📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 সাধারণ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন

📄 সাধারণ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন


কুরআন, সুন্নাতে রাসূল ও প্রাথমিক কালের মুসলিম উম্মতের ইতিহাস স্পষ্টভাবে পথ-নির্দেশ করে যে, মুসলিম উম্মত তাদের শাসক, প্রশাসক ও নেতা নির্বাচন করবে। অবশ্য তা তারা করবে ইসলামী নিয়ম-কানুন অনুযায়ী ও ইসলাম নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে। মুসলিম উম্মতের এই শাসক ও নেতা নির্বাচনের অধিকারই ইসলামী সরকারের প্রকৃতি নির্ধারণ করে। আর এ নির্বাচন পদ্ধতিই ইসলামী হুকুমাতকে দুনিয়ায় প্রচলিত গণতান্ত্রিক ও অন্যান্য সরকার পদ্ধতিসমূহ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে।

এ পর্যায়ের দলীলঃ ১. কুরআন মজীদের কতিপয় আয়াত স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছে যে, মানুষ এই যমীনে আল্লাহর খলীফা। খলীফা হওয়ার ব্যাপারে মানুষে মানুষে কোন তারতম্য বা পার্থক্য নেই। সকল মানুষ সম্পূর্ণ সমান ও পার্থক্যহীনভাবেই আল্লাহর খলীফা। মানুষের এই খিলাফত দুনিয়ায় শেষ পর্যন্ত এক চিরন্তন সত্য হিসেবেই স্বীকৃত এবং ঘোষিত। কিয়ামত পর্যন্ত তাতে কোন পরিবর্তনই সূচিত হবে না।

কুরআন মজীদে মানব সৃষ্টির ইতিহাস উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়েছে, মানুষ যখন সৃষ্টি হয় নি সেই সময় মানব সৃষ্টির সংকল্প প্রকাশ করে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা দিয়েছিলেনঃ
رَبِّى جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً (البقرة : ١٣٠)
আমি পৃথিবীতে খলীফা বানাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।

আল্লাহর ঘোষিত এই খিলাফত ব্যক্তি বিশেষের জন্য বা কোন মানুষের জন্য ব্যক্তিগতভাবে নির্দিষ্ট করা হয়নি। বরং অতঃপর তিনি যে 'আদমকে' সৃষ্টি করলেন, তার সমস্ত বংশধর- সমস্ত মানুষই খলীফা রূপে চিহ্নিত হয়েছিল। কেননা আল্লাহর এই ঘোষণা শ্রবণ করে ফেরেশতাগণ 'খলীফা' সম্পর্কে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেনঃ
اَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ تُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ ( البقر : ٣٠)
হে আল্লাহ্, তুমি দুনিয়ায় এমন এক মাখলুক বানাবে, যা তথায় বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে এবং রক্তের বন্যা প্রবাহিত করবে?

ফেরেশতাদের এ আশঙ্কা নিশ্চয় প্রথম সৃষ্ট ব্যক্তি আদমের ব্যাপারে ছিল না, তা ছিল সেই আদমের বংশধরদের ব্যাপারে। অর্থাৎ ফেরেশতাদের আশঙ্কা ছিল, সমগ্র বিশ্বলোকের প্রতিটি বস্তু ও অণু-পরমাণু যখন একান্তভাবে আল্লাহর অনুগত হয়ে আছে, সেখানে 'খলীফা' পদবাচ্য কোন স্বাধীন ইচ্ছাসম্পন্ন সৃষ্টির অবকাশ কোথায়? তাহলে তো তারা এমন-এমন কাজ করতে থাকবে, যার ফলে এই দুনিয়ার শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ভাঙন ও বিপর্যয় দেখা দেয়া এবং রক্তের বন্যা বয়ে যাওয়া একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়বে। স্মরণীয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদের এই আশঙ্কা বোধকে প্রতিবাদ করেন নি, অমূলক বলে উড়িয়েও দেন নি।

এ থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, আল্লাহর 'খলীফা' বানানোর ঘোষণাটি কোন বিশেষ ব্যক্তির জন্য ছিল না, ছিল সমগ্র মানব বংশের জন্য, মানব-বংশের প্রতিটি সন্তানের জন্য। প্রতিটি মানুষ-ই-সে পুরুষ হোক বা নারী-আল্লাহর খলীফা। কেননা- ফেরেস্তাদের আশংকা নিশ্চয়ই ব্যক্তি আদম সম্পর্কে ছিল না, ছিল সমগ্র আদম সন্তানের ব্যাপারে, সমস্ত মানুষের ব্যাপারে। অতএব প্রত্যেকটি মানুষেরই আল্লাহ্র 'খলীফা 'হওয়া অনিবার্যভাবে সুনিশ্চিত।

এ পর্যায়ের আরও কতিপয় আয়াত থেকে এই কথায়ই স্পষ্ট সমর্থন পাওয়া যায়। একটি আয়াতঃ
هُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ فِي الْأَرْضِ (فاطر : ৩৯)
সেই আল্লাহ্-ই তোমাদেরকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছেন।

এ আয়াতে একবচনে 'খলীফা' শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি; বরং বহুবচনের শব্দ خَلَائِفَ 'খলীফাগণ' ব্যবহৃত হয়েছে। এ থেকে তো অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা একজন নয়-কোন এক ব্যক্তি নয়, ব্যক্তিগতভাবে কেউ আল্লাহর খলীফা নয়। বরং প্রত্যেকটি মানুষই আল্লাহর খলীফা। এই মানুষগণই আল্লাহর খলীফাগণ।

আর একটি আয়াতঃ
امَنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا وَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلَكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ وَ إِلهُ مَعَ الله (النمل: (৬২)
কে সেই মহান সত্তা, যিনি ব্যাকুল ও বিপন্ন-অস্থির ব্যক্তির দোয়া শুনেন যখন সে তাঁকে ডাকে এবং কে তার কষ্ট ও বিপদ দূর করেন, (আর কে তিনি) যিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করেন?.... আল্লাহ্র সাথে অপর কোন ইলাহ্ আছে কি?

