📄 ইসলামী সমাজে দাসদের অবস্থান
এ কথা বললে কিছুমাত্র অত্যুক্তি হবে না যে, ইসলামী সমাজে এই দাসদের অবস্থান অন্যান্য অনৈসলামী সমাজে 'স্বাধীন' নামে পরিচিত নাগরিকদের তুলনায় কিছু মাত্র খারাপ নয়। কেননা যুদ্ধবন্দী-দাসদের ব্যাপারে ইসলামের একটা বিশেষ মানবিক নীতি রয়েছে। ইসলাম এই বন্দীদের প্রতি মানবিক মর্যাদা দেয়ার তাকীদ করেছে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি। সেই সাথে তাদের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শন মমত্ববোধ ও শুভ আচরণ গ্রহণের সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ- اِسْتَوْصُوا بِالْأَسَارَى خَيْرًا . তোমরা বন্দীদের প্রতি কল্যাণময় আচরণ গ্রহণ করবে।
খায়বর যুদ্ধশেষে হযরত বিলাল (রা) দুইজন নারীকে ধরে ইয়াহুদী পুরুষ নিহতদের স্তূপের নিকট নিয়ে গেলেন তাদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে। নিহতদের স্তূপ দেখে একটি মেয়ে ভয়ে-আতংকে চিৎকার করে উঠল এবং নিজের মাথায় মাটি মেখে বিলাপ করতে শুরু করে দিল। পরে দুজনকেই বাঁচিয়ে দেয়া হয়। তাদের একজন হচ্ছেন উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফীয়া বিনতে হাই ইবনে আখতাব (রা)।
রাসূলে করীম (স) মহিলা দুইজনের পাকড়াওকারী হযরত বিলাল (রা)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেনঃ
اِنْزِعَتْ مِنْكَ الرَّحْمَةُ يَا بِلَالُ حِينَ تُمْرُ بِامْرَاتَيْنِ عَلَى قُتْلَى رِجَابِهِمَا
হে বিলাল! তুমি যখন মহিলা দুইজনকে তাদের পুরুষদের বধ্য ভূমিতে নিয়ে গিয়েছিলে, তখন দয়া-মায়া বলতে কি তোমার অন্তরে কিছুই ছিল না?
বন্দীদের রীতিমত খাবার ও পানীয় দেয়ার জন্য নবী করীম (স) বিশেষভাবে তাকীদ করেছেন। বলেছেনঃ
أَطْعَامُ الْأَسِيرِ حَقٌّ عَلَى مَنْ أَسْرَهُ
বন্দীদের পানাহারের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব বন্দীকারীর উপর অর্পিত।
ইসলাম হত্যাকাণ্ড ঘটানোর ক্ষেত্রেও মানবিকতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। নিহত ব্যক্তির হাত-পা-নাক-কান ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটতে অত্যন্ত জোরের সাথে নিষেধ করেছে। এজন্য কুরআনে হেদায়েত দেয়া হয়েছেঃ
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ - وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّبِرِينَ - وَأَصْبَرُ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ بِمَا يَمْكُرُونَ (النحل: ١٢৬-১২৭)
আর তোমরা যদি প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তাহলে শুধু ততটুকুই গ্রহণ করবে, যতখানি তোমার উপর অত্যাচার করা হয়েছে। আর যদি ধৈর্য ধারণ করতে পার তাহলে নিঃসন্দেহে ধৈর্য ধারণকারীদের জন্য অতীব কল্যাণ রয়েছে।
হে মুহাম্মাদ! ধৈর্য সহকারে কাজ করতে থাক-আর তোমাদের এই ধৈর্যও আল্লাহ্রই দেয়া তওফীকের ফল- এই লোকদের কার্যকলাপে তুমি দুঃখিত হবে না এবং তাদের অবলম্বিত কৌশল-ষড়যন্ত্রের দরুন তোমার দিল ভারাক্রান্ত করো না।
টিকাঃ
১. সيرة ابن هشام ج: ٢، ص: ٢٩٩ ٥٠
২. ওহোদের যুদ্ধে হযরত হামযা (রা)-র লাশ পেট ছেড়া ও কলিজাশূন্য অবস্থায় দেখতে পেয়ে রাসূলে করীম (স)-এর মনে যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তারই প্রেক্ষিতে এই আয়াত। তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
এ কথা বললে কিছুমাত্র অত্যুক্তি হবে না যে, ইসলামী সমাজে এই দাসদের অবস্থান অন্যান্য অনৈসলামী সমাজে 'স্বাধীন' নামে পরিচিত নাগরিকদের তুলনায় কিছু মাত্র খারাপ নয়। কেননা যুদ্ধবন্দী-দাসদের ব্যাপারে ইসলামের একটা বিশেষ মানবিক নীতি রয়েছে। ইসলাম এই বন্দীদের প্রতি মানবিক মর্যাদা দেয়ার তাকীদ করেছে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি। সেই সাথে তাদের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শন মমত্ববোধ ও শুভ আচরণ গ্রহণের সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ- اِسْتَوْصُوا بِالْأَسَارَى خَيْرًا . তোমরা বন্দীদের প্রতি কল্যাণময় আচরণ গ্রহণ করবে।
খায়বর যুদ্ধশেষে হযরত বিলাল (রা) দুইজন নারীকে ধরে ইয়াহুদী পুরুষ নিহতদের স্তূপের নিকট নিয়ে গেলেন তাদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে। নিহতদের স্তূপ দেখে একটি মেয়ে ভয়ে-আতংকে চিৎকার করে উঠল এবং নিজের মাথায় মাটি মেখে বিলাপ করতে শুরু করে দিল। পরে দুজনকেই বাঁচিয়ে দেয়া হয়। তাদের একজন হচ্ছেন উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফীয়া বিনতে হাই ইবনে আখতাব (রা)।
রাসূলে করীম (স) মহিলা দুইজনের পাকড়াওকারী হযরত বিলাল (রা)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেনঃ
اِنْزِعَتْ مِنْكَ الرَّحْمَةُ يَا بِلَالُ حِينَ تُمْرُ بِامْرَاتَيْنِ عَلَى قُتْلَى رِجَابِهِمَا
হে বিলাল! তুমি যখন মহিলা দুইজনকে তাদের পুরুষদের বধ্য ভূমিতে নিয়ে গিয়েছিলে, তখন দয়া-মায়া বলতে কি তোমার অন্তরে কিছুই ছিল না?
