📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত নূহ আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত নূহ আলাইহিস সালামের দু'আ


আল্লাহ্র নবী হযরত নূহ আলাইহিস সালাম সাড়ে নয়শত বছর যাবত তাঁর কওমকে আল্লাহ্র পথে ডাকেন। কিন্তু তাঁর জাতি তাঁকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করে। অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহ্র পথে আনার জন্যে তাঁর যাবতীয় প্রচেষ্টা ও হিকমাত প্রয়োগ করেছেন। তাঁর দীর্ঘ দাওয়াতী আন্দোলনের চিত্র কুরআন মজীদ এভাবে রূপায়িত করেছে: আমরা নূহকে তার কওমের প্রতি প্রেরণ করেছি এ নির্দেশ দিয়ে যে, তুমি তোমার কওমকে পীড়াদায়ক আযাব আসার আগেই সাবধান ও সতর্ক করে দাও।
সে তাদের সম্বোধন করে বললো: হে আমার কওম! আমি তোমাদের জন্যে স্পষ্ট সাবধানকারী (নবী)। তোমরা আল্লাহ্ দাসত্ব কবুল করো, তাঁকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। তাহলে তিনি তোমাদের গুনাহ-খাতা মাফ করবেন এবং একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত তোমাদের বাঁচিয়ে রাখবেন। মূলত, আল্লাহ্র নির্ধারিত সময় যখন আসে, তখন কেউ তা প্রতিরোধ করতে পারেনা। হায়! তোমরা যদি জানতে! নূহ তার প্রভূকে ডেকে নিবেদন করলো: প্রভু আমার! আমি আমার কওমকে দিনরাত ডেকেছি। কিন্তু আমার ডাক তাদের এড়িয়ে চলার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
যখনই তাদেরকে তোমার ক্ষমার প্রতি ডেকেছি, তারা তাদের কানে আংগুল ঠেসে দিয়েছে। কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিয়েছে। তারা তাদের আচরণে অনমনীয়তা প্রদর্শন করেছে আর তারা অহংকার করেছে মাত্রাতিরিক্ত। পরে তাদের আমি উচ্চস্বরে ডেকেছি। প্রকাশ্যভাবে তাদের নিকট আমি দীনের দাওয়াত পৌঁছিয়েছি। গোপনে গোপনেও তাদের বুঝিয়েছি। অতপর আমি বলেছি তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা চাও। নিঃসন্দেহে তিনি বড়ই ক্ষমাশীল নূহ বললো: পরওয়ারদিগার! এরা আমার দাওয়াত প্রত্যাখান করেছে এবং ঐসব সমাজপতিদের অনুসরণ করছে, যাদের সন্তান ও সম্পদ তাদেরকে আরো ব্যর্থকাম করেছে। এ লোকেরা সাংঘাতিক ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে রেখেছে। তারা বলে: নূহের কথায় তোমরা কোনো অবস্থাতেই তোমাদের দেবতাদের ত্যাগ করতে পারবেনা- 'অদ্দ' 'সূয়া' 'ইয়াগুস' 'ইয়াউক' ও 'নসরকে' ত্যাগ করতে পারবেনা। ২
মোটকথা তারা হযরত নুহ আলাইহিস সালামকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করে তাঁকে প্রত্যাখান করলো এবং তাঁর বিরুদ্ধে চরম ও সাংঘাতিক ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপ শুরু করলো। এ জটিল পরিস্থিতির মুকাবেলায় আল্লাহ্ পরম ধৈর্যশীল বান্দাহ হযরত নূহ আলাইহিস সালাম তাঁর পরওয়ারদিগারের নিকট নিবেদন করলেন:
رَبِّ انْصُرْنِي بِمَا كَذَّبُونِ
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে সাহায্য করো। এরা আমার প্রতি মিথ্যার অভিযোগ আরোপ করে আমাকে প্রত্যাখান করেছে। (সূরা ২৩ আল মুমিনুন: ২৬)
এদের ষড়যন্ত্র, অপবাদ, বিরোধিতা ও প্রত্যাখানের মুকাবিলায় হযরত নূহ আলাইহিস সালাম আল্লাহ্র নিকট আরো দু'আ করলেন:
أَنِّى مَغْلُوبٌ فَانْتَصِرْ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমি পরাভূত ও বিজিত হয়েছি। এখন তুমি আমাকে সাহায্য করো, এদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করো। (সূরা ৫৪ আল ক্বামার: ১০)
তাঁর জাতির হিদায়াতের আর কোনোই সম্ভাবনা না থাকায়, তাদের চরম হঠকারিতার মুকাবিলায় আল্লাহ্র নবী তাদের প্রতি বদ দোয়া করলেন:
وَقَالَ نُوحٌ رَبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَفِرِينَ دَيَّارًا إِنَّكَ إِنْ تَذَرْهُمْ يُضِلُّوا عِبَادَكَ وَلَا يَلِدُوا إِلَّا فَاجِرًا كَفَّارًا .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! এ কাফেরদের একজনকেও ধরাপৃষ্ঠে ছেড়ে দিওনা। তুমি যদি এদের ছেড়ে দাও তাহলে এরা তোমার বান্দাদের গুমরাহ করে দেবে। আর এরা (বেঁচে থাকলে) এদের ঔরসজাত সন্তানগুলোও কট্টর কাফের ও দুরাচারী হয়েই জন্ম নেবে। (সূরা ৭১ নূহ: ২৬-২৭)
