📄 সরকারী কর্মচারীদের পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ
ইসলামী রাষ্ট্রের বাস্তবতামূলক প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের কল্যাণ সাধন এবং পূর্ণ আমানতদারী ও বিশ্বস্ততা সহকারে আল্লাহ্ আইন-বিধানসমূহ পুরাপুরি কার্যকর করা। তাই এ উদ্দেশ্যে নিয়োজিত জনগণের ধন-ভান্ডার থেকে নিয়মিত বেতন ভাতা প্রাপ্ত লোকেরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে কিনা, সেদিকে অবশ্যই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইসলামের বিশেষ চেষ্টা থাকে, সরকারী দায়িত্বপূর্ণ পদে সর্বাধিক যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদের নিয়োগ, যেন জনগণ সর্বাধিক উন্নত মানের খেদমত (service) লাভ করতে পারে। ইসলামের এই লক্ষ্য পুরামাত্রায় অর্জিত হচ্ছে কিনা, কর্মচারীবৃন্দ সততা, নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতা সহকারে দায়িত্ব পালন করছে কিনা, জনগণের সাথে আদর্শিক ও মানবিক আচরণ গ্রহণ করছে কিনা, তা-ও সরকারী কর্তৃপক্ষকে তীক্ষ্ণভাবে দেখতে হবে। অন্যথায় ইসলামী রাষ্ট্র তার আসল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে যাবে। এ কারণে নবী করীম (স) যখনই বাইরে কোথাও কোন বাহিনী প্রেরণ করতেনঃ
بَعَثَ مَعَهُ مِنْ ثِقَاتِهِ مَنْ يَتَجَسَّسُ لَهُ خَبْرَهُ .
তখন তিনি তার সাথে এমন সব বিশ্বস্ত নির্ভরযোগ্য লোক পাঠাতেন যারা বাহিনীর লোকদের খবরাখবর জেনে রাসূলে করীম (স)-কে জানাত।
হযরত আলী (রা) খলীফাতুল মুসলিমীন হিসেবে মালিক আল্শ্তারকে লিখিত পত্রে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তিনি যেন তাঁর নিয়োজিত কর্মচারীদের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য লোক নিয়োগ করেন। এ পর্যায়ে তাঁর নির্দেশ ছিলঃ
وابعث العيون من اهل الصدق والوفاء عليهم فان تعاهدك في السر لا مورهم حدوة لهم على استعمال الامانه والرفق بالرعية وتحفظ من الاعون فان احد منهم بسط يده الى خيانة اجتمعت بها عليه عندك اخبار عيونك اكتفيت بذلك شاهدا فبسطت عليه العقوبة في بدنه واخذته بما اصاب من عمله ثم نصبته بمقام المذلة وسمته بالخيانة قلدته عار التهمة .
সরকারী কর্মচারীদের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত লোক নিয়োগ কর। তারা যদি গোপনে তাদের ব্যাপারাদি তোমাকে জানাতে থাকে, তাহলে আমানত রক্ষা ও জনগণের প্রতি দয়ার্দ্রতা প্রদর্শনে তারা সতর্ক ও সক্রিয় হবে। এদের সহযোগিতায় তুমিও রক্ষা পাবে। তোমার নিকট যদি এমন খবর পৌঁছায় যে, তারা বিশ্বাসভঙ্গের উদ্যোগ নিচ্ছে, তাহলে তোমার নিযুক্ত খবরদাতা লোকদেরকে সেজন্য সাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করবে। পরে তাদের উপর শান্তি প্রয়োগ করবে এবং তারা কাজের যে ক্ষতি সাধন করেছে, তার পূরণ করতে পারবে। পরে অপরাধীদের লাঞ্ছিত করবে বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে দায়ী করে এবং একটা লজ্জা তাদের গলায় ঝুলিয়ে দেবে।
বস্তুত গোপন উপায়ে জনগণের ও সরকারী কর্মচারীদের বিশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাওয়া-অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে এবং বৈদেশিক ক্ষেত্রে অন্যান্য রাষ্ট্রের গোপন তত্ত্ব উদ্ঘাটন করার প্রচলন প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে। তবে পূর্বে এ ব্যাপারটি আধুনিক কালের মত খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বর্তমানে তো এটা একটা বৈজ্ঞানিক পর্যায়ে উন্নীত বিষয়। উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রে তা একটি বিষয়রূপে গণ্য হয়ে রয়েছে।
