📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 নবী করীম (স)-এর পরবর্তী মুসলিম জীবন

📄 নবী করীম (স)-এর পরবর্তী মুসলিম জীবন


নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কিরাম-মুসলিম সমাজ-একটি নতুন সরকার-সংস্থা গড়ে তোলার অপরিহার্য প্রয়োজনের কথা তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন। কেননা নবী করীম (স) জীবদ্দশায় মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, প্রশাসক ছিলেন, আইনের মাধ্যম ছিলেন, প্রধান বিচারপতি ছিলেন, আদর্শিক নেতা ও পরিচালক ছিলেন। তিনি ইন্তেকাল করলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত একটি সংস্থা ও ব্যক্তিত্ব ছাড়া মুসলিম জনগণের জীবন চলতেই পারে না। তাই অনতিবিলম্বেই- এমনকি রাসূলে করীম (স) এর কাফন-দাফনেরও পূর্বে এ কাজ করার প্রয়োজনীয়তা সকলেই বুঝতে পেরেছিলেন বলেই একত্রিত হয়ে নিজেদের মধ্য থেকে একজন প্রশাসক, প্রশাসন-পরিচালন-সংরক্ষণ ইত্যাদি যাবতীয় কাজের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব দানকারী একজন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সর্ববাদীসম্মতভাবেই হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)-কে মুসলমানদের প্রথম খলীফা নির্বাচিত করেছিলেন।

সাহাবায়ে কিরাম (রা) এর এই কর্ম পদ্ধতিতে একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে রাসূলে করীম (স)-এর কাফন-দাফনের চাইতেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামো ও ব্যবস্থাকে কার্যকর করা。

নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কিরাম-মুসলিম সমাজ-একটি নতুন সরকার-সংস্থা গড়ে তোলার অপরিহার্য প্রয়োজনের কথা তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন। কেননা নবী করীম (স) জীবদ্দশায় মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, প্রশাসক ছিলেন, আইনের মাধ্যম ছিলেন, প্রধান বিচারপতি ছিলেন, আদর্শিক নেতা ও পরিচালক ছিলেন। তিনি ইন্তেকাল করলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত একটি সংস্থা ও ব্যক্তিত্ব ছাড়া মুসলিম জনগণের জীবন চলতেই পারে না। তাই অনতিবিলম্বেই- এমনকি রাসূলে করীম (স) এর কাফন-দাফনেরও পূর্বে এ কাজ করার প্রয়োজনীয়তা সকলেই বুঝতে পেরেছিলেন বলেই একত্রিত হয়ে নিজেদের মধ্য থেকে একজন প্রশাসক, প্রশাসন-পরিচালন-সংরক্ষণ ইত্যাদি যাবতীয় কাজের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব দানকারী একজন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সর্ববাদীসম্মতভাবেই হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)-কে মুসলমানদের প্রথম খলীফা নির্বাচিত করেছিলেন।

সাহাবায়ে কিরাম (রা) এর এই কর্ম পদ্ধতিতে একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে রাসূলে করীম (স)-এর কাফন-দাফনের চাইতেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামো ও ব্যবস্থাকে কার্যকর করা。

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 জনগণ তাদের ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল (আল্লাহর খলীফা ও আমানতদার হিসাবে)

📄 জনগণ তাদের ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল (আল্লাহর খলীফা ও আমানতদার হিসাবে)


ইসলামী ফিক্হ'র একটি মৌল-নীতি হচ্ছে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজস্ব ধন- মালের জন্য দায়িত্বশীল। বস্তুত মানুষ যখন তার ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল, তখন অনিবার্যভাবে তার নিজের জন্যও দায়িত্বশীল হবে। তাইলে কোন ধন-মালের উপর তার মালিকের অনুমতি ছাড়া কোনরূপ হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকারই অন্য কারোর থাকতে পারে নয়। আর অন্য কেউ যদি কারোর ধন-মালের উপর কর্তৃত্ব করতে না-ই পারে তাহলে কারোর জীবন, সম্ভ্রম ও ব্যক্তিত্বের উপর অন্য লোকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার কোন অধিকার যে দিতে পারে না; তা আরও বলিষ্ঠভাবে বলা যায়। কোন লোক কারোর স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে না; কারোর অনুমতি ব্যতীত তার শক্তি-সামর্থ্য ও মান-মর্যাদার উপর কেউ কোনরূপ হস্তক্ষেপ করবে কেউ নিজের মর্জী চালাবে, তা কোন ক্রমেই জায়েয হতে পারে না। কেননা এ হচ্ছে মানুষ সম্পর্কে একদিকের কথা।