বন্দীদের রীতিমত খাবার ও পানীয় দেয়ার জন্য নবী করীম (স) বিশেষভাবে তাকীদ করেছেন। বলেছেনঃ
أَطْعَامُ الْأَسِيرِ حَقٌّ عَلَى مَنْ أَسْرَهُ
বন্দীদের পানাহারের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব বন্দীকারীর উপর অর্পিত।
ইসলাম হত্যাকাণ্ড ঘটানোর ক্ষেত্রেও মানবিকতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। নিহত ব্যক্তির হাত-পা-নাক-কান ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটতে অত্যন্ত জোরের সাথে নিষেধ করেছে। এজন্য কুরআনে হেদায়েত দেয়া হয়েছেঃ
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ - وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّبِرِينَ - وَأَصْبَرُ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ بِمَا يَمْكُرُونَ (النحل: ١٢৬-১২৭)
আর তোমরা যদি প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তাহলে শুধু ততটুকুই গ্রহণ করবে, যতখানি তোমার উপর অত্যাচার করা হয়েছে। আর যদি ধৈর্য ধারণ করতে পার তাহলে নিঃসন্দেহে ধৈর্য ধারণকারীদের জন্য অতীব কল্যাণ রয়েছে।
হে মুহাম্মাদ! ধৈর্য সহকারে কাজ করতে থাক-আর তোমাদের এই ধৈর্যও আল্লাহ্রই দেয়া তওফীকের ফল- এই লোকদের কার্যকলাপে তুমি দুঃখিত হবে না এবং তাদের অবলম্বিত কৌশল-ষড়যন্ত্রের দরুন তোমার দিল ভারাক্রান্ত করো না।
টিকাঃ
১. সيرة ابن هشام ج: ٢، ص: ٢٩٩ ٥٠
২. ওহোদের যুদ্ধে হযরত হামযা (রা)-র লাশ পেট ছেড়া ও কলিজাশূন্য অবস্থায় দেখতে পেয়ে রাসূলে করীম (স)-এর মনে যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তারই প্রেক্ষিতে এই আয়াত। তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
📄 সীমালংঘনকারীদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি
ইসলামে যুদ্ধের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিও অন্যতম পন্থা। ইসলামী অবস্থার প্রেক্ষিতে ও প্রয়োজনবোধে এই পন্থার আশ্রয় নিতে পারে। তবে সেজন্য সামরিক লক্ষ্য সুস্পষ্টরূপে থাকা জরুরী শর্ত। অর্থাৎ কৌশলগত লক্ষ্যের বেষ্টনীতে শত্রুর সামরিক তৎপরতা বন্ধ করা উদ্দেশ্যেই তা করা যেতে পারে। ইসলাম এই কৌশলটি প্রয়োগ করার অনুমতি দেয় কেবলমাত্র সীমালংঘনকারী ও আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে। সাধারণ ও নিরপরাধ লোকদেরকে কোনরূপ অসুবিধায় ফেলার কোন অধিকার ইসলাম কাউকেই দেয় না।
আর এটাই নবী করীম (স)-এর আদর্শ। এখানে কয়েকটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ
রাসূলে করীম (স)-এর এক অশ্বারোহী বাহিনী সুমামাতা ইবনে আসাল নামক এক ইমামা অধিবাসীকে বন্দী করে। রাসূলে করীম (স) তার সাথে শুভ আচরণ গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাকে মুক্ত করে দেয়া হয়। পরে সে ইসলাম কবুল করে। পরে মক্কায় উমরা করার জন্য চলে যায়। তখন মক্কার কুরাইশরা তাকে আটক করে এবং হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তাদের মধ্য থেকেই এক ব্যক্তি বললঃ লোকটিকে ছেড়ে দাও। কেননা তোমরা কুরাইশরা নিজেদের জীবিকার জন্য ইমামা যাতায়াত করতে বাধ্য হও। পরে তারা তাকে ছেড়ে দেয়। অতঃপর লোকটি ইমামা উপস্থিত হয়ে মক্কার উপর অর্থনৈতিক বয়কট চালু করে দেয় এবং মক্কায় কোন জিনিসই যাতে না পৌঁছায়, তার শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে মক্কার অধিবাসীরা ভীষণ সংকটের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। তখন মক্কার লোকেরা রাসূলে করীম (স)-কে পত্র লিখে এই মর্মেঃ
আপনি তো রক্ত সম্পর্কের হক আদায়ের উপর খুব গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অথচ আপনিই তাদের সাথে রক্তসম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। আপনি আপনার পৈতৃক বংশের লোকদের তরবারী দ্বারা হত্যা করেছেন। আর বাচ্চাদের হত্যা করিয়েছেন ক্ষুধায় কাতর করে।
এই পত্র পেয়ে নবী করীম (স) সুমামা (রা)-কে নির্দেশ দিলেন তাঁর আরোপিত প্রতিবন্ধকতা প্রত্যাহার করার।
শত্রুর বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি শত্রুকে দমন করার একটা কৌশল হওয়া এবং ইসলামে তা অবৈধ না হওয়া সত্ত্বেও তা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন নিছক এই কারণে যে, তদ্দরুন সাধারণ নিরাপরাধ মানুষ কষ্ট পাচ্ছিল।
