📄 মুসলিম জনগণ রাষ্ট্র প্রধান নির্বাচন করবে
বস্তুত এ-ই হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগের মৌলিক দর্শন। মুসলিম জনগণই তাকে নিজেদের সন্তুষ্টি ও স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছা-উদ্যোগের ভিত্তিতে নিয়োগ করবে। এ ছাড়া কারোর রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার বা নিয়োগের অপর কোন পন্থা থাকতে পারে না। এই পন্থা ছাড়া অপর কোন ভাবে-উপায়ে বা পন্থায় রাষ্ট্রপ্রধানের পদে আসীন হওয়ার কোন অধিকারই কারোর থাকতে পার না। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিম উম্মতের কার্য সম্পাদনের স্থায়ী-নীতি হিসেবে ঘোষণা করেছেনঃ
وامرهم شورى بينهم (الشورى: (۳৮)
মুসলিম জনগণের সামষ্টিক ব্যাপারাদি পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতেই সম্পন্ন হয়ে থাকে।
আয়াতটির তাৎপর্য হচ্ছে, মুসলিম জনগণের জাতীয় ও সামষ্টিক কোন কাজ-ই কোন এক ব্যক্তির ইচ্ছানুযায়ী সম্পন্ন হয় না। কোন এক ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা ও কল্পনার ভিত্তিতে কোন নীতি-আদর্শ, পন্থা বা দফা-যা-ই নির্ধারণ করুক, তা মুসলিম জনগণ মানতে বাধ্য নয়। কেননা তারা তো সেই লোক, যারা রাব্বুল আলামীনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁরই অধীনতা মেনে নিয়েছে। আর সেই আল্লাহরই অধীনতা-আনুগত্য স্বীকার করে তারা সালাত কায়েম করে (আয়াতটির প্রথম অংশ)। কাজেই আল্লাহ যেসব সামষ্টিক ব্যাপারে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কোন বিধান দেন নি, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ও দায়িত্ব আল্লাহ্ নিজেই তাদের উপর অর্পণ করেছেন- সে সব ব্যাপারে মুসলিম জনগণ পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, যাতে মুসলিম জনগণের সুচিন্তিত ও স্বতঃস্ফূর্ত মতের প্রতিফলন ঘটবে। আর তাদের রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ যে তাদের সামষ্টিক কার্যাবলীর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, তাতে কারোরই একবিন্দু সন্দেহ থাকতে পারে না। অতএব সে কাজ জনমতের ভিত্তিতেই সুসম্পন্ন হতে হবে।
রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনে জনমতের অংশ গ্রহণ কুরআনী বিধান অনুযায়ী অপরিহার্য। স্বৈরতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক পার্থক্যের এ একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই কারণে নবী করীম (স) ঘোষণা করেছেনঃ
مَنْ بَايَعَ أَمِيرًا عَنْ غَيْرِ مَشْوَرَةِ الْمُسْلِمِينَ فَلَا بَيْعَةً لَهُ وَلَا الَّذِي بَايَعَهُ (مسند احمد )
মুসলিম জনগণের সাথে পরামর্শ না করে-তাদের মত জেনে না নিয়ে কেউ কাউকে নেতা হিসেবে বায়'আত করলে বা মেনে নিলে তা আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়।
