📄 রাজতন্ত্র
কোন এক ব্যক্তি যখন সামরিক বিপ্লব কিংবা অস্ত্রশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কোন দেশের কর্তৃত্ব ও শাসন ক্ষমতা দখল করে নেয় এবং তারপরই নিজেকে দেশের-সর্বময় কর্তৃত্বের ধারক ও জনগণের রাজা বা বাদশাহ বলে ঘোষণা দেয়, তখন সে সেই দেশের রাজা বা নিরংকুশ বাদশাহ হয়ে বসেছে বলে প্রতিপন্ন হয়। তখন তার বিরুদ্ধতাকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে কঠিন-কঠোর শাস্তি দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। সে কেবল নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হয় না, সে সর্বসাধারণকে জানিয়ে দেয় যে, অতঃপর দেশে রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চলতে থাকবে এবং তার মৃত্যুর পর তার সন্তানরাই এই রাজক্ষমতার অধিকারী হবে, বংশানুক্রমিকভাবে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তা-ই চলতে থাকবে।
এসব রাজা-বাদশাহ ক্ষমতার তুঙ্গে পৌঁছে যায় এবং ক্ষমতার নেশায় মত্ত হয়ে নিজেকে 'যিলুল্লাহ' বা আল্লাহ্ 'ছায়া' নামে অভিহিত করতেও সংকোচ বোধ করে না। অন্য কথায় সে ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে একক ভাবে আসীন হয় ও নিরংকুশভাবে তা কার্যকর করার অবাধ সুযোগ পায় বলে নিজেকে ঠিক আল্লাহ্ স্থলাভিষিক্ত ধারণা করে।
রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাসমূহে ইতিহাসের প্রায় সকল অধ্যায়েই এই রূপ দেখা গেছে।
বস্তুত রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ব্যক্তি-শাসনেরই একটি বিশেষ রূপ। সেই ব্যক্তিই হয় তথায় সর্বেসর্বা। রাজা বা বাদশাহ তথায় সার্বভৌমত্বের ধারক, শক্তি ও ক্ষমতার একমাত্র উৎস। রাষ্ট্র ও রাজ্য পরিচালনার নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজ সে নিজ দায়িত্বেই করে থাকে। দেশের শাসন ও বিচার ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় আইন সে নিজেই দেয়। অবশ্য এসব ব্যাপারে তার সন্তানরাও কোন কোন সময় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অংশ গ্রহণ করে থাকে। উত্তরাধিকারসূত্রে তারাই হয় বিরাট রাষ্ট্রীয় ব্যাপারের বিভিন্ন দিকের কর্তৃত্ব সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। এক কথায়, এ গোটা শাসন ব্যবস্থাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক, উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তরিত এবং স্বৈরতান্ত্রিক।
এইরূপ শাসন ব্যবস্থা বাদশাহ বা রাজাকে নিরংকুশ কর্তৃত্বের অধিকারী বানায় বিধায় তা যেমন স্বৈরতান্ত্রিক, তেমনি অহংকারমূলক। স্বৈরতান্ত্রিক হওয়ার দরুন এই ব্যবস্থাধীন সাধারণ মানুষের কোন মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয় না- থাকেও না। আর অহংকারমূলক হওয়ার কারণে রাজপরিবার সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, রাজপরিবারের ব্যক্তিরা অন্য সকল মানুষ অপেক্ষা অধিক শরাফাতের অধিকারী বিবেচিত হয়। আর তাদের ছাড়া অন্যান্য মানুষ হীন, নীচ ও পশুবৎ গণ্য হয়। আর এর পরিণামে বাহ্যিক ভাবে দেশের যতই চাকচিক্য বৃদ্ধি পাক, অন্তঃ সলিলা ফল্গুধারার লোক চক্ষুর ব্যাপক বিপর্যয় সমগ্র দেশটিকে গ্রাস করে নেয়।
ঠিক এই কারণে কুরআন মজীদে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের লোকদের অগ্রাধিকার ঘোষণা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছেঃ
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا - وَالْعَاقِبَةُ للمتقين (القصص: ৮৩)
এই পরকালের শান্তির ঘর তো সেই লোকদের জন্য বানাব, যারা এই দুনিয়ায় সর্বোচ্চতা- সর্বশ্রেষ্ঠত্ব দখল করার জন্য ইচ্ছুক বা সচেষ্ট নয় এবং যারা কোনরূপ বিপর্যয় সৃষ্টিরও পক্ষপাতী নয়।
কোন এক ব্যক্তি যখন সামরিক বিপ্লব কিংবা অস্ত্রশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কোন দেশের কর্তৃত্ব ও শাসন ক্ষমতা দখল করে নেয় এবং তারপরই নিজেকে দেশের-সর্বময় কর্তৃত্বের ধারক ও জনগণের রাজা বা বাদশাহ বলে ঘোষণা দেয়, তখন সে সেই দেশের রাজা বা নিরংকুশ বাদশাহ হয়ে বসেছে বলে প্রতিপন্ন হয়। তখন তার বিরুদ্ধতাকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে কঠিন-কঠোর শাস্তি দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। সে কেবল নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হয় না, সে সর্বসাধারণকে জানিয়ে দেয় যে, অতঃপর দেশে রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চলতে থাকবে এবং তার মৃত্যুর পর তার সন্তানরাই এই রাজক্ষমতার অধিকারী হবে, বংশানুক্রমিকভাবে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তা-ই চলতে থাকবে।
এসব রাজা-বাদশাহ ক্ষমতার তুঙ্গে পৌঁছে যায় এবং ক্ষমতার নেশায় মত্ত হয়ে নিজেকে 'যিলুল্লাহ' বা আল্লাহ্ 'ছায়া' নামে অভিহিত করতেও সংকোচ বোধ করে না। অন্য কথায় সে ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে একক ভাবে আসীন হয় ও নিরংকুশভাবে তা কার্যকর করার অবাধ সুযোগ পায় বলে নিজেকে ঠিক আল্লাহ্ স্থলাভিষিক্ত ধারণা করে।
রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাসমূহে ইতিহাসের প্রায় সকল অধ্যায়েই এই রূপ দেখা গেছে।
বস্তুত রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ব্যক্তি-শাসনেরই একটি বিশেষ রূপ। সেই ব্যক্তিই হয় তথায় সর্বেসর্বা। রাজা বা বাদশাহ তথায় সার্বভৌমত্বের ধারক, শক্তি ও ক্ষমতার একমাত্র উৎস। রাষ্ট্র ও রাজ্য পরিচালনার নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজ সে নিজ দায়িত্বেই করে থাকে। দেশের শাসন ও বিচার ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় আইন সে নিজেই দেয়। অবশ্য এসব ব্যাপারে তার সন্তানরাও কোন কোন সময় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অংশ গ্রহণ করে থাকে। উত্তরাধিকারসূত্রে তারাই হয় বিরাট রাষ্ট্রীয় ব্যাপারের বিভিন্ন দিকের কর্তৃত্ব সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। এক কথায়, এ গোটা শাসন ব্যবস্থাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক, উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তরিত এবং স্বৈরতান্ত্রিক।
এইরূপ শাসন ব্যবস্থা বাদশাহ বা রাজাকে নিরংকুশ কর্তৃত্বের অধিকারী বানায় বিধায় তা যেমন স্বৈরতান্ত্রিক, তেমনি অহংকারমূলক। স্বৈরতান্ত্রিক হওয়ার দরুন এই ব্যবস্থাধীন সাধারণ মানুষের কোন মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয় না- থাকেও না। আর অহংকারমূলক হওয়ার কারণে রাজপরিবার সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, রাজপরিবারের ব্যক্তিরা অন্য সকল মানুষ অপেক্ষা অধিক শরাফাতের অধিকারী বিবেচিত হয়। আর তাদের ছাড়া অন্যান্য মানুষ হীন, নীচ ও পশুবৎ গণ্য হয়। আর এর পরিণামে বাহ্যিক ভাবে দেশের যতই চাকচিক্য বৃদ্ধি পাক, অন্তঃ সলিলা ফল্গুধারার লোক চক্ষুর ব্যাপক বিপর্যয় সমগ্র দেশটিকে গ্রাস করে নেয়।
ঠিক এই কারণে কুরআন মজীদে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের লোকদের অগ্রাধিকার ঘোষণা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছেঃ
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا - وَالْعَاقِبَةُ للمتقين (القصص: ৮৩)
এই পরকালের শান্তির ঘর তো সেই লোকদের জন্য বানাব, যারা এই দুনিয়ায় সর্বোচ্চতা- সর্বশ্রেষ্ঠত্ব দখল করার জন্য ইচ্ছুক বা সচেষ্ট নয় এবং যারা কোনরূপ বিপর্যয় সৃষ্টিরও পক্ষপাতী নয়।
📄 কুরআনে রাজতান্ত্রিক—বাদশাহী পদ্ধতি
কুরআনুল করীমের দৃষ্টিতে মুলুকিয়াত-রাজতন্ত্র বা বাদশাহী শাসন পদ্ধতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলে স্বভাবতই ব্যাপক ও মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। তথায় ব্যক্তির ইচ্ছাকে সমগ্র জনগণের উপর শক্তিবলে চাপিয়ে দেয়া হয়। লোকেরা তা মেনে নিতে প্রস্তুত না হলে তাদেরকে তা মেনে নিতে বাধ্য করা হয়। ব্যক্তির কামনা-বাসনা-লালসা চরিতার্থ করার জন্য জাতীয় সম্পদকে বে-হিসেব ব্যয় ও প্রয়োগ করা হয়। কেননা দেশের সকল নৈসর্গিক সম্পদ ও শক্তির একচ্ছত্র মালিক হয়ে থাকে সেই রাজা বা বাদশাহ। এ ব্যাপারে কারোরই কোন আপত্তি জানাবার অধিকার থাকতে পারে না। তার সমালোচনা করা, দোষ-ত্রুটি বলে বেড়ানো বা সেজন্য কোনরূপ কটূক্তি করতে যাওয়াও নিজের জন্য ধ্বংস ডেকে আনা ছাড়া আর কিছু নয়। পৃথিবীর সুদীর্ঘ ইতিহাসে রাজতান্ত্রিক তথা বাদশাহী শাসন ব্যবস্থায় এর ব্যতিক্রম কুত্রাপি দেখা যায়নি। কুরআন মজীদ এ সত্যই ঘোষণা করেছে অত্যন্ত বলিষ্ঠ দৃঢ় ভাষায়। ইরশাদ হয়েছেঃ
إِنَّ الْمُلُوكَ إِذَا دَخَلُوا قَرْيَةً أَفْسَدُوهَا وَجَعَلُوا أَعِزَّةَ أَهْلُهَا أَذِلَّةٌ ، وَكَذَلِكَ يَفْعَلُونَ (النمل: ٣٤)
স্বৈরতান্ত্রিক ও রাজা-বাদশাহরা যখন কোন জনবসতির উপর কর্তৃত্ব লাভ করে তখন তারা সেই জনবসতিটিকে ধ্বংস করে এবং তার সম্মানিত ব্যক্তিবর্গকে বানায় সর্বাধিক লাঞ্ছিত-অপমানিত। তাদের এইরূপ কাজ চিরন্তন।
আল্লাহর কালামে উদ্ধৃত এ কথাটি মানব জীবনে কার্যকর ইতিহাসের ধারাবাহিকতার সাথে পূর্ণ মাত্রায় সামঞ্জস্যশীল। ইতিহাসে এর ব্যতিক্রম কখনই দেখা যায়নি, ভবিষ্যতেও এর ব্যতিক্রম দেখা যাবে না। আজকের পৃথিবীর বাস্তব অবস্থা এই ঘোষণার পরম সত্যতা ও বাস্তবতা অকাট্যভাবে প্রমাণ করছে।
সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ তাঁর তাফসীরে এ আয়াতটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ স্বৈরতান্ত্রিক শাসক শক্তির প্রকৃতিই হচ্ছে এই যে, তা যে দেশেই প্রতিষ্ঠা পায়, সে দেশেই ব্যাপক বিপর্যয় প্রচণ্ড করে তোলে। সে দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। সে দেশের মান-মর্যাদা পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করে। সে দেশের প্রতিরক্ষা শক্তিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। সেখানকার সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে। কেননা এই ব্যক্তিরাই হয়ে থাকে সে দেশের প্রকৃত প্রতিরোধ শক্তি। বস্তুত এটাই হচ্ছে এই শাসক শক্তির স্থায়ী চরিত্র। এর ব্যতিক্রম কখনই হতে পারে না। ১
বস্তুত কুরআন মজীদ বিভিন্ন প্রসঙ্গে রাজা-বাদশাহ ও স্বৈর শাসকদের মানবতা বিরোধী কার্যকলাপের প্রতি ইঙ্গিত করেছে। তারা সাধারণ মানুষের উপর নিজেদের শান-শওকত ও শক্তির দাপট চালায়, জনগণের ধন-সম্পদ নির্মম ও নির্লজ্জভাবে লুটে-পুটে নিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে তারা না কোন নিয়মনীতি মেনে চলে, না কোন সীমায় গিয়ে থেকে যেতে রাযী হয়। দুর্বল অক্ষম ও মিসকীন লোকদের সামান্য-সামান্য সম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নিতেও তারা কুণ্ঠিত হয় না। নিপীড়িত জনগণের মর্মবিদারী ফরিয়াদ তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না।
কুরআনে অন্য একটি প্রসঙ্গে একজন স্বৈরশাসকের চরিত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে যে, একজন দরিদ্র ব্যক্তি নিজের নৌকায় লোক পারাপার করে জীবিকা নির্বাহ করত। এক সময় এই আশঙ্কা প্রবল হয়ে দেখা দিল যে, বাদশাহ্ স্বৈরশাসক তার সেই নৌকাটি পর্যন্ত কেড়ে নেবে।
প্রসঙ্গটি হযরত খিজির ও হযরত মূসা (আ)-এর জ্ঞানান্বেষণমূলক সফর কাহিনী। হযরত খিজির একটি নৌকায় নদী পার হয়ে ওপারে পৌঁছে সেই নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করে দিয়েছিলেন। তার কারণ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেনঃ
أما السَّفِينَةُ فَكَانَتْ لِمَسَاكِينَ يَعْمَلُونَ فِي الْبَحْرِ فَأَرَدْتُ أَنْ أَعِيبَهَا وَكَانَ وَرَاءَهُمْ ملِكَ يَأْخُذُ كُلَّ سَفِينَةٍ غَصْبًا (الكهف: ۷۹)
সেই নৌকাটির ব্যাপার এই ছিল যে, সেটি ছিল কয়েকজন গরীব ব্যক্তির মালিকানা, এই নৌকাটিকে কেন্দ্র করে তারা নদীতে শ্রম-মজুরী করত। আমি সেটিকে দোষযুক্ত করে দিতে চেয়েছিলাম কেননা তাদের অঞ্চলে একজন রাজা-স্বৈর শাসক-রয়েছে, যে প্রতিটি নৌকা জোরপূর্বক কেড়ে নেয়।
যে নৌকাটির কথা এ আয়াতে বলা হয়েছে, কুরআনের কথানুযায়ী সেটি ছিল কয়েকজন মিসকীন দরিদ্র ব্যক্তির জীবিকার্জনের মাধ্যম বা উপায়। এই নৌকাটিতে চড়েই তারা নদী-পথে নিজেদের শ্রম বিনিয়োগ করতে পারছিল। নৌকাটি ব্যতীত তাদের শ্রম করার কোন উপায় ছিল না। সেই নৌকাটি কেড়ে নেয়া কোন ন্যায়পরায়ণ আদর্শবাদী-ইসলামী প্রশাসকের কাজ হতে পারে না। কিন্তু তথাকার বাদশাহ তাই কেড়ে নিত! অন্য কথায়, দরিদ্র জনগণের জীবিকা নির্বাহের উপায়সমূহ করায়ত্ত করে তাদেরকে শ্রম করে উপার্জন করার উপায় থেকে বঞ্চিত করে দিয়ে ক্ষুধার জ্বালায় ছট্ফট্ করে মরে যাওয়ার জন্য ছেড়ে দেয়াই রাজা-বাদশাহ ও স্বৈর শাসকদের নীতি এবং চরিত্র। অর্থাৎ স্বৈর শাসন শুধু রাজনৈতিক শক্তিকে করায়ত্ব করা নয়, অর্থনৈতিক শক্তি ও উপায়গুলিকেও নিজের একক দখলে নিয়ে আসা। রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও যে কোন প্রকারের সম্মান ঠিক এই কারণেই আল্লাহ প্রদত্ত আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
মিসরের ফিরাউনী শাসনের ইতিহাসেও এই অবস্থারই বাস্তব চিত্র লক্ষ্য করা যায়। ফিরাউন দেশের আপামর জনগণের উপর নিরংকুশ শাসন চাপিয়ে সারাদেশের যাবতীয় ধন-মালের একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসার ঘোষণা দিয়েছিল। ফিরাউন উদাত্ত কণ্ঠে প্রচার করেছিলঃ
يَقَوْمِ أَلَيْسَ لِي مُلْكُ مِصْرَ وَهَذِهِ الْأَنْهُرُ تَجْرِي مِنْ تَحْتِى ، أَفَلَا تُبْصِرُونَ * (الزخرف: ٥١)
হে জনগণ! সমগ্র মিসরের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কি আমার করায়ত্ত নয়? আর এই নদী সমুদ্র কি আমারই নিয়ন্ত্রণাধীন প্রবাহমান নয়?.... তোমরা কি এসব দেখতে পাও না, লক্ষ্য কর না?