টিকাঃ
১. সيرة ابن هشام ج: ۲، ص: ۵۹۳۹
ইসলামে যুদ্ধের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিও অন্যতম পন্থা। ইসলামী অবস্থার প্রেক্ষিতে ও প্রয়োজনবোধে এই পন্থার আশ্রয় নিতে পারে। তবে সেজন্য সামরিক লক্ষ্য সুস্পষ্টরূপে থাকা জরুরী শর্ত। অর্থাৎ কৌশলগত লক্ষ্যের বেষ্টনীতে শত্রুর সামরিক তৎপরতা বন্ধ করা উদ্দেশ্যেই তা করা যেতে পারে। ইসলাম এই কৌশলটি প্রয়োগ করার অনুমতি দেয় কেবলমাত্র সীমালংঘনকারী ও আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে। সাধারণ ও নিরপরাধ লোকদেরকে কোনরূপ অসুবিধায় ফেলার কোন অধিকার ইসলাম কাউকেই দেয় না।
আর এটাই নবী করীম (স)-এর আদর্শ। এখানে কয়েকটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ
রাসূলে করীম (স)-এর এক অশ্বারোহী বাহিনী সুমামাতা ইবনে আসাল নামক এক ইমামা অধিবাসীকে বন্দী করে। রাসূলে করীম (স) তার সাথে শুভ আচরণ গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাকে মুক্ত করে দেয়া হয়। পরে সে ইসলাম কবুল করে। পরে মক্কায় উমরা করার জন্য চলে যায়। তখন মক্কার কুরাইশরা তাকে আটক করে এবং হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তাদের মধ্য থেকেই এক ব্যক্তি বললঃ লোকটিকে ছেড়ে দাও। কেননা তোমরা কুরাইশরা নিজেদের জীবিকার জন্য ইমামা যাতায়াত করতে বাধ্য হও। পরে তারা তাকে ছেড়ে দেয়। অতঃপর লোকটি ইমামা উপস্থিত হয়ে মক্কার উপর অর্থনৈতিক বয়কট চালু করে দেয় এবং মক্কায় কোন জিনিসই যাতে না পৌঁছায়, তার শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে মক্কার অধিবাসীরা ভীষণ সংকটের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। তখন মক্কার লোকেরা রাসূলে করীম (স)-কে পত্র লিখে এই মর্মেঃ
আপনি তো রক্ত সম্পর্কের হক আদায়ের উপর খুব গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অথচ আপনিই তাদের সাথে রক্তসম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। আপনি আপনার পৈতৃক বংশের লোকদের তরবারী দ্বারা হত্যা করেছেন। আর বাচ্চাদের হত্যা করিয়েছেন ক্ষুধায় কাতর করে।
এই পত্র পেয়ে নবী করীম (স) সুমামা (রা)-কে নির্দেশ দিলেন তাঁর আরোপিত প্রতিবন্ধকতা প্রত্যাহার করার।
শত্রুর বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি শত্রুকে দমন করার একটা কৌশল হওয়া এবং ইসলামে তা অবৈধ না হওয়া সত্ত্বেও তা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন নিছক এই কারণে যে, তদ্দরুন সাধারণ নিরাপরাধ মানুষ কষ্ট পাচ্ছিল।
টিকাঃ
১. সيرة ابن هشام ج: ۲، ص: ۵۹۳۹
📄 যুদ্ধাস্ত্র সীমিতকরণ
বর্তমান সময়ের দুনিয়ার প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ বন্ধকরণ কিংবা সীমিতকরণ পর্যায়ে যথেষ্ট চেষ্টা-প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুনিয়ার শান্তিকামী চিন্তাবিদ মনীষিগণ এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যও প্রচার করে আসছেন! কিন্তু এ কথায় কোনই সন্দেহ নেই যে, এর কোন কিছুই সাফল্যমণ্ডিত হয়নি। বিশেষ করে দুনিয়ার বৃহৎ রাষ্ট্রবর্গ মুখে অস্ত্র সংবরণের কথা যত বলে, তার তুলনায় অনেক বেশী যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ করছে। তদ্দ্বারা নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করছে যেমন, তেমনি দুনিয়ার বাজারে লোকচক্ষুর অন্তরালে ব্যাপকভাবে অস্ত্র ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে বলা যায়, বর্তমান দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক ব্যবসা সবচাইতে বড় পণ্য হচ্ছে মানুষ মারার অস্ত্র। সারাটি দুনিয়ায় অস্ত্রের কালোবাজারী চলছে। আর দুনিয়ার যেসব বড় বড় দেশ অস্ত্র নির্মাণ বন্ধের জন্য বড় বড় কথা বলে, আন্তর্জাতিক সভা-সম্মেলন করে মানবদরদী বক্তৃতা-ভাষণ দিচ্ছে, তারাই এই মারণাস্ত্রের কালোবাজারীতে তীব্র প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। আসলে ওরা মানুষের প্রতি দরদ দেখাবার ভান করে মানুষ মারার হাতিয়ার দেশে দেশে পৌঁছিয়ে দিচ্ছে সেসব দেশের শাসক-বিরোধী নির্যাতিত জনতার রক্তের বন্যা প্রবাহিত করার লক্ষ্যে।
