📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে ইসলামের নীতি

📄 যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে ইসলামের নীতি


প্রাচীন কালের ন্যায় আধুনিক কালের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারটি অত্যন্ত নাজুক ও মর্মস্পর্শী। আন্তর্জাতিক ও বৈদেশিক রাজনীতির দিক দিয়ে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধবন্দীদের কতকগুলি বিশেষ অধিকার প্রখ্যাত 'জেনেভা কনভেশনে' স্বীকৃত হয়েছে এই সেদিন। কিন্তু ইসলাম তাদের জন্য বিশেষ মর্যাদার কথা ঘোষণা করেছে চৌদ্দশ বছর পূর্বে। আর সেই মর্যাদা রক্ষার জন্য জরুরী আইন-বিধানও উপস্থাপিত করেছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে যুদ্ধবন্দী দুই প্রকারেরঃ যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ড চলাকালে যারা আত্মসমর্পণ করেনি; কিন্তু তারা বিজয়ী বাহিনীর হাতে বন্দী হয়েছে, এদের ব্যাপারে সরকারের এখতিয়ার রয়েছে, তাদের হত্যা করতে পারে। বিপরীত দিক দিয়ে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা যেতে পারে, যেন ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়। এরা এক ধরনের যুদ্ধবন্দী।
অপর ধরনের যুদ্ধবন্দী তারা, যারা যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিজয়ী বাহিনীর হাতে বন্দী হবে। এদেরকে হত্যা করা যাবে না। এ ধরনের বন্দীদের সম্পর্কে ইসলামের বিধান হলো। সরকার হয় নিছক অনুগ্রহের বশবর্তী হয়ে মুক্ত করে দেবে, না হয় বিনিময় গ্রহণ করে ছেড়ে দেবে। এর কোনটি সম্ভব না হলে তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখা হবে। এই সময় তারা ইসলাম কবুল করলেও তাদের এই দাস-অবস্থা পরিবর্তিত হবে না। ফিকহবিদদের অধিকাংশই এই মত পোষণ করেন। এ পর্যায়ে কুরআন মজীদের ঘোষণা হচ্ছেঃ
مَا كَانَ لِنَبِيّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا . واللهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللهُ عَزِيزٌ حَكِيمُ (الانفال : ٦٧)
কোন নবীর নিকট বন্দী পড়ে থাকা শোভন নয়- যতক্ষণ না সে যমীনে শত্রুবাহিনীকে নিঃশেষ ও খুব বেশী করে রক্তপাত করবে। তোমরা দুনিয়ার স্বার্থ চাও, অথচ আল্লাহর লক্ষ্য হচ্ছে পরকাল। আর আল্লাহ্ সর্বজয়ী সুবিজ্ঞানী।
আয়াতের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, পৃথিবীতে ইসলামের দুশমনদের রক্তপাত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো এবং পৃথিবীতে ইসলামের কর্তৃত্ব, সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করাই নবীর দায়িত্ব, যেন মুশরিক ও কাফিরদের ঔদ্ধতের মস্তক চূর্ণ হয়, ধুলায় লুণ্ঠিত হয় এবং দুর্বল ও শক্তিহীন হয়ে যায়। বন্দীদের প্রথম প্রকারের সাথে এ কথার মিল রয়েছে এবং অপর আয়াতে বলা হয়েছেঃ
فَإِمَّا تَثْقَفَنَّهُمْ فِي الْحَرْب فَشَرِدُ بِهِمْ مِّنْ خَلْفِهِمْ لَعَلَّهُمْ يَذْكُرُونَ (الانفال: ٥৭)
অতএব এই লোকদেরকে যদি তোমরা যুদ্ধের ময়দানে ধরে ফেলতে পার, তাহলে তাদের এমনভাবে বিধ্বস্ত করবে যে, অপর যেসব লোক তাদের মত আচরণ করবে, তারা যেন এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
মুসলমানদের সাথে চুক্তিভঙ্গকারীদের সম্পর্কে এ আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। এতে নবী করীম (স)-এর প্রতি তাকীদ করা হয়েছে যে, ইসলামী বাহিনী যখন ময়দানে কাফির-মুশরিকদের সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাতে জয় লাভ করবে, তাদেরকে ধরে ফেলতে পারবে, তখন তাদের উপর ওয়াদা ভঙ্গের চূড়ান্ত ধরনের প্রতিশোধ নিতে হবে, তাদের ক্ষেত্রে নির্মম শাস্তি কার্যকর করতে হবে। তাদের উপর এমন প্রভাব ফেলতে হবে, যেন তা দেখে অন্যান্য লোকেরা শিক্ষা গ্রহণ করে, রীতিমত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, ভয়ে থর-থর করে কাঁপে এবং চুক্তিভঙ্গ করার দুঃসাহস যেন কেউ না করতে পারে। তারা যেন নিরুপায় ও অক্ষম হয়ে মুসলমানদের সাথে সংঘর্ষে আসার ইচ্ছা চিরতরে ত্যাগ করে ও স্থান ত্যাগ করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। উদ্ধৃত আয়াতটি এই প্রথম প্রকারের বন্দীদের সম্পর্কে কথা বলছে। যেহেতু যুদ্ধ চলাকালে-যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই তাদেরকে পাকড়াও করা হয়েছে, তাই তাদেরকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করতে হবে।
আল্লাহ্ কথাঃ فشرد بهم من خلفهم তাদের এমন কঠিন শাস্তি দেবে যে, পিছনের লোকেরা ভয় পেয়ে পিছু হটতে ও সম্মুখ-সমর থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
সেই সাথে আল্লাহর এই কথাটিও পঠনীয়ঃ
فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرَبَ الرِّقَابِ - حَتَّى إِذَا أَنْخَنَتُمُوهُمْ فَشَدُّوا الْوَثَاقَ . فَإِمَّا مَنَا بَعْدُ وَإِمَّا فَدَاءً حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا (محمد : 4 )
অতএব এই কাফিরদের সাথে যখন তোমাদের সম্মুখ-সংঘর্ষ সংঘটিত হবে, তখন প্রথম কাজ-ই হলো গর্দানসমূহ কর্তন করা। এমনকি তোমরা যখন তাদেরকে খুব ভালোভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলে, তখন বন্দীদেরকে শক্ত করে বেঁধে ফেল। অতঃপর (তোমাদের ইখতিয়ার রয়েছে যে,) অনুগ্রহ প্রদর্শন করবে অথবা রক্তমূল্য গ্রহণের চুক্তি করবে-যতক্ষণ না যুদ্ধাস্ত্র সংবরণ করে।
মনে হয়, 'যুদ্ধ যতক্ষণ না অস্ত্র সংবরণ করে' কথাটি 'গর্দান মারা- কর্তন করা' কাজের শেষ মুহূর্ত অর্থাৎ হত্যা ও শাস্তিদানের কাজটি করতে হবে যুদ্ধ বন্ধ করার লক্ষ্যে। অতএব যুদ্ধক্ষেত্রে আটককৃত লোকদের হত্যা করার জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট সময় হচ্ছে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত। অতঃপর এ কাজ আর চলতে পারে না।
আর যাদেরকে যুদ্ধ শেষ হওয়া ও অস্ত্র সংবরণের পর বন্দী করা হবে, তাদের সম্পর্কে কুরআনের ফস্সালা হচ্ছেঃ حَتَّى إِذَا انْخَنَتُمُوهَا فَشُدُّوا الْوَثَاقَ إِمَّا مَنَّا وَامَّا فَدَا এমনকি তোমরা যখন তাদেরকে খুব ভালোভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলে, তখন বন্দীদেরকে শক্ত করে বেঁধে ফেল। অতঃপর অনুগ্রহ প্রদর্শন করবে অথবা রক্ত বিনিময়ে ছেড়ে দেবে।