কিন্তু বাস্তবে তা কিভাবে সম্ভব হতে পারে?..... এ প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, একটি দেশের পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ-নারী-সকল নাগরিকই হবে ভোটদাতা। সারাটি দেশ হবে একটি মাত্র নির্বাচনী এলাকা (Constituency)। নির্দিষ্ট দিনে প্রত্যেক ভোটদাতা নিজ ইচ্ছা ও পছন্দমত কাজের গুরুত্ব ও দায়িত্বের বিরাটত্বের দিকে লক্ষ্য রেখে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করার তীব্র অনুভূতি সহকারে - ভোট প্রদান করবে। কেউ প্রার্থী নেই, কোন ক্যানভাসার নেই। ভোটের জন্য কারোর প্রলোভন বা ভয়-ভীতির সম্মুখীন হতে হবে না কোন ভোটদাতাকে! এর ফলে সারা দেশে যার পক্ষে সর্বাধিক ভোট পড়বে, সে-ই রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হলো বলে ঘোষিত হবে।
কোন দেশে বিশেষ অবস্থার কারণে এইরূপ হওয়া সম্ভব মনে না করা হলে প্রথমে জাতীয় সংসদের পার্লামেন্টের নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্য নির্বাচিত করে তাদের ভোটে দুই বা ততোধিক নামের একটা প্যানেল তৈরী করা যেতে পারে এবং তারই মধ্য থেকে কোন একজনকে ভোট দেয়ার অবাধ সুযোগ সর্বসাধারণ ভোট দাতাদের দেয়া যেতে পারে। এ ভাবে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনেও জনমতের প্রতিফলন হবে বলে তাকে ইসলামসম্মত মনে করায় কোনই অসুবিধা থাকতে পারে না। বিশেষ করে যখন তা ইসলামের সুস্পষ্ট মানদন্ডের ভিত্তিতে এবং আল্লাহর নিকট জবাবদিহির অনুভূতি সহকারে ইসলামের সীমার মধ্যে থেকে করা হবে।
📄 রাষ্ট্রপ্রধানের অভিষেক, ক্ষমতা-ইখতিয়ার ও অধিকার
ইসলামে আনুগত্য স্বীকারের প্রতীক স্বরূপ হাতে হাত দিয়ে বায়'আত গ্রহণের রীতি প্রথম দিন থেকেই কার্যকর হয়ে এসেছে। স্বয়ং রাসূলে করীম (স)ই এই পদ্ধতি চালু করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বায়'আত অনুষ্ঠিত হয় মক্কায়। হিজরতের পূর্বে মদীনার কতিপয় আনসার দ্বীন-ইসলাম কবুল করলে এই বায়'আত অনুষ্ঠিত হয়। তা 'বায়'আতে আকাবা' বা আকাবা'র বায়'আত নামে পরিচিত। মিনা অঞ্চলের একটি নির্জন পর্বত গুহায় গভীর রাতে একান্ত গোপনে এ কাজটি করা হয়। সে বায়'আত হয়েছিল আনন্দ-খুশী দুর্বলতা-অবসন্নতা অভাব-অনটন ও সচ্ছলতা-উভয় প্রকারের অবস্থায়ই রাসূলে করীমের আনুগত্য করার এবং দ্বীনের জন্য অর্থ ব্যয় করা, ভালো কাজের আদেশ করা ও মন্দ কাজ না করা-করতে নিষেধ করা এবং আল্লাহর-আল্লাহর দ্বীন রক্ষা ও প্রচার-প্রতিষ্ঠায় সকল প্রকারের ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে যাওয়ার উপর। আনসারগণ প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ দায়িত্বের বোঝা নিজেদের স্বন্ধে গ্রহণ করেছিলেন।
রাসূলে করীম (স.)-কে দ্বীন-প্রতিষ্ঠার কঠিন সংগ্রামে সাহায্য সহযোগিতা করা এবং নিজেদের ও আপন স্ত্রী-পরিজনের ন্যায় তাঁকেও রক্ষণাবেক্ষণ করার এ বায়'আত-ই ইসলামে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের প্রথম ভিত্তি রচনা করেছিল। অতঃপর খুলাফায়ে রাশেদুনের ক্ষেত্রে এই বায়'আতকে পুরাপুরি ব্যবহার করা হয়েছে। এ বায়'আতের পরই রাষ্ট্রপ্রধান তার দায়িত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত হয়েছে এবং জনগণের জন্য তাঁর আনুগত্য করা সর্বাধিক কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রীয় আনুগত্য স্বীকারের জন্য হাতে হাত দিয়ে এই বায়'আত করা একটি সুন্নত হিসেবে গণ্য হলেও তা কোন্ চিরন্তন আদর্শ বা পদ্ধতি রূপে অনুসৃত হবে, শরীয়াতের দৃষ্টিতে তার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। আধুনিক কালে ব্যালটের মাধ্যমেও এ বায়'আতের কাজ সুসম্পন্ন হতে পারে এবং সর্বাধিক সংখ্যক ভোটপ্রাপ্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রপ্রধান নিযুক্ত হতে পারে।
