📄 ঈমান
দ্বীন-ইসলামের প্রতি গভীর দৃঢ় ও পূর্ণাঙ্গ ঈমান হচ্ছে সর্বপ্রথম জরুরী গুণ। মহান আল্লাহ্ তা'আলা এই দ্বীন মানুষের সার্বিক জীবনের জন্য সর্বশেষ নবী-রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর মাধ্যমে নাযিল করেছেন। তা-ই হচ্ছে মানুষের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। ব্যক্তি-জীবন ও সামষ্টিক-রাষ্ট্রীয় জীবন-জীবনের ও রাষ্ট্রের সকল দিক ও বিভাগ এই বিধান অনুযায়ী গড়ে তুলতে হবে। আর রাষ্ট্রপ্রধানকে তার পূর্ণ শক্তি দিয়ে এই বিধানকে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব পালন করতে হবে। দ্বীন-ইসলামই সর্বোত্তম নির্ভুল, মানব জীবনের যাবতীয় সমস্যার একমাত্র সমাধানকারী ও সর্বাধিক কল্যাণ দানকারী বিধানরূপে ঐকান্তিক ঈমান থাকতে হবে। আর এক কথায় এক একক ও অনন্য আল্লাহ্র প্রতি ঈমান, আল্লাহর শরীয়াতের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস।
এই শর্তের কারণে কোন কাফির ব্যক্তি মুসলিম জনগণের নেতৃত্ব ও প্রশাসকত্ব লাভ করতে পারে না। বিবেক-বুদ্ধির দিক দিয়েও এই ঈমানের শর্ত হওয়া জরুরী বিবেচিত হবে। কেননা ইসলামী রাষ্ট্র একটি আদর্শবাদী-আদর্শভিত্তিক-আদর্শ অনুসারী রাষ্ট্র। যে লোক সে আদর্শের প্রতি বিশ্বাসী নয়, তার দ্বারা সে আদর্শের অনুসরণ ও বাস্তবায়ন কখনই সম্ভবপর হতে পারে না। এজন্য ইসলামী জীবন-বিধানের প্রতি যথার্থ বিশ্বাসী নয়- এমন কোন ব্যক্তির মুসলিম জনগণের শাসক হওয়ার যোগ্যতা নেই, অধিকারও নেই। তাই আল্লাহ্ তা'আলা ঘোষণা করেছেনঃ
وَلَنْ يَجْعَلَ اللَّهُ لِلْكَفِرِينَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ سَبِيلًا (النساء: ١٤١)
আল্লাহ্ তা'আলা মু'মিন লোকদের উপর কাফির লোকদের কর্তৃত্ব করার কোন পথ-ই রাখেন নি।
📄 রাষ্ট্রীয় দায়িত্বসমূহ উত্তমভাবে পালনের যোগ্যতা, প্রতিভা
প্রশাসনিক কর্তব্য ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা সূচারুরূপে পালনের জন্য তার স্বভাবগত যোগ্যতা একান্তই অপরিহার্য। নেতৃত্ব দান ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের জন্য মৌলিক শর্ত হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ মানের যোগ্যতা। কেননা মানুষের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় শাসকদের অযোগ্যতা ও অনুপযুক্ততা বিশ্ব জাতিসমূহের-বিশেষ করে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের-ক্ষেত্রে ব্যাপক ও মারাত্মক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে, জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়েছে চরম দুর্গতি ও দুর্ভোগ।
প্রশাসকের এই গুণ থাকার শর্তটির গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। তা প্রমাণের জন্য কোন দলীল পেশ করার প্রয়োজন পড়ে না। নেতৃত্ব স্বতঃই এ শর্তের অপরিহার্যতা প্রমাণ করে। রাসূলে করীম (স) নিজে এ শর্তের প্রয়োজনীয়তার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেনঃ
لَا تَصْلُحُ الْإِمَامَةُ إِلَّا لِرَجُلٍ فِيهِ ثَلَاثُ خِصَالٍ : ا . وَرُعٍ يُحْجِرُهُ عَنْ مَعَاصِي اللهِ ۲ . وَحِلْم يملِكَ بِهِ غَضَبَهُ . وَحُسْنُ الْوِلَايَةِ عَلَى مَنْ بَلِى حَتَّى يَكُونَ كَالْوَلَدِ ( وفى رواية كالاب