এ আয়াত ইসলামী সরকারকে ইখতিয়ার দিচ্ছে, বিনামূল্যে-বিনা বিনিময়ে ছেড়ে দেবে, না হয় বন্দী বিনিময় করবে কিংবা নগদ মূল্য গ্রহণ করে ছেড়ে দেবে।
তবে উক্ত পন্থা দু'টির কোন একটি করাও সম্ভব না হলে তখন তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখবে। এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (স)-এর হাদীসে বিস্তারিত বিধান দেয়া হয়েছে।
এখানে দু'টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছেঃ
প্রথম-যুদ্ধ চলাকালে ধৃত বন্দীদের হত্যা করা একটা বিশেষ অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট। বিশেষ সময় বা কালের সাথে নয়। বরং এ সিদ্ধান্ত চিরকালের কিয়ামত পর্যন্ত কার্যকর এবং শাশ্বত, যদিও তা একটা বিশেষ অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ অবস্থার প্রেক্ষিতে এই বিধান দেয়া হয়েছে, সেই রূপ অবস্থা যখন এবং যেখানেই দেখা দেবে তখন এই নির্দেশ পালনীয় হবে। অনুরূপ অবস্থা.. বন্দীদের বাঁচিয়ে রাখা উচিত হবে না। ইসলামী ইতিহাসের প্রথম দিকে এরূপ অবস্থা বারবার দেখা দিয়েছে এবং তখন তা-ই করা হয়েছে, যার নির্দেশ উক্ত আয়াতে দেয়া হয়েছে। সেকালে এই বন্দীদের বাঁচিয়ে রেখে তাদের সংরক্ষণ করা নানা কারণেই অসম্ভব ছিল, এ কথা যেমন সত্য, তেমনি এ কথায়ও কোন সন্দেহ নেই যে, এই সব যুদ্ধরত অবস্থায় ধৃত শত্রুসৈন্যকে বাঁচিয়ে রাখা ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে কঠিন বিপদ ও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দেখা দিতে পারত।
এই প্রেক্ষিতেই কুরআনের এ সিদ্ধান্ত বিবেচ্য ও বিচার্য। তবে বর্তমান কালের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মুসলিমগণ যখন শক্তিশালী ও উক্ত রূপ অবস্থায় ধৃত শত্রুসৈন্যকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হওয়া ও তাদের সংরক্ষণ খুব একটি দুঃসাধ্য না হওয়ার প্রেক্ষিতে-বিশেষ করে তাদের হত্যা করায় মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি ও শত্রুপক্ষের দুর্বল হয়ে পড়ার তেমন কোন সম্ভাবনা নেই-তখনও কি এই সিদ্ধান্তই কার্যকর করা হবে?
হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত কুরআনী ফিকহবিদ আল্লামা আল-জাসসাস এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করে লিখেছেনঃ
কুরআনের উপরোক্ত বিধান দেয়া হয়েছিল যখন মুসলিমদের সংখ্যা ছিল খুবই কম, আর মুশরিক-কাফির শত্রুদের সংখ্যা ছিল বিপুল। এরূপ অবস্থায় মুশরিকদের রক্তপাত করা ও হত্যাকান্ডের দ্বারা তাদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত করার পর যারা থেকে যাবে তাদের বাঁচিয়ে রাখা জায়েয। তাই উক্ত হুকুমটি তখনকার জন্য কার্যকর, যখন সেই অবস্থা দেখা দেবে যে অবস্থা প্রাথমিক কালের মুসলমানদের ছিল।
আল্লামা রশীদ রিজা শত্রু নিধনযজ্ঞের দর্শন পর্যায়ে বলেছেনঃ
দুইটি শত্রু বাহিনী যখন পরস্পরের সম্মুখ-সমরে অবতীর্ণ হবে, তখন শত্রু হত্যা ও নিধন কাজে পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করা আমাদের কর্তব্য। তাদেরকে বন্দী করতে চেষ্টা না করাই উচিত। কেননা তাতে আমাদের দুর্বলতাই প্রমাণিত হবে। আর ওরা আমাদের উপর অগ্রবর্তিতাই পেয়ে যাবে। তাই যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা যখন শত্রুদের হত্যা কার্য সম্পন্ন করে ফেলব-ও ওদের হত্যা ও জখম করব, তখন ওদের উপর আমাদের অগ্রবর্তিতা প্রতিষ্টিত হবে। সেই শেষ মুহূর্তে যাদের ধরা হবে তাদেরকেই বন্দী বানানো হবে।
দ্বিতীয়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ধৃত শত্রুসৈন্যদের ব্যাপারে তিনটির যে কোন একটি পন্থা গ্রহণ করার রাষ্ট্র-সরকারের ইখতিয়ার রয়েছে-তন্মধ্যে তাদেরকে দাস বানাবার-ও ইখতিয়ার, এই পর্যায়ে খানিকটা বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
দাস বানানোর মূলে প্রধান কারণ এই যে, কোনরূপ বিনিময় ব্যতীতই কিংবা বিনিময়ের ভিত্তিতে তাদেরকে ছেড়ে দিলে পুনর্বার তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানো-ব্যাপকভাবে আক্রমণ করে বসা কিছুমাত্র অসম্ভব নয়। এই আশংকা একটা যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি রচনা করে। এছাড়া বর্তমান দুনিয়ার রেওয়াজ অনুরূপ কাঁটা তারের বেড়া রচনা করে তার মধ্যে আটকে রাখাও সব সময় সহজ বা সম্ভব হয় না। তখন বন্দীদেরকে দাস বানিয়ে নাগরিকদের মালিকানায় সঁপে দিয়ে 'হজম' (absorb) করে ফেলা ছাড়া অন্য কোন উপায়ই থাকে না।
উপরন্তু যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই বন্দীদেরকে হত্যা করার কোন সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে না। এরূপ অবস্থায় দাস বানিয়ে মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়ার যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না।
বরং এই পন্থা গ্রহণে একটি বিরাট মানবিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তা এভাবে যে, এই বন্দীদেরকে যখন বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে মুসলমানদের মালিকত্বে-অভিভাবকত্বে-ছড়িয়ে দেয়া হবে, তখন তারা মুসলমানদের নিকট-সংস্পর্শে সাহচর্যে আসবার, তাদের মানবিক সহানুভূতি ও দায়িত্ব সচেতনতা সঞ্জত লালন-পালন পেয়ে তারা মুক্ত-স্বাধীন জীবন যাপনেরই স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে। তখন তারা ক্রমান্বয়ে মুসলমানদের ইসলামী চরিত্র অনুধাবন ও গ্রহণ করার বিরাট সুযোগ পেয়ে যাবে।
এরূপ অবস্থায় বন্দীদের ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা ইসলামী রাষ্ট্র সরকারকে তিনটির যে-কোন একটি পন্থা গ্রহণের ইখতিয়ার দিয়েছেন, যেন বাস্তব অবস্থা প্রেক্ষিতে উত্তম বিবেচিত পন্থা গ্রহণ সম্ভবপর হয়-এ যেমন মহান আল্লাহর একটি অতি বড় মেহেরবানী, তেমনি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত-তাতে কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না。

