📄 কুরআনের দৃষ্টিতে সমাজ সমষ্টি
ইসলামের দৃষ্টিকোণে ব্যক্তি ও সমষ্টির অধিকার বিবেচনা করা হলে উভয়েরই নিজ ক্ষেত্রে ও পরিবেশে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব স্বীকার না করে কোন উপায় থাকে না। উভয়েরই স্বাতন্ত্র্য, অধিকার ও সমান-সমান দায়িত্ব-কর্তব্য অবশ্যই মেনে নিতে হয়।
কুরআনুল করীম এ অধিকারের দৃষ্টিতে সমাজের উপর দৃষ্টিপাত করে। তা সমাজের অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব, জীবন ও পুনরুজ্জীবন, নির্দিষ্ট সময়কাল এবং অগ্রবর্তিতা ও পশ্চাদপদতা প্রভৃতি সবই রয়েছে বলে স্বীকার করে, যেমন এসব হয়ে থাকে ব্যক্তির ক্ষেত্রেও।
এ কারণে ব্যক্তির প্রতিকূলে সমাজ-সমষ্টির বাস্তব অবস্থান অস্তিত্ব যথোপযুক্তভাবে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। এ পর্যায়ে কুরআন মজীদের আয়াতসমূহ আমাদেরকে স্পষ্ট পথ-নির্দেশ করে।
আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেনঃ
وَ لِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌ ، فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ (الاعراف: ٣٤)
প্রত্যেকটি জনসমষ্টির জন্য নির্দিষ্ট একটা সময়কাল রয়েছে। তাদের জন্য সেই নির্দিষ্ট সময়কাল যখন নিঃশেষ হয়ে আসবে, তখন একটা মুহূর্ত বিলম্বেও যাবে না, আগেও আসবে না।
كُلُّ أُمَّةٍ تُدْعَى إِلَى كِتَابِهَا (الجاثية: ۲۸)
প্রত্যেকটি উম্মতকে ডাকা হবে এই বলে যে, এস ও নিজ নিজ আমল নামা দেখে নাও।
وَكَذَالِكَ زَيَّنَّا لِكُلِّ أُمَّةٍ عَمَلُهُمْ (الانعام: ۱۰৮)
আমরা এমনিভাবেই প্রতিটি মানব মণ্ডলীর জন্য তাদের কার্যকলাপকে চাকচিক্য করে দিয়েছি।
مِنْهُمْ امَّةٌ مُقْتَصِدَةٌ (المائده: ٦٦)
امَّةً قَائِمَةً يَتْلُونَ آيَتِ اللهِ (ال عمران: ۱১৩)
এদের মধ্যে এমন কিছু লোকও আছে, যারা সত্য সঠিক পথে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে।
وَهَمَّتْ كُلُّ أُمَّةٍ بِرَسُولِهِمْ لِيَأْخُذُوهُ وَجَدِلُوا بِالْبَاطِلِ لِيُدْحِضُوا بِهِ الْحَقَّ فَأَخَذْتُهُم فَكَيْفَ كَانَ عِقَابِ (المؤمن: ٥)
প্রত্যেক জনগোষ্ঠীই তাদের রাসূলের উপর হামলা চালিয়েছে, যেন তারা তাকে গ্রেফতার করতে পারে। তারা সকলেই বাতিলের হাতিয়ারসমূহের দ্বারা দ্বীনকে নীচা দেখাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি তাদের পাকড়াও করেছি। পরে দেখ, আমার দেয়া শাস্তি কত কঠিন ও কঠোর ছিল!
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولٌ - فَإِذَا جَاءَ رَسُولُهُمْ قُضِيَ بَيْنَهُمُ بِالْقِسْطِ (يونس: ٤٧)
প্রত্যেক উম্মত-জনসমষ্টির জন্য একজন রাসূল রয়েছে। অতঃপর যখন কোন উম্মতের নিকট তার রাসূল এসে পৌছেছে, তখন পূর্ণ ইনসাফ সহকারে তাদের মধ্যকার ফয়সালা চুকিয়ে দেয়া হয়েছে।
এ আয়াতসমূহ স্পষ্ট ও উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করছে যে, ব্যক্তিগণের সামষ্টিকতা সমাজ ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়, ব্যক্তিগণের সমন্বয়ে সমাজের অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। আর সে সমাজের একটা সময়কাল রয়েছে, কিতাব রয়েছে, চেতনা রয়েছে, সমঝ-বুঝ আছে, আনুগত্য ও অনানুগত্য-গুনাহ নাফরমানী ও পুণ্যশীলতা রয়েছে এবং সামষ্টিকভাবে অনেক বিষয়ে ফয়সালাও হয়ে থাকে। ১
এ সব আয়াতের প্রেক্ষিতে একথাও প্রকট হয়ে উঠে যে, কুরআন জনসমষ্টির-উম্মতের ইতিহাসকে ততটাই গুরুত্ব দিয়েছে, যতটা দিয়েছে ব্যক্তির কাহিনীর উপর। বরং সত্যি কথা এই যে, পূর্বে ইতিহাসে প্রধানত ব্যক্তিরাই অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। তখনকার ইতিহাস রাজা-বাদশাহ্ ও বড় বড় দিগ্বিজয়ী রাজ্য স্থাপনকারী ব্যক্তিদেরই কাহিনীতে পূর্ণ ছিল। তাতে জাতি ও জনসমষ্টির ইতিহাস বড় একটা ছিল না। আসলে জাতি ও জনসমষ্টির ইতিহাস গুরুত্ব ও স্বীকৃতি লাভ করেছে কুরআন মজীদ নাযিল হওয়ার পর। তাই উত্তরকালে আল-মাসউদী ও ইবনে খালদুনের ন্যায় ব্যক্তিবর্গ মানব জাতির ও জনসমষ্টির খ্যাতনামা ইতিহাসবেত্তা রূপে আবির্ভূত হতে পেরেছেন। ফলে পরবর্তীকালে ব্যক্তিদের কাহিনীর স্থানে জাতি ও জনসমষ্টির ইতিবৃত্তই হয় ইতিহাসের প্রধান উপজীব্য। বস্তুত ইসলামে সমাজ-সমষ্টির উপর যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলেই এরূপ হওয়া সম্ভব হয়েছিল। সমাজ-সমষ্টির ইতিহাসের প্রতি এরূপ গুরুত্ব দুনিয়ার অপর কোন ধর্ম বিধান বা সামষ্টিক রীতিতে লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, ব্যক্তির চরিত্র গঠন ও মানুষোপযোগী প্রশিক্ষণ কেবল সমাজ-সমষ্টির মধ্যেই সম্ভব। এ কারণে ব্যক্তির পূর্ণত্ব বিধানের জন্যই সমাজ-সমষ্টির অপরিহার্য প্রয়োজন। মানব-চরিত্র ও ভাবধারার সাংঘর্ষিক বৈচিত্র ও বিভিন্নতা সমাজ-পরিবেশের মধ্যেই মেরুকৃত ও একাকার হতে পারে কোন-না-কোন মাত্রায়। আর অন্যান্য দৃষ্টিতে ব্যক্তি ছাড়া সমাজ-সমষ্টির যেমন ধারণা মাত্র করা যায় না, তেমনি সমাজ-সমষ্টি ছাড়া 'ব্যক্তি'র ধারণা করাও কঠিন।
এই কারণেই ইসলামের সালাত, হজ্জ, জিহাদ ও অর্থ ব্যয় প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিধানই সমাজ-সমষ্টির ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। আর এইগুলির সমাজ-সমষ্টির ভিত্তি হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালন সম্ভব করার জন্যই ইসলামী হুকুমাত একান্ত অপরিহার্য। এই হুকুমাতই কার্যত ইসলামের বিধানকে বাস্তবায়িত করে, আল্লাহর নির্ধারিত সীমাসমূহকে রক্ষা করে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষকে সর্বাত্মক কল্যাণের দিকে আবহ্বান- 'আমর বিল মারূফ ও নিহী আনিল মুনকার'-এর দায়িত্ব এই সরকারই যথাযথভাবে পালন করতে পারে। এই সবের ফলে যে সৌভাগ্যপূর্ণ ও পবিত্র ভাবধারা সম্পন্ন সমাজ গড়ে উঠে, তা-ই ব্যক্তিদের নৈতিক উন্নয়ন সাধন করে। আর তাই হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান উপায়। আর এ সব কারণেই ইসলামী সমাজ দুনিয়ার অন্যান্য সমাজ-সমষ্টি থেকে অধিক উন্নত ও সর্বাধিক কল্যাণময় হয়ে উঠতে পারে।
ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তির জন্য কতগুলি কর্তব্য অপরিহার্য করে দেয়া হয়েছে। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক মাস কালীন সিয়াম, পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও এই ধরনের অন্যান্য বহু কাজ ব্যক্তিকে অবশ্যই করতে হবে। অনুরূপভাবে ইসলামী সমাজের জন্য বহু কয়টি দায়িত্ব ও কর্তব্যও নির্ধারিত হয়েছে, যেগুলি সামাজিকভাবেই কাজে পরিণত করতে হবে এবং এ ব্যাপারে কোন টাল-বাহানা বা গড়িমসি করা চলবে না।
দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, আল্লাহ ইসলামী সমাজ-সমষ্টিকে নির্দেশ দিয়েছেনঃ
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَ نَكَالًا مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حكيم (المائده: (۳۸)
মেয়েলোক চোর ও পুরুষলোক চোর-উভয়ের হাতসমূহ কেটে দাও তাদের উভয়ের দুষ্কৃতির শাস্তিস্বরূপ, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে শিক্ষা দান হিসেবে। আর আল্লাহ্ প্রবল শক্তি সম্পন্ন সুবিবেচক।
ব্যভিচারী নারী-পুরুষ সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছেনঃ
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ ( النور : ২)
ব্যভিচারী নারী ও পুরুষ এদের প্রত্যেককে একশ'টি করে দোরা মার এবং তাদের প্রতি দয়াশীলতা আল্লাহর আইন কার্যকর করার ব্যাপারে তোমাদেরকে যেন বাধাগ্রস্থ করতে না পারে- যদি তোমরা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হও এবং এই দুইজনকে দেয়া শাস্তি যেন মু'মিনদের কিছু সংখ্যক লোক প্রত্যক্ষ্য করে।
অনুরূপভাবে ইসলামী দেশ ও রাজ্যের সীমানা সংরক্ষণ ও বহিরাক্রমণ প্রতিরোধে সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে ধৈর্য ও পাহারাদারির সাথে।
ইরশাদ হয়েছেঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ (ال عمران: ২০০)
হে ঈমানদার লোকগণ, ধৈর্য অবলম্ব কর, বাতিল পন্থীদের প্রতিরোধে দৃঢ়তা ও অনমনীয়তা প্রদর্শন কর, ইসলামী রাজ্য সংরক্ষণে সর্বদা প্রস্তুত থাক এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাক। আশা আছে, তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারবে।
অপর এক আয়াতে রাষ্ট্রদ্রোহী আল্লাহদ্রোহীদের মুকাবিলায় যুদ্ধ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যেন শেষ পর্যন্ত তারা দমিত হয়ে সত্য দ্বীনের আনুগত্য করতে বাধ্য হয় এবং রাষ্ট্রদ্রোহীতা, আল্লাহদ্রোহীতা ও সর্ব প্রকারের সীমালংঘনমূলক কার্যকলাপ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত হয়। ইরশাদ হয়েছেঃ
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا ، فَإِنْ بَغَتْ إِحْدُهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ ، فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ (الحجرات: ۹)
আর ঈমানদার লোকদের মধ্য থেকে দুটি দল যদি পরস্পরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তাদের মধ্যে সন্ধি করে দাও। পরে যদি তাদের মধ্য থেকে কোন এক পক্ষ অন্য পক্ষের প্রতি বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘনমূলক আচরণ করে তাহলে এই সীমালংঘনকারী পক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই কর যতক্ষণ না সে পক্ষটি আল্লাহর বিধান পালনের দিকে ফিরে আসছে। অতঃপর সে পক্ষ ফিরে এলে তাদের মাঝে সুবিচার সহকারে মীমাংসা-মিল-মিশ করিয়ে দাও। আর সব সময়ই সুবিচার নীতি অনুসরণ করে চলতে থাক। কেননা আল্লাহ্ সুবিচার কারীদের পছন্দ করেন-ভালোবাসেন।
বস্তুত উদ্ধৃত আয়াতসমূহে আল্লাহ্ তা'আলা মু'মিন লোক সমষ্টিকে সম্বোধন করেছেন, কোন ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে নয়। অতএব এই সম্বোধনের পর যে যে কাজের নির্দেশ দিয়েছেন, তা সেই ঈমানদার লোক-সমষ্টির প্রতি এবং তা পালন করতে হবে সেই লোক-সমষ্টিকে সমষ্টিগতভাবে কোন ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে নয়। এ পর্যায়ের আরও কয়েকটি আয়াতের উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ
وَأَنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ (البقرة: ١٩٥)
এবং তোমরা আল্লাহর পথে বিনিয়োগ কর।
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةً يَدْعُونَ إِلَى الخير ويأمرون بالمعروف وينهونَ عَنِ المنكر (ال عمران: ١٠٤)
তোমাদের মধ্য থেকে অবশ্যই এক জন-সমষ্টি বের হয়ে আসতে হবে, যারা সার্বিক কল্যাণের দিকে সতত আহ্বান জানাতে থাকবে এবং ভালো-শরীয়াতসম্মত কাজের আদেশ করতে ও অন্যায়-মন্দ তথা শরীয়াতবিরোধী কাজ করতে নিষেধ করতে থাকবে।
وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ (المائدة: ٣٥)
এবং তোমরা তাঁর পথে জিহাদ কর।
وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ (الحج: ৭৮)
এবং তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে জিহাদ কর যেমনটা জিহাদ তাঁর ব্যাপারে করা কর্তব্য।
وَ لَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيوة (البقره: ۱۷۹)
এবং কিসাসে তোমাদের জন্য জীবন নিহিত।
وَأَقِيمُوا الشَّهَادَةَ لِلَّهِ (الطلاق: ٢)
এবং তোমরা আল্লাহর জন্য স্বাক্ষ্য দাঁড় করো।
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا (ال عمران: ۱۰۳)
এবং তোমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রজ্জু ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যেও না।
أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ (الشورى: ۱۳)
তোমরা সকলে দ্বীন কায়েম এবং এ ব্যাপারে তোমরা পরস্পর ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যেও না।
এ কয়টি এবং এ ধরনের আরও বহু সংখ্যক আয়াত থেকে স্পষ্ট-অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীন-ইসলাম মূলতই এক সামষ্টিক জীবন বিধান। আল্লাহ্ তা সামষ্টিক আদর্শরূপে মু'মিন সমষ্টির উপরই পালন করা কর্তব্য করে দিয়েছেন; ঠিক যেমন বহু ব্যক্তিগত কাজের দায়িত্ব ব্যক্তিগতভাবে ব্যক্তিগণের উপর অর্পণ করেছেন। দ্বীন কায়েম করার দায়িত্ব মুসলিম লোক-সমষ্টিই পালন করতে পারে। তাদের সমন্বয়ে যে সমাজ-সমষ্টি গড়ে উঠে, আল্লাহর আদেশসমূহ পালন করা সেই সমষ্টিরই কর্তব্য, তাদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যকের জন্য এখানে কোন বিশেষত্ব নেই, নেই কোন তারতম্য।
সমষ্টিকে সম্বোধন করার দরুন অর্পিত দায়িত্ব পালন সেই সমষ্টিরই কর্তব্য, যেমন প্রত্যেক ব্যক্তির উপর আরোপিত কর্তব্য-দায়িত্ব সেই ব্যক্তিগণকে ব্যক্তিগতভাবে পালন করতে হবে।
এই ব্যক্তিগণের সমন্বয়েই সমষ্টি গড়ে উঠে। ব্যক্তিগণের উপর অর্পিত কর্তব্য দায়িত্ব ব্যক্তিগণকে সরাসরি ফরয হিসেবেই পালন করতে হবে। আর সমাজ-সমষ্টির উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যক্তির ভূমিকা হচ্ছে সমষ্টির একজন হিসেবে এবং তা ফরযে কিফায়া। সমষ্টির কোন এক ব্যক্তি যদি তা পালন করে, তাহলে গোটা সমাজ-সমষ্টিরই পালন করা হয়ে যাবে। কিন্তু কোন এক ব্যক্তিও যদি তা পালন না করে, তাহলে গোটা সমাজ-সমষ্টিই সেজন্য দায়ী হবে। কেননা সে হুকুম পালন করার দায়িত্ব সমাজ-সমষ্টির উপরই অর্পিত হয়েছিল।