একটি কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। তা হচ্ছে, মানুষ স্বভাবতই আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রবণ। প্রত্যেকেই চায়, অন্য সকলের উপর তার কর্তৃত্ব হোক, সকলেই তার কর্তৃত্ব মেনে চলুক। আর এজন্য লক্ষ্যার্জনের উপায় হিসেবেও উপায়-উকরণ পর্যায়ে অস্ত্র সংগ্রহ করা তার স্বভাব। অস্ত্র নির্মাণের ও নিত্য নব ও উন্নত মানের অ-সরল-অস্বাভাবিক (Sophisticated) অস্ত্র উদ্ভাবনের মূলে এই কারণ নিহিত বললে কিছু মাত্র অতুক্তি হবে না।
কাজেই অস্ত্র নির্মাণ বন্ধের কোন আন্দোলন সফল হওয়ার প্রশ্ন নিতান্তই অবান্তর।
ঠিক এই কারণে ইসলাম অস্ত্র নির্মাণ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়নি। তবে ইসলামের অবদান হচ্ছে, অস্ত্র নির্মাণের লক্ষ্য বদলে দিয়েছে এবং অস্ত্রের ব্যবহার নৈতিক নিয়ম-নীতি ও বাধ্যবাধকতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করতে চায়।
ইসলাম শুধু অস্ত্র নির্মাণ বা তার ব্যবহারই নয়, বিবাদ-বিসম্বাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ বা রক্তপাতের লক্ষ্য ও ক্ষেত্র হিসেবে সম্পূর্ণ নতুন জিনিস পেশ করেছে। ব্যক্তিগত বা জাতিগত আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। কেননা শুধু মানুষকে মানুষের দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী করার পরিণতিই নিয়ে আসে। তার পরিবর্তে ইসলাম মানুষকে একটি অনন্য সাধারণ আদর্শ দিয়েছে এবং মানুষের উপর নিজের বা নিজের জাতির নয়, একমাত্র আল্লাহ্ নিরংকুশ প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রাম করার আহবান জানিয়েছে।
এভাবে অস্ত্র ব্যবহারের লক্ষ্যই পরিবর্তিত হয়ে গেছে এবং সেই লক্ষ্যে ও উদ্দেশ্যে শক্তি অর্জন ও অস্ত্র নির্মাণ-সংগ্রহ একান্ত জরুরী বলে ঘোষণা করেছে।
এক কথায় ইসলাম বৈষয়িক কোন জিনিসের পরিবর্তে ঈমান-আকীদা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণপণ লড়াই করার নির্দেশ দিয়েছে। ইসলামের এ লড়াই এবং অস্ত্রের ব্যবহার পাশবিকতার পরিবর্তে সম্পূর্ণ মানবিকতাবাদী, নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে দয়া-ভালোবাসা ও সংশোধনী দৃষ্টিভঙ্গীতে চিরভাস্বর।
ইসলামের লক্ষ্য অর্জনের জন্য অস্ত্রের ব্যবহার ক্ষেত্র বিশেষে অপরিহার্য। বৈষয়িকতা তথা আল্লাহদ্রোহিতামূলক জীবন-বিধানকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেই তথায় আল্লাহ্-বিশ্বাসী ও খোদানুগত জীবন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। তাই কুরআনের নির্দেশ হচ্ছেঃ
وَاعِدُوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوٌّ اللَّهِ وَعَدُوكُمْ وَاخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ - لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ ، وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ (الانفাল : ٦٠)
এবং তোমরা যতদূর তোমাদের পক্ষে বেশী শক্তি ও সদা সজ্জিত বাঁধা অশ্ববাহিনী সংগ্রহ ও প্রস্তুত করে রাখ। উহার সাহায্যে তোমরা আল্লাহর দুশমন ও তোমাদের দুশমনকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রাখবে-এছাড়া আরও দুশমন রয়েছে, যাদের তোমরা জানো না, আল্লাহই তাদেরকে জানেন। আর আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তার পুরা মাত্রার শুভ ফল তোমাদেরকে আদায় করে দেয়া হবে। তোমাদের উপর কখনই জুলুম করা হবে না।
আয়াতটি থকে স্পষ্ট জানা যায়, আল্লাহ্ নিজেই মুসলিমদের শক্তি ও যুদ্ধ-সরঞ্জাম সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন; কিন্তু তার পশ্চাতে উদ্দেশ্য হিসেবে নির্দেশিত হয়েছে মুসলমানদের ও আল্লাহর দুশমনদের ভীত-সন্ত্রস্ত করা, যেন তারা আল্লাহর দ্বীনের সাথে এবং সেই দ্বীনের ধারক মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করার মত সাহসও না পায়; বরং তারা আল্লাহ্ ও মুসলিমদের ভয়ে সব সময় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে থাকে। অন্য কথায় সর্বত্র যেমন আল্লাহ্র রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আল্লাহর রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের এক মাত্র পক্ষপাতী মুসলিমদের প্রাধান্য স্থাপিত থাকে। আর এই শক্তি ও যুদ্ধের সরঞ্জাম সংগ্রহে যে ধন-সম্পদ নিয়োজিত ও ব্যয়িত হবে, তা আল্লাহর পথে ব্যয় হিসেবে গণ্য হবে।