এই নিরংকুশ-রাজতন্ত্র-স্বৈর শাসন আল্লাহ্ দেয়া বিধান পালন করে না, কোন বিশেষ ও স্থির রীতি-নীতিরও অনুসারী নয়, বরং তা এক ব্যক্তির স্বাধীন বিমুক্ত ইচ্ছার অন্ধ অনুসারী, তাই সেই ব্যক্তির ইচ্ছা কামনা-বাসনা চরিতার্থ করাই হয় সে শাসনের একমাত্র লক্ষ্য। সারাদেশের যাবতীয় ধন-সম্পদ ও সম্পদ-উৎপাদনের উৎস সবকিছুরই নিরংকুশ মালিক হয়ে বসা এবং তার কোন কিছুর উপর জনগণের কোন অধিকার স্বীকার না করাই হচ্ছে তার প্রকৃতি ও স্বভাব। সাধারণ মানুষের দখলে কোথাও কিছু থাকলেও তা কোন-না-কোন সময়ে কেড়ে নেয়াই তার নীতি।
রাজতন্ত্র-বাদশাহী ও স্বৈর শাসনের এ-ই যখন স্বভাব, তখন শরীয়াতের বিধানের কথা তো অনেক দূরের, সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি কি করে তা সমর্থন করতে পারে? কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ এইরূপ শাসন ব্যবস্থার হাতে কি করে সঁপে দেয়া যেতে পারে? এসব স্বার্থপর অহংকারী শাসন-ব্যবস্থা কোনক্রমেই সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। ওরা মানুষের জীবন, ইজ্জত-আব্রু ও রুটি-রুজি নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতায় মেতে থাকবে আর সাধারণ মানুষ তা চুপচাপ সহ্য করে যাবে- এটাই বা ধারণা করা যেতে পারে কিভাবে?
রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও স্বৈর শাসনে ব্যক্তির ইচ্ছা সমষ্টির উপর বিজয়ী ও প্রবল হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। তা হয়ে দাঁড়ায় কোটি কোটি মানুষের হর্তা-কর্তা-বিধাতা, সেখানে সকল মানবিক মর্যাদা, মূল্যমান পদদলিত হয় অনিবার্যভাবে। মানুষের নৈতিকতা হয় চরমভাবে বিপর্যস্ত। দূর অতীত-নিকট অতীতের এবং বর্তমান সময়ের সকল রাজা-বাদশাহ-স্বৈর শাসনের এ-ই হচ্ছে অভিন্ন রূপ।
আল্লামা তাবাতাবায়ী তাঁর প্রখ্যাত তাফসীর আল-মীযান-এ এ পর্যায়ে লিখেছেনঃ সমাজ সমষ্টির উপর কার কর্তৃত্ব চলবে, এই প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে যে, ইসলামী সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা রাজতান্ত্রিক-বাদশাহী-স্বৈর শাসন পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও সর্বদিক দিয়ে ভিন্নতর। রাজতান্ত্রিক-স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের জন্য আল্লাহর দেয়া সম্পদ ও সম্পত্তি কেবল সিংহাসনাসীন ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট করা হয়, তারই ভোগ-সম্ভোগের ইন্ধন বানানো হয় সকল মানুষকে তা থেকে বঞ্চিত করে। সমস্ত মানুষ হয় তার দাসানুদাস, আর সে তাদের নিয়ে যা ইচ্ছা হয় নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে সে তা-ই করে যায়। নিজ ইচ্ছামত তাদের উপর শাসন চালায়। তা পাশ্চাত্যের তথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঘোষণারও পরিপন্থী, যদিও ইসলাম ও পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে বিরাট ও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, কোন একটি দিক দিয়েও এ দু'য়ের মাঝে একবিন্দু সাদৃশ্য নেই।
পাশ্চাত্যের এসব সমাজ ব্যবস্থায় স্কুল ও বস্তুগত ভোগ-সম্ভোগকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তার ফলে এক শ্রেণীর লোকেরা অধিক সুযোগ-সুবিধা লাভ ও বেশীর ভাগ লোকের নিকৃষ্ট গোলাম ও অধিকার বঞ্চিত হয়ে থাকা একান্তই অনিবার্য হয়ে পড়ে।
এ কথা কাল্পনিক নয়, ঐতিহাসিকভাবে সত্য। দূর অতীতের ইতিহাসে যেমন এ ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালু থাকার কথা উল্লিখিত হয়েছে, নিকট অতীতের-বরং বর্তমান দুনিয়ার অবস্থা-ইতিহাসেও এ ধরনের শাসন ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত কিছুমাত্র বিরল নয়।
মিসরীয় ইতিহাসের ফিরাউনী শাসন, রোমান ইতিহাসে কাইজারের শাসন এবং পারস্য ইতিহাসের কিসরা শাসন তো এমন ঐতিহাসিক ব্যাপার, যা অস্বীকার করা কোন শিক্ষিত লোকের পক্ষেই সম্ভব নয়। এই শাসন-ব্যবস্থাসমূহে শাসক নিজে ইচ্ছা ও খাহেশ অনুযায়ী শাসনকার্য চালিয়েছে। কেননা এ সব-কয়টি শাসনই ছিল নিরংকুশ কর্তৃত্বের শাসন। তরবারির জোরেই এই শাসন ব্যবস্থাসমূহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠার দিন থেকে যত কাল-ই তা অক্ষুণ্ণ রয়েছে, তরবারিই তার বৈধতা প্রতিষ্ঠিত করেছে। সাধারণ মানুষ ছিল চরমভাবে অসহায়, মানবিক অধিকার থেকেও নির্মমভাবে বঞ্চিত, দাসানুদাস। রাজতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদী শাসনের তা ছিল নিকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত। এসব শাসন কিভাবে মানুষের অধিকার হরণ করেছে, কিভাবে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে তাদের জোরপূর্বক বহিষ্কৃত করে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছে, তাদের জমি-ক্ষেত থেকে তাদের উৎখাত করেছে, এমন এক স্থানে নির্বাসিত করেছে, যেখানে ঘাস ও পানির নাম চিহ্ন-ও নেই, যেখানে জীবন সম্পূর্ণ অসম্ভব এবং চরম প্রাণান্তকর অবস্থায় পড়ে থাকতে-হাজার হাজার নয়-লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাধ্য করেছে, সে সবের মর্মবিধারী কাহিনী বিশ্ব ইতিহাসের পৃষ্ঠায় এখন জ্বলজ্বল করছে।
মোটকথা, রাজকীয় শাসন মূলত ও কার্যত স্বৈরতান্ত্রিক শাসন আর স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের নির্মম ও মানবতা-বিরোধী কার্যকলাপের বিবরণ দেয়া খুব একটা সহজসাধ্য কাজ নয়। স্বৈর শাসনের মারাত্মক বিপর্যয় সত্যিই অবর্ণনীয়।
অবশ্য কুরআন মজীদে এ পর্যায়ের শাসন ব্যবস্থার যেসব কাহিনী উদ্ধৃত হয়েছে, তা আমরা এখানে সহজেই উল্লেখ করতে পারি।
টিকাঃ
১. في ظلام القرآن ج ١٩، ص ١٤٦ ٥
কুরআনুল করীমের দৃষ্টিতে মুলুকিয়াত-রাজতন্ত্র বা বাদশাহী শাসন পদ্ধতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলে স্বভাবতই ব্যাপক ও মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। তথায় ব্যক্তির ইচ্ছাকে সমগ্র জনগণের উপর শক্তিবলে চাপিয়ে দেয়া হয়। লোকেরা তা মেনে নিতে প্রস্তুত না হলে তাদেরকে তা মেনে নিতে বাধ্য করা হয়। ব্যক্তির কামনা-বাসনা-লালসা চরিতার্থ করার জন্য জাতীয় সম্পদকে বে-হিসেব ব্যয় ও প্রয়োগ করা হয়। কেননা দেশের সকল নৈসর্গিক সম্পদ ও শক্তির একচ্ছত্র মালিক হয়ে থাকে সেই রাজা বা বাদশাহ। এ ব্যাপারে কারোরই কোন আপত্তি জানাবার অধিকার থাকতে পারে না। তার সমালোচনা করা, দোষ-ত্রুটি বলে বেড়ানো বা সেজন্য কোনরূপ কটূক্তি করতে যাওয়াও নিজের জন্য ধ্বংস ডেকে আনা ছাড়া আর কিছু নয়। পৃথিবীর সুদীর্ঘ ইতিহাসে রাজতান্ত্রিক তথা বাদশাহী শাসন ব্যবস্থায় এর ব্যতিক্রম কুত্রাপি দেখা যায়নি। কুরআন মজীদ এ সত্যই ঘোষণা করেছে অত্যন্ত বলিষ্ঠ দৃঢ় ভাষায়। ইরশাদ হয়েছেঃ
إِنَّ الْمُلُوكَ إِذَا دَخَلُوا قَرْيَةً أَفْسَدُوهَا وَجَعَلُوا أَعِزَّةَ أَهْلُهَا أَذِلَّةٌ ، وَكَذَلِكَ يَفْعَلُونَ (النمل: ٣٤)
স্বৈরতান্ত্রিক ও রাজা-বাদশাহরা যখন কোন জনবসতির উপর কর্তৃত্ব লাভ করে তখন তারা সেই জনবসতিটিকে ধ্বংস করে এবং তার সম্মানিত ব্যক্তিবর্গকে বানায় সর্বাধিক লাঞ্ছিত-অপমানিত। তাদের এইরূপ কাজ চিরন্তন।
আল্লাহর কালামে উদ্ধৃত এ কথাটি মানব জীবনে কার্যকর ইতিহাসের ধারাবাহিকতার সাথে পূর্ণ মাত্রায় সামঞ্জস্যশীল। ইতিহাসে এর ব্যতিক্রম কখনই দেখা যায়নি, ভবিষ্যতেও এর ব্যতিক্রম দেখা যাবে না। আজকের পৃথিবীর বাস্তব অবস্থা এই ঘোষণার পরম সত্যতা ও বাস্তবতা অকাট্যভাবে প্রমাণ করছে।
সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ তাঁর তাফসীরে এ আয়াতটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ স্বৈরতান্ত্রিক শাসক শক্তির প্রকৃতিই হচ্ছে এই যে, তা যে দেশেই প্রতিষ্ঠা পায়, সে দেশেই ব্যাপক বিপর্যয় প্রচণ্ড করে তোলে। সে দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। সে দেশের মান-মর্যাদা পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করে। সে দেশের প্রতিরক্ষা শক্তিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। সেখানকার সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে। কেননা এই ব্যক্তিরাই হয়ে থাকে সে দেশের প্রকৃত প্রতিরোধ শক্তি। বস্তুত এটাই হচ্ছে এই শাসক শক্তির স্থায়ী চরিত্র। এর ব্যতিক্রম কখনই হতে পারে না। ১
বস্তুত কুরআন মজীদ বিভিন্ন প্রসঙ্গে রাজা-বাদশাহ ও স্বৈর শাসকদের মানবতা বিরোধী কার্যকলাপের প্রতি ইঙ্গিত করেছে। তারা সাধারণ মানুষের উপর নিজেদের শান-শওকত ও শক্তির দাপট চালায়, জনগণের ধন-সম্পদ নির্মম ও নির্লজ্জভাবে লুটে-পুটে নিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে তারা না কোন নিয়মনীতি মেনে চলে, না কোন সীমায় গিয়ে থেকে যেতে রাযী হয়। দুর্বল অক্ষম ও মিসকীন লোকদের সামান্য-সামান্য সম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নিতেও তারা কুণ্ঠিত হয় না। নিপীড়িত জনগণের মর্মবিদারী ফরিয়াদ তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না।
কুরআনে অন্য একটি প্রসঙ্গে একজন স্বৈরশাসকের চরিত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে যে, একজন দরিদ্র ব্যক্তি নিজের নৌকায় লোক পারাপার করে জীবিকা নির্বাহ করত। এক সময় এই আশঙ্কা প্রবল হয়ে দেখা দিল যে, বাদশাহ্ স্বৈরশাসক তার সেই নৌকাটি পর্যন্ত কেড়ে নেবে।
প্রসঙ্গটি হযরত খিজির ও হযরত মূসা (আ)-এর জ্ঞানান্বেষণমূলক সফর কাহিনী। হযরত খিজির একটি নৌকায় নদী পার হয়ে ওপারে পৌঁছে সেই নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করে দিয়েছিলেন। তার কারণ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেনঃ
أما السَّفِينَةُ فَكَانَتْ لِمَسَاكِينَ يَعْمَلُونَ فِي الْبَحْرِ فَأَرَدْتُ أَنْ أَعِيبَهَا وَكَانَ وَرَاءَهُمْ ملِكَ يَأْخُذُ كُلَّ سَفِينَةٍ غَصْبًا (الكهف: ۷۹)
সেই নৌকাটির ব্যাপার এই ছিল যে, সেটি ছিল কয়েকজন গরীব ব্যক্তির মালিকানা, এই নৌকাটিকে কেন্দ্র করে তারা নদীতে শ্রম-মজুরী করত। আমি সেটিকে দোষযুক্ত করে দিতে চেয়েছিলাম কেননা তাদের অঞ্চলে একজন রাজা-স্বৈর শাসক-রয়েছে, যে প্রতিটি নৌকা জোরপূর্বক কেড়ে নেয়।
যে নৌকাটির কথা এ আয়াতে বলা হয়েছে, কুরআনের কথানুযায়ী সেটি ছিল কয়েকজন মিসকীন দরিদ্র ব্যক্তির জীবিকার্জনের মাধ্যম বা উপায়। এই নৌকাটিতে চড়েই তারা নদী-পথে নিজেদের শ্রম বিনিয়োগ করতে পারছিল। নৌকাটি ব্যতীত তাদের শ্রম করার কোন উপায় ছিল না। সেই নৌকাটি কেড়ে নেয়া কোন ন্যায়পরায়ণ আদর্শবাদী-ইসলামী প্রশাসকের কাজ হতে পারে না। কিন্তু তথাকার বাদশাহ তাই কেড়ে নিত! অন্য কথায়, দরিদ্র জনগণের জীবিকা নির্বাহের উপায়সমূহ করায়ত্ত করে তাদেরকে শ্রম করে উপার্জন করার উপায় থেকে বঞ্চিত করে দিয়ে ক্ষুধার জ্বালায় ছট্ফট্ করে মরে যাওয়ার জন্য ছেড়ে দেয়াই রাজা-বাদশাহ ও স্বৈর শাসকদের নীতি এবং চরিত্র। অর্থাৎ স্বৈর শাসন শুধু রাজনৈতিক শক্তিকে করায়ত্ব করা নয়, অর্থনৈতিক শক্তি ও উপায়গুলিকেও নিজের একক দখলে নিয়ে আসা। রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও যে কোন প্রকারের সম্মান ঠিক এই কারণেই আল্লাহ প্রদত্ত আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
মিসরের ফিরাউনী শাসনের ইতিহাসেও এই অবস্থারই বাস্তব চিত্র লক্ষ্য করা যায়। ফিরাউন দেশের আপামর জনগণের উপর নিরংকুশ শাসন চাপিয়ে সারাদেশের যাবতীয় ধন-মালের একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসার ঘোষণা দিয়েছিল। ফিরাউন উদাত্ত কণ্ঠে প্রচার করেছিলঃ
يَقَوْمِ أَلَيْسَ لِي مُلْكُ مِصْرَ وَهَذِهِ الْأَنْهُرُ تَجْرِي مِنْ تَحْتِى ، أَفَلَا تُبْصِرُونَ * (الزخرف: ٥١)
হে জনগণ! সমগ্র মিসরের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কি আমার করায়ত্ত নয়? আর এই নদী সমুদ্র কি আমারই নিয়ন্ত্রণাধীন প্রবাহমান নয়?.... তোমরা কি এসব দেখতে পাও না, লক্ষ্য কর না?
এই নিরংকুশ-রাজতন্ত্র-স্বৈর শাসন আল্লাহ্ দেয়া বিধান পালন করে না, কোন বিশেষ ও স্থির রীতি-নীতিরও অনুসারী নয়, বরং তা এক ব্যক্তির স্বাধীন বিমুক্ত ইচ্ছার অন্ধ অনুসারী, তাই সেই ব্যক্তির ইচ্ছা কামনা-বাসনা চরিতার্থ করাই হয় সে শাসনের একমাত্র লক্ষ্য। সারাদেশের যাবতীয় ধন-সম্পদ ও সম্পদ-উৎপাদনের উৎস সবকিছুরই নিরংকুশ মালিক হয়ে বসা এবং তার কোন কিছুর উপর জনগণের কোন অধিকার স্বীকার না করাই হচ্ছে তার প্রকৃতি ও স্বভাব। সাধারণ মানুষের দখলে কোথাও কিছু থাকলেও তা কোন-না-কোন সময়ে কেড়ে নেয়াই তার নীতি।
রাজতন্ত্র-বাদশাহী ও স্বৈর শাসনের এ-ই যখন স্বভাব, তখন শরীয়াতের বিধানের কথা তো অনেক দূরের, সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি কি করে তা সমর্থন করতে পারে? কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ এইরূপ শাসন ব্যবস্থার হাতে কি করে সঁপে দেয়া যেতে পারে? এসব স্বার্থপর অহংকারী শাসন-ব্যবস্থা কোনক্রমেই সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। ওরা মানুষের জীবন, ইজ্জত-আব্রু ও রুটি-রুজি নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতায় মেতে থাকবে আর সাধারণ মানুষ তা চুপচাপ সহ্য করে যাবে- এটাই বা ধারণা করা যেতে পারে কিভাবে?
রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও স্বৈর শাসনে ব্যক্তির ইচ্ছা সমষ্টির উপর বিজয়ী ও প্রবল হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। তা হয়ে দাঁড়ায় কোটি কোটি মানুষের হর্তা-কর্তা-বিধাতা, সেখানে সকল মানবিক মর্যাদা, মূল্যমান পদদলিত হয় অনিবার্যভাবে। মানুষের নৈতিকতা হয় চরমভাবে বিপর্যস্ত। দূর অতীত-নিকট অতীতের এবং বর্তমান সময়ের সকল রাজা-বাদশাহ-স্বৈর শাসনের এ-ই হচ্ছে অভিন্ন রূপ।
আল্লামা তাবাতাবায়ী তাঁর প্রখ্যাত তাফসীর আল-মীযান-এ এ পর্যায়ে লিখেছেনঃ সমাজ সমষ্টির উপর কার কর্তৃত্ব চলবে, এই প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে যে, ইসলামী সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা রাজতান্ত্রিক-বাদশাহী-স্বৈর শাসন পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও সর্বদিক দিয়ে ভিন্নতর। রাজতান্ত্রিক-স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের জন্য আল্লাহর দেয়া সম্পদ ও সম্পত্তি কেবল সিংহাসনাসীন ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট করা হয়, তারই ভোগ-সম্ভোগের ইন্ধন বানানো হয় সকল মানুষকে তা থেকে বঞ্চিত করে। সমস্ত মানুষ হয় তার দাসানুদাস, আর সে তাদের নিয়ে যা ইচ্ছা হয় নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে সে তা-ই করে যায়। নিজ ইচ্ছামত তাদের উপর শাসন চালায়। তা পাশ্চাত্যের তথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঘোষণারও পরিপন্থী, যদিও ইসলাম ও পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে বিরাট ও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, কোন একটি দিক দিয়েও এ দু'য়ের মাঝে একবিন্দু সাদৃশ্য নেই।
পাশ্চাত্যের এসব সমাজ ব্যবস্থায় স্কুল ও বস্তুগত ভোগ-সম্ভোগকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তার ফলে এক শ্রেণীর লোকেরা অধিক সুযোগ-সুবিধা লাভ ও বেশীর ভাগ লোকের নিকৃষ্ট গোলাম ও অধিকার বঞ্চিত হয়ে থাকা একান্তই অনিবার্য হয়ে পড়ে।
এ কথা কাল্পনিক নয়, ঐতিহাসিকভাবে সত্য। দূর অতীতের ইতিহাসে যেমন এ ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালু থাকার কথা উল্লিখিত হয়েছে, নিকট অতীতের-বরং বর্তমান দুনিয়ার অবস্থা-ইতিহাসেও এ ধরনের শাসন ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত কিছুমাত্র বিরল নয়।
মিসরীয় ইতিহাসের ফিরাউনী শাসন, রোমান ইতিহাসে কাইজারের শাসন এবং পারস্য ইতিহাসের কিসরা শাসন তো এমন ঐতিহাসিক ব্যাপার, যা অস্বীকার করা কোন শিক্ষিত লোকের পক্ষেই সম্ভব নয়। এই শাসন-ব্যবস্থাসমূহে শাসক নিজে ইচ্ছা ও খাহেশ অনুযায়ী শাসনকার্য চালিয়েছে। কেননা এ সব-কয়টি শাসনই ছিল নিরংকুশ কর্তৃত্বের শাসন। তরবারির জোরেই এই শাসন ব্যবস্থাসমূহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠার দিন থেকে যত কাল-ই তা অক্ষুণ্ণ রয়েছে, তরবারিই তার বৈধতা প্রতিষ্ঠিত করেছে। সাধারণ মানুষ ছিল চরমভাবে অসহায়, মানবিক অধিকার থেকেও নির্মমভাবে বঞ্চিত, দাসানুদাস। রাজতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদী শাসনের তা ছিল নিকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত। এসব শাসন কিভাবে মানুষের অধিকার হরণ করেছে, কিভাবে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে তাদের জোরপূর্বক বহিষ্কৃত করে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছে, তাদের জমি-ক্ষেত থেকে তাদের উৎখাত করেছে, এমন এক স্থানে নির্বাসিত করেছে, যেখানে ঘাস ও পানির নাম চিহ্ন-ও নেই, যেখানে জীবন সম্পূর্ণ অসম্ভব এবং চরম প্রাণান্তকর অবস্থায় পড়ে থাকতে-হাজার হাজার নয়-লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাধ্য করেছে, সে সবের মর্মবিধারী কাহিনী বিশ্ব ইতিহাসের পৃষ্ঠায় এখন জ্বলজ্বল করছে।
মোটকথা, রাজকীয় শাসন মূলত ও কার্যত স্বৈরতান্ত্রিক শাসন আর স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের নির্মম ও মানবতা-বিরোধী কার্যকলাপের বিবরণ দেয়া খুব একটা সহজসাধ্য কাজ নয়। স্বৈর শাসনের মারাত্মক বিপর্যয় সত্যিই অবর্ণনীয়।
অবশ্য কুরআন মজীদে এ পর্যায়ের শাসন ব্যবস্থার যেসব কাহিনী উদ্ধৃত হয়েছে, তা আমরা এখানে সহজেই উল্লেখ করতে পারি।
টিকাঃ
১. في ظلام القرآن ج ١٩، ص ١٤٦ ٥
📄 স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের মারাত্মক পরিণতি
কুরআন মজীদে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন পর্যায়ে ফিরাউনী শাসনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন ফিরাউনকে একজন গর্বিত, অহংকারী 'মাথা উঁচুকারী' 'সীমালংঘনকারী', 'বাড়াবাড়িকারী' শাসকরূপে চিহ্নিত করেছেন। বলেছে, সে নিজেকে অন্যান্য সকল মানুষের তুলনায় শ্রেষ্ঠ, উন্নত ও উত্তম বলে দাবি করছে। সকলের ইচ্ছার উপর তার ইচ্ছা বিজয়ী, প্রধান ও প্রভাবশালী বলে ঘোষণা করছে। বলা হয়েছেঃ
ثُمَّ بَعَثْنَا مِنْ بَعْدِهِمْ مُوسَى وَهُرُونَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَائِهِ بِأَيْتِنَا فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا مُجْرِمِينَ (يونس : ٧٥)
অতঃপর আমরা তাদের পরে মূসা ও হারুনকে আমাদের আয়াতসমূহ সহকারে ফিরাউন ও তার দলীয় সরদার মাতব্বরদের নিকট পাঠিয়ে ছিলাম। কিন্তু তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভ প্রকাশ করল। আসলে তারা ছিল-ই অপরাধী লোক।
فَمَا آمَنَ لِمُوسَىٰ إِلَّا ذُرِّيَّةٌ مِنْ قَوْمِهِ عَلَى خَوْفٍ مِنْ فِرْ عَوْنَ وَمَلَائِهِمْ أَنْ يَفْتِنَهُمْ . وَإِنَّ فِرْعَوْنَ لَعَالٍ فِي الْأَرْضِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الْمُسْرِفِينَ (يونس: ۸۳)
তারপর অবস্থা এই হলো যে, ফিরাউনের বিপুল লোকজনের মধ্য থেকে মাত্র কতিপয় যুবক ছাড়া মূসার প্রতি আর কেউ-ই ঈমান আনল না। তার কারণই ছিল ফিরাউন ও স্বয়ং নিজ জাতির কর্তৃত্বশালী লোকদের ভয়। ভয় ছিল এই যে, ফিরাউন তাদেরকে আযাবে নিমজ্জিত করবে। আর ফিরাউন তো দুনিয়ায় শক্তিমান ও সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশালীরূপে প্রতিষ্ঠিত ছিল। আর সে ছিল সকল সীমালংঘনকারী লোকদের একজন।
ثُمَّ أَرْسَلْنَا مُوسَى وَأَخَاهُ هُرُونَ بَابْتِنَا وَسُلْطَنٍ مُّبِينٍ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَاتِهِ فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا عَالِينَ (المؤمنون: ٤٥-٤٦)
অতঃপর আমরা মূসা ও তার ভাই হারুনকে আমাদের নির্দশনাদি ও সুস্পষ্ট দলীল সহকারে ফিরাউন ও তার দল-বলের নিকট পাঠিয়েছিলাম। তখন তারা অহংকার-গর্ব প্রকাশ করল। আর আসলে তারা নিজদিগকে সর্বোচ্চ স্থানীয় মনে করত।
وَلَقَدْ نَجَيْنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنَ الْعَذَابِ الْمُهِينِ مِنْ فِرْعَوْنَ إِنَّهُ كَانَ عَالِيًّا مِنَ المسرفين (الدخان ٣٠ - ٣١)
আমরা বনি ইসরাইলদের অত্যন্ত অপমানকর আযাব থেকে নিশ্চিতভাবেই মুক্তি দিয়েছিলাম। সে আযাব দিচ্ছিল ফিরাউন। আর সে ছিল সীমা- লংঘনকারী উচ্চাভিমানী ব্যক্তি।
ফিরাউন সম্পর্কে পর পর উদ্ধৃত এ চারটি আয়াতে ফিরাউনের একটি চিত্র স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে-ফিরাউন ছিল বড় অহংকারী। নিজেকে ও নিজেদের দলবলকে সে সর্বোচ্চ স্থানীয় ও অন্যান্য সকল মানুষের উপর প্রবল পরাক্রান্ত ও সর্বাধিক প্রভাব ও কর্তৃত্বসম্পন্ন জ্ঞান করত। ফলে সে তার শাসনাধীন-বিশেষ করে অসহায় বনি ইসরাইলীদের কঠিন অপমানকর আযাবের মধ্যে নিমজ্জিত করে দিয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা তাদের মুক্তিদানের উদ্দেশ্যেই হযরত মূসা ও তাঁর ভাই হারুন (আ)-কে ফিরাউন ও তার দলবলের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু তারা এতই অহংকারী-গৌরবী ছিল যে, তারা হযরত মূসা ও হারুনের দাওয়াত মেনে নিতে রাযী হয়নি। মানবেই বা কি করে; তারা তো নিজেদেরকে অন্যসব মানুষ থেকে স্বতন্ত্র ও উচ্চ স্থানীয় মনে করে। তারা যেমন অপর কারোর কোন যুক্তিসঙ্গত কথা মেনে নিতে রাযী হতে পারে না, তেমনি তারা অন্যান্য সাধারণ মানুষের উপর নির্মম অত্যাচার চালাতে অবশ্যই উদ্যোগী হবে। তাদের অপমানকর আযবে মানুষ হবে অকথ্যভাবে নিপীড়িত, সারাদেশে ব্যাপক বিপর্যয় দেখা দেয়া এরূপ অবস্থায় নিতান্তই অপরিহার্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। ফিরাউনের মনোভাব ছিল নিঃসন্দেহে স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব, ওরূপ মনোভাবেরই ফসল হচ্ছে জনগণের উপর স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রবর্তন। যেখানেই শাসকদের মধ্যে ওরূপ মনোভাবের জন্ম হয়েছে, সেখানেই স্বৈরতান্ত্রিক শাসন অনিবার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। কুরআন মর্জীদে এ পর্যায়ে আরও বলা হয়েছেঃ
وَجَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودُهُ بَغْيًا وَعَدْوا - حَتَّى إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ - قَالَ آمَنْتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنْتُ بِهِ بَنُوا إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ * آلْآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ (يونس : ৯০-৯১)
বনি ইসরাইলদের আমরা সমুদ্র অতিক্রম করালাম। তখন ফিরাউন তার সৈন্যবাহিনী তাদের অনুসরণে সমুদ্রে নেমে পড়ল। তারা বাড়াবাড়ি ও জুলুমের উদ্দেশ্যেই তা করেছিল। শেষ পর্যন্ত ফিরাউন যখন ডুবে যেতে লাগল, তখন বললঃ আমি বিশ্বাস করি যে, বনি ইসরাইলীরা যে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে সে ব্যতীত ইলাহ্ আর কেউ নেই। আমি অনুগত লোকদের একজন। তখন বলা হলোঃ তুমি এখন ঈমান আনছো, অথচ এর পূর্ব পর্যন্ত তুমি আল্লাহ্ নাফরমানী করছিলে, আর তুমি ছিলে একজন বিপর্যয়কারী ব্যক্তি।
ফিরাউন তো মিসরের লোকদের দাসানুদাস বানিয়ে রেখেছিল। সে ছিল বড় অহংকারী। জনগণের মৌলিক মানবিক অধিকারটুকু পর্যন্ত হরণ করে নিয়েছিল। তার উপর দিয়ে যেমন কারোর কথা চলতো না, তেমনি তার উপর কথা বলার সাহসও কারোর ছিল না।
ফিরাউন হযরত মূসা ও হারুনের তওহীদী দাওয়াত কবুল করেনি, বনি ইসরাইলীদের মুক্তিদানের দাবিও মেনে নিতে রাযী হয়নি। তার কারণ কি? কুরআনে বলা হয়েছেঃ
فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا عَالِينَ - فَقَالُوا أَنُؤْمِنُ لِبَشَرَيْنِ مِثْلَنَا وَقَوْمَهُمَا لَنَا عِيدُونَ (المؤمنون: (٤٧-٤٦)
ওরা অহংকার দেখাল। ওরা ছিলই উচ্চতর স্থান দখলকারী লোক। ওরা বলেছিলঃ আমরা কি আমাদেরই মত দুইজন লোকের কথা মেনে নেব, অথচ ওদের লোকেরাই আমাদের অধীন দাসানুদাস?
হযরত মূসা ও হারুন (আ) নিজেদেরকে আল্লাহর রাসূল রূপেই ফিরাউনের নিকট পেশ করেছিলেন এবং একদিকে ফিরাউনকে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত দিয়েছিলেন আর অপর দিকে বনি ইসরাইলীদের মুক্তি দানের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সে এর কোন একটি কথাও মেনে নেয়নি।
না মানার কারণ হিসেবে উদ্ধৃত আয়াতটিতে তিনটি কথা বলা হয়েছে। একটিঃ ফিরাউন ও তার সঙ্গী-সাথীরা নিজেদেরকে সর্বোচ্চ স্থানীয় মনে করার অহংকারে লিপ্ত ছিল। দ্বিতীয়, তারা তাদেরই মত মানুষ মূসা ও হারুনকে আল্লাহ প্রেরিত বিশ্বাস করতে রাযী হতে পারেনি। আর তৃতীয় হচ্ছে, তারা বনি ইসরাইলীদের- যারা মূসা ও হারুনের বংশের লোক ছিল-দাসানুদাস বানিয়ে রেখেছিল। বনি ইসরাইলীদের দাসানুদাস বানিয়ে রাখার উপরই হযরত মূসা ও হারুন আপত্তি জানিয়েছিলেন ও তার তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। জবাবে ফিরাউন বলেছিলঃ
الَمْ نَرَبِّكَ فِينَا وَلِيْدًا وَلَبِثْتَ فِينَا مِنْ عُمُرِكَ سِنِينَ - (الشعراء: ١٨)
আমরা কি তোমাকে বাচ্চা বয়সে লালন-পালন করিনি? এবং তুমি কি আমাদের মধ্যে তোমার বয়সের কতিপয় বছর-কাল অবস্থান কর নি?
