েছে। ঠিক আছে আমি ধৈর্য ধারণ করলাম। আর অতি উত্তমভাবেই সবর করে থাকবো। তোমরা যা কিছু বলছো, সে বিষয়ে কেবল আল্লাহ্র নিকটই সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। (সূরা ১২ ইউসুফ: ১৮)
আল্লাহ্র নবী হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম কেবলমাত্র আল্লাহ্ তায়ালাকেই যাবতীয় ব্যাপারে আশ্রয় ও ভরসাস্থল হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। আল্লাহ্র ইচ্ছার উপর নিজের সমস্ত ইচ্ছাকে কুরবানি দিয়েছিলেন। আল্লাহ্র যে কোনো হুকুম ও ফায়সালা অকাতরে মেনে নিয়েছিলেন। তাইতো দেখি, যখন দশ পুত্রের সাথে পুত্র বিন ইয়ামিনকেও খাদ্য সামগ্রী পাওয়ার জন্যে মিসরের শাসক মিসর নিয়ে যাবার শর্তারোপ করেছিলেন, তখন প্রজ্ঞাবান হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম বিদায়ের প্রাক্কালে পুত্রদের নসীহত করেছিলেন: হে আমার পুত্রগণ! মিসরের রাজধানীতে তোমরা সকলে একই দ্বারপথে প্রবেশ করবেনা, বরং ভিন্ন ভিন্ন পথে প্রবেশ করবে। এ নসীহতের সাথে আল্লাহ্র অনুগত বান্দাহ হযরত ইয়াকুব পুত্রদের আরো হেদায়াত দিলেন:
وَمَا أُغْنِي عَنْكُم مِّنَ اللَّهِ مِن شَيْءٍ ۖ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۖ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ ۖ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكِّلُونَ
অর্থ: কিন্তু আমি আল্লাহ্র ইচ্ছা থেকে তোমাদের বাঁচাতে পারবোনা। তাঁর হুকুম ছাড়া আর কারো হুকুম চলেনা। তাঁরই উপর আমি ভরসা করছি। আর যে-ই ভরসা করতে চায় তাঁরই উপর করা উচিত। (সূরা ১২ ইউসুফ: ৬৭)
বিন ইয়ামিনকে নিয়ে মিসরে পৌছলে বিশেষ উদ্দেশ্যে হযরত ইউসুফ আ. সুকৌশলে তাঁর সহোদরকে আটক করে রাখলেন। বৈমাত্রীয় ভাইয়েরা ফিরে এসে হযরত ইয়াকুবের নিকট এ দুঃখজনক ঘটনার রিপোর্ট দিলে শোকাভিভূত আল্লাহ্ নবী একইভাবে ধৈর্যধারণ করে বললেন:
بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنْفُسَكُمْ أَمْرًا فَصَبْرٌ جَمِيلٌ .
অর্থ: অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ্ তায়ালা এদের সবাইকে (ইউসুফ ও বিন ইয়ামিনকে) আমার সাথে একত্রিত করে দেবেন। তিনি সব কিছুই জানেন এবং তিনি মহা কৌশলী। (সূরা ১২ ইউসুফ: ৮৩)
হযরত ইয়াকুব পুত্র ইউসুফের নাম নিয়ে কাঁদতে থাকেন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখে সাদা পর্দা পড়ে যায়। ছেলেরা বলে : খোদার শপথ! অবস্থা এরূপ হয়েছে যে, আপনি কেবল ইউসুফের স্মরণেই নিজেকে ক্ষয় করে ফেলবেন অথবা নিজের জীবন ধ্বংস করে ফেলবেন। এ কথার জবাবে আল্লাহ্র প্রতি আত্মোৎসর্গীত প্রাণ হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম বলেন:
إِنَّمَا أَشْكُوا بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ .
অর্থ: আমি আমার সমস্ত দুঃখ-বেদনা ও দুশ্চিন্তার ফরিয়াদ শুধুমাত্র আল্লাহ্র দরবারেই করছি। (সূরা ১২ ইউসুফ: ৮৬)
বস্তুত মুমিনের জন্যে আম্বিয়ায়ে কিরামের জীবন চরিতে রয়েছে সর্বোত্তম পথ নির্দেশ।

টিকাঃ
৫. দেখুন সূরা ১২ ইউসুফ, আয়াত: ৮-১৮।

📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের দু'আ


মিসরে বেগম আযীযের ঘরে হযরত ইউসুফ। উনিশ-বিশ বছরে এক অপরূপ সুদর্শন যুবক তিনি। অপরূপা সুন্দরী বেগম আযীয। ইউসুফের প্রতি অবৈধ আকর্ষণে পাগলপারা হয়ে উঠে বেগম আযীয। কুরআনের ভাষায়: যে মহিলার ঘরে সে অবস্থান করছিলো, সে তাকে আকৃষ্ট করতে চেষ্টা করতে লাগলো। একদা সে মহিলা দরজা বন্ধ করে বললো : 'এসো'। এ চরম ক্রান্তিক অবস্থায় টগবগ যৌবনে ভরা খোদাভীরু ইউসুফের দিল তাঁর মনিবের ভয়ে কেঁপে উঠলো। তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো :
مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ مَا إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّلِمُونَ
অর্থ: আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। আমার মনিব তো আমাকে উত্তম মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। এ ধরনের (যারা এরূপ অশ্লীল কাজে লিপ্ত হয় সেই) যালেমরা কখনো কামিয়াব হতে পারেনা। (সূরা ১২ ইউসুফ: ২৩)
দয়াময় আল্লাহ্ তাঁর সালেহ বান্দাহ ইউসুফকে গায়ে এসে পড়া অশ্লীল এই নির্লজ্জ কাজটি থেকে রক্ষা করলেন। ইউসুফ দরজার দিকে দৌড়ে বেরিয়ে এলেন। বেগমের অবৈধ যৌনজ্বালা তাকে শাঁই শাঁই করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারছে। এর পরের ঘটনা কুরআনের বর্ণনায় শুনুন: শহরের নারী সমাজ পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো: বেগম আযীয তার যুবক ক্রীতদাসের প্রতি চরম আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। প্রেমের জ্বালা তাকে উম্মাদ করে তুলেছে, আমাদের মতে সে ভুল পথে অগ্রসর হয়েছে। সে (বেগম আযীয) যখন তাদের এসব নিন্দা সূচক কথাবার্তা শুনতে পেলো, তখন তাদের ডেকে পাঠালো এবং তাদের জন্যে হেলান দিয়ে বসার ব্যবস্থা করলো। আর প্রত্যেকের সামনে রেখে দিলো একখানা করে ছুরি। (পরে ঠিক তখন, যখন মহিলারা ফল কেটে খাচ্ছিলো) সে ইশারায় ইউসুফকে তাদের সামনে বেরিয়ে আসতে নির্দেশ দিলো। তারা যখন ইউসুফকে দেখলো, বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হলো কেটে বসলো নিজেদের হাত আর উচ্চস্বরে বলে উঠলো: "আল্লাহ্র কসম! এ যুবক তো মানুষ নয়, এতো যেনো এক সম্মানিত ফেরেশতা।" আযীযের স্ত্রী বললো: "দেখলে তো তোমরা! এ সেই যুবক যার ব্যাপারে তোমরা আমাকে ভর্ৎসনা করছিলে। আমি অবশ্যই তাকে ভুলাতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে আত্মরক্ষা করে নিষ্পাপ থেকেছে। সে যদি আমার কথা না শুনে, তাহলে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হবে; চরম লাঞ্ছিত ও অপদস্ত করা হবে।"৬