টিকাঃ
১. احكام القرآن ج:۲ ص:۳۹۱، ايضاح ص: ۷۲
২. তাফসীরুল মানার জ: ১০, পৃ: ৯৭-৯৮

প্রাচীন কালের ন্যায় আধুনিক কালের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারটি অত্যন্ত নাজুক ও মর্মস্পর্শী। আন্তর্জাতিক ও বৈদেশিক রাজনীতির দিক দিয়ে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধবন্দীদের কতকগুলি বিশেষ অধিকার প্রখ্যাত 'জেনেভা কনভেশনে' স্বীকৃত হয়েছে এই সেদিন। কিন্তু ইসলাম তাদের জন্য বিশেষ মর্যাদার কথা ঘোষণা করেছে চৌদ্দশ বছর পূর্বে। আর সেই মর্যাদা রক্ষার জন্য জরুরী আইন-বিধানও উপস্থাপিত করেছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে যুদ্ধবন্দী দুই প্রকারেরঃ যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ড চলাকালে যারা আত্মসমর্পণ করেনি; কিন্তু তারা বিজয়ী বাহিনীর হাতে বন্দী হয়েছে, এদের ব্যাপারে সরকারের এখতিয়ার রয়েছে, তাদের হত্যা করতে পারে। বিপরীত দিক দিয়ে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা যেতে পারে, যেন ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়। এরা এক ধরনের যুদ্ধবন্দী।
অপর ধরনের যুদ্ধবন্দী তারা, যারা যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিজয়ী বাহিনীর হাতে বন্দী হবে। এদেরকে হত্যা করা যাবে না। এ ধরনের বন্দীদের সম্পর্কে ইসলামের বিধান হলো। সরকার হয় নিছক অনুগ্রহের বশবর্তী হয়ে মুক্ত করে দেবে, না হয় বিনিময় গ্রহণ করে ছেড়ে দেবে। এর কোনটি সম্ভব না হলে তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখা হবে। এই সময় তারা ইসলাম কবুল করলেও তাদের এই দাস-অবস্থা পরিবর্তিত হবে না। ফিকহবিদদের অধিকাংশই এই মত পোষণ করেন। এ পর্যায়ে কুরআন মজীদের ঘোষণা হচ্ছেঃ
مَا كَانَ لِنَبِيّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا . واللهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللهُ عَزِيزٌ حَكِيمُ (الانفال : ٦٧)
কোন নবীর নিকট বন্দী পড়ে থাকা শোভন নয়- যতক্ষণ না সে যমীনে শত্রুবাহিনীকে নিঃশেষ ও খুব বেশী করে রক্তপাত করবে। তোমরা দুনিয়ার স্বার্থ চাও, অথচ আল্লাহর লক্ষ্য হচ্ছে পরকাল। আর আল্লাহ্ সর্বজয়ী সুবিজ্ঞানী।
আয়াতের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, পৃথিবীতে ইসলামের দুশমনদের রক্তপাত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো এবং পৃথিবীতে ইসলামের কর্তৃত্ব, সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করাই নবীর দায়িত্ব, যেন মুশরিক ও কাফিরদের ঔদ্ধতের মস্তক চূর্ণ হয়, ধুলায় লুণ্ঠিত হয় এবং দুর্বল ও শক্তিহীন হয়ে যায়। বন্দীদের প্রথম প্রকারের সাথে এ কথার মিল রয়েছে এবং অপর আয়াতে বলা হয়েছেঃ
فَإِمَّا تَثْقَفَنَّهُمْ فِي الْحَرْب فَشَرِدُ بِهِمْ مِّنْ خَلْفِهِمْ لَعَلَّهُمْ يَذْكُرُونَ (الانفال: ٥৭)
অতএব এই লোকদেরকে যদি তোমরা যুদ্ধের ময়দানে ধরে ফেলতে পার, তাহলে তাদের এমনভাবে বিধ্বস্ত করবে যে, অপর যেসব লোক তাদের মত আচরণ করবে, তারা যেন এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
মুসলমানদের সাথে চুক্তিভঙ্গকারীদের সম্পর্কে এ আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। এতে নবী করীম (স)-এর প্রতি তাকীদ করা হয়েছে যে, ইসলামী বাহিনী যখন ময়দানে কাফির-মুশরিকদের সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাতে জয় লাভ করবে, তাদেরকে ধরে ফেলতে পারবে, তখন তাদের উপর ওয়াদা ভঙ্গের চূড়ান্ত ধরনের প্রতিশোধ নিতে হবে, তাদের ক্ষেত্রে নির্মম শাস্তি কার্যকর করতে হবে। তাদের উপর এমন প্রভাব ফেলতে হবে, যেন তা দেখে অন্যান্য লোকেরা শিক্ষা গ্রহণ করে, রীতিমত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, ভয়ে থর-থর করে কাঁপে এবং চুক্তিভঙ্গ করার দুঃসাহস যেন কেউ না করতে পারে। তারা যেন নিরুপায় ও অক্ষম হয়ে মুসলমানদের সাথে সংঘর্ষে আসার ইচ্ছা চিরতরে ত্যাগ করে ও স্থান ত্যাগ করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। উদ্ধৃত আয়াতটি এই প্রথম প্রকারের বন্দীদের সম্পর্কে কথা বলছে। যেহেতু যুদ্ধ চলাকালে-যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই তাদেরকে পাকড়াও করা হয়েছে, তাই তাদেরকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করতে হবে।
আল্লাহ্ কথাঃ فشرد بهم من خلفهم তাদের এমন কঠিন শাস্তি দেবে যে, পিছনের লোকেরা ভয় পেয়ে পিছু হটতে ও সম্মুখ-সমর থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
সেই সাথে আল্লাহর এই কথাটিও পঠনীয়ঃ
فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرَبَ الرِّقَابِ - حَتَّى إِذَا أَنْخَنَتُمُوهُمْ فَشَدُّوا الْوَثَاقَ . فَإِمَّا مَنَا بَعْدُ وَإِمَّا فَدَاءً حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا (محمد : 4 )
অতএব এই কাফিরদের সাথে যখন তোমাদের সম্মুখ-সংঘর্ষ সংঘটিত হবে, তখন প্রথম কাজ-ই হলো গর্দানসমূহ কর্তন করা। এমনকি তোমরা যখন তাদেরকে খুব ভালোভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলে, তখন বন্দীদেরকে শক্ত করে বেঁধে ফেল। অতঃপর (তোমাদের ইখতিয়ার রয়েছে যে,) অনুগ্রহ প্রদর্শন করবে অথবা রক্তমূল্য গ্রহণের চুক্তি করবে-যতক্ষণ না যুদ্ধাস্ত্র সংবরণ করে।
মনে হয়, 'যুদ্ধ যতক্ষণ না অস্ত্র সংবরণ করে' কথাটি 'গর্দান মারা- কর্তন করা' কাজের শেষ মুহূর্ত অর্থাৎ হত্যা ও শাস্তিদানের কাজটি করতে হবে যুদ্ধ বন্ধ করার লক্ষ্যে। অতএব যুদ্ধক্ষেত্রে আটককৃত লোকদের হত্যা করার জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট সময় হচ্ছে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত। অতঃপর এ কাজ আর চলতে পারে না।
আর যাদেরকে যুদ্ধ শেষ হওয়া ও অস্ত্র সংবরণের পর বন্দী করা হবে, তাদের সম্পর্কে কুরআনের ফস্সালা হচ্ছেঃ حَتَّى إِذَا انْخَنَتُمُوهَا فَشُدُّوا الْوَثَاقَ إِمَّا مَنَّا وَامَّا فَدَا এমনকি তোমরা যখন তাদেরকে খুব ভালোভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলে, তখন বন্দীদেরকে শক্ত করে বেঁধে ফেল। অতঃপর অনুগ্রহ প্রদর্শন করবে অথবা রক্ত বিনিময়ে ছেড়ে দেবে।