আর অপর দিকের কথা হচ্ছে, কোনরূপ সামাজিক-সামষ্টিক সংস্থা বা প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হলে অন্য লোকদের স্বভাব ও শরীয়াতসম্মত অধিকার, আযাদীও ধন-মালের উপর হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি করা একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

এ দুটি কাজ পরস্পর বিরোধী। অথচ এই পরস্পর কাজ দুটি একত্রিত করা না গেলে কোন সমাজিক-সামষ্টিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা কখনই এবং কোনক্রমেই সম্ভব হতে পারে না। আর এই উদ্দেশ্যেই সরকার তথ্য প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তুলতে হয়। এই প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলার কাজটি সম্পন্ন হবে জনগণের ধন-মালের ও স্বাধীনতার উপর তাদেরই অনুমতিক্রমে হস্তক্ষেপ করার মাধ্যমে। আর সে হস্তক্ষেপের জন্য, প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়া যেতে পারে প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পন্ন ব্যক্তির নির্বাচনে জনগণের ভোটদানের মাধ্যমে। এই ভোটদান কার্যত প্রমাণ করছে যে, সে তার ধন-মাল ও স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করার সুযোগ অন্য কাউকে দেয়ার এই পন্থা ও নীতিকে পূর্ণভাবে সমর্থন করে এবং সে একজনকে ভোট দিয়ে তার পক্ষে সেই কাজ করার জন্য অনুমতি প্রদান করছে।

আরও স্পষ্ট কথায় বললে বলতে হয়, মানব সমাজে যে প্রশাসন ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠিত করা হবে, তাতে অবশ্যই জনগণের ধন-মাল ও চিন্তা-বিশ্বাসের উপর একটা কর্তৃত্ব অবশ্যই চালাতে হয়। সে ব্যবস্থায় শুধু বিভিন্ন প্রকারের 'কর আদায় করা ও আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রণ করাই একমাত্র কাজ হয়ে নাফসিসে সবের উপর মানা রূপ বাধ্যবাধকতাও আরোপ করবে, তাতে তার স্বাধীনতাকে অনেকটা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত করা হবে, সম্পর্ক ভিন্নভাবে স্থাপন করা হবে, যুদ্ধের ময়দানে সেনাবাহিনী প্রেরণ করতে হবে এবং সাধারণ লোকদেরকে যুদ্ধ সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত করা হবে। এ ধরনের আরও যেসব কাজ জনগণের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচিত হবে, তা সবই করা হবে। এরূপ একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বিবেক-বুদ্ধি-বিবেচনা ও শরীয়াতের তাকীদ অনুযায়ী একান্তই কর্তব্য হয়ে পড়ে। আর সেজন্য একটি শক্তিসম্পন্ন সরকার ও প্রশাসনিক কাঠামো কায়েম করা ছাড়া অন্য কোন উপায়ই থাকতে পারে না। যদিও তা ইসলাম মানুষকে তার নিজের ও তার ধন-মালের উপর যে কর্তৃত্ব দিয়েছে, তার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। এই সাংঘর্ষিকতা বিদূরিত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে, জনগণকে আল্লাহ্ খলীফা ধরে নিয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের খিলাফতী-অধিকার স্বীকার করে জনগণের মর্জী ও সমর্থন-অনুমোদনের ভিত্তিতে এমন একটি প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা। এই সংস্থা যেসব কাজই করবে, তাতে জনগণের সমর্থন ও অনুমোদন আছে বলেই মনে করা যাবে এবং এভাবে তা সামষ্টিকভাবে আল্লাহর খিলাফতের বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করবে。

টিকাঃ
১. এই পর্যায়ে কোন কোন মহল রাসূলে করীম (স)-এর একটি কথা হিসেবে প্রচার করেঃ الناس مسلطون على الموالهم 'তার ধন-মালের উপর কর্তৃত্বশীল।' কিন্তু এর সনদ কিরূপ এবং সিহাহ সিত্তার কোন গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে কি না তা আমি নিশ্চিতভাবে ধরতে পারব না। গ্রন্থকার

ইসলামী ফিক্হ'র একটি মৌল-নীতি হচ্ছে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজস্ব ধন- মালের জন্য দায়িত্বশীল। বস্তুত মানুষ যখন তার ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল, তখন অনিবার্যভাবে তার নিজের জন্যও দায়িত্বশীল হবে। তাইলে কোন ধন-মালের উপর তার মালিকের অনুমতি ছাড়া কোনরূপ হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকারই অন্য কারোর থাকতে পারে নয়। আর অন্য কেউ যদি কারোর ধন-মালের উপর কর্তৃত্ব করতে না-ই পারে তাহলে কারোর জীবন, সম্ভ্রম ও ব্যক্তিত্বের উপর অন্য লোকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার কোন অধিকার যে দিতে পারে না; তা আরও বলিষ্ঠভাবে বলা যায়। কোন লোক কারোর স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে না; কারোর অনুমতি ব্যতীত তার শক্তি-সামর্থ্য ও মান-মর্যাদার উপর কেউ কোনরূপ হস্তক্ষেপ করবে কেউ নিজের মর্জী চালাবে, তা কোন ক্রমেই জায়েয হতে পারে না। কেননা এ হচ্ছে মানুষ সম্পর্কে একদিকের কথা।

