📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 সূচনা

📄 সূচনা


যারা আল্লাহকে পেতে চান, তাঁদের মূল কাজই হলো আল্লাহ্‌র সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা। এ হবে এমন এক বেতারের সম্পর্ক, যার খবর মনিব আর গোলাম ছাড়া অন্য কেউই রাখেনা। হাজারো গুনাহ-খাতায় পরিপূর্ণ গোলামের যিন্দেগি। আল্লাহ্‌র ইচ্ছা না হলে কোনো মানুষের জন্যেই কেবল মাত্র নিজ প্রচেষ্টায় পবিত্র থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু গুনাহ-খাতায় পরিপূর্ণ বান্দাহ যখন হৃদয়ের বেতার যন্ত্রে মাফি চেয়ে আন্তরিকতার সাথে মনিবকে ডাক দেয়, তখন পরম দয়াময় রহমান তা ক্ষমা না করে থাকেননা:
نَبِّى عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ . أَجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
অর্থ : (হে নবী!) আমার গোলামদের খবর দাও, আমি বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়াময়। (সূরা ১৫ আল হিজর : ৪৯)
অর্থ : কেউ যখন আমাকে ডাকে, আমি তখন তার ডাকের জবাব দিয়ে থাকি। (সূরা ২ আল বাকারা : ১৮৬)
বস্তুত মুমিন যখন ভুল ও অপরাধ করে, তখন তার মনিবকে স্মরণ করা ছাড়া, তার মনিবের প্রতি প্রত্যাবর্তন করা ছাড়া, তাঁরই হুজুরে নিজেকে আসামী হিসেবে দণ্ডায়মান করে দিয়ে মাফি চাওয়া ছাড়া তার আর কোনো পথই থাকেনা। একমাত্র তিনিই তাকে দয়া ও ক্ষমা করার সর্বময় অধিকারী, আর তিনি এতোই রহমদিল যে, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের তিনি ক্ষমা করে দেন:
الَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيم .
অর্থ : তারা কি জানেনা যে, তিনিই আল্লাহ্, যিনি তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং তাদের সাদাকা সমূহ গ্রহণ করেন? আর তারা কি এও জানেনা যে, আল্লাহ্ বড়ই ক্ষমাকারী ও দয়াবান! (সূরা ৯ তওবা : ১০৪)
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ م وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا الله تف وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ أُولَئِكَ جَزَاؤُهُمْ مَغْفِرَةٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَجَنَّتْ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْفُرُ خُلِدِينَ فِيهَا ، وَنِعْمَ أَجْرُ الْعَمِلِينَ .
অর্থ: সে সব লোক, তাদের দ্বারা যখনই কোনো অশ্লীল কাজ সংঘটিত হয়ে যায় অথবা কোনো গুনাহ করে তারা নিজেদের উপর যুলুম করে বসে, তখন তখনই তারা আল্লাহ্ কথা স্মরণ করে এবং তাঁর নিকট মাফি চায়; কারণ, আল্লাহ্ ছাড়া গুনাহ মাফ করতে পারে এমন আর কে আছে? অতপর জেনে বুঝে তারা আর এসব কাজে লিপ্ত হয়না- বাড়াবাড়ি করেনা। এরূপ লোকদের প্রতিফল তাদের পরওয়ারদিগারের নিকট নির্দিষ্ট রয়েছে যে, তিনি তাদের ক্ষমা করে দেবেন। আর এমন জান্নাতে তাদের দাখিল করাবেন, যার তলদেশে ঝর্ণাধারা প্রবহমাণ। সেখানে তারা চিরদিন থাকবে। আমলে সালেহ যারা করে, তাদের জন্যে কতো সুন্দর প্রতিফলই না নির্দিষ্ট রয়েছে। (সূরা ৩ আলে ইমরান: ১৩৫-১৩৬)
আল্লাহ্র দীনের মুজাহিদদের উপর শুধু শয়তানই হামলা করেনা, গোটা সমাজ ব্যবস্থা, শাসন ক্ষমতা ও তাগুতি শক্তি সমূহ তাদের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগে যায়। তাদের উপর অত্যাচার নির্যাতনের স্টীম রোলার চালায়। তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও মকরবাজির চরম বেড়াজال সৃষ্টি করা হয়, ক্ষমতার দাপটে তাদেরকে সীমাহীন হয়রানিতে নিমজ্জিত করা হয়। কোথাও হিজরত, কোথাও শাহাদাত বরণ, আবার কোথাও চরম অত্যাচার নির্যাতনের ভয়াবহ পরীক্ষা তাদেরকে দিতে হয়। এসব অবস্থায় মুমিনের আশ্রয় ও ভরসা স্থল শুধু একটাই। তা হচ্ছে মনিবের রহম ও করুণা। শুধুমাত্র এবং কেবলমাত্র তার মনিবই তার আশ্রয়স্থল:
وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِينَ .
অর্থ: মুমিনদের সাহায্য করা ও বিজয় দান করা আমার দায়িত্ব। (সূরা ৩০ আর রূম: ৪৭)
মুমিনের মানসিক, অর্থনৈতিক তথা সর্বপ্রকার দুঃখ-দুর্দশা ও অশান্তি থেকে মুক্তি লাভের একটিমাত্র পথ আর তা হচ্ছে তার একমাত্র মনিব মওলাকে স্মরণ করা, তাঁর কাছে ফরিয়াদ করা এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করা।
الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ - أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
অর্থ: যারা ঈমান এনেছে, তাদের দিল আল্লাহ্ স্মরণে পরম শান্তি, স্বস্তি ও পরিতৃপ্তি লাভ করে। সতর্ক হও! আল্লাহ্র স্মরণ মূলতই সে জিনিস, যার দ্বারা অন্তর পরম শান্তি, স্বস্তি ও পরিতৃপ্তি লাভ করে থাকে। (সূরা ১৩ আর রা'দ : ২৮)
আম্বিয়ায়ে কিরাম এবং আল্লাহ্র নেক বান্দাগণ তাঁদের প্রতিটি অসুবিধায় ফরিয়াদ কেবলমাত্র তাঁদের মনিবের কাছেই করতেন। যদি কোনো ত্রুটি বিচ্যুতি হয়ে যেতো, সাথে সাথে তাঁরা আল্লাহর দরবারে মাফি চেয়ে কেঁদে পড়তেন। শত্রুর মুকাবেলায় কেবলমাত্র মনিবের সাহায্যেরই ফরিয়াদ করতেন। তীব্র বিরোধিতার ময়দানে ঈমানের উপর অটল থাকার জন্যে কেবল মওলার নিকটই তৌফিক প্রার্থনা করতেন। নিজের পিতা-মাতা, স্ত্রী ও সন্তানাদির হিদায়াত ও নাজাতের ফরিয়াদ তারা তাদের একমাত্র পরওয়ারদিগারের নিকটই করতেন। বস্তুত আল্লাহ্ প্রিয়তম বান্দাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো- তাঁরা উঠতে, বসতে, শুতে- তথা সর্বাবস্থায় তাঁদের একমাত্র মওলা ও মনিবকে স্মরণ করে তাঁকেই ভীতি ও বিনয়ের সাথে ডাকে এবং যাবতীয় ব্যাপারে তাঁরই নিকট ফরিয়াদ করে।
আল্লাহ্র সন্তোষ লাভই মুমিন জীবনের সবচেয়ে বড় পাওনা। তাই যতো বেশি ভয় ও বিনয়ের ডাকে মহান মনিবকে ডাকা যায়, যতো বেশি মহব্বতের ডাকে তাঁকে ডাকা যায়, যতো বেশি মধুর ভাষায় তাঁকে ডাকা যায়- ততোই গোলামের প্রতি নিবিষ্ট হয় তাঁর রহমতের দৃষ্টি। দয়া ও করুণার আঁধার বান্দাকে টেনে নেন স্বীয় সান্নিধ্যে এবং তাঁর ফজল ও করমের ফল্গুধারা বইতে থাকে মুমিনের জীবনে। আর এটাই হচ্ছে মুমিনের সফল ও কামিয়াব যিন্দেগি। এ যিন্দেগিরই ধারক ও বাহক ছিলেন আম্বিয়ায়ে কিরাম এবং তাদের উম্মতের সালেহ বান্দাগণ। আল্লাহর দীনের প্রতিটি মুজাহিদকে গড়ে নিতে হবে এ জীবন। এ জীবনই হবে তাদের পাথেয় :
اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا لَا يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ .
অর্থ: মুমিনদের অভিভাবক হচ্ছেন আল্লাহ্। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আনেন। (সূরা ২ আল বাকারা: ২৫৭)
আলোচ্য মূলনীতির আলোকে কুরআন মজীদে উল্লিখিত আম্বিয়ায়ে কিরামের দু'আ সমূহ আমরা পটভূমি সহ এ গ্রন্থে আলোচনা করেছি। সাথে সাথে কুরআন মজীদে বিবৃত যাবতীয় দু'আ আমরা এ গ্রন্থে গ্রন্থাবদ্ধ করে নিয়েছি। যাতে করে আমাদের সমাজে দু'আ করার যেসব বিদআত ও শিরকি পন্থা-পদ্ধতি রয়েছে, তা থেকে মুমিনরা আত্মরক্ষা করতে পারেন এবং আল্লাহ্ তায়ালার পছন্দনীয় পন্থায় দু'আ করতে অভ্যস্ত হয়ে যান।
গ্রন্থের প্রথম দিকে কুরআন ও হাদিসের আলোকে দু'আর মর্যাদা, দু'আর আদব ও নিয়ম কানুন এবং যেসব অবস্থা, সময়, স্থান ও ব্যক্তির দু'আ কবুল হয় তাও উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ্ তায়ালা কুরআনে যেসব গুণবাচক নামে নিজেকে বিভূষিত করেছেন, সেগুলোও এ গ্রন্থে উল্লেখ করা গেলো, যাতে করে মুমিনরা সহজেই আল্লাহ্র এসব নাম আয়ত্ত করতে পারেন, এসব নামে তাঁকে ডাকতে পারেন।
গ্রন্থটির আরো উন্নতি কল্পে বিদগ্ধ পাঠক সমাজের পরামর্শ কাম্য। আল্লাহ্ তায়ালা এ গ্রন্থখানাকে তাঁর মুমিন বান্দাহদের পথ-নির্দেশিকা এবং আমার পরকালীন নাজাতের উপায় হিসেবে কবুল করুন-আমীন!
আবদুস শহীদ নাসিম
১৯৮২ ঈসায়ি

📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত আদম আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত আদম আলাইহিস সালামের দু'আ


বিশ্বজাহানের স্রষ্টা ও মালিক আল্লাহ্ তায়ালা হযরত আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করে জান্নাতে বসবাস করতে দেন। বিবি হাওয়াকে সৃষ্টি করে তাঁর সাথি (স্ত্রী) করে দেন। তাঁদেরকে জান্নাতে বসবাস করতে নির্দেশ দানের প্রাক্কালে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন: হে আদম! তুমি আর তোমার স্ত্রী উভয়েই এ জান্নাতে বাস করো, তোমাদের মন যা চায়, তাই খাও। কিন্তু এ বৃক্ষটির নিকটবর্তীও হয়োনা, তাহলে যালেমদের মধ্যে গণ্য হবে। কিন্তু অতপর শয়তান তাদের বিভ্রান্ত করলো, যেনো তাদের গোপনীয় লজ্জাস্থান সমূহ পরস্পরের সম্মুখে উন্মুক্ত হয়ে যায়। সে বললো: তোমাদের প্রভু তোমাদেরকে যে ঐ গাছের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করেছেন, তার কারণ হলো, তোমরা যেনো ফেরেশতা হয়ে না যাও। অথবা যেনো বেহেশতে চিরন্তন জীবন লাভ করে না বসো। সে কসম খেয়ে বললো: আমি তোমাদের সত্যিকারের হিতাকাঙ্খী।
এভাবে শয়তান তাদের ধোঁকার জালে বন্দী করে ফেললো। শেষ পর্যন্ত তারা যখন এ গাছের স্বাদ আস্বাদন করে, তখন তাঁদের গোপনীয় স্থান পরস্পরের নিকট উন্মুক্ত হয়ে পড়ে, আর তারা জান্নাতের পত্র-পল্লব দিয়ে নিজ নিজ শরীর ঢাকতে থাকে। এ সময় তাঁদের রব তাদেরকে ডেকে বললেন: আমি কি এ গাছের নিকট যেতে তোমাদের নিষেধ করিনি? আর বলিনি যে শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন?১
হযরত আদম ও হাওয়ার অপরাধী মন আল্লাহ্র ভয়ে কেঁপে উঠলো। সাথে সাথে তাঁরা আল্লাহ্র নির্দেশ লঙ্ঘন করার মতো এ আত্মা-যুলুমের মাফি চাইলেন। দয়াময় আল্লাহ্র দরবারে বিনয়াবনত হয়ে কাতর কণ্ঠে কেঁদে পড়লেন:
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْلَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ
অর্থ: ওগো পরওয়ারদিগার! আমরা নিজেরাই নিজেদের উপর যুলুম করেছি। এখন তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না করো আর আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করো, তাহলে তো আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো। (সূরা ৭ আল আ'রাফ: ২৩)

টিকাঃ
১. দেখুন সূরা ৭ আল আ'রাফ: ১১-২২।

📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত নূহ আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত নূহ আলাইহিস সালামের দু'আ


আল্লাহ্র নবী হযরত নূহ আলাইহিস সালাম সাড়ে নয়শত বছর যাবত তাঁর কওমকে আল্লাহ্র পথে ডাকেন। কিন্তু তাঁর জাতি তাঁকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করে। অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহ্র পথে আনার জন্যে তাঁর যাবতীয় প্রচেষ্টা ও হিকমাত প্রয়োগ করেছেন। তাঁর দীর্ঘ দাওয়াতী আন্দোলনের চিত্র কুরআন মজীদ এভাবে রূপায়িত করেছে: আমরা নূহকে তার কওমের প্রতি প্রেরণ করেছি এ নির্দেশ দিয়ে যে, তুমি তোমার কওমকে পীড়াদায়ক আযাব আসার আগেই সাবধান ও সতর্ক করে দাও।
সে তাদের সম্বোধন করে বললো: হে আমার কওম! আমি তোমাদের জন্যে স্পষ্ট সাবধানকারী (নবী)। তোমরা আল্লাহ্ দাসত্ব কবুল করো, তাঁকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। তাহলে তিনি তোমাদের গুনাহ-খাতা মাফ করবেন এবং একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত তোমাদের বাঁচিয়ে রাখবেন। মূলত, আল্লাহ্র নির্ধারিত সময় যখন আসে, তখন কেউ তা প্রতিরোধ করতে পারেনা। হায়! তোমরা যদি জানতে! নূহ তার প্রভূকে ডেকে নিবেদন করলো: প্রভু আমার! আমি আমার কওমকে দিনরাত ডেকেছি। কিন্তু আমার ডাক তাদের এড়িয়ে চলার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
যখনই তাদেরকে তোমার ক্ষমার প্রতি ডেকেছি, তারা তাদের কানে আংগুল ঠেসে দিয়েছে। কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিয়েছে। তারা তাদের আচরণে অনমনীয়তা প্রদর্শন করেছে আর তারা অহংকার করেছে মাত্রাতিরিক্ত। পরে তাদের আমি উচ্চস্বরে ডেকেছি। প্রকাশ্যভাবে তাদের নিকট আমি দীনের দাওয়াত পৌঁছিয়েছি। গোপনে গোপনেও তাদের বুঝিয়েছি। অতপর আমি বলেছি তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা চাও। নিঃসন্দেহে তিনি বড়ই ক্ষমাশীল নূহ বললো: পরওয়ারদিগার! এরা আমার দাওয়াত প্রত্যাখান করেছে এবং ঐসব সমাজপতিদের অনুসরণ করছে, যাদের সন্তান ও সম্পদ তাদেরকে আরো ব্যর্থকাম করেছে। এ লোকেরা সাংঘাতিক ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে রেখেছে। তারা বলে: নূহের কথায় তোমরা কোনো অবস্থাতেই তোমাদের দেবতাদের ত্যাগ করতে পারবেনা- 'অদ্দ' 'সূয়া' 'ইয়াগুস' 'ইয়াউক' ও 'নসরকে' ত্যাগ করতে পারবেনা। ২
মোটকথা তারা হযরত নুহ আলাইহিস সালামকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করে তাঁকে প্রত্যাখান করলো এবং তাঁর বিরুদ্ধে চরম ও সাংঘাতিক ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপ শুরু করলো। এ জটিল পরিস্থিতির মুকাবেলায় আল্লাহ্ পরম ধৈর্যশীল বান্দাহ হযরত নূহ আলাইহিস সালাম তাঁর পরওয়ারদিগারের নিকট নিবেদন করলেন:
