📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 বহিরাগতদের তৎপরতা ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ

📄 বহিরাগতদের তৎপরতা ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ


ইসলামী রাষ্ট্রের তৃতীয় পর্যায়ের সাধারণ শান্তিরক্ষা ও সংবাদ সংগ্রহমূলক কাজ হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে শত্রু পক্ষীয় লোকজনের আগমন, গতিবিধি ও তৎপরতা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সতর্কতার দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করা। কেননা দুনিয়ার কোন রাষ্ট্রই দেশের অভ্যন্তরে পঞ্চম বাহিনীর উদ্ভবকে বরদাশত করতে পারে না, পারে না সেইরূপ অবস্থার কোনরূপ সুযোগ করে দিতে। কেননা তা-ই বহু রাষ্ট্র ও সরকারের পতনের কারণ হয়ে দেখা দেয়। স্বয়ং নবী করীম (স)-ও এই নীতি অবলম্বন ও পুরাপুরি কার্যকর করেছিলেন। আর এই উপায়ে তিনি শত্রুদের বহু ষড়যন্ত্র ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম রোধ করতে ও তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
নবী করীম (স)-এর গোটা জীবন ও তৎপরতা প্রমাণ করে যে, তিনি এ উপায়ে বহু শত্রুকে সত্য দ্বীন-ইসলামের নিকট নতি স্বীকার করতে বাধ্য করেছিলেন। আর এই তৎপরতার লক্ষ্যও ছিল তাই। এর ফলে তিনি বহু রক্তপাত এড়িয়ে যেতেও সক্ষম হয়েছিলেন।
নবী করীম (স) নিজে যেসব যুদ্ধ-জিহাদে অংশ গ্রহণ করতেন কিংবা শত্রুদের মুকাবিলা করার জন্য কোন বাহিনী কোথাও পাঠাতেন, তার মূলে নিহিত উদ্দেশ্য থাকত শত্রুদের ঐক্যবদ্ধতা ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়া। তাদের ঐক্যের কাতারে ব্যাপক ভাঙ্গন ধরানো। কেননা তিনি জানতেন, ইসলামের পথের সমস্ত প্রতিবন্ধকতা দূরীভূত হয়ে গেলে ইসলামের মর্মস্পর্শী মহাসত্যের বাণী জনগণের হৃদয়-মনকে সহজেই স্পর্শ করবে ও দ্বীন গ্রহণ করতে তাদের আর কোন বিলম্ব হবে না।
বস্তুত কাফির শত্রুরা যখন ঐক্যশক্তি হারিয়ে ফেলে এবং ইসলাম ও মুসলমানদের উপর বিজয়ী হতে পারার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে যায়, মানুষ তখন তার স্বাভাবিক প্রবণতার দিকে প্রত্যাবর্তন করে নির্ভুল পথের সন্ধানে খুব বেশী আগ্রহী ও উদ্যোগী হয়ে পড়ে, ঠিক তখন-ই ইসলাম তাদের দিলে প্রবেশ করতে পারে। পারে তাকে টেনে এনে ইসলামী মুজাহিদদের কাতারে দাঁড় করে দিতে। এ তত্ত্বের সত্যতা ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। কেননা বহু সংখ্যক জাতি-গোত্র ও জনগোষ্ঠী ইসলামী শক্তির নিকট পরাজিত হয়ে সত্য পথ প্রাপ্তির দ্বারে উপস্থিত হয়েছে এবং সত্যকে গ্রহণ করে জীবনকে ধন্য করতেও প্রস্তুত হয়ে গেছে।
মক্কা বিজয়ের ঘটনা দ্বারা এ কথা দিনের আলোর মতই স্পষ্ট, উজ্জ্বল ও উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।
নবী করীম (স) জানতেন যে, মক্কা বিজিত হলে শত্রুদের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিলে এবং জনগণ শান্ত-নির্ঝঞ্ঝাট পরিমন্ডলে গভীর সূক্ষ্ম অনাসক্ত দৃষ্টিতে চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ পেলে খুব বেশী দিন অতিবাহিত হওয়ার আগেই তারা তাদের সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা দ্বীন-ইসলামের যৌক্তিকতা অনুধাবন করতে পারবে এবং পরিশেষে কবুল করতেও বিলম্ব হবে না। এ কারণে তিনি মক্কার কুরাইশদের উপর বিজয়ী হবেন-এ বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলেন এবং