আর অপর দিকের কথা হচ্ছে, কোনরূপ সামাজিক-সামষ্টিক সংস্থা বা প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হলে অন্য লোকদের স্বভাব ও শরীয়াতসম্মত অধিকার, আযাদীও ধন-মালের উপর হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি করা একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

এ দুটি কাজ পরস্পর বিরোধী। অথচ এই পরস্পর কাজ দুটি একত্রিত করা না গেলে কোন সমাজিক-সামষ্টিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা কখনই এবং কোনক্রমেই সম্ভব হতে পারে না। আর এই উদ্দেশ্যেই সরকার তথ্য প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তুলতে হয়। এই প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলার কাজটি সম্পন্ন হবে জনগণের ধন-মালের ও স্বাধীনতার উপর তাদেরই অনুমতিক্রমে হস্তক্ষেপ করার মাধ্যমে। আর সে হস্তক্ষেপের জন্য, প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়া যেতে পারে প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পন্ন ব্যক্তির নির্বাচনে জনগণের ভোটদানের মাধ্যমে। এই ভোটদান কার্যত প্রমাণ করছে যে, সে তার ধন-মাল ও স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করার সুযোগ অন্য কাউকে দেয়ার এই পন্থা ও নীতিকে পূর্ণভাবে সমর্থন করে এবং সে একজনকে ভোট দিয়ে তার পক্ষে সেই কাজ করার জন্য অনুমতি প্রদান করছে।

আরও স্পষ্ট কথায় বললে বলতে হয়, মানব সমাজে যে প্রশাসন ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠিত করা হবে, তাতে অবশ্যই জনগণের ধন-মাল ও চিন্তা-বিশ্বাসের উপর একটা কর্তৃত্ব অবশ্যই চালাতে হয়। সে ব্যবস্থায় শুধু বিভিন্ন প্রকারের 'কর আদায় করা ও আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রণ করাই একমাত্র কাজ হয়ে নাফসিসে সবের উপর মানা রূপ বাধ্যবাধকতাও আরোপ করবে, তাতে তার স্বাধীনতাকে অনেকটা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত করা হবে, সম্পর্ক ভিন্নভাবে স্থাপন করা হবে, যুদ্ধের ময়দানে সেনাবাহিনী প্রেরণ করতে হবে এবং সাধারণ লোকদেরকে যুদ্ধ সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত করা হবে। এ ধরনের আরও যেসব কাজ জনগণের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচিত হবে, তা সবই করা হবে। এরূপ একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বিবেক-বুদ্ধি-বিবেচনা ও শরীয়াতের তাকীদ অনুযায়ী একান্তই কর্তব্য হয়ে পড়ে। আর সেজন্য একটি শক্তিসম্পন্ন সরকার ও প্রশাসনিক কাঠামো কায়েম করা ছাড়া অন্য কোন উপায়ই থাকতে পারে না। যদিও তা ইসলাম মানুষকে তার নিজের ও তার ধন-মালের উপর যে কর্তৃত্ব দিয়েছে, তার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। এই সাংঘর্ষিকতা বিদূরিত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে, জনগণকে আল্লাহ্ খলীফা ধরে নিয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের খিলাফতী-অধিকার স্বীকার করে জনগণের মর্জী ও সমর্থন-অনুমোদনের ভিত্তিতে এমন একটি প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা। এই সংস্থা যেসব কাজই করবে, তাতে জনগণের সমর্থন ও অনুমোদন আছে বলেই মনে করা যাবে এবং এভাবে তা সামষ্টিকভাবে আল্লাহর খিলাফতের বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করবে。

টিকাঃ
১. এই পর্যায়ে কোন কোন মহল রাসূলে করীম (স)-এর একটি কথা হিসেবে প্রচার করেঃ الناس مسلطون على الموالهم 'তার ধন-মালের উপর কর্তৃত্বশীল।' কিন্তু এর সনদ কিরূপ এবং সিহাহ সিত্তার কোন গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে কি না তা আমি নিশ্চিতভাবে ধরতে পারব না। গ্রন্থকার

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 প্রশাসনিক ক্ষমতা—সার্বভৌমত্ব—প্রশাসকের নিকট আমানত