رَبِّ انْصُرْنِي بِمَا كَذَّبُونِ
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে সাহায্য করো। এরা আমার প্রতি মিথ্যার অভিযোগ আরোপ করে আমাকে প্রত্যাখান করেছে। (সূরা ২৩ আল মুমিনুন: ২৬)
এদের ষড়যন্ত্র, অপবাদ, বিরোধিতা ও প্রত্যাখানের মুকাবিলায় হযরত নূহ আলাইহিস সালাম আল্লাহ্র নিকট আরো দু'আ করলেন:
أَنِّى مَغْلُوبٌ فَانْتَصِرْ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমি পরাভূত ও বিজিত হয়েছি। এখন তুমি আমাকে সাহায্য করো, এদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করো। (সূরা ৫৪ আল ক্বামার: ১০)
তাঁর জাতির হিদায়াতের আর কোনোই সম্ভাবনা না থাকায়, তাদের চরম হঠকারিতার মুকাবিলায় আল্লাহ্র নবী তাদের প্রতি বদ দোয়া করলেন:
وَقَالَ نُوحٌ رَبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَفِرِينَ دَيَّارًا إِنَّكَ إِنْ تَذَرْهُمْ يُضِلُّوا عِبَادَكَ وَلَا يَلِدُوا إِلَّا فَاجِرًا كَفَّارًا .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! এ কাফেরদের একজনকেও ধরাপৃষ্ঠে ছেড়ে দিওনা। তুমি যদি এদের ছেড়ে দাও তাহলে এরা তোমার বান্দাদের গুমরাহ করে দেবে। আর এরা (বেঁচে থাকলে) এদের ঔরসজাত সন্তানগুলোও কট্টর কাফের ও দুরাচারী হয়েই জন্ম নেবে। (সূরা ৭১ নূহ: ২৬-২৭)
কাফেরদের ধ্বংসের সাথে সাথে ঈমানদার লোকেরাও যেনো ধ্বংস হয়ে না যায় এবং আল্লাহ্ যেনো তাদের ক্ষমা করে দেন, এ মুহূর্তে আল্লাহ্র নবী সে আরযও করলেন:
رَبِّ اغْفِرْلِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِي مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُؤْمِنَتِ، وَلَا تَزِدِ الظَّلِمِيْنَ إِلَّا تَبَارًا
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং মুমিন হয়ে আমার ঘরে যারা প্রবেশ করবে এমন সব লোককে এবং মুমিন পুরুষ ও মহিলাদেরকে ক্ষমা করে দাও। আর যালেমদের জন্যে ধ্বংস ছাড়া অন্য কিছুই বৃদ্ধি করোনা। (সূরা ৭১ নূহ: ২৮)
নূহ আলাইহিস সালামের জাতির ধ্বংসের সময় উপনীত হলো। আল্লাহ্ তাঁর নবী নূহকে জাহাজ তৈরি করতে নির্দেশ দিলেন। জাহাজ তৈরি শেষ হলো। চুলা উথলে যমীন থেকে পানি উৎসারিত হতে শুরু করলো। আল্লাহ্ হযরত নূহকে নির্দেশ দিলেন: প্রত্যেক প্রকারের জন্তু-জানোয়ারের এক এক জোড়া জাহাজে তুলে নাও। তোমার পরিবার পরিজনকেও এতে উঠাও। তবে তাদেরকে নয়, আগেই যাদেরকে চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে। আর ঈমানদারদের এতে উঠিয়ে নাও। আল্লাহ্র নির্দেশানুযায়ী আল্লাহ্র নবী উল্লিখিত সকলকে ডেকে বললেন:
وَقَالَ ارْكَبُوا فِيهَا بِسْمِ اللهِ مَجْرهَا وَمُرْسَهَا ، إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ .
অর্থ: আল্লাহ্ নামেই এর গতি আর আল্লাহ্র নামেই এর স্থিতি। নিশ্চয়ই আমার প্রভু বড়ই ক্ষমাশীল ও করুণাময়। (সূরা ১১ হুদ: ৪১)
অতপর জাহাজে আরোহণের মাধ্যমে কলুষিত জনপদ থেকে মুক্তি প্রাপ্তির শুকরিয়া কিভাবে আদায় করতে হবে, তাও আল্লাহ্ তাঁকে শিখিয়ে দিলেন। বললেন, তুমি ও তোমার সাথিরা যখন জাহাজে আরোহণ করবে তখন বলবে:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي نَعْنَا مِنَ الْقَوْمِ الظَّلِمِينَ .
