📄 নির্বাহী সরকারের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব
নির্বাহী বিভাগ
নির্বাহী সরকারের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব
আইন বিভাগ বা মজলিসে শুরা যে সব আইন রচনা করবে, অথবা কুরআন ও সুন্নাহ যেসব আইন অকাট্যভাবে বিধিবদ্ধ করে দিয়েছে, সে সব আইন যারা বা যে বিভাগ কার্যকর করবে, তাকেই নির্বাহী বিভাগ বা সরকার বলা হয়। এই বিভাগের প্রধান হচ্ছেন রাষ্ট্রপ্রধান। তার সাহায্য-সহযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক মন্ত্রী বা উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসক ও কর্মচারী থাকবে।
নির্বাহী সরকারের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অপরিসীম। সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরুর নিরাপত্তা বিধানের জন্য একটি শক্তিশালী নির্বাহী সরকার একান্ত অপরিহার্য। নির্বাহী সরকার ছাড়া আইন কেবল কিতাবের পাতাতেই থেকে যায়, বাস্তবে তার কোন সুফল পাওয়া যায় না।
📄 আমর বিল মারুফ ও নিহী আনিল মুনকার নির্বাহী সংস্থারই দায়িত্ব
কুরআন মজীদে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষিত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা মুসলিম উম্মাহকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও বসার সুযোগ এজন্যই দেন, যেন তারা এই 'আমর বিল মারূফ ও নিহী আনিল মুনকার'-এর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। ইরশাদ হয়েছেঃ
الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ ۗ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ (الحج: ৪১)
অর্থাৎ আমি যদি তাদের পৃথিবীতে বসার ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ-ক্ষমতা দেই, তাহলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত ব্যবস্থা চালু করবে, ভালো কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ করতে নিষেধ করবে। আর সব কাজের চূড়ান্ত পরিণাম আল্লাহরই ইখতিয়ারভুক্ত।
এই আয়াতে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্বাহী সরকারের চারটি প্রধান দায়িত্বের কথা বলা হয়েছেঃ ১. সালাত কায়েম করা, ২. যাকাত ব্যবস্থা প্রবর্তন করা, ৩. সৎ কাজের আদেশ দান ও ৪. অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা। এই কাজগুলি আঞ্জাম দেয়াই নির্বাহী সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
📄 সরকার সংস্থার দায়িত্ব
ইসলামী রাষ্ট্রের সরকার বা নির্বাহী সংস্থার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে ফিকাহবিদগণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আল্লামা মাওয়ার্দী (রহ) এ সম্পর্কে দশটি দফার উল্লেখ করেছেনঃ
১. দ্বীন-ইসলামের হেফাযত করা। অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে দ্বীনের মৌলিক ও শাখাগত বিষয়গুলি সংরক্ষণ করা এবং বিদয়াত ও বিকৃতি থেকে দ্বীনকে মুক্ত রাখা।
২. বাদী ও বিবাদীর মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, যাতে সবল দুর্বলের উপর অত্যাচার করতে না পারে এবং দুর্বল তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।
৩. দেশের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরুর নিরাপত্তা বিধান করা, যাতে জনগণ নিশ্চিন্তে জীবন যাপন করতে পারে।
৪. ইসলামী শরীয়াতের হুদুদ বা দণ্ডবিধি কার্যকর করা, যাতে আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজসমূহ থেকে মানুষ বিরত থাকে এবং বান্দার হক নষ্ট না হয়।
৫. সীমান্ত রক্ষা করা এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা।
৬. কাফিরদের সাথে জিহাদ করা, যারা ইসলামের দাওয়াত কবুল করে না এবং জিযিয়া দিতেও অস্বীকার করে।
৭. ফাই ও যাকাত আদায় করা এবং শরীয়াতের বিধান অনুযায়ী তা বন্টন করা।
৮. বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রীয় ধনাগার থেকে হকদারদের মধ্যে ভাতা ও সাহায্য প্রদান করা।
৯. যোগ্য ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগ করা।
১০. রাষ্ট্রপ্রধানের সশরীরে ও সরাসরি সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তদারক করা। ১
টিকাঃ
১. الأحكام السلطانية
📄 রাসূলে করীম(স)-এর যুগে প্রশাসনিক দায়িত্বশীলদের প্রশিক্ষণ
রাসূল করীম (স) তাঁর নিযুক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উন্নতমানের নৈতিক ও চারিত্রিক প্রশিক্ষণ দান করতেন। তাদের মনে আল্লাহ-ভীতি ও পরকালীন জবাবদিহির অনুভূতি তীব্রভাবে জাগরূক করে দিতেন। হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রা)-কে ইয়েমেনের শাসনকর্তা হিসেবে পাঠানোর সময় তিনি যে সব উপদেশ দিয়েছিলেন, তা প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের এক অনন্য দলিল। তিনি বলেছিলেনঃ
'হে মুয়ায! তুমি আহলে কিতাবদের এক সম্প্রদায়ের নিকট যাচ্ছ। সুতরাং সর্বপ্রথম তাদেরকে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল—এ কথার সাক্ষ্য দানের আহ্বান জানাবে। যদি তারা তা মেনে নেয়, তবে তাদেরকে জানাবে যে, আল্লাহ তাদের উপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছেন। যদি তারা তাও মেনে নেয়, তবে তাদেরকে জানাবে যে, আল্লাহ তাদের ধন-সম্পদে যাকাত ফরয করেছেন, যা তাদের ধনীদের নিকট থেকে গ্রহণ করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করা হবে। সাবধান! তাদের উত্তম ও উৎকৃষ্ট মালগুলো বেছে নেবে না। আর মজলুমের ফরিয়াদকে ভয় করবে। কেননা তার ও আল্লাহর মাঝখানে কোন পর্দা থাকে না।'