তৎকালীন বিশ্বের সভ্যতম দেশের উপরতলার মহিলাদের এ হলো চিত্র। এমতাবস্থায় যুবক ইউসুফের নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা করা কি সহজ ব্যাপার ছিলো? যেখানে তিনি উনিশ-কুড়ি বছরের এক সুদর্শন যুবক। মরু জীবনের অবদানে এক অপূর্ব স্বাস্থ্যমণ্ডিত দেহ। টগবগে ভরা যৌবন। দারিদ্র্য, পরদেশ, নিজ আত্মীয়-স্বজন ও ঘর-বাড়ি থেকে বহিষ্কৃত জীবন, জবরদস্তি দাসত্ব প্রভৃতি কঠিন অবস্থা অতিক্রম করছিলেন। এমতাবস্থায় কপাল তাঁকে তৎকালীন দুনিয়ার সর্বাপেক্ষা অধিক সভ্যতা- সংস্কৃতি সম্পন্ন রাজ্যের রাজধানীতে এক বড় ধনী ও পদস্থ ব্যক্তির ঘরে এনে পৌছে দিলো। এখানে সে ঘরের স্ত্রী লোকটিই তাঁর প্রতি প্রথমে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে যার সাথে ছিলো তার দিন-রাতের সাক্ষাতের ব্যাপার। পরে তার রূপ-সৌন্দর্যের কথা গোটা শহরের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। শহরের বড় লোকদের বেগমরা তাঁর রূপ দেখে আত্মহারা হয়ে পড়ে। এ সময় একদিকে তিনি, আর একদিকে অসংখ্য ছলনাময়ী জালের আকর্ষণ তাকে সব সময়ই জড়িয়ে ধরতে ব্যতিব্যস্ত। ... রাতদিন চব্বিশ ঘন্টাই তিনি এরূপ বিপদের ঝুঁকি নিয়ে কাটাচ্ছিলেন। এক মুহূর্তের জন্যেও তাঁর ইচ্ছা বাসনায় এক বিন্দু শিথিলতা দেখা দিলেই অপেক্ষমান শত-সহস্র দরজার যে কোনোটিতে প্রবেশ করতে পারেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ্র মনোনীত বান্দাহ ইউসুফের অন্তরে একবিন্দু লোভ ও অহংকার আসা তো দূরের কথা, বরং মানবীয় পদস্খলনের ভয়ে কম্পমান আল্লাহ্র এই বান্দাহ কেবল আল্লাহ্র কাছেই আশ্রয় চাইতেন। তাইতো বেগম আযীয যখন দম্ভোক্তি করে বললো: 'সে যদি আমার কথা না শুনে তাহলে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হবে এবং চরম লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হবে।' তখন তিনি আল্লাহ্র দরবারে বিনয়াবনত হয়ে আরয করলেন:
رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَى مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ ، وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُن مِّنَ الْجَهلِينَ ۞
অর্থ: ওগো আমার অভিভাবক। ওগো মওলা! কারাগারে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে আমি অধিক পছন্দ করি সে কাজ থেকে, এরা যা আমার নিকট পেতে চায়। মওলা! এদের অপকৌশল তুমি যদি আমার হতে দূরে ফিরিয়ে না দাও, তাহলে আমি এদের ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে পড়বো এবং জাহেলদের মধ্যে গণ্য হয়ে যাবো। (সূরা ১২ ইউসুফ: ৩৩)
এ ছিলো দুনিয়ার সুখ-সম্ভোগ, আয়েশ ও চাকচিক্য এবং লোভনীয় নারীদের মুকাবিলায় এক চরম দুর্দশাগ্রস্ত আল্লাহ প্রেমিক যুবকের ফরিয়াদ। মানুষের দয়াময় প্রতিপালক এমন ফরিয়াদ কবুল না করে থাকেননা:
فَاسْتَجَابَ لَهُ رَبُّهُ فَصَرَفَ عَنْهُ كَيْدَهُنَّ طَ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ۞
অর্থ: অতপর তাঁর মনিব তাঁর এ ফরিয়াদ কবুল করলেন; সে নারীদের কূটকৌশল তার থেকে রহিত করলেন। নিশ্চয়ই তিনি ফরিয়াদ শ্রবণকারী এবং নিজ বান্দার অবস্থা অবগত। (সূরা ১২ ইউসুফ: ৩৪)
ভাইদের দ্বারা নির্যাতিত, কৃতদাস হিসেবে বিক্রিত এবং আল্লাহর মনোনীত ইউসুফ এমনি করে সমস্ত কামনা বাসনা লোভ ও লালসার উপর বিজয়ী হন। বিনা অপরাধে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। নির্দোষ ও নিগূঢ় জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে কারাগার থেকে অনেক বছর পর মুক্তিলাভ করেন এবং শেষ পর্যন্ত মিসরের সিংহাসনে ক্ষমতার অধিকারী হন। অতপর অপরাধী ভাইয়েরা মুখোমুখি ধরা পড়ে। তারা নিজেদের অপরাধের স্বীকৃতি দেয়। তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন:
لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ ، يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ ، وَهُوَ اَرْحَمُ الرَّحِمِينَ ۞
