📄 জিযিয়া
ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম যিম্মীদের নিকট থেকে এই কর আদায় করা হয় তাদের পূর্ণ নিরাপত্তার দায়িত্ব ইসলামী সরকার গ্রহণ করে বলে।
📄 অন্যান্য
এ ছাড়া আরও বহু প্রকারের কর ধার্য হতে পারে। যার পরিমাণ শরীয়াতে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি, তার জন্য বিশেষ কোন সময়কালও নির্দিষ্ট নেই। ইসলামী রাষ্ট্র সরকারই তা প্রয়োজনানুপাতে ধার্য করবে।
📄 ব্যতিক্রমধর্মী আয়
উপরে ইসলামী রাষ্ট্রের কতিপয় মৌলিক অর্থনৈতিক উৎসের উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এ কয়টিই একমাত্র চূড়ান্ত উৎস নয়। এ কয়টি ছাড়া ইসলামী রাষ্ট্রের আরও বিভিন্ন আয়ের উৎস রয়েছে। এ সব সূত্র ও উৎস থেকে যা কিছু আয় হবে তাও সর্বসাধারণ মুসলিমের সার্বিক কল্যাণে ব্যয় করা হবে। তবে সেগুলি বাধ্যতামূলক নয়। এই পর্যায়ে কতিপয় আয়ের সূত্রের উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ
(ক) আল-মাযালিমঃ ব্যক্তির বাড়াবাড়িমূলক কিংবা কর্তব্যে অবহেলামূলক কার্যকলাপে অথবা অন্য লোকের ধন-সম্পদ বিনষ্টকরণের দরুন-যা তার মালিক জানে না, তার ক্ষতি পূরণের সাথে সংশ্লিষ্ট। যার উপর জুলুম করা হলো, তার জন্য ব্যয় করার লক্ষ্যে সেই ব্যক্তির নিকট থেকে আদায় করা হবে। এই সব ক্ষেত্রে সরকার হস্তক্ষেপ করবে এবং যা কিছু জরিমানা ইত্যাদি বাবদ আদায় করা হবে তা নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করা হবে।
(খ) কয়েক প্রকারের কাফ্ফারাঃ যেমন ইচ্ছামূলক হত্যা বা ভুলবশত হত্যা, মানত রক্ষা না করার, ওয়াদা খেলাফী করা, কিরা-কসম ভঙ্গ করা-যা খাদ্য খাওয়ানো ও কাপড় পরানোর সাথে সংশ্লিষ্ট, প্রভৃতি ক্ষেত্রে আদায় করা হবে। সরকার এ সব ক্ষেত্রে কাফ্ফারা দেবার জন্য দায়ী ব্যক্তির সমস্ত দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
(গ) লুকতাঃ পড়ে পাওয়া মাল-সম্পদ, হারিয়ে যাওয়া ধন-মাল যার মালিক বহু খুঁজেও পাওয়া যায়নি। সরকার সে মালের ধারক হবে শরীয়াত আরোপিত শর্তানুযায়ী।
(ঘ) ওয়াক্ফ, অসীয়ত, সাধারণ মানত আর মিনায় হাজীদের দেয়া কুরবানীসহঃ ইসলামী হুকুমাত এসব ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করবে এবং জনগণের কল্যাণে ব্যয় করবে।
উপরে উল্লিখিত আয়ের উৎসসমূহ নিয়েই সরকার ক্ষান্ত থাকবে না। সরকার নিজেই বহু শিল্প-কারখানা, ব্যবসা, বাণিজ্য, মুদ্রা প্রচলন, বীমা, কৃষি ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব, অর্থনৈতিক শক্তির বৃদ্ধি, পানি সাপ্লাই ব্যবস্থামূলক প্রতিষ্ঠান, স্থল জল ও আকাশ পথের যানবাহন ব্যবস্থা, জলকর, ডাক-ব্যবস্থা, টেলিফোন, টেলিগ্রাম ব্যবস্থা ইত্যাদির মাধ্যমেও বিপুল আয় সরকারের হস্তগত হবে। বৈদেশিক বাণিজ্য-আমদানি ও রফতানি শুল্কও একটা বিরাট উৎস হিসেবে গণ্য।
