📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 ইসলামে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের গুরুত্ব

📄 ইসলামে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের গুরুত্ব


মুসলিম উম্মতের জীবনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ও বিপদজ্জনক ব্যাপারাদিতে সুষ্ঠু সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপরই জনগণের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য একান্তভাবে নির্ভর করে। এই কারণে ইসলামের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের ব্যাপারটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও ফয়সালাকারী বিষয়। তাই মুসলিম সমাজকে তাদের সামষ্টিক দায়িত্ব সুষ্ঠুরূপে পালনের জন্য একজন শাসক-প্রশাসক নিযুক্ত করা একান্তই কর্তব্য। এই উদ্দেশ্যে প্রত্যেক মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর একজন 'ইমাম' বা রাষ্ট্রনায়ক নিযুক্ত করা শরীয়াত ও সাহাবায়ে কিরামের আমল 'ওয়াজিব' (ফরয) প্রমাণ করেছে। রাসূলে করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর সর্বপ্রথম কাজ হিসেবে সাহাবায়ে কিরাম (রা) হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-কে খলীফা নির্বাচিত করে এই কাজের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছে।

এই কারণে মুসলিম উম্মার ইতিহাসে এমন কোন সময় বা যুগ অতিবাহিত হয়নি, যখন তাদের ইমাম বা সর্বোচ্চ শাসক কেউ ছিল না। আল্লামা জুরজানী এই প্রেক্ষিতেই দাবি করেছেনঃ
إِنَّ نَصْبَ الْإِمَامِ مِنْ أَتمَّ مَصَالِحِ الْمُسْلِمِينَ وَاعْظَمِ مَقَاصِدِ الَّدِينِ .
'ইমাম' বা রাষ্ট্রনায়ক নিয়োগ মুসলমানদের কল্যাণ সাধনের পূর্ণতম ব্যবস্থা এবং দ্বীন-ইসলামের সর্বোচ্চ লক্ষ্যের সর্বাধিক মাত্রার বাস্তবায়ন।

আল্লামা নসফী আহলিস্-সুন্নাত-ওয়াল-জামায়াতের আকীদা হিসেবে লিখেছেনঃ
وَالْمُسْلِمِينَ لَا بُدَّلَهُمْ مِّنْ إِمَامٍ يَقُومُ بِتَنْفِيذِ أَحْكَامِهِمْ وَاقَامَةِ حُدُودِهِمْ وَسَدِّتُغُورِهِمْ وَتَجْهِزِ جُيُوشِهِمْ وَأَخْذَ صَدَقَاتِهِمْ وَقَهْرِ الْمُتَغَلِبَةِ وَالْمُتَلَصِّصَةِ وَقُطَّاعِ الطَّرِيقِ وَاقَامَةِ الجمع وَالْأَعْيَادِ وَقَطْعِ الْمُنَازِعَاتِ الْوَاقِعَةِ بَيْنَ الْعِبَادِ وَقُبُولِ الشَّهَادَةِ الْقَائِمَةِ عَلَى الْحُقُوقِ وَتَزْوِيجِ الصَّغَارِ وَالصَّغَائِرِ الَّذِينَ لَا أَوْلِيَاءَ لَهُمْ وَقِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَنَحْوَذَ لِكَ مِنَ الْأَبْوَابِ الَّتِي لَيْسَتْ إِلَّا لِلْاِمَامِ وَلِجَمَاعَةِ الْمُسْلِمِينَ
মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য একজন ইমাম-রাষ্ট্রনায়ক-অবশ্যই থাকতে হবে থাকা অপরিহার্য। সে আইন-কানুনসমূহ কার্যকর করবে, শরীয়াত-নির্দিষ্ট শাস্তিসমূহ জারি করবে, বিপদ-আপদের সকল দিক বন্ধ করবে, সেনাবাহিনীকে সুসজ্জিত ও সদা-প্রস্তুত করে রাখবে শত্রুর আগ্রাসন বন্ধের লক্ষ্যে। লোকদের নিকট থেকে যাকাত-সাদাকাত ইত্যাদি গ্রহণ ও বন্টন করবে, বিদ্রোহী দুষ্কৃতিকারী, চোর-ঘুষখোর ও ডাকাত-ছিনতাইকারীদের কঠিন শাসনে দমন করবে। জুম’আ ও ঈদের নামাযসমূহ কায়েম ও তাতে ইমামতি করবে; লোকদের অধিকার প্রয়াণের জন্য সাক্ষ্য গ্রহণ করবে (বিচার বিভাগ চালু করবে)। অভিভাৱকহীন দুর্বল অক্ষম বালক-বালিকাদের বিবাহের ব্যৱস্থা করবে, জাতীয় সম্পদ জনগণের মধ্যে বন্টন করবে। আর এই ধরনের বহু কাজই সে আঞ্জাম দেবে, যা কোন ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে আঞ্জাম দিতে পারে না।