অর্থ: যাও, আজ আর তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ্ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি সব দয়াবানদের চাইতে অধিক দয়াবান। (সূরা ১২ ইউসুফ: ৯২)
অতপর তিনি পিতা-মাতা ও ভাইদের মিসরে নিয়ে আসেন। এমনি করে তিনি তৎকালীন দুনিয়ার সর্বোচ্চ শাসন ক্ষমতার শরীকদার হয়ে সর্বোত্তম প্রতিষ্ঠা লাভ করার পরও তাঁর অন্তরে কোনো প্রকার বড়াই ও অহংকার স্থান তো লাভ করেইনি, বরং এগুলোকে আল্লাহ্র প্রদত্ত পুরস্কার ও নেয়ামত ভেবে অবনত মস্তকে তাঁর শোকরিয়া জ্ঞাপন করেন। আল্লাহকে নিজের অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করেন। মুসলিমের মৃত্যু কামনা করেন আর আল্লাহ্ নেক্কার বান্দাদের সাথে মিলিত হবার তৌফিক কামনা করেন:
رَبِّ مَنْ أَتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ ۚ فَاطِرَ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ ۖ أَنتَ وَلِيِّ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَالْحِقْنِي بِالصَّلِحِينَ ۞
অর্থ: পরওয়ারদিগার! তুমিই আমাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দান করেছো, সব বিষয়ের সূক্ষ্মতত্ত্ব অনুধাবনের শিক্ষা দান করেছো। ওহে আসমান ও যমীনের স্রষ্টা! তুমিই আমার দুনিয়া ও আখিরাতের অভিভাবক। ইসলামের আদর্শের উপর আমার মৃত্যু দিও আর পরিণামে আমাকে নেক্কার লোকদের সাথে মিলিত ক'রো। (সূরা ১২ ইউসুফ: ১০১)

টিকাঃ
৬. দেখুন সূরা ১২ ইউসুফ: ৩০-৩৬।

📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত মূসা আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত মূসা আলাইহিস সালামের দু'আ


পবিত্র তোয়া ময়দানে আল্লাহ্ তায়ালা মিসরের যালেম শাসক খোদাদ্রোহী ফেরাউনের নিকট দীনের দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার জন্য হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে নির্দেশ দেন। এ বিরাট দায়িত্বের কথা চিন্তা করে তাঁর দিল কেঁপে উঠলো, চোখের সামনে ভেসে উঠলো এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। কাতর কণ্ঠে নিজের সমস্ত দুর্বলতা তুলে ধরলেন হযরত মুসা বিশ্বজাহানের মালিকের দরবারে:
رَبِّ إِنِّي أَخَافُ أَن يُكَذِّبُونِ وَيَضِيقُ صَدْرِى وَلَا يَنْطَلِقُ لِسَانِي فَأَرْسِلْ إلى مرُونَ * وَلَهُمْ عَلَى ذَنْب فَأَخَافُ أَن يَقْتُلُونَ .
অর্থ: ওগো মওলা! আমার আশংকা হয় তারা আমাকে মিথ্যা মনে করে অমান্য করবে। আমার মন ছোট হয়ে আসছে আর আমার রসনা সঞ্চালিত হয়না। আপনি হারুনকেও রিসালাত দান করুন। একটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগও আমার বিরুদ্ধে তাদের রয়েছে। তাই আমার ভয় হয় তারা আমাকে হত্যা করবে। (সূরা ২৬ আশশোয়ারা: ১২-১৪)
সে সময়কার মিসরের ক্ষমতাসীন শাসকবর্গ ও হযরত মূসা আলাইহিস সালামের জাতি ক্ষমতাচ্যুত বনি ইসরাইলের ইতিহাস এবং হযরত মূসার প্রতিপালিত হওয়ার কাহিনী যাদের জানা আছে, তারা নিশ্চয়ই মূসা আলাইহিস সালামের উপর অর্পিত এ গুরুদায়িত্ব পালনের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারছেন। এখানে অবস্থার সংক্ষিপ্ত পটভূমি আলোচিত হলো:
