📄 পদপ্রার্থী খিয়ানতকারী
কেননা রাষ্ট্রপ্রধান সমগ্র জনগণের সামষ্টিক কাজের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল, জাতীয় ধন-সম্পদের উপর কর্তৃত্ব চালানোর অধিকারী। কোন লোককে এই পদে অধিষ্ঠিত হতে হলে তা শুধু তার পক্ষেই সম্ভব, যার প্রতি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আস্থা ও বিশ্বাস থাকবে। আসলে এটা শাসক ও শাসিত-আমানতদার ও আমানত অর্পণকারীদের মধ্যকার একটি চুক্তির ব্যাপার। এ চুক্তি উভয় পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছা, আগ্রহ ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই সম্পাদিত হতে পারে। যার প্রতি পূর্বাহ্নে এই ইচ্ছা, আগ্রহ ও আস্থা পাওয়া যায়নি বা জানা যায়নি, আছে বলে প্রকাশ হয়নি, তার কোন অধিকার থাকতে পারে না একমাত্র নিজের ইচ্ছায় এই পদ দখল করে বসার। এ জন্যই রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ
إِنَّ إِخْوَانَكُمْ عِنْدَنَا مَنْ طَلَبَهُ .
তোমাদের মধ্য থেকে যে লোক এই দায়িত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার জন্য নিজ থেকে আগ্রহী হবে-পেতে চাইবে, চেষ্টা করবে, সে আমাদের মতে তোমাদের মধ্যকার সবচেয়ে খিয়ানতকারী ব্যক্তি।
এর অর্থ, প্রথমত সে এই পদ চেয়েই খিয়ানতকারীর অপরাধে অপরাধী হয়েছে। আর দ্বিতীয়, সে যেভাবে স্ব-ইচ্ছায়-স্বচেষ্টায় এই পদ দখল করেছে, তাতে সে এই বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ আমানতের হক্ আদায় করতে, রাষ্ট্র পরিচালন ও জাতীয় অর্থ-সম্পদ ব্যয়-ব্যবহারে জনগণের বিশ্বাস রক্ষা করতে সক্ষম হবে না। সে জাতীয় শক্তি ও সম্পদে বিশ্বাস ভঙ্গের কাজ করবেই। তার নিজস্বভাবে প্রার্থী হওয়াই তার অকাট্য প্রমাণ। স্পষ্ট মনে হচ্ছে, সে এ পদের কঠিন ও গুরুদায়িত্বের কথা অনুভবই করতে পারেনি। সে এটাকে নেহাত ছেলে-খেলা মনে করেছে। অতএব খলীফা-রাষ্ট্রপ্রধান নিযুক্তিতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত রায়ই হতে হবে প্রধান অবলম্বন।
আর এই জনমতের ভিত্তিতে যখন একজন নির্বাচিত হচ্ছে, জনগণ তার নেতৃত্বাধীন প্রতিবাদহীন জীবন যাপন করছে, তখন জোরপূর্বক তাকে পদচ্যুত করে যে লোক ক্ষমতা কেড়ে নেয় একমাত্র নিজস্ব পরিকল্পনার ভিত্তিতে, ইসলামের দৃষ্টিতে সে ডাকাত, পরস্বাপহরণকারী, ছিনতাইকারী, ক্ষমতা লোভী, নিকৃষ্টতম ব্যক্তি। এরূপ অবস্থার প্রেক্ষিতে মুসলিম জনগণের কর্তব্যের কথা রাসূলে করীম (স) বলেছেন এ ভাষায়ঃ
مَنْ أَتَاكُمْ وَأَمْرُكُمْ جَمِيعٌ عَلَى رَجُلٍ وَاحِدٍ يُرِيدُ أَنْ يَشِقَ عَصَاكُمْ أَوْ يُفْرِقَ جَمَاعَتَكُمْ فَاقْتُلُوهُ -
তোমরা যখন কোন ব্যক্তির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ, তখন যদি কেউ তোমাদের নিকট সেই নেতৃত্ব দখল করার উদ্দেশ্যে আসে এবং সে তোমাদের শক্তিকে প্রতিহত করতে চায় ও তোমাদের ঐক্যবদ্ধ সমাজকে ছিন্ন ভিন্ন করতে সচেষ্ট হয়, তাহলে তোমরা তাকে হত্যা কর।
মুসলিম জাহানের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্বান ও জ্ঞানী (the greatest among the men of learning in the world of Islam) ইবনে সীনা (৯৮০-১০৩৭) লিখেছেনঃ
The legislature must then decree in his law that if someone seccedes and lays claim to the Caliphate by virtue of power or wealth. Then it becomes the duty of every citizen to fight and kill him. If the citizens are incapable of doing so. then they disobey God and commit an act of unbelief
