📄 আন্তর্জাতিক চুক্তি ও ওয়াদা-প্রতিশ্রুতির প্রতি মর্যাদা
চুক্তি ও ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা বা পূরণ করা ( الوفاء ) মানব প্রকৃতি নিহিত দাবি। মানুষ তার ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রাথমিক পাঠশালায়-ই তার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভ করে, এমনকি বয়স্করা যদি কখনও কোন ধরনের ওয়াদা প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তাহলে পরিবারের অল্প বয়স্করাই তার প্রতিবাদ করে উঠে। এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (স)-এর কথা বলে বর্ণিত একটি হাদীস উদ্ধৃত করছি। তিনি ইরশাদ করেছেনঃ أحِبُّوا الصِّبْيَانَ وَارْحَمُوهُمْ وَإِذَا وَعَدَتُمُوهُمْ شَيْئًا فَقُوا لَهُمْ
তোমরা বালক-বালিকাদের ভালবাসবে, তাদের প্রতি স্নেহ ও মমতা রাখবে। আর যদি কখনও তাদের নিকট কোন কিছুর ওয়াদা কর, তাহলে তা তাদের জন্য অবশ্যই পূরণ করবে।
তাছাড়া সামষ্টিক জীবনের স্থিতিস্থাপকতার জন্য যে-কোন পর্যায়ের পারস্পরিক ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরী শর্ত। পারস্পরিক বিশ্বস্ততা ও বিশ্বাসপরায়ণতা এই জীবনের মৌলিক ভিত্তি। ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি পূরণ ব্যতীত এই ভিত্তি রক্ষা পেতে পারে না। তাই আল্লাহ্ তা'আলা হুকুম করে দিয়েছেনঃ
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا (الاسرأ : ٣٤)
তোমরা পারস্পরিক ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি সমূহ পূর্ণ কর। কেননা এই ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কিয়ামতের দিন অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
আর মু'মিনদের গুণ-পরিচিতি পর্যায়ে বলা হয়েছেঃ
وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمْنَتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَعُونَ (المؤمنون: ৮)
এবং কল্যাণপ্রাপ্ত হচ্ছে সেই সব মুমিন লোক, যারা তাদের আমানত সমূহ এবং তাদের ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি পূর্ণ সতর্কতার সাথে রক্ষা করে।
কুরআন মজীদে ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি পূরণকারীদের প্রশংসা ব্যাপদেশে বলা হয়েছেঃ
إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ - الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَلَا يَنْقُضُونَ الْمِيثَاقَ (الرعد: ۱۹. ২০)
কেবল বুদ্ধিমান লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে। তারা তো সেই লোক, যারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি পূরণ করে এবং চুক্তি কখনই ভঙ্গ করে না।
আর এর বিপরীত যারা ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাদের মন্দ বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছেঃ
يَنْقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِنْ بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَالَّذِينَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ - أُولَئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ (الرعد: ২৫)
আর যারা আল্লাহর ওয়াদা পাকা-পোক্ত ও সুদৃঢ় করার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ্ যার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করার আদেশ করেছন, তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাদের উপর লা'নত বর্ষিত; আর তাদের জন্য রয়েছে অত্যন্ত খারাপ বসবাস স্থান।
একটি আয়াতে ওয়াদা ভঙ্গকারীকে সেই নারীর সাথে তুলনা করা হয়েছে, যে নিজ হাতে সূতা পরিপক্ক করার পর নিজেই তা কেটে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলে। বলা হয়েছেঃ
وَأَوْفُوا بِعَهْدِ اللَّهِ إِذَا عَاهَدْتُمْ وَلَا تَنْقُضُوا الإِيمَانَ بَعْدَ تُوكِيدِهَا وَقَدْ جَعَلْتُمُ اللَّهَ عَلَيْكُمْ كَفِيلًا - إِنَّ اللهَ يَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ - وَلَا تَكُونُوا كَالَّتِي نَقَضَتْ غَزْلَهَا مِنْ بَعْدِ قُوَّةٍ أَنْكَاثًا (النحل: ٩١-٩٢)
তোমরা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ কর, যখন তোমরা তাঁর সাথে কোন ওয়াদা শক্ত করে বেঁধে নিয়েছ এবং নিজেদের কিরা-কসম পাকা পোক্তভাবে করার পর তা ভঙ্গ করো না, যখন তোমরা আল্লাহকে সাক্ষী বানিয়ে নিয়েছ। আল্লাহ্ তোমাদের সব কাজ-কর্ম সম্পর্কে অবহিত রয়েছেন। তোমাদের অবস্থা যেন সেই নারীর মত না হয়, যে নিজেই কঠিন পরিশ্রম করে সূতা কেটেছে ,পরে সে নিজেই তা টুকরা টুকরা করে ফেলেছে।
টিকাঃ
১. এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (স) থেকে বহু মূল্যবান হাদীস বর্ণিত ও উদ্ধৃত হয়েছে। এখানে ভিন্নতর বর্ণনা সূত্রে প্রাপ্ত কতিপয় হাদীস সেই সূত্রের ভাষা অনুযায়ী তুলে দিচ্ছিঃ
(ক) যে লোক আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার, সে যেন ওয়াদা করলে তা পূরণ করে। مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَفِ إِذَا وَعَدَ .
أَقْرَبُكُمْ مِنِّى غَدًا فِي الْمَوقَفِ أَصْدَقُكُمْ فِي الْحَدِيثِ وَأَقَاكُمْ لِلْأَمَانَةِ وَأَوْقَاكُمْ بِالْعَهْدِ .
(খ) কাল কিয়ামতের দিন আমার অতি নিকটবর্তী হবে সেই লোক, যে তোমাদের মধ্যে কথার দিক দিয়ে অতীব সত্যবাদী, আমানতের খুব বেশী আদায়কারী এবং ওয়াদা খুব বেশী পূরণকারী।
يَجِبُّ عَلَى الْمُؤْمِنِ الْوَفَاءِ بِالْمَوَاعِيدِ وَالصِّدْقِ فِيهَا
(গ) মু'মিনের কর্তব্য হচ্ছে ওয়াদা পূরণ করা ও তাতে সততা-সত্যবাদিতা রক্ষা করা।
চুক্তি ও ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা বা পূরণ করা ( الوفاء ) মানব প্রকৃতি নিহিত দাবি। মানুষ তার ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রাথমিক পাঠশালায়-ই তার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভ করে, এমনকি বয়স্করা যদি কখনও কোন ধরনের ওয়াদা প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তাহলে পরিবারের অল্প বয়স্করাই তার প্রতিবাদ করে উঠে। এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (স)-এর কথা বলে বর্ণিত একটি হাদীস উদ্ধৃত করছি। তিনি ইরশাদ করেছেনঃ أحِبُّوا الصِّبْيَانَ وَارْحَمُوهُمْ وَإِذَا وَعَدَتُمُوهُمْ شَيْئًا فَقُوا لَهُمْ
তোমরা বালক-বালিকাদের ভালবাসবে, তাদের প্রতি স্নেহ ও মমতা রাখবে। আর যদি কখনও তাদের নিকট কোন কিছুর ওয়াদা কর, তাহলে তা তাদের জন্য অবশ্যই পূরণ করবে।
তাছাড়া সামষ্টিক জীবনের স্থিতিস্থাপকতার জন্য যে-কোন পর্যায়ের পারস্পরিক ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরী শর্ত। পারস্পরিক বিশ্বস্ততা ও বিশ্বাসপরায়ণতা এই জীবনের মৌলিক ভিত্তি। ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি পূরণ ব্যতীত এই ভিত্তি রক্ষা পেতে পারে না। তাই আল্লাহ্ তা'আলা হুকুম করে দিয়েছেনঃ
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا (الاسرأ : ٣٤)
তোমরা পারস্পরিক ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি সমূহ পূর্ণ কর। কেননা এই ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কিয়ামতের দিন অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
আর মু'মিনদের গুণ-পরিচিতি পর্যায়ে বলা হয়েছেঃ
وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمْنَتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَعُونَ (المؤمنون: ৮)
এবং কল্যাণপ্রাপ্ত হচ্ছে সেই সব মুমিন লোক, যারা তাদের আমানত সমূহ এবং তাদের ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি পূর্ণ সতর্কতার সাথে রক্ষা করে।
কুরআন মজীদে ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি পূরণকারীদের প্রশংসা ব্যাপদেশে বলা হয়েছেঃ
إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ - الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَلَا يَنْقُضُونَ الْمِيثَاقَ (الرعد: ۱۹. ২০)
কেবল বুদ্ধিমান লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে। তারা তো সেই লোক, যারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি পূরণ করে এবং চুক্তি কখনই ভঙ্গ করে না।
আর এর বিপরীত যারা ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাদের মন্দ বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছেঃ
يَنْقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِنْ بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَالَّذِينَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ - أُولَئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ (الرعد: ২৫)
আর যারা আল্লাহর ওয়াদা পাকা-পোক্ত ও সুদৃঢ় করার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ্ যার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করার আদেশ করেছন, তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাদের উপর লা'নত বর্ষিত; আর তাদের জন্য রয়েছে অত্যন্ত খারাপ বসবাস স্থান।
একটি আয়াতে ওয়াদা ভঙ্গকারীকে সেই নারীর সাথে তুলনা করা হয়েছে, যে নিজ হাতে সূতা পরিপক্ক করার পর নিজেই তা কেটে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলে। বলা হয়েছেঃ
وَأَوْفُوا بِعَهْدِ اللَّهِ إِذَا عَاهَدْتُمْ وَلَا تَنْقُضُوا الإِيمَانَ بَعْدَ تُوكِيدِهَا وَقَدْ جَعَلْتُمُ اللَّهَ عَلَيْكُمْ كَفِيلًا - إِنَّ اللهَ يَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ - وَلَا تَكُونُوا كَالَّتِي نَقَضَتْ غَزْلَهَا مِنْ بَعْدِ قُوَّةٍ أَنْكَاثًا (النحل: ٩١-٩٢)
তোমরা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ কর, যখন তোমরা তাঁর সাথে কোন ওয়াদা শক্ত করে বেঁধে নিয়েছ এবং নিজেদের কিরা-কসম পাকা পোক্তভাবে করার পর তা ভঙ্গ করো না, যখন তোমরা আল্লাহকে সাক্ষী বানিয়ে নিয়েছ। আল্লাহ্ তোমাদের সব কাজ-কর্ম সম্পর্কে অবহিত রয়েছেন। তোমাদের অবস্থা যেন সেই নারীর মত না হয়, যে নিজেই কঠিন পরিশ্রম করে সূতা কেটেছে ,পরে সে নিজেই তা টুকরা টুকরা করে ফেলেছে।
টিকাঃ
১. এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (স) থেকে বহু মূল্যবান হাদীস বর্ণিত ও উদ্ধৃত হয়েছে। এখানে ভিন্নতর বর্ণনা সূত্রে প্রাপ্ত কতিপয় হাদীস সেই সূত্রের ভাষা অনুযায়ী তুলে দিচ্ছিঃ
(ক) যে লোক আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার, সে যেন ওয়াদা করলে তা পূরণ করে। مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَفِ إِذَا وَعَدَ .
أَقْرَبُكُمْ مِنِّى غَدًا فِي الْمَوقَفِ أَصْدَقُكُمْ فِي الْحَدِيثِ وَأَقَاكُمْ لِلْأَمَانَةِ وَأَوْقَاكُمْ بِالْعَهْدِ .