ক. হযরত মূসার জাতি বনী ইসরাঈল মূলত মিসরীয় নয়। হযরত ইয়াকুবের পুত্র ইউসুফ আলাইহিস সালাম কর্তৃক মিসরে ক্ষমতা লাভের মাধ্যমে এরা মিসরে বসবাস শুরু করে। হযরত ইউসুফের সময় মিসরে রাজত্ব করতো রাখাল রাজারা। হযরত ইউসুফ এ বংশেরই এক রাজার অধীনে মন্ত্রীত্ব করেন। রাজা হযরত ইউসুফকে রাষ্ট্র চালাবার স্বাধীন ক্ষমতা প্রদান করেন। এ সময় হযরত ইউসুফ বনি ইসরাঈলকে প্রশাসনে ব্যাপক নিয়োগ দান করেন। হযরত ইউসুফের ইন্তেকালের পর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে যখন রাখাল রাজারা ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং মিসরীয় কিবতীরা ক্ষমতা দখল করে, তখন বনি ইসরাঈলও রাষ্ট্রীয় পদসমূহ থেকে বিতাড়িত হয় এবং কিবতীরা ইসরাঈলীদের চরম নির্যাতন, অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করতে থাকে। এমনকি এদের পক্ষ থেকে পুনরায় ক্ষমতা দখলের আশংকায় এদের পুত্র সন্তানদের হত্যা করার নির্দেশ জারি হয়। এ বংশের লোক হওয়ার কারণে হযরত মূসার মধ্যে এ আশংকা দেখা দেয়।
খ. হযরত মূসার মুখে জড়তা ছিলো। স্পষ্টভাবে বক্তব্যের বিষয় বুঝাতে পারতেননা।
গ. ফেরাউনি জাতির এক ব্যক্তি তাঁর ঘুষি খেয়ে নিহত হয়। যদিও হত্যার উদ্দেশ্যে তিনি ঘুষি মারেননি। এ মার্ডার কেসে ফেরাউন প্রতিশোধোম্মুখ হয়ে উঠে। আত্মরক্ষার্থে হযরত মূসা মাদায়ানের দিকে চলে যান। এ ঘটনাও তাঁর আশংকার অন্যতম কারণ ছিলো।
জনৈক মিসরীয়কে হত্যার কারণে মূসা আলাইহিস সালাম যখন মাদায়েন অভিমুখে রওয়ানা করলেন এবং মাদায়েনে গিয়ে পৌঁছলেন, তখন দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি ও দানাপানিহীন অবস্থায় কাতর হয়ে পড়ছিলেন, এ অসহায় ও প্রায় অবসাদগ্রস্থ অবস্থায় দু'জন মহিলার পশুকে পানি পান করাতে সাহায্য করে গাছের ছায়ায় বসে পড়লেন আর দয়াময় দাতা প্রতিপালকের দরবারে কাতর কণ্ঠে নিবেদন করলেন:
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَى مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
অর্থ: ওগো প্রতিপালক-পরওয়ারদিগার! তুমি আমার জন্যে যে কল্যাণ ও মেহমানদারীরই ব্যবস্থা করবে, আমি তারই মুখাপেক্ষী। (সূরা ২৮ আল কাসাস : ২৪)
অতপর আল্লাহ্র ইচ্ছায় আলোচ্য মহিলাদের পিতা তাঁকে ডেকে পাঠালেন, তাঁকে আশ্রয় দান করলেন এবং এক কন্যাকে তাঁর সাথে বিয়ে দিলেন। দীর্ঘ কয়েক বছর এখানে অতিবাহিত করার পর ফেরার পথে আল্লাহ্ তায়ালা তাঁকে 'তোয়া' ময়দানে ফেরাউনের নিকট দীনের দাওয়াত নিয়ে যাবার নির্দেশ প্রদান করেন। এ নির্দেশের প্রেক্ষিতে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ্র নিকট প্রথমোক্ত নিবেদন করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ্ তাঁর নির্দেশ বলবত রাখেন এবং বলেন: “ফেরাউনের নিকট যাও, সে বিদ্রোহী হয়েছে।"
এখন একদিকে মূসা আলাইহিস সালামের মধ্যে উপরোক্ত দুর্বলতা সমূহ, অন্যদিকে সে ব্যক্তির নিকটই দীনের দাওয়াত নিয়ে যেতে হবে যে তাঁর খুনের পিয়াসী। সে ব্যক্তির নিকটই আনুগত্যের দাবি করতে হবে, গোটা জাতি যার আনুগত্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এমতাবস্থায় মূসা আলাইহিস সালামের অন্তর ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। পুনরায় তিনি রব্বুল আলামীনের দরবারে নিবেদন করলেন :
رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِى وَيَسِّرْ لِى أَمْرِى وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّنْ لِسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِى وَاجْعَلْ لِى وَزِيرًا مِّنْ أَهْلِي مُرُونَ أَخِي اشْدُدْ بِهِ ازرى وَأَشْرِكْهُ فِي أَمْرِي كَى نُسَبِّحَكَ كَثِيرًا وَنَذْكُرَكَ كَثِيرًا إِنَّكَ كُنْتَ بِنَا بَصِيرًا .