টিকাঃ
১. الحكومة الاسلامية ص: ٦٠٢
২. نهج البلاغة قسم الكتب الرقم ٥٣
📄 শত্রু-সৈন্যদের তৎপরতা পর্যবেক্ষণ
স্বয়ং নবী করীম (স) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে পুরাপুরি কার্যকর করে তুলেছিলেন - বিশেষ করে শত্রু পক্ষের সেনাবাহিনীর চলাচল ও গতিবিধি সম্পর্কে সঠিক সংবাদ পাওয়ার সুষ্ঠু ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা করেছিলেন- এই ব্যবস্থার সাহায্যে যথেষ্ট কল্যাণ লাভ করেছেন। তাঁরা সামরিক বিজয়ে এই বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে, রাসূলে করীম (স)-এর যুদ্ধজয়ের ইতিহাসে তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে রয়েছে।
রাসূলে করীম (স) নিয়োজিত ব্যক্তিরা গোপনে প্রতিপক্ষের তৎপরতা ও গতিবিধি যা কিছু দেখতে পেত, তার যথাযথ বিবরণ তাঁকে জানিয়ে দিত। ফলে নবী করীম (স) শত্রুর মুকবিলায় আগাম পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন এমন ভাবে যে, শত্রুপক্ষ কিছুই কল্পনা করতে পারত না। তারা তাদের পদক্ষেপের পূর্বেই আকস্মিকভাবে আক্রান্ত হয়ে যেমন ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ত, তেমনি ইসলামী বাহিনীর নিকট পরাজিত হয়ে চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ত। কুরআন মজীদের একটি সূরা'র নিম্নোদ্ধৃত শব্দগুলি সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে।
وَالْعَدِيتِ صَبْحًا . فَالْمُورِيتِ قَدْحًا . فَالْمُغِيرَتِ صُبحا (العديت : ١-٣)
শপথ সেই (ঘোড়াগুলির), যা হেষা ধ্বনি করে দৌড়ায়, পরে (নিজেদের ক্ষুর দিয়ে) অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ঝাড়ে, আর অতি প্রত্যুষকালে আকস্মিক আক্রমণ চালায়।
নবী করীম (স) বলেছেনঃ
اكْمِنِ النَّهَارَ وَسِرِ الَّيْلَ وَلَا تُفَارِقْكَ الْعَيْنُ .
দিনের বেলা লুকিয়ে থাকবে, রাত্রিবেলা চলবে এবং গোয়েন্দা সাহায্য যেন কখনই বিচ্ছিন্ন না হয়।
১. বদর যুদ্ধে নবী করীম (স) সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে সঙ্গে নিয়ে মদীনা থেকে বের হয়ে পড়লেন। পথিমধ্যে এক আরব গোত্রপতির বাড়িতে অবস্থান নিলেন। তিনি কুরাইশদের সম্পর্কে খবরাখবর জানবার জন্য চেষ্টা করলেন। তিনি আরব গোত্রপতিকে কুরাইশ এবং মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের সম্পর্কে চিন্তাভারাক্রান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন। জবাবে গোত্র প্রধান বললঃ শুনেছি, মুহাম্মাদ (স) ও তাঁর সঙ্গীরা অমুক দিন মদীনা থেকে বের হয়ে এসেছেন। এই খবর সত্য হলে আজ তাঁর আমার এই স্থানে উপস্থিত হওয়ার কথা। আর এ-ও খবর পেয়েছি যে, তারাও অমুক দিন মক্কা থেকে বের হয়ে এসেছে। এ খবর সত্য হলে আজ তাদের অমুক স্থানে উপস্থিত হওয়ার কথা-সেটা ঠিক সেই স্থানই ছিল, যেখানে কুরাইশরা সেই দিন অবস্থান নিয়েছিল।
২. 'বদর'-এ উপস্থিত হয়ে নবী করীম (স) চতুর্দিকে লোক পাঠিয়ে দিলেন কুরাইশদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর সংগ্রহের জন্য। তাঁরা দুইজন ক্রীতদাস ধরে নিয়ে এলেন। তাদের নিকট থেকে কুরাইশ বাহিনীর অবস্থান, তার লোকসংখ্যা এবং নেতৃত্বে কারা কারা রয়েছে ইত্যাদি সর্ববিষয়ে আগাম খবর পাওয়া গেল। নবী করীম (স) সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে বললেনঃ
هَذِهِ مَكَّةٌ قَدْ الْقَتْ إِلَيْكُمْ أَفَلَا ذَكَيْدِهَا .