(খ) কাল কিয়ামতের দিন আমার অতি নিকটবর্তী হবে সেই লোক, যে তোমাদের মধ্যে কথার দিক দিয়ে অতীব সত্যবাদী, আমানতের খুব বেশী আদায়কারী এবং ওয়াদা খুব বেশী পূরণকারী।
يَجِبُّ عَلَى الْمُؤْمِنِ الْوَفَاءِ بِالْمَوَاعِيدِ وَالصِّدْقِ فِيهَا
(গ) মু'মিনের কর্তব্য হচ্ছে ওয়াদা পূরণ করা ও তাতে সততা-সত্যবাদিতা রক্ষা করা।
📄 যুদ্ধের কারণ ও ইসলামের নীতি
দূর অতীত কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশে দেশে ও জাতিতে জাতিতে যেসব যুদ্ধ হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে, তার মূলে তিনটি কারণই প্রধানঃ
১। সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে অঞ্চলের পর অঞ্চল দখল করে স্বাধীন মানুষকে অধীন বানানো:
২। অন্যদের দেশের উপর আক্রমণ চালিয়ে সেই দেশে অনুকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা বা সেই দেশকে সন্ধিসূত্রে বন্দী করে নিজ দেশের বেকার ও অতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য সেই দেশে অবস্থান গ্রহণের ও উপার্জনের অবাধ সুযোগ করে দেয়া; এবং
৩। নিজের দেশের শিল্পজাত পণ্যদ্রব্য বিক্রয়ের বাজার সৃষ্টি করা এবং নিজ দেশের মূলধন সেই দেশে অবাধ ও নির্বিঘ্ন বিনিয়োগের সুযোগ করার লক্ষ্যে পরদেশ দখল করা কিংবা নিজ দেশের শিল্পোৎপাদনের, প্রতিষ্ঠিত কল-কারখানা চালু রাখা ও বেকার সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সহজে লাভ করার জন্যও বিদেশের উপর সর্বাত্মক আক্রমণ চালানো ও দখল করে নেয়া হয়।
কিন্তু এর কোন একটি উদ্দেশ্যেও পরদেশ আক্রমণের অনুমতি কুরআন মজীদে দেয়া হয়নি। এমন একটি আয়াত সমগ্র কুরআনে সন্ধান করেও পাওয়া যাবে না, যাতে এই ধরনের কোন প্রয়োজনে কোন দেশ দখল করার আদেশ করা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসেও এই উদ্দেশ্যে পরদেশ আক্রমণের কোন ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যেতে পারে না।
অনুরূপভাবে যেসব দেশের সাথে বন্ধুত্বের চুক্তি রয়েছে, সেসব দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ একতরফাভাবে ও অতর্কিতে শুরু করারও কোন অনুমতি কুরআনে নেই। বলা হয়েছেঃ
وَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ كَمَا كَفَرُوا فَتَكُونُونَ سَوَاءٌ فَلَا تَتَّخِذُوا مِنْهُمْ أَوْلِيَاءَ حَتَّى يُهَاجِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ - فَإِنْ تَوَلَّوا فَخُذُوهُمْ وَاقْتُلُوهُمْ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ . وَلَا تَتَّخِذُوا مِنْهُمْ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا - إِلَّا الَّذِينَ يَصِلُونَ إِلَى قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِيثَاقَ أَوْ جَاءُوكُمْ حَصَرَتْ صُدُورُهُمْ أَنْ يُقَاتِلُوكُمْ أَوْ يُقَاتِلُوا قَوْمَهُمْ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَسَلَّطَهُمْ عَلَيْكُمْ فَلَقْتَلُوكُمْ - فَإِنِ اعْتَزَلُوكُمْ فَلَمْ يُقَاتِلُوكُمْ وَالْقَوْا إِلَيْكُمُ السَّلَمَ - فَمَا جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ عَلَيْهِمْ سَبِيلًا - سَتَجِدُونَ آخَرِينَ يُرِيدُونَ أَنْ يَا مَنُوكُمْ وَيَأْمَنُوا قَوْمَهُمْ . كُلَّمَا رُدُّوا إِلَى الْفِتْنَةِ أُرْكِسُوا فِيهَا ، فَإِنْ لَّمْ يَعْتَزِلُوكُمْ وَيُلْقُوا إِلَيْكُمُ السَّلَمَ وَيَكُفُّوا أَيْدِيَهُمْ فَخُذُوهُمْ وَاقْتُلُوهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوهُمْ . وَأُولَئِكُمْ جَعَلْنَا لَكُمْ عَلَيْهِمْ سُلْطَانًا مُبِينًا (النساء: ۸۹-۹۱)
তারা তো এটাই চায় যে, তারা নিজেরা যেমন কাফির হয়েছে, তোমরাও তেমনিভাবে কাফির হয়ে যাও, যেন তোমরা তাদের সমান হয়ে যেতে পার। অতঃপর তোমরা তাদের মধ্য থেকে কাউকে বন্ধু-পৃষ্ঠপোষক রূপে গ্রহণ করবে না, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর পথে হিজরাত করে আসবে। তারা যদি হিজরাত করে না আসে, তাহলে তাদের মধ্য থেকে কাউকে বন্ধু-পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারী রূপে গ্রহণ করবে না। অবশ্য সেসব মুনাফিক এ কথার অন্তর্ভুক্ত নয়, যাদের সাথে তোমাদের কোনরূপ চুক্তি রয়েছে তাদের মধ্যে গিয়ে যদি তারা মিলিত হয়। সেই মুনাফিকরাও এই কথার মধ্যে শামিল নয়, যারা তোমাদের নিকট আসে বটে; কিন্তু তোমাদের বিরুদ্ধে বা তাদের লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে কুণ্ঠিত। আল্লাহ্ ইচ্ছা করলে তাদেরকে তোমাদের উপর বিজয়ীরূপে প্রতিষ্ঠিত করে দিতেন, তখন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। এক্ষণে তারা যদি তোমাদের থেকে বিছিন্ন ও নিঃসম্পর্ক হয়ে যায় ও তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই না করে এবং তোমাদের নিকট সন্ধির প্রস্তাব পেশ করে, তখন তাদের উপর আক্রমণ করার তোমাদের জন্য আল্লাহ্ কোন পথ করে দেননি। আর এক ধরনের মুনাফিক তোমরা পাবে, যারা তোমাদের নিকট থেকেও; নিরাপত্তা পেতে চায় এবং নিজ জাতির পক্ষ থেকেও; কিন্তু যখনই ফিতনা সৃষ্টির সুযোগ পাবে, তাতেই ওরা ঝাঁপিয়ে পড়বে। এ ধরনের লোক তাদের মুকাবিলা করা থেকে যদি বিরত না থাকে, তোমাদের নিকট সন্ধি-শান্তির প্রস্তাব না দেয় এবং নিজেদের হস্ত তোমাদের উপর আক্রমণ করা থেকে বিরত না রাখে, তাহলে ওদেরকে যেখানেই ধরবে হত্যা করবে। এদের উপর আক্রমণ চালানোর কর্তৃত্ব ও অধীকার তোমাদেরকে সুস্পষ্ট করে দিলাম।
ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী'র তাফসীর অনুযায়ী আমাদের আলোচনার প্রেক্ষিতে উদ্ধৃত আয়াতটির সার বক্তব্য হচ্ছেঃ
১. মুশরিক, মুনাফিক ও সুপরিচিত ধর্মহীন-আল্লাহদ্রোহী লোকদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন জায়েয নয়।
২. বিশেষ করে হিজরাতের পর-অন্য কথায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও যে লোক ইসলাম কবুল করবে না ও হিজরাত করে ইসলামী রাষ্ট্রে আসবে না, তাদেরকেও মুসলমানদের বন্ধু বা মিত্র মনে করা যায় না। কেননা সেরূপ অবস্থায় হিজরাতই হচ্ছে ইসলাম গ্রহণের বাস্তব প্রমাণ। তাই অপর আয়াতে বলা হয়েছেঃ
(الانفال : ٧٦) مَا لَكُم مِّنْ وَلَا يَتِهِمْ مِنْ شَيْ حَتَّى يُهَاجِرُوا
যারা হিজরাত করে আসেনি, তাদের অভিভাবকত্বের কোন দায়িত্ব তোমাদের নেই।
৩. তারা যদি হিজরাত না করে, বরং নিজেদের স্থানেই অবিচল হয়ে থাকে ইসলামী রাষ্ট্রের বাইরে, তাহলে তাদের পাকড়াও কর যেখানেই পাও এবং হত্যা কর। এরূপ অবস্থায় তাদের মধ্য থেকে কাউকেই বন্ধু রূপে গ্রহণ করবে না। ওদের কাউকে তোমাদের সাহায্যকারীও মনে করবে না।
৪. তবে যে লোকদের সাথে তোমাদের 'যুদ্ধ নয়' বা অন্য কোন ধরনের চুক্তি রয়েছে, হিজরাত থেকে বিরত থাকা মুসলমানরা যদি তাদের সঙ্গে মিলিত হয়, তাহলে তারাও সেই চুক্তির মধ্যে শামিল বলে গণ্য হবে। কেননা এটা অসম্ভব নয় যে, ইসলামী রাষ্ট্রে হিজরাত করে আসতে চাইলেও হয়ত কোনরূপ বাধা-প্রতিবন্ধকতার কারণে তারা ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ লোকদের নিকট আশ্রয় নিতে পারে।
৫. যারা চুক্তিবদ্ধ লোকদের সাথে মিলিত হবে কিংবা যারা মুসলমান তথা ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুক বা নিঃসাহস হয়ে পড়েছে, ফলে তারা যুদ্ধ করছে না ও যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে সন্ধি করতে ইচ্ছুক নয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কোন পথই আল্লাহ্ ইসলামী রাষ্ট্র বা মুসলমানদের জন্য খোলা রাখেননি।
৬. 'যুদ্ধ নয়' বা অন্য কোন ধরনের চুক্তি থাকলে চুক্তিবদ্ধ কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যাবে না।
৭. যারা মুসলমানদের নিকট উপস্থিত হয়ে নিজেদেরকে মুসলিম হিসেবে প্রদর্শন করে, কিন্তু তাদের নিকট থেকে চলে গিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সুযোগ পেলেই কোন-না-কোন ক্ষতিকর বা বিপর্যয়ের কাজে লিপ্ত হয়, তাদের সম্পর্কেও আল্লাহ্র নির্দেশ হচ্ছে, তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে পাকড়াও করতে হবে এবং হত্যা করতে হবে। কেননা প্রকাশ্য মুনাফিকী করছে ও মুসলমানদের সাথে কৃত চুক্তিভঙ্গ করছে, যেহেতু তারা বাস্তবভাবেই প্রমাণ করেছে যে, ওরা মুসলমানদের সাথে শত্রুতা পরিহার করেনি। বস্তুত ওয়াদা খেলাফী ও চুক্তিভঙ্গ করা দ্বীনী ভাবধারাশূন্য লোকদের পরিচিতি। যে তা করে সে এই অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপিত করে যে, তার মধ্যে দ্বীনদারী বলতে বাস্তবিকই কিছু নেই। এমন কি যে মুশরিকদের ঈমানদার লোকদের কঠোর শত্রু বলে ঘোষণা প্রসঙ্গে বলা হয়েছেঃ
لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا (المائده : ۸۲)
ইয়াহুদ ও মুশরিক লোক দিগকেই তুমি মু'মিনদের সবচাইতে বেশী কঠিন ও কঠোর শত্রু রূপে পাবে।
সেই মুশরিকদের সাথে কৃত ওয়াদা-চুক্তি রক্ষা করার জন্য তাকীদ করা হয়েছেঃ
الَّذِينَ عَاهَدتُّمْ مِنَ الْمُشْرِكِينَ ثُمَّ لَمْ يَنْقُضُوكُمْ شَيْئًا وَلَمْ يُظَاهِرُوا عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَاتَّقُوا إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلَى مُدَّتِهِمْ (التوبه : ٤)
তোমরা যে মুশরিকদের সাথে চুক্তি করেছ, পরে তারা যদি সেই চুক্তির কিছুই ভঙ্গ না করে থাকে, তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকেই সাহায্য-ও না করে থাকে, তাহলে তাদের সাথে করা ওয়াদা-চুক্তিকে তার মেয়াদ পর্যন্ত সম্পূর্ণ কর।
তা সত্ত্বেও এই মুশরিকরা যদি তাদের কিরা-কসম ভঙ্গ করে ও মুসলমানদের সাথে করা ওয়াদার বিরুদ্ধতা করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি ইসলাম দিয়েছে। বলা হয়েছেঃ
وَإِنْ نَّكَثُوا أَيْمَانَهُمْ مِنْ بَعْدِ عَهْدِهِمْ وَطَعَنُوا فِي دِينِكُمْ فَقَاتِلُوا أَئِمَّةَ الْكُفْرِ إِنَّهُمْ لَا إِيْمَانَ لَهُمْ - لَعَلَّهُمْ يَنْتَهُونَ (التوبه: ۱۲)
ওরা যদি তাদের ওয়াদা করার পর তাদের কিরা-কসম ভঙ্গ করে ও তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে গালমন্দ বলে, তাহলে তখন কুফরির এই সরদারদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ কর। ওদের কিরা-কসমের কোন মূল্য নেই-তাহলে হয়ত ওরা ওয়াদা ভঙ্গ করা থেকে বিরত থাকবে।
নবী করীম (স) কাফিরদের সাথে করা চুক্তি রক্ষায় দৃষ্টান্তহীন অবদান রেখেছেন। সেই চুক্তির একটা ধারায় লিখিত হয়েছিলঃ 'মক্কার কোন লোক মদীনায় পালিয়ে গেলে ও ইসলাম কবুল করলেও তাকে মুশরিকদের নিকট মক্কায় ফেরত পাঠাতে হবে।
কোন কোন বর্ণনামতে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরই [আবার অপর একটি বর্ণনানুযায়ী রাসূলে করীম (স)-এর মদীনায় ফিরে আসার পর] আবু বুচাইর নামক মক্কারত ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (স)-এর নিকট উপস্থিত হলো। সে মক্কায় ইসলাম কবুল করলে মুশরিকরা তাকে লৌহ-শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছিল। পরে কোনভাবে সুযোগ পেয়ে সেই শৃঙ্খল পরা অবস্থায় পালিয়ে গিয়ে সে রাসূলে করীম (স)-এর সম্মুখে উপস্থিত হলো। তখন সেই লোক বললঃ ইয়া রাসূল! আপনি কি আমাদের মুশরিকদের হাতে ফিরিয়ে দেবেন? জবাবে নবী করীম (স) বললেনঃ
يَابَا بُصَيْرَ انْطَلِقُ فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى سَيَجْعَلُ وَلَنْ مَّعَكَ مِنَ الْمُسْتَضْعَفِينَ فَرَبًا ومخرجا .