পূর্বে যেমন বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব দ্বিবিধঃ ইসলাম কায়েম ও কার্যকর করা এবং দ্বিতীয় সমস্ত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ইসলামের আদর্শ ও রীতি-নীতি অনুযায়ী আঞ্জাম দেয়া। অবশ্য রাষ্ট্রপ্রধানকে শু'রার পরামর্শ গ্রহণ এবং মজলিসে শু'রার সিদ্ধান্তসমূহের মধ্যে থেকেই কাজ করতে হবে। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা ওহী গ্রহণকারী স্বয়ং নবী করীম (স)-কে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন।
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ (ال عمران: ১৫৯)
এবং হে নবী! তুমি তাদের সঙ্গে (মুসলিম জনগণের সঙ্গে) যাবতীয় সামষ্টিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে পরামর্শ কর।
বস্তুত ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা একটি পরামর্শভিত্তিক বিধান। লোকদের সাথে পরামর্শ করে তারপরই রাষ্ট্রীয় কাজ আঞ্জাম দেয়া যেতে পারে। এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (স)-এর ঘোষণা অবশ্যই স্মরণীয়ঃ
وَامْرُكُمْ شُورَى بَيْنَكُمْ فَظَهُرُ الْأَرْضِ خَيْرٌ لَكُم مِّنْ بَطْنِهِ (ترمذی)
তোমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যাপারাদি পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হলে তোমাদের জীবন মৃত্যুর তুলনায় শ্রেয়।
রাসূলে করীম (স)-এর প্রতি এই নির্দেশ যে আয়াতটিতে দেয়া হয়েছে, তার শুরুতে বলা হয়েছেঃ তুমি আল্লাহ্র রহমতে অত্যন্ত নরম দিল। তুমি যদি রুঢ়-কর্কশ পাষাণ-হৃদয় হতে তাহলে লোকেরা তোমার চারপাশ থেকে সরে যেত। অতএব তুমি তাদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন কর এবং তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা কর। অতঃপর বলা হয়েছেঃ আর জাতীয়-সামষ্টিক ব্যাপারাদিতে তাদের সাথে পরামর্শ কর। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে-সমাজের লোকদের সাথে সামষ্টিকভাবে পরামর্শ করা ইসলামী সমাজের একটা বিশেষ বিশেষত্ব। এ বিশেষত্ব না থাকলে ইসলামী সমাজ হতে পারে না। অতএব ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধানকে পরামর্শ করতে হবে, জনমত জানতে হবে এবং সম্মুখবর্তী সামষ্টিক ব্যাপারে জনগণ নির্বাচিত মজলিসে শু'রা যে বিষয়ে যে পরামর্শ দেবে, রাষ্ট্রপ্রধান তা অগ্রাহ্য করতে পারবে না।
এই পর্যায়ে দু'টি মত স্পষ্ট। আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছেঃ
فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ .
তুমি যখন কোন কাজ করার সংকল্প গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহর উপর পূর্ণ নির্ভরতা গ্রহণ করে সে কাজটি করে ফেল।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংকল্প করা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ কি পরামর্শ গ্রহণ বা শু'রার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তিতে হবে কিংবা শু'রার সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ মাত্র না করেই সিদ্ধান্ত বা সংকল্প গ্রহণের অধিকার রাষ্ট্র প্রধানের রয়েছে?