(Ibn Sena, Healing Metaphysics in Learner and Mahdi op cit pp 104-105 and The political Economy of the Islamic State p-18-19)
বস্তুত ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান-মুসলিম উম্মতের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার যোগ্য কেবলমাত্র সেই ব্যক্তি, যার মনোভাব হবে প্রথম নির্বাচিত খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (র)-এর মনোভাবের মত। রাসূলে করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর তিনি খলীফা নির্বাচিত হয়ে যে ভাষণসমূহ দিয়েছিলেন, তন্মধ্যে একটি ভাষণে তিনি তা অকপটে ব্যক্ত করেছিলেন। বলেছিলেনঃ
يَاتِهَا النَّاسُ إِنْ كُنْتُمْ ظَنَنْتُمْ أَنِّي أَخَذْتُ خِلَافَتَكُمْ رَغْبَةٌ فِيهَا أَوَإِرَادَةً اسْتِنْثَارًا عَلَيْكُمْ وَعَلَى المُسْلِمِينَ فَلَا وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا أَخَذْتُهَا رَغْبَةً فِيهَا وَلَا اسْتِنْشَارًا عَلَيْكُمْ وَلَا عَلَى أَحَدٍ مِّنَ الْمُسْلِمِينَ وَلَا حَرَصْتُ عَلَيْهَا يَوْمًا وَلَا لَيْلَةٌ قَطُّ وَلَا سَأَلْتُ اللهَ سِرًّا وَلَا عَلَانِيَةٌ وَلَقَدْ تَقَلَّدْتُ أَمْرًا عَظِيمًا لَا طَاقَةَ لِي بِهِ إِلَّا أَنْ يُعِينَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ الله وَلَوَدَدْتُ أَنَّهَا إِلى أَي أَصْحَابِ رَسُولِ اللهِ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى أَنْ يَعْدِلَ فِيهَا فَهِيَ إِلَيْكُمْ رَدُّ وَلَا بَيْعَةَ لَكُمْ عِنْدِي فَادْفَعُوا لِمَنْ تُحِبُّونَهُ فَإِنَّمَا أَنَا رَجُلٍ مِّنْكُمْ (الاسلام - سعيد حوی ج ۲، ص ۱۲۹)
হে জনগণ! তোমরা যদি ধারণা করে থাক যে, আমি নিজ আগ্রহের ভিত্তিতে তোমাদের এই খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি, অথবা ইচ্ছা করে, নিজেকে তোমাদের ও অন্যান্য সব মুসলমানদের উপর প্রাধান্য প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, তাহলে মনে রাখবে, এ কথা কিছুমাত্র সত্য নয়। যাঁর হাতে আমার প্রাণ-জীবন, সেই আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি তা নিজ আগ্রহে গ্রহণ করিনি, নিজেকে তোমাদের বা কোন একজন মুসলমানের তুলনায় বড় মনে করে-বড় করে তোলার উদ্দেশ্যে তা গ্রহণ করিনি। আমি কখনই তা পাওয়ার লোভ করিনি-না কোন দিনে, না রাতে। এজন্য আল্লাহর নিকটও কখনও প্রার্থনা করিনি, না গোপনে, না প্রকাশ্যে। আসলে একটা অনেক বড় বোঝা বহনের জন্য আমাকে বাধ্য করা হচ্ছে। যা বহন করার কোন সাধ্যই আমার নেই। তবে একমাত্র ভরসা আল্লাহ যদি সাহায্য করেন। আমি বরং মনে মনে কামনা করছি, এ দায়িত্ব রাসূলে করীম (স)-এর অপর কোন সাহাবীর উপর অর্পিত হোক, তিনি এ কাজে ন্যায়পরতা অবলম্বন করবেন। তাহলে এই খিলাফত তোমাদের নিকটই ফেরত যাবে, তখন আমার হাতে করা এই বায়'আত তোমাদের উপর বাধ্যতাপূর্ণ থাকবে না। তোমরা তা তখন তোমাদের পছন্দ করা কোন লোকের উপর অর্পণ করবে। আর আমি তোমাদের মধ্যেরই একজন সাধারণ মানুষ হয়েই থাকব।
তিনি রাসূলে করীম (স)-এর মিম্বারের উপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেনঃ
هَلْ مِنْ كَارِهِ فَأَقِيلُهُ - ثَلَاثًا يَقُولُ ذَلِكَ
তোমাদের মধ্যে আমার খিলাফত অপছন্দ করে এমন কেউ আছে কি? ...... থাকলে আমি তার সাথে কথা বলে তা দূর করতে চেষ্টা করব।
পর পর তিনবার এই কথাটি বললেন।
তখন হযরত আলী (রা)-ও দাঁড়িয়ে বললেনঃ
لا وَاللَّهِ أَنْقِبْلُكَ وَلَا نَسْتَقِيلُكَ مَنْ ذَالَّذِي يُؤَخِّرُكَ وَقَدْ قَدَّمَكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ (الاسلام - سعيد حوی ج ۲ ص ۱۲۱)
না, আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমরা আপনাকে এ দায়িত্ব থেকে সরে যেতে দেব না, কাউকে তা করতেও দেব না। স্বয়ং রাসূলে করীম (স)-ই আপনাকে অগ্রবর্তী করেছেন। আপনাকে পেছনে ফেলতে পারে এমন কে কোথায় আছে?
📄 মুসলিম জনগণ রাষ্ট্র প্রধান নির্বাচন করবে
বস্তুত এ-ই হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগের মৌলিক দর্শন। মুসলিম জনগণই তাকে নিজেদের সন্তুষ্টি ও স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছা-উদ্যোগের ভিত্তিতে নিয়োগ করবে। এ ছাড়া কারোর রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার বা নিয়োগের অপর কোন পন্থা থাকতে পারে না। এই পন্থা ছাড়া অপর কোন ভাবে-উপায়ে বা পন্থায় রাষ্ট্রপ্রধানের পদে আসীন হওয়ার কোন অধিকারই কারোর থাকতে পার না। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিম উম্মতের কার্য সম্পাদনের স্থায়ী-নীতি হিসেবে ঘোষণা করেছেনঃ
وامرهم شورى بينهم (الشورى: (۳৮)
মুসলিম জনগণের সামষ্টিক ব্যাপারাদি পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতেই সম্পন্ন হয়ে থাকে।
আয়াতটির তাৎপর্য হচ্ছে, মুসলিম জনগণের জাতীয় ও সামষ্টিক কোন কাজ-ই কোন এক ব্যক্তির ইচ্ছানুযায়ী সম্পন্ন হয় না। কোন এক ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা ও কল্পনার ভিত্তিতে কোন নীতি-আদর্শ, পন্থা বা দফা-যা-ই নির্ধারণ করুক, তা মুসলিম জনগণ মানতে বাধ্য নয়। কেননা তারা তো সেই লোক, যারা রাব্বুল আলামীনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁরই অধীনতা মেনে নিয়েছে। আর সেই আল্লাহরই অধীনতা-আনুগত্য স্বীকার করে তারা সালাত কায়েম করে (আয়াতটির প্রথম অংশ)। কাজেই আল্লাহ যেসব সামষ্টিক ব্যাপারে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কোন বিধান দেন নি, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ও দায়িত্ব আল্লাহ্ নিজেই তাদের উপর অর্পণ করেছেন- সে সব ব্যাপারে মুসলিম জনগণ পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, যাতে মুসলিম জনগণের সুচিন্তিত ও স্বতঃস্ফূর্ত মতের প্রতিফলন ঘটবে। আর তাদের রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ যে তাদের সামষ্টিক কার্যাবলীর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, তাতে কারোরই একবিন্দু সন্দেহ থাকতে পারে না। অতএব সে কাজ জনমতের ভিত্তিতেই সুসম্পন্ন হতে হবে।
রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনে জনমতের অংশ গ্রহণ কুরআনী বিধান অনুযায়ী অপরিহার্য। স্বৈরতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক পার্থক্যের এ একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই কারণে নবী করীম (স) ঘোষণা করেছেনঃ