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হচ্ছে যে, বিপন্ন মানুষের দোয়া শুনেন একমাত্র আল্লাহ্ এবং তাদের বিপদ ও দুঃখ-কষ্ট কেবলমাত্র তিনি-ই দূর করেন। তিনি ছাড়া এ কাজ করার আর কেউ কোথাও নেই। এ-ই হচ্ছে কুরআন উপস্থাপিত প্রকৃত তওহীদী আকীদা। এই তওহীদী আকীদারই অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে, আল্লাহই মানুষকে দুনিয়ায় তাঁর খলীফা নিযুক্ত করেছেন। এ দুনিয়ায় মানুষ যা-ই করবে, তা যদি আল্লাহ্ খলীফা হিসেবে করে, তা হলেই সে তা করার অধিকারী হবে। অন্যথায় তা করার কোন অধিকারই তার থাকতে পারে না। এই খলীফা হওয়ার অধিকার সর্বজনীন- সকল মানুষের ক্ষেত্রে একেবারে সাধারণ।

বলা বাহুল্য, মানুষের এ 'খিলাফত' পূর্ববর্তী কোন সৃষ্টি সমষ্টির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দিক দিয়ে নয়। পূর্ববর্তী কোন সৃষ্টির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দিক দিয়ে মানুষকে খলীফা বলা হয়ে থাকলে কথাটি এভাবে বলার কোন প্রয়োজন ছিল না। সে কথার ধরনই সম্পূর্ণ ভিন্নতর। যেমন এ দিক দিয়েও মানুষকে 'খলীফা' করা হয়েছে কোন কোন আয়াতে। যেমন এই আয়াতটিতেঃ
ثُمَّ جَعَلْنَكُمْ خَلْيْفَ فِي الْأَرْضِ مِنْ بَعْدِهِمْ (يونس: ١٤)
অতঃপর তোমাদেরকেই পৃথিবীতে তাদের পরে স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি বানালাম।

উপরোদ্ধৃত আয়াতসমূহের সারকথা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টিকূলের মধ্যে অত্যন্ত মর্যাদাবান বানিয়েছেন, তাকে পৃথিবীতে তাঁর খলীফা বানিয়েছেন। ফলে মানুষ সমগ্র সৃষ্টিলোকের উপর এক বিশিষ্ট সৃষ্টিরূপে গণ্য হতে পারছে। এ মর্যাদা এই অসংখ্য সৃষ্টিকূলের মধ্যে আর কারোরই নেই। আর মানুষ যেহেতু দুনিয়ায় আল্লাহর খলীফা, এজন্যই আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তাকে সিজদা করার জন্য। এই সিজদা আসলে মানুষের অধীনতা ও বশ্যতা স্বীকারের প্রতীক। এ দুনিয়ায় আল্লাহর খলীফা হিসেবে মানুষ যা-ই করবে, ফেরেশতারা তাতে মানুষের আনুকূল্য করবে, সহযোগিতা করবে, সিজদা তারই নিঃশব্দ স্বীকৃতি মাত্র। সেই সাথে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বেরও স্বীকৃতি।

দুনিয়ায় মানুষকে আল্লাহর খলীফা বলে ঘোষণার ফলে দুটি কথা অনিবার্য হয়ে পড়ে।

১. মানুষ আল্লাহর খলীফা—আল্লাহ্ মহান নাম ও উচ্চতর পবিত্র গুণাবলীর বাস্তব রূপায়ণে।
মানুষ আল্লাহর খলীফা, সে তার অস্তিত্ব দ্বারাই মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের প্রমাণ ও প্রকাশ করছে। মানুষ এ দুনিয়ায় নানা জিনিস উদ্ভাবন করবে, নানা শিল্প কর্ম তৈয়ার করবে, আবিষ্কার করবে, নবোদ্ভাবন করবে, দিন-রাত কাজ করবে এবং এই সব করে মানুষ তার দুঃখকে হাল্কা করবে, অনুর্বরকে উর্বর করবে, বিরান স্থানকে আবাদ করবে, স্থলভাগকে জলভাগে ও জলভাগকে স্থলভাগে পরিণত করবে। গাছ-পালা রোপণ করবে, শ্যামল শোভামণ্ডিত বাগান রচনা করবে, পশু পালন করবে, তার বংশ বৃদ্ধি করবে। সে সবের মধ্যে কেউ ছোট হবে, কেউ বড় হবে। কোনটি গৃহপালিত হবে, আবার কোনটি বন্যই থেকে যাবে। এই সকল প্রকারের প্রজাতি দ্বারা মানুষ উপকৃত হবে, তাকে নিজের কাজে ব্যবহার করবে ঠিক যেমন প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক শক্তিসমূহ এবং অন্যান্য যাবতীয় সৃষ্টিকূক্লকে মানুষ নিজের ইচ্ছামত নানা কাজে ব্যবহার করছে।