কিছু সংখ্যক মনীষীর মত-শু'রার সিদ্ধান্ত ছাড়াও রাষ্ট্রপ্রধানের নিজস্ব বিচার-বিবেচনা ও কল্যাণ চিন্তার ভিত্তিতে একান্ত নিজস্বভাবে সংকল্প ও পদক্ষেপ গ্রহণের অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধান শু'রার পরামর্শ বা সিদ্ধান্তের অধীন নয় এবং সে তা মেনে নিতে একান্তভাবে বাধ্যও নয়। এমন নয় যে, শু'রার সিদ্ধান্তের সামান্য বিরুদ্ধতা করারও তার ইখতিয়ার থাকবে না। সে পরামর্শ নেবে; কিন্তু প্রকৃত সিদ্ধান্ত ও সংকল্প গ্রহণের অধিকার রাষ্ট্রপ্রধানের এবং তার এটা কর্তব্যও।
কিন্তু এ মতের একটি মারাত্মক দিক হচ্ছে, এরূপ ইখতিয়ার ও অধিকার থাকলে রাষ্ট্রপ্রধানের স্বৈরতান্ত্রিক ভূমিকা অবলম্বন অনিবার্য পরিণতি কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র-দর্শনে এই ভূমিকা অবলম্বনের কোন অবকাশ নেই।
তাই অন্যান্য মনীষীদের মত হচ্ছে, চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও কার্যত পদক্ষেপ গ্রহণ রাষ্ট্রপ্রধানেরই কাজ এবং দায়িত্ব। তবে তাকে তা করতে হবে মজলিসে শু'রার পরামর্শ ও সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে, তা বাদ দিয়ে বা এড়িয়ে গিয়ে নয়। (فتح القدير للشوكاني)
📄 ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কর্তব্য
ইসলামী রাষ্ট্র রাষ্ট্রের সমস্ত জনগণের উপর কর্তৃত্ব বিস্তার করে। জনগণের বৈষয়িক জীবনকে সুষ্ঠুরূপে পরিচালনার এবং তাদের পরকালীন জীবনে মুক্তি ও সাফল্যের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব হিসেবে দু'টি কথার উল্লেখ করেছেন। একটি হচ্ছে, দ্বীন-ইসলামকে পূর্ণরূপে কার্যকর ও সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা। ইসলামের আইন বিধান যথাযথভাবে কার্যকর করা। আর দ্বিতীয় হচ্ছে, ইসলামের রীতি-নীতি অনুযায়ী গোটা রাষ্ট্রকে পরিচালিত করা। এক কথায় বলা যায় দ্বীন-ইসলামকে বাস্তবায়িত করাই রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ কারণে ফিকাহবিদগণ ইসলামী রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিয়েছেন এই ভাষায়ঃ
إِنَّهَا رِبَاسَةً عَامَةً فِي أُمُورِ الدِّينِ وَالدُّنْيَا نِيَابَةٌ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
ইসলামী রাষ্ট্র হচ্ছে দ্বীন ও দুনিয়ার যাবতীয় ব্যাপারের দিকে সাধারণ নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব।
আর রাষ্ট্রপ্রধানের পরিচিতিস্বরূপ বলা হয়েছেঃ
أَنهَا خِلَافَةُ الرَّسُولِ فِي إِقَامَةِ الدِّينِ وَحِفْظِ حَوْرَةِ الْمِلَّةِ بِحَيْثُ يَجِبُ اتِّبَاعُهُ عَلَى كَافَةِ الْأُمَّةِ (المواقف ص ٢٠٣، المسامره ج ٢ ص ١٤١)
দ্বীন কায়েম করা ও মুসলিম মিল্লাতের আদর্শ ও মান রক্ষা করার কাজে রাসূলের প্রতিনিধিত্ব করা-এ কারনেই তার অনুসরণ করা সমগ্র উম্মতের কর্তব্য।
আল্লামা মাওয়ার্দী ইসলামী রাষ্ট্রের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেনঃ
إِنَّهَا مَوْضُوعَةُ الْخِلَافَةِ النُّبُوَّةِ فِي حَرَاسَةِ الدِّينِ وَسِيَاسَةِ الدُّنْيَا (الاحكام السلطانيه ص ৩)