এ কথার জবাবে হযরত মূসা (আ) বলেছিলেনঃ
وَتِلْكَ نِعْمَةٌ تَمَنَّهَا عَلَى أَنْ عَبَدَتْ بَنِي إِسْرَائِيلَ (الشعراء: ٢٢)
হ্যাঁ, এটা তো একটা নিয়ামত ছিল। আর তুমি আমার উপর সেই অনুগ্রহের দোহাই দিচ্ছ এবং এটাকে কারণ বানিয়ে তুমি বনি ইসরাইলদের দাসানুদাস বানিয়ে রেখেছ।
অর্থাৎ মূসার বাল্যকালে ফিরাউনের ঘরে লালিত-পালিত হওয়া ও তাদের মধ্যে তাঁর বয়সের কয়েকটি বছর অবস্থান করার ব্যাপারটি ছিল আল্লাহর একটি নিয়ামত- একটি বিশেষ ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থা দেখিয়ে মূসার প্রতি ফিরাউনের অনুগ্রহ প্রদর্শন যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। আর এই কারণ দেখিয়ে বনি ইসরাইলীদের দাসানুদাস বানিয় রাখারও কোন যুক্তি থাকতে পারে না।
অর্থাৎ স্বৈর শাসক তার স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পক্ষে ব্যক্তিগত অনুগ্রহ বর্ষণকে দাঁড় করাতে চেষ্টা করে। কিন্তু যুক্তির কষ্টিপাথরে তা কিছুতেই উত্তীর্ণ হতে বা যুক্তিসঙ্গত বলে প্রমাণিত হতে পারে না। আসলেই ফিরাউন ছিল চরম অহংকারী, উচ্ছৃঙ্খল, সীমালংঘনকারী ও স্বৈরতান্ত্রিক। সে কারোর উপদেশ-নসীহত শুনতে প্রস্তুত হয় না, কারোর একবিন্দু বিরূপ সমালোচনা বরদাস্ত করতে রাযী হতে পারে না। তখন তার নিকৃষ্টতম কার্যাবলীকে সে সুন্দর ও কল্যাণময় কাজ হিসেবে জনগণের সম্মুখে পেশ করে ও সেই সব কাজের দোহাই দিয়ে স্বীয় স্বৈর শাসনের যৌক্তিকতা ও বৈধতা প্রমাণ করার জন্য নিষ্ফল চেষ্টা করে।
কুরআনের এ আয়াতদ্বয়ে সেই কথাই বলা হয়েছেঃ
وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَهَا مَنُ بْنِ لِي صَرْحًا لَعَلَى ابْلُغُ الْأَسْبَابَ - أَسْبَابَ السَّمَوتِ فَاطَّلِعَ إلى الهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا وَكَذَلِكَ زُيِّنَ لِفِرْعَوْنَ سُوءُ عَمَلِهِ وَصُدَّ عَنِ السَّبِيلِ ، وَمَا كَيْدُ فِرْعَوْنَ إِلَّا فِي تَبَابِ (المؤمن: ٣٦-٣٧)
ফিরাউন বললঃ হে হামান, আমার জন্য একটি উচ্চ ইমারত নির্মাণ কর, যেন আমি ঊর্ধ্বলোকের পথসমূহ পর্যন্ত পৌঁছতে পারি-আকাশমণ্ডলের পথসমূহ এবং মূসার খোদাকে চোখ দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারি। এই মূসা তো আমার কাজে মিথ্যাবাদী মনে হয়-এভাবে ফিরাউনের জন্য তার বদ আমল চাকচিক্যময় বানিয়ে দেয়া হলো এবং তাকে সঠিক পথ থেকে বিরত রাখা হলো। ফিরাউনের সমস্ত চালবাজি তার নিজের ধ্বংসেই ব্যবহৃত হলো।
বস্তুত স্বৈরতন্ত্রী শাসক নিজের মতকেই চূড়ান্ত মনে করে। তার বিশ্বাস-জনগণেরও উচিত তার মতকেই চূড়ান্ত বলে মেনে নেয়া। সে যা চিন্তা করে, তার যৌক্তিকতা সকলেরই মাথা পেতে নেয়া কর্তব্য। সে মত ও চিন্তা বাস্তবিকই যুক্তিভিত্তিক ও সুবিবেচনাপ্রসূত কিনা, তা জনগণের বিচার্য বিষয় নয়। স্বৈর শাসক যখন 'বলে দিয়েছে, তখন আর সে বিষয়ে জনগণের কিছু বলবার বা ভাববার কি থাকতে পারে। স্বৈর শাসকের কথাই হবে আইন, জনগণ তা অকুণ্ঠিত মনে ও নির্বাক চিত্তে মেনে নেবে, এ-ই তো হওয়া উচিত! তার মত ও ইচ্ছা-বাসনার নিকট সকলেরই আত্মসমর্পণ করা কর্তব্য। হযরত মূসা (আ) লোকদের সম্বোধন করে ফিরাউনের স্বৈর শাসনের প্রেক্ষিতে বলেছিলেনঃ
يَقَوْمِ لَكُمُ المُلكُ الْيَوْمَ ظَهِرِينَ فِي الْأَرْضِ - فَمَنْ يَنْصُرُنَا مِنْ بَأْسِ اللَّهِ إِنْ جَاءَنَا (المؤمن : ۲۹)
হে আমার জনগণ! আজ তোমরাই বাদশাহী ও কর্তৃত্বের অধিকারী, পৃথিবীতে তোমরাই বিজয়ী-প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আল্লাহর আযাব যদি এসেই পড়ে, তাহলে তখন কে আমাদের সাহায্য করবে (তা ভেবে দেখছ কি)?
অর্থাৎ তোমাদের এই স্বৈর শাসন ও বিজয়ীরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়া আল্লাহ্ আযাব আসার কারণ। সে আযাব যদি এসে-ই পড়ে, তাহলে তা ঠেকানো এবং জনগণকে সে আযাব থেকে রক্ষা করা এই স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পক্ষে আদৌ সম্ভব হবে না।
ফিরাউন হযরত মূসার একথা শুনে জবাবে বললঃ
مَا أُرِيكُمْ إِلَّا مَا أَرَى وَمَا أَهْدِيكُمْ إِلَّا سَبِيلَ الرَّشَادِ (المؤمن: (۲۹)
আমি তো তোমাদেরকে সেই মত-ই দেব, যা আমার দৃষ্টিতে সমীচীন। আর আমি সেই পথই তোমাদেরকে দেখাব, যা (আমার দৃষ্টিতে) সত্য ও সঠিক।
অর্থাৎ স্বৈর শাসকের মত জনগণের মত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর এবং সে মতকেই সকলের উপর চাপিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। সে যে পথকেই সত্য ও সঠিক মনে করবে, তাকে অন্যরা সত্য ও সঠিক মনে না করলেও- তা আল্লাহ এবং রাসূলের দেখানো পথের বিপরীত হলেও সেই পথে সকলকে চলতে বাধ্য করাই নীতি। ফলে স্বৈর শাসক গোটা সমাজের বিপুল জনতাকে দুর্বল পেয়ে তাদের অপমান করতে একবিন্দু কুণ্ঠিত হয় না। যেমন ফিরাউন মিসরের জনগণকে অপমানিত করেছিল বলে কুরআন বলেছেঃ
فَاسْتَخَفَّ قَوْمَهُ فَأَطَاعُوهُ - إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَسِقِينَ (الزخرف: ٥٤)
ফিরাউন তার অধীন বসবাসকারী জনগণকে নির্বোধ বানিয়ে তাদেরকে গুমরাহীর দিকে পরিচালিত করেছিল। আর সেই জনগণও তাকে মেনে নিয়েছিল। মেনে নিয়েছিল এজন্যে যে, তারা নিজেরাই ছিল আল্লাহ্ সীমালংঘনকারী লোক।
স্বৈর শাসনে শাসিত জনতা বাস্তবিকই নির্বোধ হয়ে যায়। তারা স্বাধীন বিমুক্ত চিন্তা-বিবেচনা শক্তিও হারিয়ে ফেলে। স্বৈর শাসনের অধীন স্বাধীন চিন্তার অবকাশ থাকে না বলেই এরূপ হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। তখন স্বৈরতন্ত্রী শাসন জনগণকে নিজের দাসানুদাসে পরিণত করে নেয়। তখন সে চায়, জনগণ অন্ধের মত তার অনুসরণ করুক, নিজেদের স্বাধীন চিন্তা-বিবেচনা তুলে রেখে নিতান্ত অক্ষমের ন্যায় তাকে মেনে চলুক। তার কার্যকলাপে কেউ ‘টু’ শব্দটি না করুক।
অন্য কথায়, স্বৈরতন্ত্রী শাসক চায়, মানুষ আল্লাহ্র প্রতি ঈমান এনে যেমন তাঁর দাসত্ব করা ও তাঁর আদেশ নিষেধ মেনে চলা স্বীয় কর্তব্য বলে মনে করে, ঠিক সেই রকমই তার দাসত্ব করুক, তার কথা অকপটে মেনে নিক। স্বৈর শাসক কখনই পছন্দ বা বরদাশত করতে পারে না যে, মানুষ তার অধীন থেকে অন্য কারোর-এমন কি আল্লাহর-দাসত্ব করুক, আল্লাহর বিধান পালন করুক। তার পথে সে প্রবল প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতেও কুণ্ঠিত হয় না। যদি কেউ সব বাধা অতিক্রম করে এক আল্লাহর দাসত্ব করে, তাহলে তখন সে তাদেরকে অমানুষিক অত্যাচারে জর্জরিত করে। তাকে কারাগারে বন্ধী করে। তথায় যত রকমে পীড়ন দেয়া সম্ভব তাই দিয়ে তার উপর নিপীড়ন চালায়। কুরআন মজীদ ফিরাউনের এ ধরনের কার্যকলাপের বিবরণ উপস্থাপিত করেছে। একটি আয়াতঃ
وَقَالَ فِرْعَوْنُ يٰۤاَيُّهَا الْمَلَاُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرِىْ (القصص: ۳۸)
ফিরাউন বললঃ হে জনগণ! আমি ছাড়া তোমাদের আর কেউ ইলাহ্ আছে বলে আমি জানি-ই না।
এভাবে স্বৈরতন্ত্রী শাসক শেষ পর্যন্ত নিজেকেই জনগণের সর্বময় কর্তা ও সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী শাসক রূপে জনগণকে মেনে নেয়ার আহবান জানায়। যেমন ফিরাউন জানিয়েছিলঃ
فَحَشَرَ فَنَادٰى ۙ فَقَالَ اَنَا رَبُّكُمُ الْاَعْلٰى (النزعت: ٢٣-٢٤)
ফিরাউন জনগণকে একত্রিত করে ভাষণ দিল। বললঃ আমি-ই হচ্ছি তোমাদের সর্বোচ্চ রব্ব।
সে আল্লাহ্র রাসূল হযরত মূসা (আ)-কে পর্যন্ত ধমক দিল। বললঃ
لَئِنِ اتَّخَذْتَ اِلٰهًا غَيْرِيْ لَاَجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُونِيْنَ (الشعراء: ٢٩)
হে মূসা! তুমি যদি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ‘ইলাহ’ রূপে গ্রহণ কর, তাহলে আমি তোমাকে গ্রেফতার করে কারাগারে বন্দী করে দেব।
এই স্বৈরাচারীর ক্রোধের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায় যখন সে দেখতে পায় যে, তার-ই অধীন, তারই শাসিত দুর্বল-অক্ষম-দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরা তার পরিবর্তে অন্য কাউকে 'ইলাহ' বা 'রব্ব' মেনে নিয়েছে এবং তাঁরই সমীপে নিজেকে সমর্পিত করে দিয়েছে এবং তাঁরই আনুগত্য করে সম্পূর্ণ ভিন্নতর জীবন ধারা গ্রহণ করে চলেছে। তখন সে সর্বশক্তি নিয়োগ করে তার উপর নির্যাতন-নিষ্পেষণের স্টীম রোলার চালাতে শুরু করে। এ সময় স্বৈর শাসকের মুখ থেকে তার যে মনোভাব প্রকাশিত হয়, কুরআনের ভাষায় তা-ই ছিল ফিরাউনের কথা। সে বলেছিলঃ
امَنْتُمْ لَهُ قَبْلَ أَنْ أَذَنَ لَكُمْ إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلَّمَكُمُ السِّحْرَ فَلَسَوفَ تَعْلَمُونَ لا قطعَنَّ أَيْدِيكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ مِّنْ خِلَافٍ وَلَا صَلِّبَنَّكُمْ أَجْمَعِينَ (الشعراء: ٤٩)
তোমরা মূসার কথা মেনে নিলে আমার অনুমতি দেয়ার আগেই? নিশ্চয়ই সে তোমাদের মধ্যে সেই বড় ব্যক্তি, যে তোমাদেরকে যাদুবিদ্যা শিখিয়েছে। (এর পরিণাম কত ভয়াবহ হতে পারে, তা) তোমরা শিগগীরই জানতে পারবে। আমি (তোমাদের এই অপরাধের শাস্তি স্বরূপ) তোমাদেরকে হাত ও পা বিপরীত দিক দিয়ে কেটে ফেলব এবং তোমাদের সকলকে শূলবিদ্ধ করব।
امَنْتُمْ لَهُ قَبْلَ أَنْ اذَنَ لَكُمْ إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلْمَكُمُ السِّحْرَ - فَلَا قَطِعَنَّ أَيْدِيكُمْ وَارْجُلَكُمْ مِنْ خِلَافٍ وَلَا وَصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ - وَلَتَعْلَمُنَّ أَيُّنَا أَشَدُّ عَذَابًا وابقى (طه: ৭১)
তোমরা তার (মুসা'র) প্রতি ঈমান আনলে আমার অনুমতি দেয়ার আগেই? বোঝা গেল, সেই তোমাদের সেই বড় ব্যক্তিটি, যে তোমাদেরকে যাদুবিদ্যা শিখিয়েছে।....ঠিক আছে, এখন আমি তোমাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং খেজুর গাছের উপর তোমাদেরকে শূলে বসাব, তাহলেই তোমরা বুঝতে পারবে, আমাদের দু'জনার মধ্যে আযাব দেয়ার দিক দিয়ে কে অধিক কঠোর ও নির্মম এবং কে অধিক টিকে থাকতে সক্ষম।
স্বৈর শাসক জনগণকে উপদেশ ও সমঝ-বুঝ দিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ে আসার সামাজিক পদ্ধতি অবলম্বনের ধার ধারে না, তার প্রয়োজনও মনে করে না। সে কারোর সাথে মত বিনিময় বা একজনের মতের মূলে নিহিত যুক্তিধারা বুঝতেও প্রস্তুত নয়। হযরত মূসা ও হারুন (আ)-এর তওহীদী দাওয়াতের মর্ম বুঝতে না পেরে তারা নিজেরা যেমন ক্ষমতালোভী, তাঁদেরকেও তেমনি মনে করে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল এই বলেঃ
أَجِئْتَنَا لِتَلْفِتَنَا عَمَّا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا وَتَكُونَ لَكُمَا الْكِبْرِيَاءُ فِي الْأَرْضِ - وَمَا نَحْنُ لَكُمَا بِمُؤْمِنِينَ (يونس: ۷৮)
তোমরা কি আমার নিকট এ উদ্দেশ্যেই এসেছ যে, আমরা যে আমাদের পূর্বপুরুষ থেকে চলে আসা ধর্মমত ও কাজকর্ম অনুসরণ করে চলেছি তা থেকে তোমরা আমাদেরকে ভিন্ন দিকে ফিরিয়ে নেবে? আর দেশে সকল প্রকার শ্রেষ্ঠত্ব-প্রাধান্য-কর্তৃত্ব কেবল তোমাদের দু'জনারই প্রতিষ্ঠিত হবে?.....না, আমরা তোমাদের প্রতি বিশ্বাসী হতে পারছি না।
নবী-রাসূলগণের তওহীদী দাওয়াতের মুকাবিলা করার জন্য বাতিলপন্থী ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাসীন লোকেরা চিরদিনই এই ধরনের কথা বলেছে। ফিরাউন ও তার রাজন্যবর্গ যেমন মূসা ও হারুন (আ)-কে বলেছিল। তাদের এই কথা থেকে তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। তওহীদের বিপ্লবী দাওয়াৎ শোনামাত্র এই শ্রেণীর লোকদের মনে ভয় জেগে উঠে যে, আসলে ওরা আমাদের চলমান জীবনধারা, চরিত্র, নৈতিকতা, সামাজিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চায়। তার কারণ এই যে, ওরা হয় তওহীদী দাওয়াতের মর্ম বুঝতে পারে না অথবা তা বুঝতেই চায় না কিংবা ওরা শক্তি ও ক্ষমতার নেশায় এতই বুঁদ হয়ে থাকে যে, সামান্য ব্যতিক্রমধর্মী কথা শুনলেই ওদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। ভাবে, এই বুঝি গেল আমাদের বাপ-দাদার নিকট থেকে পাওয়া ধর্ম, এই বুঝি উৎখাত হতে হলো বহুকাল ধরে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা থেকে। এই কারণে তারা খুব দ্রুত জনগণের মনস্তাত্ত্বিক 'অপারেশন' করতে শুরু করে দেয়। এই তওহীদী দাওয়াত দাতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা করে জনমনে ঘৃণা ও বিদ্বেষ জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। তারা জনগণকে ভয় পাইয়ে দেয় এই বলে যে, আমি ক্ষমতায় আছি বলে তোমরা সুখে আছ। ওরা যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে তোমরা গোল্লায় যাবে, বাপ-দাদার ধর্ম নষ্ট হবে এবং তোমাদেরকে কঠিন দুর্দশার মধ্যে ফেলে দেবে। কাজেই ওদের কথা কখনই শুনবে না, ওদের দিকে ভ্রূক্ষেপই করবে না।
আসলে এ সব-ই হচ্ছে স্বৈর শাসকের মারাত্মক ধোঁকাবাজি। তখন জনগণকে ভুল বোঝানো ও প্রতারিত করা ছাড়া ওদের উপায়ও কিছু থাকে না। ফিরাউন এই ধোঁকাবাজির ধুম্রজাল সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই হযরত মূসা (আ)-কে লক্ষ্য করে বললঃ
اجِئْتَنَا لِتُخْرِجَنَا مِنْ أَرْضِنَا بِسِحْرِكَ يَمُوسى (طه: ٥٧)
হে মূসা! তুমি কি এ উদ্দেশ্যেই আমাদের কাছে এসেছ যে, তুমি তোমার যাদুবিদ্যার জোরে আমাদেরকে আমাদের দেশ-ঘর-বাড়ি-ক্ষমতা-প্রতিপত্তি থেকে বহিষ্কৃত ও উৎখাত করবে?