সামাজিক-রাজনৈতিক নেতৃত্ব দান কেবল মাত্র পুরুষদের পক্ষেই সম্ভব। তার জন্যও তিনটি শর্ত রয়েছেঃ এমন সততা-ন্যায়পরতা-আল্লাহ্ পরস্তি যা তাকে আল্লাহর নাফরমানীর কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং ধৈর্যস্থৈর্য, যেন তদ্দ্বারা সে স্বীয় ক্রোধ দমন করতে পারে। যাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করবে তাদের উপর উত্তম নেতৃত্ব দান, যেন তারা সবাই তার সন্তান-তুল্য হয়ে যায়।
ইসলাম তো এই শর্তও করেছে যে, প্রশাসককে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অন্যদের তুলনায় অধিক যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে।
হযরত আলী (রা) বলেছেনঃ লোকদের উপর নেতৃত্ব দানের অধিক অধিকারী হবে সেই ব্যক্তি, যে তাদের সকলের তুলনায় অধিক দৃঢ় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ও অধিক শক্তিশালী হবে। আল্লাহর বিধান সম্পর্কে অন্যদের অপেক্ষা অধিক জ্ঞানী ও বিদ্বান, কেউ গণ্ডগোল করলে তাকে অভিযুক্ত করবে, তাতে দমিত না হলে তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যক্রম গ্রহণ করবে। ১
টিকাঃ
১. نهج البلاغة - الخطبة ۱۷۲
📄 রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দূরদৃষ্টি ও বুদ্ধিমত্তায় সর্বাগ্রসর
নিছক প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা ও উত্তম নেতৃত্বের গুণাবলীই ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্বের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দূরদৃষ্টি ও বুদ্ধিমত্তায় নেতাকে অন্যান্য সকলের তুলনায় অনেক বেশী অগ্রসর হতে হবে। তাহলেই তার পক্ষে জনগণের প্রকৃত কল্যাণ সম্পর্কে অধিক বেশী জ্ঞানী হয়ে কাজ করা সম্ভব হবে। মানুষের অভাব-অনটন ও প্রয়োজন সম্পর্কে বেশী অবহিতি লাভ তার পক্ষে সহজ হবে। ফলে কোন জাতীয় বিষয়ে তার মত ভুল হবে না, কোন সিদ্ধান্ত ভ্রান্তিপূর্ণ হবে না। তার কোন বিষয়ে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেকখানি কম থাকবে। আর ইসলামী সমাজ তখন অতীব উন্নতমানের নেতৃত্ব পেয়ে অধিকতর ধন্য হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারবে।
এই সব কারণে মুসলিম উম্মতের সর্বোচ্চ প্রশাসন সম্পর্কে একথা নির্দিষ্ট হয়ে আছে যে, তার সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অতীব উন্নতমানের হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাহলেই তার পক্ষে মুসলিম উম্মতকে সঠিক ও নির্ভুল নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব হবে এবং কালের অগ্রগতির সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষা করে জনগণকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাওয়া সহজতর হবে।
এজন্য তাকে সাম্প্রতিককালের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অবস্থা ও উত্থান পতন পর্যায়ে উচ্চতর মনের অধিকারী হতে হবে। তাহলেই তার পক্ষে নিজ জাতিকে আন্তর্জাতিক ঘাত প্রতিঘাতের ক্ষতি থেকে রক্ষা করা সম্ভবপর হবে। কেমনা বর্তমান দুনিয়ায় যে কোন সময়ের প্রেক্ষিতে কোন দেশ বা সমাজই অন্য নিরপেক্ষ হয়ে থাকতে পারে না। চতুর্দিকের 'সার্বিক অবস্থার দিকে লক্ষ্য রেখেই প্রত্যেকটি জাতি-জনগোষ্ঠীকে নিজস্ব লক্ষ্য' পথে চলতে হয়। আজানা-অচেনা পথে চলা যেমন মারাত্মক পরিণতি নিয়ে আসতে পারে, তেমনি সেই চলায় গতিশীলতার সৃষ্টি করা কখনই সম্ভব হয় না। আর রাষ্ট্র পরিচালনা বাস্তবিকই কোন ছেলেখেলা নয়, নয় হাস্য যৌতুকের ব্যাপার। না জেনে না বুঝে না দেখে চলতে গেলে রূঢ় বাস্তবতার কঠিন আঘাতে গোটা জাতির চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া কখনই আশংকামুক্ত হতে পারে না।