দ্বীনের পাহারাদারী, সংরক্ষণ ও দুনিয়ার সুষ্ঠু পরিচালনে নবুয়্যাতের প্রতিনিধিত্ব করার উদ্দেশ্যেই তা প্রতিষ্ঠিত।
আর আল্লামা ইবনে খালদুন সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেনঃ
إِنَّهَا حَمْلُ الْكَافَّةِ عَلَى مُقْتَضَى النَّظْرِ الشَّرْعِي فِي مَصَالِحِهِمُ الْأَخْرُويَّةِ وَالدُّنْيَوِيَّةِ الرَّجِعَةِ إِلَيْهَا إِذْ أَحْوَالُ الدُّنْيَا تَرْجِعُ كُلُّهَا عِنْدَ الشَّارِعِ إِلَى اعْتِبَارِهَا بِمَصَالِحَ الْآخِرَةِ فِهِيَ فِي الْحَقِيقَةِ خِلَافَةٌ عَنْ صَاحِبِ الشَّرْعِ فِي حَرَاسَةِ الدِّينِ وَسِيَاسَةِ الدنيا به مقدمه ابن خلدون ص (۱۸۰)
জনগণের পরকালীন ও বৈষয়িক কল্যাণ-যার পরিণতি সেই পরকাল-শরীয়াতের দাবি অনুযায়ী-সাধনের সর্বাত্মক দায়িত্ব গ্রহণ। কেননা শরীয়াত দাতার দৃষ্টিতে দুনিয়ার সমস্ত অবস্থা প্রকৃত পক্ষেই পরকালের কল্যাণের দৃষ্টিতে সম্পন্ন হতে হবে। তাই তা হচ্ছে দ্বীনের সংরক্ষণ ও দ্বীনের সাহায্যে বিশ্বব্যবস্থা সংগঠন ও পরিচালনে শরীয়াতদাতার প্রতিনিধিত্ব।
ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য যেমন বিরাট তেমনি মহান। তাই দুইটি কারণে রাষ্ট্রপ্রধান তার এই পদের অযোগ্য প্রমাণিত হয়।
একটি তার ব্যক্তিগত সততা-বিশ্বস্ততা ক্ষুন্ন হওয়া। আর দ্বিতীয়টি, তার দৈহিক বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগত ত্রুটি ও অক্ষমতা।
ব্যক্তিগত সততা ও বিশ্বস্ততা ক্ষুন্ন হওয়ার অর্থ রাষ্ট্রপ্রধানের 'ফাসিক'-শরীয়াতের সীমালংঘনকারী প্রমাণিত হওয়া। এর দু'টি দিক। একটি লালসা-কামনা চরিতার্থ করা। আর দ্বিতীয়টির সম্পর্ক তার ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয়ের উদ্রেক।
প্রথমটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গজনিত ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট। আর তা হচ্ছে তার কোন হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া, শরীয়াতে ঘৃণিত-নিষিদ্ধ কাজে জড়িত হয়ে পড়া। যৌন-লালসার দ্বারা চালিত হয়ে কোন জঘন্য কাজ করা। যেমন যিনা-ব্যভিচার, মদ্যপান, সীমাতিরিক্ত ক্রোধ। এ চরিত্রগত দোষ থাকলে তার পক্ষে ইসলামী রাষ্টের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রপ্রধান নিযুক্ত হওয়ার পর এই ধরনের অপরাধ করলে সে যেমন নিজেকে উক্ত পদের সম্পূর্ণ অযোগ্য প্রমাণ করে, তেমনি সেই উচ্চতর পদটিরও করে চরম অপমান।
দ্বিতীয় প্রকারের সীমালংঘনমূলক কাজের সম্পর্ক আকীদা-বিশ্বাসের সাথে। আকীদা-বিশ্বাসে 'ফিস্ক' দেখা দিলে তা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা শরীয়াত লংঘনের মতই অপরাধ। অতঃপর সে রাষ্ট্রপ্রধান পদে নিযুক্ত থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলে। কেননা আকীদায় 'ফিস্ক' দেখা দিলে তা কুফর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া অসম্ভব নয়।
এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হচ্ছে হযরত উবাদাতা ইবনুস্ সামিত (রা) বর্ণিত একটি হাদীস। তিনি বলেছেনঃ
بَايَعْنَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ فِي مَنْشَطَنَا وَمَكْرَهَنَا وَعُسْرِنَا وَيُسْرِنَا وَآثَرَةِ عَلَيْنَا وَأَنْ لا نُنَازِعَ الْأَمْرَ أَهْلَهُ إِلَّا أَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاكَّنَا عِندَكُمْ فِيهِ مِنَ اللَّهِ بُرْهَانَ (الاسلام - سعيد حوى ج ٢ ص ١٥٣)
আমরা রাসূলে করীম (স)-এর নিকট বায়'আত করেছি, আমাদের আনন্দ অসন্তুষ্টি, কঠিনতা বিপদ ও সুবিধা ও আমাদের স্বার্থ-সর্বাবস্থায়ই আমরা শুনব ও মানব-অনুগত থাকব। আর দায়িত্বশীলের সাথে কোন ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করব না। তবে এমন কুফরি যদি দেখতে পাই যা স্পষ্ট ও প্রকাশ্য-সর্বজনবিদিত এবং যা'র কুফর হওয়ার অকাট্য দলীল আল্লাহর নিকট থেকে থাকবে, তাহলে শুনা ও মানা-আনুগত্যের উক্ত শপথ কার্যকর নয়।
রাষ্ট্রপ্রধানের এ রূপ চারিত্রিক পতনের দরুন তাকে পদচ্যুত করা কিংবা তার আনুগত্য করতে অস্বীকার করার অধিকার মুসলিম জনগণের সংরক্ষিত বলে বহু ফিকহবিদ মত প্রকাশ করেছেন।
দৈহিক আঙ্গিক ত্রুটি ও অক্ষমতা পর্যায়ে ইন্দ্রিয়নিচয়ের অক্ষমতাও গণ্য। দায়িত্ব পালনে আঙ্গিক অসামর্থ্য বা পংগুত্ব এ পদের পথে মারাত্মক ধরনের বাধা। (ঐ)
📄 রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য
ইসলামী ফিকহবিদ মনীষীদের ব্যাখ্যানুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিম্নরূপঃ
১. দ্বীন-ইসলাম সংরক্ষণ মুসলিম উম্মতের আদর্শ ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, সময়োপযোগী ব্যাখ্যা সহকারে;
২. বিবদমান পক্ষসমূহের উপর আল্লাহ্র আইন কার্যকরকরণ, ঝগড়া বিবাদ ইসলামী আইন অনুযায়ী মীমাংসা করার ব্যবস্থাকরণ;
৩. প্রত্যেকটি নাগরিকের বৈধ দখলী স্বত্ব জবরদখল বা বেআইনী দখল থেকে রক্ষা করা, উদ্ধার করা, যেন প্রত্যেকে নিজ দখলের উপর স্বীয় কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে, তারা কোন বেআইনী বাধা-প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন না হয় ও নিশ্চিন্ত নিরাপত্তাপূর্ণ জীবন যাপন সকলের পক্ষেই সম্ভব হয়। এক কথায় শান্তি-শঙ্খলা (Law and order) স্থাপন ও সংরক্ষণ;
৪. শরীয়াত ঘোষিত 'হদ্দ' ও 'কিসাস' কার্যকরকরণের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা করা, যেন আল্লাহর হারাম ঘোষিত কোন কাজ হতে না পারে, সকলের অধিকার সকল প্রকারের আঘাত ও লুটতরাজ থেকে পূর্ণরূপে রক্ষা পেতে পারে। কোন লোকই স্বীয় ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। (দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন- দুর্বলকে শক্তিশালী করা ও সবলদেরে সংযত ও নিয়ন্ত্রিত করা-সকল নাগরিককে সমান মর্যাদা ও অধিকারে প্রতিষ্ঠিত করাও এর মধ্যে গণ্য);