এ সংকল্পও তাঁর ছিল যে, এ বিজয় সার্বিক হতে হবে। এ কাজ সম্ভব হতে পেরেছিল গোটা পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে গোপন থাকার ও কারোরই সে বিষয়ে একটি অক্ষরও জানতে না পারার কারণে। বস্তুত রাসূলে করীম (স)-এর মক্কা আক্রমণের পরিকল্পনা কোন একজন সাহাবীরও জানা ছিল না। কেবলমাত্র হযরত হাতিব ইবনে আবূ বলতায়া (রা) রাসূলে করীম (স)-এর ব্যস্ততা ও উদ্বিগ্নতা দেখে নিজেই আঁচ করেছিলেন এবং এবারের লক্ষ্য মক্কা হতে পারে বলে মনে করেছিলেন। তাঁর পরিবারবর্গ তখনও মক্কায় অবস্থান করছিল। তাদের নিরাপত্তার কোন বিগ্ন হতে পারে মনে করে মক্কাগামী এক বৃদ্ধার মাধ্যমে কুরাইশ সরদারদের নিকট লিখিত এক পত্রে এ কথা জানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নবী করীম (স) যথাসময় অবহিতি লাভ করেন ও এক বাহিনী পাঠিয়ে সেই চিঠি উদ্ধার করেন। এই প্রেক্ষিতেই কুরআন মজীদের এ আয়াতটি নাযিল হয়ঃ
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَآءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِم بِٱلْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُواْ بِمَا جَآءَكُم مِّنَ ٱلْحَقِّ يُخْرِجُونَ ٱلرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَن تُؤْمِنُواْ بِٱللَّهِ رَبِّكُمْ (الممتحنة: (١)
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধু-পৃষ্ঠপোষক বানিয়ো না, ভালোবাসা পোষণ করে তাদেরকে (গোপন কথা) জানিয়ে দাও, অথচ ওরা অমান্য-অস্বীকার করেছে সেই মহাসত্যকে যা তোমাদের নিকট এসেছে। ওরা রাসূলকে এবং বিশেষ করে তোমাদেরকে (মক্কা থেকে) বহিষ্কৃত করেছে শুধু এই অপরাধে যে, তোমরা তোমাদের রব্ব আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখো।
এভাবে রাসূলে করীম (স) নিজ শাসন এলাকায় শত্রুদের পক্ষে কোন গোয়েন্দাগিরি (Spying) করতে দেন নি। যখনই এই পর্যায়ে কোন কাজ হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি তা জানতে পেরে সমস্ত পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিয়েছেন।
ইমাম আবূ ইউসুফ লিখেছেনঃ ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষে এরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য যে, মুশরিক দেশে যাওয়ার পথসমূহে সীমান্তবর্তী সশস্ত্র রক্ষীবাহিনী থাকবে, তারা সেদিকে গমনকারী বা তথা থেকে আগমনকারী ব্যবসায়ীদের তল্লাশী চালাবে। গমনাগমনকারীদের নিকট অস্ত্র-শস্ত্র পাওয়া গেলে তা কেড়ে নেবে, কারোর নিকট পত্রাদি থাকলে তা পড়ে দেখবে। তাতে মুসলমানদের কোন গোপন ও অপ্রকাশনীয় তত্ত্ব বা তথ্য লিখিত থাকলে তাকে পাকড়াও করবে এবং তাকে সরকারে সোপর্দ করবে তার বিচার করার উদ্দেশ্যে।
ইসলামী রাজ্যের যেসব লোক বিদেশী শক্তির স্বার্থে গোয়েন্দাগিরি করে, ইসলাম তাদের ব্যাপারে কঠোর নীতি অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। অনুরূপভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন বসবাসকারী অমুসলিম নাগরিক (যিম্মী) রাও যদি বিদেশী শক্তির স্বার্থে ও তার নির্দেশে ইসলামী রাজ্যের অভ্যন্তরে কোন গোয়েন্দাগিরি করে, তাহলে যিম্মীদের নাগরিকত্ব লাভের প্রধান শর্তই ভঙ্গ করা হবে। কেননা যিম্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক হচ্ছেঃ