مَنْ بَايَعَ أَمِيرًا عَنْ غَيْرِ مَشْوَرَةِ الْمُسْلِمِينَ فَلَا بَيْعَةً لَهُ وَلَا الَّذِي بَايَعَهُ (مسند احمد )
মুসলিম জনগণের সাথে পরামর্শ না করে-তাদের মত জেনে না নিয়ে কেউ কাউকে নেতা হিসেবে বায়'আত করলে বা মেনে নিলে তা আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়।
কিন্তু বাস্তবে তা কিভাবে সম্ভব হতে পারে?..... এ প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, একটি দেশের পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ-নারী-সকল নাগরিকই হবে ভোটদাতা। সারাটি দেশ হবে একটি মাত্র নির্বাচনী এলাকা (Constituency)। নির্দিষ্ট দিনে প্রত্যেক ভোটদাতা নিজ ইচ্ছা ও পছন্দমত কাজের গুরুত্ব ও দায়িত্বের বিরাটত্বের দিকে লক্ষ্য রেখে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করার তীব্র অনুভূতি সহকারে - ভোট প্রদান করবে। কেউ প্রার্থী নেই, কোন ক্যানভাসার নেই। ভোটের জন্য কারোর প্রলোভন বা ভয়-ভীতির সম্মুখীন হতে হবে না কোন ভোটদাতাকে! এর ফলে সারা দেশে যার পক্ষে সর্বাধিক ভোট পড়বে, সে-ই রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হলো বলে ঘোষিত হবে।
কোন দেশে বিশেষ অবস্থার কারণে এইরূপ হওয়া সম্ভব মনে না করা হলে প্রথমে জাতীয় সংসদের পার্লামেন্টের নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্য নির্বাচিত করে তাদের ভোটে দুই বা ততোধিক নামের একটা প্যানেল তৈরী করা যেতে পারে এবং তারই মধ্য থেকে কোন একজনকে ভোট দেয়ার অবাধ সুযোগ সর্বসাধারণ ভোট দাতাদের দেয়া যেতে পারে। এ ভাবে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনেও জনমতের প্রতিফলন হবে বলে তাকে ইসলামসম্মত মনে করায় কোনই অসুবিধা থাকতে পারে না। বিশেষ করে যখন তা ইসলামের সুস্পষ্ট মানদন্ডের ভিত্তিতে এবং আল্লাহর নিকট জবাবদিহির অনুভূতি সহকারে ইসলামের সীমার মধ্যে থেকে করা হবে।
📄 রাষ্ট্রপ্রধানের অভিষেক, ক্ষমতা-ইখতিয়ার ও অধিকার
ইসলামে আনুগত্য স্বীকারের প্রতীক স্বরূপ হাতে হাত দিয়ে বায়'আত গ্রহণের রীতি প্রথম দিন থেকেই কার্যকর হয়ে এসেছে। স্বয়ং রাসূলে করীম (স)ই এই পদ্ধতি চালু করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বায়'আত অনুষ্ঠিত হয় মক্কায়। হিজরতের পূর্বে মদীনার কতিপয় আনসার দ্বীন-ইসলাম কবুল করলে এই বায়'আত অনুষ্ঠিত হয়। তা 'বায়'আতে আকাবা' বা আকাবা'র বায়'আত নামে পরিচিত। মিনা অঞ্চলের একটি নির্জন পর্বত গুহায় গভীর রাতে একান্ত গোপনে এ কাজটি করা হয়। সে বায়'আত হয়েছিল আনন্দ-খুশী দুর্বলতা-অবসন্নতা অভাব-অনটন ও সচ্ছলতা-উভয় প্রকারের অবস্থায়ই রাসূলে করীমের আনুগত্য করার এবং দ্বীনের জন্য অর্থ ব্যয় করা, ভালো কাজের আদেশ করা ও মন্দ কাজ না করা-করতে নিষেধ করা এবং আল্লাহর-আল্লাহর দ্বীন রক্ষা ও প্রচার-প্রতিষ্ঠায় সকল প্রকারের ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে যাওয়ার উপর। আনসারগণ প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ দায়িত্বের বোঝা নিজেদের স্বন্ধে গ্রহণ করেছিলেন।