ইমাম-রাষ্ট্রপ্রধানদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের এই তালিকাই স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে, মুসলিম উম্মতের সুষ্ঠু জীবনের জন্য যেমন রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন একজন ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধানের। অন্যথায় এই জরুরী কার্যসমূহ কখনই আঞ্জাম পেতে পারে না। আর এই গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী আঞ্জাম দেয়ার জন্য নিযুক্ত রাষ্ট্রপ্রধান সেই ব্যক্তিই হতে পারে, যার মধ্যে জরুরী গুণাবলী পুরামাত্রায় অবশ্যই বর্তমান থাকবে। রাষ্ট্রপ্রধানের সেই গুণাবলী থাকা রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার জন্য জরুরী শর্ত। সেই শর্তানুরূপ গুণাবলী সম্পন্ন রাষ্ট্রপ্রধান না হলে জাতীয় নেতৃত্ব সম্পূর্ণ রূপে বিপথগামী হওয়া, ইনসাফ ও ন্যায়পরতার সরল সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া অনিবার্য হয়ে দাঁড়াবে। আর তারই পরিণতি গোটা উম্মতের চরম গুমরাহী, ব্যাপক অকল্যাণ ও মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হওয়া অবধারিত হয়ে পড়বে। তখন রাষ্ট্রনেতা গোটা উম্মতের চরম গুমরাহীর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং কিয়ামতের দিন মুসলিম উম্মত এই ধরণের রাষ্ট্রনেতাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ্‌র নিকট অভিযোগ করবে এই বলেঃ
رَبَّنَا هُوَلَا أَضَلُّونَا فَالِهِمْ عَذَابًا ضِعْفًا مِنَ النَّارِ (الاعراف: ৩৮)
হে পরওয়ারদিগার, এই লোকেরাই আমাদেরকে দ্বীন-ইসলাম থেকে গুমরাহ করেছিল। অতএব তুমি এদেরকে জাহান্নামের দ্বিগুণ আযাবে নিক্ষেপ কর।

বলবেঃ
رَبَّنَا أَنِهِمْ ضَعُفَينَ مِنَ الْعَذَابِ ربنا أنا أطعنا سادَتَنَا وَكُبَراءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلا رَبَّنَا أنهم ضعفين من والمعينهم لعنا كبيرا الاحزاب
হে আমাদের রব্ব আমরা আমাদের সরদার বড় বড় নেতাদের অনুসরণ করেছিলাম। ফলে এক্স আমাদেরকে আসল পথ থেকে বিভ্রান্ত করেছে।হে আমাদের রব্ব। তুমি আজ ওদেরকে দ্বিগুণ আযাক দাও। আর ওদের উপর বড় রকমের অভিশাপ বর্ষণ কর।

দুটি আয়াত দুইটি ভিন্ন ভিন্ন সূরা ও ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতের হলেও মূল বক্তব্য অভিন্ন। আর তা হচ্ছে গুমরাহ, নেতৃত্বের মারাত্মক কুফল। রাষ্ট্রনেতা যদি ইসলামী আদর্শবাদী, ও ইসলামের বাস্তর অনুসারী না হয়। তা যদি হয় ইসলাম বিরোধী মতাদর্শে বিশ্বাসী ও ইসলাম পরিপন্থী চরিত্রে ভূষিত, তাহলে তার অধীনে ইসলামী ও চরিত্রবান জীবন-যাপন করা কখনই সম্ভবপর হতে পারে না। তার পরিণতি হচ্ছে অধীনস্থ জনগণের চরম গুমরাহী ও পথভ্রষ্টতা। এর কুফল যে সর্বগ্রাসী ও মারাত্মক, তার বড় প্রমাণ, এই নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আল্লাহর প্রতি ঈমানদার লোকেরা কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকট প্রচণ্ড অভিযোগ পেশ করবো বলবে, হে আল্লাহ! আমরা তো তোমার বিধান অনুযায়ী জীবন-যাপন করতে প্রস্তুত ছিলাম; কিন্তু এই নেতা বা নেতারা আমাদের, তার সুযোগই দেয়নি, ওরা আমাদেরকে গুমরাহ করেছে, ভিন্নতর পথে চলতে বাধ্য করেছে।

জরুরী গুণাবলী
এই কারণে কুরআনের দৃষ্টিতে সকল পর্যায়ের নেতৃত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআন যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা পেশ করেছে, তাতে বিশেষভাবে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের জন্য কতগুলি জরুরী গুণের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। সেই গুণসমূহ যার মধ্যে পাওয়া যাবে, ইসলামী রাষ্ট্রের নেতা বা প্রধান তাকেই বানানো যেতে পারে।

টিকাঃ
১. الاسلام السعيد حوی ج ۲، ص ۱۲۷: شرح عقائد النسفي مع ترجمه اردو ص: ۳৩৮، طبع امدادیه ঢাকা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00