📄 বিশ্বরাষ্ট্র গঠনে নতুন প্রস্তাব
আধুনিক বিশ্বের চিন্তাবিদ ও মনীষীগণ বর্তমান অরাজক অবস্থা থেকে মুক্তি লাভের জন্য একটি বিশ্বরাষ্ট্র (World Government) গঠনের প্রস্তাব পেশ করেছেন। বার্ট্রান্ড রাসেল, এইচ. জি. ওয়েলস, আইনস্টাইন প্রমুখ মনীষী এ বিষয়ে জোরালো মত ব্যক্ত করেছেন। তারা মনে করেন, পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করতে হলে জাতীয় রাষ্ট্রসমূহের সার্বভৌমত্ব খর্ব করে একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ব সরকার গঠন করা অপরিহার্য।
কিন্তু তাদের এই প্রস্তাব কেবল তাত্ত্বিক পর্যায়েই রয়ে গেছে। এর বাস্তব রূপায়নের কোন কার্যকর ফর্মুলা তারা দিতে পারেননি। কারণ, যে মন-মানসিকতা ও নৈতিক চরিত্র থাকলে মানুষ নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করে বিশ্বজনীন স্বার্থের কথা ভাবতে পারে, তা সৃষ্টি করার কোন ব্যবস্থা আধুনিক বস্তুবাদী সভ্যতায় নেই। ইসলাম এখানেই এক নতুন ও বাস্তবসম্মত প্রস্তাব পেশ করে। ইসলাম বলে, মানুষের সার্বভৌমত্ব বা জনগণের সার্বভৌমত্ব নয়, বরং আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতেই কেবল বিশ্বরাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব। যখন মানুষ এক আল্লাহকে একমাত্র আইনদাতা ও বিধানদাতা হিসেবে মেনে নেবে, তখনই তারা কৃত্রিম ভেদাভেদ ভুলে এক উম্মতে পরিণত হতে পারবে।
📄 বিশ্বরাষ্ট্রের জন্য বিশ্ব মানবিক আদর্শ
একটি বিশ্বরাষ্ট্র টিকে থাকার জন্য এমন একটি আদর্শের প্রয়োজন, যা সর্বজনীন এবং যা মানুষের বিবেকের কাছে গ্রহণযোগ্য। যে আদর্শ মানুষকে বর্ণ, গোত্র, ভাষা ও অঞ্চলের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় এবং সকলের জন্য সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করে।
পুঁজিবাদ বা কমিউনিজম এই আদর্শ হতে পারেনি। পুঁজিবাদ মানুষকে অর্থের দাস বানিয়েছে এবং মানুষে মানুষে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। আর কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র শ্রেণী সংগ্রামের কথা বলে মানুষকে হিংস্র করে তুলেছে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের যুপকাষ্ঠে ব্যক্তির স্বাধীনতাকে বলি দিয়েছে।
একমাত্র ইসলামই সেই বিশ্ব মানবিক আদর্শ পেশ করেছে, যা মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর দাসে পরিণত করে। ইসলামের দৃষ্টিতেঃ
১. সমস্ত মানুষ এক পিতা-মাতার সন্তান। তাই জন্মগতভাবে সকল মানুষ সমান।
২. আরবের ওপর অনারবের এবং অনারবের ওপর আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সাদার ওপর কালোর এবং কালোর ওপর সাদার কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই।
৩. শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি ও সৎকর্ম।
এই আদর্শই পারে বিশ্ববাসীকে এক পতাকাতলে সমবেত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধিশালী বিশ্বরাষ্ট্র উপহার দিতে।
📄 বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভূমিকা
ইতিহাস সাক্ষী, ইসলামই একমাত্র শক্তি যা বাস্তবে একটি বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়েছিল। রাসূলে করীম (স) এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা ছিল প্রকৃত অর্থেই একটি বিশ্বরাষ্ট্রের ক্ষুদ্র সংস্করণ বা মডেল। সেখানে বিভিন্ন বর্ণ, ভাষা ও অঞ্চলের মানুষ—বিলাল (হাবশী), সুহায়েব (রোমান), সালমান (ফারসী)—একই কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করেছেন এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
ইসলাম বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নিম্নোক্ত ভূমিকা পালন করেঃ
১. এটি ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের মূলে কুঠারাঘাত করে।
২. এটি বর্ণবৈষম্য ও জাতিভেদ প্রথা সম্পূর্ণরূপে উচ্ছেদ করে।
৩. এটি এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর আইনের শাসন প্রবর্তন করে, যার সামনে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র সবাই সমান।
৪. এটি মানুষের মনে পরকালীন জবাবদিহির অনুভূতি জাগ্রত করে, যা তাকে জুলুম ও অন্যায় থেকে বিরত রাখে।
ইসলামের এই ঐতিহাসিক ভূমিকা ও সম্ভাবনাই আজকের বিভক্ত ও সংঘাতময় বিশ্বে একমাত্র আশার আলো।
📄 ঈমানই হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ মানব সৃষ্টির নির্ভুল ভিত্তি
মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য রক্ত, বর্ণ, ভাষা বা ভৌগোলিক ঐক্যের ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল ও ঠুনকো। স্বার্থের সামান্য আঘাতেই এই ঐক্য ভেঙে খানখান হয়ে যায়। কিন্তু ঈমানের ভিত্তিতে যে ঐক্য গড়ে ওঠে, তা অত্যন্ত সুদৃঢ় ও স্থায়ী।
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যেও না।
এই 'আল্লাহর রজ্জু' হলো আল-কুরআন বা ইসলাম। যখন বিভিন্ন জাতি ও বর্ণের মানুষ এক আল্লাহ, এক রাসূল এবং এক কিতাবের প্রতি ঈমান আনে, তখন তাদের অন্তরের মিল হয়ে যায়। তাদের চিন্তা-চেতনা, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং জীবন-পদ্ধতি এক হয়ে যায়। একে অপরের প্রতি মায়া-মমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়।
আল্লাহ আরো বলেনঃ
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই।
অতএব, ঈমানই হচ্ছে সেই জাদুকরী শক্তি, যা শতধা বিভক্ত মানবজাতিকে এক ও অভিন্ন জাতিতে পরিণত করতে পারে। বিশ্বরাষ্ট্রের ভিত্তি হতে হবে এই ঈমান।