📄 দাউদ (আ)-এর খিলাফত আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বের অধীন
আল্লাহ্ তা'আলা হযরত দাউদ (আ)-কে পৃথিবীতে তাঁর খলীফা নিযুক্ত করেছিলেন। আল্লাহ্ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তিনি আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে তাঁরই দেয়া বিধান অনুযায়ী শাসন-প্রশাসনের কাজ সুসম্পন্ন করেই এই খিলাফতের দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি পূর্ণ সত্যতা, সততা ও নিরপেক্ষ ন্যায়পরতা সহকারে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন। কুরআনে উদ্ধৃত হয়েছে আল্লাহ্ ঘোষণাঃ
يداوُدُ إِنَّا جَعَلْنَكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ (ص: ٢٦)
হে দাউদ! আমরাই তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করেছি। অতএব তুমি জনগণের মধ্যে পরম সত্যতা-সততা-ন্যায়পরতা সহকারে শাসন-কার্য পরিচালনা কর।
আদম (আ)-কে লক্ষ্য করে 'খলীফা' বানাবার ঘোষণা এবং হযরত দাউদ (আ)-কে সম্বোধন করে বলা এই 'খলীফা' মূলত একই-এ দুয়ের মধ্যে মৌলিকভাবে কোন পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, এখানে হযরত দাউদ (আ)-কে ব্যক্তিগতভাবে খলীফা বানাবার কথা বলা হয়েছে। আর হযরত আদমের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে সমস্ত আদম বংশধরদের খলীফা বানাবার সংকল্প ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) খিলাফতের প্রথমোক্ত দিকটির প্রতি ইঙ্গিত করে অর্থ করেছেন এভাবেঃ 'সে দুনিয়ায় ফসল উৎপাদনে, ফল বের করণে ও খাল-নদী তৈরী করার ক্ষেত্রে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে।'
আর দ্বিতীয়, উক্ত দিকে ইঙ্গিত করে তার তাফসীর করেছেন এই বলেঃ সৃষ্টিকূলের উপর শাসন-প্রশাসন চালানোর ক্ষেত্রে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে। আর খলীফা হবেন আদম ও তাঁর সন্তানদের মধ্যে যারাই তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবে। ১
টিকাঃ
১. التبيان ج ۱، ص ۱۳۱
📄 শাসন প্রশাসন ব্যবস্থা—হুকুমাত—ছাড়া আমানত আদায় করা সম্ভব নয়
কুরআন মজীদে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ তা'আলা 'আমানত' গ্রহণের জন্য সমস্ত জিনিসের নিকট প্রস্তাব পেশ করেছেন- আসমান যমীন ইত্যাদিকে এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলেছেন। কিন্তু সবকিছুই তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। এ পর্যায়ে আল্লাহ্ কথা হচ্ছেঃ
إِنَّ عَرَضنَا الأَمَانَةَ عَلَى السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَالجِبَالِ فَأَبَيْنِ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانَ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا - لِيُعَذِّبَ اللَّهُ الْمُنْفِقِينَ وَالْمُنفِقْتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكْتِ وَيَتُوبُ اللهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ ، وَكَانَ اللَّهُ غفورا رحيما (الاحزاب: ۷۲-۷۳)
আমরা এই আমানতকে আকাশমণ্ডল, যমীন ও পাহাড়-পর্বতের সম্মুখে পেশ করেছি। কিন্তু ওরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে, ওরা ভয় পেয়ে গেছে। কিন্তু মানুষ তা নিজের স্কন্ধে তুলে নিয়েছে। বস্তুত মানুষ যে জালিম ও জাহিল তাতে সন্দেহ নেই। আমানতের এই দুর্বহ বোঝা গ্রহণ করার অনিবার্য পরিণাম হলো, আল্লাহ্ মুনাফিক পুরুষ স্ত্রীলোক ও মুশরিক পুরুষ-স্ত্রীলোকদের শাস্তি দেবেন ও মু'মিন পুরুষ-স্ত্রীলোকদের তওবা কবুল করবেন। বস্তুত আল্লাহ্ অতীব ক্ষমাশীল এবং অশেষ দয়াবান।