এবারে মক্কা তার কলিজার টুকরাগুলিকে তোমাদের সম্মুখে পেশ করে দিয়েছে।'
মোটকথা, রাসূলে করীম (স) নিজে বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য ও যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদেরকে ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে শত্রু বাহিনীর মধ্যে ও তাদের এলাকায় গোয়েন্দাগিরির কাজে নিযুক্ত করতেন, তাদের পাঠানো খবরের ভিত্তিতে তিনি যুদ্ধের কৌশল তৈয়ার করতেন এবং শত্রু পক্ষের সব পরিকল্পনাকে ব্যর্থ ও নিষ্ফল করে দিতেন।
রাসূলে করীম (স.) আবদুল্লাহ্ ইবনে জাহাশ (রা)-কে একটি গোয়েন্দা বাহিনীর নেতা বানিয়ে মক্কায় পাঠালেন। সঙ্গে একখানি মুখ বন্ধ করা পত্র দিয়ে দিলেন। বললেন, দুইদিন দুইরাত্রি পথ চলার পর এই পত্র খুলে পড়বে এবং তাতে যে নির্দেশ লেখা রয়েছে, সেই অনুযায়ী কাজ করবে। দুইদিন পথ চলার পর পত্রখানা খোলা হলে দেখা গেল, তাতে লিখিত রয়েছেঃ
إِذَا نَظَرْتُ فِي كِتَابِي هَذَا فَامْضِ حَتَّى تَنْزِلَ نَخْلَةَ بَيْنَ مَكَّةَ وَالطَّائِفِ فَتَرَصَّدُ بِهَا قَرِيشًا وَتَعْلَمُ لَنَا مِنْ أَخْبَارِهِمْ .
আমার এই পত্র পাঠ করার পর কিছু দূর চললেই মক্কা ও তায়েফ-এর মধ্যবর্তী নাখালা নামক স্থানে (অথবা খেজুর বাগানে) উপস্থিত হবে এবং তথায় ঘুপটি মেরে বসে থেকে কুরাইশদের সম্পর্কে খবরাখবর জানবে এবং আমাদের আগাম জানাবে।'
খন্দকের যুদ্ধে কুরাইশ এবং ইয়াহুদী ও গাতফান ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নেমেছিল। এই সময় নবী করীম (স) এমন এক কৌশল অবলম্বন করেছিলেন যে, তার ফলে তাদের মধ্যে অনৈক্য ও বিরোধ সৃষ্টি হয়। বেঁধে যায়। পরে তিনি হুযায়ফাতা ইবনুল-ইয়ামান (রা) কে পাঠিয়ে তাদের ভেতরকার অবস্থা জানবার ব্যবস্থা করেছিলেন। বলা বাহুল্য, রাসূলে করীম (স) গৃহীত কৌশল এক শত ভাগ সফল হয়েছিল। হুযায়ফাতুল ইয়ামান (রা) কুরাইশদের ইচ্ছা, সংকল্প ও যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পর্কে নবী করীম (স)কে পূর্ণ ও বিস্তারিত খবর দিয়েছিলেন।
ঐতিহাসিকভাবে এই সত্য প্রমাণিত যে, নবী করীম (স) কর্তৃক শত্রুপক্ষ সম্পর্কে আগাম খবর জানার জন্য গৃহীত এই পন্থা ছিল তদানীন্তন আন্তর্জাতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অভিনব। সেকালের কোন রাষ্ট্রনায়ক বা সমর-অধ্যক্ষের পক্ষে এ ধরনের কোন কর্মপন্থা গ্রহণের চিন্তা করাও সম্ভব হয়নি। এ থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় আল্লাহ্র এই কথার সত্যতাঃ;
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا - وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ (العنكوت: ٦٩)
আর যারাই কেবলমাত্র আমাদের জন্য ও আমাদের দেখিয়ে দেয়া পথে জিহাদ করবে, আমরা অবশ্যই তাদেরকে আমাদের নির্ভুল পথ ও উপায় পন্থাসমূহ জানিয়ে দেব। আর বস্তুতই আল্লাহ্ তো কেবল তাদের সঙ্গেই রয়েছেন যারা ঐকান্তিক নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও আত্মোৎসর্গের ভাবধারাসম্পন্ন।