সমাজ-সমষ্টির উপর কর্তব্য পালনের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে সেই সব কাজের, যা সমাজ-সমষ্টির পক্ষেই পালন করা সম্ভব, ব্যক্তিগতভাবে কোন ব্যক্তির পক্ষে তা পালন করা সম্ভব নয়। সেই সামষ্টিক কর্তব্যসমূহ পালন করার জন্য সমাজ তার মধ্য থেকে এক বা কতিপয় লোককে নিযুক্ত করতে পারে। সেই নিযুক্ত এক বা একাধিক লোক সে দায়িত্ব পালন তখনই করতে পারে, যদি, তা করার কর্তৃত্ব (Authority) সমাজ-সমষ্টিই দেয়। এভাবেই সমাজ-সমষ্টির দায়িত্ব পালনের জন্য সমাজ-সমর্থিত একটি সরকার তথা, প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা-ইসলামের কর্ম সম্পাদনের স্থায়ী নিয়ম। এ সংস্থাই ইসলামী আদর্শভিত্তিক সামাজিক নিয়ম-শৃঙ্খলা বাস্তবায়িত করবে এবং সমাজ-সমষ্টির উপর অর্পিত দায়িত্ব-কর্তব্যসমূহও যথাযথভাবে পালন করবে। সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য এটাই হচ্ছে একমাত্র কার্যকর পন্থা। সমাজ-সমষ্টির কল্যাণ ও তাঁর সার্বিক উন্নয়ন সাধন এরূপ একটি সংস্থা গড়ে তোলা ছাড়া কোন ক্রমেই সম্ভব হতে পারে না। এরূপ একটি সংস্থা কার্যকর না থাকলে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যেমন চরম অরাজকতা উচ্ছৃঙ্খলতা প্রবল হয়ে উঠা অনিবার্য, তেমনি বৈদেশিক শক্তির আগ্রাসন প্রতিরোধ ও স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্পূর্ণ অসম্ভবই থেকে যাবে, আর এর কোন একটিও ইসলামের কাম্য নয়। বরং ইসলাম তীব্রভাবে এই অবস্থাকে প্রতিরোধ করতে বলে।
এ দীর্ঘ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা থেকে আমরা এই তত্ত্ব উদ্ধার করতে পারি যে, জন-সমষ্টিই হচ্ছে প্রশাসনিক ক্ষমতার উৎস। অবশ্য নিরংকুশ উৎস নয়। উৎস শুধু আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ ও ইসলামী আইন-কানুন জারিকরণের আওতায়। ইসলামে জনগণই সরকার ও প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা, প্রশাসক নিয়োগ ও নির্বাচনের জন্য দায়িত্বশীল। জনগণকে কল্যাণের দিকে পরিচালনায় নেতৃত্ব দান এ সংস্থার পক্ষেই সম্ভব। এ সংস্থাই আল্লাহর শরীয়াতী বিধানকে সামষ্টিক ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত করবে। কেননা আল্লাহর সম্বোধনসমূহে এই সমাজ-সমষ্টি-জনগণ-ই-সম্বোধিত। কিন্তু তারা সকলে ব্যক্তিগতভাবে এ দায়িত্ব পালন করতে পারে না বলেই তাদের সকলের পক্ষ থেকে কে বা কারা এ দায়িত্ব পালন করবে, তা-নির্ধারণ করা তাদেরই কর্তব্য। কুরআনের আয়াত ভুলে কেমন দেখানো হয়েছে, 'চোরের হাত কাটা, ব্যভিচারীকে প্রস্তরাঘাতে মারা, সীমালংঘনকারীকে সীমার মধ্যে থাকতে বাধ্য করা, আগ্রাসন প্রতিরোধ করা ও দ্বীনী নিয়ম-শৃঙ্খলা-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা- প্রভৃতির আদেশ কি মুসলিম সমষ্টির উপর কর্তব্য করা হয়নি?
তাহলে স্পষ্ট হলো যে ইসলামের ইসলামী সমাজ সমষ্টির গুরুত্ব স্বীকৃত। সেই সমাজ সমষ্টিরই কর্তব্য এমন এক সরকার প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা, যা সেই সমাজ-সমষ্টির পক্ষ থেকে তার অর্পিত ক্ষমতা বলে এই সামষ্টিক কর্তব্যসমূহ পালন করবে। কেননা ইসলাম এই কর্তব্যসমূহকে সামষ্টিক কর্তব্য রূপেই ফরয করেছেন এবং এই কাজগুলি করা কেবলমাত্র একটি সমাজ-সমষ্টির পক্ষেই সম্ভবপর।
বস্তুত একটি সরকার প্রশাসন-সংস্থা-যা জীবনের বিভিন্ন দিকের গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব-কর্তব্য সমূহ তার প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাদির মাধ্যমে সুসম্পন্ন করবে, একান্তভাবে দায়িত্ব সহকারে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ক্ষেত্রে আল্লাহর আইনসমূহ যথাযথভাবে কার্যকর করবে- ব্যতীত না ইসলামী জীবন চলতে পারে, না ইসলামী সমাজ।
ইসলাম তার সামষ্টিক নিয়ম-বিধান ও আইন-কানুন কার্যকর করতে চাইবে অথচ সে কাজ সম্পন্ন করার জন্য অপরিহার্য যন্ত্র কাঠামো সরকার বা প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তুলতে চাইবে না, আবার জনগণের অধিকার রক্ষার, সম্পর্ক সংরক্ষণের ও জনগণের দাবিসমূহ আদায়ের বড় বড় ওয়াদা প্রতিশ্রুতি দেবে, তা কি কল্পনা করা যায়?
টিকাঃ
১. تفسير الميزان
ইসলামের দৃষ্টিকোণে ব্যক্তি ও সমষ্টির অধিকার বিবেচনা করা হলে উভয়েরই নিজ ক্ষেত্রে ও পরিবেশে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব স্বীকার না করে কোন উপায় থাকে না। উভয়েরই স্বাতন্ত্র্য, অধিকার ও সমান-সমান দায়িত্ব-কর্তব্য অবশ্যই মেনে নিতে হয়।
কুরআনুল করীম এ অধিকারের দৃষ্টিতে সমাজের উপর দৃষ্টিপাত করে। তা সমাজের অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব, জীবন ও পুনরুজ্জীবন, নির্দিষ্ট সময়কাল এবং অগ্রবর্তিতা ও পশ্চাদপদতা প্রভৃতি সবই রয়েছে বলে স্বীকার করে, যেমন এসব হয়ে থাকে ব্যক্তির ক্ষেত্রেও।
এ কারণে ব্যক্তির প্রতিকূলে সমাজ-সমষ্টির বাস্তব অবস্থান অস্তিত্ব যথোপযুক্তভাবে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। এ পর্যায়ে কুরআন মজীদের আয়াতসমূহ আমাদেরকে স্পষ্ট পথ-নির্দেশ করে।
আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেনঃ
وَ لِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌ ، فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ (الاعراف: ٣٤)
প্রত্যেকটি জনসমষ্টির জন্য নির্দিষ্ট একটা সময়কাল রয়েছে। তাদের জন্য সেই নির্দিষ্ট সময়কাল যখন নিঃশেষ হয়ে আসবে, তখন একটা মুহূর্ত বিলম্বেও যাবে না, আগেও আসবে না।
كُلُّ أُمَّةٍ تُدْعَى إِلَى كِتَابِهَا (الجاثية: ۲۸)
প্রত্যেকটি উম্মতকে ডাকা হবে এই বলে যে, এস ও নিজ নিজ আমল নামা দেখে নাও।
وَكَذَالِكَ زَيَّنَّا لِكُلِّ أُمَّةٍ عَمَلُهُمْ (الانعام: ۱۰৮)
আমরা এমনিভাবেই প্রতিটি মানব মণ্ডলীর জন্য তাদের কার্যকলাপকে চাকচিক্য করে দিয়েছি।
مِنْهُمْ امَّةٌ مُقْتَصِدَةٌ (المائده: ٦٦)
امَّةً قَائِمَةً يَتْلُونَ آيَتِ اللهِ (ال عمران: ۱১৩)
এদের মধ্যে এমন কিছু লোকও আছে, যারা সত্য সঠিক পথে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে।
وَهَمَّتْ كُلُّ أُمَّةٍ بِرَسُولِهِمْ لِيَأْخُذُوهُ وَجَدِلُوا بِالْبَاطِلِ لِيُدْحِضُوا بِهِ الْحَقَّ فَأَخَذْتُهُم فَكَيْفَ كَانَ عِقَابِ (المؤمن: ٥)
প্রত্যেক জনগোষ্ঠীই তাদের রাসূলের উপর হামলা চালিয়েছে, যেন তারা তাকে গ্রেফতার করতে পারে। তারা সকলেই বাতিলের হাতিয়ারসমূহের দ্বারা দ্বীনকে নীচা দেখাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি তাদের পাকড়াও করেছি। পরে দেখ, আমার দেয়া শাস্তি কত কঠিন ও কঠোর ছিল!