অপর আয়াতে কথাটি এইঃ
إِنْ هَذَانِ لَسْحَرَانِ يُرِيدَانِ أَنْ يُخْرِجُكُمْ مِنْ أَرْضِكُمْ بِسِحْرِهِمَا (طه: ٦৩)
আসলে এ দুজন (মূসা ও হারুন) মস্তবড় যাদুকর। ওরা দুজনই তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে উৎখাত করার মতলবে আছে।
স্বৈর শাসনের অধীন জনগণের যে চরম মাত্রার দুর্দশা ও দুরবস্থা হয়, তাকে স্বৈরতন্ত্রীরা খুবই উত্তম-উজ্জ্বল-সুন্দর প্রমাণ করতে প্রাণ-পণে চেষ্টা করে। তারা লোকদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে, আসলে তোমাদের বর্তমান জীবন-ধারা ও রীতি-ই অতীব উত্তম। কিন্তু ওরা তা খতম করে দিতে বদ্ধ পরিকর। ফিরাউন ও তার দল-বলের ভাষায় কথাটি এইঃ
إِنَّ هَذَانِ لَسْحِرَانِ يُرِيدَانِ أَنْ يُخْرِجُكُمْ مِنْ أَرْضِكُمْ بِسِحْرِهِمَا وَيَذْهَبَا بِطَرِيقَتِكُمُ المُثْلَى (طه: ٦৩)
এই দুই যাদুকর তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে উৎখাত করতে চায় তাদের যাদুবিদ্যার জোরে এবং তোমাদের সর্বোন্নত মানের আদর্শ জীবন-ধারা ও পদ্ধতিকে বিনষ্ট করতে বদ্ধপরিকর।
স্বৈর শাসকরা অনেক সময় নিজেদের নিরংকুশ কর্তৃত্বের সিংহাসনকে রক্ষা করার লক্ষ্যে শেষ অস্ত্র হিসেবে নিজেদের বড় ধার্মিক, আল্লাহ-ভীরু, রাসূল-প্রেমিক ও মানব দরদী রূপী মিথ্যামিথ্যি পেশ করতেও লজ্জা পায় না। অথচ তাদের আসল উদ্দেশ্য হয় নিজেদেরকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতাসীন রেখে দ্বীন-ধর্মকে সমূলে উৎপাটিত করা। আর যারা প্রকৃতই কোন কল্যাণকর বিধান নিয়ে মানুষের নিকট উপস্থিত হয়, তাদেরকেই স্বার্থপর অসদুদ্দেশ্যপরায়ণ এবং মানুষের জন্য বিপদজ্জনক রূপে চিহ্নিত করতে সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা চালায়। হযরত মূসা (আ) যখন ফিরাউনের নিকট এক আল্লাহর বন্দেগী কবুলের দাওয়াত দিলেন, তখনই ফিরাউন বলে উঠলঃ
ذَرُونِي اقْتُلْ مُوسَى وَلْيَدْعُ رَبَّهُ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُبْدِلَ دِينَكُمْ أَوَانٌ يُظْهِرَ فِي الْأَرْضِ الْفَسَادَ (المؤمن: ২৬)
আমাকে ছাড়ো তো। আমি এ মূসাকে হত্যা করে ফেলি! রক্ষা পাওয়ার জন্য সে তার আল্লাহকে ডাকুক না! (দেখা যাবে, সে কেমন করে আমার হাত থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে!) আমার আশঙ্কা হচ্ছে, এই লোকটি তোমাদের আবহমান কাল থেক অনুসৃত তোমাদের জীবন-বিধিকে বদলে দেবে অথবা দেশে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে।
স্বৈর শাসক যখন মনে করে, জনগণের মধ্যে ধর্মীয় ভাবধারা অত্যন্ত প্রবল, ধর্মের কথা শুনলে যখন বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়, তখন সে জনগণের সম্মুখে নিজেকে একজন বড় ধার্মিক, সত্য পথের পথিক ও সত্য পথ-প্রদর্শক রূপে পেশ করে। কুরআনে ফিরাউনের কথার উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছেঃ
مَا أُرِيكُمْ إِلَّا مَا أَرَى وَمَا أَهْدِيكُمْ إِلَّا سَبِيلَ الرَّشَادِ (المؤمن: (۲۹) ۱
আমি তো তোমাদেরকে তা-ই বলি, যা আমি সর্বোত্তম মনে করি। আর আমি নির্ভুল ও সত্য পথেরই সন্ধান দেই।
স্বৈরতান্ত্রিক-স্বেচ্ছাচারী শাসকরা স্বীয় ক্ষমতার 'ময়ূর সিংহাসন' অক্ষুণ্ণ ও স্থায়ী করে রাখার জন্য সুসংবদ্ধ ও সুবিন্যস্ত সমাজকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়ে থাকে। তার একটি ভাগে থাকে সমাজের সেসব লোক, যারা চূড়ান্ত পর্যায়ের বড় লোক, যারা 'Elite' বলে পরিচিত, যারা ধন-বল জন-বল ও বুদ্ধি-কৌশলের বলে সমাজের শীর্ষস্থানে আসীন হয়ে রয়েছে এবং সে সব কারণে চরম মাত্রার অহংকারী, দাম্ভিক! আর দ্বিতীয় ভাগে থাকে সেসব লোক, যারা দরিদ্র, দুর্বল, অক্ষম, অসহায়, মৌলিক মানবিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত, জীবন-ধারায় পশুর চাইতেও নিম্ন পর্যায়ে গণ্য। এজন্য সমাজকে নির্দিষ্টভাবে কেবল দুটি ভাগেই বিভক্ত করা হয় তা-ই নয়, প্রয়োজনবোধে ও অবস্থার অনুপাতে শত শত খণ্ডে বিভক্ত করতেও দ্বিধা বোধ করে না। তখন স্বৈরশাসক সেই অল্প সংখ্যক বড় লোকদের সহায়তা নিয়ে বিপুল সংখ্যক 'ছোট লোক'দের উপর স্বৈর শাসনের স্টীম রোলার চালাতে থাকে। ঐক্যবদ্ধতাকে খান খান করে দিয়ে জনতার মাথা তুলে দাঁড়াবার ক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে অবলুপ্ত করে দেয়। স্বৈর শাসকের এই নীতিকেই ইংরেজীতে বলা হয় Divide and Rule। আল্লাহ তা'আলা ফিরাউন সম্পর্কে ঠিক এ কথা-ই বলেছেনঃ
إِنَّ فِرْعَونَ عَلَا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيعًا (القصص: (٤)
ফিরাউন দেশে বিজয়ী ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসেছে এবং দেশের জনগণকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত করে দিয়েছে।
এইরূপ স্বৈর শাসক নিজেকে গোটা দেশের একচ্ছত্র মালিক ও মনিব বলে মনে করে। দেশের সব নৈসর্গিক ও মানবিক সম্পদের নিরংকুশ মালিকানা দাবি করে। ফিরাউনও তাই করেছিল। সে ঘোষণা দিয়েছিলঃ
يَقَوْمِ الْيَسَ لِي مُلْكُ مِصْرَ وَهَذِهِ الْأَنْهُرُ تَجْرِى مِنْ تَحْتِي أَفَلَا تُبْصِرُونَ (الزخرف: ٥١)
হে দেশের জনগণ! এই মিসর দেশের একচ্ছত্র মালিক কি আমি-ই নই? এই খাল-বিল-নদী-সমুদ্র কি আমার-ই নিরংকুশ কর্তৃত্বাধীন প্রবাহিত হচ্ছে না?... তোমরা কি দেখতে পাও না, লক্ষ্য করো না?
এভাবে স্বৈর শাসক যখন নিজেকে সকল প্রকার বিরুদ্ধতা-প্রতিরোধ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত মনে করতে শুরু করে, যখন দেখতে পায় প্রতিবাদী সমালোচক কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে গেছে, সকল মানুষ তারই অধীনতা স্বীকার করে তাকে পুরাপুরিভাবে মেনে নেয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত, তখন সে নিজেকে আইনদাতা-বিধানতাদারূপে ঘোষণা করে এবং জানিয়ে দেয় যে, কেবল তারই ঘোষিত নীতি ও তারই জারি করা আইন মানতে হবে। অন্যথায় কঠিন দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। তখন সে নিজ ইচ্ছা ও খাহেশে কোন জিনিসকে হালাল ঘোষণা করে আবার কোন জিনিসকে করে হারাম। অথচ আল্লাহর বিধানকে বাদ দিয়ে এরূপ করার কোন অধিকারই এ দুনিয়ার কারোরই থাকতে পারে না। আল্লাহ্ বলেছেনঃ
وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ الْسِنَتْكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلْلٌ وَهُذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ (النحل: ١١٦)
তোমাদের মুখে যেমন আসে মিথ্যামিথ্যি বলতে থেকো না যে, এটা হালাল আর এটা হারাম। কেননা তাতে মিথ্যামিথ্যি ভাবে স্বরচিত বিধানকে আল্লাহর নামে চালিয়ে দেয়ার অপরাধে তোমরা অপরাধী হয়ে পড়বে।
স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এতই মারাত্মক নেশার মত যে, যে-লোকই এরূপ শাসন চালাতে শুরু করবে, সে নিজেকে সারাটি দেশের একচ্ছত্র মালিক মুখতার ঘোষণা দিয়ে ও নিজ ইচ্ছামত আইন-বিধান রচনা করে জনগণের উপর জারি করেই ক্ষান্ত হয় না, শেষ পর্যন্ত সে নিজেকে জনগণের জীবন-মরণেরও একমাত্র কর্তা রূপে পেশ করে। অথচ কোটি কোটি বছরের ইতিহাস নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, মানুষ এই দুনিয়ায় ক্ষমতার অনেক দাপট দেখিয়েছে বটে; কিন্তু নিজেকে মানুষের জীবন-মরণের নিরংকুশ কর্তা প্রমাণ করা কখনই সম্ভব হয়নি। কোন মানুষ বা জীবকে জীবন দেয়াও সম্ভব হয়নি, কারোর মৃত্যুর চূড়ান্ত ফয়সালা করাও কারোর সাধ্যে কুলায়নি। (যদিও মানুষ জীবন ও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে)। জীবন ও মরণের মালিক হওয়ার এই স্বৈরতান্ত্রিক আহমিকতা দেখিয়েছে ফিরাউনের-ই মত-ফিরাউনেরও বহু পূর্বে আর একজন স্বৈর শাসক, যার নাম নমরূদ। কুরআন মজীদে তার সম্পর্কে এভাবে বলা হয়েছেঃ
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِي حَاجَّ إِبْرَاهِيمَ فِي رَبِّهِ أَنْ آتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ - إِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّي الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ - قَالَ أَنَا أُحْيِي وَأُمِيتُ (البقرة: ٢٥٨)
তুমি কি সেই ব্যক্তির অবস্থা চিন্তা করনি, যে ব্যক্তি ইবরাহীমের সাথে তর্ক করেছিল এই নিয়ে যে, তার রব্ব কে? এবং সে তর্ক করেছিল এই কারণে যে, আল্লাহই তাকে বাদশাহী দিয়েছিলেন। ইবরাহীম যখন বলল, আমার রব্ব তিনিই যিনি জীবন ও মৃত্যু দানকারী। সে তখন বললঃ আমিই তো জীবন দেই ও মৃত্যু ঘটাই।
বস্তুত এরূপ স্বৈরশাসন মানব জীবনে কত যে লাঞ্ছনা, দুঃখ, অশান্তি সৃষ্টির প্রত্যক্ষ কারণ হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। বিশ্বমানবের ইতিহাস এই পর্যায়ের দুঃখময় কাহিনীতে ভরপুর হয়ে রয়েছে। মানুষকে এত কঠিন আযাবের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে, যা সহ্য করার কোন সাধ্যই মানুষের হতে পারে না। 'গর্তকর্তারা' কিছু সংখ্যক আল্লাহ্ অনুগত মানুষকে যে কঠিন আযাব দিয়েছিল, তা প্রাচীনকালীন ইতিহাস পাঠক মাত্রেরই জানা থাকার কথা। কুরআন মজীদে তাদের এই কীর্তিকলাপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওরা ছিল অত্যাচারী স্বৈরতান্ত্রিক শাসক। ওরা জোর করে জনগণকে নিজেদের শিরকী বিশ্বাস গ্রহণে বাধ্য করতে চেয়েছিল, কিন্তু লোকেরা তা গ্রহণ করতে যখন প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করল, তখন, তাদের জন্য বড় বড় ও গভীর গর্ত খুদলো। তাতে প্রচণ্ড অগ্নিকুণ্ড জ্বালালো এবং সে সব লোককে তার মধ্যে জীবন্ত নিক্ষেপ করল। কেবল তাদেরকেই নয়, সেই সাথে তাদের স্ত্রী-পুত্র ও বাচ্চা-কাচ্চাদেরও তার মধ্যে ফেলে দিল। ইতিহাসে স্বৈরতন্ত্রীরা মানুষকে যত আযাব দিয়েছে বলে উল্লিখিত হয়েছে, এটা ছিল তার মধ্যে একটি নির্মমতম ঘটনা। এজন্য কুরআন মজীদ তার বিশেষ গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছে। বলেছেঃ
قُتِلَ أَصْحَابُ الْأَخْدُودِ - النَّارِ ذَاتِ الْوَقُودِ - إِذْ هُمْ عَلَيْهَا قُعُودٌ ، وَهُمْ عَلَى مَا يَفْعَلُونَ بِالْمُؤْمِنِينَ شُهُودٌ ، وَمَا نَقَمُوا مِنْهُمْ إِلَّا أَنْ يُؤْمِنُوا بِاللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ (البروج : ٤-٨)
ধ্বংস হয়েছে গর্তকর্তারা। (সেই গর্তকর্তারা) যারা জ্বালিয়েছিল দাউ-দাউ করে জ্বলা ইন্ধনের আগুন। -যখন তারা সেই গর্তের মুখে উপবিষ্ট ছিল। আর তারা ঈমানদার লোকদের সাথে যে ব্যবহারটা করছিল, তা তারা প্রত্যক্ষ করছিল। এই ঈমানদার লোকদের সাথে তাদের শত্রুতার একমাত্র কারণ এই ছিল যে, তারা প্রবল পরাক্রান্ত ও স্ব-প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল।
প্রথম কথাটিঃ ধ্বংস হয়েছে গর্তকর্তারা অর্থ, যারা গর্ত খুড়ে অগ্নিকুণ্ডলি বানিয়ে সেই দাউ-দাউ করা আগুনের মধ্যে ঈমানদার লোকদেরকে জীবন্ত নিক্ষেপ করেছিল, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে। তারা আল্লাহর আযাব পাওয়ার যোগ্য প্রমাণিত হয়েছে।
ঈমানদার লোকদেরকে জ্বলন্ত দাউ দাউ করা অগ্নি গহ্বরে নিক্ষেপ করার ঘটনা হাদীসেও উল্লিখিত হয়েছে। তাতে মনে হয়, দুনিয়ার ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনা বহুবার সংঘটিত হয়েছে। মওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী এই কাহিনীর উপর ঐতিহাসিক প্রামাণ্য ও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এ পর্যায়ের বহু কয়টি ঘটনার মধ্য থেকে একটি ঘটনার সংক্ষিপ্ত উল্লেখ এখানে করা যাচ্ছে। ইয়েমন শাসক যু-নাওয়াস দক্ষিণ আরবের নাজরান দখল করে ও তথাকার সাইয়্যেদ হারিসা সুরিয়ানী (Arethas)-কে হত্যা করে। তার স্ত্রী রুমা'র চোখের সামনেই তার দুই ক্যনাকে হত্যা করে তাদের রক্ত পান করতে তাকে বাধ্য করল। শেষ পর্যন্ত তাকেও হত্যা করল। বিশপ পলের অস্থি কবর থেকে বের করে ভস্ম করা হলো এবং আগুন ভর্তি গর্তসমূহে নারী-পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ, পাদ্রী, পূজারী সকলকেই নিক্ষেপ করল। নিহতের সংখ্যা মোট ২০ থেকে ৪০ হাজার দাঁড়িয়েছিল। ৫২৩ খৃস্টাব্দের অক্টোবর মাসে এই ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। ১
হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে গর্তকর্তাদের এই ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে যে, একজন বাদশাহ মদ খেয়ে বেহুঁশ হয়ে নিজ ঔরসজাত কন্যার উপর (অথবা আপন ভগ্নীর উপর) বলাৎ করে। পরে তার মনে প্রশ্ন জাগে যে, অতঃপর যে দুর্নাম হবে তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় কি? কন্যা (বা ভগ্নী) পরামর্শ দিল যে, জনগণের এক মহাসম্মেলন আহ্বান করে এ কথা ঘোষণা করে দেয়া হোক যে, আপন কন্যা (বা বোন) বিয়ে করা আমার মতে সম্পূর্ণ বৈধ এবং একথা মেনে নিতে সকলকে বাধ্য করতে হবে। বাদশাহ তাই করল। কিন্তু তার এই মত জনতার কেউ-ই গ্রহণ করতে রাযী হলো না। তখন সে গর্ত খুড়ে তার মধ্যে কাষ্ঠের স্তূপ করে আগুন ধরিয়ে দিল এবং তার মত গ্রহণ করতে রাযী নয়- এমন সমস্ত মানুষকে তাতে নিক্ষেপ করল। ২
এ সব বিবরণ থেক অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, স্বৈর শাসকরা পশুত্বের নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছতে ও তা সকলকে অকপটে মেনে নিতে বাধ্য করতেও লজ্জা বোধ করে না। সকল প্রকার হারাম কাজ সে স্বীয় খাহেশ পূরণের জন্য করে এবং তা করতে বা তা করা হারাম নয় বলে মেনে নিতে বাধ্য করতে সচেষ্ট হয়ে থাকে। আর কেউ যদি স্বীয় সঠিক ঈমানের কারণে তা মেনে নিতে প্রস্তুত না হয়, তাহলে তার উপর অত্যাচারের পাহাড় ভাঙ্গতেও কুণ্ঠিত হয় না। কুরআন মজীদ ফিরাউন ও অন্যান্য স্বৈর শাসকদের যেসব চরিত্র ও কার্যকলাপের উল্লেখ করেছে তা কেবল সেই বিশেষ ব্যক্তিদেরই নয়, সকল স্বৈর শাসকেরই এই চরিত্র ও কার্যকলাপ। এই স্বৈর শাসন পদ্ধতিই শাসকের মধ্যে এরূপ চরিত্র সৃষ্টি করে ও অনুরূপ কার্যকলাপ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এ স্বৈর শাসনের আসল পরিচিতি হচ্ছে নিরংকুশ কর্তৃত্বের রাজতন্ত্র বাদশাহী বা অস্ত্র বলে দখল করা ক্ষমতা। তা যেমন আল্লাহ্র বিধান মেনে চলে না, তেমনি কোনরূপ মানবিকতারও ধার ধারে না। এক ব্যক্তিই হয়ে থাকে কোটি কোটি মানুষের উপর নিরংকুশ কর্তৃত্বের একচ্ছত্র অধিকারী। কুরআনে বিশেষভাবে ফিরাউন ও নমরূদের কথা বলা হয়েছে এজন্য যে, এরা দু'জন হচ্ছে মানবেতিহাসে স্বৈরতন্ত্রী শাসকের জীবন্ত প্রতীক।
তবে স্বৈরতন্ত্রের বিপর্যয় পরিমাণ ও পরিস্থিতির (quantity and quality) দিক দিয়ে যথেষ্ট পার্থক্য হয়ে থাকে। এ পার্থক্য হয় ব্যক্তির যোগ্যতা ও মন-মানসিকতার মাত্রা-পার্থক্যের কারণে। এ দিক দিয়ে ব্যক্তি ব্যক্তিতে যে পার্থক্য হয়ে থাকে, তা তো সর্বজনস্বীকৃত।
কোন কোন স্বৈরতন্ত্রী জনগণের কতিপয় মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করে, আর কতিপয় দিক দিয়ে তা হরণ করে না, রক্ষা করে। আবার কোন কোন স্বৈরতন্ত্রী প্রত্যেকটি নাগরিকের সমস্ত অধিকারই হরণ করে নেয়, ব্যক্তির স্বাধীনতা বলতে কিছুই থাকতে দেয়া হয় না। এক্ষেত্রে সে সাধারণ সীমা পর্যন্ত লংঘন করে যায়। জনগণের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জন করা সমস্ত ধন-সম্পদও নিঃশেষ লুটেপুটে নিয়ে যায়। আর শেষ পর্যন্ত সে শুধু রাজ্য সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসতেই রাযী হয় না, সেই সাথে সারা দেশের কোটি কোটি মানুষের যাবতীয় ধন-সম্পদের-এমন কি সেই লোকদেরও নিরংকুশ মালিক হয়ে বসার অহমিকতা বোধ করতে থাকে। এরূপ অবস্থায় স্বৈরতন্ত্র কতটা প্রচণ্ড হতে পারে, তা অনুমান করলেও রোমাঞ্চিত হতে হয়। এই সময় এ ধরনের স্বৈরতন্ত্রী মানুষের আল্লাহ্ হয়ে বসে আর মানুষের উপ্ন চলে স্বৈচ্ছাচারিতাজনিত সীমাহীন বর্বরতা। সে মানুষের খোদা হয়ে সকলকে একমাত্র তারই দাসত্ব করতে বাধ্য করে।
এইরূপ একটি শাসন ব্যবস্থার সাথে ইসলামের যে দূরতম সম্পর্ক-ও থাকতে পারে না, তা ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন হয় না। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে নাজিবাদ, ফ্যাসীবাদ ও বিপ্লবী সমাজতন্ত্রবাদ প্রভৃতি শাসন ব্যবস্থার সাথে তার পুরাপুরি সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। বলা যায়, প্রাচীনকালীন নমরূদী ফিরাউনী শাসনের এগুলিই হচ্ছে অতি আধুনিক সংস্করণ। অন্য কথায়, এই সব কয়টি শাসন ব্যবস্থাই আল্লাহদ্রোহী শাসন ব্যবস্থা, আল্লাহ্ আল্লাহ্ত্বকে অস্বীকার করে জনগণের উপর নিজেকে আল্লাহ্ বানিয়ে বসার শাসন ব্যবস্থা।
এ প্রসঙ্গে কুরআনে উল্লিখিত কতিপয় বাদশাহী ব্যবস্থা সম্পর্কেও আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করছি। কেননা পূর্ববর্তী আলোচনা পাঠান্তে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, বাদশাহী ব্যবস্থা যদি ইসলাম পরিপন্থী স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাই হবে, তাহলে কুরআনের কোন কোন নবী ও অ-নবীকে বাদশাহ বানানো ও তাকে ইসলামী মনে করার কথা বলা হলো কেমন করে? .....তা কি ইসলাম সম্মত?
