📄 অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বিচারকের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা
বিচারকের বা বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা ইসলামী বিচার ব্যবস্থার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। বিচারক যেন কোনরূপ ভয়-ভীতি বা প্রলোভনের বশবর্তী না হয়ে স্বাধীনভাবে ও নিরপেক্ষভাবে বিচার কার্য পরিচালনা করতে পারেন, সে জন্য ইসলাম বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতাঃ বিচারকের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করা ও তাকে অভাবমুক্ত রাখার জন্য বাইতুল মাল থেকে তার জন্য পর্যাপ্ত বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। হযরত উমর (রা) বিচারকদের জন্য মোটা অংকের বেতন নির্ধারণ করেছিলেন, যাতে তারা ঘুষ গ্রহণ বা দুর্নীতির আশ্রয় নিতে বাধ্য না হয় বা প্রলুব্ধ না হয়।
রাজনৈতিক স্বাধীনতাঃ বিচারক শাসন বিভাগের প্রভাবমুক্ত থাকবেন। রাষ্ট্রপ্রধান বা খলীফাও বিচারকের কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। এমনকি খলীফার বিরুদ্ধেও যদি কোন অভিযোগ থাকে, তবে তাকেও সাধারণ নাগরিকের মতই বিচারকের সামনে হাজির হতে হবে এবং বিচারকের রায় মেনে নিতে হবে। ইসলামের ইতিহাসে এর বহু নজির রয়েছে। হযরত আলী (রা) ও জনৈক ইহুদীর বর্ম চুরির মামলা এবং হযরত আলী (রা)-এর নিজের বিরুদ্ধে বিচারকের রায় মেনে নেয়ার ঘটনা এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
📄 সুবিচারের জন্য আবশ্যকীয নিয়ম-নীতির পূর্ণ সংরক্ষণ
বিচারকের কর্তব্য হচ্ছে বিবাদমান দুই পক্ষকে সমান দৃষ্টিতে দেখা এবং তাদের প্রতি সমান আচরণ করা। হযরত উমর (রা) হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা)-কে লিখিত এক পত্রে বিচারকের কর্তব্য সম্পর্কে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেনঃ
'তোমার মজলিসে, তোমার চেহারায় এবং তোমার বিচারে লোকদের মধ্যে সমতা রক্ষা করবে। যাতে সম্ভ্রান্ত ও শক্তিশালী লোক তোমার পক্ষপাতিত্বের আশা না করতে পারে এবং দুর্বল লোক তোমার ন্যায়বিচার থেকে নিরাশ না হয়।'
অর্থাৎ বিচারক আদালতে বসার সময়, বাদী-বিবাদীর দিকে তাকানোর সময় এবং তাদের সাথে কথা বলার সময়ও সমতা রক্ষা করবেন। কাউকে কাছে বসাবেন আর কাউকে দূরে, কারো দিকে হাসিমুখে তাকাবেন আর কারো দিকে ভ্রুকুটি করবেন—এমনটি করা বিচারকের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
📄 সাক্ষ্যদান
ইসলামী বিচার ব্যবস্থায় সাক্ষ্যদান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই বিচারক রায় প্রদান করেন। রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ
الْبَيِّنَةُ عَلَى الْمُدَّعِي وَالْيَمِينَ عَلَى مَنْ أَنْكَرَ
'প্রমাণ পেশ করা বাদীর দায়িত্ব আর (বাদী প্রমাণ পেশ করতে না পারলে) অস্বীকারকারীর দায়িত্ব হচ্ছে কসম খাওয়া।'
সাক্ষীর যোগ্যতাঃ সাক্ষীকে অবশ্যই ন্যায়পরায়ণ ও নির্ভরযোগ্য হতে হবে। মিথ্যাবাদী, ফাসিক বা সন্দেহভাজন ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। সাক্ষীর সংখ্যা ও যোগ্যতা সম্পর্কে কুরআনে বিস্তারিত নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَاسْتَشْهِدُوا شَهِيدَيْنِ مِن رِّجَالِكُمْ ۖ فَإِن لَّمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌ وَامْرَأَتَانِ مِمَّن تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَاءِ
'তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে দুইজন সাক্ষী রাখ। যদি দুইজন পুরুষ না পাওয়া যায়, তবে একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী রাখ, যাদের সাক্ষ্য সম্পর্কে তোমরা সন্তুষ্ট হতে পার।' (সূরা বাকারাহঃ ২৮২)
মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়াকে ইসলামে কবীরা গুনাহ বা মহাপাপ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আবার সত্য সাক্ষ্য গোপন করাও নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেনঃ
وَلَا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ ۚ وَمَن يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ آثِمٌ قَلْبُهُ
'তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে ব্যক্তি তা গোপন করে, তার অন্তর পাপী।' (সূরা বাকারাহঃ ২৮৩)