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولٌ - فَإِذَا جَاءَ رَسُولُهُمْ قُضِيَ بَيْنَهُمُ بِالْقِسْطِ (يونس: ٤٧)
প্রত্যেক উম্মত-জনসমষ্টির জন্য একজন রাসূল রয়েছে। অতঃপর যখন কোন উম্মতের নিকট তার রাসূল এসে পৌছেছে, তখন পূর্ণ ইনসাফ সহকারে তাদের মধ্যকার ফয়সালা চুকিয়ে দেয়া হয়েছে।
এ আয়াতসমূহ স্পষ্ট ও উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করছে যে, ব্যক্তিগণের সামষ্টিকতা সমাজ ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়, ব্যক্তিগণের সমন্বয়ে সমাজের অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। আর সে সমাজের একটা সময়কাল রয়েছে, কিতাব রয়েছে, চেতনা রয়েছে, সমঝ-বুঝ আছে, আনুগত্য ও অনানুগত্য-গুনাহ নাফরমানী ও পুণ্যশীলতা রয়েছে এবং সামষ্টিকভাবে অনেক বিষয়ে ফয়সালাও হয়ে থাকে। ১
এ সব আয়াতের প্রেক্ষিতে একথাও প্রকট হয়ে উঠে যে, কুরআন জনসমষ্টির-উম্মতের ইতিহাসকে ততটাই গুরুত্ব দিয়েছে, যতটা দিয়েছে ব্যক্তির কাহিনীর উপর। বরং সত্যি কথা এই যে, পূর্বে ইতিহাসে প্রধানত ব্যক্তিরাই অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। তখনকার ইতিহাস রাজা-বাদশাহ্ ও বড় বড় দিগ্বিজয়ী রাজ্য স্থাপনকারী ব্যক্তিদেরই কাহিনীতে পূর্ণ ছিল। তাতে জাতি ও জনসমষ্টির ইতিহাস বড় একটা ছিল না। আসলে জাতি ও জনসমষ্টির ইতিহাস গুরুত্ব ও স্বীকৃতি লাভ করেছে কুরআন মজীদ নাযিল হওয়ার পর। তাই উত্তরকালে আল-মাসউদী ও ইবনে খালদুনের ন্যায় ব্যক্তিবর্গ মানব জাতির ও জনসমষ্টির খ্যাতনামা ইতিহাসবেত্তা রূপে আবির্ভূত হতে পেরেছেন। ফলে পরবর্তীকালে ব্যক্তিদের কাহিনীর স্থানে জাতি ও জনসমষ্টির ইতিবৃত্তই হয় ইতিহাসের প্রধান উপজীব্য। বস্তুত ইসলামে সমাজ-সমষ্টির উপর যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলেই এরূপ হওয়া সম্ভব হয়েছিল। সমাজ-সমষ্টির ইতিহাসের প্রতি এরূপ গুরুত্ব দুনিয়ার অপর কোন ধর্ম বিধান বা সামষ্টিক রীতিতে লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, ব্যক্তির চরিত্র গঠন ও মানুষোপযোগী প্রশিক্ষণ কেবল সমাজ-সমষ্টির মধ্যেই সম্ভব। এ কারণে ব্যক্তির পূর্ণত্ব বিধানের জন্যই সমাজ-সমষ্টির অপরিহার্য প্রয়োজন। মানব-চরিত্র ও ভাবধারার সাংঘর্ষিক বৈচিত্র ও বিভিন্নতা সমাজ-পরিবেশের মধ্যেই মেরুকৃত ও একাকার হতে পারে কোন-না-কোন মাত্রায়। আর অন্যান্য দৃষ্টিতে ব্যক্তি ছাড়া সমাজ-সমষ্টির যেমন ধারণা মাত্র করা যায় না, তেমনি সমাজ-সমষ্টি ছাড়া 'ব্যক্তি'র ধারণা করাও কঠিন।
এই কারণেই ইসলামের সালাত, হজ্জ, জিহাদ ও অর্থ ব্যয় প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিধানই সমাজ-সমষ্টির ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। আর এইগুলির সমাজ-সমষ্টির ভিত্তি হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালন সম্ভব করার জন্যই ইসলামী হুকুমাত একান্ত অপরিহার্য। এই হুকুমাতই কার্যত ইসলামের বিধানকে বাস্তবায়িত করে, আল্লাহর নির্ধারিত সীমাসমূহকে রক্ষা করে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষকে সর্বাত্মক কল্যাণের দিকে আবহ্বান- 'আমর বিল মারূফ ও নিহী আনিল মুনকার'-এর দায়িত্ব এই সরকারই যথাযথভাবে পালন করতে পারে। এই সবের ফলে যে সৌভাগ্যপূর্ণ ও পবিত্র ভাবধারা সম্পন্ন সমাজ গড়ে উঠে, তা-ই ব্যক্তিদের নৈতিক উন্নয়ন সাধন করে। আর তাই হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান উপায়। আর এ সব কারণেই ইসলামী সমাজ দুনিয়ার অন্যান্য সমাজ-সমষ্টি থেকে অধিক উন্নত ও সর্বাধিক কল্যাণময় হয়ে উঠতে পারে।
ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তির জন্য কতগুলি কর্তব্য অপরিহার্য করে দেয়া হয়েছে। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক মাস কালীন সিয়াম, পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও এই ধরনের অন্যান্য বহু কাজ ব্যক্তিকে অবশ্যই করতে হবে। অনুরূপভাবে ইসলামী সমাজের জন্য বহু কয়টি দায়িত্ব ও কর্তব্যও নির্ধারিত হয়েছে, যেগুলি সামাজিকভাবেই কাজে পরিণত করতে হবে এবং এ ব্যাপারে কোন টাল-বাহানা বা গড়িমসি করা চলবে না।
দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, আল্লাহ ইসলামী সমাজ-সমষ্টিকে নির্দেশ দিয়েছেনঃ
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَ نَكَالًا مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حكيم (المائده: (۳۸)
মেয়েলোক চোর ও পুরুষলোক চোর-উভয়ের হাতসমূহ কেটে দাও তাদের উভয়ের দুষ্কৃতির শাস্তিস্বরূপ, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে শিক্ষা দান হিসেবে। আর আল্লাহ্ প্রবল শক্তি সম্পন্ন সুবিবেচক।
ব্যভিচারী নারী-পুরুষ সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছেনঃ
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ ( النور : ২)
ব্যভিচারী নারী ও পুরুষ এদের প্রত্যেককে একশ'টি করে দোরা মার এবং তাদের প্রতি দয়াশীলতা আল্লাহর আইন কার্যকর করার ব্যাপারে তোমাদেরকে যেন বাধাগ্রস্থ করতে না পারে- যদি তোমরা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হও এবং এই দুইজনকে দেয়া শাস্তি যেন মু'মিনদের কিছু সংখ্যক লোক প্রত্যক্ষ্য করে।
অনুরূপভাবে ইসলামী দেশ ও রাজ্যের সীমানা সংরক্ষণ ও বহিরাক্রমণ প্রতিরোধে সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে ধৈর্য ও পাহারাদারির সাথে।
ইরশাদ হয়েছেঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ (ال عمران: ২০০)
হে ঈমানদার লোকগণ, ধৈর্য অবলম্ব কর, বাতিল পন্থীদের প্রতিরোধে দৃঢ়তা ও অনমনীয়তা প্রদর্শন কর, ইসলামী রাজ্য সংরক্ষণে সর্বদা প্রস্তুত থাক এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাক। আশা আছে, তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারবে।
অপর এক আয়াতে রাষ্ট্রদ্রোহী আল্লাহদ্রোহীদের মুকাবিলায় যুদ্ধ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যেন শেষ পর্যন্ত তারা দমিত হয়ে সত্য দ্বীনের আনুগত্য করতে বাধ্য হয় এবং রাষ্ট্রদ্রোহীতা, আল্লাহদ্রোহীতা ও সর্ব প্রকারের সীমালংঘনমূলক কার্যকলাপ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত হয়। ইরশাদ হয়েছেঃ
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا ، فَإِنْ بَغَتْ إِحْدُهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ ، فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ (الحجرات: ۹)