বস্তুত ইসরাইলীদের ইতিহাসে বহু বাদশাহের উল্লেখ পাওয়া যায় এবং সে বাদশাহী আল্লাহ্ দিয়েছেন বলে তিনি নিজেই তাঁর কালামে-কুরআনে দাবি করেছেন। এই বাদশাহীগুলি কি ধরনের এবং তা আল্লাহ্ দিয়েছেন কেমন করে?
এর জবাবে বলা যায়, আল্লাহ্ তা'আলার দেয়া রাজত্ব-বাদশাহী এ সব রাজত্ব-বাদশাহী থেকে চরিত্র-বৈশিষ্ট্য ও রীতি-নীতি সর্ব দিক দিয়েই সম্পূর্ণ ভিন্নতর। কেননা আল্লাহর দেয়া বাদশাহী হয় নবুয়্যাতের সাথে জড়িত, না হয় বিশেষ অবস্থায় আল্লাহ্র এক বিশেষ দান। তাতে ফিরাউনিয়ত হতে পারে না, গর্ব-অহংকার-অহমিকতা, আল্লাহদ্রোহিতা ও মানব জীবনে কোনরূপ বিপর্যয় সৃষ্টির কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। এ রাজতন্ত্র নয়, এ বাদশাহী প্রকৃতই বাদশাহী নয়, বরং তা হচ্ছে নবুয়্যাতের দায়িত্ব পালন এবং পরিভাষার দিক দিয়ে তা আল্লাহ্ মহান খিলাফত। তা সম্পূর্ণরূপে ও সর্বতোভাবে আল্লাহ্ বিধানের ভিত্তিতে চলে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা হযরত দাউদ (আ)-কে সম্বোধন করে বলেছেনঃ
يُدَاوُدُ إِنَّا جَعَلْنَكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمُ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلُّكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ - إِنَّ الَّذِينَ يُضِلُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ (ص: ٢٦)
হে দাউদ! আমরাই তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছি। অতএব তুমি লোকদের উপর শাসন চালাও-লোকদের পরস্পরের মধ্যে বিচার কার্য সম্পাদন কর পরম সত্য নীতি অবলম্বন ও ইনসাফ সহকারে। আর নিজের স্বেচ্ছাচারিতাকে অনুসরণ করো না। তা হলে তোমার এই স্বেচ্ছাচারিতাই তোমাকে আল্লাহ্ পথ থেকে ভ্রষ্ট করে দেবে।
এ আয়াত অনুযায়ী আল্লাহর দেয়া শাসন ক্ষমতা খিলাফত নামে অভিহিত। যাকে এই শাসন ক্ষমতা দেয়া হয়, সে আল্লাহ্র খলীফা।
এ খিলাফতী শাসন ব্যবস্থায় লোকদের উপর শাসনকার্য পরিচালিত হয় পরম সত্য নীতি আদর্শ-আল্লাহ্ দেয়া বিধান-অনুযায়ী।
এখানে বাদশাহর ব্যক্তিগত খামখেয়ালী, স্বেচ্ছাচারিতা ও খাহেশ অনুসরণের একবিন্দু অবকাশ থাকতে পারে না। যদি তা হয়, তাহলে সে বাদশাহী আল্লাহ্ সমর্থন হারিয়ে ফেলবে। তখনই তা হবে চরম স্বৈরতন্ত্র, যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।
হযরত মুহাম্মাদ (স)-ও মদীনায় প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন। তাঁকেও অনুরূপ নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ্ বলেছিলেনঃ
وَأَنِ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ (المائدة: ٤٩)
এবং শাসন কার্য পরিচালনা কর লোকদের মধ্যে আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী এবং লোকদের কামনা বাসনা কে অনুসরণ করো না।
এ শাসনকার্য মূলত কোন ব্যক্তির শাসন নয়, ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতাও চলে না তাতে। বরং তা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর বিধান-ভিত্তিক শাসন। অতএব এ শাসন কখনই স্বৈরতন্ত্রী হয় না।
বনি ইসরাইলীদের মধ্যে এরূপ বাদশাহী গড়ে তোলা হয়েছিল এবং তা-ও অনুরূপ শাসন ব্যবস্থা ছিল। ফলে তা কখনই স্বৈরতান্ত্রিক নয়। যেমন কুরআনে বলা হয়েছেঃ
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ بِقَوْمِ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَعَلَ فِيكُمْ أَنْبِيَاءَ وَجَعَلَكُمْ مُلُوكًا (المائدة: ٢٠)
মূসা যখন তার জনগণকে ডেকে বললঃ হে জনগণ! তোমরা স্মরণ কর তোমাদের প্রতি আল্লাহর দেয়া সেই নিয়ামতের কথা, যার ফলে তিনি তোমাদের নবী বানিয়েছেন এবং তোমাদেরকে বাদশাহ বানিয়েছেন।
এই বাদশাহগণ আসলে নবী-রাসূল। যেমন হযরত ইউসুফ, হযরত দাউদ, হযরত সুলায়মান (আ)- তাঁদের সম্পর্কেই কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ
أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَى مَا أَتَهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ - فَقَدْ أَتَيْنَا أَنَّ إِبْرَهِيمُ الْكِتَبُ وَالْحِكْمَةَ وَآتَيْنَهُمْ مُلْكًا عَظِيمًا (النساء: ٥٤)
আল্লাহ্ তাদেরকে তাঁর বিশেষ অনুগ্রহের ফলে যা কিছু দান করেছেন, তা দেখে এ লোকদের প্রতি তারা হিংসা পোষণ করে?..... বস্তুত আমরা তো ইবরাহীম ও তাঁর বংশধরদেরকে কিতাব ও হিকমাত দিয়েছি, আমরা তাদেরকে বিরাট রাজত্বও দিয়েছি। ১
হযরত ইউসুফ ও দাউদ (আ) যে হযরত ইবরাহীমের বংশধর ছিলেন, তা সর্বজনজ্ঞাত। আর তাঁরাই ছিলেন বনি ইসরাইলের শীর্ষস্থানীয় নবী-রাসূল।
এক পর্যায়ে বনি ইসরাইলের জন্য একজন বাদশাহ্ নিয়োগ করার দাবি জানানো হয় আল্লাহ্র নিকট এবং তিনি তা নিয়োগ করেন একজন অ-নবী ব্যক্তিকে। কুরআন মজীদেই বলা হয়েছেঃ
وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ اللهَ قَدْ بَعَثَ لَكُمْ طَالُوتَ مَلِكًا - قَالُوا أَنِّي يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةً مِّنَ الْمَالِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَةً بَسْطَةٌ فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ - وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ (البقرة: ٢٤٧)
তাদের নবী তাদেরকে ডেকে বললঃ বস্তুতই আল্লাহ তালূতকে তোমাদের জন্য বাদশাহ বানিয়ে পাঠিয়েছেন। লোকেরা বললঃ সে কি করে আমাদের বাদশাহ্ হতে পারে, তার তুলনায় আমরাই বরং বাদশাহীর বেশী অধিকারী। তাকে তো বিপুল ধন-মালও দেয়া হয়নি! নবী বললঃ নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তাকেই তোমাদের উপর বাদশাহ বাছাই করে নিয়োগ করেছেন এবং তাকে ইলম ও দেহের দিক দিয়ে বিপুলতা বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা তার বাদশাহী দান করেন। আল্লাহ্ তো বিপুল-বিশাল, সর্বজ্ঞ।
তালূত নবী ছিলেন না বটে; তবে তার সঙ্গে ছিলেন একজন নবী। আর সে ব্যক্তিও কোন সীমালংঘনকারী ব্যক্তি ছিল না। সে আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থাধীন লালন ও প্রশিক্ষণ লাভ করেছিল। শাসন ক্ষমতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা তার মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বর্তমান ছিল। উপরোদ্ধৃত আয়াতের শেষ ভাগে তা-ই বলা হয়েছে।
সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ এ আয়াতের তাফসীরে লিখেছেনঃ বনি-ইসরাইলের বাদশাহী প্রাপ্তিতে তাদের অগ্রাধিকার লাভের কথা বলে তাদের প্রকৃত মনোবৃত্তিই প্রকাশ করেছে। তাদের বক্তব্য ছিল, তাদের একজন বাদশাহ হবে, যার পতাকাতলে মিলিত হয়ে তারা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করবে। তারা তা বলেই দিয়েছে যে, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করতে ইচ্ছুক এবং প্রস্তুত। নবীর নিকট তারা একজন বাদশাহের দাবিও জানিয়েছিল। সেই অনুযায়ী নবী আল্লাহর পক্ষ ‘থেকে তাদের খবর দিলেন যে, আল্লাহ্ তালূতকে বাদশাহ রূপে নিযুক্ত করেছেন। কিন্তু তারা আল্লাহর এ বাছাই ও নিয়োগ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে। বলে, তালূত কি করে বাদশাহ হতে পারে; ওর তো ধন-মালের বিপুলতাই নেই, আমরাই বরং বাদশাহী পাওয়ার বেশী অধিকারী, বিশেষ করে বংশানুক্রমিকতার দৃষ্টিতে, উত্তরাধিকার নীতির ভিত্তিতে। ও তো বাদশাহদের বংশের সন্তান নয়। এ হচ্ছে বাদশাহ সংক্রান্ত ধারণার অনিবার্য পরিণতি। বনি ইসরাইলের বংশীয় গৌরব ও বিদ্বেষের কথা কে না জানে?
নবী তাদের এই দুই ভিত্তিক দাবিকে অগ্রাহ্য করলেন। তিনি বাদশাহ হওয়ার জন্য বিপুল ধন-মালের মালিক হওয়ার ভিত্তিকেও মানলেন না, মানলেন না বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের দোহাই। এ দুটিকে অস্বীকার করে বাদশাহীর জন্য প্রয়োজনীয় গুণকে ভিত্তিরূপে ঘোষণা করলেন। সে ভিত্তি হচ্ছে ইল্ম ও সুস্বাস্থ্য। এ দুটি দিক নিয়ে সে-ই বাদশাহ হওয়ার অধিক উপযুক্ত প্রমাণিত হয়েছে। আর সর্বোপরি স্বয়ং আল্লাহর বাছাই- মনোনয়ন নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। বললেনঃ
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةً فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ .
নিঃসন্দেহে আল্লাহই তাকে তোমাদের উপর মনোনীত করেছেন এবং তাকে ইলম ও স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে আধিক্য দিয়েছেন। ১
তালুতের বাদশাহ হওয়ার অকাট্য প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহর মনোনয়ন। কিন্তু আল্লাহ্ তাকে মনোনীত করলেন কেন? তার কারণ হচ্ছে, সে রাজা-বাদশাহর বংশধর বা বেশী ধন-মালের মালিক না হলেও সে ইলম ও সুস্বাস্থ্যের-দৈহিক ক্ষমতার দিক দিয়ে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। ইলম হচ্ছে মানুষের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব ও বৈশিষ্ট্য আর রাষ্ট্র পরিচালনা ও যুদ্ধ-জিহাদ চালাবার কঠিন অবিশ্রান্ত কষ্ট স্বীকারের জন্য স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা শুধু সাহায্যকারী-ই নয়, অপরিহার্য শর্ত।
প্রমাণিত হলো যে, তালুতের বাদশাহ হওয়ার অধিকার দ্বীন সম্পর্কিত ইলমের কারণে এবং দৈহিক শক্তি-সামর্থ্যের কারণে। বংশের দরুন নয়। ২
সেই সাথে এ কথাও বলা যায় যে, কুরআন যে রাজতন্ত্র বা বাদশাহীকে হারাম করেছে, তা হচ্ছে জনগণের উপর নিরংকুশ কর্তৃত্বসম্পন্ন রাজতন্ত্র বা বাদশাহী। নবী-রাসূলগণ যে বাদশাহী পেয়েছিলেন, তা সে রকমের নয়। তা নিছক জনগণের ব্যাপারাদির ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা আল্লাহ্ বিধান অনুযায়ী। এখানে নিরংকুশতার কোন অবকাশ নেই।
তা সত্ত্বেও তাঁদের ক্ষমতাসীনতাকে 'শাসক' ও মালিক বা বাদশাহ নামে অভিহিত করার কারণ কি? মনে হয় শাসন-প্রশাসনের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে পরিচিত ও প্রচলিত শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে, যেন কথা জনগণের বোধগম্য হয়। কেননা বিশ্ব ইতিহাসের যে যে অধ্যায়ের এই সব কাহিনী, তখন বলতে গেলে দুনিয়ার সর্বত্রই এই বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র ও বাদশাহী অথবা ক্ষমতা দখল ছাড়া অন্য কোন পদ্ধতি প্রচলিত ও জনগণের নিকট পরিচিত ছিল না। যদিও আল্লাহ্ তা'আলা নবী-রাসূলগণকে বা কোন অ-নবীকে প্রচলিত ধরনের রাজা বা বাদশাহ বানান নি, তার বিপরীত আল্লাহর বিধান অনুসরণ করে প্রশাসক হিসেবেই তাঁদের নিযুক্ত করেছিলেন। তা সত্ত্বেও তাদের জন্যও প্রচলিত পরিভাষাই ব্যবহার করা জরুরী হয়ে পড়েছিল, যদিও এ দু'ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে নীতি-আদর্শ ও আচার-আচরণের দিক দিয়ে আসমান-যমীনের পার্থক্য রয়েছে।
উপরন্তু আল্লাহ্ যে অল্প সংখ্যক নবীকে 'বাদশাহ' বা 'শাসক' নামে অভিহিত করেছেন, তাদের শাসন-প্রশাসন আমাদের এখানে আলোচ্য রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও স্বৈরতন্ত্র থেকে মৌলিকভাবেই ভিন্নতর। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীগণের মধ্য থেকে যে নেক বান্দাকে বাদশাহ বানিয়েছিলেন বলে কুরআনের আলোচ্য আয়াতসমূহে বলা হয়েছে, তা কখনও শক্তি প্রয়োগ, জবরদস্তি সহকারে ও গায়ের জোরে জনগণের মালিক-মুখতার হয়ে বসার নীতিতে অর্জিত হয়নি। অথচ দুনিয়ার প্রায় সব রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও নিরংকুশ শাসকর্তার মূলে এ জিনিসই ছিল প্রধান হাতিয়ার।
এ দুই ধরনের বাদশাহী ও শাসনকর্তার মধ্যকার পার্থক্য আরও দুটি দিক দিয়ে দেখানো যেতে পারেঃ
প্রথম, নবী-রাসূলগণ শাসক-প্রশাসক হলেও তাঁরা ছিলেন মা'সুম এবং মহান পবিত্র গুণের অধিকারী। দুনিয়ার অন্যান্য রাজা-বাদশাহ-স্বৈরতন্ত্রীরা সে রূপ ছিল না, হতেও পারে না।
দ্বিতীয়, নবী-রাসূলগণ যে রাজত্ব-বাদশাহী পেয়েছিলেন মূলত তা মহান আল্লাহর দান বিশেষ। তাঁরা তা কখনই ক্ষমতাবলে-শক্তি প্রয়োগে অর্জন করেন নি। শক্তি বলে বা প্রতারণা ইত্যাদির মাধ্যমে রাজত্ব লাভ তো আল্লাহদ্রোহী ব্যক্তিদের চিরন্তনী চরিত্র।
এ দুটি দিক বাদ দিয়ে যে রাজতন্ত্র ও বাদশাহী, তা-ই হচ্ছে স্বৈরতন্ত্র। তা অনিবার্যভাবে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টির কারণ ঘটাবে এবং এই শাসকরাই নমরূদ ফিরাউন হয়ে বসতে পারে। ইতিহাস তা-ই প্রমাণ করে।
কোন কোন নবী-রাসূলকে আল্লাহ্ তা'আলা 'মালিক'-বাদশাহ নামে অভিহিত করেছেন বটে; কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, সাধারণভাবে রাজা-বাদশাহরা অহংকারী, প্রতাপান্বিত ও স্বৈরতন্ত্রী হলেও কুরআন নাযিল হওয়ার সময় নবী-রাসূলগণকে 'বাদশাহ' ইত্যাদি বলার দরুণ তাঁদেরকে সে ধরনের রাজা-বাদশাহরূপে কেউ-ই মনে করতে পারেনি। কারো-ই মনে রাজা-বাদশাহদের সম্পর্কিত খারাপ ধারণা নবী-রাসূল সম্পর্কে জেগে উঠেনি আর আজও তা কখনই মনে হয় না।
আর এ কারনেই আল্লাহ্ তা'আলা তালুতকেও মালিক-বাদশাহ নামে অভিহিত করতে দ্বিধা করেন নি। উদাত্ত কণ্ঠে তিনি বলেছেনঃ
إِنَّ اللَّهَ قَدْ بَعَثَ لَكُمْ طَالُوتَ مَلِكًا (البقرة: २४৭)
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তালূতকে একজন বাদশাহ করেই তোমাদের জন্য পাঠিয়েছেন।
আর বনি ইসরাইলীদের প্রতি এই বলে অনুগ্রহ দেখিয়েছেন যে, আল্লাহ্ তাদের মধ্যে নবী বানিয়েছেন, রাজা-বাদশাহ বানিয়েছেন। আর এটা স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলারই একটি অতি বড় নিয়ামত বিশেষ। বলেছেনঃ
اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَعَلَ فِيكُمْ أَنْبِيَاءَ وَجَعَلَكُمْ مُلُوكًا (المائدة: ٢٠).