📄 ন্যায়পরতা, নিরপেক্ষতা ও সুবিচার
রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির পর, সর্বোচ্চ রাষ্ট্রনেতাকে অপর যে গুণে অধিক গুণান্বিত হতে হবে, তা হচ্ছে সুবিচার, ন্যায়পরতা ও নিরপেক্ষতার গুণ। অরণ্য সর্বপ্রকার গুনাহ ও নাফরমানী থেকে তো তাকে দূরে থাকতেই হবে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সুবিচার ও ন্যায়পরতা উচ্চতার মহত্তর ভেগের অধিকারী না হলে কারী পক্ষে স্বীয় দায়িত্ব, পূর্ণ, সততার সাথে পালন করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি, জনগণের সত্যিকার অর্থে কোন কল্যাণ সাধনও অসম্ভব। বস্তুত সুবিচার ন্যায় পরতা এক মানুসিক অবস্থা বিশেষ। তা রাক্তিকে সর্বপ্রকারের, গুনাহ থেকে যেমন দূরে রাখে, তেমনি জাতীয় পর্যায়ের কার্যাবলীতে খিয়ানত বিশ্বাসঘাতকতা, মিথ্যা-প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ ও জুলুম-শোষণ-নির্যাতনমূলক কার্যক্রম থেকেও যুক্ত ও পবিত্র থাকতে উদ্বুদ্ধ করে।
অতএব কোন ফাসিক আল্লাহর বিধান লংঘনকারী ব্যক্তিকে মুসলিষ্ঠ উম্মতের সর্বোচ্চ শুধু সর্বোচ্চ ময় কোন পর্যায়ের শাসকরূপে নিয়োগ করী 'ইসলামের মানব কল্যাণমূলক আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহ তা'আলা যে জালিম লোকদের প্রতি ঝুঁকে পড়তে আনুগত্য স্বীকার করতে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করেছেন, তা এই কারণে। তিনি আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেনঃ
وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا (الكهف: ۲۸)
যে লোকের দিল আল্লাহর স্মরণশূন্য-আল্লাহর আনুগত্যমূলক ভাবধারাহীন-এবং স্বীয় বন্ধন-নিয়ন্ত্রণহীন কামনা-বাসনার অনুসারী, আর এ কারণে যার কাজকর্ম বাড়াবাড়িপূর্ণ তুমি তার অনুসরণ কখনই করবে না।
এরূপ চরিত্রের লোকদের আনুগত্য-অধীনতা-অনুসরণ যে চরম গুমরাহীর কারণ, তাতেও কোন সন্দেহ নেই। কিয়ামতের দিন এরূপ লোকদের অনুসরণকারীরা আল্লাহর নিকট যে ফরিয়াদ করবে, তার উল্লেখ করে কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ
وَقَالُوا رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَا عَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلَا (الاحزاب: ٦٧)
দ্বীন-ইসলাম অমান্যকারী-কাফির- লোকেরা (কিয়ামতের দিন) বলবেঃ হে আমাদের পরওয়ারদিগার! আমরা তো দুনিয়ায় আমাদের সরদার, নেতা ও আমাদের অপেক্ষা বড় লোকদেরই আনুগত্য করে চলেছি। ফলে তারা আমাদেরকে (তোমার আনুগত্যের) পথ থেকে গুমরাহ্ করে নিয়েছে।
সাধারণভাবে সমাজে যেসব লোক কর্তা, নেতা ও মাতব্বর-সরদার হয়ে থাকে, নির্বিচারে ও অন্ধভাবে তাদের আনুগত্য স্বীকার করাই এই গুমরাহীর মূলীভূত কারণ।
তারা বলবেঃ তা না করে আমরা যদি সর্বাবস্থায় কেবল আল্লাহ ও রাসূলেরই আনুগত্য করতাম, তাহলে আজকে-কিয়ামতের দিন-জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে ও তথায় চিরদিন অবস্থানের ঘোষণা শুনতে বাধ্য হতাম না।
يَقُولُونَ بَلَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولَا (الاحزاب: ٦٦)
তারা বলবেঃ হায়, আমরা যদি আল্লাহ্র আনুগত্য করতাম, আনুগত্য করতাম রাসূলের!