রাসূলে করীম (স.)-কে দ্বীন-প্রতিষ্ঠার কঠিন সংগ্রামে সাহায্য সহযোগিতা করা এবং নিজেদের ও আপন স্ত্রী-পরিজনের ন্যায় তাঁকেও রক্ষণাবেক্ষণ করার এ বায়'আত-ই ইসলামে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের প্রথম ভিত্তি রচনা করেছিল। অতঃপর খুলাফায়ে রাশেদুনের ক্ষেত্রে এই বায়'আতকে পুরাপুরি ব্যবহার করা হয়েছে। এ বায়'আতের পরই রাষ্ট্রপ্রধান তার দায়িত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত হয়েছে এবং জনগণের জন্য তাঁর আনুগত্য করা সর্বাধিক কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রীয় আনুগত্য স্বীকারের জন্য হাতে হাত দিয়ে এই বায়'আত করা একটি সুন্নত হিসেবে গণ্য হলেও তা কোন্ চিরন্তন আদর্শ বা পদ্ধতি রূপে অনুসৃত হবে, শরীয়াতের দৃষ্টিতে তার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। আধুনিক কালে ব্যালটের মাধ্যমেও এ বায়'আতের কাজ সুসম্পন্ন হতে পারে এবং সর্বাধিক সংখ্যক ভোটপ্রাপ্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রপ্রধান নিযুক্ত হতে পারে।
পূর্বে যেমন বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব দ্বিবিধঃ ইসলাম কায়েম ও কার্যকর করা এবং দ্বিতীয় সমস্ত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ইসলামের আদর্শ ও রীতি-নীতি অনুযায়ী আঞ্জাম দেয়া। অবশ্য রাষ্ট্রপ্রধানকে শু'রার পরামর্শ গ্রহণ এবং মজলিসে শু'রার সিদ্ধান্তসমূহের মধ্যে থেকেই কাজ করতে হবে। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা ওহী গ্রহণকারী স্বয়ং নবী করীম (স)-কে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন।
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ (ال عمران: ১৫৯)
এবং হে নবী! তুমি তাদের সঙ্গে (মুসলিম জনগণের সঙ্গে) যাবতীয় সামষ্টিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে পরামর্শ কর।
বস্তুত ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা একটি পরামর্শভিত্তিক বিধান। লোকদের সাথে পরামর্শ করে তারপরই রাষ্ট্রীয় কাজ আঞ্জাম দেয়া যেতে পারে। এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (স)-এর ঘোষণা অবশ্যই স্মরণীয়ঃ
وَامْرُكُمْ شُورَى بَيْنَكُمْ فَظَهُرُ الْأَرْضِ خَيْرٌ لَكُم مِّنْ بَطْنِهِ (ترمذی)
তোমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যাপারাদি পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হলে তোমাদের জীবন মৃত্যুর তুলনায় শ্রেয়।
রাসূলে করীম (স)-এর প্রতি এই নির্দেশ যে আয়াতটিতে দেয়া হয়েছে, তার শুরুতে বলা হয়েছেঃ তুমি আল্লাহ্র রহমতে অত্যন্ত নরম দিল। তুমি যদি রুঢ়-কর্কশ পাষাণ-হৃদয় হতে তাহলে লোকেরা তোমার চারপাশ থেকে সরে যেত। অতএব তুমি তাদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন কর এবং তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা কর। অতঃপর বলা হয়েছেঃ আর জাতীয়-সামষ্টিক ব্যাপারাদিতে তাদের সাথে পরামর্শ কর। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে-সমাজের লোকদের সাথে সামষ্টিকভাবে পরামর্শ করা ইসলামী সমাজের একটা বিশেষ বিশেষত্ব। এ বিশেষত্ব না থাকলে ইসলামী সমাজ হতে পারে না। অতএব ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধানকে পরামর্শ করতে হবে, জনমত জানতে হবে এবং সম্মুখবর্তী সামষ্টিক ব্যাপারে জনগণ নির্বাচিত মজলিসে শু'রা যে বিষয়ে যে পরামর্শ দেবে, রাষ্ট্রপ্রধান তা অগ্রাহ্য করতে পারবে না।
এই পর্যায়ে দু'টি মত স্পষ্ট। আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছেঃ
فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ .
তুমি যখন কোন কাজ করার সংকল্প গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহর উপর পূর্ণ নির্ভরতা গ্রহণ করে সে কাজটি করে ফেল।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংকল্প করা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ কি পরামর্শ গ্রহণ বা শু'রার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তিতে হবে কিংবা শু'রার সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ মাত্র না করেই সিদ্ধান্ত বা সংকল্প গ্রহণের অধিকার রাষ্ট্র প্রধানের রয়েছে?
কিছু সংখ্যক মনীষীর মত-শু'রার সিদ্ধান্ত ছাড়াও রাষ্ট্রপ্রধানের নিজস্ব বিচার-বিবেচনা ও কল্যাণ চিন্তার ভিত্তিতে একান্ত নিজস্বভাবে সংকল্প ও পদক্ষেপ গ্রহণের অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধান শু'রার পরামর্শ বা সিদ্ধান্তের অধীন নয় এবং সে তা মেনে নিতে একান্তভাবে বাধ্যও নয়। এমন নয় যে, শু'রার সিদ্ধান্তের সামান্য বিরুদ্ধতা করারও তার ইখতিয়ার থাকবে না। সে পরামর্শ নেবে; কিন্তু প্রকৃত সিদ্ধান্ত ও সংকল্প গ্রহণের অধিকার রাষ্ট্রপ্রধানের এবং তার এটা কর্তব্যও।
কিন্তু এ মতের একটি মারাত্মক দিক হচ্ছে, এরূপ ইখতিয়ার ও অধিকার থাকলে রাষ্ট্রপ্রধানের স্বৈরতান্ত্রিক ভূমিকা অবলম্বন অনিবার্য পরিণতি কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র-দর্শনে এই ভূমিকা অবলম্বনের কোন অবকাশ নেই।
তাই অন্যান্য মনীষীদের মত হচ্ছে, চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও কার্যত পদক্ষেপ গ্রহণ রাষ্ট্রপ্রধানেরই কাজ এবং দায়িত্ব। তবে তাকে তা করতে হবে মজলিসে শু'রার পরামর্শ ও সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে, তা বাদ দিয়ে বা এড়িয়ে গিয়ে নয়। (فتح القدير للشوكاني)
📄 ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কর্তব্য
ইসলামী রাষ্ট্র রাষ্ট্রের সমস্ত জনগণের উপর কর্তৃত্ব বিস্তার করে। জনগণের বৈষয়িক জীবনকে সুষ্ঠুরূপে পরিচালনার এবং তাদের পরকালীন জীবনে মুক্তি ও সাফল্যের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব হিসেবে দু'টি কথার উল্লেখ করেছেন। একটি হচ্ছে, দ্বীন-ইসলামকে পূর্ণরূপে কার্যকর ও সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা। ইসলামের আইন বিধান যথাযথভাবে কার্যকর করা। আর দ্বিতীয় হচ্ছে, ইসলামের রীতি-নীতি অনুযায়ী গোটা রাষ্ট্রকে পরিচালিত করা। এক কথায় বলা যায় দ্বীন-ইসলামকে বাস্তবায়িত করাই রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ কারণে ফিকাহবিদগণ ইসলামী রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিয়েছেন এই ভাষায়ঃ