স্মরণ কর তোমাদের প্রতি আল্লাহ্ সেই নিয়ামতকে যে তিনি তোমাদের মধ্যে নবীও বানিয়েছেন, তোমাদেরকে রাজা-বাদশাহ্ও বানিয়েছেন।
ইবরাহীমী বংশধরদের কিতাব হিকমাত এবং বিরাট রাজ্য-রাজত্ব দেয়ার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। (আন্-নিসাঃ ৫৪) শেষ পর্যন্ত হযরত দাউদ (আ)-এর এ কথাটিরও উল্লেখ করেছেন যে, তিনি আল্লাহর নিকট রাজত্ব মালিকত্ব চেয়েছিলেন, যা তাঁর পর আর কারোর ভাগ্যে জুটবে না।
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِّنْ بَعْدِي (ص: ٣٥)
হে আমার পরওয়ারদিগার, আমাকে ক্ষমা কর এবং আমাকে এমন এক রাজত্ব দাও, যা আমার পরে আর কারোর জন্যই বাঞ্ছনীয় হবে না।
মোটকথা, আল্লাহ্র দেয়া ও আল্লাহর নিকট থেকে চেয়ে পাওয়া এসব রাজত্ব ছাড়া অন্যান্য সকল প্রকারের রাজত্ব বাদশাহী-যার পেছনে আল্লাহর অনুমতি বা সমর্থন নেই-ইসলামে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। বিশেষত উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রাজত্ব, মালিকত্ব ও বাদশাহী।
তার কারণ, এই ধরনের রাজত্ব বাদশাহীতে ব্যাপক বিপর্যয়, জনগণের হক্ বিনষ্ট, মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং সুবিচার-ন্যায়পরতা-নিরপেক্ষ ইনসাফ পদদলিত হওয়া একান্তই অপরিহার্য। মানুষের ইতিহাসের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতাই তার অকাট্য প্রমাণ।
প্রখ্যাত ইতিহাস-দার্শনিক আল্লামা ইবনে খালদূন তাঁর গ্রন্থের ভূমিকা অংশে লিখেছেনঃ
কোন জাতি বা কোন গোত্রের বিশেষ একটি পরিবারে বা ঘরে রাজত্ব যখন স্থিতি লাভ করে, সমস্ত বিজয়ী জাতির মধ্যে যখন তা এককভাবে দেশের ও রাজত্বের একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসে এবং অন্যান্য পরিবারগুলিকে পেছনে ফেলে দেয়, পরে রাজত্ব ক্রমাগতভাবে একই বংশের লোকদের মধ্যে হস্তান্তরিত হয়ে চলতে থাকে, তখন বাদশাহের বেশীর ভাগ রাজন্য ও পরিষদবর্গের পক্ষ থেকে বাদশাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ভাব জেগে উঠে। আর সরকার পরিচালন ক্ষমতা সে পরিবারের হাত থেকে কেড়ে নেয়া হয়। আর তার মূলে প্রায়ই এই কারণ হয় যে, বংশের কোন অযোগ্য কিংবা কম বয়সের বালক নিজের পিতার জীবদ্দশা থেকেই প্রিন্স বা পরবর্তী বাদশাহ নিযুক্ত হয়। কিংবা তার মৃত্যুর পর আপনজনের চেষ্টা-সহযোগিতার বলে রাজসিংহাসনে আরোহণ করে। যখন অনুভব করা যায় যে, রাজত্বের নতুন উত্তরাধিকারী স্বীয় অল্প বয়স্কতা বা অযোগ্যতার কারণে শাসনকার্য চালাতে অক্ষম, তখন তার অভিভাবক রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ধারণ করে-সে তার পিতার উজীর বা পরিষদ হোক বা গোত্রেরই কোন ব্যক্তি। দেশ শাসনের পূর্ণ কর্তৃত্ব নিজ হাতে নিয়ে রাজত্ব চালাতে থাকে। তখন অল্প বয়স্ক বাদশাহকে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারাদি থেকে অনেক দূরে রেখে সুখ-সম্ভোগ, বিলাস-ব্যসন ও আনন্দ স্ফূর্তির মধ্যে ডুবিয়া রেখে দেয়। রাষ্ট্রীয় ব্যাপারাদির প্রতি তাকে চোখ তুলে তাকাতেও দেয় না। ফলে দেশ ও রাষ্ট্রের একচ্ছত্র স্বাধীন মালিক সে-ই হয়ে যায়। অতঃপর বাদশাহী-সাম্রাজ্যকতার গন্ধ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তখন তার মনে এই খেয়াল জাগে যে, 'শাহান শাহী'র অর্থ শুধু এতটুকুই যে, কখনও কখনও সিংহাসনে আরোহণ করে লোকদের প্রতি উপহার উপঢৌকন, সম্মান-প্রদর্শন ও উপাধি বিতরণ করা ও স্ত্রীলোকদের নিয়ে ঘরের চার প্রাচীরের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করা মাত্র। আর দেশের শাসন-শৃঙ্খলা, তার সমস্যাবলীর সমাধান, তার আইন-কানুন জারী করা, রাষ্ট্রীয় ব্যাপারাদি দেখা-শুনা করা, দেশের সামরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা বা তার অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা, সীমান্তসমূহের ব্যবস্থাপনা-ইত্যাদি বাদশাহের মতে উজীর-নাজীর বা মন্ত্রীমণ্ডলের কাজ। এজন্য এ সব ব্যাপারই সে উজীরের উপর ন্যস্ত করে দেয়। এভাবেই বাদশাহ'র একটা স্বৈরতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে যায়। পরে তা তার পুত্র দৌহিত্রদের মধ্যে চলতে থাকে।........ দুনিয়ার বিভিন্ন বংশের রাজত্বের ইতিহাসে তা-ই দেখা যায়।.......
কখনও এমনও হয় যে, ক্ষমতাহীন বাদশাহ খাবে গাফলত থেকে জেগে উঠে নিজের অবস্থার যথার্থ পর্যালোচনা করে। আর চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়ে হারানো ক্ষমতা ও স্বাধীনতা পুনরায় করায়ত্ত করে নেয় এবং স্বাধীন ক্ষমতার মালিক হয়ে কর্তৃত্বশীলরা বিদ্রোহীদের মস্তক চূর্ণ করে দেয়। কখনও তরবারির দ্বারা তাদের হত্যা করে। আবার কখনও তাদেরকে তাদের দখল করা ক্ষমতা বা পদ থেকে বিচ্যুত করে....... ১
সারকথা হচ্ছে, নিরংকুশ রাজতান্ত্রিক বা বাদশাহী ও উত্তরাধিকার মূলক শাসন ব্যবস্থা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া আর কিছুই নয়。
টিকাঃ
১. তাফহীমুল কোরআন, সূরা আল-বুরুজ।
২. তাফসীর মাজমাউল বায়ান, দূররে মনসুর।
১. এই এ বা রাজত্ব বলতে বস্তুগত ও আদর্শগত উভয় পর্যায়ের ব্যাপারাদির উপর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বোঝায়। তাতে নবুয়্যাত, নেতৃত্ব ও ধন-সম্পদ-সব কিছুর মালিকত্ব সামিল রয়েছে। এর পূর্ববর্তী আয়াতের দৃষ্টিতে এর অর্থ তা-ই বোঝা যায়।
২. تفسير الميزان للعلامة الطباطبائی ج: ٤، ص: ٢٧٥
১. في ظلال القرآن ج ۲، ص: ۲۲۸
২. الجامع لاحكام القرآن ج ۲، ص: ٢٤٦
১. মুকাদ্দমাঃ ইবনে খালদুন
কুরআন মজীদে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন পর্যায়ে ফিরাউনী শাসনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন ফিরাউনকে একজন গর্বিত, অহংকারী 'মাথা উঁচুকারী' 'সীমালংঘনকারী', 'বাড়াবাড়িকারী' শাসকরূপে চিহ্নিত করেছেন। বলেছে, সে নিজেকে অন্যান্য সকল মানুষের তুলনায় শ্রেষ্ঠ, উন্নত ও উত্তম বলে দাবি করছে। সকলের ইচ্ছার উপর তার ইচ্ছা বিজয়ী, প্রধান ও প্রভাবশালী বলে ঘোষণা করছে। বলা হয়েছেঃ
ثُمَّ بَعَثْنَا مِنْ بَعْدِهِمْ مُوسَى وَهُرُونَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَائِهِ بِأَيْتِنَا فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا مُجْرِمِينَ (يونس : ٧٥)
অতঃপর আমরা তাদের পরে মূসা ও হারুনকে আমাদের আয়াতসমূহ সহকারে ফিরাউন ও তার দলীয় সরদার মাতব্বরদের নিকট পাঠিয়ে ছিলাম। কিন্তু তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভ প্রকাশ করল। আসলে তারা ছিল-ই অপরাধী লোক।
فَمَا آمَنَ لِمُوسَىٰ إِلَّا ذُرِّيَّةٌ مِنْ قَوْمِهِ عَلَى خَوْفٍ مِنْ فِرْ عَوْنَ وَمَلَائِهِمْ أَنْ يَفْتِنَهُمْ . وَإِنَّ فِرْعَوْنَ لَعَالٍ فِي الْأَرْضِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الْمُسْرِفِينَ (يونس: ۸۳)
তারপর অবস্থা এই হলো যে, ফিরাউনের বিপুল লোকজনের মধ্য থেকে মাত্র কতিপয় যুবক ছাড়া মূসার প্রতি আর কেউ-ই ঈমান আনল না। তার কারণই ছিল ফিরাউন ও স্বয়ং নিজ জাতির কর্তৃত্বশালী লোকদের ভয়। ভয় ছিল এই যে, ফিরাউন তাদেরকে আযাবে নিমজ্জিত করবে। আর ফিরাউন তো দুনিয়ায় শক্তিমান ও সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশালীরূপে প্রতিষ্ঠিত ছিল। আর সে ছিল সকল সীমালংঘনকারী লোকদের একজন।
ثُمَّ أَرْسَلْنَا مُوسَى وَأَخَاهُ هُرُونَ بَابْتِنَا وَسُلْطَنٍ مُّبِينٍ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَاتِهِ فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا عَالِينَ (المؤمنون: ٤٥-٤٦)
অতঃপর আমরা মূসা ও তার ভাই হারুনকে আমাদের নির্দশনাদি ও সুস্পষ্ট দলীল সহকারে ফিরাউন ও তার দল-বলের নিকট পাঠিয়েছিলাম। তখন তারা অহংকার-গর্ব প্রকাশ করল। আর আসলে তারা নিজদিগকে সর্বোচ্চ স্থানীয় মনে করত।
وَلَقَدْ نَجَيْنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنَ الْعَذَابِ الْمُهِينِ مِنْ فِرْعَوْنَ إِنَّهُ كَانَ عَالِيًّا مِنَ المسرفين (الدخان ٣٠ - ٣١)
আমরা বনি ইসরাইলদের অত্যন্ত অপমানকর আযাব থেকে নিশ্চিতভাবেই মুক্তি দিয়েছিলাম। সে আযাব দিচ্ছিল ফিরাউন। আর সে ছিল সীমা- লংঘনকারী উচ্চাভিমানী ব্যক্তি।
ফিরাউন সম্পর্কে পর পর উদ্ধৃত এ চারটি আয়াতে ফিরাউনের একটি চিত্র স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে-ফিরাউন ছিল বড় অহংকারী। নিজেকে ও নিজেদের দলবলকে সে সর্বোচ্চ স্থানীয় ও অন্যান্য সকল মানুষের উপর প্রবল পরাক্রান্ত ও সর্বাধিক প্রভাব ও কর্তৃত্বসম্পন্ন জ্ঞান করত। ফলে সে তার শাসনাধীন-বিশেষ করে অসহায় বনি ইসরাইলীদের কঠিন অপমানকর আযাবের মধ্যে নিমজ্জিত করে দিয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা তাদের মুক্তিদানের উদ্দেশ্যেই হযরত মূসা ও তাঁর ভাই হারুন (আ)-কে ফিরাউন ও তার দলবলের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু তারা এতই অহংকারী-গৌরবী ছিল যে, তারা হযরত মূসা ও হারুনের দাওয়াত মেনে নিতে রাযী হয়নি। মানবেই বা কি করে; তারা তো নিজেদেরকে অন্যসব মানুষ থেকে স্বতন্ত্র ও উচ্চ স্থানীয় মনে করে। তারা যেমন অপর কারোর কোন যুক্তিসঙ্গত কথা মেনে নিতে রাযী হতে পারে না, তেমনি তারা অন্যান্য সাধারণ মানুষের উপর নির্মম অত্যাচার চালাতে অবশ্যই উদ্যোগী হবে। তাদের অপমানকর আযবে মানুষ হবে অকথ্যভাবে নিপীড়িত, সারাদেশে ব্যাপক বিপর্যয় দেখা দেয়া এরূপ অবস্থায় নিতান্তই অপরিহার্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। ফিরাউনের মনোভাব ছিল নিঃসন্দেহে স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব, ওরূপ মনোভাবেরই ফসল হচ্ছে জনগণের উপর স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রবর্তন। যেখানেই শাসকদের মধ্যে ওরূপ মনোভাবের জন্ম হয়েছে, সেখানেই স্বৈরতান্ত্রিক শাসন অনিবার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। কুরআন মর্জীদে এ পর্যায়ে আরও বলা হয়েছেঃ
وَجَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودُهُ بَغْيًا وَعَدْوا - حَتَّى إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ - قَالَ آمَنْتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنْتُ بِهِ بَنُوا إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ * آلْآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ (يونس : ৯০-৯১)
বনি ইসরাইলদের আমরা সমুদ্র অতিক্রম করালাম। তখন ফিরাউন তার সৈন্যবাহিনী তাদের অনুসরণে সমুদ্রে নেমে পড়ল। তারা বাড়াবাড়ি ও জুলুমের উদ্দেশ্যেই তা করেছিল। শেষ পর্যন্ত ফিরাউন যখন ডুবে যেতে লাগল, তখন বললঃ আমি বিশ্বাস করি যে, বনি ইসরাইলীরা যে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে সে ব্যতীত ইলাহ্ আর কেউ নেই। আমি অনুগত লোকদের একজন। তখন বলা হলোঃ তুমি এখন ঈমান আনছো, অথচ এর পূর্ব পর্যন্ত তুমি আল্লাহ্ নাফরমানী করছিলে, আর তুমি ছিলে একজন বিপর্যয়কারী ব্যক্তি।
ফিরাউন তো মিসরের লোকদের দাসানুদাস বানিয়ে রেখেছিল। সে ছিল বড় অহংকারী। জনগণের মৌলিক মানবিক অধিকারটুকু পর্যন্ত হরণ করে নিয়েছিল। তার উপর দিয়ে যেমন কারোর কথা চলতো না, তেমনি তার উপর কথা বলার সাহসও কারোর ছিল না।
ফিরাউন হযরত মূসা ও হারুনের তওহীদী দাওয়াত কবুল করেনি, বনি ইসরাইলীদের মুক্তিদানের দাবিও মেনে নিতে রাযী হয়নি। তার কারণ কি? কুরআনে বলা হয়েছেঃ
فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا عَالِينَ - فَقَالُوا أَنُؤْمِنُ لِبَشَرَيْنِ مِثْلَنَا وَقَوْمَهُمَا لَنَا عِيدُونَ (المؤمنون: (٤٧-٤٦)
ওরা অহংকার দেখাল। ওরা ছিলই উচ্চতর স্থান দখলকারী লোক। ওরা বলেছিলঃ আমরা কি আমাদেরই মত দুইজন লোকের কথা মেনে নেব, অথচ ওদের লোকেরাই আমাদের অধীন দাসানুদাস?