এ আয়াত ইসলামী সরকারকে ইখতিয়ার দিচ্ছে, বিনামূল্যে-বিনা বিনিময়ে ছেড়ে দেবে, না হয় বন্দী বিনিময় করবে কিংবা নগদ মূল্য গ্রহণ করে ছেড়ে দেবে।
তবে উক্ত পন্থা দু'টির কোন একটি করাও সম্ভব না হলে তখন তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখবে। এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (স)-এর হাদীসে বিস্তারিত বিধান দেয়া হয়েছে।
এখানে দু'টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছেঃ
প্রথম-যুদ্ধ চলাকালে ধৃত বন্দীদের হত্যা করা একটা বিশেষ অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট। বিশেষ সময় বা কালের সাথে নয়। বরং এ সিদ্ধান্ত চিরকালের কিয়ামত পর্যন্ত কার্যকর এবং শাশ্বত, যদিও তা একটা বিশেষ অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ অবস্থার প্রেক্ষিতে এই বিধান দেয়া হয়েছে, সেই রূপ অবস্থা যখন এবং যেখানেই দেখা দেবে তখন এই নির্দেশ পালনীয় হবে। অনুরূপ অবস্থা.. বন্দীদের বাঁচিয়ে রাখা উচিত হবে না। ইসলামী ইতিহাসের প্রথম দিকে এরূপ অবস্থা বারবার দেখা দিয়েছে এবং তখন তা-ই করা হয়েছে, যার নির্দেশ উক্ত আয়াতে দেয়া হয়েছে। সেকালে এই বন্দীদের বাঁচিয়ে রেখে তাদের সংরক্ষণ করা নানা কারণেই অসম্ভব ছিল, এ কথা যেমন সত্য, তেমনি এ কথায়ও কোন সন্দেহ নেই যে, এই সব যুদ্ধরত অবস্থায় ধৃত শত্রুসৈন্যকে বাঁচিয়ে রাখা ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে কঠিন বিপদ ও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দেখা দিতে পারত।
এই প্রেক্ষিতেই কুরআনের এ সিদ্ধান্ত বিবেচ্য ও বিচার্য। তবে বর্তমান কালের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মুসলিমগণ যখন শক্তিশালী ও উক্ত রূপ অবস্থায় ধৃত শত্রুসৈন্যকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হওয়া ও তাদের সংরক্ষণ খুব একটি দুঃসাধ্য না হওয়ার প্রেক্ষিতে-বিশেষ করে তাদের হত্যা করায় মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি ও শত্রুপক্ষের দুর্বল হয়ে পড়ার তেমন কোন সম্ভাবনা নেই-তখনও কি এই সিদ্ধান্তই কার্যকর করা হবে?
হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত কুরআনী ফিকহবিদ আল্লামা আল-জাসসাস এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করে লিখেছেনঃ
কুরআনের উপরোক্ত বিধান দেয়া হয়েছিল যখন মুসলিমদের সংখ্যা ছিল খুবই কম, আর মুশরিক-কাফির শত্রুদের সংখ্যা ছিল বিপুল। এরূপ অবস্থায় মুশরিকদের রক্তপাত করা ও হত্যাকান্ডের দ্বারা তাদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত করার পর যারা থেকে যাবে তাদের বাঁচিয়ে রাখা জায়েয। তাই উক্ত হুকুমটি তখনকার জন্য কার্যকর, যখন সেই অবস্থা দেখা দেবে যে অবস্থা প্রাথমিক কালের মুসলমানদের ছিল।
আল্লামা রশীদ রিজা শত্রু নিধনযজ্ঞের দর্শন পর্যায়ে বলেছেনঃ
দুইটি শত্রু বাহিনী যখন পরস্পরের সম্মুখ-সমরে অবতীর্ণ হবে, তখন শত্রু হত্যা ও নিধন কাজে পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করা আমাদের কর্তব্য। তাদেরকে বন্দী করতে চেষ্টা না করাই উচিত। কেননা তাতে আমাদের দুর্বলতাই প্রমাণিত হবে। আর ওরা আমাদের উপর অগ্রবর্তিতাই পেয়ে যাবে। তাই যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা যখন শত্রুদের হত্যা কার্য সম্পন্ন করে ফেলব-ও ওদের হত্যা ও জখম করব, তখন ওদের উপর আমাদের অগ্রবর্তিতা প্রতিষ্টিত হবে। সেই শেষ মুহূর্তে যাদের ধরা হবে তাদেরকেই বন্দী বানানো হবে।
দ্বিতীয়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ধৃত শত্রুসৈন্যদের ব্যাপারে তিনটির যে কোন একটি পন্থা গ্রহণ করার রাষ্ট্র-সরকারের ইখতিয়ার রয়েছে-তন্মধ্যে তাদেরকে দাস বানাবার-ও ইখতিয়ার, এই পর্যায়ে খানিকটা বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
দাস বানানোর মূলে প্রধান কারণ এই যে, কোনরূপ বিনিময় ব্যতীতই কিংবা বিনিময়ের ভিত্তিতে তাদেরকে ছেড়ে দিলে পুনর্বার তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানো-ব্যাপকভাবে আক্রমণ করে বসা কিছুমাত্র অসম্ভব নয়। এই আশংকা একটা যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি রচনা করে। এছাড়া বর্তমান দুনিয়ার রেওয়াজ অনুরূপ কাঁটা তারের বেড়া রচনা করে তার মধ্যে আটকে রাখাও সব সময় সহজ বা সম্ভব হয় না। তখন বন্দীদেরকে দাস বানিয়ে নাগরিকদের মালিকানায় সঁপে দিয়ে 'হজম' (absorb) করে ফেলা ছাড়া অন্য কোন উপায়ই থাকে না।
উপরন্তু যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই বন্দীদেরকে হত্যা করার কোন সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে না। এরূপ অবস্থায় দাস বানিয়ে মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়ার যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না।
বরং এই পন্থা গ্রহণে একটি বিরাট মানবিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তা এভাবে যে, এই বন্দীদেরকে যখন বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে মুসলমানদের মালিকত্বে-অভিভাবকত্বে-ছড়িয়ে দেয়া হবে, তখন তারা মুসলমানদের নিকট-সংস্পর্শে সাহচর্যে আসবার, তাদের মানবিক সহানুভূতি ও দায়িত্ব সচেতনতা সঞ্জত লালন-পালন পেয়ে তারা মুক্ত-স্বাধীন জীবন যাপনেরই স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে। তখন তারা ক্রমান্বয়ে মুসলমানদের ইসলামী চরিত্র অনুধাবন ও গ্রহণ করার বিরাট সুযোগ পেয়ে যাবে।
এরূপ অবস্থায় বন্দীদের ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা ইসলামী রাষ্ট্র সরকারকে তিনটির যে-কোন একটি পন্থা গ্রহণের ইখতিয়ার দিয়েছেন, যেন বাস্তব অবস্থা প্রেক্ষিতে উত্তম বিবেচিত পন্থা গ্রহণ সম্ভবপর হয়-এ যেমন মহান আল্লাহর একটি অতি বড় মেহেরবানী, তেমনি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত-তাতে কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না。