এই সত্যের প্রতি লক্ষ্য রেখেই চিন্তাশীল ব্যক্তিরা বলেছেনঃ একজন সদা সচেতন মেধাবী-প্রতিভাসম্পন্ন সূক্ষ্ম খবর সংগ্রহকারী লোক বিশ হাজার যোদ্ধার তুলনায় যুদ্ধের ময়দানে অধিক কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
তাবুক যুদ্ধে রওয়ানার সময় নবী করীম (স) তাঁর লোক মারফত খবর পেয়েছিলেন যে, মদীনারই একটি বাড়িতে কিছু সংখ্যক মুনাফিক একত্রিত হয়ে লোকদিগকে যুদ্ধযাত্রায় বিলম্ব করার জন্য উসকানী দিচ্ছে। তিনি এ খবর পাওয়ার পর হযরত তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রা)-কে কতিপয় লোক সহ তথায় পাঠিয়ে দিলেন এবং সেই সভা-গৃহকে জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তা-ই করা হয়েছিল।
এ থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায়, নবী করীম (স)-এর বিশ্বস্ত নির্ভরযোগ্য লোক মদীনার সর্বত্র নিয়োজিত ছিল যাবতীয় খবরাখবর যথাসময় তাঁর নিকট পৌঁছাবার জন্য। উক্ত ঘটনা তার ফলেই সম্ভব হয়েছিল। ফলে মদীনার ইয়াহুদীরা অত্যন্ত গোপনে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যত ষড়যন্ত্রই করেছে, তা সব আগাম খবর পেয়ে তিনি ছিন্নভিন্ন ও ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন।
খায়বর যুদ্ধে ইয়াহুদীদের সুরক্ষিত প্রাচীনতর দুর্গজয় করাও নবী করীম (স)-এর পক্ষে এই পন্থার সাহায্যে সহজ ও সম্ভব হয়েছিল।
এই প্রেক্ষিতে চূড়ান্ত কথা হলো, ইসলামী রাষ্ট্রকে সংবাদ সংগ্রহের ব্যবস্থাকে অত্যাধুনিক সাজ-সজ্জা সহকারে প্রতিষ্টিত করতে হবে।
টিকাঃ
১. বলা বাহুল্য লোকটি রাসূলে করীম (স)-কে চিনতে পারেনি।
২. سيرة ابن هشام ج ۱، ص ٦١٢-٦١٧
৩. سيرة ابن هشام ج ۱، ص ٦٠٢
৪. ঐ, ২য় খন্ড, পৃ ২৩২; ৪২: مغازی الواقدی ص
📄 বহিরাগতদের তৎপরতা ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ
ইসলামী রাষ্ট্রের তৃতীয় পর্যায়ের সাধারণ শান্তিরক্ষা ও সংবাদ সংগ্রহমূলক কাজ হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে শত্রু পক্ষীয় লোকজনের আগমন, গতিবিধি ও তৎপরতা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সতর্কতার দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করা। কেননা দুনিয়ার কোন রাষ্ট্রই দেশের অভ্যন্তরে পঞ্চম বাহিনীর উদ্ভবকে বরদাশত করতে পারে না, পারে না সেইরূপ অবস্থার কোনরূপ সুযোগ করে দিতে। কেননা তা-ই বহু রাষ্ট্র ও সরকারের পতনের কারণ হয়ে দেখা দেয়। স্বয়ং নবী করীম (স)-ও এই নীতি অবলম্বন ও পুরাপুরি কার্যকর করেছিলেন। আর এই উপায়ে তিনি শত্রুদের বহু ষড়যন্ত্র ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম রোধ করতে ও তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
নবী করীম (স)-এর গোটা জীবন ও তৎপরতা প্রমাণ করে যে, তিনি এ উপায়ে বহু শত্রুকে সত্য দ্বীন-ইসলামের নিকট নতি স্বীকার করতে বাধ্য করেছিলেন। আর এই তৎপরতার লক্ষ্যও ছিল তাই। এর ফলে তিনি বহু রক্তপাত এড়িয়ে যেতেও সক্ষম হয়েছিলেন।