📄 প্রশাসনিক ক্ষমতা—সার্বভৌমত্ব—প্রশাসকের নিকট আমানত


পূর্বোদ্ধৃত বিস্তারিত আলোচনার প্রেক্ষিতে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, একটি সরকার গঠন ও সেজন্য সর্বোচ্চ প্রশাসক নির্বাচন জনগণের একটা সামষ্টিক অধিকার। জনগণই একজন সর্বোচ্চ প্রশাসক নিযুক্ত করবে নিজেদের মর্জীমত এবং যখন ইচ্ছা হবে তা সেই জনগণই তার নিকট থেকে কেড়ে নেবে। এই কথার তাৎপর্য হচ্ছে, প্রশাসনিক ক্ষমতা-প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব-সর্বোচ্চ প্রশাসকের দেয়া একটি আমানত। জনগণই এ আমানত তার নিকট রাখে কিন্তু সে আমানতের খিয়ানত করে প্রশাসন যদি জনগণের প্রতিই বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে সেই জনগণই তার নিকট থেকে এ আমানত কেড়ে নেবার অধিকার রাখে।

এই কথা কুরআন মজীদের কতিপয় আয়াত দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُوَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ - إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُمْ بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا (النساء: ٥٨)
নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তোমাদেরকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আমানত সমূহ-দায়িত্বপূর্ণ কাজের পদসমূহ-সে সবের যোগ্য লোকদেরকে দাও। আর (পারস্পরিক বিবাদ কালে) তোমরা যখন লোকদের মধ্যে ফয়সালা করবে, তখন (আল্লাহ্র আদেশ এই) যে, তোমরা অবশ্যই সুবিচার করবে। আল্লাহ্ তোমাদেরকে নিশ্চয়ই অতীব উত্তম নীতির কথা বলছেন। আর আল্লাহ্ বস্তুতই সর্বশ্রোতা, সর্বদর্শী।

তিনি আরও বলেছেনঃ
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ . خير وَاحْسَنُ تَأْوِيلًا (النساء: ٥٩)
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ্র, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যকার সামষ্টিক দায়িত্ব সম্পন্ন লোকদেরও। পরে তোমরা যদি কোন বিষয়ে পারস্পরিক মতবিরোধে লিপ্ত হও, তাহলে সে বিষয়টি আল্লাহ্ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। (কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে মীমাংসা করে নাও) যদি তোমরা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাক। জেনে রাখো, এই নীতিই সর্বোত্তম, সর্বাধিক কল্যাণময় এবং পরিণতির দিক দিয়ে অতীব ভালো।

বস্তুত প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের ব্যাপার। এটা গড়ে তোলার অধিকার ঈমানদার জনগণের নিকট পবিত্র আমানত। এ আমানত নিশ্চয়ই সেই লোকদের নিকট সমর্পণ করতে হবে যারা তা যথাযথভাবে পালন করবে ও আমানতের হক আদায় করার যোগ্যতার অধিকারী। যারা সে যোগ্যতার অধিকারী নয়, তাদের নিকট এ আমানত কখনই অর্পণ করা উচিত নয়। আর যোগ্য ও অধিকারী মনে করে আমানত অর্পণের পর তা যথাযথ আদায় করতে অযোগ্যতার—দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রমাণ দিলে জনগণই সে আমানত ফিরিয়ে নেবে।

ঈমানদার লোকেরা প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তুলবে, সংস্থার প্রধানের আনুগত্যও করবে। কিন্তু সে আনুগত্য কখনই শর্তহীন হবে না। নিঃশর্ত আনুগত্য করতে হবে শুধু আল্লাহ্র এবং আল্লাহ্র রাসূলের। তা ছাড়া অন্যদের আনুগত্য হবে এই শর্তে যে, ১. সে বা তারা নিজে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে চলবে। ২. তারা জনগণকে এমন কাজের আনুগত্য করার নির্দেশ দেবে যা করলে আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য হয়ে যায় এবং ৩. এমন কোন কাজের হুকুম দিবে না, যা করলে আল্লাহ্ ও রাসূলের নাফরমানী হয়।

প্রথমোল্লিখিত আয়াতে 'তোমাদেরকে আদেশ করেছেন' বলে প্রশাসকদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে। কেননা এরপরই 'তোমরা যখন লোকদের মধ্যে ফয়সালা করবে' বলে তাদের প্রতিই হুকুম জারি করা হয়েছে। কাজেই নিঃসন্দেহে বোঝা যায় যে, এখানে 'আমানত' বলে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বোঝানো হয়েছে। এর পরই আনুগত্যের আদেশ দেয়ায়ও সেই হুকুমাত-প্রশাসনিক কর্তৃত্বকেই নির্দেশ করা হয়েছে। কাজেই 'আমানত' বলতে হুকুমাত-তথা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।