যে আল্লাহ্ প্রত্যেকটি জিনিসকেই সৃষ্টি করেছেন এবং তার জন্য একটা বিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন اعطى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَى : মানুষকে ধন্য করেছেন। মানুষকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছেন, যেন মানুষ আল্লাহর সুন্নাতকে এখানে কার্যকর করে। তাঁর সৃষ্টি কুশলতাকে উদ্ভাসিত করে তোলে, তাঁর হিকমতের তত্ত্ব-রহস্যকে উদ্‌ঘাটিত করে, তাঁর বিধানের সার্বিক কল্যাণ মানুষ গ্রহণ করে। বস্তুত এ দুনিয়ায় আল্লাহর অসীম-বিস্ময়কর শক্তির ও ব্যাপক-গভীর-সূক্ষ্ণ জ্ঞানের বাস্তব নিদর্শনই হচ্ছে মানুষ। মানুষকে তিনি সর্বোত্তম মানে ও কাঠামোয় সৃষ্টি করেছেনঃ
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيْمِ
আর মানুষ তো এই সব দিক দিয়েই পৃথিবীতে আল্লাহ্র খলীফা।

প্রাকৃতিক-স্বাভাবিক ব্যাপারাদির ক্ষেত্রে মানুষ আল্লাহর খলীফা, তাই পৃথিবীকে আবাদ করা, আবর্জনা-জঞ্জাল মুক্ত করা, এখানে বসবাসের বিপদ সংকুলতা দূর করার দায়িত্ব মানুষের উপরই অর্পিত। আর এ দুনিয়ার সুষ্ঠু ব্যবস্থা করেই আল্লাহ্ লক্ষ্যকে বাস্তবায়িত করবে মানুষ। যেমন আল্লাহ্ বলেছেনঃ
هُوَ أَنْشَاكُمْ مِّنَ الْأَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ فِيهَا (هود : ٦١)
সেই আল্লাহই তোমাদেরকে যমীন থেকে পয়দা করেছেন এবং এখানেই তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

আল্লাহ্ তা'আলাই স্থান-যমীন ও পশুকূলেরও রব্ব। অতএব আল্লাহ্ খলীফা এই মানুষই সেই সম্পর্কিত যাবতীয় কাজের দায়িত্বশীল। হযরত আলী (রা) তাই বলেছেনঃ
إِنَّكُمْ مَسْئُولُونَ حَتَّى عَنِ الْبِقَاعِ وَالْبَهَائِمِ
তোমরাই দুনিয়ার স্থান ও পশুকূলের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।
সারকথা, মানুষ এ দুনিয়ায় প্রাকৃতিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহর দেয়া শক্তি ও ক্ষমতার বলে আল্লাহ্ সুবহানুহু'র প্রতিনিধি।

২. সেই সাথে মানুষ এ দুনিয়ার মানুষের সামষ্টিক ব্যাপারাদিতে নেতৃত্ব ও প্রশাসকত্বের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ খলীফা।
অর্থাৎ দুনিয়ায় মানুষের আল্লাহ্ খলীফা হওয়ার ব্যাপারটি শুধু উপরে উল্লিখিত ব্যাপারসমূহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষ দেশ শাসন ও জনগণকে নেতৃত্ব দানের ক্ষেত্রেও আল্লাহর খলীফা। কেননা মানুষ যখন দুনিয়ার স্থানসমূহের ব্যবস্থাপনা, জন্তু-জানোয়ারের রক্ষণাবেক্ষণ ও যাবতীয় ব্যাপারাদি সূচারুরূপে সম্পাদনের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল- কিয়ামতের দিন এইসব বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে তখন মানুষ তাদের নিজেদের ব্যাপারেও জিজ্ঞাসিত হবে অনিবার্যভাবে। মানুষের ব্যক্তিজীবন, সমাজ, রাষ্ট্র সরকার-প্রশাসন, শিক্ষা, অর্থনীতি ও বিচার ইনসাফ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত না হয়ে পারে না। আর জিজ্ঞাসিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, এসব ব্যাপারে তাদের কঠিন দায়িত্ব রয়েছে। অতএব এসব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দান তাদের কর্তব্য। আর এ কর্তব্যের কারণেই তারা এ ক্ষেত্রেও আল্লাহর খলীফা।

এসব ক্ষেত্রে মানুষের খিলাফতের দায়িত্ব অবশ্যই পালিত হতে হবে আল্লাহর দেয়া বিধানের ভিত্তিতে। নিজেদের ইচ্ছামত এ দায়িত্ব পালন করার কোন অধিকার মানুষের থাকতে পারে না। ফলে মানুষের প্রশাসনিকতা আল্লাহর খলিফা হিসেবেই কার্যকর হবে এবং আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে এই প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব সম্পাদিত হলেই বাস্তবায়িত হতে পারবে এই যমীনে আল্লাহর খিলাফত। মানুষ আল্লাহর খলীফা হিসেবেই প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্বের অধিকারী হবে, যদিও আসল ও প্রকৃত সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণরূপে ও একান্তভাবে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট, যাতে মানুষের কোন অংশ আদপেই নেই।

তাই বলা যায়, মানুষ এ দুনিয়ায় প্রশাসনিক কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করবে কেবলমাত্র আল্লাহর খলীফা হিসেবে, আল্লাহ্ প্রতিনিধি রূপে, নিজস্ব ভাবে নয়।

এই প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব বা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অধিকারী সাধারণভাবে সমস্ত মানুষ। কিন্তু সমস্ত মানুষের পক্ষে এ কর্তৃত্ব চালানো সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ একসাথে কখনই সম্ভব হতে পারে না। সেজন্য মানুষের মধ্য থেকেই কতিপয় লোককে বাছাই করে নিতে হবে ও তাদেরকে সুযোগ দিতে হবে এই কর্তৃত্ব পালন ও সার্বভৌমত্ব কার্যত প্রয়োগ করার জন্য। আর এখানেই নির্বাচনের প্রশ্ন।

সকল মানুষ একসাথে প্রয়োজনীয় সার্বভৌমত্ব-প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ব্যবহার করতে পারে না। তা করার জন্য নির্দিষ্ট এক বা একাধিক ব্যক্তির নিযুক্তি ও ভারপ্রাপ্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সেই এক বা একাধিক ব্যক্তি কে বা কারা? তাদের সাধারণ জনগণ থেকে আলাদা করা ও কার্যে নিয়োজিত করা কিভাবে 'সম্ভব হতে পারে?