নবী করীম (স) নিজে যেসব যুদ্ধ-জিহাদে অংশ গ্রহণ করতেন কিংবা শত্রুদের মুকাবিলা করার জন্য কোন বাহিনী কোথাও পাঠাতেন, তার মূলে নিহিত উদ্দেশ্য থাকত শত্রুদের ঐক্যবদ্ধতা ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়া। তাদের ঐক্যের কাতারে ব্যাপক ভাঙ্গন ধরানো। কেননা তিনি জানতেন, ইসলামের পথের সমস্ত প্রতিবন্ধকতা দূরীভূত হয়ে গেলে ইসলামের মর্মস্পর্শী মহাসত্যের বাণী জনগণের হৃদয়-মনকে সহজেই স্পর্শ করবে ও দ্বীন গ্রহণ করতে তাদের আর কোন বিলম্ব হবে না।
বস্তুত কাফির শত্রুরা যখন ঐক্যশক্তি হারিয়ে ফেলে এবং ইসলাম ও মুসলমানদের উপর বিজয়ী হতে পারার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে যায়, মানুষ তখন তার স্বাভাবিক প্রবণতার দিকে প্রত্যাবর্তন করে নির্ভুল পথের সন্ধানে খুব বেশী আগ্রহী ও উদ্যোগী হয়ে পড়ে, ঠিক তখন-ই ইসলাম তাদের দিলে প্রবেশ করতে পারে। পারে তাকে টেনে এনে ইসলামী মুজাহিদদের কাতারে দাঁড় করে দিতে। এ তত্ত্বের সত্যতা ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। কেননা বহু সংখ্যক জাতি-গোত্র ও জনগোষ্ঠী ইসলামী শক্তির নিকট পরাজিত হয়ে সত্য পথ প্রাপ্তির দ্বারে উপস্থিত হয়েছে এবং সত্যকে গ্রহণ করে জীবনকে ধন্য করতেও প্রস্তুত হয়ে গেছে।
মক্কা বিজয়ের ঘটনা দ্বারা এ কথা দিনের আলোর মতই স্পষ্ট, উজ্জ্বল ও উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।
নবী করীম (স) জানতেন যে, মক্কা বিজিত হলে শত্রুদের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিলে এবং জনগণ শান্ত-নির্ঝঞ্ঝাট পরিমন্ডলে গভীর সূক্ষ্ম অনাসক্ত দৃষ্টিতে চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ পেলে খুব বেশী দিন অতিবাহিত হওয়ার আগেই তারা তাদের সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা দ্বীন-ইসলামের যৌক্তিকতা অনুধাবন করতে পারবে এবং পরিশেষে কবুল করতেও বিলম্ব হবে না। এ কারণে তিনি মক্কার কুরাইশদের উপর বিজয়ী হবেন-এ বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলেন এবং এ সংকল্পও তাঁর ছিল যে, এ বিজয় সার্বিক হতে হবে। এ কাজ সম্ভব হতে পেরেছিল গোটা পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে গোপন থাকার ও কারোরই সে বিষয়ে একটি অক্ষরও জানতে না পারার কারণে। বস্তুত রাসূলে করীম (স)-এর মক্কা আক্রমণের পরিকল্পনা কোন একজন সাহাবীরও জানা ছিল না। কেবলমাত্র হযরত হাতিব ইবনে আবূ বলতায়া (রা) রাসূলে করীম (স)-এর ব্যস্ততা ও উদ্বিগ্নতা দেখে নিজেই আঁচ করেছিলেন এবং এবারের লক্ষ্য মক্কা হতে পারে বলে মনে করেছিলেন। তাঁর পরিবারবর্গ তখনও মক্কায় অবস্থান করছিল। তাদের নিরাপত্তার কোন বিগ্ন হতে পারে মনে করে মক্কাগামী এক বৃদ্ধার মাধ্যমে কুরাইশ সরদারদের নিকট লিখিত এক পত্রে এ কথা জানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নবী করীম (স) যথাসময় অবহিতি লাভ করেন ও এক বাহিনী পাঠিয়ে সেই চিঠি উদ্ধার করেন। এই প্রেক্ষিতেই কুরআন মজীদের এ আয়াতটি নাযিল হয়ঃ