হে আবূ বুচাই। সন্ধি অনুযায়ী তোমাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে বাধ্য। অতএব তুমি যাও। আল্লাহ্ তোমার জন্য এবং তোমার মত দুর্বল অবস্থায় পতিত লোকদের জন্য নিশ্চয়ই কোন সুযোগ এবং মুক্তির কোন পথ বের করে দেবেন।
আবু জান্দালের ঘটনা আরও মর্মস্পর্শী। ঠিক সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার মুহূর্তে আবূ জান্দাল জিঞ্জির বন্দী অবস্থায় সন্ধিস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন। কুরাইশ সরদার সুহাইল তাকে চপেটাঘাত করে। এই মুহূর্তে চৌদ্দশ' কোষ মুক্ত কৃপাণ তার মস্তকে পড়তে কোন অসুবিধা ছিল না। কিন্তু না, ইসলাম অশান্তি চায় না, সন্ধিশর্তের খেলাফ করারও অনুমতি দেয় না।
এবং বাস্তবিকই আল্লাহ্ তা'আলা কিছু দিনে মধ্যেই তাদের জন্য মুশরিকদের কবল থেকে মুক্তিলাভের বিরাট সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে তার বিস্তারিত বিবরণ পঠিতব্য।
সেই দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেনঃ
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يُهَاجِرُوا مَا لَكُم مِّنْ وَلَايَتِهِم مِّنْ شَيْءٍ حَتَّى يُهَاجِرُوا وَإِنِ اسْتَنْصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ إِلَّا عَلَى قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِيثَاقُ - وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ (الانفال: ৭২)
আর যারা ঈমান এনেছে, কিন্তু হিজরাত করে দারুল-ইসলামে আসেনি, তাদের অভিভাবক হওয়ার কোন দায়িত্ব তোমাদের উপর বর্তে না, যতক্ষণ না তারা হিজরাত করে আসছে। কিন্তু দ্বীনের ব্যাপারে তারা যদি তোমাদের নিকট সাহায্য চায়, তাহলে তাদের সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য। কিন্তু তা-ও এমন কোন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হতে পারবে না, যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি রয়েছে। বস্তুত তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ্ তা দেখছেন।
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় ইসলামের দৃষ্টিতে বিভিন্ন জাতি-জনগোষ্ঠীর মধ্যে কৃত চুক্তি রক্ষা করা সর্বোপরি কর্তব্য। এমনকি কাফির-মুশরিকদের নির্যাতনাধীন নিপীড়িত মুসলিমদের সাহায্যার্থেও সেই চুক্তির বিরুদ্ধে কাজ করা যাবে না- সেই চুক্তি যে ধরনেরই হোক না কেন।
টিকাঃ
১. তাফসীর কবীর জ: ১০, স: ২২০-২২৫
২. নবী করীম (স) বলেছেনঃ لا دين لمن لا عهد له যে লোক ওয়াদা পূরণ করে না, তার দ্বীন বা ধর্ম বলতে কিছুই নেই।
৩. سيرة ابن هشام ج: ۲، ص: ۲۲۳
৪. سيرة ابن هشام ج: ٤ ص: ۲۱۸ ، الكامل للجزري ج ۲ ص ১৩৮ ۵۰ اعلام الورى للطبرسي ص: ৯৭
দূর অতীত কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশে দেশে ও জাতিতে জাতিতে যেসব যুদ্ধ হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে, তার মূলে তিনটি কারণই প্রধানঃ
১। সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে অঞ্চলের পর অঞ্চল দখল করে স্বাধীন মানুষকে অধীন বানানো:
২। অন্যদের দেশের উপর আক্রমণ চালিয়ে সেই দেশে অনুকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা বা সেই দেশকে সন্ধিসূত্রে বন্দী করে নিজ দেশের বেকার ও অতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য সেই দেশে অবস্থান গ্রহণের ও উপার্জনের অবাধ সুযোগ করে দেয়া; এবং
৩। নিজের দেশের শিল্পজাত পণ্যদ্রব্য বিক্রয়ের বাজার সৃষ্টি করা এবং নিজ দেশের মূলধন সেই দেশে অবাধ ও নির্বিঘ্ন বিনিয়োগের সুযোগ করার লক্ষ্যে পরদেশ দখল করা কিংবা নিজ দেশের শিল্পোৎপাদনের, প্রতিষ্ঠিত কল-কারখানা চালু রাখা ও বেকার সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সহজে লাভ করার জন্যও বিদেশের উপর সর্বাত্মক আক্রমণ চালানো ও দখল করে নেয়া হয়।
কিন্তু এর কোন একটি উদ্দেশ্যেও পরদেশ আক্রমণের অনুমতি কুরআন মজীদে দেয়া হয়নি। এমন একটি আয়াত সমগ্র কুরআনে সন্ধান করেও পাওয়া যাবে না, যাতে এই ধরনের কোন প্রয়োজনে কোন দেশ দখল করার আদেশ করা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসেও এই উদ্দেশ্যে পরদেশ আক্রমণের কোন ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যেতে পারে না।
অনুরূপভাবে যেসব দেশের সাথে বন্ধুত্বের চুক্তি রয়েছে, সেসব দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ একতরফাভাবে ও অতর্কিতে শুরু করারও কোন অনুমতি কুরআনে নেই। বলা হয়েছেঃ
وَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ كَمَا كَفَرُوا فَتَكُونُونَ سَوَاءٌ فَلَا تَتَّخِذُوا مِنْهُمْ أَوْلِيَاءَ حَتَّى يُهَاجِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ - فَإِنْ تَوَلَّوا فَخُذُوهُمْ وَاقْتُلُوهُمْ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ . وَلَا تَتَّخِذُوا مِنْهُمْ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا - إِلَّا الَّذِينَ يَصِلُونَ إِلَى قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِيثَاقَ أَوْ جَاءُوكُمْ حَصَرَتْ صُدُورُهُمْ أَنْ يُقَاتِلُوكُمْ أَوْ يُقَاتِلُوا قَوْمَهُمْ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَسَلَّطَهُمْ عَلَيْكُمْ فَلَقْتَلُوكُمْ - فَإِنِ اعْتَزَلُوكُمْ فَلَمْ يُقَاتِلُوكُمْ وَالْقَوْا إِلَيْكُمُ السَّلَمَ - فَمَا جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ عَلَيْهِمْ سَبِيلًا - سَتَجِدُونَ آخَرِينَ يُرِيدُونَ أَنْ يَا مَنُوكُمْ وَيَأْمَنُوا قَوْمَهُمْ . كُلَّمَا رُدُّوا إِلَى الْفِتْنَةِ أُرْكِسُوا فِيهَا ، فَإِنْ لَّمْ يَعْتَزِلُوكُمْ وَيُلْقُوا إِلَيْكُمُ السَّلَمَ وَيَكُفُّوا أَيْدِيَهُمْ فَخُذُوهُمْ وَاقْتُلُوهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوهُمْ . وَأُولَئِكُمْ جَعَلْنَا لَكُمْ عَلَيْهِمْ سُلْطَانًا مُبِينًا (النساء: ۸۹-۹۱)
তারা তো এটাই চায় যে, তারা নিজেরা যেমন কাফির হয়েছে, তোমরাও তেমনিভাবে কাফির হয়ে যাও, যেন তোমরা তাদের সমান হয়ে যেতে পার। অতঃপর তোমরা তাদের মধ্য থেকে কাউকে বন্ধু-পৃষ্ঠপোষক রূপে গ্রহণ করবে না, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর পথে হিজরাত করে আসবে। তারা যদি হিজরাত করে না আসে, তাহলে তাদের মধ্য থেকে কাউকে বন্ধু-পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারী রূপে গ্রহণ করবে না। অবশ্য সেসব মুনাফিক এ কথার অন্তর্ভুক্ত নয়, যাদের সাথে তোমাদের কোনরূপ চুক্তি রয়েছে তাদের মধ্যে গিয়ে যদি তারা মিলিত হয়। সেই মুনাফিকরাও এই কথার মধ্যে শামিল নয়, যারা তোমাদের নিকট আসে বটে; কিন্তু তোমাদের বিরুদ্ধে বা তাদের লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে কুণ্ঠিত। আল্লাহ্ ইচ্ছা করলে তাদেরকে তোমাদের উপর বিজয়ীরূপে প্রতিষ্ঠিত করে দিতেন, তখন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। এক্ষণে তারা যদি তোমাদের থেকে বিছিন্ন ও নিঃসম্পর্ক হয়ে যায় ও তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই না করে এবং তোমাদের নিকট সন্ধির প্রস্তাব পেশ করে, তখন তাদের উপর আক্রমণ করার তোমাদের জন্য আল্লাহ্ কোন পথ করে দেননি। আর এক ধরনের মুনাফিক তোমরা পাবে, যারা তোমাদের নিকট থেকেও; নিরাপত্তা পেতে চায় এবং নিজ জাতির পক্ষ থেকেও; কিন্তু যখনই ফিতনা সৃষ্টির সুযোগ পাবে, তাতেই ওরা ঝাঁপিয়ে পড়বে। এ ধরনের লোক তাদের মুকাবিলা করা থেকে যদি বিরত না থাকে, তোমাদের নিকট সন্ধি-শান্তির প্রস্তাব না দেয় এবং নিজেদের হস্ত তোমাদের উপর আক্রমণ করা থেকে বিরত না রাখে, তাহলে ওদেরকে যেখানেই ধরবে হত্যা করবে। এদের উপর আক্রমণ চালানোর কর্তৃত্ব ও অধীকার তোমাদেরকে সুস্পষ্ট করে দিলাম।
ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী'র তাফসীর অনুযায়ী আমাদের আলোচনার প্রেক্ষিতে উদ্ধৃত আয়াতটির সার বক্তব্য হচ্ছেঃ
১. মুশরিক, মুনাফিক ও সুপরিচিত ধর্মহীন-আল্লাহদ্রোহী লোকদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন জায়েয নয়।
২. বিশেষ করে হিজরাতের পর-অন্য কথায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও যে লোক ইসলাম কবুল করবে না ও হিজরাত করে ইসলামী রাষ্ট্রে আসবে না, তাদেরকেও মুসলমানদের বন্ধু বা মিত্র মনে করা যায় না। কেননা সেরূপ অবস্থায় হিজরাতই হচ্ছে ইসলাম গ্রহণের বাস্তব প্রমাণ। তাই অপর আয়াতে বলা হয়েছেঃ
(الانفال : ٧٦) مَا لَكُم مِّنْ وَلَا يَتِهِمْ مِنْ شَيْ حَتَّى يُهَاجِرُوا
যারা হিজরাত করে আসেনি, তাদের অভিভাবকত্বের কোন দায়িত্ব তোমাদের নেই।
৩. তারা যদি হিজরাত না করে, বরং নিজেদের স্থানেই অবিচল হয়ে থাকে ইসলামী রাষ্ট্রের বাইরে, তাহলে তাদের পাকড়াও কর যেখানেই পাও এবং হত্যা কর। এরূপ অবস্থায় তাদের মধ্য থেকে কাউকেই বন্ধু রূপে গ্রহণ করবে না। ওদের কাউকে তোমাদের সাহায্যকারীও মনে করবে না।
৪. তবে যে লোকদের সাথে তোমাদের 'যুদ্ধ নয়' বা অন্য কোন ধরনের চুক্তি রয়েছে, হিজরাত থেকে বিরত থাকা মুসলমানরা যদি তাদের সঙ্গে মিলিত হয়, তাহলে তারাও সেই চুক্তির মধ্যে শামিল বলে গণ্য হবে। কেননা এটা অসম্ভব নয় যে, ইসলামী রাষ্ট্রে হিজরাত করে আসতে চাইলেও হয়ত কোনরূপ বাধা-প্রতিবন্ধকতার কারণে তারা ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ লোকদের নিকট আশ্রয় নিতে পারে।
৫. যারা চুক্তিবদ্ধ লোকদের সাথে মিলিত হবে কিংবা যারা মুসলমান তথা ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুক বা নিঃসাহস হয়ে পড়েছে, ফলে তারা যুদ্ধ করছে না ও যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে সন্ধি করতে ইচ্ছুক নয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কোন পথই আল্লাহ্ ইসলামী রাষ্ট্র বা মুসলমানদের জন্য খোলা রাখেননি।
৬. 'যুদ্ধ নয়' বা অন্য কোন ধরনের চুক্তি থাকলে চুক্তিবদ্ধ কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যাবে না।