তার একটি মাত্র উপায়ই আছে এবং সে উপায় হচ্ছে নির্বাচন। অর্থাৎ সাধারণ মানুষেরা সমানভাবে প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব তথা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অধিকারী হয়েও তারা সকলে একই সময় কার্যত তা করতে পারে না বলে তারা নিজেরাই নিজেদের মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে বাছাই করে তাদেরকে এ কাজের দায়িত্ব দেবে, সেই সাথে বাস্তব সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে তাদেরকে প্রাপ্ত দায়িত্ব সুষ্ঠুরূপে পালন করার অবাধ ও নির্বিঘ্ন সুযোগ করে দেবে।

এই পর্যায়ে দুটি মৌলিক কথা অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে। প্রথম এই যে, জনগণ নিজেদের মধ্য থেকে এক বা একাধিক লোককে বাছাই করবে সেই কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের জন্য, যা মূলত তাদের সকলের, কেবল সেই ব্যক্তিদেরই নয়, যাদেরকে বাছাই করা হয়েছে ও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অতএব এই বাছাই কার্যটি নিঃশর্ত ও পক্ষপাতহীনভাবে সম্পাদিত হতে হবে। অর্থাৎ তারা তাদের নিজেদের সুস্থ ও অনাবিল বিবেচনায় যাকে বা যাদেরকেই অধিক যোগ্য মনে করবে অর্পিতব্য দায়িত্ব পালনের দিক দিয়ে, কেবল তাদেরকেই বাছাই করবে। সে জন্য না নিকটাত্মীয়তার কোন শর্ত থাকবে, না নগদ কোন স্বার্থ লাভের প্রশ্ন উঠবে। উপরন্তু এ ভাবে বাছাই করার পর নির্বাচিত ব্যক্তিদেরকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে পূর্ণ সুযোগ ও সহযোগিতাও দেবে। কেননা তারা যে কাজ করছে, তা তাদের একান্ত নিজস্ব কোন কাজ নয়, তা সকল মানুষের কাজ। কাজেই সে কাজে সকলেরই আন্তরিক সদিচ্ছা ও সহযোগিতা থাকা আবশ্যক।

আর দ্বিতীয় এই-যে বা যারা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হলো, সে কখনই মনে করবে না যে, প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব বা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব কেবল মাত্র তাদেরই, অন্য কারোরই নয়। বরং মনে করবে, এ কর্তৃত্ব সকলেরই। তবে সকলে তা এক সাথে করতে পারবে না বলেই সকলের পক্ষ থেকেই এই দায়িত্ব তাদের উপর অর্পণ করা হয়েছে। তারা এ কাজ 'নিজেদের কাজ' মন করে করবে না, করবে সকলের কাজ মনে করে। অতএব এই 'ক্ষমতা' লাভের সুযোগে তারা কোন ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করার দিকে মনোযোগ দেবে না, সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকবে এই সামষ্টিক দায়িত্ব পালনের জন্য। উপরন্তু তারা ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহ্ খলীফা হওয়া সত্ত্বেও সামষ্টিক খিলাফতের দায়িত্ব পালনের জন্য জনগণ তাদের নিজস্ব খিলাফতের একটা অংশ তাদেরকে দিয়েছে। এ জন্য তারা তাদেরও খলীফা। এ ভাবে এক দিকে আল্লাহ্ খলীফা হওয়ার সাথে সাথে মানুষেরও খলীফা হওয়ার কারণে তারা যেমন আল্লাহ্র নিকট দায়ী-জবাবদিহি করতে বাধ্য-তেমনি জনগণের নিকটও দায়ী, তাদের নিকটও জবাবদিহি করতে বাধ্য। এ উভয় দিকে জবাবদিহি দায়িত্ববোধের তীব্রতায় এই নির্বাচিত ব্যক্তিরা কখনই স্বৈরতান্ত্রিক হতে পারে না। বরং তারা এ দুনিয়ায় যেমন জনগণের নিকট দায়ী হওয়ার কারণে জনগণের স্বাধীন সমালোচনার সম্মুখীন হতে বাধ্য, তেমনি কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে আল্লাহর ও জনগণের খিলাফতের দায়িত্ব যথাযথরূপে পালন না করলে। এই ভয়ে তাকে বা তাদেরকে সদা কম্পমান হয়ে থাকতে হবে।

এমনকি, জনগণ যে সব গুণের অগ্রবর্তিতা দেখে ও যে-সব দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে বা তাদেরকে নির্বাচিত করেছে-নির্বাচিত হওয়ার পর সেই গুণ হারিয়ে ফেললে ও সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে জনগণ তাদের দেয়া খিলাফতের অংশ ফিরিয়ে নিতেও পারবে। কেননা খিলাফতের এই অংশ দান বিশেষ গুণের শর্তে ও বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্যই ছিল। তা-ই যখন থাকল না বা দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম হয়ে গেল, তখন জনগণের দেয়া খিলাফতের অংশ দখল করে থাকার তার বা তাদের কোন অধিকারই থাকতে পারে না。