স্পষ্ট কথা, শক্তি ও অস্ত্র-শস্ত্র সংগ্রহের মূল লক্ষ্যই হলো প্রধানত আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও কাফেরী শক্তিকে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখা।
বর্তমান সময়ের দুনিয়ার প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ বন্ধকরণ কিংবা সীমিতকরণ পর্যায়ে যথেষ্ট চেষ্টা-প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুনিয়ার শান্তিকামী চিন্তাবিদ মনীষিগণ এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যও প্রচার করে আসছেন! কিন্তু এ কথায় কোনই সন্দেহ নেই যে, এর কোন কিছুই সাফল্যমণ্ডিত হয়নি। বিশেষ করে দুনিয়ার বৃহৎ রাষ্ট্রবর্গ মুখে অস্ত্র সংবরণের কথা যত বলে, তার তুলনায় অনেক বেশী যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ করছে। তদ্দ্বারা নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করছে যেমন, তেমনি দুনিয়ার বাজারে লোকচক্ষুর অন্তরালে ব্যাপকভাবে অস্ত্র ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে বলা যায়, বর্তমান দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক ব্যবসা সবচাইতে বড় পণ্য হচ্ছে মানুষ মারার অস্ত্র। সারাটি দুনিয়ায় অস্ত্রের কালোবাজারী চলছে। আর দুনিয়ার যেসব বড় বড় দেশ অস্ত্র নির্মাণ বন্ধের জন্য বড় বড় কথা বলে, আন্তর্জাতিক সভা-সম্মেলন করে মানবদরদী বক্তৃতা-ভাষণ দিচ্ছে, তারাই এই মারণাস্ত্রের কালোবাজারীতে তীব্র প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। আসলে ওরা মানুষের প্রতি দরদ দেখাবার ভান করে মানুষ মারার হাতিয়ার দেশে দেশে পৌঁছিয়ে দিচ্ছে সেসব দেশের শাসক-বিরোধী নির্যাতিত জনতার রক্তের বন্যা প্রবাহিত করার লক্ষ্যে।
একটি কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। তা হচ্ছে, মানুষ স্বভাবতই আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রবণ। প্রত্যেকেই চায়, অন্য সকলের উপর তার কর্তৃত্ব হোক, সকলেই তার কর্তৃত্ব মেনে চলুক। আর এজন্য লক্ষ্যার্জনের উপায় হিসেবেও উপায়-উকরণ পর্যায়ে অস্ত্র সংগ্রহ করা তার স্বভাব। অস্ত্র নির্মাণের ও নিত্য নব ও উন্নত মানের অ-সরল-অস্বাভাবিক (Sophisticated) অস্ত্র উদ্ভাবনের মূলে এই কারণ নিহিত বললে কিছু মাত্র অতুক্তি হবে না।
কাজেই অস্ত্র নির্মাণ বন্ধের কোন আন্দোলন সফল হওয়ার প্রশ্ন নিতান্তই অবান্তর।
ঠিক এই কারণে ইসলাম অস্ত্র নির্মাণ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়নি। তবে ইসলামের অবদান হচ্ছে, অস্ত্র নির্মাণের লক্ষ্য বদলে দিয়েছে এবং অস্ত্রের ব্যবহার নৈতিক নিয়ম-নীতি ও বাধ্যবাধকতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করতে চায়।
ইসলাম শুধু অস্ত্র নির্মাণ বা তার ব্যবহারই নয়, বিবাদ-বিসম্বাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ বা রক্তপাতের লক্ষ্য ও ক্ষেত্র হিসেবে সম্পূর্ণ নতুন জিনিস পেশ করেছে। ব্যক্তিগত বা জাতিগত আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। কেননা শুধু মানুষকে মানুষের দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী করার পরিণতিই নিয়ে আসে। তার পরিবর্তে ইসলাম মানুষকে একটি অনন্য সাধারণ আদর্শ দিয়েছে এবং মানুষের উপর নিজের বা নিজের জাতির নয়, একমাত্র আল্লাহ্ নিরংকুশ প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রাম করার আহবান জানিয়েছে।
এভাবে অস্ত্র ব্যবহারের লক্ষ্যই পরিবর্তিত হয়ে গেছে এবং সেই লক্ষ্যে ও উদ্দেশ্যে শক্তি অর্জন ও অস্ত্র নির্মাণ-সংগ্রহ একান্ত জরুরী বলে ঘোষণা করেছে।
এক কথায় ইসলাম বৈষয়িক কোন জিনিসের পরিবর্তে ঈমান-আকীদা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণপণ লড়াই করার নির্দেশ দিয়েছে। ইসলামের এ লড়াই এবং অস্ত্রের ব্যবহার পাশবিকতার পরিবর্তে সম্পূর্ণ মানবিকতাবাদী, নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে দয়া-ভালোবাসা ও সংশোধনী দৃষ্টিভঙ্গীতে চিরভাস্বর।