৭. যারা মুসলমানদের নিকট উপস্থিত হয়ে নিজেদেরকে মুসলিম হিসেবে প্রদর্শন করে, কিন্তু তাদের নিকট থেকে চলে গিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সুযোগ পেলেই কোন-না-কোন ক্ষতিকর বা বিপর্যয়ের কাজে লিপ্ত হয়, তাদের সম্পর্কেও আল্লাহ্র নির্দেশ হচ্ছে, তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে পাকড়াও করতে হবে এবং হত্যা করতে হবে। কেননা প্রকাশ্য মুনাফিকী করছে ও মুসলমানদের সাথে কৃত চুক্তিভঙ্গ করছে, যেহেতু তারা বাস্তবভাবেই প্রমাণ করেছে যে, ওরা মুসলমানদের সাথে শত্রুতা পরিহার করেনি। বস্তুত ওয়াদা খেলাফী ও চুক্তিভঙ্গ করা দ্বীনী ভাবধারাশূন্য লোকদের পরিচিতি। যে তা করে সে এই অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপিত করে যে, তার মধ্যে দ্বীনদারী বলতে বাস্তবিকই কিছু নেই। এমন কি যে মুশরিকদের ঈমানদার লোকদের কঠোর শত্রু বলে ঘোষণা প্রসঙ্গে বলা হয়েছেঃ
لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا (المائده : ۸۲)
ইয়াহুদ ও মুশরিক লোক দিগকেই তুমি মু'মিনদের সবচাইতে বেশী কঠিন ও কঠোর শত্রু রূপে পাবে।
সেই মুশরিকদের সাথে কৃত ওয়াদা-চুক্তি রক্ষা করার জন্য তাকীদ করা হয়েছেঃ
الَّذِينَ عَاهَدتُّمْ مِنَ الْمُشْرِكِينَ ثُمَّ لَمْ يَنْقُضُوكُمْ شَيْئًا وَلَمْ يُظَاهِرُوا عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَاتَّقُوا إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلَى مُدَّتِهِمْ (التوبه : ٤)
তোমরা যে মুশরিকদের সাথে চুক্তি করেছ, পরে তারা যদি সেই চুক্তির কিছুই ভঙ্গ না করে থাকে, তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকেই সাহায্য-ও না করে থাকে, তাহলে তাদের সাথে করা ওয়াদা-চুক্তিকে তার মেয়াদ পর্যন্ত সম্পূর্ণ কর।
তা সত্ত্বেও এই মুশরিকরা যদি তাদের কিরা-কসম ভঙ্গ করে ও মুসলমানদের সাথে করা ওয়াদার বিরুদ্ধতা করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি ইসলাম দিয়েছে। বলা হয়েছেঃ
وَإِنْ نَّكَثُوا أَيْمَانَهُمْ مِنْ بَعْدِ عَهْدِهِمْ وَطَعَنُوا فِي دِينِكُمْ فَقَاتِلُوا أَئِمَّةَ الْكُفْرِ إِنَّهُمْ لَا إِيْمَانَ لَهُمْ - لَعَلَّهُمْ يَنْتَهُونَ (التوبه: ۱۲)
ওরা যদি তাদের ওয়াদা করার পর তাদের কিরা-কসম ভঙ্গ করে ও তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে গালমন্দ বলে, তাহলে তখন কুফরির এই সরদারদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ কর। ওদের কিরা-কসমের কোন মূল্য নেই-তাহলে হয়ত ওরা ওয়াদা ভঙ্গ করা থেকে বিরত থাকবে।
নবী করীম (স) কাফিরদের সাথে করা চুক্তি রক্ষায় দৃষ্টান্তহীন অবদান রেখেছেন। সেই চুক্তির একটা ধারায় লিখিত হয়েছিলঃ 'মক্কার কোন লোক মদীনায় পালিয়ে গেলে ও ইসলাম কবুল করলেও তাকে মুশরিকদের নিকট মক্কায় ফেরত পাঠাতে হবে।
কোন কোন বর্ণনামতে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরই [আবার অপর একটি বর্ণনানুযায়ী রাসূলে করীম (স)-এর মদীনায় ফিরে আসার পর] আবু বুচাইর নামক মক্কারত ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (স)-এর নিকট উপস্থিত হলো। সে মক্কায় ইসলাম কবুল করলে মুশরিকরা তাকে লৌহ-শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছিল। পরে কোনভাবে সুযোগ পেয়ে সেই শৃঙ্খল পরা অবস্থায় পালিয়ে গিয়ে সে রাসূলে করীম (স)-এর সম্মুখে উপস্থিত হলো। তখন সেই লোক বললঃ ইয়া রাসূল! আপনি কি আমাদের মুশরিকদের হাতে ফিরিয়ে দেবেন? জবাবে নবী করীম (স) বললেনঃ
يَابَا بُصَيْرَ انْطَلِقُ فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى سَيَجْعَلُ وَلَنْ مَّعَكَ مِنَ الْمُسْتَضْعَفِينَ فَرَبًا ومخرجا .
হে আবূ বুচাই। সন্ধি অনুযায়ী তোমাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে বাধ্য। অতএব তুমি যাও। আল্লাহ্ তোমার জন্য এবং তোমার মত দুর্বল অবস্থায় পতিত লোকদের জন্য নিশ্চয়ই কোন সুযোগ এবং মুক্তির কোন পথ বের করে দেবেন।
আবু জান্দালের ঘটনা আরও মর্মস্পর্শী। ঠিক সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার মুহূর্তে আবূ জান্দাল জিঞ্জির বন্দী অবস্থায় সন্ধিস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন। কুরাইশ সরদার সুহাইল তাকে চপেটাঘাত করে। এই মুহূর্তে চৌদ্দশ' কোষ মুক্ত কৃপাণ তার মস্তকে পড়তে কোন অসুবিধা ছিল না। কিন্তু না, ইসলাম অশান্তি চায় না, সন্ধিশর্তের খেলাফ করারও অনুমতি দেয় না।
এবং বাস্তবিকই আল্লাহ্ তা'আলা কিছু দিনে মধ্যেই তাদের জন্য মুশরিকদের কবল থেকে মুক্তিলাভের বিরাট সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে তার বিস্তারিত বিবরণ পঠিতব্য।
সেই দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেনঃ
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يُهَاجِرُوا مَا لَكُم مِّنْ وَلَايَتِهِم مِّنْ شَيْءٍ حَتَّى يُهَاجِرُوا وَإِنِ اسْتَنْصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ إِلَّا عَلَى قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِيثَاقُ - وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ (الانفال: ৭২)
আর যারা ঈমান এনেছে, কিন্তু হিজরাত করে দারুল-ইসলামে আসেনি, তাদের অভিভাবক হওয়ার কোন দায়িত্ব তোমাদের উপর বর্তে না, যতক্ষণ না তারা হিজরাত করে আসছে। কিন্তু দ্বীনের ব্যাপারে তারা যদি তোমাদের নিকট সাহায্য চায়, তাহলে তাদের সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য। কিন্তু তা-ও এমন কোন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হতে পারবে না, যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি রয়েছে। বস্তুত তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ্ তা দেখছেন।
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় ইসলামের দৃষ্টিতে বিভিন্ন জাতি-জনগোষ্ঠীর মধ্যে কৃত চুক্তি রক্ষা করা সর্বোপরি কর্তব্য। এমনকি কাফির-মুশরিকদের নির্যাতনাধীন নিপীড়িত মুসলিমদের সাহায্যার্থেও সেই চুক্তির বিরুদ্ধে কাজ করা যাবে না- সেই চুক্তি যে ধরনেরই হোক না কেন।
টিকাঃ
১. তাফসীর কবীর জ: ১০, স: ২২০-২২৫
২. নবী করীম (স) বলেছেনঃ لا دين لمن لا عهد له যে লোক ওয়াদা পূরণ করে না, তার দ্বীন বা ধর্ম বলতে কিছুই নেই।
৩. سيرة ابن هشام ج: ۲، ص: ۲۲۳
৪. سيرة ابن هشام ج: ٤ ص: ۲۱۸ ، الكامل للجزري ج ۲ ص ১৩৮ ۵۰ اعلام الورى للطبرسي ص: ৯৭
📄 ইসলাম ও বিশ্বশান্তি
'শান্তি' কথাটি খুবই লোভনীয়, তা শুনবার জন্য মানুষ সব সময়ই উৎকর্ণ হয়ে থাকে। কেননা মানুষ স্বভাবতই শান্তির পক্ষপাতী, অশান্তির বিরুদ্ধে। মানুষ অন্তর দিয়ে কামনা করে, সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, একবিন্দু অশান্তিও যেন কোথাও না থাকে, অশান্তির কারণ যেন কখনই না ঘটে। দুনিয়ার মানুষ শান্তির জন্য পাগল। আর দুনিয়ার বৃহৎ শক্তিবর্গ নিত্য নতুন শানিত মারণাস্ত্র নির্মাণে জাতীয় সম্পদের বেশীর ভাগ ব্যয় করছে। নিজেদের রক্ত-পিপাসা চরিতার্থ করার কুমতলবে কৌশলের পর কৌশল আঁটছে। তাদের পারস্পরিক চ্যালেঞ্জ শুনে বিশ্বমানবতা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে।
কিন্তু মানুষ ভয়ে যতই কাঁপুক, শান্তির কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না; শুধু তাই নয়, শান্তি যেন ক্রমশ কঠিন থেকেও কঠিনতর হয়ে উঠছে। বৃহৎ শক্তিবর্গ যেমন করে মারণাস্ত্র নির্মাণে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে, তাতে যে কোন মুহূর্তে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যাওয়া অবধারিত মনে হয়। কেননা বৃহৎ রাষ্ট্রবর্গের সাম্রাজ্যবাদী চণ্ডল নীতির ফলে দুনিয়ার বিভিন্ন দিকে স্থানীয় বা আঞ্চলিক সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেছে এবং বছরের পর বছর অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে, তবু তার মীমাংসা বা সমাপ্তি হচ্ছে না। তাতে মনে হয়—তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বশান্তির কোন সম্ভাবনাই লক্ষ্য করা যাবে না।
অপরদিকে বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যাতে বেঁধে না যায়, সে জন্য চেষ্টারও কোন অভাব নেই। এজন্য বড় বড় সভা-সম্মেলন হচ্ছে, দাবির প্রচণ্ডতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মিছিল-বিক্ষোভ হচ্ছে। কেননা বিশ্বের মানুষ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য আদৌ প্রস্তুত নয়। একথা সকলেরই জানা আছে যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি সত্যিই শুরু হয়, তাহলে বিশ্বমানবতা ও বিশ্বসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।
কিন্তু এতসব সত্ত্বেও বিশ্বযুদ্ধের আশংকা বিন্দুমাত্রও কমছে না। কেননা প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অশান্তির কঠিন কারণসমূহ বিদূরণ কার্যত সম্ভব হয়ে উঠছে না। কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি বৃহৎ শক্তিবর্গের কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে না, মারণাস্ত্র নির্মাণের প্রস্তুতি বন্ধ হচ্ছে না, পরস্পরে হুমকি প্রতি হুমকি দেয়াও চলছে অবিরাম।
এই প্রেক্ষিতে একথা বললে কিছুমাত্র অত্যুক্তি হবে না যে, বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তিগুলি একটা বিশ্ব রক্তপাত ছাড়া বোধ হয় থামবে না, যুদ্ধ প্রস্তুতি প্রতি মুহূর্ত বাড়তে বাড়তে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, যখন প্রকৃত যুদ্ধ ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।
তার কারণও রয়েছে। কেননা বর্তমান দুনিয়ার পরাশক্তিসমূহের নিকট মারণাস্ত্র ছাড়া মানবিক আদর্শের কিছুই নেই, যা তারা গ্রহণ করে নিজেরা যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে, আর অপরাপর শক্তিগুলিকেও যুদ্ধ থেকে বিরত রাখবে।