দ্বিতীয়োক্ত আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, এই আমানতের আসল অধিকারী হচ্ছে ঈমানদার জনগণ। অতএব হুকুমাত বা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব সেই জনগণের নিকট থেকেই পেতে হবে। জনগণকে এ আমানত স্বীয় আল্লাহ্ তা'আলাই দিয়েছেন, যদিও সে হুকুমাত মূলত আল্লাহর। কেননা হুকুমাতের জন্য যে সার্বভৌমত্ব অপরিহার্য, তা আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই হতে পারে না মানুষের নিকট শুধু প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব আসে আল্লাহর নিকট থেকে। এ থেকে প্রমাণিত হল যে, সার্বভৌমত্ব দু'ধরনের। একটি প্রকৃত ও মৌলিক যা একান্তভাবে আল্লাহর। আর দ্বিতীয় অধীন, প্রদুক্ত অর্পিত ও এ দুটি সার্বভৌমত্ব ইসলামী হুকুমাতে একসাথে কাজ করে। এ দুটির মধ্যে কখনই বিরোধ বাঁধে না। কাজেই আমানতের ধারক হচ্ছে মুসলিম জনগণ। আর সেই আমানতের সার্বভৌমত্বের আসল মালিক হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা।

চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রা) তাঁর একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে বলেছিলেনঃ
তোমার কাজও কর্তৃত্ব তোমার জন্য কোন জারের খাদ্য নয়। বরং তা তোমার ঘাড়ের উপর একটি ভারী আমানত। তোমার উপরস্থের জন্য তুমি প্রহরার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি। তুমি এই প্রহরার কাজে কোনরূপ অন্যায় করতে পার না।

তিনি আরও বলেছেন
হে জনগণ! তোমাদের এই রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে কিছু করার অধিকার কেবল তারই হতে পারে যাকে তোমরা নিযুক্ত করবে। আর খলীফা হিসেবে আমার কোন ক্ষমতা নেই। আছে শুধু এই যে, তোমাদের যে মাল-সম্পদ আমার নিকট রয়েছে, তার চাবিগুলি আমার নিকট রক্ষিত।

হযরত আলী (রা)-র আর একটি উক্তিঃ
ইমাম রাষ্ট্রনায়কের অধিকার হচ্ছে এতটুকু মাত্র আল্লাহ নামির ইস্লামি বিধানের ভিত্তিতে প্রিয়ন কার্য চালাবে। সে যদি তা করে, তাহলে জনগণের উপর তাঁর এই অধিকার হবে। কে, তোমরিতার কথা শুনবে ও তার আনুগত্য করবে এবং তরম ভাংরাংশে ডাকে সাড়া দেবে।

এ আয়াতসমূহ এবং অন্যান্য উক্তি গভীরভাবে চিন্তা-বিবেচনা করলে নিঃসন্দেহে বুঝতে পারা যায়, শাসক-প্রশাসক নির্বাচন করা মুসলিম উম্মতের 'অধিকার' ও 'কর্তব্য'। অবশ্য তা করতে হবে শরীয়াতের স্থায়ী নিয়ম বিধান অনুযায়ী। অন্তত সরকার যে মুসলিম উম্মতের ইচ্ছা ও মর্জীর ভিত্তিতে গঠিত হতে হবে, তাতে আর কোনই সন্দেহ নেই।

তবে শাসক-প্রশাসক নির্বাচনের এ অধিকার পাশ্চাত্যের ধর্মহীন গণতান্ত্রিক পন্থার মত নিশ্চয়ই নয়, তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতি সম্পন্ন, ভিন্নতর লক্ষ্য সমৃদ্ধ। ইসলামে শাসক নির্বাচন করা হয় বিশেষ কতগুলি গুণের ভিত্তিতে, বিশেষ কতগুলি শর্তের অধীন। এগুলির উল্লেখ পরে করা হবে। কিন্তু পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এই ধরনের অবশ্য পালনীয় কোন শর্ত নেই, নেই বিশেষ কোন গুণের অধিকারী হওয়ার অনিবার্য শর্ত।

তাছাড়া পাশ্চাত্যের ধর্মহীন গণতান্ত্রিক পন্থায় শাসক জনগণের অধীন হয়ে থাকে। কল্যাণ ও সত্যের অনুসারী হতে হয় না। কেননা তথায় জনগণই ভোটের একমাত্র অধিকারী। তাই নির্বাচিত শাসককে সেই জনগণের অনুসরণ করে চলতে হয় সব সময়, অন্যথায় পরবর্তী নির্বাচনে তার নির্বাচিত হওয়ার আশা সুদূরপরাহত। তাই একবার নির্বাচিত হয়ে নির্ভেজাল ও সার্বিক কল্যাণের জন্য করা ও সর্বক্ষেত্রে প্রকৃত সত্যের অনুসরণের পরিবর্তে ন্যায়ভাবে হোক, কি অন্যায়ভাবে, ভোটদাতাদের সন্তুষ্ট করার কাজেই তাকে চব্বিশ ঘন্টা চিন্তিত ও ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকতে হয়।

