📄 আইনের দৃষ্টিতে সাম্য
ইসলামী রাষ্ট্রে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, বংশ বা পেশার কারণে আইনের প্রয়োগে কারো প্রতি কোনরূপ বৈষম্য করা হয় না। রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সাধারণ প্রজা পর্যন্ত সবাই একই আইনের অধীন। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
ইসলামে সাম্যের ধারণা নিছক তাত্ত্বিক বুলি নয়, বরং এটি একটি রূঢ় বাস্তবতা। রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ
النَّاسُ سَوَاسِيَةٌ كَأَسْنَانِ الْمُشْطِ
মানুষ চিরুনীর দাঁতের মতই সমান। ১
চুরির অপরাধে মখযুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত মহিলা ফাতেমার হাত কাটার হুকুম হলে সাহাবীদের কেউ কেউ তার সাজা মওকুফ বা হ্রাসের সুপারিশ করতে চেয়েছিলেন। এতে মহানবী (স) অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে বলেছিলেনঃ
'তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহ এজন্যই ধ্বংস হয়ে গেছে যে, তাদের সাধারণ ও দুর্বল লোকেরা চুরি করলে তাদের হাত কাটা হতো, আর সম্ভ্রান্ত ও শক্তিশালীরা চুরি করলে তাদের ছেড়ে দেয়া হতো। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতেমাও চুরি করত, তবে আমি তারও হাত কেটে দিতাম।'
ইসলামের ইতিহাসে এর ভুরি ভুরি নজির রয়েছে। খলীফা হযরত উমর (রা) এবং হযরত আলী (রা)-কে সাধারণ নাগরিকদের সাথে একই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারকের প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে। আইনের এই সাম্যই ইসলামী সমাজের ভিত্তি।
টিকাঃ
১. কানযুল উম্মাল
📄 সাম্য ন্যায়বিচারের পরিণতি
সাম্য এবং ন্যায়বিচার (ইনসাফ) একে অপরের পরিপূরক। যেখানে ন্যায়বিচার নেই, সেখানে সাম্য থাকতে পারে না। আবার যেখানে সাম্য নেই, সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। ইসলামী রাষ্ট্রে সাম্য হচ্ছে ন্যায়বিচারেরই অনিবার্য পরিণতি।
যখন বিচারক ধনী-দরিদ্র, আত্মীয়-অনাত্মীয় এবং রাজা-প্রজার মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য না করে আল্লাহর আইন অনুযায়ী রায় প্রদান করেন, তখনই সমাজে প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পক্ষান্তরে বিচার ব্যবস্থায় যদি বৈষম্য থাকে, তবে সমাজে শ্রেণী-সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকদের (জিম্মি) অধিকারও মুসলিম নাগরিকদের সমান। তাদের জান-মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা বিধান করা ইসলামী রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। আইনের দৃষ্টিতে তারাও সমান অধিকার ভোগ করে। দিয়ত বা রক্তপণের ক্ষেত্রেও মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয় না।
📄 ন্যায়পরতা ও সুবিচারের সুফল
সমাজে ন্যায়বিচার ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হলে তার সুফল সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে যায়। এর ফলেঃ
১. সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা বিরাজ করে। সবল দুর্বলের উপর অত্যাচার করার সাহস পায় না।
২. জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থা বৃদ্ধি পায়। শাসক ও শাসিতের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
৩. আল্লাহ তা'আলার রহমত ও বরকত নাযিল হয়। কারণ আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।
৪. অপরাধ প্রবণতা হ্রাস পায়। কারণ অপরাধী জানে যে, অপরাধ করলে তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে, কোন সুপারিশ বা প্রভাব তাকে বাঁচাতে পারবে না।
৫. রাষ্ট্রের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। ইতিহাস সাক্ষী, যে রাষ্ট্র ন্যায়বিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত, তা দীর্ঘস্থায়ী হয়। আর যে রাষ্ট্রে অবিচার ও জুলুম চলে, তা দ্রুত ধ্বংস হয়ে যায়।
📄 সুবিচারের উপর ইসলামের গুরুত্বারোপ
ইসলাম ন্যায়বিচার বা 'আদল'-এর উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। কুরআন মজীদে বহু আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছেঃ
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ
নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও ইহসানের নির্দেশ দিচ্ছেন। (সূরা নহলঃ ৯০)
অন্যত্র বলা হয়েছেঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক এবং ন্যায়পরায়ণতার সাথে সাক্ষ্য দাও। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার কর, এটি তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। (সূরা মায়িদাঃ ৮)
এমনকি নিজের বা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে গেলেও ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছেঃ
كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ
তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাক আল্লাহর সাক্ষী হিসেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। (সূরা নিসাঃ ১৩৫)