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَآءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِم بِٱلْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُواْ بِمَا جَآءَكُم مِّنَ ٱلْحَقِّ يُخْرِجُونَ ٱلرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَن تُؤْمِنُواْ بِٱللَّهِ رَبِّكُمْ (الممتحنة: (١)
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধু-পৃষ্ঠপোষক বানিয়ো না, ভালোবাসা পোষণ করে তাদেরকে (গোপন কথা) জানিয়ে দাও, অথচ ওরা অমান্য-অস্বীকার করেছে সেই মহাসত্যকে যা তোমাদের নিকট এসেছে। ওরা রাসূলকে এবং বিশেষ করে তোমাদেরকে (মক্কা থেকে) বহিষ্কৃত করেছে শুধু এই অপরাধে যে, তোমরা তোমাদের রব্ব আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখো।
এভাবে রাসূলে করীম (স) নিজ শাসন এলাকায় শত্রুদের পক্ষে কোন গোয়েন্দাগিরি (Spying) করতে দেন নি। যখনই এই পর্যায়ে কোন কাজ হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি তা জানতে পেরে সমস্ত পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিয়েছেন।
ইমাম আবূ ইউসুফ লিখেছেনঃ ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষে এরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য যে, মুশরিক দেশে যাওয়ার পথসমূহে সীমান্তবর্তী সশস্ত্র রক্ষীবাহিনী থাকবে, তারা সেদিকে গমনকারী বা তথা থেকে আগমনকারী ব্যবসায়ীদের তল্লাশী চালাবে। গমনাগমনকারীদের নিকট অস্ত্র-শস্ত্র পাওয়া গেলে তা কেড়ে নেবে, কারোর নিকট পত্রাদি থাকলে তা পড়ে দেখবে। তাতে মুসলমানদের কোন গোপন ও অপ্রকাশনীয় তত্ত্ব বা তথ্য লিখিত থাকলে তাকে পাকড়াও করবে এবং তাকে সরকারে সোপর্দ করবে তার বিচার করার উদ্দেশ্যে।
ইসলামী রাজ্যের যেসব লোক বিদেশী শক্তির স্বার্থে গোয়েন্দাগিরি করে, ইসলাম তাদের ব্যাপারে কঠোর নীতি অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। অনুরূপভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন বসবাসকারী অমুসলিম নাগরিক (যিম্মী) রাও যদি বিদেশী শক্তির স্বার্থে ও তার নির্দেশে ইসলামী রাজ্যের অভ্যন্তরে কোন গোয়েন্দাগিরি করে, তাহলে যিম্মীদের নাগরিকত্ব লাভের প্রধান শর্তই ভঙ্গ করা হবে। কেননা যিম্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক হচ্ছেঃ
তারা মুসলমানদের কোনরূপ কষ্ট দেবে না, মান-সম্মান-আবরু নষ্ট করার মত কোন কাজ-যেমন মুসলিম নারীর সাথে ব্যভিচার, অন্যান্য চরিত্রহীতার কাজ, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই করে তাদের ধন-মাল হরণ এবং বাইরের মুশরিক-ইসলাম দুশমনদের জন্য গোয়েন্দাগিরি করা ইত্যাদি কাজ করবে না। এর কোন একটি কাজ-ও করলে তাদের নাগরিকত্বের শর্ত চূর্ণ হয়ে যাবে।