কাফেরদের ধ্বংসের সাথে সাথে ঈমানদার লোকেরাও যেনো ধ্বংস হয়ে না যায় এবং আল্লাহ্ যেনো তাদের ক্ষমা করে দেন, এ মুহূর্তে আল্লাহ্র নবী সে আরযও করলেন:
رَبِّ اغْفِرْلِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِي مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُؤْمِنَتِ، وَلَا تَزِدِ الظَّلِمِيْنَ إِلَّا تَبَارًا
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং মুমিন হয়ে আমার ঘরে যারা প্রবেশ করবে এমন সব লোককে এবং মুমিন পুরুষ ও মহিলাদেরকে ক্ষমা করে দাও। আর যালেমদের জন্যে ধ্বংস ছাড়া অন্য কিছুই বৃদ্ধি করোনা। (সূরা ৭১ নূহ: ২৮)
নূহ আলাইহিস সালামের জাতির ধ্বংসের সময় উপনীত হলো। আল্লাহ্ তাঁর নবী নূহকে জাহাজ তৈরি করতে নির্দেশ দিলেন। জাহাজ তৈরি শেষ হলো। চুলা উথলে যমীন থেকে পানি উৎসারিত হতে শুরু করলো। আল্লাহ্ হযরত নূহকে নির্দেশ দিলেন: প্রত্যেক প্রকারের জন্তু-জানোয়ারের এক এক জোড়া জাহাজে তুলে নাও। তোমার পরিবার পরিজনকেও এতে উঠাও। তবে তাদেরকে নয়, আগেই যাদেরকে চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে। আর ঈমানদারদের এতে উঠিয়ে নাও। আল্লাহ্র নির্দেশানুযায়ী আল্লাহ্র নবী উল্লিখিত সকলকে ডেকে বললেন:
وَقَالَ ارْكَبُوا فِيهَا بِسْمِ اللهِ مَجْرهَا وَمُرْسَهَا ، إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ .
অর্থ: আল্লাহ্ নামেই এর গতি আর আল্লাহ্র নামেই এর স্থিতি। নিশ্চয়ই আমার প্রভু বড়ই ক্ষমাশীল ও করুণাময়। (সূরা ১১ হুদ: ৪১)
অতপর জাহাজে আরোহণের মাধ্যমে কলুষিত জনপদ থেকে মুক্তি প্রাপ্তির শুকরিয়া কিভাবে আদায় করতে হবে, তাও আল্লাহ্ তাঁকে শিখিয়ে দিলেন। বললেন, তুমি ও তোমার সাথিরা যখন জাহাজে আরোহণ করবে তখন বলবে:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي نَعْنَا مِنَ الْقَوْمِ الظَّلِمِينَ .
অর্থ: শোকর সেই আল্লাহ্, যিনি যালেমদের হাত থেকে আমাদের মুক্তি দিয়েছেন। (সূরা ২৩ আল মুমিনুন: ২৮)
জাহাজে আরোহণ করে আল্লাহ্র নিকট কি দু'আ করতে হবে, আল্লাহ্ তায়ালা তাও শিখিয়ে দিলেন তাঁর প্রিয় নবী নূহ আলাইহিস সালামকে। তিনি শিখিয়ে দিলেন: হে নূহ! বলো:
رَبِّ اَنْزِلْنِي مُنْزَلاً مُبْرَكًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْمُنْزِلِينَ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! বরকতপূর্ণ স্থানে আমাদের অবতরণ করাও। আর তুমিই তো সর্বোত্তমভাবে অবতরণ করাও। (সূরা ২৩ আল মুমিনুন: ২৯)
নির্দেশিত সকলেই জাহাজে উঠার পর ঢেউ-এর পর ঢেউ এসে যমীন ডুবে যেতে লাগলো। হযরত নূহ আলাইহিস সালামের পুত্র কাফের। পুত্রের মর্মান্তিক ধ্বংসের কথা চিন্তা করে করুণা হলো পিতার। তিনি ছেলেকে ডেকে বললেন: আমাদের সাথে এ জাহাজে আরোহণ কর। কাফেরদের সাথে থাকিসনে। কাফের ছেলে বললো: পাহাড়ে আরোহণ করে আমি পানি থেকে বেঁচে যাবো। বলতে বলতে একটা প্রচণ্ড ঢেউ এসে উভয়ের মাঝে আড়াল সৃষ্টি করে দিলো। পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেলো ছেলে। নূহ চিৎকার করে তাঁর প্রভুকে ডাকলেন: প্রভু! আমার পুত্রতো আমার পরিবারেরই একজন। আর তোমার ওয়াদাতো সত্য। তুমি সব বিচারক অপেক্ষা বড় বিচারক। প্রভু বললেন: হে নূহ! সে তোমার পরিবারের মধ্যে শামিল নয়। সেতো এক অসৎ কর্ম। কাজেই যে ব্যাপার তোমার অজানা, সে ব্যাপারে আমাকে নিবেদন করোনা। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি: জাহেলদের মতো আবদার আবেদন করোনা। ৪
একদিকে পুত্রের জন্যে দরদ। অন্যদিকে কাফের পুত্রের জন্যে নিবেদন করার নিষেধাজ্ঞা। অথচ হযরত নূহ পুত্রের মুক্তির জন্যে নিবেদন করে ফেলেছেন। সঙ্গে সঙ্গে এ ভুলের জন্যে আল্লাহ্ মুখলিস বান্দাহ নূহ বিনয়াবনত হয়ে পানাহ চাইলেন তাঁর রবের দরবারে:
رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْتَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ وَإِلَّا تَغْفِرُ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُنْ مِنَ الْخَاسِرِينَ .