সত্যি কথা হচ্ছে, বর্তমান বিশ্ব নেতৃত্ব মনুষ্যত্ব বিবর্জিত। মানবিকতা বলতে কোন কিছুই কুত্রাপি দেখা যাচ্ছে না। ফলে পাশবিকতার ও পশ্বাচারই মানুষের আকৃতিতে নৃত্য করছে সমগ্র বিশ্বের নাট্যমঞ্চে। পুঁজিবাদী-তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশ হোক, আর সমাজতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র হোক, মানবিক আদর্শের হাতিয়ার কারোর নিকটই নেই।
তাই একথা বলার সময় উপস্থিত হয়েছে যে, একমাত্র ইসলাম-ই পারে বর্তমান যুদ্ধ-ঝঞ্ঝা প্রকম্পিত বিশ্বকে শান্তির সন্ধান দিতে। বিশ্বশান্তির জন্য যে মানবিক আদর্শের প্রয়োজন, তা কেবল ইসলামেই রয়েছে।
তার বড় প্রমাণ, 'ইসলাম' শব্দটিই নির্গত হয়েছে 'সালামুন )سلم( ধাতু থেকে, যার আর এক অর্থ সন্ধি, সমৃদ্ধি। এই শান্তি ও সমৃদ্ধির দিকেই কুরআন আহবান জানিয়েছে ঈমানদার লোকদেরকে। ইরশাদ হয়েছেঃ
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً (البقرة: ۲۰۸)
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা সম্পূর্ণরূপে ইসলামে-সন্ধি, সমৃদ্ধিতে-প্রবেশ কর।
আর আজকের শত্রুও যদি সন্ধি ও সন্ধির পরিণতিতে সমৃদ্ধির জন্য আগ্রহান্বিত হয়, তা তার সাথে সন্ধির হাত মিলাতে দ্বিধা করা যাবে না। বলা হয়েছেঃ
وَإِنْ جَنَحُوا لِلسِّلْمِ فَاجْنَحْ لَهَا (الانفال: ٦١)
শত্রুও যদি শান্তি ও সন্ধি-সমৃদ্ধির জন্য আগ্রহী হয়, তাহলে তুমিও তার জন্য আগ্রহী হও।
কুরআনের চিরন্তন আহবান হচ্ছে শান্তি রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। এমন কি, পারিবারিক ক্ষুদ্র সংকীর্ণ পরিবেশেও শান্তি-সমৃদ্ধির ব্যবস্থা ইসলামই উপস্থাপিত করেছে। কেননা তাই হচ্ছে বৃহত্তর পরিবেশের প্রাথমিক স্তর। বলা হয়েছেঃ
وَالصُّلْحُ خَيْرٌ (النساء: ۱۲۸)
সন্ধি-সমৃদ্ধি-ই সর্বোত্তম ও সর্বাধিক কল্যাণের বাহক।
ইসলাম সব মু'মিন পুরুষ-নারীর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কের কথা ঘোষণা করেছে। তাদের মধ্যে কোনরূপ বিরোধ বা বিবাদ দেখা দিলে তা দূর করে অবিলম্বে সন্ধি কায়েম করে সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। বলা হয়েছেঃ
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ أَخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ (الحجرات: ١٠
মু'মিনরা সব পরস্পর ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের এই ভাইদের মধ্যে সর্বদা সন্ধি-সমৃদ্ধি স্থাপন করতে থাক।
আর মুসলমানদের দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ ও যুদ্ধ যদি শুরু হয়ে যায়, তাহলে গোটা মুসলিম সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে—তাদের মধ্যে অনতিবিলম্বে মীমাংসা করে দেয়া এবং প্রয়োজন হলে সীমালংঘনকারী পক্ষের বিরুদ্ধে সম্মিলিত হয়ে যুদ্ধ করা, তাকে মীমাংসা মেনে নিতে বাধ্য করা। বলা হয়েছেঃ
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَهُمَا عَلَى الأخرى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ - فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ (الحجرات : ٩)
মু'মিনদের দুটি পক্ষ যদি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে হে মুসলিমগণ! তোমরা সেই পক্ষদ্বয়ের মাঝে সন্ধি করে দাও। পরে যদি এক পক্ষ অপর পক্ষের উপর সীমালংঘন ও আগ্রাসন করে বসে, তাহলে তোমরা সকলে সম্মিলিতভাবে সেই পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যতক্ষণ না সেই পক্ষ আল্লাহ্ ফয়সালা—মীমাংসার দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে তাহলে তখন উভয় পক্ষের মাঝে ন্যায়পরতা সহকারে মীমাংসা ও সন্ধি করে দাও। আর তোমরা সকল ক্ষেত্রে সুবিচার ও ন্যায়পরতাকে প্রতিষ্ঠিত করবে। কেননা আল্লাহ্ ন্যায়পরতা ও সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন।
ইসলামের এসব আদেশ ও বিধানের চরম লক্ষ্যই হচ্ছে শান্তি রক্ষা, শান্তি প্রতিষ্ঠিত করা, যেন মানুষ পরম শান্তি নিরাপত্তা সহকারে জীবন-যাপন করতে পারে। ইসলামের এই লক্ষ্য যেমন মুসলিম জনগণের মধ্যে, তেমনি সমগ্র মানব সমাজের মধ্যেও নিবন্ধ। তাই আল্লাহ্ বলেছেনঃ
عَسَى اللَّهُ أَنْ يَجْعَلَ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ الَّذِينَ عَادَيْتُمْ مِنْهُم مَّوَدَّةً . وَاللَّهُ قَدِيرٌ - وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (الممتحنة : ٧)
অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ্ তোমাদের ও যাদের সাথে আজ তোমরা শত্রুতার সৃষ্টি করে ফেলেছ তাদের মধ্যে ভালোবাসার সঞ্চার করে দেবে। আল্লাহ্ তো বড়ই শক্তিমান, তিনি অতীব ক্ষমাশীল, দয়াবান।
বস্তুতই ইসলাম মানব জীবনের সকল দিকে ও ক্ষেত্রেই শান্তি স্থাপনের পক্ষে সচেষ্ট।
নবী করীম (স) আল্লাহর এই বিধানকে বাস্তবে অনুসরণ করেছেন এবং সমস্ত কাজ আল্লাহ্ দেখিয়ে দেয়া পন্থা ও পদ্ধতিতে আঞ্জাম দিয়েছেন।
মক্কা বিজয়কালে তিনি যে পরম মানবতাবাদী অবদান রেখেছেন, তা চিরকালের ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। তিনি সেদিন হযরত সায়াদ ইবনে উবাদা (রা)-র হাতে পতাকা দিয়েছিলেন। তিনি সেই পতাকা নিয়ে যখন অগ্রসর হলেন, আবু সুফিয়ানকে দেখতে পেলেন। তিনি তাকে সম্বোধন করে বললেনঃ
يَا أَبَا سُفْيَانَ الْيَوْمَ يَوْمُ الْمَلْحَمَةِ الْيَوْمَ تَسْتَحِلُّ الْحُرْمَةُ الْيَوْمَ أَذَلَّ اللهُ قُرَيْشًا .
হে আবু সুফিয়ান! আজকের দিন লড়াই জবাইর দিন, আজকের দিন সমস্ত হারাম হালাল হওয়ার দিন, আজ আল্লাহ্ কুরাইশদেরকে লাঞ্ছিত করেছেন।
একথা শুনতে পেয়েই নবী করীম (স) বলে উঠলেনঃ
اليوم يوم المرحمة اليوم أعز الله قريشا .
না, আজকের দিন ক্ষমা ও দয়ার দিন। আজ-ই আল্লাহ্ কুরাইশদের সম্মানিত করেছেন।
এ তো অনেক পরবর্তী সময়ের কথা। তার পূর্বে হুদায়বিয়ার সন্ধি মক্কার কুরাইশদের সাথে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। হুদায়বিয়ার এই সন্ধির ইতিহাস ও দলীল-দস্তাবেজ ইসলামের শান্তি প্রয়াসের উজ্জ্বল অকাট্য দলীল। তাতে কুরাইশদের দাবি অনুযায়ী রাসূলে করীম (স)-এর নামের পর 'রাসূলুল্লাহ' লেখাও বাদ দিয়েছিলেন।
টিকাঃ
১. المغازي للواقدي ج ۲ ص ۵۰۸۲۲۸۳۱
২. سيرة ابن هشام ج: ٤ ص: ۳۱۸ ، الكامل للججزری ج ۲ ص ۱۲۸ २० اعلام الورى للطبرسي ص: ۹۷
'শান্তি' কথাটি খুবই লোভনীয়, তা শুনবার জন্য মানুষ সব সময়ই উৎকর্ণ হয়ে থাকে। কেননা মানুষ স্বভাবতই শান্তির পক্ষপাতী, অশান্তির বিরুদ্ধে। মানুষ অন্তর দিয়ে কামনা করে, সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, একবিন্দু অশান্তিও যেন কোথাও না থাকে, অশান্তির কারণ যেন কখনই না ঘটে। দুনিয়ার মানুষ শান্তির জন্য পাগল। আর দুনিয়ার বৃহৎ শক্তিবর্গ নিত্য নতুন শানিত মারণাস্ত্র নির্মাণে জাতীয় সম্পদের বেশীর ভাগ ব্যয় করছে। নিজেদের রক্ত-পিপাসা চরিতার্থ করার কুমতলবে কৌশলের পর কৌশল আঁটছে। তাদের পারস্পরিক চ্যালেঞ্জ শুনে বিশ্বমানবতা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে।
কিন্তু মানুষ ভয়ে যতই কাঁপুক, শান্তির কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না; শুধু তাই নয়, শান্তি যেন ক্রমশ কঠিন থেকেও কঠিনতর হয়ে উঠছে। বৃহৎ শক্তিবর্গ যেমন করে মারণাস্ত্র নির্মাণে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে, তাতে যে কোন মুহূর্তে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যাওয়া অবধারিত মনে হয়। কেননা বৃহৎ রাষ্ট্রবর্গের সাম্রাজ্যবাদী চণ্ডল নীতির ফলে দুনিয়ার বিভিন্ন দিকে স্থানীয় বা আঞ্চলিক সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেছে এবং বছরের পর বছর অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে, তবু তার মীমাংসা বা সমাপ্তি হচ্ছে না। তাতে মনে হয়—তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বশান্তির কোন সম্ভাবনাই লক্ষ্য করা যাবে না।
অপরদিকে বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যাতে বেঁধে না যায়, সে জন্য চেষ্টারও কোন অভাব নেই। এজন্য বড় বড় সভা-সম্মেলন হচ্ছে, দাবির প্রচণ্ডতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মিছিল-বিক্ষোভ হচ্ছে। কেননা বিশ্বের মানুষ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য আদৌ প্রস্তুত নয়। একথা সকলেরই জানা আছে যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি সত্যিই শুরু হয়, তাহলে বিশ্বমানবতা ও বিশ্বসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।
কিন্তু এতসব সত্ত্বেও বিশ্বযুদ্ধের আশংকা বিন্দুমাত্রও কমছে না। কেননা প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অশান্তির কঠিন কারণসমূহ বিদূরণ কার্যত সম্ভব হয়ে উঠছে না। কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি বৃহৎ শক্তিবর্গের কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে না, মারণাস্ত্র নির্মাণের প্রস্তুতি বন্ধ হচ্ছে না, পরস্পরে হুমকি প্রতি হুমকি দেয়াও চলছে অবিরাম।
এই প্রেক্ষিতে একথা বললে কিছুমাত্র অত্যুক্তি হবে না যে, বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তিগুলি একটা বিশ্ব রক্তপাত ছাড়া বোধ হয় থামবে না, যুদ্ধ প্রস্তুতি প্রতি মুহূর্ত বাড়তে বাড়তে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, যখন প্রকৃত যুদ্ধ ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।
তার কারণও রয়েছে। কেননা বর্তমান দুনিয়ার পরাশক্তিসমূহের নিকট মারণাস্ত্র ছাড়া মানবিক আদর্শের কিছুই নেই, যা তারা গ্রহণ করে নিজেরা যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে, আর অপরাপর শক্তিগুলিকেও যুদ্ধ থেকে বিরত রাখবে।
সত্যি কথা হচ্ছে, বর্তমান বিশ্ব নেতৃত্ব মনুষ্যত্ব বিবর্জিত। মানবিকতা বলতে কোন কিছুই কুত্রাপি দেখা যাচ্ছে না। ফলে পাশবিকতার ও পশ্বাচারই মানুষের আকৃতিতে নৃত্য করছে সমগ্র বিশ্বের নাট্যমঞ্চে। পুঁজিবাদী-তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশ হোক, আর সমাজতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র হোক, মানবিক আদর্শের হাতিয়ার কারোর নিকটই নেই।