إِنَّهَا رِبَاسَةً عَامَةً فِي أُمُورِ الدِّينِ وَالدُّنْيَا نِيَابَةٌ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
ইসলামী রাষ্ট্র হচ্ছে দ্বীন ও দুনিয়ার যাবতীয় ব্যাপারের দিকে সাধারণ নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব।
আর রাষ্ট্রপ্রধানের পরিচিতিস্বরূপ বলা হয়েছেঃ
أَنهَا خِلَافَةُ الرَّسُولِ فِي إِقَامَةِ الدِّينِ وَحِفْظِ حَوْرَةِ الْمِلَّةِ بِحَيْثُ يَجِبُ اتِّبَاعُهُ عَلَى كَافَةِ الْأُمَّةِ (المواقف ص ٢٠٣، المسامره ج ٢ ص ١٤١)
দ্বীন কায়েম করা ও মুসলিম মিল্লাতের আদর্শ ও মান রক্ষা করার কাজে রাসূলের প্রতিনিধিত্ব করা-এ কারনেই তার অনুসরণ করা সমগ্র উম্মতের কর্তব্য।
আল্লামা মাওয়ার্দী ইসলামী রাষ্ট্রের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেনঃ
إِنَّهَا مَوْضُوعَةُ الْخِلَافَةِ النُّبُوَّةِ فِي حَرَاسَةِ الدِّينِ وَسِيَاسَةِ الدُّنْيَا (الاحكام السلطانيه ص ৩)
দ্বীনের পাহারাদারী, সংরক্ষণ ও দুনিয়ার সুষ্ঠু পরিচালনে নবুয়্যাতের প্রতিনিধিত্ব করার উদ্দেশ্যেই তা প্রতিষ্ঠিত।
আর আল্লামা ইবনে খালদুন সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেনঃ
إِنَّهَا حَمْلُ الْكَافَّةِ عَلَى مُقْتَضَى النَّظْرِ الشَّرْعِي فِي مَصَالِحِهِمُ الْأَخْرُويَّةِ وَالدُّنْيَوِيَّةِ الرَّجِعَةِ إِلَيْهَا إِذْ أَحْوَالُ الدُّنْيَا تَرْجِعُ كُلُّهَا عِنْدَ الشَّارِعِ إِلَى اعْتِبَارِهَا بِمَصَالِحَ الْآخِرَةِ فِهِيَ فِي الْحَقِيقَةِ خِلَافَةٌ عَنْ صَاحِبِ الشَّرْعِ فِي حَرَاسَةِ الدِّينِ وَسِيَاسَةِ الدنيا به مقدمه ابن خلدون ص (۱۸۰)
জনগণের পরকালীন ও বৈষয়িক কল্যাণ-যার পরিণতি সেই পরকাল-শরীয়াতের দাবি অনুযায়ী-সাধনের সর্বাত্মক দায়িত্ব গ্রহণ। কেননা শরীয়াত দাতার দৃষ্টিতে দুনিয়ার সমস্ত অবস্থা প্রকৃত পক্ষেই পরকালের কল্যাণের দৃষ্টিতে সম্পন্ন হতে হবে। তাই তা হচ্ছে দ্বীনের সংরক্ষণ ও দ্বীনের সাহায্যে বিশ্বব্যবস্থা সংগঠন ও পরিচালনে শরীয়াতদাতার প্রতিনিধিত্ব।
ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য যেমন বিরাট তেমনি মহান। তাই দুইটি কারণে রাষ্ট্রপ্রধান তার এই পদের অযোগ্য প্রমাণিত হয়।
একটি তার ব্যক্তিগত সততা-বিশ্বস্ততা ক্ষুন্ন হওয়া। আর দ্বিতীয়টি, তার দৈহিক বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগত ত্রুটি ও অক্ষমতা।
ব্যক্তিগত সততা ও বিশ্বস্ততা ক্ষুন্ন হওয়ার অর্থ রাষ্ট্রপ্রধানের 'ফাসিক'-শরীয়াতের সীমালংঘনকারী প্রমাণিত হওয়া। এর দু'টি দিক। একটি লালসা-কামনা চরিতার্থ করা। আর দ্বিতীয়টির সম্পর্ক তার ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয়ের উদ্রেক।