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 সার্বভৌমত্ব প্রয়োগে আল্লাহ্র প্রতিনিধিত্ব

📄 সার্বভৌমত্ব প্রয়োগে আল্লাহ্র প্রতিনিধিত্ব


সার্বভৌমত্ব মূলত একমাত্র আল্লাহর। কিন্তু মানব সমাজে এই সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ হতে পারে মানুষের দ্বারাই। তা করার পন্থা স্বয়ং সার্বভৌম আল্লাহ্ তা'আলাই নিরূপন করে দিয়েছেন এ ভাবে যে, তিনি নিজেই মানুষকে দুনিয়ায় তাঁর খলীফা রূপে নিযুক্ত করেছেন। আল্লাহর খিলাফত- প্রতিনিধিত্ব-করার দায়িত্ব তিনি নিজেই মানুষের উপর অর্পণ করেছেন। এই খিলাফতের অধিকার ও মর্যাদা প্রত্যেকটি মানুষের অভিন্ন। সকল মানুষ একত্রিত হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এই খিলাফতের দায়িত্ব পালনে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে প্রয়োগ করবে। এই প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব মানুষের নিকট এক মহান আমানত হিসেবে গচ্ছিত। কিন্তু কার্যত সকল মানুষ একত্রিত হয়েও এক সাথে এই প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করতে পারে না বলেই সকলের পক্ষ থেকে এক বা একাধিক ব্যক্তি তা প্রয়োগ করবে। এই কাজ সুসম্পন্ন করার জন্য কয়েকটি ব্যবস্থার একান্তভাবেই প্রয়োজনঃ

প্রথমত গোটা মানব সমাজকে এক ও অভিন্ন কেন্দ্রবিন্দুতে একত্রিত হতে হবে, যারা প্রদত্ত খিলাফত প্রয়োগ করে এই পৃথিবীতে ঐক্যবদ্ধ খলীফাসমষ্টি রূপে গণ্য হবে। তারা অন্যান্য সকল প্রকারের সম্পর্ক ছিন্ন করে নেবে এবং সমগ্র বিশ্বলোক ও তার মধ্যকার সব কিছুর একমাত্র মালিক ও নিয়ন্ত্রকরূপে সেই 'এক'কেই স্বীকার করবে।

এই গভীর ও সূক্ষ্ণ তত্ত্ব কুরআন বোঝাতে চেয়েছে একটি দৃষ্টান্তমূলক কথা দ্বারা। ইরশাদ হয়েছেঃ
ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلاً رَجُلاً فِيهِ شَرَكَاءُ مُتَشْكِسُونَ وَرَجُلاً سَلَمَا لِرَجُلٍ - هَلْ يَسْتَوِينِ مثلاً (الزمر: ۲۹)
আল্লাহ্ একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। এক ব্যক্তি তো সে. যার মালিকানায় বহু সংখ্যক বাঁকা স্বভাবের মনিব শরীক হয়ে আছে, যারা প্রত্যেকেই তাকে নিজের দিকে টানে। আর অপর এক ব্যক্তি পুরাপুরিভাবে একই মনিবের জন্য নির্দিষ্ট।..... এই দুইজনের অবস্থা কি একই রকমের হতে পারে?

এ দৃষ্টান্ত থেকে মু'মিন ও কাফির- এক আল্লাহ্র অনুগত ও বহু আল্লাহতে বিশ্বাসী মুশরিকের অবস্থা এবং এ দুয়ের মধ্যকার আসমান-যমীনের পার্থক্য স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে গেছে।

এক আল্লাহতে বিশ্বাসী ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহ্র দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্ধী। তার মনিব সেই এক আল্লাহ্-ই। আর মুশরিক-কাফির ব্যক্তি বহু সংখ্যক বিভিন্ন ইলাহতে বিশ্বাসী বলে সে সেই ক্রীতদাসের মত, যার মনিব বহু সংখ্যক, বিভিন্ন সাংঘর্ষিক মর্জী ও ইচ্ছার দাসত্ব করতে হয় তাকে। একই সময় প্রত্যেক মনিবই তাকে তার কাজ করতে বলে। ফলে এই ক্রীতদাস একই সময় বহু মনিবের নির্দেশ পালনের দায়িত্বের নিষ্পেষণে প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত, জর্জরিত ও দিশেহারা হয়ে যেতে বাধ্য হয়। একটি মানব সমাজ-সমষ্টির ব্যাপারও এই দৃষ্টিতে বিবেচ্য। তা যদি এক আল্লাহতে বিশ্বাসী হয়, এক আল্লাহর একক সার্বভৌমত্ব মেনে চলাই হবে তার নীতি ও আদর্শ। সেই সমাজ-সমষ্টি উপরোক্ত দৃষ্টান্তের সেই ক্রীতদাসের ন্যায় হবে, যার মনিব মাত্র একজন। পক্ষান্তরে তা যদি কাফির বা মুশরিক হয়, তাহলে একক সার্বভৌমত্ব মেনে চলা তার পক্ষে সম্ভব হবে না, একক সার্বভৌমত্ব-ভিত্তিক কোন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলাও তার পক্ষে সম্ভব হবে না। বরং বিভিন্ন সার্বভৌম শক্তি সেই সমাজের উপর কর্তৃত্ব করবে, যেমন কুরআনী দৃষ্টান্তে বহু মনিবের একজন ক্রীতদাসের উপর চলে তাদের ভিন্ন ভিন্ন ইচ্ছা ও মর্জী। তাকে নিয়ে তখন বহু সংখ্যক সার্বভৌম শক্তির টানাটানি চলবে, যেমন একটি লাশ নিয়ে টানাটানি ও কামড়া-কামড়ি করে বহু সংখ্যক কুকুর।

হযরত ইউসুফ (আ) এই একক সার্বভৌমত্বের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেছিলেনঃ
ارْبَابُ مُتَفَرِّقُونَ خَيْرَامِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ ( يوسف : ٣٩)
বিভিন্ন-বিচ্ছিন্ন বহু সংখ্যক রব্ব-সার্বভৌম উত্তম, না মহাপরাক্রমশালী এক আল্লাহ্ সার্বভৌম হিসেবে উত্তম?