এর ফলে তাকে জনগণের বিচিত্র ধরনের কামনা-বাসনার চরিতার্থতা করতে হয় ও তাদের অধীন হয়ে থাকতে হয়। কোন সময়ই সে নিরপেক্ষ সত্যের অনুসরণ করে চলার সাহস পায় না।

পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগণ নিজেদের আত্মীয়তা, পরিচিতি-বন্ধুত্ব ও আঞ্চলিক-বৈষয়িক স্বার্থ দেখে ভোট প্রয়োগ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে যোগ্যতা ও চরিত্রের দিক দিয়ে কে ভোট পাওয়ার যোগ্য, সেই বিচার-বিবেচনা তারা সাধারণত করে না। ফলে সমাজের সর্বোত্তম আদর্শবাদী ও চরিত্রবান ব্যক্তিদের নির্বাচিত হওয়া প্রায়ই সম্ভব হয় না। আর তার পরিণামে কোন দিনই আদর্শবাদী চরিত্রের ন্যায় ও সত্যের একান্ত অনুসারী সরকার গঠিত হতে পারে না। অতএব এইরূপ নির্বাচনে সাধারণত সমাজের অত্যাচারী লোকেরই শাসক হয়ে বসার সম্ভাবনা কোনক্রমেই অস্বীকার করা যায় না। এই দিকের লক্ষ্য রেখেই আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিম উম্মতকে সম্বোধন করে ইরশাদ করেছেনঃ

وَلا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ ثُمَّ لا تَنصَرُونَ (هود: (۱۱۳)
তোমরা এই জালিমদের প্রতি ঝুকে পড়ো না। নতুবা তোমরা জাহান্নামের আওতার মধ্যে পড়ে যাবে। তখন তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোন বন্ধু পৃষ্ঠপোষক পাবে না যে তোমাদেরকে আল্লাহর (আযাব) থেকে রক্ষা করতে পারে, কোন দিক থেকে কোন সাহায্যও তোমরা পাবে না।

পূর্বোদ্ধৃত বিস্তারিত আলোচনার প্রেক্ষিতে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, একটি সরকার গঠন ও সেজন্য সর্বোচ্চ প্রশাসক নির্বাচন জনগণের একটা সামষ্টিক অধিকার। জনগণই একজন সর্বোচ্চ প্রশাসক নিযুক্ত করবে নিজেদের মর্জীমত এবং যখন ইচ্ছা হবে তা সেই জনগণই তার নিকট থেকে কেড়ে নেবে। এই কথার তাৎপর্য হচ্ছে, প্রশাসনিক ক্ষমতা-প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব-সর্বোচ্চ প্রশাসকের দেয়া একটি আমানত। জনগণই এ আমানত তার নিকট রাখে কিন্তু সে আমানতের খিয়ানত করে প্রশাসন যদি জনগণের প্রতিই বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে সেই জনগণই তার নিকট থেকে এ আমানত কেড়ে নেবার অধিকার রাখে।

এই কথা কুরআন মজীদের কতিপয় আয়াত দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُوَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ - إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُمْ بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا (النساء: ٥٨)
নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তোমাদেরকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আমানত সমূহ-দায়িত্বপূর্ণ কাজের পদসমূহ-সে সবের যোগ্য লোকদেরকে দাও। আর (পারস্পরিক বিবাদ কালে) তোমরা যখন লোকদের মধ্যে ফয়সালা করবে, তখন (আল্লাহ্র আদেশ এই) যে, তোমরা অবশ্যই সুবিচার করবে। আল্লাহ্ তোমাদেরকে নিশ্চয়ই অতীব উত্তম নীতির কথা বলছেন। আর আল্লাহ্ বস্তুতই সর্বশ্রোতা, সর্বদর্শী।

তিনি আরও বলেছেনঃ
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ . خير وَاحْسَنُ تَأْوِيلًا (النساء: ٥٩)
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ্র, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যকার সামষ্টিক দায়িত্ব সম্পন্ন লোকদেরও। পরে তোমরা যদি কোন বিষয়ে পারস্পরিক মতবিরোধে লিপ্ত হও, তাহলে সে বিষয়টি আল্লাহ্ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। (কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে মীমাংসা করে নাও) যদি তোমরা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাক। জেনে রাখো, এই নীতিই সর্বোত্তম, সর্বাধিক কল্যাণময় এবং পরিণতির দিক দিয়ে অতীব ভালো।