আর ঈমানদার লোকদের মধ্য থেকে দুটি দল যদি পরস্পরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তাদের মধ্যে সন্ধি করে দাও। পরে যদি তাদের মধ্য থেকে কোন এক পক্ষ অন্য পক্ষের প্রতি বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘনমূলক আচরণ করে তাহলে এই সীমালংঘনকারী পক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই কর যতক্ষণ না সে পক্ষটি আল্লাহর বিধান পালনের দিকে ফিরে আসছে। অতঃপর সে পক্ষ ফিরে এলে তাদের মাঝে সুবিচার সহকারে মীমাংসা-মিল-মিশ করিয়ে দাও। আর সব সময়ই সুবিচার নীতি অনুসরণ করে চলতে থাক। কেননা আল্লাহ্ সুবিচার কারীদের পছন্দ করেন-ভালোবাসেন।
বস্তুত উদ্ধৃত আয়াতসমূহে আল্লাহ্ তা'আলা মু'মিন লোক সমষ্টিকে সম্বোধন করেছেন, কোন ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে নয়। অতএব এই সম্বোধনের পর যে যে কাজের নির্দেশ দিয়েছেন, তা সেই ঈমানদার লোক-সমষ্টির প্রতি এবং তা পালন করতে হবে সেই লোক-সমষ্টিকে সমষ্টিগতভাবে কোন ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে নয়। এ পর্যায়ের আরও কয়েকটি আয়াতের উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ
وَأَنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ (البقرة: ١٩٥)
এবং তোমরা আল্লাহর পথে বিনিয়োগ কর।
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةً يَدْعُونَ إِلَى الخير ويأمرون بالمعروف وينهونَ عَنِ المنكر (ال عمران: ١٠٤)
তোমাদের মধ্য থেকে অবশ্যই এক জন-সমষ্টি বের হয়ে আসতে হবে, যারা সার্বিক কল্যাণের দিকে সতত আহ্বান জানাতে থাকবে এবং ভালো-শরীয়াতসম্মত কাজের আদেশ করতে ও অন্যায়-মন্দ তথা শরীয়াতবিরোধী কাজ করতে নিষেধ করতে থাকবে।
وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ (المائدة: ٣٥)
এবং তোমরা তাঁর পথে জিহাদ কর।
وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ (الحج: ৭৮)
এবং তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে জিহাদ কর যেমনটা জিহাদ তাঁর ব্যাপারে করা কর্তব্য।
وَ لَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيوة (البقره: ۱۷۹)
এবং কিসাসে তোমাদের জন্য জীবন নিহিত।
وَأَقِيمُوا الشَّهَادَةَ لِلَّهِ (الطلاق: ٢)
এবং তোমরা আল্লাহর জন্য স্বাক্ষ্য দাঁড় করো।
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا (ال عمران: ۱۰۳)
এবং তোমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রজ্জু ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যেও না।
أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ (الشورى: ۱۳)
তোমরা সকলে দ্বীন কায়েম এবং এ ব্যাপারে তোমরা পরস্পর ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যেও না।
এ কয়টি এবং এ ধরনের আরও বহু সংখ্যক আয়াত থেকে স্পষ্ট-অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীন-ইসলাম মূলতই এক সামষ্টিক জীবন বিধান। আল্লাহ্ তা সামষ্টিক আদর্শরূপে মু'মিন সমষ্টির উপরই পালন করা কর্তব্য করে দিয়েছেন; ঠিক যেমন বহু ব্যক্তিগত কাজের দায়িত্ব ব্যক্তিগতভাবে ব্যক্তিগণের উপর অর্পণ করেছেন। দ্বীন কায়েম করার দায়িত্ব মুসলিম লোক-সমষ্টিই পালন করতে পারে। তাদের সমন্বয়ে যে সমাজ-সমষ্টি গড়ে উঠে, আল্লাহর আদেশসমূহ পালন করা সেই সমষ্টিরই কর্তব্য, তাদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যকের জন্য এখানে কোন বিশেষত্ব নেই, নেই কোন তারতম্য।
সমষ্টিকে সম্বোধন করার দরুন অর্পিত দায়িত্ব পালন সেই সমষ্টিরই কর্তব্য, যেমন প্রত্যেক ব্যক্তির উপর আরোপিত কর্তব্য-দায়িত্ব সেই ব্যক্তিগণকে ব্যক্তিগতভাবে পালন করতে হবে।
এই ব্যক্তিগণের সমন্বয়েই সমষ্টি গড়ে উঠে। ব্যক্তিগণের উপর অর্পিত কর্তব্য দায়িত্ব ব্যক্তিগণকে সরাসরি ফরয হিসেবেই পালন করতে হবে। আর সমাজ-সমষ্টির উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যক্তির ভূমিকা হচ্ছে সমষ্টির একজন হিসেবে এবং তা ফরযে কিফায়া। সমষ্টির কোন এক ব্যক্তি যদি তা পালন করে, তাহলে গোটা সমাজ-সমষ্টিরই পালন করা হয়ে যাবে। কিন্তু কোন এক ব্যক্তিও যদি তা পালন না করে, তাহলে গোটা সমাজ-সমষ্টিই সেজন্য দায়ী হবে। কেননা সে হুকুম পালন করার দায়িত্ব সমাজ-সমষ্টির উপরই অর্পিত হয়েছিল।
সমাজ-সমষ্টির উপর কর্তব্য পালনের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে সেই সব কাজের, যা সমাজ-সমষ্টির পক্ষেই পালন করা সম্ভব, ব্যক্তিগতভাবে কোন ব্যক্তির পক্ষে তা পালন করা সম্ভব নয়। সেই সামষ্টিক কর্তব্যসমূহ পালন করার জন্য সমাজ তার মধ্য থেকে এক বা কতিপয় লোককে নিযুক্ত করতে পারে। সেই নিযুক্ত এক বা একাধিক লোক সে দায়িত্ব পালন তখনই করতে পারে, যদি, তা করার কর্তৃত্ব (Authority) সমাজ-সমষ্টিই দেয়। এভাবেই সমাজ-সমষ্টির দায়িত্ব পালনের জন্য সমাজ-সমর্থিত একটি সরকার তথা, প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা-ইসলামের কর্ম সম্পাদনের স্থায়ী নিয়ম। এ সংস্থাই ইসলামী আদর্শভিত্তিক সামাজিক নিয়ম-শৃঙ্খলা বাস্তবায়িত করবে এবং সমাজ-সমষ্টির উপর অর্পিত দায়িত্ব-কর্তব্যসমূহও যথাযথভাবে পালন করবে। সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য এটাই হচ্ছে একমাত্র কার্যকর পন্থা। সমাজ-সমষ্টির কল্যাণ ও তাঁর সার্বিক উন্নয়ন সাধন এরূপ একটি সংস্থা গড়ে তোলা ছাড়া কোন ক্রমেই সম্ভব হতে পারে না। এরূপ একটি সংস্থা কার্যকর না থাকলে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যেমন চরম অরাজকতা উচ্ছৃঙ্খলতা প্রবল হয়ে উঠা অনিবার্য, তেমনি বৈদেশিক শক্তির আগ্রাসন প্রতিরোধ ও স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্পূর্ণ অসম্ভবই থেকে যাবে, আর এর কোন একটিও ইসলামের কাম্য নয়। বরং ইসলাম তীব্রভাবে এই অবস্থাকে প্রতিরোধ করতে বলে।
এ দীর্ঘ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা থেকে আমরা এই তত্ত্ব উদ্ধার করতে পারি যে, জন-সমষ্টিই হচ্ছে প্রশাসনিক ক্ষমতার উৎস। অবশ্য নিরংকুশ উৎস নয়। উৎস শুধু আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ ও ইসলামী আইন-কানুন জারিকরণের আওতায়। ইসলামে জনগণই সরকার ও প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা, প্রশাসক নিয়োগ ও নির্বাচনের জন্য দায়িত্বশীল। জনগণকে কল্যাণের দিকে পরিচালনায় নেতৃত্ব দান এ সংস্থার পক্ষেই সম্ভব। এ সংস্থাই আল্লাহর শরীয়াতী বিধানকে সামষ্টিক ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত করবে। কেননা আল্লাহর সম্বোধনসমূহে এই সমাজ-সমষ্টি-জনগণ-ই-সম্বোধিত। কিন্তু তারা সকলে ব্যক্তিগতভাবে এ দায়িত্ব পালন করতে পারে না বলেই তাদের সকলের পক্ষ থেকে কে বা কারা এ দায়িত্ব পালন করবে, তা-নির্ধারণ করা তাদেরই কর্তব্য। কুরআনের আয়াত ভুলে কেমন দেখানো হয়েছে, 'চোরের হাত কাটা, ব্যভিচারীকে প্রস্তরাঘাতে মারা, সীমালংঘনকারীকে সীমার মধ্যে থাকতে বাধ্য করা, আগ্রাসন প্রতিরোধ করা ও দ্বীনী নিয়ম-শৃঙ্খলা-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা- প্রভৃতির আদেশ কি মুসলিম সমষ্টির উপর কর্তব্য করা হয়নি?