টিকাঃ
১. احكام القرآن ج:۲ ص:۳۹۱، ايضاح ص: ۷۲
২. তাফসীরুল মানার জ: ১০, পৃ: ৯৭-৯৮

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 ইসলামী সমাজে দাসদের অবস্থান

📄 ইসলামী সমাজে দাসদের অবস্থান


এ কথা বললে কিছুমাত্র অত্যুক্তি হবে না যে, ইসলামী সমাজে এই দাসদের অবস্থান অন্যান্য অনৈসলামী সমাজে 'স্বাধীন' নামে পরিচিত নাগরিকদের তুলনায় কিছু মাত্র খারাপ নয়। কেননা যুদ্ধবন্দী-দাসদের ব্যাপারে ইসলামের একটা বিশেষ মানবিক নীতি রয়েছে। ইসলাম এই বন্দীদের প্রতি মানবিক মর্যাদা দেয়ার তাকীদ করেছে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি। সেই সাথে তাদের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শন মমত্ববোধ ও শুভ আচরণ গ্রহণের সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ- اِسْتَوْصُوا بِالْأَسَارَى خَيْرًا . তোমরা বন্দীদের প্রতি কল্যাণময় আচরণ গ্রহণ করবে।
খায়বর যুদ্ধশেষে হযরত বিলাল (রা) দুইজন নারীকে ধরে ইয়াহুদী পুরুষ নিহতদের স্তূপের নিকট নিয়ে গেলেন তাদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে। নিহতদের স্তূপ দেখে একটি মেয়ে ভয়ে-আতংকে চিৎকার করে উঠল এবং নিজের মাথায় মাটি মেখে বিলাপ করতে শুরু করে দিল। পরে দুজনকেই বাঁচিয়ে দেয়া হয়। তাদের একজন হচ্ছেন উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফীয়া বিনতে হাই ইবনে আখতাব (রা)।
রাসূলে করীম (স) মহিলা দুইজনের পাকড়াওকারী হযরত বিলাল (রা)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেনঃ
اِنْزِعَتْ مِنْكَ الرَّحْمَةُ يَا بِلَالُ حِينَ تُمْرُ بِامْرَاتَيْنِ عَلَى قُتْلَى رِجَابِهِمَا
হে বিলাল! তুমি যখন মহিলা দুইজনকে তাদের পুরুষদের বধ্য ভূমিতে নিয়ে গিয়েছিলে, তখন দয়া-মায়া বলতে কি তোমার অন্তরে কিছুই ছিল না?
বন্দীদের রীতিমত খাবার ও পানীয় দেয়ার জন্য নবী করীম (স) বিশেষভাবে তাকীদ করেছেন। বলেছেনঃ
أَطْعَامُ الْأَسِيرِ حَقٌّ عَلَى مَنْ أَسْرَهُ
বন্দীদের পানাহারের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব বন্দীকারীর উপর অর্পিত।
ইসলাম হত্যাকাণ্ড ঘটানোর ক্ষেত্রেও মানবিকতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। নিহত ব্যক্তির হাত-পা-নাক-কান ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটতে অত্যন্ত জোরের সাথে নিষেধ করেছে। এজন্য কুরআনে হেদায়েত দেয়া হয়েছেঃ
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ - وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّبِرِينَ - وَأَصْبَرُ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ بِمَا يَمْكُرُونَ (النحل: ١٢৬-১২৭)
আর তোমরা যদি প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তাহলে শুধু ততটুকুই গ্রহণ করবে, যতখানি তোমার উপর অত্যাচার করা হয়েছে। আর যদি ধৈর্য ধারণ করতে পার তাহলে নিঃসন্দেহে ধৈর্য ধারণকারীদের জন্য অতীব কল্যাণ রয়েছে।
হে মুহাম্মাদ! ধৈর্য সহকারে কাজ করতে থাক-আর তোমাদের এই ধৈর্যও আল্লাহ্রই দেয়া তওফীকের ফল- এই লোকদের কার্যকলাপে তুমি দুঃখিত হবে না এবং তাদের অবলম্বিত কৌশল-ষড়যন্ত্রের দরুন তোমার দিল ভারাক্রান্ত করো না।

টিকাঃ
১. সيرة ابن هشام ج: ٢، ص: ٢٩٩ ٥٠
২. ওহোদের যুদ্ধে হযরত হামযা (রা)-র লাশ পেট ছেড়া ও কলিজাশূন্য অবস্থায় দেখতে পেয়ে রাসূলে করীম (স)-এর মনে যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তারই প্রেক্ষিতে এই আয়াত। তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

এ কথা বললে কিছুমাত্র অত্যুক্তি হবে না যে, ইসলামী সমাজে এই দাসদের অবস্থান অন্যান্য অনৈসলামী সমাজে 'স্বাধীন' নামে পরিচিত নাগরিকদের তুলনায় কিছু মাত্র খারাপ নয়। কেননা যুদ্ধবন্দী-দাসদের ব্যাপারে ইসলামের একটা বিশেষ মানবিক নীতি রয়েছে। ইসলাম এই বন্দীদের প্রতি মানবিক মর্যাদা দেয়ার তাকীদ করেছে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি। সেই সাথে তাদের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শন মমত্ববোধ ও শুভ আচরণ গ্রহণের সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ- اِسْتَوْصُوا بِالْأَسَارَى خَيْرًا . তোমরা বন্দীদের প্রতি কল্যাণময় আচরণ গ্রহণ করবে।
খায়বর যুদ্ধশেষে হযরত বিলাল (রা) দুইজন নারীকে ধরে ইয়াহুদী পুরুষ নিহতদের স্তূপের নিকট নিয়ে গেলেন তাদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে। নিহতদের স্তূপ দেখে একটি মেয়ে ভয়ে-আতংকে চিৎকার করে উঠল এবং নিজের মাথায় মাটি মেখে বিলাপ করতে শুরু করে দিল। পরে দুজনকেই বাঁচিয়ে দেয়া হয়। তাদের একজন হচ্ছেন উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফীয়া বিনতে হাই ইবনে আখতাব (রা)।
রাসূলে করীম (স) মহিলা দুইজনের পাকড়াওকারী হযরত বিলাল (রা)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেনঃ
اِنْزِعَتْ مِنْكَ الرَّحْمَةُ يَا بِلَالُ حِينَ تُمْرُ بِامْرَاتَيْنِ عَلَى قُتْلَى رِجَابِهِمَا
হে বিলাল! তুমি যখন মহিলা দুইজনকে তাদের পুরুষদের বধ্য ভূমিতে নিয়ে গিয়েছিলে, তখন দয়া-মায়া বলতে কি তোমার অন্তরে কিছুই ছিল না?
বন্দীদের রীতিমত খাবার ও পানীয় দেয়ার জন্য নবী করীম (স) বিশেষভাবে তাকীদ করেছেন। বলেছেনঃ
أَطْعَامُ الْأَسِيرِ حَقٌّ عَلَى مَنْ أَسْرَهُ
বন্দীদের পানাহারের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব বন্দীকারীর উপর অর্পিত।
ইসলাম হত্যাকাণ্ড ঘটানোর ক্ষেত্রেও মানবিকতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। নিহত ব্যক্তির হাত-পা-নাক-কান ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটতে অত্যন্ত জোরের সাথে নিষেধ করেছে। এজন্য কুরআনে হেদায়েত দেয়া হয়েছেঃ
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ - وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّبِرِينَ - وَأَصْبَرُ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ بِمَا يَمْكُرُونَ (النحل: ١٢৬-১২৭)
আর তোমরা যদি প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তাহলে শুধু ততটুকুই গ্রহণ করবে, যতখানি তোমার উপর অত্যাচার করা হয়েছে। আর যদি ধৈর্য ধারণ করতে পার তাহলে নিঃসন্দেহে ধৈর্য ধারণকারীদের জন্য অতীব কল্যাণ রয়েছে।
হে মুহাম্মাদ! ধৈর্য সহকারে কাজ করতে থাক-আর তোমাদের এই ধৈর্যও আল্লাহ্রই দেয়া তওফীকের ফল- এই লোকদের কার্যকলাপে তুমি দুঃখিত হবে না এবং তাদের অবলম্বিত কৌশল-ষড়যন্ত্রের দরুন তোমার দিল ভারাক্রান্ত করো না।