দ্বিতীয়ত, সেই সমাজ-সমষ্টিকে এক আল্লাহ্ জন্য খালেস দাসত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে, সমাজের লোকদের পারস্পরিক সম্পর্কও সেই অনুযায়ী গড়ে উঠতে হবে এবং অন্যান্য অসংখ্য তাগুতী শক্তির সার্বভৌমত্বের বন্ধন থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও স্বাধীন হতে হবে। কেননা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যান্য যে সব শক্তির নাম করা হয় সার্বভৌম হিসেবে, সেগুলি তো নিছক নাম মাত্র। সে নামগুলি হয় তোমরা রেখেছ, না হয় তোমাদের পূর্বপুরুষরা রেখে নিয়েছে। বলা হয়েছেঃ
مَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ (يوسف : ٤٠)
এক আল্লাহকে বাদ দিয়ে আর যার যার দাসত্ব তোমরা কর (সার্বভৌম মনে করে), সেগুলি নিছক কতকগুলি নাম মাত্র (সেই নামগুলির অন্তরালে ব্যক্তিসত্তা বলতে কিছুরই অস্তিত্ব নেই)। এই নাম তোমরা আর তোমাদের বাপ-দাদারা রেখে নিয়েছ।

বস্তুত বহু সংখ্যক সার্বভৌমের দাসত্ব থেকে মানবকূলকে মুক্তি দিয়ে একমাত্র আল্লাহর একক সার্বভৌমত্বের অধীন ও অনুসারী বানাবার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ্ তা'আলা হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে সর্বশেষ নবী রাসূল রূপে পাঠিয়েছেন। তাই মানুষকে আল্লাহ্ ছাড়া অন্যান্য সকল প্রকারের সার্বভৌমত্ব স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করতে হবে। একক সার্বভৌম আল্লাহর সাথে কৃত চুক্তিকে একক চুক্তিরূপে মানতে হবে। অ-খোদা শক্তি ও ব্যক্তির আনুগত্য খতম করে দিয়ে এক আল্লাহ্ আনুগত্য স্বীকার করতে হবে। এবং এক আল্লাহ্ কর্তৃত্ব ছাড়া অন্যান্য সকল প্রকারের কর্তৃত্ব থেকে বিদ্রোহ করতে হবে, উৎপাটিত করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এক আল্লাহর সার্বভৌম-ভিত্তিক সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রশাসন-ব্যবস্থা।

তৃতীয়ত, সমগ্র সামাজিক সামগ্রিক সম্পর্ক-সম্বন্ধের ক্ষেত্র থেকে পার্থক্য প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার নীতি নির্মূল করে সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বের প্রাণস্পর্শী পবিত্র ভাবধারাকে মূর্ত ও প্রবল করে তুলতে হবে। এখানে আল্লাহই হবেন একমাত্র সার্বভৌম, কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ রূপে একমাত্র আল্লাহ্। আর সমগ্র মানুষ সর্বতোভাবে সমান, অভিন্ন সেই আল্লাহ্র সাথে সম্পর্কের দিক দিয়ে। আর এই সমস্ত মানুষই পৃথিবীতে আল্লাহ্ খলীফা বিশ্ব ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে, মানব জীবন সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার ব্যাপারে। এখানে মান-মর্যাদা ও মৌলিক স্বাভাবিক অধিকারও সমস্ত মানুষের এক ও অভিন্ন, ঠিক যেমন চিরুনীর কাঁটাগুলি হয়ে থাকে।

এরূপ অবস্থায়ই মানব সমষ্টি পৃথিবীতে আল্লাহর খিলাফতের দায়িত্ব পালনে রত থাকবে, তা এই গুণ-পরিচিতি সহকারে আল্লাহর খলীফা হওয়ার ভূমিকা পালন করবে। এই রূপ এক মানব-সমষ্টি সম্পর্কে একথা ভাবা যায় না যে, তা স্বেচ্ছাচারিতার সাথে শাসনকার্য চালাতে কিংবা আল্লাহর সম্মতিহীন ইজতিহাদের বলে আইন-কানুন রচনা করবে। কেননা তা আল্লাহ্ খলীফা হওয়ার প্রকৃতির সাথে একবিন্দু সঙ্গতিসম্পন্ন নয়।

এ দিক দিয়ে কুরআনী ইসলামী আদর্শনুসারী মানব-সমষ্টি পাশ্চাত্যের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সমাজ-সংস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর হয়ে থাকে।
কেননা পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক পদ্ধতির অনুসারী সমাজ নিজেই নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্বের অধিকারী। এই কর্তৃত্ব-সার্বভৌমত্ব প্রয়োগে তা আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করে না, আল্লাহর পক্ষ থেকে শাসনকার্য চালায় না। ফলে তা কারোর নিকটেই দায়ী নয়, জবাবদিহি করতে বাধ্য নয় কারোর নিকটই। শাসনকার্য পরিচালনায় ও আইন প্রণয়নে কোন স্থায়ী আদর্শ ও মানদণ্ড মেনে চলতেও বাধ্য নয়। সেখানে জাতির জনগণ আইন-বিধান হিসেবে গ্রহণ করতে যা'তেই একমত হবে, তা যদি তার মান-মর্যাদা পরিপন্থী হয়ও এবং তা যদি সেই সমাজেরই কোন একটা অংশের কল্যাণ-বিরোধী হয়ও তবু তা গ্রহণ ও কার্যকর করতে কোন বাধা থাকে না।