ইসলামের লক্ষ্য অর্জনের জন্য অস্ত্রের ব্যবহার ক্ষেত্র বিশেষে অপরিহার্য। বৈষয়িকতা তথা আল্লাহদ্রোহিতামূলক জীবন-বিধানকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেই তথায় আল্লাহ্-বিশ্বাসী ও খোদানুগত জীবন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। তাই কুরআনের নির্দেশ হচ্ছেঃ
وَاعِدُوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوٌّ اللَّهِ وَعَدُوكُمْ وَاخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ - لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ ، وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ (الانفাল : ٦٠)
এবং তোমরা যতদূর তোমাদের পক্ষে বেশী শক্তি ও সদা সজ্জিত বাঁধা অশ্ববাহিনী সংগ্রহ ও প্রস্তুত করে রাখ। উহার সাহায্যে তোমরা আল্লাহর দুশমন ও তোমাদের দুশমনকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রাখবে-এছাড়া আরও দুশমন রয়েছে, যাদের তোমরা জানো না, আল্লাহই তাদেরকে জানেন। আর আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তার পুরা মাত্রার শুভ ফল তোমাদেরকে আদায় করে দেয়া হবে। তোমাদের উপর কখনই জুলুম করা হবে না।
আয়াতটি থকে স্পষ্ট জানা যায়, আল্লাহ্ নিজেই মুসলিমদের শক্তি ও যুদ্ধ-সরঞ্জাম সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন; কিন্তু তার পশ্চাতে উদ্দেশ্য হিসেবে নির্দেশিত হয়েছে মুসলমানদের ও আল্লাহর দুশমনদের ভীত-সন্ত্রস্ত করা, যেন তারা আল্লাহর দ্বীনের সাথে এবং সেই দ্বীনের ধারক মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করার মত সাহসও না পায়; বরং তারা আল্লাহ্ ও মুসলিমদের ভয়ে সব সময় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে থাকে। অন্য কথায় সর্বত্র যেমন আল্লাহ্র রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আল্লাহর রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের এক মাত্র পক্ষপাতী মুসলিমদের প্রাধান্য স্থাপিত থাকে। আর এই শক্তি ও যুদ্ধের সরঞ্জাম সংগ্রহে যে ধন-সম্পদ নিয়োজিত ও ব্যয়িত হবে, তা আল্লাহর পথে ব্যয় হিসেবে গণ্য হবে।
স্পষ্ট কথা, শক্তি ও অস্ত্র-শস্ত্র সংগ্রহের মূল লক্ষ্যই হলো প্রধানত আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও কাফেরী শক্তিকে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখা।
📄 সাধারণ কল্যাণ ও বিশেষ কল্যাণ
একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারা যায়, এই নিষেধ দুটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। সমাজ-সমষ্টির সাথে এর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই, সামষ্টিক কল্যাণ এর দ্বারা ব্যাহত হয় না বলেই মনে করা যায়।
কিন্তু না, এ দুটো নিষিদ্ধ কাজই সংক্রামক এবং এর প্রতিক্রিয়া গোটা সমাজকে জর্জরিত করতে পারে। অন্য কথায় নিষিদ্ধ কাজ দুটির দুইটি দিক রয়েছে। একটি ব্যক্তিগত দিক আর অপরটি সামাজিক দিক। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে তা না হলেও তেমন ক্ষতির আশংকা থাকে না। কিন্তু তা যখন সামষ্টিক রূপ পায়, তখন তা মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়! অথবা বলা যায়, ব্যক্তিগত দোষ-ত্রুটি সন্ধান না করা হলেও তেমন ক্ষতি হয় না, কিন্তু সামষ্টিক ক্ষেত্রে অনেক সময় তা না করাই বরং অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে। তখন সমষ্টির কল্যাণকে ব্যক্তির ক্ষতির উপর অগ্রাধিকার দেয়া ছাড়া কোনই উপায় থাকে না।
ইসলামী শরীয়াত মানুষের ব্যক্তিগত গোপন তথ্য জানতে চেষ্টা করতে কঠিনভাবে নিষেধ করেছে এবং ব্যক্তিগণের গীবত করাকে সুস্পষ্ট হারাম ঘোষণা করেছে। কিন্তু সামষ্টিক প্রয়োজনে যদি ব্যক্তিগণের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার এবং কারোর অনুপস্থিতিতে তার দোষ-ত্রুটি বলার আবশ্যকতা দেখা দেয়, তখন তা অবশ্যই করতে হবে, তখন ব্যক্তি অধিকারের উপর সামষ্টিক প্রয়োজনকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। সে পর্যায়ে ব্যক্তিগণের দোষ খোঁজ করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দোষ ত্রুটি জনগণের মধ্যে প্রচার করে দেয়া সমষ্টির স্বার্থ রক্ষার জন্য একান্তই অপরিহার্য কর্তব্য।