আয়াতটিতে যে আমানতের কথা বলা হয়েছে, সে 'আমানত' বলে কি বুঝিয়েছে? ইমাম কুরতুবী ও অন্যান্য মুফাস্সির বলেছেনঃ 'তা হচ্ছে সাধারণভাবে দ্বীন পালনের যাবতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য।' এ পর্যায়ে যত কথা বলা হয়েছে, তন্মধ্যে এই মতই অধিক সহীহ্। ১ আল্লামা তাবরিযী লিখেছেনঃ আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষের যে সব হুকুম-আহকাম, কর্তব্য ও সীমাসমূহ নাযিল করেছন, তা সবই আমানত এবং এ আমানত রক্ষার দায়িত্ব মানুষ গ্রহণ করেছে। ২
আর একথা তো নিঃসন্দেহ যে, মানুষ এই আমানত গ্রহণ করেছিল তা যথাযথভাবে পালন ও কার্যকর করার উদ্দেশ্যে। তাই এ কথায়ও কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না যে, আল্লাহর নাযিল করা হুকুম-আহকাম-আইন-বিধান, কর্তব্য ও সীমাসমূহ মানব জীবনে কার্যকর করা এমন একটি হুকুমত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়া কখনই সম্ভব হতে পারে না, যা মূলত আল্লাহর দ্বীনের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে, যা গড়ে তুলবে মু'মিন উম্মত এই মনোভাব সহকারে যে, এইরূপ একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীন আল্লাহর আনুগত্য ভিত্তিক জীবন যাপন করা সম্ভব, অন্য কোন ধরনের শাসন ব্যবস্থার অধীন তা সম্ভবপর নয়।
দ্বিতীয় আয়াতটি يُعَذِّبَ اللَّهُ যেন আল্লাহ্ আযাব দেন........ উল্লিখিত আমানতের নিগূঢ় সত্য কথা উদ্ঘাটিত ও প্রকাশিত করছে। বোঝা যাচ্ছে যে, 'আমানত' ধারণকারী মানুষ মু'মিন, মুশরিক ও মুনাফিক-এই তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। মানুষকে এইরূপ বিভক্তকরণ কেবল সত্য আকীদা গ্রহণ ও দ্বীন পালনের দৃষ্টিতেই সম্ভব হতে পারে! এ দৃষ্টিতে মু'মিন সে, যে দ্বীন পালন ও কায়েম করবে। এ ক্ষেত্রে যারা শিরক-এ লিপ্ত হবে, তারা মুশরিক হবে। তারা কিছুটা দ্বীন পালন করলেও দ্বীন-বিরোধী কার্যকলাপই বেশী করবে। আর মুনাফিক বলে চিহ্নিত হবে সেইসব লোক, যারা দ্বীনের প্রতি ঈমানদার বলে বাহ্যত দাবি ও প্রচার করবে কিন্তু আসলে ও প্রকৃতপক্ষে দ্বীনের প্রতি তারা ঈমানদারও নয়, নয় তারা দ্বীন পালনকারীও।
প্রথম আয়াতের শেষাংশে মানুষকে 'যালুম' ও 'জাহল' বলা হয়েছে তো এই কারণে যে, মানুষ সামষ্টিকভাবে এই আমানত বহন করার দায়িত্ব গ্রহণ করেও তারা তাতে খিয়ানত করেছে, কার্যত আমানতের দায়িত্ব বহন করেনি। ফলে মানুষ মু'মিন, মুশরিক ও মুনাফিক- এই তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। মু'মিন হয়েছে তারা, যারা ওয়াদা অনুযায়ী কাজ করেছে-কার্যত দ্বীন পালনের দায়িত্ব বহন করেছে। মুনাফিক হয়েছে তারা, যারা প্রকৃত অবস্থার বিপরীত বাইরে প্রকাশ করেছে কেননা তারা অন্তর দিয়ে দ্বীনের প্রতি ঈমান না এনেও নিজেদেরকে ঈমানদার বলে যাহির করেছে। আর মুশরিক হয়েছে তারা, যারা এক আল্লাহর প্রতি ঐকান্তিক-আন্তরিক ঈমান গ্রহণ করতে পারেনি-অন্যান্য শক্তির প্রতিও ঈমান এনেছে এবং কার্যত এক আল্লাহর দেয়া বিধান পালন করেনি। কিছুটা আল্লাহর বিধান আর কিছুটা মানুষের মনগড়া বিধান পালন করেছে। কার্যত নফসের খায়েশাতেরই অনুসরণ করেছে।
টিকাঃ
১. الجامع لاحكام القرآن ج ۱۴ ص ২০২
২. التبیان ج ۸. ص ۵۰۳
📄 শাসনকার্য পরিচালনা ও নেতৃত্বদানে খিলাফত
পূর্ববর্তী দীর্ঘ আলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, মানুষ এ পৃথিবীতে আল্লাহ্ খলীফা। এ খিলাফত কার্যত শাসনকার্য পরিচালনা ও নেতৃত্ব দানে বাস্তবায়িত হবে।