৫. সকল প্রকার বহিরাক্রমণ থেকে দেশের প্রতিটি ইঞ্চি পরিমাণ স্থানও রক্ষা করা। সে জন্য প্রবল প্রতিরোধে শক্তি গড়ে তোলা যেন কোন শক্তিই- সে যত বড় শক্তিশালী এবং সৈন্যবল ও অস্ত্রবলে যত বলীয়ানই হোক-দেশের প্রতি চোখ তুলে তাকাবারও সাহস না পায়। এক কথায় বৈদেশিক আক্রমণের থেকে দেশকে ও দেশের জনগণ ও তাদের মাল-সম্পদ, জান-প্রাণ ও মান-ইযযত রক্ষা করা এবং এজন্য প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জন ও সামর্থ্য সংগ্রহ করা;
৬. ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করা। অবশ্য প্রথমে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দান ও জিযিয়ার বিনিময়ে বশ্যতা স্বীকারের প্রস্তাব পেশের পর সবশেষ উপায় হিসেবে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ইসলামী শরীয়াতের এটাই স্থায়ী বিধান;
৭. কর, খাজনা ও অন্যান্য সরকারী পাওনা সঠিকরূপে আদায় করার ব্যবস্থা করা। তা শরীয়াতের স্থায়ী নীতি অনুযায়ী হতে হবে এবং এ ব্যাপারে কোনরূপ নির্দয়তার প্রশ্রয় দেয়া চলবে না;
৮. বায়তুলমাল সংরক্ষণ। তা থেকে যাকে যা দেয়ার তার পরিমাণ নির্ধারণ ও যথাযথ দিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা, তাতে বাড়াবাড়ি না করা, অপচয় না করা, আর পাওনা পরিমাণেও হ্রাস-বৃদ্ধি না করা, যথাসময়ে দিয়ে দেয়া-বিলম্ব না করা;
৯. দায়িত্বশীল কর্মচারী নিয়োগ করা, তাদের কাজের সুযোগ করে দেয়া, তাদের নিকট থেকে কাজ বুঝে নেয়া-তাদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা;
১০. সমস্ত জাতীয় ও সামষ্টিক ব্যাপারে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হওয়া, পরিস্থিতি অধ্যয়ন, পর্যবেক্ষণ ও তদানুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ, যেমন সার্বিকভাবে গোটা উম্মত রক্ষা পায় এবং মিল্লাত সংরক্ষিত থাকে।
আল্লামা আল-গারা তাঁর 'আল-আহকামুস্ সুলতানীয়া' গ্রন্থের ১১ পৃষ্ঠায় এবং আল্লামা মাওয়ার্দী তাঁর 'আল-আহকামুস্-সুলতানীয়া' গ্রন্থের ১৫ পৃষ্ঠায় এই কথাগুলি উদ্ধৃত করেছেন। আমি মনে করি, মনীষীগণ এর কোন একটি কথাও কল্পনা করে লিখেন নি; বরং কুরআন মজীদের আয়াত থেকেই তা নিঃসৃত। এ পর্যায়ের দু'টি আয়াত আমি এখানে উদ্ধৃত করছিঃ
وَعَدَ اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ - وَلَيُمْكِنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبْدِلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنَا - يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ( النور : ٥٥)
তোমাদের মধ্য থেকে যারাই ঈমান আনবে ও ঈমান অনুযায়ী নেক আমল করবে, তাদের জন্য আল্লাহ্ ওয়াদা করেছেন যে, তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে খলীফা-রাষ্ট্র পরিচালক-বানাবেন যেমন করে তাদের পূর্ববর্তীদের তিনি খলীফা বানিয়েছিলেন এবং যেন তাদের জন্য তাঁর পছন্দ করা দ্বীনকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তাদের ভয়-ভীতি-আশঙ্কার পর পূর্ণ নির্ভীকতা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারেন। এই লোকেরা কেবলমাত্র আল্লাহরই দাসত্ব করবে, তাঁর সাথে একবিন্দু জিনিসকেও শরীক করবে না।
এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হচ্ছে যে, আল্লাহর খিলাফত-ইসলামী রাষ্ট্রের মৌল উদ্দেশ্যই হচ্ছে দ্বীন ইসলামকে সুদৃঢ়ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা, দ্বীনকে পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত করা, দ্বীনের মান-মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং সেখানকার জনগণের জীবনকে সকল প্রকারের ভয়-ভীতি ও বিপদ আশঙ্কা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে স্বাধীন নির্বিঘ্ন জীবন যাপনের নির্ভরযোগ্য সুযোগ করে দেয়া। বস্তুত দুনিয়ার প্রত্যেক দেশের আপামর জনগণের তা-ই তো কাম্য এবং তা সবকিছুই পূর্ণ মাত্রায় বাস্তবায়িত হতে পারে কেবলমাত্র ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। আর এ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানই এইসব কাজ করার জন্য প্রধান দায়িত্বশীল।
আর দ্বিতীয় আয়াতঃ
وَاعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمْ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ (انفাল : ৬০ )
এবং তোমরা শত্রুপক্ষের মুকাবিলা করার লক্ষ্যে যথাসাধ্য শক্তি ও যানবাহন সংগ্রহ ও প্রস্তুত কর। তদ্দ্বারা তোমরা আল্লাহর দুশমনদের ভীত-সন্ত্রস্ত করবে-তোমাদের নিজেদের শত্রুদেরও। এদের ছাড়া আরও অনেক শত্রু আছে যাদের তোমরা জান না, আল্লাহ্ তাদের জানেন।
উভয় আয়াতে বলা কথা ও কাজ যদিও সামষ্টিকভাবে মুসলিম উম্মতের জন্য, কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানই যেহেতু মুসলিম উম্মতের প্রতিনিধি, সকলের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল, তাই রাষ্ট্রপ্রধানকেই এ কাজসমূহ করতে হবে।
কুরআনের ঘোষণা হলো
فَمَنِ اعْتَدَى عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُوا عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَى عَلَيْكُمْ (البقره: ١٩٤)
রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ
انما جعل الراعى عضد اللضعفاء وحجاز للاقوياء ليدفعو القوى عن الظلم ويعينوا الضعيف على الحق كتاب النبي صلعم الى الولاة . (منهاج الصالحين: ۷۲۱)
'ইমাম' রাষ্ট্রপ্রধান সম্পর্কে রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ
إِنَّمَا الْإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتِلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيَتَّقِي بِهِ (مسلم)
রাষ্ট্রপ্রধান মিথ্যাবাদী বা কাফির হলে তার আনুগত্য করা যাবে না।
কুরআনের নির্দেশঃ
فَلَا تُطِعِ الْمُكَذِّبِينَ وَدُّوا لَوْ تُدْهِنُ فَيُدْهِنُونَ (القلم: ٨-٩)
وَلَا تُطِعِ الْكَفَّرِينَ وَالْمُنْفِقِينَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا (الاحزاب)
وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا ...... وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا (الكهف: ٢٨)