বস্তুত প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের ব্যাপার। এটা গড়ে তোলার অধিকার ঈমানদার জনগণের নিকট পবিত্র আমানত। এ আমানত নিশ্চয়ই সেই লোকদের নিকট সমর্পণ করতে হবে যারা তা যথাযথভাবে পালন করবে ও আমানতের হক আদায় করার যোগ্যতার অধিকারী। যারা সে যোগ্যতার অধিকারী নয়, তাদের নিকট এ আমানত কখনই অর্পণ করা উচিত নয়। আর যোগ্য ও অধিকারী মনে করে আমানত অর্পণের পর তা যথাযথ আদায় করতে অযোগ্যতার—দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রমাণ দিলে জনগণই সে আমানত ফিরিয়ে নেবে।

ঈমানদার লোকেরা প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তুলবে, সংস্থার প্রধানের আনুগত্যও করবে। কিন্তু সে আনুগত্য কখনই শর্তহীন হবে না। নিঃশর্ত আনুগত্য করতে হবে শুধু আল্লাহ্র এবং আল্লাহ্র রাসূলের। তা ছাড়া অন্যদের আনুগত্য হবে এই শর্তে যে, ১. সে বা তারা নিজে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে চলবে। ২. তারা জনগণকে এমন কাজের আনুগত্য করার নির্দেশ দেবে যা করলে আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য হয়ে যায় এবং ৩. এমন কোন কাজের হুকুম দিবে না, যা করলে আল্লাহ্ ও রাসূলের নাফরমানী হয়।

প্রথমোল্লিখিত আয়াতে 'তোমাদেরকে আদেশ করেছেন' বলে প্রশাসকদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে। কেননা এরপরই 'তোমরা যখন লোকদের মধ্যে ফয়সালা করবে' বলে তাদের প্রতিই হুকুম জারি করা হয়েছে। কাজেই নিঃসন্দেহে বোঝা যায় যে, এখানে 'আমানত' বলে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বোঝানো হয়েছে। এর পরই আনুগত্যের আদেশ দেয়ায়ও সেই হুকুমাত-প্রশাসনিক কর্তৃত্বকেই নির্দেশ করা হয়েছে। কাজেই 'আমানত' বলতে হুকুমাত-তথা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।

দ্বিতীয়োক্ত আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, এই আমানতের আসল অধিকারী হচ্ছে ঈমানদার জনগণ। অতএব হুকুমাত বা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব সেই জনগণের নিকট থেকেই পেতে হবে। জনগণকে এ আমানত স্বীয় আল্লাহ্ তা'আলাই দিয়েছেন, যদিও সে হুকুমাত মূলত আল্লাহর। কেননা হুকুমাতের জন্য যে সার্বভৌমত্ব অপরিহার্য, তা আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই হতে পারে না মানুষের নিকট শুধু প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব আসে আল্লাহর নিকট থেকে। এ থেকে প্রমাণিত হল যে, সার্বভৌমত্ব দু'ধরনের। একটি প্রকৃত ও মৌলিক যা একান্তভাবে আল্লাহর। আর দ্বিতীয় অধীন, প্রদুক্ত অর্পিত ও এ দুটি সার্বভৌমত্ব ইসলামী হুকুমাতে একসাথে কাজ করে। এ দুটির মধ্যে কখনই বিরোধ বাঁধে না। কাজেই আমানতের ধারক হচ্ছে মুসলিম জনগণ। আর সেই আমানতের সার্বভৌমত্বের আসল মালিক হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলা।

চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রা) তাঁর একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে বলেছিলেনঃ
তোমার কাজও কর্তৃত্ব তোমার জন্য কোন জারের খাদ্য নয়। বরং তা তোমার ঘাড়ের উপর একটি ভারী আমানত। তোমার উপরস্থের জন্য তুমি প্রহরার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি। তুমি এই প্রহরার কাজে কোনরূপ অন্যায় করতে পার না।

তিনি আরও বলেছেন
হে জনগণ! তোমাদের এই রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে কিছু করার অধিকার কেবল তারই হতে পারে যাকে তোমরা নিযুক্ত করবে। আর খলীফা হিসেবে আমার কোন ক্ষমতা নেই। আছে শুধু এই যে, তোমাদের যে মাল-সম্পদ আমার নিকট রয়েছে, তার চাবিগুলি আমার নিকট রক্ষিত।

