📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য

📄 রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য


ইসলামী ফিকহবিদ মনীষীদের ব্যাখ্যানুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিম্নরূপঃ

১. দ্বীন-ইসলাম সংরক্ষণ মুসলিম উম্মতের আদর্শ ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, সময়োপযোগী ব্যাখ্যা সহকারে;
২. বিবদমান পক্ষসমূহের উপর আল্লাহ্র আইন কার্যকরকরণ, ঝগড়া বিবাদ ইসলামী আইন অনুযায়ী মীমাংসা করার ব্যবস্থাকরণ;
৩. প্রত্যেকটি নাগরিকের বৈধ দখলী স্বত্ব জবরদখল বা বেআইনী দখল থেকে রক্ষা করা, উদ্ধার করা, যেন প্রত্যেকে নিজ দখলের উপর স্বীয় কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে, তারা কোন বেআইনী বাধা-প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন না হয় ও নিশ্চিন্ত নিরাপত্তাপূর্ণ জীবন যাপন সকলের পক্ষেই সম্ভব হয়। এক কথায় শান্তি-শঙ্খলা (Law and order) স্থাপন ও সংরক্ষণ;
৪. শরীয়াত ঘোষিত 'হদ্দ' ও 'কিসাস' কার্যকরকরণের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা করা, যেন আল্লাহর হারাম ঘোষিত কোন কাজ হতে না পারে, সকলের অধিকার সকল প্রকারের আঘাত ও লুটতরাজ থেকে পূর্ণরূপে রক্ষা পেতে পারে। কোন লোকই স্বীয় ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। (দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন- দুর্বলকে শক্তিশালী করা ও সবলদেরে সংযত ও নিয়ন্ত্রিত করা-সকল নাগরিককে সমান মর্যাদা ও অধিকারে প্রতিষ্ঠিত করাও এর মধ্যে গণ্য);
৫. সকল প্রকার বহিরাক্রমণ থেকে দেশের প্রতিটি ইঞ্চি পরিমাণ স্থানও রক্ষা করা। সে জন্য প্রবল প্রতিরোধে শক্তি গড়ে তোলা যেন কোন শক্তিই- সে যত বড় শক্তিশালী এবং সৈন্যবল ও অস্ত্রবলে যত বলীয়ানই হোক-দেশের প্রতি চোখ তুলে তাকাবারও সাহস না পায়। এক কথায় বৈদেশিক আক্রমণের থেকে দেশকে ও দেশের জনগণ ও তাদের মাল-সম্পদ, জান-প্রাণ ও মান-ইযযত রক্ষা করা এবং এজন্য প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জন ও সামর্থ্য সংগ্রহ করা;
৬. ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করা। অবশ্য প্রথমে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দান ও জিযিয়ার বিনিময়ে বশ্যতা স্বীকারের প্রস্তাব পেশের পর সবশেষ উপায় হিসেবে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ইসলামী শরীয়াতের এটাই স্থায়ী বিধান;
৭. কর, খাজনা ও অন্যান্য সরকারী পাওনা সঠিকরূপে আদায় করার ব্যবস্থা করা। তা শরীয়াতের স্থায়ী নীতি অনুযায়ী হতে হবে এবং এ ব্যাপারে কোনরূপ নির্দয়তার প্রশ্রয় দেয়া চলবে না;
৮. বায়তুলমাল সংরক্ষণ। তা থেকে যাকে যা দেয়ার তার পরিমাণ নির্ধারণ ও যথাযথ দিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা, তাতে বাড়াবাড়ি না করা, অপচয় না করা, আর পাওনা পরিমাণেও হ্রাস-বৃদ্ধি না করা, যথাসময়ে দিয়ে দেয়া-বিলম্ব না করা;
৯. দায়িত্বশীল কর্মচারী নিয়োগ করা, তাদের কাজের সুযোগ করে দেয়া, তাদের নিকট থেকে কাজ বুঝে নেয়া-তাদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা;
১০. সমস্ত জাতীয় ও সামষ্টিক ব্যাপারে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হওয়া, পরিস্থিতি অধ্যয়ন, পর্যবেক্ষণ ও তদানুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ, যেমন সার্বিকভাবে গোটা উম্মত রক্ষা পায় এবং মিল্লাত সংরক্ষিত থাকে।

আল্লামা আল-গারা তাঁর 'আল-আহকামুস্ সুলতানীয়া' গ্রন্থের ১১ পৃষ্ঠায় এবং আল্লামা মাওয়ার্দী তাঁর 'আল-আহকামুস্-সুলতানীয়া' গ্রন্থের ১৫ পৃষ্ঠায় এই কথাগুলি উদ্ধৃত করেছেন। আমি মনে করি, মনীষীগণ এর কোন একটি কথাও কল্পনা করে লিখেন নি; বরং কুরআন মজীদের আয়াত থেকেই তা নিঃসৃত। এ পর্যায়ের দু'টি আয়াত আমি এখানে উদ্ধৃত করছিঃ

وَعَدَ اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ - وَلَيُمْكِنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبْدِلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنَا - يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ( النور : ٥٥)
তোমাদের মধ্য থেকে যারাই ঈমান আনবে ও ঈমান অনুযায়ী নেক আমল করবে, তাদের জন্য আল্লাহ্ ওয়াদা করেছেন যে, তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে খলীফা-রাষ্ট্র পরিচালক-বানাবেন যেমন করে তাদের পূর্ববর্তীদের তিনি খলীফা বানিয়েছিলেন এবং যেন তাদের জন্য তাঁর পছন্দ করা দ্বীনকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তাদের ভয়-ভীতি-আশঙ্কার পর পূর্ণ নির্ভীকতা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারেন। এই লোকেরা কেবলমাত্র আল্লাহরই দাসত্ব করবে, তাঁর সাথে একবিন্দু জিনিসকেও শরীক করবে না।