যিম্মীদের জন্য এই বাধ্যবাধকতাও রয়েছে যে, তারা দেশের মুসলমানদের কোন গোপন খবর বাইরের শত্রুদের নিকট পৌছাবে না, তাদের গোপন প্রস্তুতি ও শক্তি-সামর্থ সম্পর্কেও তাদেরকে অবহিত করবে না। কেউ তা করলে সে তার নাগরিকত্বের শর্ত ভঙ্গ করেছে বলে ধরে নিতে হবে। তখন তার রক্ত হালাল। অতঃপর তার ব্যাপারে আল্লাহ্, রাসূল ও মু'মিনদের কোন দায়িত্ব (যিম্মাদারী) থাকলো না
কাযী আবূ ইউসুফ লিখেছেনঃ
আপনি গোয়েন্দা কর্মে লিপ্ত লোকদের ফয়সালা জানতে চেয়েছেন, যাদেরকে পাকড়াও করা হবে। তারা হয় যিম্মী হবে, না হয় যুদ্ধকারী শত্রুপক্ষের লোক হবে অথবা মুসলমান হবে।
তারা যদি সামরিক প্রতিপক্ষের লোক হয় কিংবা হয় যিম্মী-যারা জিযিয়া দেয়, তারা ইয়াহুদী, খৃস্টান ও অগ্নিপূজারী যা-ই হোক, তাদের হত্যা করতে হবে, আর যদি মুসলমানদের কেউ হয়- ইসলাম পালনে সুপরিচিত, তাহলে তাকে কঠিন যন্ত্রণার দণ্ডে দণ্ডিত করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদী আটকে বন্দী করতে হবে- যেন শেষ পর্যন্ত সে তওবা করতে পারে।
বস্তুত বিদেশী শক্তির পক্ষে ইসলামের রাজ্যে গোয়েন্দাগিরি করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধরূপে গণ্য। এ বিষয়ে ইসলামে মৌল নীতিই দেয়া হয়েছে, বিস্তারিত ও খুটিনাটি আইন দেয়া হয়নি। কেননা গোয়েন্দাগিরির কোন স্থায়ী একটি মাত্র রূপ বা ধরন নেই। তা নিত্য নতুন রূপে সংঘটিত হতে পারে। তাই ইসলামের মৌলনীতির ভিত্তিতে বিস্তারিত আইন-বিধি রচনা করার দায়িত্ব ইসলামী রাষ্ট্রের উপর অর্পিত। রাসূলে করীম (স) এজন্য খবর সংগ্রহকারী লোক নিয়োগ করেছেন এবং তাদের দেয়া সংবাদের ভিত্তিতে তিনি যুদ্ধ কৌশল রচনা করেছেন, তা ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত।
ইয়াফে, নামক মদীনার এক ব্যক্তির ক্রীতদাস ছিলেন হযরত জায়দ ইবনে আরকম। তাঁকে মদীনার মুনাফিকদের উপর দৃষ্টি রাখার জন্য দায়িত্বশীল নিযুক্ত করা হয়েছিল। বনু মুস্তালিক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনকালে প্রধান মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই গোপনভাবেই বলেছিলঃ 'মদীনায় পৌঁছার পর আমাদের মধ্যকার অধিক সম্মানিত ব্যক্তি অধিক হীন ব্যক্তিকে বহিষ্কার করবে'। হযরত জায়দ তা শুনতে পেয়ে উপস্থিতভাবে তাকে যা বলার তা তো বললেনই, সঙ্গে সঙ্গে তা নবী করীম (স)-কে জানিয়ে দিলেন।
ইসলামী রাষ্ট্রকে এজন্য লোকদেরকে বিশেষ শিক্ষা প্রশিক্ষণে তৈরী করতে ও সংশ্লিষ্ট কাজে বিশেষ দক্ষ, সাহসী ও সুকৌশলী বানাতে হবে। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, এর উপর যেমন ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নির্ভরশীল, অনুরূপভাবে মুসলিম জনগণের ইসলামী জীবন যাপন ও ইসলামী আইন-বিধানের পূর্ণ কার্যকরতাও এরই উপর নির্ভর করে। তাই এই বিভাগটিই ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য একান্তই অপরিহার্য।
টিকাঃ
১. كتاب الخارج لابي يوسف طبعه القاهرة ١٠٢ الخ ..
২. شرائع الاسلام كتاب الجهاد ص ۲۲۹ . تذكرة الفقهاء ج ١ ص ٤٤٢
৩. কানযুল উম্মাল খিররাজ স : ২০৫-২০৬
৪. মাজমাউল বায়ান খন্ড ৫ পৃ :২৯৪