এ প্রেক্ষিতে মনে করা যায়, ইসলামী রাষ্ট্রের আয়ের পরিমাণ তার ব্যয় বাজেটের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট হবে। কাজেই উপরে উল্লিখিত উৎসসমূহকে সীমিত ও নগণ্য মনে করা কোন ক্রমেই বাঞ্ছনীয় হতে পারে না। বরং এ সব উৎস ও সূত্র থেকে লব্ধ সম্পদ রাষ্ট্র সরকারকে তার সার্বজনীন কল্যাণ সাধনের কার্যসূচী সফল করার জন্য যথেষ্ট হবে। বলা যায়, শুধু যাকাত যদি রীতিমত পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব-নিকেশ ও কড়াকড়ি করে আদায় করা হয়, তাহলে জনগণের সাধারণ দারিদ্র্য ও অভাব-অনটন অনায়াসেই দূর হয়ে যাবে। জনগণের মধ্যে সাধারণ সচ্ছলতা দেখা দেবে। এ কথা জোর দিয়েই বলা যায়। ধনীরা যদি তাদের উপর ফরযরূপে যাকাত নিয়মিতভাবে ও সঠিক হিসেব করে দিয়ে দেয়, তাহলে দেশে দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনের নাম-চিহ্নও কোথাও থাকবে না। যাকাত আল্লাহ্ ফরযই করেছেন সর্বকালের সকল সমাজের সাধারণ দারিদ্র্য দূর করার প্রধান ও কার্যকর মাধ্যম হিসেবে। যাকাতের হিসেব ও দেয় পরিমাণ শরীয়াত কর্তৃক যাই নির্ধারিত হয়েছে, তাই জনগণের দারিদ্র্য দূরকরণ ও সাধারণ সচ্ছলতা বিধানে এতই কার্যকর, যার কোন তুলনা দুনিয়ার অর্থ ব্যবস্থাসমূহের মধ্যে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
তাছাড়া ইসলামী রাষ্ট্র নির্দিষ্ট কতিপয় আয়ের উৎসের উপর এমনভাবে একান্ত নির্ভরশীলও নয় যে, এ কয়টি উৎস থেকে যা আয় হবে, তাই হবে তার একমাত্র ধন। বস্তুত ইসলামী রাষ্ট্র আল্লাহ্ বিধানভিত্তিক এক ক্ষমতাবান রাষ্ট্র। সাধারণ আয়ের উৎস থেকে লব্ধ সম্পদ তার দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট না হলে প্রয়োজন পরিমাণ আরও অধিক আয়ের জন্য নতুন নতুন পথ ও পন্থা গ্রহণ করার পূর্ণ ইখতিয়ার তার রয়েছে এবং তদ্দ্বারা তার সার্বিক কল্যাণমূলক বিরাট দায়িত্ব পালনের জন্য উপায় গ্রহণ করতে পারবে।
এক কথায় বলা যায়, ইসলামী রাষ্ট্র আল্লাহর জমীনে আল্লাহর খিলাফত প্রতিষ্ঠাকারী রাষ্ট্র। আর আল্লাহ্ সমগ্র বিশ্বলোকের একমাত্র স্রষ্টা। এখানকার শক্তি ও সম্পদের নিরংকুশ মালিক। দুনিয়ার সব কিছুই তিনি মানুষের সার্বিক কল্যাণে নিয়োজিত করে রেখেছেন। এ থেকে ব্যক্তি যেমন তার প্রয়োজন পূরণের অধিকারী ব্যক্তিগত দখল (Possession)-এর মাধ্যমে নিরংকুশ মালিকানা অধিকার ছাড়াই, তেমনি রাষ্ট্র ও তার কল্যাণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য পূর্ণ অধিকারী ও দায়িত্বশীল। ব্যক্তিদের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে এই রাষ্ট্র ও সরকার গঠিত, পরিচালিত, নিয়ন্ত্রিত, তেমনি রাষ্ট্র আল্লাহ্ অনুমোদন প্রাপ্ত ও জনগণের সার্বিক সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত বলে শরীয়াতের সীমার মধ্যে থেকে শরীয়াতেরই দাবি পূরণের যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণের অধিকারী। তা যেমন রাজতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক কিংবা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র বা সরকার নয়, তেমনি নয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে গড়ে না-উঠা ও না-চলা রাষ্ট্র।
অতএব এই রাষ্ট্র মানুষের মর্যাদা ও অধিকার সংরক্ষণের জন্য পুরা মাত্রায় দায়িত্বশীল। এই রাষ্ট্রই সক্ষম মানুষের বৈষয়িক ও পরকালীন-বস্তুগত ও নৈতিক-দৈহিক ও মানসিক যাবতীয় চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ করতে। মানবতার সার্বিক কল্যাণ কেবলমাত্র এই রাষ্ট্রের উপরই একান্তভাবে নির্ভরশীল। এরূপ রাষ্ট্রই মজলুম, বঞ্চিত মানবতার একমাত্র আশা ভরসার শেষ লক্ষ্যস্থল।
وَآخِرُ دَعَوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