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হচ্ছে যে, আল্লাহর খিলাফত-ইসলামী রাষ্ট্রের মৌল উদ্দেশ্যই হচ্ছে দ্বীন ইসলামকে সুদৃঢ়ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা, দ্বীনকে পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত করা, দ্বীনের মান-মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং সেখানকার জনগণের জীবনকে সকল প্রকারের ভয়-ভীতি ও বিপদ আশঙ্কা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে স্বাধীন নির্বিঘ্ন জীবন যাপনের নির্ভরযোগ্য সুযোগ করে দেয়া। বস্তুত দুনিয়ার প্রত্যেক দেশের আপামর জনগণের তা-ই তো কাম্য এবং তা সবকিছুই পূর্ণ মাত্রায় বাস্তবায়িত হতে পারে কেবলমাত্র ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। আর এ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানই এইসব কাজ করার জন্য প্রধান দায়িত্বশীল।

আর দ্বিতীয় আয়াতঃ
وَاعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمْ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ (انفাল : ৬০ )
এবং তোমরা শত্রুপক্ষের মুকাবিলা করার লক্ষ্যে যথাসাধ্য শক্তি ও যানবাহন সংগ্রহ ও প্রস্তুত কর। তদ্দ্বারা তোমরা আল্লাহর দুশমনদের ভীত-সন্ত্রস্ত করবে-তোমাদের নিজেদের শত্রুদেরও। এদের ছাড়া আরও অনেক শত্রু আছে যাদের তোমরা জান না, আল্লাহ্ তাদের জানেন।

উভয় আয়াতে বলা কথা ও কাজ যদিও সামষ্টিকভাবে মুসলিম উম্মতের জন্য, কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানই যেহেতু মুসলিম উম্মতের প্রতিনিধি, সকলের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল, তাই রাষ্ট্রপ্রধানকেই এ কাজসমূহ করতে হবে।

কুরআনের ঘোষণা হলো
فَمَنِ اعْتَدَى عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُوا عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَى عَلَيْكُمْ (البقره: ١٩٤)

রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ
انما جعل الراعى عضد اللضعفاء وحجاز للاقوياء ليدفعو القوى عن الظلم ويعينوا الضعيف على الحق كتاب النبي صلعم الى الولاة . (منهاج الصالحين: ۷۲۱)

'ইমাম' রাষ্ট্রপ্রধান সম্পর্কে রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ
إِنَّمَا الْإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتِلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيَتَّقِي بِهِ (مسلم)
রাষ্ট্রপ্রধান মিথ্যাবাদী বা কাফির হলে তার আনুগত্য করা যাবে না।

কুরআনের নির্দেশঃ
فَلَا تُطِعِ الْمُكَذِّبِينَ وَدُّوا لَوْ تُدْهِنُ فَيُدْهِنُونَ (القلم: ٨-٩)
وَلَا تُطِعِ الْكَفَّرِينَ وَالْمُنْفِقِينَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا (الاحزاب)
وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا ...... وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا (الكهف: ٢٨)

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 রাষ্ট্রপ্রধানের অধিকার

📄 রাষ্ট্রপ্রধানের অধিকার


রাষ্ট্রপ্রধান তার উপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ পালন করলে তার দুইটি প্রধান অধিকার অবশ্য স্বীকৃতব্য হয়ে পড়েঃ একটি, জনগণের উপর তার অধিকার এবং দ্বিতীয়টি, জনগণের ধন-মালে তার অধিকার। বলা বাহুল্য, এ অধিকার ব্যক্তিগতভাবে নয়, কেবলমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বসমূহ পালনার্থে।

১. জনগণের উপর রাষ্ট্রপ্রধানের অধিকার হচ্ছে, জনগণ তাকে মান্য করবে, তার আনুগত্য স্বীকার করবে। এ অধিকার নিশ্চয়ই নিরংকুশ ও শর্তহীন নয়। এ অধিকার তার নিজের আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা এবং আল্লাহ্ ও রাসূলের আইন-বিধানের সীমার মধ্যে থেকে তাকে মেনে চলতে জনগণকে বলার মধ্যে সীমিত। এর বাইরে কারোরই কোন আনুগত্য থাকতে পারে না।

২. রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার গৃহীত নীতি বা সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বিরোধ হওয়া সম্ভব। জনগণ তার সাথে মতবিরোধ করতে পারে, করার অধিকার স্বয়ং আল্লাহই তাদেরকে দিয়েছেন। এ অধিকার হরণ করে নেয়ার কোন অধিকার রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার-কারোরই নেই এবং মতবিরোধের চুড়ান্ত মীমাংসা হতে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের ইচ্ছানুযায়ী নয়, বরং তা হবে আল্লাহ্ ও রাসূল অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাতের ভিত্তিতে, যা মেনে নিতে উভয় পক্ষ সমানভাবে বাধ্য। রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের আনুগত্যের সীমা রাসূলে করীম (স) নির্ধারিত করে দিয়েছেন। বলেছেনঃ
لا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ
সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ নাফরমানী করে কারোরই আনুগত্য করা যায় না। আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারোর আনুগত্য করা যেতে পারে ততক্ষণ এবং সেসব কাজে, যতক্ষণ এবং যেসব কাজে আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের নাফরমানী হবে না。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00