অর্থ: শোকর সেই আল্লাহ্, যিনি যালেমদের হাত থেকে আমাদের মুক্তি দিয়েছেন। (সূরা ২৩ আল মুমিনুন: ২৮)
জাহাজে আরোহণ করে আল্লাহ্র নিকট কি দু'আ করতে হবে, আল্লাহ্ তায়ালা তাও শিখিয়ে দিলেন তাঁর প্রিয় নবী নূহ আলাইহিস সালামকে। তিনি শিখিয়ে দিলেন: হে নূহ! বলো:
رَبِّ اَنْزِلْنِي مُنْزَلاً مُبْرَكًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْمُنْزِلِينَ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! বরকতপূর্ণ স্থানে আমাদের অবতরণ করাও। আর তুমিই তো সর্বোত্তমভাবে অবতরণ করাও। (সূরা ২৩ আল মুমিনুন: ২৯)
নির্দেশিত সকলেই জাহাজে উঠার পর ঢেউ-এর পর ঢেউ এসে যমীন ডুবে যেতে লাগলো। হযরত নূহ আলাইহিস সালামের পুত্র কাফের। পুত্রের মর্মান্তিক ধ্বংসের কথা চিন্তা করে করুণা হলো পিতার। তিনি ছেলেকে ডেকে বললেন: আমাদের সাথে এ জাহাজে আরোহণ কর। কাফেরদের সাথে থাকিসনে। কাফের ছেলে বললো: পাহাড়ে আরোহণ করে আমি পানি থেকে বেঁচে যাবো। বলতে বলতে একটা প্রচণ্ড ঢেউ এসে উভয়ের মাঝে আড়াল সৃষ্টি করে দিলো। পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেলো ছেলে। নূহ চিৎকার করে তাঁর প্রভুকে ডাকলেন: প্রভু! আমার পুত্রতো আমার পরিবারেরই একজন। আর তোমার ওয়াদাতো সত্য। তুমি সব বিচারক অপেক্ষা বড় বিচারক। প্রভু বললেন: হে নূহ! সে তোমার পরিবারের মধ্যে শামিল নয়। সেতো এক অসৎ কর্ম। কাজেই যে ব্যাপার তোমার অজানা, সে ব্যাপারে আমাকে নিবেদন করোনা। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি: জাহেলদের মতো আবদার আবেদন করোনা। ৪
একদিকে পুত্রের জন্যে দরদ। অন্যদিকে কাফের পুত্রের জন্যে নিবেদন করার নিষেধাজ্ঞা। অথচ হযরত নূহ পুত্রের মুক্তির জন্যে নিবেদন করে ফেলেছেন। সঙ্গে সঙ্গে এ ভুলের জন্যে আল্লাহ্ মুখলিস বান্দাহ নূহ বিনয়াবনত হয়ে পানাহ চাইলেন তাঁর রবের দরবারে:
رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْتَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ وَإِلَّا تَغْفِرُ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُنْ مِنَ الْخَاسِرِينَ .
অর্থ: প্রভু! যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে তোমার কাছে আবদার করা থেকে আমি পানাহ্ চাই। এখন তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না করো এবং আমার প্রতি রহম না করো তবে তো আমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবো। (সূরা ১১ হুদ : আয়াত ৪৭)

টিকাঃ
২. দেখুন সূরা নূহ: আয়াত ১-২৩
৩. দেখুন সূরা ১১ হুদ: আয়াত ৪০।
৪. সূরা হুদ: ৪২-৪৬

📘 আল কুরআনের দুআ > 📄 হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দু'আ

📄 হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দু'আ


আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে ইরাকের উর নগরীতে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের জন্ম। তাঁর পিতা আযর ধর্মীয় পুরোহিত হিসেবে শাসক নমরুদের সভাসদ ছিলেন। পৌত্তলিক ধর্মান্ধতার চরম জাহেলিয়াতের যুগে হযরত ইবরাহীমের জন্ম। সেই চরম জাহেলি সমাজে জন্মগ্রহণ করেও হযরত ইবরাহীম তাঁর সত্য সন্ধানী চিন্তা ও গবেষণার মাধ্যমে আল্লাহ্র পরিচয় লাভ করতে সক্ষম হন।
তিনি ছিলেন আল্লাহ্ তায়ালার খলীল- পরম বন্ধু। তাঁর সুকোমল হৃদয়, আল্লাহ্র প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সীমাহীন প্রেম এবং আল্লাহ্ত্র সন্তোষের খাতিরে তাঁর চরম ত্যাগ ও কুরবানীর কথা আল্লাহ্ তায়ালা কুরআন মজীদে অত্যন্ত প্রশংসার সাথে উল্লেখ করেছেন।
যুবক ইবরাহীম শিরকের সাথে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে তাঁর জাহেল কওমের নিকট শিরকের প্রতিবাদ ও তাওহীদের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। শুরু হলো বিরোধিতা। পিতা তাঁকে পরিত্যাগ করলো। জাতির নেতৃবৃন্দ তাঁকে অগ্নিকুণ্ডে ফেললো। তারা আল্লাহ্র খলীলের বিরুদ্ধে শাস্তি, ষড়যন্ত্র ও নির্যাতনের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে শুরু করলো। আল্লাহ্ নবী ইবরাহীম দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, অবস্থা যতো সংগীনই হোক না কেনো, তিনি তওহীদের আন্দোলন থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও নিবৃত হবেননা। অবস্থার জটিলতা বেড়ে চললো। এ চরম মুহূর্তে আল্লাহ্র খলীল যে দু'আ করেছিলেন তা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী :
رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ .
অর্থ: ওগো আমাদের অভিভাবক! আমরা তোমার উপর তাওয়াক্কুল করলাম, তোমার দিকে প্রত্যাবর্তন করলাম আর তুমিই তো আমাদের গন্তব্যস্থল। (সূরা ৬০ আল মুমতাহানা : ৪)
رَبَّنَا لا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا ، إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাদেরকে কাফিরদের জন্যে পরীক্ষার স্থল করোনা। ওগো মওলা! আমাদের অপরাধগুলো মাফ করে দাও। তুমি অবশ্যই মহাপরাক্রমশালী ও মহাবিচক্ষণ। (সূরা ৬০ আল মুমতাহানা: ৫)
এ সময় তিনি তাঁর মালিকের দরবারে আরো নিবেদন করলেন:
رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَالْحِقْنِي بِالصَّلِحِينَ وَاجْعَلْ لِي لِسَانَ صِدْqٍ فِي الْآخِرِينَ * وَاجْعَلْنِي مِنْ وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ * وَاغْفِرْ لِأَبِي إِنَّهُ كَانَ مِنَ الضَّالِّينَ . وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ . يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ .
অর্থ: পরওয়ারদিগার! আমাকে জ্ঞান-বুদ্ধি দান করো এবং নেককার লোকদের সাথে আমার মিলন ঘটিয়ে দিয়ো; পরবর্তী লোকদের মধ্যে আমাকে সত্যিকারের খ্যাতি দান করো আর আমাকে নেয়ামতে ভরা জান্নাতের ওয়ারিসদের অন্তর্ভুক্ত ক'রো। আমার পিতাকে মাফ করে দাও। তিনিতো গুমরাহদের অন্তর্ভুক্ত। আমাকে সেদিন অপমানিত করোনা, যেদিন সব মানুষকে পুনরুত্থিত করা হবে, যেদিন ধন-সম্পদ কোনো কাজে লাগবেনা, কাজে আসবেনা আওলাদ-ফরযন্দ। যেদিন মুক্তি পাবে শুধু ঐ সমস্ত মানুষ, প্রশান্ত হৃদয় নিয়ে হাযির হবে যারা। (সূরা ২৬ আশ্‌শুয়ারা: ৮৩-৮৯)
শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্র ও নির্যাতনের মুখে আল্লাহ্র খলীলকে হিজরত করতে বাধ্য করা হলো। প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগের মুহূর্তে নিজেকে সঁপে দিলেন তিনি একমাত্র ভরসাস্থল রহমানের হাতে। তিনি বললেন:
إِنِّي ذَاهِبٌ إِلَى رَبِّي سَيَهْدِينِ .
অর্থ: আমি আমার পরওয়ারদিগারের দিকে চললাম। তিনিই আমাকে পথ দেখাবেন। (সূরা ৩৭ আস্সাফফাত : ৯৯)
এক স্ত্রী এবং ভাতিজা লূতকে সাথে নিয়ে তিনি রওয়ানা করলেন। হিজরতের সময় নিঃসন্তান ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দয়াময় দাতা আল্লাহ্র নিকট দু'আ করলেন:
ربِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّلِحِينَ
অর্থ: ওগো আমার রব! আমাকে একটি সালেহ পুত্র দান করো। (সূরা ৩৭ আস্সাফফাত : ১০০)
আল্লাহ্ তাবারুক ওয়া তায়ালা স্বীয় খলীলের দু'আ কবুল করলেন। তিনি তাঁকে বৃদ্ধ বয়সে সালেহ পুত্র দান করলেন। তিনি আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন। নিজের জন্যে ও বংশধরদের জন্যে দু'আ করলেন :
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَهَبَ لِى عَلَى الْكِبَرِ اسْمَعِيلَ وَاسْحَقَ ، إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاءِ رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلوةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلُ دُعَاء رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَى وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُوْمُ الْحِسَابُ .