কিন্তু আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি শুধু গুমরাহ সরদার-মাতব্বর-নেতৃস্থানীয় ও বড় বড় লোকদের আনুগত্য স্বীকার করার কারণে। কিয়ামতের দিন তারা তাদের দুনিয়ার নেতাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়বে এবং আল্লাহর নিকট নিজেদের এই মর্মান্তিক পরিণতির জন্য তাদের অনুসৃত এই নেতাদের বিরুদ্ধে ফরিয়াদ করে বলবেঃ
رَبَّنَا آتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنَا كَبِيرًا (الاحزاب: ٦٨)
হে পরওয়ারদিগার! তুমি ওদেরকে দ্বিগুণ আযাব দাও এবং ওদের উপর বড় ধরনের আভশাপ বর্ষণ কর।
এসব আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে একথা সুস্পষ্ট ও অকাট্য যে, ফাসিক-ফাজির-আল্লাহদ্রোহী-আল্লাহর নাফরমান পাপী-পথভ্রষ্ট লোকদের-তারা সামাজিকতার দিক দিয়ে যত বড় প্রভাবশালী ও ধনশালীই হোক-নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব মুসলিম উম্মতের কখনই মেনে নেয়া উচিত নয়। তাদের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে বা থাকলে তা সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করা মুসলিম উম্মতের দ্বীনী ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।
মোটকথা, আল্লাহ্ ভয়ে ভীত নয়, তাঁর শরীয়াতের অনুগত নয়- এমন কোন ব্যক্তির নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব মুসলিম উম্মতের কখনই মেনে নেয়া ও বরদাশত করা উচিত নয়।
মুসলিম জনগণের নেতা এমন ব্যক্তি কখনই হতে পারে না যেঃ
১. কৃপণ-কেননা সে তো তার যাবতীয় ধন-সম্পদ পেটুকের মত খেয়ে শেষ করবে।
২. মূর্খ-কেননা সে তার মূর্খতার দ্বারা সমস্ত মানুষকে গুমরাহ করবে।
৩. নির্দয়-অত্যাচারী-কেননা সে তার নির্দয়তা ও অত্যাচারে জনগণকে জর্জরিত ও অতিষ্ঠ করে তুলবে।
৪. অন্য রাষ্ট্রের ভিন্নতর আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট-কেননা এরূপ ব্যক্তি কোন সমাজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা লাভ করলে সে সমাজের স্বাধীনতা বিদেশী শক্তির নিকট বিক্রয় করে দেবে। স্বাধীন জাতিকে পরাধীন বানিয়ে দেবে।
৫. ঘুষখোর-দূর্নীতিপরায়ণ-এরূপ চরিত্রের লোক শাসক-প্রশাসক হলে সে বিচার কার্যে ও দেশ শাসনে জনগণের অধিকার ন্যায়সঙ্গতভাবে আদায় করতে পারবে না। আল্লাহ্ নির্ধারিত সীমাসমূহ যথাযথভাবে রক্ষা করতে পারবে না।
৬. রাসূলের সুন্নাতকে অমান্য-উপেক্ষাকারী-কেননা এরূপ ব্যক্তি জনগণকে কখনই কল্যাণের দিকে নিয়ে যেতে পারবে না।
এই কারণে মুসলিম উম্মতের নেতা ও প্রশাসককে অবশ্যই আত্ম-সংযমশীল, ইসলামী শিক্ষায় পূর্ণ শিক্ষিত এবং পূর্ণ মাত্রায় ইসলামী চরিত্রে চরিত্রবান হতে হবে। ইসলামের বিধান কার্যত অনুসরণকারী ও বাস্তবভাবে প্রবর্তনকারী হতে হবে। নবী করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ
يَوْمَ وَاحِدٌ مِنْ سُلْطَانٍ عَادِلٍ خَيْرٌ مِنْ مَطَرٍ أَرْبَعِينَ يَوْمًا وَحَدٌ يُقَامُ فِي الْأَرْضِ أَزْكَى مِنْ عِبَادَةِ سَنَةٍ (المستدرك للحاكم ج ٣ ص ٢١٦)
সুবিচারক ন্যায়বাদী শাসকের অধীন একটি দিন চল্লিশ দিনের বৃষ্টিপাতের কল্যাণের চেয়েও অধিক উত্তম এবং পৃথিবীতে আল্লাহ্ নির্ধারিত একটি শাস্তি কার্যকর হওয়া এক বছরের নফল ইবাদতের তুলনায় অধিক পরিশুদ্ধতা সৃষ্টিকারী।
তিনি আরও বলেছেনঃ
أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ يَوْمَ الْقِيمَةِ وَأَدْنَاهُمْ مِنْهُ مَجْلِسًا إِمَامٌ عَادِلٌ وَأَبْغَضُ النَّاسِ لِلَّهِ وَابْعَدُهُمْ مِنْهُ مَجْلِسًا إِمَامُ جَائِرٌ (جامع الاصول ج: ٤ ص ٥٥ أخرجه الترمذي)
কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় ও আসন গ্রহণের দিক দিয়ে তাঁর সর্বাধিক নিকটবর্তী ব্যক্তি হবে সুবিচারক নেতা ও শাসক এবং সেদিন আল্লাহ্র নিকট সর্বাধিক ঘৃণ্য ও আসন গ্রহণের দিক দিয়ে অধিক দূরবর্তী হবে অন্যায়কারী-অত্যাচারী নেতা বা শাসক।
তাঁর এই হাদীসটিও স্মরণীয়ঃ
إِنَّ الْمُقْسِطِينَ عِنْدَ اللهِ عَلَى مَنَابِرٍ مِنْ نُورٍ عَنْ يَمِينِ الرَّحْمٰنِ وَكِلْتَا بَدَيْهِ بَيْنَ الَّذِينَ يَعْدِلُونَ فِي حُكْمِهِمْ وَأَهْلِهِمْ وَمَا وَلُوا (جامع الاصول ج ٤ ص ٥٣ اخرجه مسلم)
কিয়ামতের দিন সুবিচারকারী ন্যায়বাদী শাসকরা আল্লাহ্ রহমানের ডান দিকে নূর-এর উচ্চাসনে আসীন হবে-আল্লহ্র দুটি দিক-ই ডান-তারা সেই লোক, যারা তাদের শাসন কার্যে ও বিচার-আচারে তাদের জনগণ ও বন্ধুদের মধ্যে ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত করবে।
এই শেষোক্ত হাদীসটি যদিও বিচারকার্য সম্পর্কীয়, তবু তা সাধারণ অর্থে দেশ শাসন ও নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। কেননা এই কাজটি বিচার বিভাগীয় কাজের মূল হোতা এবং অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। কেননা রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ দায়িত্ব যে ধরনের লোকের হাতে থাকবে, তার প্রশাসনের অধীন বিচার বিভাগীয় কার্যও সেই ধরনেরই হবে, তা নিঃসন্দেহে-ই বলা যায়। এই কারণে সর্বোচ্চ প্রশাসকের মধ্যে এই গুণ সর্বাধিক মাত্রায় থাকা সবকিছুর তুলনায় অনেক বেশী প্রয়োজন।
নামাযের ইমামতির ক্ষেত্রেও এই ন্যায়পরতা ও সুবিচারের শর্ত আরোপ করা হয়েছে, অথচ নামায ইসলামী জীবন-বিধানের একটি কাজ মাত্র- যদিও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ-নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমিত। তাই গোটা ইসলামী দেশের বিপুল সংখ্যক মুসলিম জনগণের সর্বোচ্চ শাসককে সবচেয়ে বেশী ন্যায়বাদী, নিরপেক্ষ, সুবিচারক ও ইসলামী আদর্শের অবিচল অনুসারী হওয়া সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কেননা গোটা উম্মতের জীবন-মরণের মূল চাবি-কাঠি তার হাতেই নিবদ্ধ।