টিকাঃ
১. সيرة ابن هشام ج: ٢، ص: ٢٩٩ ٥٠
২. ওহোদের যুদ্ধে হযরত হামযা (রা)-র লাশ পেট ছেড়া ও কলিজাশূন্য অবস্থায় দেখতে পেয়ে রাসূলে করীম (স)-এর মনে যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তারই প্রেক্ষিতে এই আয়াত। তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 সীমালংঘনকারীদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি

📄 সীমালংঘনকারীদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি


ইসলামে যুদ্ধের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিও অন্যতম পন্থা। ইসলামী অবস্থার প্রেক্ষিতে ও প্রয়োজনবোধে এই পন্থার আশ্রয় নিতে পারে। তবে সেজন্য সামরিক লক্ষ্য সুস্পষ্টরূপে থাকা জরুরী শর্ত। অর্থাৎ কৌশলগত লক্ষ্যের বেষ্টনীতে শত্রুর সামরিক তৎপরতা বন্ধ করা উদ্দেশ্যেই তা করা যেতে পারে। ইসলাম এই কৌশলটি প্রয়োগ করার অনুমতি দেয় কেবলমাত্র সীমালংঘনকারী ও আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে। সাধারণ ও নিরপরাধ লোকদেরকে কোনরূপ অসুবিধায় ফেলার কোন অধিকার ইসলাম কাউকেই দেয় না।
আর এটাই নবী করীম (স)-এর আদর্শ। এখানে কয়েকটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ
রাসূলে করীম (স)-এর এক অশ্বারোহী বাহিনী সুমামাতা ইবনে আসাল নামক এক ইমামা অধিবাসীকে বন্দী করে। রাসূলে করীম (স) তার সাথে শুভ আচরণ গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাকে মুক্ত করে দেয়া হয়। পরে সে ইসলাম কবুল করে। পরে মক্কায় উমরা করার জন্য চলে যায়। তখন মক্কার কুরাইশরা তাকে আটক করে এবং হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তাদের মধ্য থেকেই এক ব্যক্তি বললঃ লোকটিকে ছেড়ে দাও। কেননা তোমরা কুরাইশরা নিজেদের জীবিকার জন্য ইমামা যাতায়াত করতে বাধ্য হও। পরে তারা তাকে ছেড়ে দেয়। অতঃপর লোকটি ইমামা উপস্থিত হয়ে মক্কার উপর অর্থনৈতিক বয়কট চালু করে দেয় এবং মক্কায় কোন জিনিসই যাতে না পৌঁছায়, তার শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে মক্কার অধিবাসীরা ভীষণ সংকটের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। তখন মক্কার লোকেরা রাসূলে করীম (স)-কে পত্র লিখে এই মর্মেঃ
আপনি তো রক্ত সম্পর্কের হক আদায়ের উপর খুব গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অথচ আপনিই তাদের সাথে রক্তসম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। আপনি আপনার পৈতৃক বংশের লোকদের তরবারী দ্বারা হত্যা করেছেন। আর বাচ্চাদের হত্যা করিয়েছেন ক্ষুধায় কাতর করে।
এই পত্র পেয়ে নবী করীম (স) সুমামা (রা)-কে নির্দেশ দিলেন তাঁর আরোপিত প্রতিবন্ধকতা প্রত্যাহার করার।
শত্রুর বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি শত্রুকে দমন করার একটা কৌশল হওয়া এবং ইসলামে তা অবৈধ না হওয়া সত্ত্বেও তা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন নিছক এই কারণে যে, তদ্দরুন সাধারণ নিরাপরাধ মানুষ কষ্ট পাচ্ছিল।

টিকাঃ
১. সيرة ابن هشام ج: ۲، ص: ۵۹۳۹

ইসলামে যুদ্ধের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিও অন্যতম পন্থা। ইসলামী অবস্থার প্রেক্ষিতে ও প্রয়োজনবোধে এই পন্থার আশ্রয় নিতে পারে। তবে সেজন্য সামরিক লক্ষ্য সুস্পষ্টরূপে থাকা জরুরী শর্ত। অর্থাৎ কৌশলগত লক্ষ্যের বেষ্টনীতে শত্রুর সামরিক তৎপরতা বন্ধ করা উদ্দেশ্যেই তা করা যেতে পারে। ইসলাম এই কৌশলটি প্রয়োগ করার অনুমতি দেয় কেবলমাত্র সীমালংঘনকারী ও আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে। সাধারণ ও নিরপরাধ লোকদেরকে কোনরূপ অসুবিধায় ফেলার কোন অধিকার ইসলাম কাউকেই দেয় না।
আর এটাই নবী করীম (স)-এর আদর্শ। এখানে কয়েকটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ
রাসূলে করীম (স)-এর এক অশ্বারোহী বাহিনী সুমামাতা ইবনে আসাল নামক এক ইমামা অধিবাসীকে বন্দী করে। রাসূলে করীম (স) তার সাথে শুভ আচরণ গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাকে মুক্ত করে দেয়া হয়। পরে সে ইসলাম কবুল করে। পরে মক্কায় উমরা করার জন্য চলে যায়। তখন মক্কার কুরাইশরা তাকে আটক করে এবং হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তাদের মধ্য থেকেই এক ব্যক্তি বললঃ লোকটিকে ছেড়ে দাও। কেননা তোমরা কুরাইশরা নিজেদের জীবিকার জন্য ইমামা যাতায়াত করতে বাধ্য হও। পরে তারা তাকে ছেড়ে দেয়। অতঃপর লোকটি ইমামা উপস্থিত হয়ে মক্কার উপর অর্থনৈতিক বয়কট চালু করে দেয় এবং মক্কায় কোন জিনিসই যাতে না পৌঁছায়, তার শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে মক্কার অধিবাসীরা ভীষণ সংকটের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। তখন মক্কার লোকেরা রাসূলে করীম (স)-কে পত্র লিখে এই মর্মেঃ
আপনি তো রক্ত সম্পর্কের হক আদায়ের উপর খুব গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অথচ আপনিই তাদের সাথে রক্তসম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। আপনি আপনার পৈতৃক বংশের লোকদের তরবারী দ্বারা হত্যা করেছেন। আর বাচ্চাদের হত্যা করিয়েছেন ক্ষুধায় কাতর করে।
এই পত্র পেয়ে নবী করীম (স) সুমামা (রা)-কে নির্দেশ দিলেন তাঁর আরোপিত প্রতিবন্ধকতা প্রত্যাহার করার।
শত্রুর বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি শত্রুকে দমন করার একটা কৌশল হওয়া এবং ইসলামে তা অবৈধ না হওয়া সত্ত্বেও তা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন নিছক এই কারণে যে, তদ্দরুন সাধারণ নিরাপরাধ মানুষ কষ্ট পাচ্ছিল।