বরং ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে সমষ্টির স্বার্থ- তথা অস্তিত্ব রক্ষার্থে ব্যক্তিগণের ব্যক্তিগত জীবনের প্রকৃত অবস্থা জানবার জন্য চেষ্টা করা ও সেই পর্যায়ে ব্যাপক অনুসন্ধান করা ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। কেননা রাষ্ট্র যদি ব্যক্তিগণের সঠিক অবস্থা সম্পর্কে অবহিত না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণ সুষ্ঠুরূপে সম্পন্ন হতে পারে না। এমনকি, এরূপ অবস্থা দেখা দেয়াও অসম্ভব নয় যে, ব্যক্তিগণের প্রবণতা, চরিত্র ও কর্মতৎপরতা সম্পর্কে সরকারের অবহিতির অভাবের দরুন রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে। কেননা সমাজে এসব ব্যক্তিদের অস্তিত্ব ও অবস্থান অকল্পনীয় নয়, যারা রাষ্ট্রের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর কার্যকলাপে গোপনভাবে নিয়োজিত রয়েছে। এই লোকদের তৎপরতা যথাসময়ে বন্ধ করা না হলে তা গোটা সমাজে ও রাষ্ট্রকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
এরূপ অবস্থায় ইসলামী রাষ্ট্র সরকারের পক্ষে সে দেশের প্রত্যেকটি নাগরিক সম্পর্কে অবহিতি রাখা এবং তার তৎপরতা ও গতিবিধি লক্ষ্য করা যে একান্তই কর্তব্য তাতে কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না। একথা যেমন সাধারণ সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিসম্মত, তেমনি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকেও স্বীকৃতব্য।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, পাশ্চাত্যপন্থী রাষ্ট্র সরকারের নীতিতে জনগণকে হয়রান পেরেশান করার লক্ষ্যে বা পদে পদে তাদেরকে উত্যক্ত করে রাখার উদ্দেশ্যে এ কাজ করা যাবে না। তা করা হলে তা কুরআনের উদ্ধৃত নিষেধের আওতায় পড়বে এবং অত্যন্ত গুনাহের কাজ হবে। বরং সত্যি কথা হচ্ছে, তা করার অধিকার ইসলামী রাষ্ট্রের নেই।
মদীনীয় সমাজের মুনাফিকরা ইসলামের দুশমনদের পক্ষ থেকে নিয়োজিত গোয়েন্দা হিসেবে কার্যরত ছিল। তারা মুসলমানদের যাবতীয় গোপন তত্ত্ব ও তথ্য সংগ্রহ করে সঙ্গোপনে শত্রুদের জানিয়ে দিত! এ পর্যায়ে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেনঃ
لَوْ خَرَجُوا فِيكُمْ مَّازَادُوكُمْ إِلَّا خَبَالًا وَلَا أَضَعُوا خَلَلَكُمْ يَبْغُونَكُمُ الْفِتْنَةَ ، وَفِيكُمْ سَمَّعُونَ لَهُمْ - وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّلِمِينَ (التوبه: ٤٧)
ওরা যদি তোমাদের সাথে যুদ্ধে গমন করত, তাহলে তোমাদের মধ্যে দোষ-ত্রুটি ছাড়া আর কিছুই বাড়িয়ে দিত না। ওরা তোমাদের মধ্যে ফিত্না সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পূর্ণ শক্তিতে চেষ্টা চালাচ্ছে আর তোমাদের লোকদের অবস্থা এই যে, তাদের কথা বিশেষ উৎকর্ণতা সহকারে শুনতে সচেষ্ট অনেক লোকই তোমাদের মধ্যে রয়েছে। আল্লাহ্ এই জালিমদের খুব ভালো করেই জানেন।
ইসলামী সমাজে মুনাফিকদের চরিত্র ও ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর কার্যকলাপ সম্পর্কে উক্ত আয়াতে কথা বলা হয়েছে। ওরাই কাফির মুশরিক-ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করত। তারা অবস্থান করত মুসলমানদের মধ্যে; কিন্তু কাজ করত শত্রুদের জন্য।
ইসলাম ও মুসলমানদের সামষ্টিক স্বার্থে ও অস্তিত্ব রক্ষার্থে নবী করীম (স) গোয়েন্দা নিযুক্ত করেছিলেন। ফলে কাফিরদের নিয়োজিত গোয়েন্দাদের ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে ক্ষতিকর তৎপরতা ধরা পড়ে যেতে লাগল। তখন মুনাফিকরাই এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চিৎকার করে উঠল। আল্লাহ্ তা'আলা তাদের চিৎকার বা আপত্তির জবাবে ইরশাদ করলেনঃ
وَمِنْهُمُ الَّذِينَ يُؤْذُونَ النَّبِيَّ وَيَقُولُونَ هُوَ أُذُنٌ - قُلْ أَذُنٌ خَيْرٌ لَكُمْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَيُؤْمِنُ عَذَابٌ أَلِيمٌ لِلْمُؤْمِنِينَ وَرَحْمَةٌ لِلَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ - وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ رَسُولَ اللهِ لَهُمْ : (التوبه : ٦١)
এদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা নিজেদের কথাবার্তা দ্বারা নবীকে কষ্ট দেয় এবং বলে-এই ব্যক্তি বড় কান-কথা শুনে। বল, তিনি তো তোমাদেরই ভালোর জন্য এই রূপ করেন। আল্লাহর প্রতি তিনি ঈমান রাখেন এবং ঈমানদার লোকদের প্রতি বিশ্বাস রাখেন। তিনি তাদের জন্য রহমত, যারা তোমাদের মধ্যে ঈমানদার। বস্তুত যারা আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট ও জ্বালা দেয়, তাদের জন্য পীড়াদায়ক আযাব রয়েছে।
অর্থাৎ রাসূলে করীম (স) লোকদের নিকট খবর সংগ্রহ করেন, লোকেরা তাঁকে সর্ববিষয়ে জানায়। তাঁর এই খবর শ্রবণ সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে, সত্যকে উদ্ঘাটিত করার উদ্দেশ্যে, কোন খারাপ উদ্দেশ্যে নয়, অকারণ কারোর প্রতি সন্দেহপ্রবণ হয়েও নয়, কারোর ক্ষতি সাধনও তার লক্ষ্য নয়। আর তাঁকে খবরদাতা লোকেরা যেহেতু ঈমানদার, নিষ্ঠাবান, সেই কারণে তিনি তাদের নিকট থেকে পাওয়া খবরকে সত্য বলে বিশ্বাসও করেন। কাজেই তাঁর এই কাজ মু'মিনদের জন্য রহমত স্বরূপ। আর হে মুনাফিকরা, রাসূল (স) তোমাদের কথা শুনলেও বিশ্বাস করেন না। কেননা তোমাদের প্রকৃত অবস্থা অপ্রকাশ্য ও অজ্ঞাত। উদ্ধৃত আয়াতে আল্লাহ্ বক্তব্য হলোঃ
রাসূলে করীম (স) কাফির শত্রুদের গোপন ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রমের খবরাদি জানতে পারেন। তার মূলে তাঁর উদ্দেশ্য মুসলমানদের সামষ্টিক কল্যাণ। কাফিরদের আকস্মিক ও অতর্কিত আক্রমণ থেকে মুসলিম জনগণকে রক্ষা করাও তাঁরই অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এজন্য মুসলিম জনগণকে সব সময় উৎকর্ণ, সতর্ক, সদা-সচেতন, জাগ্রত ও অবহিত করে রাখার জন্যই সংবাদ সংগ্রহকারী বিশেষ দায়িত্বশীল লোক নিয়োগ করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল এবং তিনি তা-ই করেছিলেন।
অতএব ইসলামী রাষ্ট্রকেও অনুরূপ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে সংবাদ সরবরাহকারী একটা সদা তৎপর কার্যকর সংস্থা অবশ্যই গড়ে তুলতে হবে। এক দিকে সাধারণ নাগরিকদের অভাব-অনটন-প্রয়োজন সম্পর্কে অবহিত হয়ে যথাসময়ে-অবিলম্বে-তা পূরণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অপর দিকে ইসলামের দুশমনদের গোপন ক্ষতিকর কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিতি লাভ করে তাৎক্ষণিকভাবে তা নস্যাৎ করে দেয়ার এবং মুসলিম জনগণ ও ইসলামী রাষ্ট্রকে তার ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য এরূপ একটি সংস্থা অবশ্যই থাকতে হবে।
সেই সাথে এই সংস্থাকে আরও তিন পর্যায়ের কাজ করতে হবেঃ
১. ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করা, যেন তারা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব-যা তাদের নিকট আমানত-যথাযথভাবে পালন করতে পারে ও তাতে কোনরূপ ত্রুটি-বিচ্যুতি, অবজ্ঞা-অবহেলা-উপেক্ষা বা দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ না ঘটে।
২. শত্রুপক্ষের সেনাবাহিনীর চলাচল ও গতিবিধি লক্ষ্য করা, যেন যথাসময়ে যে-কোন আগ্রাসনকে প্রতিরোধ করা যায়।
৩. বিদেশী লোকদের গতিবিধি ও তৎপরতা তীক্ষ্ণভাবে নজরে রাখা, যেন তারা শত্রুপক্ষের জন্য কোন গোয়েন্দাগিরি করতে বা দেশের অভ্যন্তরে শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে।
টিকাঃ
১. ওহোদ যুদ্ধের পর এক সময় বন্ আসাদ গোত্র মদীনার উপর অতর্কিত আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। নবী করীম (স)-এর নিয়োগকৃত সংবাদ সংগ্রহ ও সরবরাহকারিগণ সঙ্গে সঙ্গেই তাদের এই প্রস্তুতি সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করেছিলেন এবং তিনি আগে ভাগেই একটি শক্তিশালী বাহিনী তাদের মস্তক চূর্ণ করার জন্য হযরত আবু সালমা'র নেতৃত্বে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তারা অতর্কিতে তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের হতচকিত করে দিয়েছিলেন। তারা সবকিছু ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল এবং মুসলমানরা বিপুল গনীমতের মাল লাভ করেন। (তাফহীমুল কোরআন, ১২ খন্ড, পৃ-৩-৪)