অর্থ: ওগো মালিক, ওগো মওলা! আমার অন্তরে শক্তি-সাহস বাড়িয়ে দাও। এ গুরুদায়িত্ব পালন করা আমার জন্যে সহজ করে দাও। আমার ভাষার জড়তা দূর করে দাও, যেনো ওরা আমার বক্তব্য স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে। আর আমার নিজ পরিবারের মধ্য হতে আমার একজন সহকর্মী নির্দিষ্ট করে দাও। আমার ভাই হারূনের দ্বারা আমার হাত মজবুত করো আর তাকে আমার দায়িত্বে শরীক বানিয়ে দাও, যেনো আমরা খুব বেশি করে তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করতে পারি এবং অধিক মাত্রায় তোমার চর্চা, আলোচনা ও স্মরণ করতে পারি। তুমি তো সব সময়ই আমাদের অবস্থার প্রতি দৃষ্টি রেখেছো। (সূরা ২০ তোয়াহা : ২৫-৩৫)
আসমান ও যমীনের মালিক তাঁর বান্দার অন্তরের আকুতিতে অবশ্যই সাড়া দিয়ে থাকেন। জবাবে তাঁর প্রতিপালক বলেন:
قَالَ قَدْ أُوتِيتَ سُؤلَكَ يَمُوسَى .
অর্থ: মূসা! যা চাইলে তা সবই তোমাকে দেয়া হলো। (সূরা ২০ তোয়াহা : ৩৬)
অতপর দু'ভাই মিসর এসে ক্ষমতাধর ফেরাউন, হামান ও কারুনদের আল্লাহ্র দাসত্ব ও নবীর আনুগত্যের প্রতি আহবান জানালেন। এ আহবানের প্রতিক্রিয়ায় ফেরাউনের গোটা তখতে তাউস থরথর করে কেঁপে উঠলো। সর্ব প্রকারের যুক্তি ও কৌশলে পরাজিত হয়ে শেষ রক্ষার জন্যে ফেরাউন দিশেহারা হয়ে বললো: "যারা ঈমান এনে মূসার দলে শামিল হয়েছে, তাদের সবার পুত্র সন্তানদের হত্যা করো এবং কন্যা সন্তানদের জীবিত রাখো।” সে আরো বাড়াবাড়ি করে বললো "তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও! আমি মূসাকে হত্যা করে ফেলি, সে তার রবকে ডেকে দেখুক। আমার আশংকা হয়, সে তোমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা পাল্টে দেবে অথবা দেশে বিপর্যয় ডেকে আনবে।"৭
খোদাদ্রোহী ফেরাউনের এসব অতিশয় দম্ভোক্তির মুকাবিলায় হযরত মূসা কলীমুল্লাহ যে জবাব দিয়েছিলেন, আল্লাহ্ দীনের মুজাহিদদের জন্যে সে এক শাশ্বত ঘোষণা। ফেরাউনের দম্ভোক্তির জবাবে মূসা বললেন:
إِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُم مِّن كُلِّ مُتَكَبِرِ لَّا يُؤْمِنُ بِيَوْمِ الْحِسَابِ ۞
অর্থ: পরকালের প্রতি ঈমান রাখেনা- এমনসব অহংকারীদের মুকাবিলায় আমি তো আশ্রয় নিয়ে নিয়েছি সেই মহান সত্তার যিনি আমার রব আর তোমাদেরও রব। (সূরা ৪০ আল মু'মিন: ২৭)
অবস্থা যখন সাংঘাতিক উত্তপ্ত হয়ে উঠলো, আল্লাহ্র নির্দেশে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ইসরাঈল সন্তানদের সাথে নিয়ে তখন সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সাইনা উপত্যকার দিকে অগ্রসর হন। দীর্ঘদিন মিসরীয়দের দাসত্বের জীবন যাপন করার পর বনি ইসরাঈল এখন মুক্ত স্বাধীন। কিন্তু মিসরের পৌত্তলিক সমাজের প্রভাব তাদের মন-মানসিকতায় জেঁকে বসেছিল। পথ চলতে চলতে তারা যখন একটি মূর্তিপূজক জাতির নিকট এসে পৌঁছালো, তখনই তারা মূসা আলাইহিস সালামকে বলে বসলো : ‘হে মূসা! আমাদের জন্যেও এমন মা'বুদ বানিয়ে দাও, যেমন এ লোকদের মা'বুদ রয়েছে।’