তাই একথা বলার সময় উপস্থিত হয়েছে যে, একমাত্র ইসলাম-ই পারে বর্তমান যুদ্ধ-ঝঞ্ঝা প্রকম্পিত বিশ্বকে শান্তির সন্ধান দিতে। বিশ্বশান্তির জন্য যে মানবিক আদর্শের প্রয়োজন, তা কেবল ইসলামেই রয়েছে।
তার বড় প্রমাণ, 'ইসলাম' শব্দটিই নির্গত হয়েছে 'সালামুন )سلم( ধাতু থেকে, যার আর এক অর্থ সন্ধি, সমৃদ্ধি। এই শান্তি ও সমৃদ্ধির দিকেই কুরআন আহবান জানিয়েছে ঈমানদার লোকদেরকে। ইরশাদ হয়েছেঃ
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً (البقرة: ۲۰۸)
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা সম্পূর্ণরূপে ইসলামে-সন্ধি, সমৃদ্ধিতে-প্রবেশ কর।
আর আজকের শত্রুও যদি সন্ধি ও সন্ধির পরিণতিতে সমৃদ্ধির জন্য আগ্রহান্বিত হয়, তা তার সাথে সন্ধির হাত মিলাতে দ্বিধা করা যাবে না। বলা হয়েছেঃ
وَإِنْ جَنَحُوا لِلسِّلْمِ فَاجْنَحْ لَهَا (الانفال: ٦١)
শত্রুও যদি শান্তি ও সন্ধি-সমৃদ্ধির জন্য আগ্রহী হয়, তাহলে তুমিও তার জন্য আগ্রহী হও।
কুরআনের চিরন্তন আহবান হচ্ছে শান্তি রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। এমন কি, পারিবারিক ক্ষুদ্র সংকীর্ণ পরিবেশেও শান্তি-সমৃদ্ধির ব্যবস্থা ইসলামই উপস্থাপিত করেছে। কেননা তাই হচ্ছে বৃহত্তর পরিবেশের প্রাথমিক স্তর। বলা হয়েছেঃ
وَالصُّلْحُ خَيْرٌ (النساء: ۱۲۸)
সন্ধি-সমৃদ্ধি-ই সর্বোত্তম ও সর্বাধিক কল্যাণের বাহক।
ইসলাম সব মু'মিন পুরুষ-নারীর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কের কথা ঘোষণা করেছে। তাদের মধ্যে কোনরূপ বিরোধ বা বিবাদ দেখা দিলে তা দূর করে অবিলম্বে সন্ধি কায়েম করে সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। বলা হয়েছেঃ
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ أَخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ (الحجرات: ١٠
মু'মিনরা সব পরস্পর ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের এই ভাইদের মধ্যে সর্বদা সন্ধি-সমৃদ্ধি স্থাপন করতে থাক।
আর মুসলমানদের দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ ও যুদ্ধ যদি শুরু হয়ে যায়, তাহলে গোটা মুসলিম সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে—তাদের মধ্যে অনতিবিলম্বে মীমাংসা করে দেয়া এবং প্রয়োজন হলে সীমালংঘনকারী পক্ষের বিরুদ্ধে সম্মিলিত হয়ে যুদ্ধ করা, তাকে মীমাংসা মেনে নিতে বাধ্য করা। বলা হয়েছেঃ
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَهُمَا عَلَى الأخرى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ - فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ (الحجرات : ٩)
মু'মিনদের দুটি পক্ষ যদি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে হে মুসলিমগণ! তোমরা সেই পক্ষদ্বয়ের মাঝে সন্ধি করে দাও। পরে যদি এক পক্ষ অপর পক্ষের উপর সীমালংঘন ও আগ্রাসন করে বসে, তাহলে তোমরা সকলে সম্মিলিতভাবে সেই পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যতক্ষণ না সেই পক্ষ আল্লাহ্ ফয়সালা—মীমাংসার দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে তাহলে তখন উভয় পক্ষের মাঝে ন্যায়পরতা সহকারে মীমাংসা ও সন্ধি করে দাও। আর তোমরা সকল ক্ষেত্রে সুবিচার ও ন্যায়পরতাকে প্রতিষ্ঠিত করবে। কেননা আল্লাহ্ ন্যায়পরতা ও সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন।
ইসলামের এসব আদেশ ও বিধানের চরম লক্ষ্যই হচ্ছে শান্তি রক্ষা, শান্তি প্রতিষ্ঠিত করা, যেন মানুষ পরম শান্তি নিরাপত্তা সহকারে জীবন-যাপন করতে পারে। ইসলামের এই লক্ষ্য যেমন মুসলিম জনগণের মধ্যে, তেমনি সমগ্র মানব সমাজের মধ্যেও নিবন্ধ। তাই আল্লাহ্ বলেছেনঃ
عَسَى اللَّهُ أَنْ يَجْعَلَ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ الَّذِينَ عَادَيْتُمْ مِنْهُم مَّوَدَّةً . وَاللَّهُ قَدِيرٌ - وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (الممتحنة : ٧)
অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ্ তোমাদের ও যাদের সাথে আজ তোমরা শত্রুতার সৃষ্টি করে ফেলেছ তাদের মধ্যে ভালোবাসার সঞ্চার করে দেবে। আল্লাহ্ তো বড়ই শক্তিমান, তিনি অতীব ক্ষমাশীল, দয়াবান।
বস্তুতই ইসলাম মানব জীবনের সকল দিকে ও ক্ষেত্রেই শান্তি স্থাপনের পক্ষে সচেষ্ট।
নবী করীম (স) আল্লাহর এই বিধানকে বাস্তবে অনুসরণ করেছেন এবং সমস্ত কাজ আল্লাহ্ দেখিয়ে দেয়া পন্থা ও পদ্ধতিতে আঞ্জাম দিয়েছেন।
মক্কা বিজয়কালে তিনি যে পরম মানবতাবাদী অবদান রেখেছেন, তা চিরকালের ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। তিনি সেদিন হযরত সায়াদ ইবনে উবাদা (রা)-র হাতে পতাকা দিয়েছিলেন। তিনি সেই পতাকা নিয়ে যখন অগ্রসর হলেন, আবু সুফিয়ানকে দেখতে পেলেন। তিনি তাকে সম্বোধন করে বললেনঃ
يَا أَبَا سُفْيَانَ الْيَوْمَ يَوْمُ الْمَلْحَمَةِ الْيَوْمَ تَسْتَحِلُّ الْحُرْمَةُ الْيَوْمَ أَذَلَّ اللهُ قُرَيْشًا .
হে আবু সুফিয়ান! আজকের দিন লড়াই জবাইর দিন, আজকের দিন সমস্ত হারাম হালাল হওয়ার দিন, আজ আল্লাহ্ কুরাইশদেরকে লাঞ্ছিত করেছেন।
একথা শুনতে পেয়েই নবী করীম (স) বলে উঠলেনঃ
اليوم يوم المرحمة اليوم أعز الله قريشا .
না, আজকের দিন ক্ষমা ও দয়ার দিন। আজ-ই আল্লাহ্ কুরাইশদের সম্মানিত করেছেন।
এ তো অনেক পরবর্তী সময়ের কথা। তার পূর্বে হুদায়বিয়ার সন্ধি মক্কার কুরাইশদের সাথে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। হুদায়বিয়ার এই সন্ধির ইতিহাস ও দলীল-দস্তাবেজ ইসলামের শান্তি প্রয়াসের উজ্জ্বল অকাট্য দলীল। তাতে কুরাইশদের দাবি অনুযায়ী রাসূলে করীম (স)-এর নামের পর 'রাসূলুল্লাহ' লেখাও বাদ দিয়েছিলেন।
টিকাঃ
১. المغازي للواقدي ج ۲ ص ۵۰۸۲۲۸۳۱
২. سيرة ابن هشام ج: ٤ ص: ۳۱۸ ، الكامل للججزری ج ۲ ص ۱۲۸ २० اعلام الورى للطبرسي ص: ۹۷
📄 যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে ইসলামের নীতি
প্রাচীন কালের ন্যায় আধুনিক কালের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারটি অত্যন্ত নাজুক ও মর্মস্পর্শী। আন্তর্জাতিক ও বৈদেশিক রাজনীতির দিক দিয়ে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধবন্দীদের কতকগুলি বিশেষ অধিকার প্রখ্যাত 'জেনেভা কনভেশনে' স্বীকৃত হয়েছে এই সেদিন। কিন্তু ইসলাম তাদের জন্য বিশেষ মর্যাদার কথা ঘোষণা করেছে চৌদ্দশ বছর পূর্বে। আর সেই মর্যাদা রক্ষার জন্য জরুরী আইন-বিধানও উপস্থাপিত করেছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে যুদ্ধবন্দী দুই প্রকারেরঃ যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ড চলাকালে যারা আত্মসমর্পণ করেনি; কিন্তু তারা বিজয়ী বাহিনীর হাতে বন্দী হয়েছে, এদের ব্যাপারে সরকারের এখতিয়ার রয়েছে, তাদের হত্যা করতে পারে। বিপরীত দিক দিয়ে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা যেতে পারে, যেন ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়। এরা এক ধরনের যুদ্ধবন্দী।
অপর ধরনের যুদ্ধবন্দী তারা, যারা যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিজয়ী বাহিনীর হাতে বন্দী হবে। এদেরকে হত্যা করা যাবে না। এ ধরনের বন্দীদের সম্পর্কে ইসলামের বিধান হলো। সরকার হয় নিছক অনুগ্রহের বশবর্তী হয়ে মুক্ত করে দেবে, না হয় বিনিময় গ্রহণ করে ছেড়ে দেবে। এর কোনটি সম্ভব না হলে তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখা হবে। এই সময় তারা ইসলাম কবুল করলেও তাদের এই দাস-অবস্থা পরিবর্তিত হবে না। ফিকহবিদদের অধিকাংশই এই মত পোষণ করেন। এ পর্যায়ে কুরআন মজীদের ঘোষণা হচ্ছেঃ
مَا كَانَ لِنَبِيّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا . واللهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللهُ عَزِيزٌ حَكِيمُ (الانفال : ٦٧)
কোন নবীর নিকট বন্দী পড়ে থাকা শোভন নয়- যতক্ষণ না সে যমীনে শত্রুবাহিনীকে নিঃশেষ ও খুব বেশী করে রক্তপাত করবে। তোমরা দুনিয়ার স্বার্থ চাও, অথচ আল্লাহর লক্ষ্য হচ্ছে পরকাল। আর আল্লাহ্ সর্বজয়ী সুবিজ্ঞানী।
আয়াতের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, পৃথিবীতে ইসলামের দুশমনদের রক্তপাত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো এবং পৃথিবীতে ইসলামের কর্তৃত্ব, সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করাই নবীর দায়িত্ব, যেন মুশরিক ও কাফিরদের ঔদ্ধতের মস্তক চূর্ণ হয়, ধুলায় লুণ্ঠিত হয় এবং দুর্বল ও শক্তিহীন হয়ে যায়। বন্দীদের প্রথম প্রকারের সাথে এ কথার মিল রয়েছে এবং অপর আয়াতে বলা হয়েছেঃ
فَإِمَّا تَثْقَفَنَّهُمْ فِي الْحَرْب فَشَرِدُ بِهِمْ مِّنْ خَلْفِهِمْ لَعَلَّهُمْ يَذْكُرُونَ (الانفال: ٥৭)
অতএব এই লোকদেরকে যদি তোমরা যুদ্ধের ময়দানে ধরে ফেলতে পার, তাহলে তাদের এমনভাবে বিধ্বস্ত করবে যে, অপর যেসব লোক তাদের মত আচরণ করবে, তারা যেন এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
মুসলমানদের সাথে চুক্তিভঙ্গকারীদের সম্পর্কে এ আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। এতে নবী করীম (স)-এর প্রতি তাকীদ করা হয়েছে যে, ইসলামী বাহিনী যখন ময়দানে কাফির-মুশরিকদের সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাতে জয় লাভ করবে, তাদেরকে ধরে ফেলতে পারবে, তখন তাদের উপর ওয়াদা ভঙ্গের চূড়ান্ত ধরনের প্রতিশোধ নিতে হবে, তাদের ক্ষেত্রে নির্মম শাস্তি কার্যকর করতে হবে। তাদের উপর এমন প্রভাব ফেলতে হবে, যেন তা দেখে অন্যান্য লোকেরা শিক্ষা গ্রহণ করে, রীতিমত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, ভয়ে থর-থর করে কাঁপে এবং চুক্তিভঙ্গ করার দুঃসাহস যেন কেউ না করতে পারে। তারা যেন নিরুপায় ও অক্ষম হয়ে মুসলমানদের সাথে সংঘর্ষে আসার ইচ্ছা চিরতরে ত্যাগ করে ও স্থান ত্যাগ করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। উদ্ধৃত আয়াতটি এই প্রথম প্রকারের বন্দীদের সম্পর্কে কথা বলছে। যেহেতু যুদ্ধ চলাকালে-যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই তাদেরকে পাকড়াও করা হয়েছে, তাই তাদেরকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করতে হবে।