পূর্বোল্লিখিত আয়াতসমূহ থেকে খিলাফতের এই তাৎপর্যই প্রতিভাত হচ্ছে। শাসনকার্যের এই নেতৃত্ব দান নিঃসন্দেহে সেই নেতৃত্ব থেকে মৌলিকভাবেই সম্পূর্ণ ভিন্নতর, যা সাধারণত দুনিয়ার আল্লাহদ্রোহী ব্যক্তিরা, রাজা-বাদশাহ স্বৈরতন্ত্রীরা দিয়ে থাকে। এ সব লোক যুগের পর যুগ ধরে জনগণের উপর নির্মম স্বৈর শাসন চালিয়ে যাচ্ছে, তার সাথে কুরআনে উপস্থাপিত খিলাফতের-শাসনকার্য পরিচালনায় নেতৃত্বদানের দূরতম কোন সম্পর্কই নেই। ওদের এ স্বৈর শাসন যদিও আল্লাহর নামেই দুর্বল-অক্ষম-অসহায় মানবকূলের উপর চালানো হচ্ছে। কিন্তু আসলে ওরা নিজেরাই নিজেদেরকে মানুষের উপর আল্লাহ্ আসনে বসাচ্ছে, মানুষের উপর প্রভুত্ব করে যাচ্ছে।
উপরন্তু খিলাফতের শাসনকার্য ও ওদের স্বৈর শাসন যেমন কোন দিক দিয়েই এক নয়, তেমনি একটি সমাজ-সমষ্টির জন্য আল্লাহ্র নিকট থেকে সার্বভৌমত্ব প্রদানও অভিন্ন নয়। একটি সমাজ-সমষ্টির জন্য আল্লাহর দেয়া সার্বভৌমত্ব মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্ব মাত্র। আল্লাহর খিলাফত আল্লাহর শাসন-নীতিরই বাস্তবায়ন মাত্র। শাসকের স্বেচ্ছাচারিতা করার একবিন্দু অবকাশ সেখানে নেই।
খিলাফতে আল্লাহই হচ্ছেন সার্বভৌমত্বের একক অধিকারী, মানুষের নিকট যে কর্তৃত্বটুকু আসে, আল্লাহ্-ই হচ্ছেন তার একমাত্র উৎস। আর আল্লাহর বিধান শরীয়াত-ই তথায় একমাত্র শাসন ব্যবস্থা। শরীয়াত মানুষকে যতটা সীমাবদ্ধ দেয়, মানুষকে তথায় ততটা সীমার মধ্যে থেকেই শাসনকার্য পরিচালনা ও নেতৃত্ব দান করতে হয়। সে শরীয়াতকে ইচ্ছামত পরিবর্তন বা ব্যাখ্যা দানের কোন অধিকারই মানুষের থাকতে পারে না।
এই কারণে খিলাফতের শাসন ব্যবস্থায় মানুষ আল্লাহ্র সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করে আল্লাহর নিকট অক্ষরে অক্ষরে জবাবদিহি করার তীব্র অনুভূতি সহকারে। কেননা এখানে কোন মানুষই নিরংকুশ কর্তৃত্বের অধিকারী হয় না। গোটা সমাজ-সমষ্টিও নয়। আল্লাহ্র অর্পিত আমানত রক্ষা এবং সে জন্য তাঁরই নিকট জবাবদিহি করার তীব্র অনুভূতিতে প্রতি মুহূর্তেই কম্পমান হয়ে থাকা একান্তই অপরিহার্য গুণ।
📄 সরকার সংগঠনে সামষ্টিক দায়িত্ব
পূর্বোদ্ধৃত আয়াতসমূহ অনিবার্যভাবে প্রমাণ করছে যে, আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী মুসলিম উম্মতের কর্তব্য হচ্ছে-ইসলামী আইন-কানুনের পরিমণ্ডলে একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এখানে এ দায়িত্ব যেমন গোটা মুসলিম উম্মতের উপর সাধারণভাবে অর্পিত, তেমনি কোন ব্যক্তির অধিকার নেই নিজেকে গোটা উম্মতের উপরে চাপিয়ে বসানোর এবং তাদের ইচ্ছা-মর্জী-অনুমতি ব্যতিরেকে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব দখল করে বসার।
বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের পূর্বে একটি প্রশ্নের সুস্পষ্ট জবাব নির্ধারণ আবশ্যক। প্রশ্নটি হচ্ছেঃ
বাহ্যিক পটভূমিতে সমাজ-সমষ্টির কোন অস্তিত্ব আছে কি, যা ব্যক্তির অস্তিত্ব থেকে স্বতন্ত্র ও বাস্তব? কিংবা তা ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির একাত্ম হওয়ার কোন আপেক্ষিক বা কল্পিত রূপ মাত্র?
পূর্বোদ্ধৃত আয়াতসমূহ অনিবার্যভাবে প্রমাণ করছে যে, আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী মুসলিম উম্মতের কর্তব্য হচ্ছে-ইসলামী আইন-কানুনের পরিমণ্ডলে একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এখানে এ দায়িত্ব যেমন গোটা মুসলিম উম্মতের উপর সাধারণভাবে অর্পিত, তেমনি কোন ব্যক্তির অধিকার নেই নিজেকে গোটা উম্মতের উপরে চাপিয়ে বসানোর এবং তাদের ইচ্ছা-মর্জী-অনুমতি ব্যতিরেকে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব দখল করে বসার।
বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের পূর্বে একটি প্রশ্নের সুস্পষ্ট জবাব নির্ধারণ আবশ্যক। প্রশ্নটি হচ্ছেঃ
বাহ্যিক পটভূমিতে সমাজ-সমষ্টির কোন অস্তিত্ব আছে কি, যা ব্যক্তির অস্তিত্ব থেকে স্বতন্ত্র ও বাস্তব? কিংবা তা ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির একাত্ম হওয়ার কোন আপেক্ষিক বা কল্পিত রূপ মাত্র?