অর্থ: প্রভু! যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে তোমার কাছে আবদার করা থেকে আমি পানাহ্ চাই। এখন তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না করো এবং আমার প্রতি রহম না করো তবে তো আমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবো। (সূরা ১১ হুদ : আয়াত ৪৭)

টিকাঃ
২. দেখুন সূরা নূহ: আয়াত ১-২৩
৩. দেখুন সূরা ১১ হুদ: আয়াত ৪০।
৪. সূরা হুদ: ৪২-৪৬

📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দু'আ


আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে ইরাকের উর নগরীতে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের জন্ম। তাঁর পিতা আযর ধর্মীয় পুরোহিত হিসেবে শাসক নমরুদের সভাসদ ছিলেন। পৌত্তলিক ধর্মান্ধতার চরম জাহেলিয়াতের যুগে হযরত ইবরাহীমের জন্ম। সেই চরম জাহেলি সমাজে জন্মগ্রহণ করেও হযরত ইবরাহীম তাঁর সত্য সন্ধানী চিন্তা ও গবেষণার মাধ্যমে আল্লাহ্র পরিচয় লাভ করতে সক্ষম হন।
তিনি ছিলেন আল্লাহ্ তায়ালার খলীল- পরম বন্ধু। তাঁর সুকোমল হৃদয়, আল্লাহ্র প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সীমাহীন প্রেম এবং আল্লাহ্ত্র সন্তোষের খাতিরে তাঁর চরম ত্যাগ ও কুরবানীর কথা আল্লাহ্ তায়ালা কুরআন মজীদে অত্যন্ত প্রশংসার সাথে উল্লেখ করেছেন।
যুবক ইবরাহীম শিরকের সাথে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে তাঁর জাহেল কওমের নিকট শিরকের প্রতিবাদ ও তাওহীদের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। শুরু হলো বিরোধিতা। পিতা তাঁকে পরিত্যাগ করলো। জাতির নেতৃবৃন্দ তাঁকে অগ্নিকুণ্ডে ফেললো। তারা আল্লাহ্র খলীলের বিরুদ্ধে শাস্তি, ষড়যন্ত্র ও নির্যাতনের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে শুরু করলো। আল্লাহ্ নবী ইবরাহীম দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, অবস্থা যতো সংগীনই হোক না কেনো, তিনি তওহীদের আন্দোলন থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও নিবৃত হবেননা। অবস্থার জটিলতা বেড়ে চললো। এ চরম মুহূর্তে আল্লাহ্র খলীল যে দু'আ করেছিলেন তা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী :
رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ .
অর্থ: ওগো আমাদের অভিভাবক! আমরা তোমার উপর তাওয়াক্কুল করলাম, তোমার দিকে প্রত্যাবর্তন করলাম আর তুমিই তো আমাদের গন্তব্যস্থল। (সূরা ৬০ আল মুমতাহানা : ৪)
رَبَّنَا لا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا ، إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাদেরকে কাফিরদের জন্যে পরীক্ষার স্থল করোনা। ওগো মওলা! আমাদের অপরাধগুলো মাফ করে দাও। তুমি অবশ্যই মহাপরাক্রমশালী ও মহাবিচক্ষণ। (সূরা ৬০ আল মুমতাহানা: ৫)
এ সময় তিনি তাঁর মালিকের দরবারে আরো নিবেদন করলেন:
رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَالْحِقْنِي بِالصَّلِحِينَ وَاجْعَلْ لِي لِسَانَ صِدْqٍ فِي الْآخِرِينَ * وَاجْعَلْنِي مِنْ وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ * وَاغْفِرْ لِأَبِي إِنَّهُ كَانَ مِنَ الضَّالِّينَ . وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ . يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে জ্ঞান-বুদ্ধি দান করো এবং নেককার লোকদের সাথে আমার মিলন ঘটিয়ে দিয়ো; পরবর্তী লোকদের মধ্যে আমাকে সত্যিকারের খ্যাতি দান করো আর আমাকে নেয়ামতে ভরা জান্নাতের ওয়ারিসদের অন্তর্ভুক্ত ক'রো। আমার পিতাকে মাফ করে দাও। তিনিতো গুমরাহদের অন্তর্ভুক্ত। আমাকে সেদিন অপমানিত করোনা, যেদিন সব মানুষকে পুনরুত্থিত করা হবে, যেদিন ধন-সম্পদ কোনো কাজে লাগবেনা, কাজে আসবেনা আওলাদ-ফরযন্দ। যেদিন মুক্তি পাবে শুধু ঐ সমস্ত মানুষ, প্রশান্ত হৃদয় নিয়ে হাযির হবে যারা। (সূরা ২৬ আশ্‌শুয়ারা: ৮৩-৮৯)
শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্র ও নির্যাতনের মুখে আল্লাহ্র খলীলকে হিজরত করতে বাধ্য করা হলো। প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগের মুহূর্তে নিজেকে সঁপে দিলেন তিনি একমাত্র ভরসাস্থল রহমানের হাতে। তিনি বললেন:
إِنِّي ذَاهِبٌ إِلَى رَبِّي سَيَهْدِينِ .
অর্থ: আমি আমার পরওয়ারদিগারের দিকে চললাম। তিনিই আমাকে পথ দেখাবেন। (সূরা ৩৭ আস্সাফফাত : ৯৯)
এক স্ত্রী এবং ভাতিজা লূতকে সাথে নিয়ে তিনি রওয়ানা করলেন। হিজরতের সময় নিঃসন্তান ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দয়াময় দাতা আল্লাহ্র নিকট দু'আ করলেন:
ربِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّلِحِينَ
অর্থ: ওগো আমার রব! আমাকে একটি সালেহ পুত্র দান করো। (সূরা ৩৭ আস্সাফফাত : ১০০)
আল্লাহ্ তাবারুক ওয়া তায়ালা স্বীয় খলীলের দু'আ কবুল করলেন। তিনি তাঁকে বৃদ্ধ বয়সে সালেহ পুত্র দান করলেন। তিনি আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন। নিজের জন্যে ও বংশধরদের জন্যে দু'আ করলেন :
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَهَبَ لِى عَلَى الْكِبَرِ اسْمَعِيلَ وَاسْحَقَ ، إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاءِ رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلوةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلُ دُعَاء رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَى وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُوْمُ الْحِسَابُ .
অর্থ: শোকর সেই আল্লাহ্, যিনি এই বার্ধক্যাবস্থায় আমাকে ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। আসলে আমার মনিব অবশ্যই দু'আ শোনেন। পরওয়ারদিগার! আমাকে নামায কায়েমকারী বানাও আর আমার সন্তানদেরকেও। ওগো প্রভু! আমার দু'আ কবুল করো। ওগো দয়াময় অভিভাবক! আমাকে, আমার পিতা মাতা আর ঈমানদার লোকদের সেদিন মাফ করে দিও, যেদিন হিসাব কার্যকর হবে। (সূরা ১৪ ইবরাহীম: ৩৯-৪১)
সন্তানদের নিয়ে আল্লাহ্ খলীল আরবের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীন প্রচার করতে লাগলেন মক্কার দিকেও দীনের আবাদ শুরু করলেন। মক্কার সেই মরু বালুকার বুকে তিনি আল্লাহ্র ঘরের নির্মাণ কাজ আরম্ভ করলেন স্নেহ প্রতীম পুত্র ইসমাঈলকে সাথে নিয়ে। এ মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দেবার প্রাক্কালে পিতা-পুত্র দু'জনে দু'আ করলেন পরওয়ারদিগারের দরবারে:
وَإِذْ يَرْفَعُ ابْرِهِمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَاسْمَعِيلُ ، رَبَّنَا تَقَبَّلُ مِنَّا ، إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ . رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةٌ مُسْلِمَةٌ لكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا : إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ . رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَبَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ ، إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ .
অর্থ: হে পরওয়ারদিগার! আমাদের এ কাজ তুমি কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি সবকিছু শোনো ও সবকিছু জানো। প্রভু! আমাদেরকে তোমার অনুগত বানাও আর আমাদের বংশধরদের মধ্য থেকেও তোমার অনুগত একটি জাতির উত্থান করো। আমাদেরকে ইবাদাতের পন্থা শিখিয়ে দাও আর ক্ষমা করে দাও আমাদের দোষ ত্রুটি। নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল ও অনুগ্রহকারী। পরওয়ারদিগার! এ জাতির মধ্যে থেকে এদের প্রতি একজন রসূল পাঠিয়ো, যিনি তাদের তোমার আয়াত সমূহ পাঠ করে শুনাবেন; কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দিবেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন। প্রভু! নিশ্চয়ই তুমি বড় শক্তিমান ও বিজ্ঞ। (সূরা ২ আল বাকারা : ১২৯-১২৯)
হযরত খলীলুল্লাহর প্রচেষ্টায় মক্কায় গড়ে উঠলো কাবা কেন্দ্রিক একটি ছোট্ট শহর। এ প্রিয় শহর ও শহরবাসীদের জন্যে দু'আ করলেন আল্লাহ্র খলীল:
رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَنْ نَعْبُدَ الْأَمْنَامَ رَبِّ إِنَّهُ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ ، فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رحيم . رَبَّنَا إِنِّي أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلوةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِى إِلَيْهِمُ وارزقهم من الثَّمَرتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ .
অর্থ: প্রভু আমার! এ শহরটাকে শান্তি ও নিরাপত্তার শহর বানিয়ে দাও। আমাকে ও আমার সন্তানদের মূর্তি পূজার পংকিলতা থেকে বাঁচাও। প্রভু! এ মূর্তিগুলো বহুসংখ্যক মানুষকে গোমরাহীতে নিমজ্জিত করেছে। তাই যে আমাকে অনুসরণ করবে সেই আমার লোক। আর যে আমার বিরুদ্ধ পন্থা অনুসরণ করবে তুমি নিশ্চয়ই ক্ষমাশীল ও দয়াবান। পরওয়ারদিগার! আমি পানি ও তরুলতাশূন্য এক মরু প্রান্তরে আমার সন্তানদের একটি অংশকে তোমার মহা সম্মানিত ঘরের নিকট এনে পুনর্বাসিত করলাম। ওগো মওলা! এ কাজ আমি এ জন্যে করেছি যেনো এরা নামায কায়েম করে। অতএব তুমি মানুষের দিলকে এদের প্রতি অনুরক্ত বানিয়ে দাও। আর খাবার জন্যে এদেরকে ফল দান করো। সম্ভবত এরা শোকর গুযার হবে। (সূরা ১৪ ইবরাহীম: ৩৫-৩৭)

📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের দু'আ


আল্লাহ্ নবী হযরত ইয়াকুব। ধৈর্য ও প্রজ্ঞার এক জ্বলন্ত প্রতীক তিনি। বারজন পুত্র তাঁর। এক পক্ষে দু'জন- হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম এবং তাঁর ছোট ভাই বিন ইয়ামিন। অন্যান্য পক্ষের স্ত্রীদের ছিলো দশটি সন্তান। জ্ঞান, বুদ্ধি ও আমল-আখলাকের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের কারণে পিতা ইউসুফকে খুবই ভালোবাসতেন। কিন্তু অন্য দশ ভাইয়ের নিকট এটা ছিলো খুবই অসহনীয়। তারা ইউসুফকে সাংঘাতিকভাবে হিংসা করতে লাগলো। এমনকি তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে একদিন এসে পিতাকে বললো : আব্বাজান আপনার কি হয়েছে? ইউসুফের ব্যাপারে আপনি আমাদের বিশ্বাস করেননা কেনো? অথচ আমরা তো তার ভালোই চাই। আগামীকাল ওকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিন। সে কিছুটা ঘুরে ফিরে নেবে এবং খেলাধূলা করে নিজেকে খুশি করবে। আমরা তার পূর্ণ হেফাযতে নিয়োজিত থাকবো। হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম যদিও তাদের ব্যাপারে আশংকামুক্ত ছিলেননা; তবু তাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞার প্রেক্ষিতে আল্লাহ্র উপর ভরসা করে ইউসুফকে তাদের সাথে দিলেন। তারা ইউসুফকে নিয়ে গেলো এবং মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে এক অন্ধকূপে নিক্ষেপ করলো। সন্ধ্যায় তারা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এসে হযরত ইয়াকুবকে বললো : আব্বাজান! আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করছিলাম আর ইউসুফকে আমাদের জিনিস-পত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম। এরি মধ্যে নেকড়ে এসে তাকে খেয়ে ফেলেছে। আমরা যদিও সত্যি কথা বলছি; কিন্তু আপনি তো আমাদের কথা বিশ্বাস করবেননা। তারা ইউসুফের জামায় মিথ্যা মিথ্যি রক্ত মেখেও এনেছিলো। ৫
এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা শুনে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আঁধার, ধৈর্য ও সহনশীলতার মূর্তপ্রতীক হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এভাবে অতি সংক্ষেপে তাঁর মনের বেদনা প্রকাশ করেছিলেন:
بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنْفُسُكُمْ أَمْرًا ۖ فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ۖ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَىٰ مَا تَصِفُونَ
অর্থ: বরং তোমাদের নফস তোমাদের জন্যে একটা বিরাট কাজকে সহজ বানিয়ে দিয়েছে। ঠিক আছে আমি ধৈর্য ধারণ করলাম। আর অতি উত্তমভাবেই সবর করে থাকবো। তোমরা যা কিছু বলছো, সে বিষয়ে কেবল আল্লাহ্র নিকটই সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। (সূরা ১২ ইউসুফ: ১৮)
আল্লাহ্র নবী হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম কেবলমাত্র আল্লাহ্ তায়ালাকেই যাবতীয় ব্যাপারে আশ্রয় ও ভরসাস্থল হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। আল্লাহ্র ইচ্ছার উপর নিজের সমস্ত ইচ্ছাকে কুরবানি দিয়েছিলেন। আল্লাহ্র যে কোনো হুকুম ও ফায়সালা অকাতরে মেনে নিয়েছিলেন। তাইতো দেখি, যখন দশ পুত্রের সাথে পুত্র বিন ইয়ামিনকেও খাদ্য সামগ্রী পাওয়ার জন্যে মিসরের শাসক মিসর নিয়ে যাবার শর্তারোপ করেছিলেন, তখন প্রজ্ঞাবান হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম বিদায়ের প্রাক্কালে পুত্রদের নসীহত করেছিলেন: হে আমার পুত্রগণ! মিসরের রাজধানীতে তোমরা সকলে একই দ্বারপথে প্রবেশ করবেনা, বরং ভিন্ন ভিন্ন পথে প্রবেশ করবে। এ নসীহতের সাথে আল্লাহ্র অনুগত বান্দাহ হযরত ইয়াকুব পুত্রদের আরো হেদায়াত দিলেন:
وَمَا أُغْنِي عَنْكُم مِّنَ اللَّهِ مِن شَيْءٍ ۖ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۖ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ ۖ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكِّلُونَ
অর্থ: কিন্তু আমি আল্লাহ্র ইচ্ছা থেকে তোমাদের বাঁচাতে পারবোনা। তাঁর হুকুম ছাড়া আর কারো হুকুম চলেনা। তাঁরই উপর আমি ভরসা করছি। আর যে-ই ভরসা করতে চায় তাঁরই উপর করা উচিত। (সূরা ১২ ইউসুফ: ৬৭)
বিন ইয়ামিনকে নিয়ে মিসরে পৌছলে বিশেষ উদ্দেশ্যে হযরত ইউসুফ আ. সুকৌশলে তাঁর সহোদরকে আটক করে রাখলেন। বৈমাত্রীয় ভাইয়েরা ফিরে এসে হযরত ইয়াকুবের নিকট এ দুঃখজনক ঘটনার রিপোর্ট দিলে শোকাভিভূত আল্লাহ্ নবী একইভাবে ধৈর্যধারণ করে বললেন:
بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنْفُسَكُمْ أَمْرًا فَصَبْرٌ جَمِيلٌ .
অর্থ: অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ্ তায়ালা এদের সবাইকে (ইউসুফ ও বিন ইয়ামিনকে) আমার সাথে একত্রিত করে দেবেন। তিনি সব কিছুই জানেন এবং তিনি মহা কৌশলী। (সূরা ১২ ইউসুফ: ৮৩)
হযরত ইয়াকুব পুত্র ইউসুফের নাম নিয়ে কাঁদতে থাকেন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখে সাদা পর্দা পড়ে যায়। ছেলেরা বলে : খোদার শপথ! অবস্থা এরূপ হয়েছে যে, আপনি কেবল ইউসুফের স্মরণেই নিজেকে ক্ষয় করে ফেলবেন অথবা নিজের জীবন ধ্বংস করে ফেলবেন। এ কথার জবাবে আল্লাহ্র প্রতি আত্মোৎসর্গীত প্রাণ হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম বলেন:
إِنَّمَا أَشْكُوا بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ .
অর্থ: আমি আমার সমস্ত দুঃখ-বেদনা ও দুশ্চিন্তার ফরিয়াদ শুধুমাত্র আল্লাহ্র দরবারেই করছি। (সূরা ১২ ইউসুফ: ৮৬)
বস্তুত মুমিনের জন্যে আম্বিয়ায়ে কিরামের জীবন চরিতে রয়েছে সর্বোত্তম পথ নির্দেশ।

টিকাঃ
৫. দেখুন সূরা ১২ ইউসুফ, আয়াত: ৮-১৮।

📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের দু'আ


মিসরে বেগম আযীযের ঘরে হযরত ইউসুফ। উনিশ-বিশ বছরে এক অপরূপ সুদর্শন যুবক তিনি। অপরূপা সুন্দরী বেগম আযীয। ইউসুফের প্রতি অবৈধ আকর্ষণে পাগলপারা হয়ে উঠে বেগম আযীয। কুরআনের ভাষায়: যে মহিলার ঘরে সে অবস্থান করছিলো, সে তাকে আকৃষ্ট করতে চেষ্টা করতে লাগলো। একদা সে মহিলা দরজা বন্ধ করে বললো : 'এসো'। এ চরম ক্রান্তিক অবস্থায় টগবগ যৌবনে ভরা খোদাভীরু ইউসুফের দিল তাঁর মনিবের ভয়ে কেঁপে উঠলো। তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো :
مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ مَا إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّلِمُونَ
অর্থ: আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। আমার মনিব তো আমাকে উত্তম মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। এ ধরনের (যারা এরূপ অশ্লীল কাজে লিপ্ত হয় সেই) যালেমরা কখনো কামিয়াব হতে পারেনা। (সূরা ১২ ইউসুফ: ২৩)
দয়াময় আল্লাহ্ তাঁর সালেহ বান্দাহ ইউসুফকে গায়ে এসে পড়া অশ্লীল এই নির্লজ্জ কাজটি থেকে রক্ষা করলেন। ইউসুফ দরজার দিকে দৌড়ে বেরিয়ে এলেন। বেগমের অবৈধ যৌনজ্বালা তাকে শাঁই শাঁই করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারছে। এর পরের ঘটনা কুরআনের বর্ণনায় শুনুন: শহরের নারী সমাজ পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো: বেগম আযীয তার যুবক ক্রীতদাসের প্রতি চরম আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। প্রেমের জ্বালা তাকে উম্মাদ করে তুলেছে, আমাদের মতে সে ভুল পথে অগ্রসর হয়েছে। সে (বেগম আযীয) যখন তাদের এসব নিন্দা সূচক কথাবার্তা শুনতে পেলো, তখন তাদের ডেকে পাঠালো এবং তাদের জন্যে হেলান দিয়ে বসার ব্যবস্থা করলো। আর প্রত্যেকের সামনে রেখে দিলো একখানা করে ছুরি। (পরে ঠিক তখন, যখন মহিলারা ফল কেটে খাচ্ছিলো) সে ইশারায় ইউসুফকে তাদের সামনে বেরিয়ে আসতে নির্দেশ দিলো। তারা যখন ইউসুফকে দেখলো, বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হলো কেটে বসলো নিজেদের হাত আর উচ্চস্বরে বলে উঠলো: "আল্লাহ্র কসম! এ যুবক তো মানুষ নয়, এতো যেনো এক সম্মানিত ফেরেশতা।" আযীযের স্ত্রী বললো: "দেখলে তো তোমরা! এ সেই যুবক যার ব্যাপারে তোমরা আমাকে ভর্ৎসনা করছিলে। আমি অবশ্যই তাকে ভুলাতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে আত্মরক্ষা করে নিষ্পাপ থেকেছে। সে যদি আমার কথা না শুনে, তাহলে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হবে; চরম লাঞ্ছিত ও অপদস্ত করা হবে।"৬
তৎকালীন বিশ্বের সভ্যতম দেশের উপরতলার মহিলাদের এ হলো চিত্র। এমতাবস্থায় যুবক ইউসুফের নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা করা কি সহজ ব্যাপার ছিলো? যেখানে তিনি উনিশ-কুড়ি বছরের এক সুদর্শন যুবক। মরু জীবনের অবদানে এক অপূর্ব স্বাস্থ্যমণ্ডিত দেহ। টগবগে ভরা যৌবন। দারিদ্র্য, পরদেশ, নিজ আত্মীয়-স্বজন ও ঘর-বাড়ি থেকে বহিষ্কৃত জীবন, জবরদস্তি দাসত্ব প্রভৃতি কঠিন অবস্থা অতিক্রম করছিলেন। এমতাবস্থায় কপাল তাঁকে তৎকালীন দুনিয়ার সর্বাপেক্ষা অধিক সভ্যতা- সংস্কৃতি সম্পন্ন রাজ্যের রাজধানীতে এক বড় ধনী ও পদস্থ ব্যক্তির ঘরে এনে পৌছে দিলো। এখানে সে ঘরের স্ত্রী লোকটিই তাঁর প্রতি প্রথমে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে যার সাথে ছিলো তার দিন-রাতের সাক্ষাতের ব্যাপার। পরে তার রূপ-সৌন্দর্যের কথা গোটা শহরের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। শহরের বড় লোকদের বেগমরা তাঁর রূপ দেখে আত্মহারা হয়ে পড়ে। এ সময় একদিকে তিনি, আর একদিকে অসংখ্য ছলনাময়ী জালের আকর্ষণ তাকে সব সময়ই জড়িয়ে ধরতে ব্যতিব্যস্ত। ... রাতদিন চব্বিশ ঘন্টাই তিনি এরূপ বিপদের ঝুঁকি নিয়ে কাটাচ্ছিলেন। এক মুহূর্তের জন্যেও তাঁর ইচ্ছা বাসনায় এক