তাহলে স্পষ্ট হলো যে ইসলামের ইসলামী সমাজ সমষ্টির গুরুত্ব স্বীকৃত। সেই সমাজ সমষ্টিরই কর্তব্য এমন এক সরকার প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা, যা সেই সমাজ-সমষ্টির পক্ষ থেকে তার অর্পিত ক্ষমতা বলে এই সামষ্টিক কর্তব্যসমূহ পালন করবে। কেননা ইসলাম এই কর্তব্যসমূহকে সামষ্টিক কর্তব্য রূপেই ফরয করেছেন এবং এই কাজগুলি করা কেবলমাত্র একটি সমাজ-সমষ্টির পক্ষেই সম্ভবপর।
বস্তুত একটি সরকার প্রশাসন-সংস্থা-যা জীবনের বিভিন্ন দিকের গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব-কর্তব্য সমূহ তার প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাদির মাধ্যমে সুসম্পন্ন করবে, একান্তভাবে দায়িত্ব সহকারে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ক্ষেত্রে আল্লাহর আইনসমূহ যথাযথভাবে কার্যকর করবে- ব্যতীত না ইসলামী জীবন চলতে পারে, না ইসলামী সমাজ।
ইসলাম তার সামষ্টিক নিয়ম-বিধান ও আইন-কানুন কার্যকর করতে চাইবে অথচ সে কাজ সম্পন্ন করার জন্য অপরিহার্য যন্ত্র কাঠামো সরকার বা প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তুলতে চাইবে না, আবার জনগণের অধিকার রক্ষার, সম্পর্ক সংরক্ষণের ও জনগণের দাবিসমূহ আদায়ের বড় বড় ওয়াদা প্রতিশ্রুতি দেবে, তা কি কল্পনা করা যায়?
টিকাঃ
১. تفسير الميزان
📄 বিবেক-বুদ্ধির দৃষ্টিতে সরকার গঠন
ইসলামী শরীয়াতে মানুষের সহজ-সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি কুরআন, সুন্নাত ও ইজমা'র পরে একটি অন্যতম উৎসরূপে স্বীকৃত। যেসব ক্ষেত্রে এই বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগের অবকাশ রয়েছে, সেখানে তা শরীয়াতের ইমামগণ ব্যাপকভাবে ও গুরুত্ব সহকারে প্রয়োগ করেছেন। এখানে এই দৃষ্টিতে আমাদের বক্তব্যঃ
সুস্থ সহজ বিবেক-বুদ্ধি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করছে যে, জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সরকার ও প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা একান্তই কর্তব্য। কেননা তা না হলে মানুষের জীবনে কোন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করাই সম্ভব নয়। আর মানব-সমাজের শৃঙ্খলা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রাখা যে একান্তই কর্তব্য, তাতে একবিন্দু সন্দেহের অবকাশ নেই।
মানুষের মধ্যে সামাজিক শৃঙ্খলা স্থাপন, তার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন ও স্বয়ং মানব-জীবনের সংরক্ষণ ও স্থিতির জন্যই আবশ্যক। সেজন্য চষ্টা-সাধনা ও কষ্ট স্বীকার সাধারণভাবে সমস্ত মানুষের জন্যই কর্তব্য। কেননা মানুষ এইরূপ একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজ-পরিবেশেই নিশ্চিত ও নিরাপত্তাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারে, পারে তার কাম্য কল্যাণ ও উৎকর্ষ-উন্নতি অর্জন করতে।
এ কারণে আমরা দেখতে পাই, দুনিয়ায় এমন বহু জাতি রয়েছে যারা কোন দ্বীন বা শরীয়াতের অনুসরী না হলেও তারা নিজেদের সামাজিক শৃঙ্খলা দৃঢ়তার সাথে স্থাপন করেছে।
এ দৃষ্টিতে আমরা সহজেই বলতে পারি যে, সামাজিক-সামষ্টিক নিয়ম-শৃঙ্খলা স্থাপন স্বাভাবিক বিবেক বুদ্ধিরই ঐকান্তিক দাবি। মানুষ কোন দ্বীন বা শরীয়াত পালন না করলেও এই কর্তব্যের কথা কেউ-ই অস্বীকার করতে পারে না।
আর সামাজিক নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যে একান্তই প্রয়োজন, তা-ও সর্বতোভাবে অনস্বীকার্য। এমন একটি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান প্রত্যেক সমাজে অবশ্যই থাকতে হবে, যা সেই সমাজের জনগণের সার্বিক সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে দিনরাত একান্তভাবে নিয়োজিত ও কর্মরত থাকবে। শুধু তাই নয়, সামাজিক-সামষ্টিক নিয়ম-শৃঙ্খলা বিধান, সংরক্ষণ ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিও থাকতে হবে, যার মধ্যে এই দায়িত্বশীলতার জন্য জবাবদিহির তীব্র অনুভূতিও থাকতে হবে। এ কারণে মানব-সমাজের ইতিহাসে এমন কোন অধ্যায়ের সন্ধান পাওয়া যায় না, সেখানে এইরূপ দায়িত্বশীল বলতে কেউ কোথাও নেই। সভ্য ও আধুনিক সমাজের তো কোন প্রশ্নই উঠে না। প্রাচীন আদিম অসভ্য বর্বর সমাজেও এইরূপ দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে আমরা দেখি সমাজ প্রধান বা গোত্র সরদারকে। গোটা সমাজ বা গোত্র যেমন তার নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে, তেমনি সেই সমাজ ও গোত্রের-কবীলার-সার্বিক সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য তাকেই কাজ করত হয়, সে কাজ যথাযথরূপে সম্পন্ন হলো কি না, সেজন্য তাকে সেই সমাজ বা গোত্রের জনগণের নিকট জবাবদিহিও করতে হয়।
বৃহত্তর ও আধুনিক সম্প্রসারিত জীবন-প্রেক্ষিতে এই দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বই আত্মপ্রকাশ করেছে সরকার বা প্রশাসনিক সংস্থা রূপে। এইরূপ একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা ও তার সদা কার্যকরতা ব্যতীত কোন সমাজের অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না। ইসলাম তাই এরূপ সংস্থা প্রতিষ্ঠিত করার উপর যথেষ্ট তাকীদ পেশ করেছে। এরূপ একটি সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন জীবনই মানুষের জন্য সম্ভব বলে ইসলাম বিশ্বাস করে। এরূপ একটি জীবনেই সম্ভব ইসলামী আদর্শের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও পালন-অনুসরণ। এরূপ একটি জীবনেই আশা করা যায়, মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ। এক কথায় মানুষের সার্বিক কল্যাণ এরূপ একটি সংস্থাধীন জীবন ছাড়া কল্পনাও করা যায় না।
ইসলামী শরীয়াতে মানুষের সহজ-সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি কুরআন, সুন্নাত ও ইজমা'র পরে একটি অন্যতম উৎসরূপে স্বীকৃত। যেসব ক্ষেত্রে এই বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগের অবকাশ রয়েছে, সেখানে তা শরীয়াতের ইমামগণ ব্যাপকভাবে ও গুরুত্ব সহকারে প্রয়োগ করেছেন। এখানে এই দৃষ্টিতে আমাদের বক্তব্যঃ
সুস্থ সহজ বিবেক-বুদ্ধি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করছে যে, জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সরকার ও প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা একান্তই কর্তব্য। কেননা তা না হলে মানুষের জীবনে কোন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করাই সম্ভব নয়। আর মানব-সমাজের শৃঙ্খলা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রাখা যে একান্তই কর্তব্য, তাতে একবিন্দু সন্দেহের অবকাশ নেই।
মানুষের মধ্যে সামাজিক শৃঙ্খলা স্থাপন, তার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন ও স্বয়ং মানব-জীবনের সংরক্ষণ ও স্থিতির জন্যই আবশ্যক। সেজন্য চষ্টা-সাধনা ও কষ্ট স্বীকার সাধারণভাবে সমস্ত মানুষের জন্যই কর্তব্য। কেননা মানুষ এইরূপ একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজ-পরিবেশেই নিশ্চিত ও নিরাপত্তাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারে, পারে তার কাম্য কল্যাণ ও উৎকর্ষ-উন্নতি অর্জন করতে।
এ কারণে আমরা দেখতে পাই, দুনিয়ায় এমন বহু জাতি রয়েছে যারা কোন দ্বীন বা শরীয়াতের অনুসরী না হলেও তারা নিজেদের সামাজিক শৃঙ্খলা দৃঢ়তার সাথে স্থাপন করেছে।
এ দৃষ্টিতে আমরা সহজেই বলতে পারি যে, সামাজিক-সামষ্টিক নিয়ম-শৃঙ্খলা স্থাপন স্বাভাবিক বিবেক বুদ্ধিরই ঐকান্তিক দাবি। মানুষ কোন দ্বীন বা শরীয়াত পালন না করলেও এই কর্তব্যের কথা কেউ-ই অস্বীকার করতে পারে না।