আল্লাহর খলীফা রূপে গঠিত ও প্রতিষ্ঠিত সমাজ সম্পূর্ণ ভিন্নতর প্রকৃতি ও ভাবধারার হয়ে থাকে। তার শাসন-প্রশাসন স্বাধীন ও নিরংকুশ হয় না কখনই। তা এক দায়িত্বসম্পন্ন-জবাবদিহি করতে বাধ্য সমাজ। সে সমাজ-সংস্থাকে সর্বক্ষেত্রে সত্য ও ইনসাফকে অনুসরণ ও প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, জুলুম-শোষণকে নির্মূল করতে হয়, আল্লাহদ্রোহীতাকে প্রতিরোধ করতে হয়। তার প্রতিটি কাজ করতে হয় মহান আল্লাহ্র সম্মুখে জবাবদিহি করার তীব্র দায়িত্ব বোধ সহকারে। এ দৃষ্টিতে বলা যায়-ইসলামী হুকুমাত উম্মতের উপর উম্মতের শাসন আল্লাহ্ খিলাফত হিসেব অর্থাৎ দেশ শাসন ও পরিচালনায় মুসলিম উম্মত স্বীয় ইচ্ছা ও কামনা-বাসনাকেই বাস্তবায়িত করবে না, বরং মহান আল্লাহ্র ইচ্ছা পূরণ ও তাঁরই দেয়া আইন-বিধান ও রীতি-নীতিকে পূর্ণ শক্তিতে বাস্তবায়িত করে তুলবে। আল্লাহ্ ঘোষিত সীমা সমূহের মধ্যে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব কার্যকর হবে。

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 দাউদ (আ)-এর খিলাফত আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বের অধীন

📄 দাউদ (আ)-এর খিলাফত আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বের অধীন


আল্লাহ্ তা'আলা হযরত দাউদ (আ)-কে পৃথিবীতে তাঁর খলীফা নিযুক্ত করেছিলেন। আল্লাহ্ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তিনি আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে তাঁরই দেয়া বিধান অনুযায়ী শাসন-প্রশাসনের কাজ সুসম্পন্ন করেই এই খিলাফতের দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি পূর্ণ সত্যতা, সততা ও নিরপেক্ষ ন্যায়পরতা সহকারে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন। কুরআনে উদ্ধৃত হয়েছে আল্লাহ্ ঘোষণাঃ
يداوُدُ إِنَّا جَعَلْنَكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ (ص: ٢٦)
হে দাউদ! আমরাই তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করেছি। অতএব তুমি জনগণের মধ্যে পরম সত্যতা-সততা-ন্যায়পরতা সহকারে শাসন-কার্য পরিচালনা কর।

আদম (আ)-কে লক্ষ্য করে 'খলীফা' বানাবার ঘোষণা এবং হযরত দাউদ (আ)-কে সম্বোধন করে বলা এই 'খলীফা' মূলত একই-এ দুয়ের মধ্যে মৌলিকভাবে কোন পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, এখানে হযরত দাউদ (আ)-কে ব্যক্তিগতভাবে খলীফা বানাবার কথা বলা হয়েছে। আর হযরত আদমের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে সমস্ত আদম বংশধরদের খলীফা বানাবার সংকল্প ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) খিলাফতের প্রথমোক্ত দিকটির প্রতি ইঙ্গিত করে অর্থ করেছেন এভাবেঃ 'সে দুনিয়ায় ফসল উৎপাদনে, ফল বের করণে ও খাল-নদী তৈরী করার ক্ষেত্রে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে।'
আর দ্বিতীয়, উক্ত দিকে ইঙ্গিত করে তার তাফসীর করেছেন এই বলেঃ সৃষ্টিকূলের উপর শাসন-প্রশাসন চালানোর ক্ষেত্রে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে। আর খলীফা হবেন আদম ও তাঁর সন্তানদের মধ্যে যারাই তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবে। ১

টিকাঃ
১. التبيان ج ۱، ص ۱۳۱

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 শাসন প্রশাসন ব্যবস্থা—হুকুমাত—ছাড়া আমানত আদায় করা সম্ভব নয়

📄 শাসন প্রশাসন ব্যবস্থা—হুকুমাত—ছাড়া আমানত আদায় করা সম্ভব নয়


কুরআন মজীদে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ তা'আলা 'আমানত' গ্রহণের জন্য সমস্ত জিনিসের নিকট প্রস্তাব পেশ করেছেন- আসমান যমীন ইত্যাদিকে এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলেছেন। কিন্তু সবকিছুই তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। এ পর্যায়ে আল্লাহ্ কথা হচ্ছেঃ