আল্লাহ্ কথাঃ فشرد بهم من خلفهم তাদের এমন কঠিন শাস্তি দেবে যে, পিছনের লোকেরা ভয় পেয়ে পিছু হটতে ও সম্মুখ-সমর থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
সেই সাথে আল্লাহর এই কথাটিও পঠনীয়ঃ
فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرَبَ الرِّقَابِ - حَتَّى إِذَا أَنْخَنَتُمُوهُمْ فَشَدُّوا الْوَثَاقَ . فَإِمَّا مَنَا بَعْدُ وَإِمَّا فَدَاءً حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا (محمد : 4 )
অতএব এই কাফিরদের সাথে যখন তোমাদের সম্মুখ-সংঘর্ষ সংঘটিত হবে, তখন প্রথম কাজ-ই হলো গর্দানসমূহ কর্তন করা। এমনকি তোমরা যখন তাদেরকে খুব ভালোভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলে, তখন বন্দীদেরকে শক্ত করে বেঁধে ফেল। অতঃপর (তোমাদের ইখতিয়ার রয়েছে যে,) অনুগ্রহ প্রদর্শন করবে অথবা রক্তমূল্য গ্রহণের চুক্তি করবে-যতক্ষণ না যুদ্ধাস্ত্র সংবরণ করে।
মনে হয়, 'যুদ্ধ যতক্ষণ না অস্ত্র সংবরণ করে' কথাটি 'গর্দান মারা- কর্তন করা' কাজের শেষ মুহূর্ত অর্থাৎ হত্যা ও শাস্তিদানের কাজটি করতে হবে যুদ্ধ বন্ধ করার লক্ষ্যে। অতএব যুদ্ধক্ষেত্রে আটককৃত লোকদের হত্যা করার জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট সময় হচ্ছে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত। অতঃপর এ কাজ আর চলতে পারে না।
আর যাদেরকে যুদ্ধ শেষ হওয়া ও অস্ত্র সংবরণের পর বন্দী করা হবে, তাদের সম্পর্কে কুরআনের ফস্সালা হচ্ছেঃ حَتَّى إِذَا انْخَنَتُمُوهَا فَشُدُّوا الْوَثَاقَ إِمَّا مَنَّا وَامَّا فَدَا এমনকি তোমরা যখন তাদেরকে খুব ভালোভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলে, তখন বন্দীদেরকে শক্ত করে বেঁধে ফেল। অতঃপর অনুগ্রহ প্রদর্শন করবে অথবা রক্ত বিনিময়ে ছেড়ে দেবে।
এ আয়াত ইসলামী সরকারকে ইখতিয়ার দিচ্ছে, বিনামূল্যে-বিনা বিনিময়ে ছেড়ে দেবে, না হয় বন্দী বিনিময় করবে কিংবা নগদ মূল্য গ্রহণ করে ছেড়ে দেবে।
তবে উক্ত পন্থা দু'টির কোন একটি করাও সম্ভব না হলে তখন তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখবে। এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (স)-এর হাদীসে বিস্তারিত বিধান দেয়া হয়েছে।
এখানে দু'টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছেঃ
প্রথম-যুদ্ধ চলাকালে ধৃত বন্দীদের হত্যা করা একটা বিশেষ অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট। বিশেষ সময় বা কালের সাথে নয়। বরং এ সিদ্ধান্ত চিরকালের কিয়ামত পর্যন্ত কার্যকর এবং শাশ্বত, যদিও তা একটা বিশেষ অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ অবস্থার প্রেক্ষিতে এই বিধান দেয়া হয়েছে, সেই রূপ অবস্থা যখন এবং যেখানেই দেখা দেবে তখন এই নির্দেশ পালনীয় হবে। অনুরূপ অবস্থা.. বন্দীদের বাঁচিয়ে রাখা উচিত হবে না। ইসলামী ইতিহাসের প্রথম দিকে এরূপ অবস্থা বারবার দেখা দিয়েছে এবং তখন তা-ই করা হয়েছে, যার নির্দেশ উক্ত আয়াতে দেয়া হয়েছে। সেকালে এই বন্দীদের বাঁচিয়ে রেখে তাদের সংরক্ষণ করা নানা কারণেই অসম্ভব ছিল, এ কথা যেমন সত্য, তেমনি এ কথায়ও কোন সন্দেহ নেই যে, এই সব যুদ্ধরত অবস্থায় ধৃত শত্রুসৈন্যকে বাঁচিয়ে রাখা ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে কঠিন বিপদ ও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দেখা দিতে পারত।
এই প্রেক্ষিতেই কুরআনের এ সিদ্ধান্ত বিবেচ্য ও বিচার্য। তবে বর্তমান কালের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মুসলিমগণ যখন শক্তিশালী ও উক্ত রূপ অবস্থায় ধৃত শত্রুসৈন্যকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হওয়া ও তাদের সংরক্ষণ খুব একটি দুঃসাধ্য না হওয়ার প্রেক্ষিতে-বিশেষ করে তাদের হত্যা করায় মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি ও শত্রুপক্ষের দুর্বল হয়ে পড়ার তেমন কোন সম্ভাবনা নেই-তখনও কি এই সিদ্ধান্তই কার্যকর করা হবে?
হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত কুরআনী ফিকহবিদ আল্লামা আল-জাসসাস এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করে লিখেছেনঃ
কুরআনের উপরোক্ত বিধান দেয়া হয়েছিল যখন মুসলিমদের সংখ্যা ছিল খুবই কম, আর মুশরিক-কাফির শত্রুদের সংখ্যা ছিল বিপুল। এরূপ অবস্থায় মুশরিকদের রক্তপাত করা ও হত্যাকান্ডের দ্বারা তাদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত করার পর যারা থেকে যাবে তাদের বাঁচিয়ে রাখা জায়েয। তাই উক্ত হুকুমটি তখনকার জন্য কার্যকর, যখন সেই অবস্থা দেখা দেবে যে অবস্থা প্রাথমিক কালের মুসলমানদের ছিল।
আল্লামা রশীদ রিজা শত্রু নিধনযজ্ঞের দর্শন পর্যায়ে বলেছেনঃ
দুইটি শত্রু বাহিনী যখন পরস্পরের সম্মুখ-সমরে অবতীর্ণ হবে, তখন শত্রু হত্যা ও নিধন কাজে পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করা আমাদের কর্তব্য। তাদেরকে বন্দী করতে চেষ্টা না করাই উচিত। কেননা তাতে আমাদের দুর্বলতাই প্রমাণিত হবে। আর ওরা আমাদের উপর অগ্রবর্তিতাই পেয়ে যাবে। তাই যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা যখন শত্রুদের হত্যা কার্য সম্পন্ন করে ফেলব-ও ওদের হত্যা ও জখম করব, তখন ওদের উপর আমাদের অগ্রবর্তিতা প্রতিষ্টিত হবে। সেই শেষ মুহূর্তে যাদের ধরা হবে তাদেরকেই বন্দী বানানো হবে।
দ্বিতীয়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ধৃত শত্রুসৈন্যদের ব্যাপারে তিনটির যে কোন একটি পন্থা গ্রহণ করার রাষ্ট্র-সরকারের ইখতিয়ার রয়েছে-তন্মধ্যে তাদেরকে দাস বানাবার-ও ইখতিয়ার, এই পর্যায়ে খানিকটা বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
দাস বানানোর মূলে প্রধান কারণ এই যে, কোনরূপ বিনিময় ব্যতীতই কিংবা বিনিময়ের ভিত্তিতে তাদেরকে ছেড়ে দিলে পুনর্বার তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানো-ব্যাপকভাবে আক্রমণ করে বসা কিছুমাত্র অসম্ভব নয়। এই আশংকা একটা যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি রচনা করে। এছাড়া বর্তমান দুনিয়ার রেওয়াজ অনুরূপ কাঁটা তারের বেড়া রচনা করে তার মধ্যে আটকে রাখাও সব সময় সহজ বা সম্ভব হয় না। তখন বন্দীদেরকে দাস বানিয়ে নাগরিকদের মালিকানায় সঁপে দিয়ে 'হজম' (absorb) করে ফেলা ছাড়া অন্য কোন উপায়ই থাকে না।
উপরন্তু যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই বন্দীদেরকে হত্যা করার কোন সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে না। এরূপ অবস্থায় দাস বানিয়ে মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়ার যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না।
বরং এই পন্থা গ্রহণে একটি বিরাট মানবিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তা এভাবে যে, এই বন্দীদেরকে যখন বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে মুসলমানদের মালিকত্বে-অভিভাবকত্বে-ছড়িয়ে দেয়া হবে, তখন তারা মুসলমানদের নিকট-সংস্পর্শে সাহচর্যে আসবার, তাদের মানবিক সহানুভূতি ও দায়িত্ব সচেতনতা সঞ্জত লালন-পালন পেয়ে তারা মুক্ত-স্বাধীন জীবন যাপনেরই স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে। তখন তারা ক্রমান্বয়ে মুসলমানদের ইসলামী চরিত্র অনুধাবন ও গ্রহণ করার বিরাট সুযোগ পেয়ে যাবে।
এরূপ অবস্থায় বন্দীদের ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা ইসলামী রাষ্ট্র সরকারকে তিনটির যে-কোন একটি পন্থা গ্রহণের ইখতিয়ার দিয়েছেন, যেন বাস্তব অবস্থা প্রেক্ষিতে উত্তম বিবেচিত পন্থা গ্রহণ সম্ভবপর হয়-এ যেমন মহান আল্লাহর একটি অতি বড় মেহেরবানী, তেমনি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত-তাতে কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না。
টিকাঃ
১. احكام القرآن ج:۲ ص:۳۹۱، ايضاح ص: ۷۲
২. তাফসীরুল মানার জ: ১০, পৃ: ৯৭-৯৮
প্রাচীন কালের ন্যায় আধুনিক কালের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারটি অত্যন্ত নাজুক ও মর্মস্পর্শী। আন্তর্জাতিক ও বৈদেশিক রাজনীতির দিক দিয়ে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধবন্দীদের কতকগুলি বিশেষ অধিকার প্রখ্যাত 'জেনেভা কনভেশনে' স্বীকৃত হয়েছে এই সেদিন। কিন্তু ইসলাম তাদের জন্য বিশেষ মর্যাদার কথা ঘোষণা করেছে চৌদ্দশ বছর পূর্বে। আর সেই মর্যাদা রক্ষার জন্য জরুরী আইন-বিধানও উপস্থাপিত করেছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে যুদ্ধবন্দী দুই প্রকারেরঃ যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ড চলাকালে যারা আত্মসমর্পণ করেনি; কিন্তু তারা বিজয়ী বাহিনীর হাতে বন্দী হয়েছে, এদের ব্যাপারে সরকারের এখতিয়ার রয়েছে, তাদের হত্যা করতে পারে। বিপরীত দিক দিয়ে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা যেতে পারে, যেন ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়। এরা এক ধরনের যুদ্ধবন্দী।
অপর ধরনের যুদ্ধবন্দী তারা, যারা যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিজয়ী বাহিনীর হাতে বন্দী হবে। এদেরকে হত্যা করা যাবে না। এ ধরনের বন্দীদের সম্পর্কে ইসলামের বিধান হলো। সরকার হয় নিছক অনুগ্রহের বশবর্তী হয়ে মুক্ত করে দেবে, না হয় বিনিময় গ্রহণ করে ছেড়ে দেবে। এর কোনটি সম্ভব না হলে তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখা হবে। এই সময় তারা ইসলাম কবুল করলেও তাদের এই দাস-অবস্থা পরিবর্তিত হবে না। ফিকহবিদদের অধিকাংশই এই মত পোষণ করেন। এ পর্যায়ে কুরআন মজীদের ঘোষণা হচ্ছেঃ
مَا كَانَ لِنَبِيّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا . واللهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللهُ عَزِيزٌ حَكِيمُ (الانفال : ٦٧)
কোন নবীর নিকট বন্দী পড়ে থাকা শোভন নয়- যতক্ষণ না সে যমীনে শত্রুবাহিনীকে নিঃশেষ ও খুব বেশী করে রক্তপাত করবে। তোমরা দুনিয়ার স্বার্থ চাও, অথচ আল্লাহর লক্ষ্য হচ্ছে পরকাল। আর আল্লাহ্ সর্বজয়ী সুবিজ্ঞানী।