আর সামাজিক নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যে একান্তই প্রয়োজন, তা-ও সর্বতোভাবে অনস্বীকার্য। এমন একটি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান প্রত্যেক সমাজে অবশ্যই থাকতে হবে, যা সেই সমাজের জনগণের সার্বিক সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে দিনরাত একান্তভাবে নিয়োজিত ও কর্মরত থাকবে। শুধু তাই নয়, সামাজিক-সামষ্টিক নিয়ম-শৃঙ্খলা বিধান, সংরক্ষণ ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিও থাকতে হবে, যার মধ্যে এই দায়িত্বশীলতার জন্য জবাবদিহির তীব্র অনুভূতিও থাকতে হবে। এ কারণে মানব-সমাজের ইতিহাসে এমন কোন অধ্যায়ের সন্ধান পাওয়া যায় না, সেখানে এইরূপ দায়িত্বশীল বলতে কেউ কোথাও নেই। সভ্য ও আধুনিক সমাজের তো কোন প্রশ্নই উঠে না। প্রাচীন আদিম অসভ্য বর্বর সমাজেও এইরূপ দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে আমরা দেখি সমাজ প্রধান বা গোত্র সরদারকে। গোটা সমাজ বা গোত্র যেমন তার নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে, তেমনি সেই সমাজ ও গোত্রের-কবীলার-সার্বিক সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য তাকেই কাজ করত হয়, সে কাজ যথাযথরূপে সম্পন্ন হলো কি না, সেজন্য তাকে সেই সমাজ বা গোত্রের জনগণের নিকট জবাবদিহিও করতে হয়।
বৃহত্তর ও আধুনিক সম্প্রসারিত জীবন-প্রেক্ষিতে এই দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বই আত্মপ্রকাশ করেছে সরকার বা প্রশাসনিক সংস্থা রূপে। এইরূপ একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা ও তার সদা কার্যকরতা ব্যতীত কোন সমাজের অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না। ইসলাম তাই এরূপ সংস্থা প্রতিষ্ঠিত করার উপর যথেষ্ট তাকীদ পেশ করেছে। এরূপ একটি সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন জীবনই মানুষের জন্য সম্ভব বলে ইসলাম বিশ্বাস করে। এরূপ একটি জীবনেই সম্ভব ইসলামী আদর্শের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও পালন-অনুসরণ। এরূপ একটি জীবনেই আশা করা যায়, মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ। এক কথায় মানুষের সার্বিক কল্যাণ এরূপ একটি সংস্থাধীন জীবন ছাড়া কল্পনাও করা যায় না।
📄 নবী করীম (স)-এর পরবর্তী মুসলিম জীবন
নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কিরাম-মুসলিম সমাজ-একটি নতুন সরকার-সংস্থা গড়ে তোলার অপরিহার্য প্রয়োজনের কথা তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন। কেননা নবী করীম (স) জীবদ্দশায় মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, প্রশাসক ছিলেন, আইনের মাধ্যম ছিলেন, প্রধান বিচারপতি ছিলেন, আদর্শিক নেতা ও পরিচালক ছিলেন। তিনি ইন্তেকাল করলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত একটি সংস্থা ও ব্যক্তিত্ব ছাড়া মুসলিম জনগণের জীবন চলতেই পারে না। তাই অনতিবিলম্বেই- এমনকি রাসূলে করীম (স) এর কাফন-দাফনেরও পূর্বে এ কাজ করার প্রয়োজনীয়তা সকলেই বুঝতে পেরেছিলেন বলেই একত্রিত হয়ে নিজেদের মধ্য থেকে একজন প্রশাসক, প্রশাসন-পরিচালন-সংরক্ষণ ইত্যাদি যাবতীয় কাজের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব দানকারী একজন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সর্ববাদীসম্মতভাবেই হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)-কে মুসলমানদের প্রথম খলীফা নির্বাচিত করেছিলেন।
সাহাবায়ে কিরাম (রা) এর এই কর্ম পদ্ধতিতে একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে রাসূলে করীম (স)-এর কাফন-দাফনের চাইতেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামো ও ব্যবস্থাকে কার্যকর করা。
নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কিরাম-মুসলিম সমাজ-একটি নতুন সরকার-সংস্থা গড়ে তোলার অপরিহার্য প্রয়োজনের কথা তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন। কেননা নবী করীম (স) জীবদ্দশায় মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, প্রশাসক ছিলেন, আইনের মাধ্যম ছিলেন, প্রধান বিচারপতি ছিলেন, আদর্শিক নেতা ও পরিচালক ছিলেন। তিনি ইন্তেকাল করলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত একটি সংস্থা ও ব্যক্তিত্ব ছাড়া মুসলিম জনগণের জীবন চলতেই পারে না। তাই অনতিবিলম্বেই- এমনকি রাসূলে করীম (স) এর কাফন-দাফনেরও পূর্বে এ কাজ করার প্রয়োজনীয়তা সকলেই বুঝতে পেরেছিলেন বলেই একত্রিত হয়ে নিজেদের মধ্য থেকে একজন প্রশাসক, প্রশাসন-পরিচালন-সংরক্ষণ ইত্যাদি যাবতীয় কাজের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব দানকারী একজন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সর্ববাদীসম্মতভাবেই হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)-কে মুসলমানদের প্রথম খলীফা নির্বাচিত করেছিলেন।
সাহাবায়ে কিরাম (রা) এর এই কর্ম পদ্ধতিতে একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে রাসূলে করীম (স)-এর কাফন-দাফনের চাইতেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামো ও ব্যবস্থাকে কার্যকর করা。
📄 জনগণ তাদের ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল (আল্লাহর খলীফা ও আমানতদার হিসাবে)
ইসলামী ফিক্হ'র একটি মৌল-নীতি হচ্ছে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজস্ব ধন- মালের জন্য দায়িত্বশীল। বস্তুত মানুষ যখন তার ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল, তখন অনিবার্যভাবে তার নিজের জন্যও দায়িত্বশীল হবে। তাইলে কোন ধন-মালের উপর তার মালিকের অনুমতি ছাড়া কোনরূপ হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকারই অন্য কারোর থাকতে পারে নয়। আর অন্য কেউ যদি কারোর ধন-মালের উপর কর্তৃত্ব করতে না-ই পারে তাহলে কারোর জীবন, সম্ভ্রম ও ব্যক্তিত্বের উপর অন্য লোকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার কোন অধিকার যে দিতে পারে না; তা আরও বলিষ্ঠভাবে বলা যায়। কোন লোক কারোর স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে না; কারোর অনুমতি ব্যতীত তার শক্তি-সামর্থ্য ও মান-মর্যাদার উপর কেউ কোনরূপ হস্তক্ষেপ করবে কেউ নিজের মর্জী চালাবে, তা কোন ক্রমেই জায়েয হতে পারে না। কেননা এ হচ্ছে মানুষ সম্পর্কে একদিকের কথা।
আর অপর দিকের কথা হচ্ছে, কোনরূপ সামাজিক-সামষ্টিক সংস্থা বা প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হলে অন্য লোকদের স্বভাব ও শরীয়াতসম্মত অধিকার, আযাদীও ধন-মালের উপর হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি করা একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
এ দুটি কাজ পরস্পর বিরোধী। অথচ এই পরস্পর কাজ দুটি একত্রিত করা না গেলে কোন সমাজিক-সামষ্টিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা কখনই এবং কোনক্রমেই সম্ভব হতে পারে না। আর এই উদ্দেশ্যেই সরকার তথ্য প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তুলতে হয়। এই প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলার কাজটি সম্পন্ন হবে জনগণের ধন-মালের ও স্বাধীনতার উপর তাদেরই অনুমতিক্রমে হস্তক্ষেপ করার মাধ্যমে। আর সে হস্তক্ষেপের জন্য, প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়া যেতে পারে প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পন্ন ব্যক্তির নির্বাচনে জনগণের ভোটদানের মাধ্যমে। এই ভোটদান কার্যত প্রমাণ করছে যে, সে তার ধন-মাল ও স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করার সুযোগ অন্য কাউকে দেয়ার এই পন্থা ও নীতিকে পূর্ণভাবে সমর্থন করে এবং সে একজনকে ভোট দিয়ে তার পক্ষে সেই কাজ করার জন্য অনুমতি প্রদান করছে।