টিকাঃ
১. সيرة ابن هشام ج: ۲، ص: ۵۹۳۹

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 যুদ্ধাস্ত্র সীমিতকরণ

📄 যুদ্ধাস্ত্র সীমিতকরণ


বর্তমান সময়ের দুনিয়ার প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ বন্ধকরণ কিংবা সীমিতকরণ পর্যায়ে যথেষ্ট চেষ্টা-প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুনিয়ার শান্তিকামী চিন্তাবিদ মনীষিগণ এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যও প্রচার করে আসছেন! কিন্তু এ কথায় কোনই সন্দেহ নেই যে, এর কোন কিছুই সাফল্যমণ্ডিত হয়নি। বিশেষ করে দুনিয়ার বৃহৎ রাষ্ট্রবর্গ মুখে অস্ত্র সংবরণের কথা যত বলে, তার তুলনায় অনেক বেশী যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ করছে। তদ্দ্বারা নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করছে যেমন, তেমনি দুনিয়ার বাজারে লোকচক্ষুর অন্তরালে ব্যাপকভাবে অস্ত্র ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে বলা যায়, বর্তমান দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক ব্যবসা সবচাইতে বড় পণ্য হচ্ছে মানুষ মারার অস্ত্র। সারাটি দুনিয়ায় অস্ত্রের কালোবাজারী চলছে। আর দুনিয়ার যেসব বড় বড় দেশ অস্ত্র নির্মাণ বন্ধের জন্য বড় বড় কথা বলে, আন্তর্জাতিক সভা-সম্মেলন করে মানবদরদী বক্তৃতা-ভাষণ দিচ্ছে, তারাই এই মারণাস্ত্রের কালোবাজারীতে তীব্র প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। আসলে ওরা মানুষের প্রতি দরদ দেখাবার ভান করে মানুষ মারার হাতিয়ার দেশে দেশে পৌঁছিয়ে দিচ্ছে সেসব দেশের শাসক-বিরোধী নির্যাতিত জনতার রক্তের বন্যা প্রবাহিত করার লক্ষ্যে।
একটি কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। তা হচ্ছে, মানুষ স্বভাবতই আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রবণ। প্রত্যেকেই চায়, অন্য সকলের উপর তার কর্তৃত্ব হোক, সকলেই তার কর্তৃত্ব মেনে চলুক। আর এজন্য লক্ষ্যার্জনের উপায় হিসেবেও উপায়-উকরণ পর্যায়ে অস্ত্র সংগ্রহ করা তার স্বভাব। অস্ত্র নির্মাণের ও নিত্য নব ও উন্নত মানের অ-সরল-অস্বাভাবিক (Sophisticated) অস্ত্র উদ্ভাবনের মূলে এই কারণ নিহিত বললে কিছু মাত্র অতুক্তি হবে না।
কাজেই অস্ত্র নির্মাণ বন্ধের কোন আন্দোলন সফল হওয়ার প্রশ্ন নিতান্তই অবান্তর।
ঠিক এই কারণে ইসলাম অস্ত্র নির্মাণ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়নি। তবে ইসলামের অবদান হচ্ছে, অস্ত্র নির্মাণের লক্ষ্য বদলে দিয়েছে এবং অস্ত্রের ব্যবহার নৈতিক নিয়ম-নীতি ও বাধ্যবাধকতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করতে চায়।
ইসলাম শুধু অস্ত্র নির্মাণ বা তার ব্যবহারই নয়, বিবাদ-বিসম্বাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ বা রক্তপাতের লক্ষ্য ও ক্ষেত্র হিসেবে সম্পূর্ণ নতুন জিনিস পেশ করেছে। ব্যক্তিগত বা জাতিগত আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। কেননা শুধু মানুষকে মানুষের দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী করার পরিণতিই নিয়ে আসে। তার পরিবর্তে ইসলাম মানুষকে একটি অনন্য সাধারণ আদর্শ দিয়েছে এবং মানুষের উপর নিজের বা নিজের জাতির নয়, একমাত্র আল্লাহ্ নিরংকুশ প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রাম করার আহবান জানিয়েছে।
এভাবে অস্ত্র ব্যবহারের লক্ষ্যই পরিবর্তিত হয়ে গেছে এবং সেই লক্ষ্যে ও উদ্দেশ্যে শক্তি অর্জন ও অস্ত্র নির্মাণ-সংগ্রহ একান্ত জরুরী বলে ঘোষণা করেছে।
এক কথায় ইসলাম বৈষয়িক কোন জিনিসের পরিবর্তে ঈমান-আকীদা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণপণ লড়াই করার নির্দেশ দিয়েছে। ইসলামের এ লড়াই এবং অস্ত্রের ব্যবহার পাশবিকতার পরিবর্তে সম্পূর্ণ মানবিকতাবাদী, নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে দয়া-ভালোবাসা ও সংশোধনী দৃষ্টিভঙ্গীতে চিরভাস্বর।
ইসলামের লক্ষ্য অর্জনের জন্য অস্ত্রের ব্যবহার ক্ষেত্র বিশেষে অপরিহার্য। বৈষয়িকতা তথা আল্লাহদ্রোহিতামূলক জীবন-বিধানকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেই তথায় আল্লাহ্-বিশ্বাসী ও খোদানুগত জীবন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। তাই কুরআনের নির্দেশ হচ্ছেঃ
وَاعِدُوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوٌّ اللَّهِ وَعَدُوكُمْ وَاخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ - لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ ، وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ (الانفাল : ٦٠)
এবং তোমরা যতদূর তোমাদের পক্ষে বেশী শক্তি ও সদা সজ্জিত বাঁধা অশ্ববাহিনী সংগ্রহ ও প্রস্তুত করে রাখ। উহার সাহায্যে তোমরা আল্লাহর দুশমন ও তোমাদের দুশমনকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রাখবে-এছাড়া আরও দুশমন রয়েছে, যাদের তোমরা জানো না, আল্লাহই তাদেরকে জানেন। আর আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তার পুরা মাত্রার শুভ ফল তোমাদেরকে আদায় করে দেয়া হবে। তোমাদের উপর কখনই জুলুম করা হবে না।
আয়াতটি থকে স্পষ্ট জানা যায়, আল্লাহ্ নিজেই মুসলিমদের শক্তি ও যুদ্ধ-সরঞ্জাম সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন; কিন্তু তার পশ্চাতে উদ্দেশ্য হিসেবে নির্দেশিত হয়েছে মুসলমানদের ও আল্লাহর দুশমনদের ভীত-সন্ত্রস্ত করা, যেন তারা আল্লাহর দ্বীনের সাথে এবং সেই দ্বীনের ধারক মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করার মত সাহসও না পায়; বরং তারা আল্লাহ্ ও মুসলিমদের ভয়ে সব সময় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে থাকে। অন্য কথায় সর্বত্র যেমন আল্লাহ্র রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আল্লাহর রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের এক মাত্র পক্ষপাতী মুসলিমদের প্রাধান্য স্থাপিত থাকে। আর এই শক্তি ও যুদ্ধের সরঞ্জাম সংগ্রহে যে ধন-সম্পদ নিয়োজিত ও ব্যয়িত হবে, তা আল্লাহর পথে ব্যয় হিসেবে গণ্য হবে।
স্পষ্ট কথা, শক্তি ও অস্ত্র-শস্ত্র সংগ্রহের মূল লক্ষ্যই হলো প্রধানত আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও কাফেরী শক্তিকে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখা।