অর্থ: শোকর সেই আল্লাহ্, যিনি এই বার্ধক্যাবস্থায় আমাকে ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। আসলে আমার মনিব অবশ্যই দু'আ শোনেন। পরওয়ারদিগার! আমাকে নামায কায়েমকারী বানাও আর আমার সন্তানদেরকেও। ওগো প্রভু! আমার দু'আ কবুল করো। ওগো দয়াময় অভিভাবক! আমাকে, আমার পিতা মাতা আর ঈমানদার লোকদের সেদিন মাফ করে দিও, যেদিন হিসাব কার্যকর হবে। (সূরা ১৪ ইবরাহীম: ৩৯-৪১)
সন্তানদের নিয়ে আল্লাহ্ খলীল আরবের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীন প্রচার করতে লাগলেন মক্কার দিকেও দীনের আবাদ শুরু করলেন। মক্কার সেই মরু বালুকার বুকে তিনি আল্লাহ্র ঘরের নির্মাণ কাজ আরম্ভ করলেন স্নেহ প্রতীম পুত্র ইসমাঈলকে সাথে নিয়ে। এ মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দেবার প্রাক্কালে পিতা-পুত্র দু'জনে দু'আ করলেন পরওয়ারদিগারের দরবারে:
وَإِذْ يَرْفَعُ ابْرِهِمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَاسْمَعِيلُ ، رَبَّنَا تَقَبَّلُ مِنَّا ، إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ . رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةٌ مُسْلِمَةٌ لكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا : إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ . رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَبَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ ، إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ .
অর্থ: হে পরওয়ারদিগার! আমাদের এ কাজ তুমি কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি সবকিছু শোনো ও সবকিছু জানো। প্রভু! আমাদেরকে তোমার অনুগত বানাও আর আমাদের বংশধরদের মধ্য থেকেও তোমার অনুগত একটি জাতির উত্থান করো। আমাদেরকে ইবাদাতের পন্থা শিখিয়ে দাও আর ক্ষমা করে দাও আমাদের দোষ ত্রুটি। নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল ও অনুগ্রহকারী। পরওয়ারদিগার! এ জাতির মধ্যে থেকে এদের প্রতি একজন রসূল পাঠিয়ো, যিনি তাদের তোমার আয়াত সমূহ পাঠ করে শুনাবেন; কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দিবেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন। প্রভু! নিশ্চয়ই তুমি বড় শক্তিমান ও বিজ্ঞ। (সূরা ২ আল বাকারা : ১২৯-১২৯)
হযরত খলীলুল্লাহর প্রচেষ্টায় মক্কায় গড়ে উঠলো কাবা কেন্দ্রিক একটি ছোট্ট শহর। এ প্রিয় শহর ও শহরবাসীদের জন্যে দু'আ করলেন আল্লাহ্র খলীল:
رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَنْ نَعْبُدَ الْأَمْنَامَ رَبِّ إِنَّهُ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ ، فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رحيم . رَبَّنَا إِنِّي أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلوةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِى إِلَيْهِمُ وارزقهم من الثَّمَرتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ .
অর্থ: প্রভু আমার! এ শহরটাকে শান্তি ও নিরাপত্তার শহর বানিয়ে দাও। আমাকে ও আমার সন্তানদের মূর্তি পূজার পংকিলতা থেকে বাঁচাও। প্রভু! এ মূর্তিগুলো বহুসংখ্যক মানুষকে গোমরাহীতে নিমজ্জিত করেছে। তাই যে আমাকে অনুসরণ করবে সেই আমার লোক। আর যে আমার বিরুদ্ধ পন্থা অনুসরণ করবে তুমি নিশ্চয়ই ক্ষমাশীল ও দয়াবান। পরওয়ারদিগার! আমি পানি ও তরুলতাশূন্য এক মরু প্রান্তরে আমার সন্তানদের একটি অংশকে তোমার মহা সম্মানিত ঘরের নিকট এনে পুনর্বাসিত করলাম। ওগো মওলা! এ কাজ আমি এ জন্যে করেছি যেনো এরা নামায কায়েম করে। অতএব তুমি মানুষের দিলকে এদের প্রতি অনুরক্ত বানিয়ে দাও। আর খাবার জন্যে এদেরকে ফল দান করো। সম্ভবত এরা শোকর গুযার হবে। (সূরা ১৪ ইবরাহীম: ৩৫-৩৭)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00