আরও স্পষ্ট কথায় বললে বলতে হয়, মানব সমাজে যে প্রশাসন ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠিত করা হবে, তাতে অবশ্যই জনগণের ধন-মাল ও চিন্তা-বিশ্বাসের উপর একটা কর্তৃত্ব অবশ্যই চালাতে হয়। সে ব্যবস্থায় শুধু বিভিন্ন প্রকারের 'কর আদায় করা ও আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রণ করাই একমাত্র কাজ হয়ে নাফসিসে সবের উপর মানা রূপ বাধ্যবাধকতাও আরোপ করবে, তাতে তার স্বাধীনতাকে অনেকটা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত করা হবে, সম্পর্ক ভিন্নভাবে স্থাপন করা হবে, যুদ্ধের ময়দানে সেনাবাহিনী প্রেরণ করতে হবে এবং সাধারণ লোকদেরকে যুদ্ধ সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত করা হবে। এ ধরনের আরও যেসব কাজ জনগণের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচিত হবে, তা সবই করা হবে। এরূপ একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বিবেক-বুদ্ধি-বিবেচনা ও শরীয়াতের তাকীদ অনুযায়ী একান্তই কর্তব্য হয়ে পড়ে। আর সেজন্য একটি শক্তিসম্পন্ন সরকার ও প্রশাসনিক কাঠামো কায়েম করা ছাড়া অন্য কোন উপায়ই থাকতে পারে না। যদিও তা ইসলাম মানুষকে তার নিজের ও তার ধন-মালের উপর যে কর্তৃত্ব দিয়েছে, তার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। এই সাংঘর্ষিকতা বিদূরিত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে, জনগণকে আল্লাহ্ খলীফা ধরে নিয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের খিলাফতী-অধিকার স্বীকার করে জনগণের মর্জী ও সমর্থন-অনুমোদনের ভিত্তিতে এমন একটি প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা। এই সংস্থা যেসব কাজই করবে, তাতে জনগণের সমর্থন ও অনুমোদন আছে বলেই মনে করা যাবে এবং এভাবে তা সামষ্টিকভাবে আল্লাহর খিলাফতের বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করবে。
টিকাঃ
১. এই পর্যায়ে কোন কোন মহল রাসূলে করীম (স)-এর একটি কথা হিসেবে প্রচার করেঃ الناس مسلطون على الموالهم 'তার ধন-মালের উপর কর্তৃত্বশীল।' কিন্তু এর সনদ কিরূপ এবং সিহাহ সিত্তার কোন গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে কি না তা আমি নিশ্চিতভাবে ধরতে পারব না। গ্রন্থকার
ইসলামী ফিক্হ'র একটি মৌল-নীতি হচ্ছে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজস্ব ধন- মালের জন্য দায়িত্বশীল। বস্তুত মানুষ যখন তার ধন-মালের জন্য দায়িত্বশীল, তখন অনিবার্যভাবে তার নিজের জন্যও দায়িত্বশীল হবে। তাইলে কোন ধন-মালের উপর তার মালিকের অনুমতি ছাড়া কোনরূপ হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকারই অন্য কারোর থাকতে পারে নয়। আর অন্য কেউ যদি কারোর ধন-মালের উপর কর্তৃত্ব করতে না-ই পারে তাহলে কারোর জীবন, সম্ভ্রম ও ব্যক্তিত্বের উপর অন্য লোকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার কোন অধিকার যে দিতে পারে না; তা আরও বলিষ্ঠভাবে বলা যায়। কোন লোক কারোর স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে না; কারোর অনুমতি ব্যতীত তার শক্তি-সামর্থ্য ও মান-মর্যাদার উপর কেউ কোনরূপ হস্তক্ষেপ করবে কেউ নিজের মর্জী চালাবে, তা কোন ক্রমেই জায়েয হতে পারে না। কেননা এ হচ্ছে মানুষ সম্পর্কে একদিকের কথা।
আর অপর দিকের কথা হচ্ছে, কোনরূপ সামাজিক-সামষ্টিক সংস্থা বা প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হলে অন্য লোকদের স্বভাব ও শরীয়াতসম্মত অধিকার, আযাদীও ধন-মালের উপর হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি করা একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
এ দুটি কাজ পরস্পর বিরোধী। অথচ এই পরস্পর কাজ দুটি একত্রিত করা না গেলে কোন সমাজিক-সামষ্টিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা কখনই এবং কোনক্রমেই সম্ভব হতে পারে না। আর এই উদ্দেশ্যেই সরকার তথ্য প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তুলতে হয়। এই প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলার কাজটি সম্পন্ন হবে জনগণের ধন-মালের ও স্বাধীনতার উপর তাদেরই অনুমতিক্রমে হস্তক্ষেপ করার মাধ্যমে। আর সে হস্তক্ষেপের জন্য, প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়া যেতে পারে প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পন্ন ব্যক্তির নির্বাচনে জনগণের ভোটদানের মাধ্যমে। এই ভোটদান কার্যত প্রমাণ করছে যে, সে তার ধন-মাল ও স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করার সুযোগ অন্য কাউকে দেয়ার এই পন্থা ও নীতিকে পূর্ণভাবে সমর্থন করে এবং সে একজনকে ভোট দিয়ে তার পক্ষে সেই কাজ করার জন্য অনুমতি প্রদান করছে।
আরও স্পষ্ট কথায় বললে বলতে হয়, মানব সমাজে যে প্রশাসন ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠিত করা হবে, তাতে অবশ্যই জনগণের ধন-মাল ও চিন্তা-বিশ্বাসের উপর একটা কর্তৃত্ব অবশ্যই চালাতে হয়। সে ব্যবস্থায় শুধু বিভিন্ন প্রকারের 'কর আদায় করা ও আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রণ করাই একমাত্র কাজ হয়ে নাফসিসে সবের উপর মানা রূপ বাধ্যবাধকতাও আরোপ করবে, তাতে তার স্বাধীনতাকে অনেকটা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত করা হবে, সম্পর্ক ভিন্নভাবে স্থাপন করা হবে, যুদ্ধের ময়দানে সেনাবাহিনী প্রেরণ করতে হবে এবং সাধারণ লোকদেরকে যুদ্ধ সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত করা হবে। এ ধরনের আরও যেসব কাজ জনগণের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচিত হবে, তা সবই করা হবে। এরূপ একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বিবেক-বুদ্ধি-বিবেচনা ও শরীয়াতের তাকীদ অনুযায়ী একান্তই কর্তব্য হয়ে পড়ে। আর সেজন্য একটি শক্তিসম্পন্ন সরকার ও প্রশাসনিক কাঠামো কায়েম করা ছাড়া অন্য কোন উপায়ই থাকতে পারে না। যদিও তা ইসলাম মানুষকে তার নিজের ও তার ধন-মালের উপর যে কর্তৃত্ব দিয়েছে, তার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। এই সাংঘর্ষিকতা বিদূরিত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে, জনগণকে আল্লাহ্ খলীফা ধরে নিয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের খিলাফতী-অধিকার স্বীকার করে জনগণের মর্জী ও সমর্থন-অনুমোদনের ভিত্তিতে এমন একটি প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলা। এই সংস্থা যেসব কাজই করবে, তাতে জনগণের সমর্থন ও অনুমোদন আছে বলেই মনে করা যাবে এবং এভাবে তা সামষ্টিকভাবে আল্লাহর খিলাফতের বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করবে。
টিকাঃ
১. এই পর্যায়ে কোন কোন মহল রাসূলে করীম (স)-এর একটি কথা হিসেবে প্রচার করেঃ الناس مسلطون على الموالهم 'তার ধন-মালের উপর কর্তৃত্বশীল।' কিন্তু এর সনদ কিরূপ এবং সিহাহ সিত্তার কোন গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে কি না তা আমি নিশ্চিতভাবে ধরতে পারব না। গ্রন্থকার