বিন্দু শিথিলতা দেখা দিলেই অপেক্ষমান শত-সহস্র দরজার যে কোনোটিতে প্রবেশ করতে পারেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ্র মনোনীত বান্দাহ ইউসুফের অন্তরে একবিন্দু লোভ ও অহংকার আসা তো দূরের কথা, বরং মানবীয় পদস্খলনের ভয়ে কম্পমান আল্লাহ্র এই বান্দাহ কেবল আল্লাহ্র কাছেই আশ্রয় চাইতেন। তাইতো বেগম আযীয যখন দম্ভোক্তি করে বললো: 'সে যদি আমার কথা না শুনে তাহলে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হবে এবং চরম লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হবে।' তখন তিনি আল্লাহ্র দরবারে বিনয়াবনত হয়ে আরয করলেন:
رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَى مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ ، وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُن مِّنَ الْجَهلِينَ ۞
অর্থ: ওগো আমার অভিভাবক। ওগো মওলা! কারাগারে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে আমি অধিক পছন্দ করি সে কাজ থেকে, এরা যা আমার নিকট পেতে চায়। মওলা! এদের অপকৌশল তুমি যদি আমার হতে দূরে ফিরিয়ে না দাও, তাহলে আমি এদের ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে পড়বো এবং জাহেলদের মধ্যে গণ্য হয়ে যাবো। (সূরা ১২ ইউসুফ: ৩৩)
এ ছিলো দুনিয়ার সুখ-সম্ভোগ, আয়েশ ও চাকচিক্য এবং লোভনীয় নারীদের মুকাবিলায় এক চরম দুর্দশাগ্রস্ত আল্লাহ প্রেমিক যুবকের ফরিয়াদ। মানুষের দয়াময় প্রতিপালক এমন ফরিয়াদ কবুল না করে থাকেননা:
فَاسْتَجَابَ لَهُ رَبُّهُ فَصَرَفَ عَنْهُ كَيْدَهُنَّ طَ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ۞
অর্থ: অতপর তাঁর মনিব তাঁর এ ফরিয়াদ কবুল করলেন; সে নারীদের কূটকৌশল তার থেকে রহিত করলেন। নিশ্চয়ই তিনি ফরিয়াদ শ্রবণকারী এবং নিজ বান্দার অবস্থা অবগত। (সূরা ১২ ইউসুফ: ৩৪)
ভাইদের দ্বারা নির্যাতিত, কৃতদাস হিসেবে বিক্রিত এবং আল্লাহর মনোনীত ইউসুফ এমনি করে সমস্ত কামনা বাসনা লোভ ও লালসার উপর বিজয়ী হন। বিনা অপরাধে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। নির্দোষ ও নিগূঢ় জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে কারাগার থেকে অনেক বছর পর মুক্তিলাভ করেন এবং শেষ পর্যন্ত মিসরের সিংহাসনে ক্ষমতার অধিকারী হন। অতপর অপরাধী ভাইয়েরা মুখোমুখি ধরা পড়ে। তারা নিজেদের অপরাধের স্বীকৃতি দেয়। তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন:
لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ ، يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ ، وَهُوَ اَرْحَمُ الرَّحِمِينَ ۞
অর্থ: যাও, আজ আর তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ্ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি সব দয়াবানদের চাইতে অধিক দয়াবান। (সূরা ১২ ইউসুফ: ৯২)
অতপর তিনি পিতা-মাতা ও ভাইদের মিসরে নিয়ে আসেন। এমনি করে তিনি তৎকালীন দুনিয়ার সর্বোচ্চ শাসন ক্ষমতার শরীকদার হয়ে সর্বোত্তম প্রতিষ্ঠা লাভ করার পরও তাঁর অন্তরে কোনো প্রকার বড়াই ও অহংকার স্থান তো লাভ করেইনি, বরং এগুলোকে আল্লাহ্র প্রদত্ত পুরস্কার ও নেয়ামত ভেবে অবনত মস্তকে তাঁর শোকরিয়া জ্ঞাপন করেন। আল্লাহকে নিজের অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করেন। মুসলিমের মৃত্যু কামনা করেন আর আল্লাহ্ নেক্কার বান্দাদের সাথে মিলিত হবার তৌফিক কামনা করেন:
رَبِّ مَنْ أَتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ ۚ فَاطِرَ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ ۖ أَنتَ وَلِيِّ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَالْحِقْنِي بِالصَّلِحِينَ ۞
অর্থ: পরওয়ারদিগার! তুমিই আমাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দান করেছো, সব বিষয়ের সূক্ষ্মতত্ত্ব অনুধাবনের শিক্ষা দান করেছো। ওহে আসমান ও যমীনের স্রষ্টা! তুমিই আমার দুনিয়া ও আখিরাতের অভিভাবক। ইসলামের আদর্শের উপর আমার মৃত্যু দিও আর পরিণামে আমাকে নেক্কার লোকদের সাথে মিলিত ক'রো। (সূরা ১২ ইউসুফ: ১০১)

টিকাঃ
৬. দেখুন সূরা ১২ ইউসুফ: ৩০-৩৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00