إِنَّ عَرَضنَا الأَمَانَةَ عَلَى السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَالجِبَالِ فَأَبَيْنِ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانَ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا - لِيُعَذِّبَ اللَّهُ الْمُنْفِقِينَ وَالْمُنفِقْتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكْتِ وَيَتُوبُ اللهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ ، وَكَانَ اللَّهُ غفورا رحيما (الاحزاب: ۷۲-۷۳)
আমরা এই আমানতকে আকাশমণ্ডল, যমীন ও পাহাড়-পর্বতের সম্মুখে পেশ করেছি। কিন্তু ওরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে, ওরা ভয় পেয়ে গেছে। কিন্তু মানুষ তা নিজের স্কন্ধে তুলে নিয়েছে। বস্তুত মানুষ যে জালিম ও জাহিল তাতে সন্দেহ নেই। আমানতের এই দুর্বহ বোঝা গ্রহণ করার অনিবার্য পরিণাম হলো, আল্লাহ্ মুনাফিক পুরুষ স্ত্রীলোক ও মুশরিক পুরুষ-স্ত্রীলোকদের শাস্তি দেবেন ও মু'মিন পুরুষ-স্ত্রীলোকদের তওবা কবুল করবেন। বস্তুত আল্লাহ্ অতীব ক্ষমাশীল এবং অশেষ দয়াবান।

আয়াতটিতে যে আমানতের কথা বলা হয়েছে, সে 'আমানত' বলে কি বুঝিয়েছে? ইমাম কুরতুবী ও অন্যান্য মুফাস্সির বলেছেনঃ 'তা হচ্ছে সাধারণভাবে দ্বীন পালনের যাবতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য।' এ পর্যায়ে যত কথা বলা হয়েছে, তন্মধ্যে এই মতই অধিক সহীহ্। ১ আল্লামা তাবরিযী লিখেছেনঃ আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষের যে সব হুকুম-আহকাম, কর্তব্য ও সীমাসমূহ নাযিল করেছন, তা সবই আমানত এবং এ আমানত রক্ষার দায়িত্ব মানুষ গ্রহণ করেছে। ২

আর একথা তো নিঃসন্দেহ যে, মানুষ এই আমানত গ্রহণ করেছিল তা যথাযথভাবে পালন ও কার্যকর করার উদ্দেশ্যে। তাই এ কথায়ও কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না যে, আল্লাহর নাযিল করা হুকুম-আহকাম-আইন-বিধান, কর্তব্য ও সীমাসমূহ মানব জীবনে কার্যকর করা এমন একটি হুকুমত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়া কখনই সম্ভব হতে পারে না, যা মূলত আল্লাহর দ্বীনের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে, যা গড়ে তুলবে মু'মিন উম্মত এই মনোভাব সহকারে যে, এইরূপ একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীন আল্লাহর আনুগত্য ভিত্তিক জীবন যাপন করা সম্ভব, অন্য কোন ধরনের শাসন ব্যবস্থার অধীন তা সম্ভবপর নয়।

দ্বিতীয় আয়াতটি يُعَذِّبَ اللَّهُ যেন আল্লাহ্ আযাব দেন........ উল্লিখিত আমানতের নিগূঢ় সত্য কথা উদ্ঘাটিত ও প্রকাশিত করছে। বোঝা যাচ্ছে যে, 'আমানত' ধারণকারী মানুষ মু'মিন, মুশরিক ও মুনাফিক-এই তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। মানুষকে এইরূপ বিভক্তকরণ কেবল সত্য আকীদা গ্রহণ ও দ্বীন পালনের দৃষ্টিতেই সম্ভব হতে পারে! এ দৃষ্টিতে মু'মিন সে, যে দ্বীন পালন ও কায়েম করবে। এ ক্ষেত্রে যারা শিরক-এ লিপ্ত হবে, তারা মুশরিক হবে। তারা কিছুটা দ্বীন পালন করলেও দ্বীন-বিরোধী কার্যকলাপই বেশী করবে। আর মুনাফিক বলে চিহ্নিত হবে সেইসব লোক, যারা দ্বীনের প্রতি ঈমানদার বলে বাহ্যত দাবি ও প্রচার করবে কিন্তু আসলে ও প্রকৃতপক্ষে দ্বীনের প্রতি তারা ঈমানদারও নয়, নয় তারা দ্বীন পালনকারীও।

প্রথম আয়াতের শেষাংশে মানুষকে 'যালুম' ও 'জাহল' বলা হয়েছে তো এই কারণে যে, মানুষ সামষ্টিকভাবে এই আমানত বহন করার দায়িত্ব গ্রহণ করেও তারা তাতে খিয়ানত করেছে, কার্যত আমানতের দায়িত্ব বহন করেনি। ফলে মানুষ মু'মিন, মুশরিক ও মুনাফিক- এই তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। মু'মিন হয়েছে তারা, যারা ওয়াদা অনুযায়ী কাজ করেছে-কার্যত দ্বীন পালনের দায়িত্ব বহন করেছে। মুনাফিক হয়েছে তারা, যারা প্রকৃত অবস্থার বিপরীত বাইরে প্রকাশ করেছে কেননা তারা অন্তর দিয়ে দ্বীনের প্রতি ঈমান না এনেও নিজেদেরকে ঈমানদার বলে যাহির করেছে। আর মুশরিক হয়েছে তারা, যারা এক আল্লাহর প্রতি ঐকান্তিক-আন্তরিক ঈমান গ্রহণ করতে পারেনি-অন্যান্য শক্তির প্রতিও ঈমান এনেছে এবং কার্যত এক আল্লাহর দেয়া বিধান পালন করেনি। কিছুটা আল্লাহর বিধান আর কিছুটা মানুষের মনগড়া বিধান পালন করেছে। কার্যত নফসের খায়েশাতেরই অনুসরণ করেছে।

টিকাঃ
১. الجامع لاحكام القرآن ج ۱۴ ص ২০২
২. التبیان ج ۸. ص ۵۰۳

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00