আয়াতের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, পৃথিবীতে ইসলামের দুশমনদের রক্তপাত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো এবং পৃথিবীতে ইসলামের কর্তৃত্ব, সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করাই নবীর দায়িত্ব, যেন মুশরিক ও কাফিরদের ঔদ্ধতের মস্তক চূর্ণ হয়, ধুলায় লুণ্ঠিত হয় এবং দুর্বল ও শক্তিহীন হয়ে যায়। বন্দীদের প্রথম প্রকারের সাথে এ কথার মিল রয়েছে এবং অপর আয়াতে বলা হয়েছেঃ
فَإِمَّا تَثْقَفَنَّهُمْ فِي الْحَرْب فَشَرِدُ بِهِمْ مِّنْ خَلْفِهِمْ لَعَلَّهُمْ يَذْكُرُونَ (الانفال: ٥৭)
অতএব এই লোকদেরকে যদি তোমরা যুদ্ধের ময়দানে ধরে ফেলতে পার, তাহলে তাদের এমনভাবে বিধ্বস্ত করবে যে, অপর যেসব লোক তাদের মত আচরণ করবে, তারা যেন এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
মুসলমানদের সাথে চুক্তিভঙ্গকারীদের সম্পর্কে এ আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। এতে নবী করীম (স)-এর প্রতি তাকীদ করা হয়েছে যে, ইসলামী বাহিনী যখন ময়দানে কাফির-মুশরিকদের সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাতে জয় লাভ করবে, তাদেরকে ধরে ফেলতে পারবে, তখন তাদের উপর ওয়াদা ভঙ্গের চূড়ান্ত ধরনের প্রতিশোধ নিতে হবে, তাদের ক্ষেত্রে নির্মম শাস্তি কার্যকর করতে হবে। তাদের উপর এমন প্রভাব ফেলতে হবে, যেন তা দেখে অন্যান্য লোকেরা শিক্ষা গ্রহণ করে, রীতিমত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, ভয়ে থর-থর করে কাঁপে এবং চুক্তিভঙ্গ করার দুঃসাহস যেন কেউ না করতে পারে। তারা যেন নিরুপায় ও অক্ষম হয়ে মুসলমানদের সাথে সংঘর্ষে আসার ইচ্ছা চিরতরে ত্যাগ করে ও স্থান ত্যাগ করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। উদ্ধৃত আয়াতটি এই প্রথম প্রকারের বন্দীদের সম্পর্কে কথা বলছে। যেহেতু যুদ্ধ চলাকালে-যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই তাদেরকে পাকড়াও করা হয়েছে, তাই তাদেরকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করতে হবে।
আল্লাহ্ কথাঃ فشرد بهم من خلفهم তাদের এমন কঠিন শাস্তি দেবে যে, পিছনের লোকেরা ভয় পেয়ে পিছু হটতে ও সম্মুখ-সমর থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
সেই সাথে আল্লাহর এই কথাটিও পঠনীয়ঃ
فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرَبَ الرِّقَابِ - حَتَّى إِذَا أَنْخَنَتُمُوهُمْ فَشَدُّوا الْوَثَاقَ . فَإِمَّا مَنَا بَعْدُ وَإِمَّا فَدَاءً حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا (محمد : 4 )
অতএব এই কাফিরদের সাথে যখন তোমাদের সম্মুখ-সংঘর্ষ সংঘটিত হবে, তখন প্রথম কাজ-ই হলো গর্দানসমূহ কর্তন করা। এমনকি তোমরা যখন তাদেরকে খুব ভালোভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলে, তখন বন্দীদেরকে শক্ত করে বেঁধে ফেল। অতঃপর (তোমাদের ইখতিয়ার রয়েছে যে,) অনুগ্রহ প্রদর্শন করবে অথবা রক্তমূল্য গ্রহণের চুক্তি করবে-যতক্ষণ না যুদ্ধাস্ত্র সংবরণ করে।
মনে হয়, 'যুদ্ধ যতক্ষণ না অস্ত্র সংবরণ করে' কথাটি 'গর্দান মারা- কর্তন করা' কাজের শেষ মুহূর্ত অর্থাৎ হত্যা ও শাস্তিদানের কাজটি করতে হবে যুদ্ধ বন্ধ করার লক্ষ্যে। অতএব যুদ্ধক্ষেত্রে আটককৃত লোকদের হত্যা করার জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট সময় হচ্ছে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত। অতঃপর এ কাজ আর চলতে পারে না।
আর যাদেরকে যুদ্ধ শেষ হওয়া ও অস্ত্র সংবরণের পর বন্দী করা হবে, তাদের সম্পর্কে কুরআনের ফস্সালা হচ্ছেঃ حَتَّى إِذَا انْخَنَتُمُوهَا فَشُدُّوا الْوَثَاقَ إِمَّا مَنَّا وَامَّا فَدَا এমনকি তোমরা যখন তাদেরকে খুব ভালোভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলে, তখন বন্দীদেরকে শক্ত করে বেঁধে ফেল। অতঃপর অনুগ্রহ প্রদর্শন করবে অথবা রক্ত বিনিময়ে ছেড়ে দেবে।
এ আয়াত ইসলামী সরকারকে ইখতিয়ার দিচ্ছে, বিনামূল্যে-বিনা বিনিময়ে ছেড়ে দেবে, না হয় বন্দী বিনিময় করবে কিংবা নগদ মূল্য গ্রহণ করে ছেড়ে দেবে।
তবে উক্ত পন্থা দু'টির কোন একটি করাও সম্ভব না হলে তখন তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখবে। এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (স)-এর হাদীসে বিস্তারিত বিধান দেয়া হয়েছে।
এখানে দু'টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছেঃ
প্রথম-যুদ্ধ চলাকালে ধৃত বন্দীদের হত্যা করা একটা বিশেষ অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট। বিশেষ সময় বা কালের সাথে নয়। বরং এ সিদ্ধান্ত চিরকালের কিয়ামত পর্যন্ত কার্যকর এবং শাশ্বত, যদিও তা একটা বিশেষ অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ অবস্থার প্রেক্ষিতে এই বিধান দেয়া হয়েছে, সেই রূপ অবস্থা যখন এবং যেখানেই দেখা দেবে তখন এই নির্দেশ পালনীয় হবে। অনুরূপ অবস্থা.. বন্দীদের বাঁচিয়ে রাখা উচিত হবে না। ইসলামী ইতিহাসের প্রথম দিকে এরূপ অবস্থা বারবার দেখা দিয়েছে এবং তখন তা-ই করা হয়েছে, যার নির্দেশ উক্ত আয়াতে দেয়া হয়েছে। সেকালে এই বন্দীদের বাঁচিয়ে রেখে তাদের সংরক্ষণ করা নানা কারণেই অসম্ভব ছিল, এ কথা যেমন সত্য, তেমনি এ কথায়ও কোন সন্দেহ নেই যে, এই সব যুদ্ধরত অবস্থায় ধৃত শত্রুসৈন্যকে বাঁচিয়ে রাখা ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে কঠিন বিপদ ও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দেখা দিতে পারত।
এই প্রেক্ষিতেই কুরআনের এ সিদ্ধান্ত বিবেচ্য ও বিচার্য। তবে বর্তমান কালের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মুসলিমগণ যখন শক্তিশালী ও উক্ত রূপ অবস্থায় ধৃত শত্রুসৈন্যকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হওয়া ও তাদের সংরক্ষণ খুব একটি দুঃসাধ্য না হওয়ার প্রেক্ষিতে-বিশেষ করে তাদের হত্যা করায় মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি ও শত্রুপক্ষের দুর্বল হয়ে পড়ার তেমন কোন সম্ভাবনা নেই-তখনও কি এই সিদ্ধান্তই কার্যকর করা হবে?
হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত কুরআনী ফিকহবিদ আল্লামা আল-জাসসাস এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করে লিখেছেনঃ
কুরআনের উপরোক্ত বিধান দেয়া হয়েছিল যখন মুসলিমদের সংখ্যা ছিল খুবই কম, আর মুশরিক-কাফির শত্রুদের সংখ্যা ছিল বিপুল। এরূপ অবস্থায় মুশরিকদের রক্তপাত করা ও হত্যাকান্ডের দ্বারা তাদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত করার পর যারা থেকে যাবে তাদের বাঁচিয়ে রাখা জায়েয। তাই উক্ত হুকুমটি তখনকার জন্য কার্যকর, যখন সেই অবস্থা দেখা দেবে যে অবস্থা প্রাথমিক কালের মুসলমানদের ছিল।
আল্লামা রশীদ রিজা শত্রু নিধনযজ্ঞের দর্শন পর্যায়ে বলেছেনঃ
দুইটি শত্রু বাহিনী যখন পরস্পরের সম্মুখ-সমরে অবতীর্ণ হবে, তখন শত্রু হত্যা ও নিধন কাজে পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করা আমাদের কর্তব্য। তাদেরকে বন্দী করতে চেষ্টা না করাই উচিত। কেননা তাতে আমাদের দুর্বলতাই প্রমাণিত হবে। আর ওরা আমাদের উপর অগ্রবর্তিতাই পেয়ে যাবে। তাই যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা যখন শত্রুদের হত্যা কার্য সম্পন্ন করে ফেলব-ও ওদের হত্যা ও জখম করব, তখন ওদের উপর আমাদের অগ্রবর্তিতা প্রতিষ্টিত হবে। সেই শেষ মুহূর্তে যাদের ধরা হবে তাদেরকেই বন্দী বানানো হবে।
দ্বিতীয়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ধৃত শত্রুসৈন্যদের ব্যাপারে তিনটির যে কোন একটি পন্থা গ্রহণ করার রাষ্ট্র-সরকারের ইখতিয়ার রয়েছে-তন্মধ্যে তাদেরকে দাস বানাবার-ও ইখতিয়ার, এই পর্যায়ে খানিকটা বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
দাস বানানোর মূলে প্রধান কারণ এই যে, কোনরূপ বিনিময় ব্যতীতই কিংবা বিনিময়ের ভিত্তিতে তাদেরকে ছেড়ে দিলে পুনর্বার তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানো-ব্যাপকভাবে আক্রমণ করে বসা কিছুমাত্র অসম্ভব নয়। এই আশংকা একটা যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি রচনা করে। এছাড়া বর্তমান দুনিয়ার রেওয়াজ অনুরূপ কাঁটা তারের বেড়া রচনা করে তার মধ্যে আটকে রাখাও সব সময় সহজ বা সম্ভব হয় না। তখন বন্দীদেরকে দাস বানিয়ে নাগরিকদের মালিকানায় সঁপে দিয়ে 'হজম' (absorb) করে ফেলা ছাড়া অন্য কোন উপায়ই থাকে না।
উপরন্তু যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই বন্দীদেরকে হত্যা করার কোন সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে না। এরূপ অবস্থায় দাস বানিয়ে মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়ার যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না।
বরং এই পন্থা গ্রহণে একটি বিরাট মানবিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তা এভাবে যে, এই বন্দীদেরকে যখন বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে মুসলমানদের মালিকত্বে-অভিভাবকত্বে-ছড়িয়ে দেয়া হবে, তখন তারা মুসলমানদের নিকট-সংস্পর্শে সাহচর্যে আসবার, তাদের মানবিক সহানুভূতি ও দায়িত্ব সচেতনতা সঞ্জত লালন-পালন পেয়ে তারা মুক্ত-স্বাধীন জীবন যাপনেরই স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে। তখন তারা ক্রমান্বয়ে মুসলমানদের ইসলামী চরিত্র অনুধাবন ও গ্রহণ করার বিরাট সুযোগ পেয়ে যাবে।
এরূপ অবস্থায় বন্দীদের ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা ইসলামী রাষ্ট্র সরকারকে তিনটির যে-কোন একটি পন্থা গ্রহণের ইখতিয়ার দিয়েছেন, যেন বাস্তব অবস্থা প্রেক্ষিতে উত্তম বিবেচিত পন্থা গ্রহণ সম্ভবপর হয়-এ যেমন মহান আল্লাহর একটি অতি বড় মেহেরবানী, তেমনি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত-তাতে কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না。
টিকাঃ
১. احكام القرآن ج:۲ ص:۳۹۱، ايضاح ص: ۷۲
২. তাফসীরুল মানার জ: ১০, পৃ: ৯৭-৯৮