হযরত আলী (রা)-র আর একটি উক্তিঃ
ইমাম রাষ্ট্রনায়কের অধিকার হচ্ছে এতটুকু মাত্র আল্লাহ নামির ইস্লামি বিধানের ভিত্তিতে প্রিয়ন কার্য চালাবে। সে যদি তা করে, তাহলে জনগণের উপর তাঁর এই অধিকার হবে। কে, তোমরিতার কথা শুনবে ও তার আনুগত্য করবে এবং তরম ভাংরাংশে ডাকে সাড়া দেবে।

এ আয়াতসমূহ এবং অন্যান্য উক্তি গভীরভাবে চিন্তা-বিবেচনা করলে নিঃসন্দেহে বুঝতে পারা যায়, শাসক-প্রশাসক নির্বাচন করা মুসলিম উম্মতের 'অধিকার' ও 'কর্তব্য'। অবশ্য তা করতে হবে শরীয়াতের স্থায়ী নিয়ম বিধান অনুযায়ী। অন্তত সরকার যে মুসলিম উম্মতের ইচ্ছা ও মর্জীর ভিত্তিতে গঠিত হতে হবে, তাতে আর কোনই সন্দেহ নেই।

তবে শাসক-প্রশাসক নির্বাচনের এ অধিকার পাশ্চাত্যের ধর্মহীন গণতান্ত্রিক পন্থার মত নিশ্চয়ই নয়, তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতি সম্পন্ন, ভিন্নতর লক্ষ্য সমৃদ্ধ। ইসলামে শাসক নির্বাচন করা হয় বিশেষ কতগুলি গুণের ভিত্তিতে, বিশেষ কতগুলি শর্তের অধীন। এগুলির উল্লেখ পরে করা হবে। কিন্তু পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এই ধরনের অবশ্য পালনীয় কোন শর্ত নেই, নেই বিশেষ কোন গুণের অধিকারী হওয়ার অনিবার্য শর্ত।

তাছাড়া পাশ্চাত্যের ধর্মহীন গণতান্ত্রিক পন্থায় শাসক জনগণের অধীন হয়ে থাকে। কল্যাণ ও সত্যের অনুসারী হতে হয় না। কেননা তথায় জনগণই ভোটের একমাত্র অধিকারী। তাই নির্বাচিত শাসককে সেই জনগণের অনুসরণ করে চলতে হয় সব সময়, অন্যথায় পরবর্তী নির্বাচনে তার নির্বাচিত হওয়ার আশা সুদূরপরাহত। তাই একবার নির্বাচিত হয়ে নির্ভেজাল ও সার্বিক কল্যাণের জন্য করা ও সর্বক্ষেত্রে প্রকৃত সত্যের অনুসরণের পরিবর্তে ন্যায়ভাবে হোক, কি অন্যায়ভাবে, ভোটদাতাদের সন্তুষ্ট করার কাজেই তাকে চব্বিশ ঘন্টা চিন্তিত ও ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকতে হয়।

এর ফলে তাকে জনগণের বিচিত্র ধরনের কামনা-বাসনার চরিতার্থতা করতে হয় ও তাদের অধীন হয়ে থাকতে হয়। কোন সময়ই সে নিরপেক্ষ সত্যের অনুসরণ করে চলার সাহস পায় না।

পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগণ নিজেদের আত্মীয়তা, পরিচিতি-বন্ধুত্ব ও আঞ্চলিক-বৈষয়িক স্বার্থ দেখে ভোট প্রয়োগ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে যোগ্যতা ও চরিত্রের দিক দিয়ে কে ভোট পাওয়ার যোগ্য, সেই বিচার-বিবেচনা তারা সাধারণত করে না। ফলে সমাজের সর্বোত্তম আদর্শবাদী ও চরিত্রবান ব্যক্তিদের নির্বাচিত হওয়া প্রায়ই সম্ভব হয় না। আর তার পরিণামে কোন দিনই আদর্শবাদী চরিত্রের ন্যায় ও সত্যের একান্ত অনুসারী সরকার গঠিত হতে পারে না। অতএব এইরূপ নির্বাচনে সাধারণত সমাজের অত্যাচারী লোকেরই শাসক হয়ে বসার সম্ভাবনা কোনক্রমেই অস্বীকার করা যায় না। এই দিকের লক্ষ্য রেখেই আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিম উম্মতকে সম্বোধন করে ইরশাদ করেছেনঃ

وَلا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ ثُمَّ لا تَنصَرُونَ (هود: (۱۱۳)
তোমরা এই জালিমদের প্রতি ঝুকে পড়ো না। নতুবা তোমরা জাহান্নামের আওতার মধ্যে পড়ে যাবে। তখন তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোন বন্ধু পৃষ্ঠপোষক পাবে না যে তোমাদেরকে আল্লাহর (আযাব) থেকে রক্ষা করতে পারে, কোন দিক থেকে কোন সাহায্যও তোমরা পাবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00