তারা মুসলমানদের কোনরূপ কষ্ট দেবে না, মান-সম্মান-আবরু নষ্ট করার মত কোন কাজ-যেমন মুসলিম নারীর সাথে ব্যভিচার, অন্যান্য চরিত্রহীতার কাজ, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই করে তাদের ধন-মাল হরণ এবং বাইরের মুশরিক-ইসলাম দুশমনদের জন্য গোয়েন্দাগিরি করা ইত্যাদি কাজ করবে না। এর কোন একটি কাজ-ও করলে তাদের নাগরিকত্বের শর্ত চূর্ণ হয়ে যাবে।
যিম্মীদের জন্য এই বাধ্যবাধকতাও রয়েছে যে, তারা দেশের মুসলমানদের কোন গোপন খবর বাইরের শত্রুদের নিকট পৌছাবে না, তাদের গোপন প্রস্তুতি ও শক্তি-সামর্থ সম্পর্কেও তাদেরকে অবহিত করবে না। কেউ তা করলে সে তার নাগরিকত্বের শর্ত ভঙ্গ করেছে বলে ধরে নিতে হবে। তখন তার রক্ত হালাল। অতঃপর তার ব্যাপারে আল্লাহ্, রাসূল ও মু'মিনদের কোন দায়িত্ব (যিম্মাদারী) থাকলো না
কাযী আবূ ইউসুফ লিখেছেনঃ
আপনি গোয়েন্দা কর্মে লিপ্ত লোকদের ফয়সালা জানতে চেয়েছেন, যাদেরকে পাকড়াও করা হবে। তারা হয় যিম্মী হবে, না হয় যুদ্ধকারী শত্রুপক্ষের লোক হবে অথবা মুসলমান হবে।
তারা যদি সামরিক প্রতিপক্ষের লোক হয় কিংবা হয় যিম্মী-যারা জিযিয়া দেয়, তারা ইয়াহুদী, খৃস্টান ও অগ্নিপূজারী যা-ই হোক, তাদের হত্যা করতে হবে, আর যদি মুসলমানদের কেউ হয়- ইসলাম পালনে সুপরিচিত, তাহলে তাকে কঠিন যন্ত্রণার দণ্ডে দণ্ডিত করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদী আটকে বন্দী করতে হবে- যেন শেষ পর্যন্ত সে তওবা করতে পারে।
বস্তুত বিদেশী শক্তির পক্ষে ইসলামের রাজ্যে গোয়েন্দাগিরি করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধরূপে গণ্য। এ বিষয়ে ইসলামে মৌল নীতিই দেয়া হয়েছে, বিস্তারিত ও খুটিনাটি আইন দেয়া হয়নি। কেননা গোয়েন্দাগিরির কোন স্থায়ী একটি মাত্র রূপ বা ধরন নেই। তা নিত্য নতুন রূপে সংঘটিত হতে পারে। তাই ইসলামের মৌলনীতির ভিত্তিতে বিস্তারিত আইন-বিধি রচনা করার দায়িত্ব ইসলামী রাষ্ট্রের উপর অর্পিত। রাসূলে করীম (স) এজন্য খবর সংগ্রহকারী লোক নিয়োগ করেছেন এবং তাদের দেয়া সংবাদের ভিত্তিতে তিনি যুদ্ধ কৌশল রচনা করেছেন, তা ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত।
ইয়াফে, নামক মদীনার এক ব্যক্তির ক্রীতদাস ছিলেন হযরত জায়দ ইবনে আরকম। তাঁকে মদীনার মুনাফিকদের উপর দৃষ্টি রাখার জন্য দায়িত্বশীল নিযুক্ত করা হয়েছিল। বনু মুস্তালিক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনকালে প্রধান মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই গোপনভাবেই বলেছিলঃ 'মদীনায় পৌঁছার পর আমাদের মধ্যকার অধিক সম্মানিত ব্যক্তি অধিক হীন ব্যক্তিকে বহিষ্কার করবে'। হযরত জায়দ তা শুনতে পেয়ে উপস্থিতভাবে তাকে যা বলার তা তো বললেনই, সঙ্গে সঙ্গে তা নবী করীম (স)-কে জানিয়ে দিলেন।
ইসলামী রাষ্ট্রকে এজন্য লোকদেরকে বিশেষ শিক্ষা প্রশিক্ষণে তৈরী করতে ও সংশ্লিষ্ট কাজে বিশেষ দক্ষ, সাহসী ও সুকৌশলী বানাতে হবে। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, এর উপর যেমন ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নির্ভরশীল, অনুরূপভাবে মুসলিম জনগণের ইসলামী জীবন যাপন ও ইসলামী আইন-বিধানের পূর্ণ কার্যকরতাও এরই উপর নির্ভর করে। তাই এই বিভাগটিই ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য একান্তই অপরিহার্য।

টিকাঃ
১. كتاب الخارج لابي يوسف طبعه القاهرة ١٠٢ الخ ..
২. شرائع الاسلام كتاب الجهاد ص ۲۲۹ . تذكرة الفقهاء ج ١ ص ٤٤٢
৩. কানযুল উম্মাল খিররাজ স : ২০৫-২০৬
৪. মাজমাউল বায়ান খন্ড ৫ পৃ :২৯৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00