প্রথমটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গজনিত ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট। আর তা হচ্ছে তার কোন হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া, শরীয়াতে ঘৃণিত-নিষিদ্ধ কাজে জড়িত হয়ে পড়া। যৌন-লালসার দ্বারা চালিত হয়ে কোন জঘন্য কাজ করা। যেমন যিনা-ব্যভিচার, মদ্যপান, সীমাতিরিক্ত ক্রোধ। এ চরিত্রগত দোষ থাকলে তার পক্ষে ইসলামী রাষ্টের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রপ্রধান নিযুক্ত হওয়ার পর এই ধরনের অপরাধ করলে সে যেমন নিজেকে উক্ত পদের সম্পূর্ণ অযোগ্য প্রমাণ করে, তেমনি সেই উচ্চতর পদটিরও করে চরম অপমান।
দ্বিতীয় প্রকারের সীমালংঘনমূলক কাজের সম্পর্ক আকীদা-বিশ্বাসের সাথে। আকীদা-বিশ্বাসে 'ফিস্ক' দেখা দিলে তা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা শরীয়াত লংঘনের মতই অপরাধ। অতঃপর সে রাষ্ট্রপ্রধান পদে নিযুক্ত থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলে। কেননা আকীদায় 'ফিস্ক' দেখা দিলে তা কুফর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া অসম্ভব নয়।
এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হচ্ছে হযরত উবাদাতা ইবনুস্ সামিত (রা) বর্ণিত একটি হাদীস। তিনি বলেছেনঃ
بَايَعْنَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ فِي مَنْشَطَنَا وَمَكْرَهَنَا وَعُسْرِنَا وَيُسْرِنَا وَآثَرَةِ عَلَيْنَا وَأَنْ لا نُنَازِعَ الْأَمْرَ أَهْلَهُ إِلَّا أَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاكَّنَا عِندَكُمْ فِيهِ مِنَ اللَّهِ بُرْهَانَ (الاسلام - سعيد حوى ج ٢ ص ١٥٣)
আমরা রাসূলে করীম (স)-এর নিকট বায়'আত করেছি, আমাদের আনন্দ অসন্তুষ্টি, কঠিনতা বিপদ ও সুবিধা ও আমাদের স্বার্থ-সর্বাবস্থায়ই আমরা শুনব ও মানব-অনুগত থাকব। আর দায়িত্বশীলের সাথে কোন ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করব না। তবে এমন কুফরি যদি দেখতে পাই যা স্পষ্ট ও প্রকাশ্য-সর্বজনবিদিত এবং যা'র কুফর হওয়ার অকাট্য দলীল আল্লাহর নিকট থেকে থাকবে, তাহলে শুনা ও মানা-আনুগত্যের উক্ত শপথ কার্যকর নয়।
রাষ্ট্রপ্রধানের এ রূপ চারিত্রিক পতনের দরুন তাকে পদচ্যুত করা কিংবা তার আনুগত্য করতে অস্বীকার করার অধিকার মুসলিম জনগণের সংরক্ষিত বলে বহু ফিকহবিদ মত প্রকাশ করেছেন।
দৈহিক আঙ্গিক ত্রুটি ও অক্ষমতা পর্যায়ে ইন্দ্রিয়নিচয়ের অক্ষমতাও গণ্য। দায়িত্ব পালনে আঙ্গিক অসামর্থ্য বা পংগুত্ব এ পদের পথে মারাত্মক ধরনের বাধা। (ঐ)