বর্তমান সময়ের দুনিয়ার প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ বন্ধকরণ কিংবা সীমিতকরণ পর্যায়ে যথেষ্ট চেষ্টা-প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুনিয়ার শান্তিকামী চিন্তাবিদ মনীষিগণ এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যও প্রচার করে আসছেন! কিন্তু এ কথায় কোনই সন্দেহ নেই যে, এর কোন কিছুই সাফল্যমণ্ডিত হয়নি। বিশেষ করে দুনিয়ার বৃহৎ রাষ্ট্রবর্গ মুখে অস্ত্র সংবরণের কথা যত বলে, তার তুলনায় অনেক বেশী যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ করছে। তদ্দ্বারা নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করছে যেমন, তেমনি দুনিয়ার বাজারে লোকচক্ষুর অন্তরালে ব্যাপকভাবে অস্ত্র ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে বলা যায়, বর্তমান দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক ব্যবসা সবচাইতে বড় পণ্য হচ্ছে মানুষ মারার অস্ত্র। সারাটি দুনিয়ায় অস্ত্রের কালোবাজারী চলছে। আর দুনিয়ার যেসব বড় বড় দেশ অস্ত্র নির্মাণ বন্ধের জন্য বড় বড় কথা বলে, আন্তর্জাতিক সভা-সম্মেলন করে মানবদরদী বক্তৃতা-ভাষণ দিচ্ছে, তারাই এই মারণাস্ত্রের কালোবাজারীতে তীব্র প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। আসলে ওরা মানুষের প্রতি দরদ দেখাবার ভান করে মানুষ মারার হাতিয়ার দেশে দেশে পৌঁছিয়ে দিচ্ছে সেসব দেশের শাসক-বিরোধী নির্যাতিত জনতার রক্তের বন্যা প্রবাহিত করার লক্ষ্যে।
একটি কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। তা হচ্ছে, মানুষ স্বভাবতই আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রবণ। প্রত্যেকেই চায়, অন্য সকলের উপর তার কর্তৃত্ব হোক, সকলেই তার কর্তৃত্ব মেনে চলুক। আর এজন্য লক্ষ্যার্জনের উপায় হিসেবেও উপায়-উকরণ পর্যায়ে অস্ত্র সংগ্রহ করা তার স্বভাব। অস্ত্র নির্মাণের ও নিত্য নব ও উন্নত মানের অ-সরল-অস্বাভাবিক (Sophisticated) অস্ত্র উদ্ভাবনের মূলে এই কারণ নিহিত বললে কিছু মাত্র অতুক্তি হবে না।
কাজেই অস্ত্র নির্মাণ বন্ধের কোন আন্দোলন সফল হওয়ার প্রশ্ন নিতান্তই অবান্তর।
ঠিক এই কারণে ইসলাম অস্ত্র নির্মাণ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়নি। তবে ইসলামের অবদান হচ্ছে, অস্ত্র নির্মাণের লক্ষ্য বদলে দিয়েছে এবং অস্ত্রের ব্যবহার নৈতিক নিয়ম-নীতি ও বাধ্যবাধকতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করতে চায়।
ইসলাম শুধু অস্ত্র নির্মাণ বা তার ব্যবহারই নয়, বিবাদ-বিসম্বাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ বা রক্তপাতের লক্ষ্য ও ক্ষেত্র হিসেবে সম্পূর্ণ নতুন জিনিস পেশ করেছে। ব্যক্তিগত বা জাতিগত আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। কেননা শুধু মানুষকে মানুষের দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী করার পরিণতিই নিয়ে আসে। তার পরিবর্তে ইসলাম মানুষকে একটি অনন্য সাধারণ আদর্শ দিয়েছে এবং মানুষের উপর নিজের বা নিজের জাতির নয়, একমাত্র আল্লাহ্ নিরংকুশ প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রাম করার আহবান জানিয়েছে।
এভাবে অস্ত্র ব্যবহারের লক্ষ্যই পরিবর্তিত হয়ে গেছে এবং সেই লক্ষ্যে ও উদ্দেশ্যে শক্তি অর্জন ও অস্ত্র নির্মাণ-সংগ্রহ একান্ত জরুরী বলে ঘোষণা করেছে।
এক কথায় ইসলাম বৈষয়িক কোন জিনিসের পরিবর্তে ঈমান-আকীদা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণপণ লড়াই করার নির্দেশ দিয়েছে। ইসলামের এ লড়াই এবং অস্ত্রের ব্যবহার পাশবিকতার পরিবর্তে সম্পূর্ণ মানবিকতাবাদী, নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে দয়া-ভালোবাসা ও সংশোধনী দৃষ্টিভঙ্গীতে চিরভাস্বর।
ইসলামের লক্ষ্য অর্জনের জন্য অস্ত্রের ব্যবহার ক্ষেত্র বিশেষে অপরিহার্য। বৈষয়িকতা তথা আল্লাহদ্রোহিতামূলক জীবন-বিধানকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেই তথায় আল্লাহ্-বিশ্বাসী ও খোদানুগত জীবন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। তাই কুরআনের নির্দেশ হচ্ছেঃ
وَاعِدُوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوٌّ اللَّهِ وَعَدُوكُمْ وَاخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ - لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ ، وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ (الانفাল : ٦٠)
এবং তোমরা যতদূর তোমাদের পক্ষে বেশী শক্তি ও সদা সজ্জিত বাঁধা অশ্ববাহিনী সংগ্রহ ও প্রস্তুত করে রাখ। উহার সাহায্যে তোমরা আল্লাহর দুশমন ও তোমাদের দুশমনকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রাখবে-এছাড়া আরও দুশমন রয়েছে, যাদের তোমরা জানো না, আল্লাহই তাদেরকে জানেন। আর আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তার পুরা মাত্রার শুভ ফল তোমাদেরকে আদায় করে দেয়া হবে। তোমাদের উপর কখনই জুলুম করা হবে না।
আয়াতটি থকে স্পষ্ট জানা যায়, আল্লাহ্ নিজেই মুসলিমদের শক্তি ও যুদ্ধ-সরঞ্জাম সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন; কিন্তু তার পশ্চাতে উদ্দেশ্য হিসেবে নির্দেশিত হয়েছে মুসলমানদের ও আল্লাহর দুশমনদের ভীত-সন্ত্রস্ত করা, যেন তারা আল্লাহর দ্বীনের সাথে এবং সেই দ্বীনের ধারক মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করার মত সাহসও না পায়; বরং তারা আল্লাহ্ ও মুসলিমদের ভয়ে সব সময় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে থাকে। অন্য কথায় সর্বত্র যেমন আল্লাহ্র রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আল্লাহর রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের এক মাত্র পক্ষপাতী মুসলিমদের প্রাধান্য স্থাপিত থাকে। আর এই শক্তি ও যুদ্ধের সরঞ্জাম সংগ্রহে যে ধন-সম্পদ নিয়োজিত ও ব্যয়িত হবে, তা আল্লাহর পথে ব্যয় হিসেবে গণ্য হবে।
স্পষ্ট কথা, শক্তি ও অস্ত্র-শস্ত্র সংগ্রহের মূল লক্ষ্যই হলো প্রধানত আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও কাফেরী শক্তিকে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00