অতপর হযরত মূসা যখন আল্লাহ্র নির্দেশে ভাই হারুনকে স্থলাভিষিক্ত করে চল্লিশ দিনের জন্যে পাহাড়ে চলে গেলেন, এরি মধ্যে "তাঁর জাতির লোকেরা নিজেদের গয়না ও অলংকার দিয়ে একটি গো-বাছুরের মূর্তি তৈরি করে নিলো।” তারা একটা মা'বুদ বানালো। হযরত মূসা ফিরে এসে তাঁর জাতির উপর দারুণ ক্রোধান্বিত হলেন। ভাই হারূন তাঁর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলে "তিনি তাঁর মাথার চুল ধরে টান দিলেন।" হারূন জবাব দিলেন: হে আমার মায়ের পেটের ভাই, এ লোকগুলো আমাকে পরাভূত করে আমাকে মারতে উদ্যত হয়েছিল। তুমি শত্রুদেরকে আমায় ঠাট্টা করার সুযোগ দিয়োনা, আর আমাকে যালেমদের মধ্যে গণ্য করোনা। এ মুহূর্তে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর মনের ভাব এভাবে প্রকাশ করেন :
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ ۖ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ ۞
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা করে দাও। আর আমাদের তোমার রহমতের মধ্যে দাখিল করো। তুমিই তো সবচে' বড় দয়াবান। (সূরা ৭ আল আরাফ: ১৫১)
এরপর হযরত মূসা আলাইহিস সালাম জাতির সত্তরজন ব্যক্তিকে নিয়ে পুনরায় সাইনা পর্বতে গেলেন বাছুর বানানোর অপরাধ ক্ষমা চাওয়ার উদ্দেশ্যে। তারা যখন উপস্থিত হলেন, তখন একটি ভূ-কম্পন আরম্ভ হলো। এ ভূ-কম্পনকে খোদার কঠিন আযাবের আগমন মনে করে হযরত মূসা কাতর কণ্ঠে তাঁর মনিবের দরবারে আরয করলেন:
رَبِّ لَوْ شِئْتَ أَهْلَكْتَهُمْ مِنْ قَبْلُ وَإِيَّايَ ، أَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ السُّفَهَاءُ مِنَّا ، إِنْ هِيَ إِلَّا فِتْنَتُكَ ، تُضِلُّ بِهَا مَنْ تَشَاءُ وَتَهْدِي مَنْ تَشَاءُ ، أَنْتَ وَلِيُّنَا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ ۞
পরওয়ারদিগার! তুমি ইচ্ছে করলে আরো আগেই এদেরকে এবং আমাকে ধ্বংস করে দিতে পারতে। তুমি কি আমাদের মধ্যকার কয়েকজন নির্বোধের অপরাধের জন্য সবাইকে ধ্বংস করে দেবে? এতো ছিলো তোমার একটা পরীক্ষা। এ পরীক্ষার মাধ্যমে তুমি যাকে ইচ্ছে গোমরাহ করে দাও আর যাকে ইচ্ছে তাকে দান করো হেদায়েত। তুমিইতো আমাদের অভিভাবক। অতএব, আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও। তুমিই তো সর্বোত্তম ক্ষমাশীল। (সূরা ৭ আল আরাফ: ১৫৫)
হযরত মূসার জাতির সম্মুখে যখন মূর্তি পূজার গোলক ধাঁধা ছিন্ন হয়ে গেলো, তখন তারাও আল্লাহ্র দরবারে অপরাধীর বেশে হাযিরা দিলো। তারা অনুশোচনা করলো:
لَئِنْ لَّمْ يَرْحَمْنَا رَبُّنَا وَيَغْفِرْ لَنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ ۞
অর্থ: আমাদের পরওয়ারদিগার! যদি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ ও ক্ষমা প্রদর্শন না করেন আর আমাদের যদি মাফ না করে দেন, তাহলে তো আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো। (সূরা ৭ আল আরাফ: ১৪৯)

টিকাঃ
৭. সূরা ৪০ আল মু'মিন (সূরা গাফির) আয়াত: ২৫-২৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00