হযরত মূসা ও হারুন (আ) নিজেদেরকে আল্লাহর রাসূল রূপেই ফিরাউনের নিকট পেশ করেছিলেন এবং একদিকে ফিরাউনকে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত দিয়েছিলেন আর অপর দিকে বনি ইসরাইলীদের মুক্তি দানের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সে এর কোন একটি কথাও মেনে নেয়নি।
না মানার কারণ হিসেবে উদ্ধৃত আয়াতটিতে তিনটি কথা বলা হয়েছে। একটিঃ ফিরাউন ও তার সঙ্গী-সাথীরা নিজেদেরকে সর্বোচ্চ স্থানীয় মনে করার অহংকারে লিপ্ত ছিল। দ্বিতীয়, তারা তাদেরই মত মানুষ মূসা ও হারুনকে আল্লাহ প্রেরিত বিশ্বাস করতে রাযী হতে পারেনি। আর তৃতীয় হচ্ছে, তারা বনি ইসরাইলীদের- যারা মূসা ও হারুনের বংশের লোক ছিল-দাসানুদাস বানিয়ে রেখেছিল। বনি ইসরাইলীদের দাসানুদাস বানিয়ে রাখার উপরই হযরত মূসা ও হারুন আপত্তি জানিয়েছিলেন ও তার তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। জবাবে ফিরাউন বলেছিলঃ
الَمْ نَرَبِّكَ فِينَا وَلِيْدًا وَلَبِثْتَ فِينَا مِنْ عُمُرِكَ سِنِينَ - (الشعراء: ١٨)
আমরা কি তোমাকে বাচ্চা বয়সে লালন-পালন করিনি? এবং তুমি কি আমাদের মধ্যে তোমার বয়সের কতিপয় বছর-কাল অবস্থান কর নি?
এ কথার জবাবে হযরত মূসা (আ) বলেছিলেনঃ
وَتِلْكَ نِعْمَةٌ تَمَنَّهَا عَلَى أَنْ عَبَدَتْ بَنِي إِسْرَائِيلَ (الشعراء: ٢٢)
হ্যাঁ, এটা তো একটা নিয়ামত ছিল। আর তুমি আমার উপর সেই অনুগ্রহের দোহাই দিচ্ছ এবং এটাকে কারণ বানিয়ে তুমি বনি ইসরাইলদের দাসানুদাস বানিয়ে রেখেছ।
অর্থাৎ মূসার বাল্যকালে ফিরাউনের ঘরে লালিত-পালিত হওয়া ও তাদের মধ্যে তাঁর বয়সের কয়েকটি বছর অবস্থান করার ব্যাপারটি ছিল আল্লাহর একটি নিয়ামত- একটি বিশেষ ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থা দেখিয়ে মূসার প্রতি ফিরাউনের অনুগ্রহ প্রদর্শন যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। আর এই কারণ দেখিয়ে বনি ইসরাইলীদের দাসানুদাস বানিয় রাখারও কোন যুক্তি থাকতে পারে না।
অর্থাৎ স্বৈর শাসক তার স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পক্ষে ব্যক্তিগত অনুগ্রহ বর্ষণকে দাঁড় করাতে চেষ্টা করে। কিন্তু যুক্তির কষ্টিপাথরে তা কিছুতেই উত্তীর্ণ হতে বা যুক্তিসঙ্গত বলে প্রমাণিত হতে পারে না। আসলেই ফিরাউন ছিল চরম অহংকারী, উচ্ছৃঙ্খল, সীমালংঘনকারী ও স্বৈরতান্ত্রিক। সে কারোর উপদেশ-নসীহত শুনতে প্রস্তুত হয় না, কারোর একবিন্দু বিরূপ সমালোচনা বরদাস্ত করতে রাযী হতে পারে না। তখন তার নিকৃষ্টতম কার্যাবলীকে সে সুন্দর ও কল্যাণময় কাজ হিসেবে জনগণের সম্মুখে পেশ করে ও সেই সব কাজের দোহাই দিয়ে স্বীয় স্বৈর শাসনের যৌক্তিকতা ও বৈধতা প্রমাণ করার জন্য নিষ্ফল চেষ্টা করে।
কুরআনের এ আয়াতদ্বয়ে সেই কথাই বলা হয়েছেঃ
وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَهَا مَنُ بْنِ لِي صَرْحًا لَعَلَى ابْلُغُ الْأَسْبَابَ - أَسْبَابَ السَّمَوتِ فَاطَّلِعَ إلى الهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا وَكَذَلِكَ زُيِّنَ لِفِرْعَوْنَ سُوءُ عَمَلِهِ وَصُدَّ عَنِ السَّبِيلِ ، وَمَا كَيْدُ فِرْعَوْنَ إِلَّا فِي تَبَابِ (المؤمن: ٣٦-٣٧)
ফিরাউন বললঃ হে হামান, আমার জন্য একটি উচ্চ ইমারত নির্মাণ কর, যেন আমি ঊর্ধ্বলোকের পথসমূহ পর্যন্ত পৌঁছতে পারি-আকাশমণ্ডলের পথসমূহ এবং মূসার খোদাকে চোখ দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারি। এই মূসা তো আমার কাজে মিথ্যাবাদী মনে হয়-এভাবে ফিরাউনের জন্য তার বদ আমল চাকচিক্যময় বানিয়ে দেয়া হলো এবং তাকে সঠিক পথ থেকে বিরত রাখা হলো। ফিরাউনের সমস্ত চালবাজি তার নিজের ধ্বংসেই ব্যবহৃত হলো।
বস্তুত স্বৈরতন্ত্রী শাসক নিজের মতকেই চূড়ান্ত মনে করে। তার বিশ্বাস-জনগণেরও উচিত তার মতকেই চূড়ান্ত বলে মেনে নেয়া। সে যা চিন্তা করে, তার যৌক্তিকতা সকলেরই মাথা পেতে নেয়া কর্তব্য। সে মত ও চিন্তা বাস্তবিকই যুক্তিভিত্তিক ও সুবিবেচনাপ্রসূত কিনা, তা জনগণের বিচার্য বিষয় নয়। স্বৈর শাসক যখন 'বলে দিয়েছে, তখন আর সে বিষয়ে জনগণের কিছু বলবার বা ভাববার কি থাকতে পারে। স্বৈর শাসকের কথাই হবে আইন, জনগণ তা অকুণ্ঠিত মনে ও নির্বাক চিত্তে মেনে নেবে, এ-ই তো হওয়া উচিত! তার মত ও ইচ্ছা-বাসনার নিকট সকলেরই আত্মসমর্পণ করা কর্তব্য। হযরত মূসা (আ) লোকদের সম্বোধন করে ফিরাউনের স্বৈর শাসনের প্রেক্ষিতে বলেছিলেনঃ
يَقَوْمِ لَكُمُ المُلكُ الْيَوْمَ ظَهِرِينَ فِي الْأَرْضِ - فَمَنْ يَنْصُرُنَا مِنْ بَأْسِ اللَّهِ إِنْ جَاءَنَا (المؤمن : ۲۹)
হে আমার জনগণ! আজ তোমরাই বাদশাহী ও কর্তৃত্বের অধিকারী, পৃথিবীতে তোমরাই বিজয়ী-প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আল্লাহর আযাব যদি এসেই পড়ে, তাহলে তখন কে আমাদের সাহায্য করবে (তা ভেবে দেখছ কি)?
অর্থাৎ তোমাদের এই স্বৈর শাসন ও বিজয়ীরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়া আল্লাহ্ আযাব আসার কারণ। সে আযাব যদি এসে-ই পড়ে, তাহলে তা ঠেকানো এবং জনগণকে সে আযাব থেকে রক্ষা করা এই স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পক্ষে আদৌ সম্ভব হবে না।
ফিরাউন হযরত মূসার একথা শুনে জবাবে বললঃ
مَا أُرِيكُمْ إِلَّا مَا أَرَى وَمَا أَهْدِيكُمْ إِلَّا سَبِيلَ الرَّشَادِ (المؤمن: (۲۹)
আমি তো তোমাদেরকে সেই মত-ই দেব, যা আমার দৃষ্টিতে সমীচীন। আর আমি সেই পথই তোমাদেরকে দেখাব, যা (আমার দৃষ্টিতে) সত্য ও সঠিক।
অর্থাৎ স্বৈর শাসকের মত জনগণের মত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর এবং সে মতকেই সকলের উপর চাপিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। সে যে পথকেই সত্য ও সঠিক মনে করবে, তাকে অন্যরা সত্য ও সঠিক মনে না করলেও- তা আল্লাহ এবং রাসূলের দেখানো পথের বিপরীত হলেও সেই পথে সকলকে চলতে বাধ্য করাই নীতি। ফলে স্বৈর শাসক গোটা সমাজের বিপুল জনতাকে দুর্বল পেয়ে তাদের অপমান করতে একবিন্দু কুণ্ঠিত হয় না। যেমন ফিরাউন মিসরের জনগণকে অপমানিত করেছিল বলে কুরআন বলেছেঃ
فَاسْتَخَفَّ قَوْمَهُ فَأَطَاعُوهُ - إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَسِقِينَ (الزخرف: ٥٤)
ফিরাউন তার অধীন বসবাসকারী জনগণকে নির্বোধ বানিয়ে তাদেরকে গুমরাহীর দিকে পরিচালিত করেছিল। আর সেই জনগণও তাকে মেনে নিয়েছিল। মেনে নিয়েছিল এজন্যে যে, তারা নিজেরাই ছিল আল্লাহ্ সীমালংঘনকারী লোক।
স্বৈর শাসনে শাসিত জনতা বাস্তবিকই নির্বোধ হয়ে যায়। তারা স্বাধীন বিমুক্ত চিন্তা-বিবেচনা শক্তিও হারিয়ে ফেলে। স্বৈর শাসনের অধীন স্বাধীন চিন্তার অবকাশ থাকে না বলেই এরূপ হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। তখন স্বৈরতন্ত্রী শাসন জনগণকে নিজের দাসানুদাসে পরিণত করে নেয়। তখন সে চায়, জনগণ অন্ধের মত তার অনুসরণ করুক, নিজেদের স্বাধীন চিন্তা-বিবেচনা তুলে রেখে নিতান্ত অক্ষমের ন্যায় তাকে মেনে চলুক। তার কার্যকলাপে কেউ ‘টু’ শব্দটি না করুক।
অন্য কথায়, স্বৈরতন্ত্রী শাসক চায়, মানুষ আল্লাহ্র প্রতি ঈমান এনে যেমন তাঁর দাসত্ব করা ও তাঁর আদেশ নিষেধ মেনে চলা স্বীয় কর্তব্য বলে মনে করে, ঠিক সেই রকমই তার দাসত্ব করুক, তার কথা অকপটে মেনে নিক। স্বৈর শাসক কখনই পছন্দ বা বরদাশত করতে পারে না যে, মানুষ তার অধীন থেকে অন্য কারোর-এমন কি আল্লাহর-দাসত্ব করুক, আল্লাহর বিধান পালন করুক। তার পথে সে প্রবল প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতেও কুণ্ঠিত হয় না। যদি কেউ সব বাধা অতিক্রম করে এক আল্লাহর দাসত্ব করে, তাহলে তখন সে তাদেরকে অমানুষিক অত্যাচারে জর্জরিত করে। তাকে কারাগারে বন্ধী করে। তথায় যত রকমে পীড়ন দেয়া সম্ভব তাই দিয়ে তার উপর নিপীড়ন চালায়। কুরআন মজীদ ফিরাউনের এ ধরনের কার্যকলাপের বিবরণ উপস্থাপিত করেছে। একটি আয়াতঃ
وَقَالَ فِرْعَوْنُ يٰۤاَيُّهَا الْمَلَاُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرِىْ (القصص: ۳۸)
ফিরাউন বললঃ হে জনগণ! আমি ছাড়া তোমাদের আর কেউ ইলাহ্ আছে বলে আমি জানি-ই না।
এভাবে স্বৈরতন্ত্রী শাসক শেষ পর্যন্ত নিজেকেই জনগণের সর্বময় কর্তা ও সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী শাসক রূপে জনগণকে মেনে নেয়ার আহবান জানায়। যেমন ফিরাউন জানিয়েছিলঃ
فَحَشَرَ فَنَادٰى ۙ فَقَالَ اَنَا رَبُّكُمُ الْاَعْلٰى (النزعت: ٢٣-٢٤)
ফিরাউন জনগণকে একত্রিত করে ভাষণ দিল। বললঃ আমি-ই হচ্ছি তোমাদের সর্বোচ্চ রব্ব।
সে আল্লাহ্র রাসূল হযরত মূসা (আ)-কে পর্যন্ত ধমক দিল। বললঃ
لَئِنِ اتَّخَذْتَ اِلٰهًا غَيْرِيْ لَاَجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُونِيْنَ (الشعراء: ٢٩)
হে মূসা! তুমি যদি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ‘ইলাহ’ রূপে গ্রহণ কর, তাহলে আমি তোমাকে গ্রেফতার করে কারাগারে বন্দী করে দেব।
এই স্বৈরাচারীর ক্রোধের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায় যখন সে দেখতে পায় যে, তার-ই অধীন, তারই শাসিত দুর্বল-অক্ষম-দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরা তার পরিবর্তে অন্য কাউকে 'ইলাহ' বা 'রব্ব' মেনে নিয়েছে এবং তাঁরই সমীপে নিজেকে সমর্পিত করে দিয়েছে এবং তাঁরই আনুগত্য করে সম্পূর্ণ ভিন্নতর জীবন ধারা গ্রহণ করে চলেছে। তখন সে সর্বশক্তি নিয়োগ করে তার উপর নির্যাতন-নিষ্পেষণের স্টীম রোলার চালাতে শুরু করে। এ সময় স্বৈর শাসকের মুখ থেকে তার যে মনোভাব প্রকাশিত হয়, কুরআনের ভাষায় তা-ই ছিল ফিরাউনের কথা। সে বলেছিলঃ
امَنْتُمْ لَهُ قَبْلَ أَنْ أَذَنَ لَكُمْ إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلَّمَكُمُ السِّحْرَ فَلَسَوفَ تَعْلَمُونَ لا قطعَنَّ أَيْدِيكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ مِّنْ خِلَافٍ وَلَا صَلِّبَنَّكُمْ أَجْمَعِينَ (الشعراء: ٤٩)
তোমরা মূসার কথা মেনে নিলে আমার অনুমতি দেয়ার আগেই? নিশ্চয়ই সে তোমাদের মধ্যে সেই বড় ব্যক্তি, যে তোমাদেরকে যাদুবিদ্যা শিখিয়েছে। (এর পরিণাম কত ভয়াবহ হতে পারে, তা) তোমরা শিগগীরই জানতে পারবে। আমি (তোমাদের এই অপরাধের শাস্তি স্বরূপ) তোমাদেরকে হাত ও পা বিপরীত দিক দিয়ে কেটে ফেলব এবং তোমাদের সকলকে শূলবিদ্ধ করব।
امَنْتُمْ لَهُ قَبْلَ أَنْ اذَنَ لَكُمْ إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلْمَكُمُ السِّحْرَ - فَلَا قَطِعَنَّ أَيْدِيكُمْ وَارْجُلَكُمْ مِنْ خِلَافٍ وَلَا وَصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ - وَلَتَعْلَمُنَّ أَيُّنَا أَشَدُّ عَذَابًا وابقى (طه: ৭১)
তোমরা তার (মুসা'র) প্রতি ঈমান আনলে আমার অনুমতি দেয়ার আগেই? বোঝা গেল, সেই তোমাদের সেই বড় ব্যক্তিটি, যে তোমাদেরকে যাদুবিদ্যা শিখিয়েছে।....ঠিক আছে, এখন আমি তোমাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং খেজুর গাছের উপর তোমাদেরকে শূলে বসাব, তাহলেই তোমরা বুঝতে পারবে, আমাদের দু'জনার মধ্যে আযাব দেয়ার দিক দিয়ে কে অধিক কঠোর ও নির্মম এবং কে অধিক টিকে থাকতে সক্ষম।
স্বৈর শাসক জনগণকে উপদেশ ও সমঝ-বুঝ দিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ে আসার সামাজিক পদ্ধতি অবলম্বনের ধার ধারে না, তার প্রয়োজনও মনে করে না। সে কারোর সাথে মত বিনিময় বা একজনের মতের মূলে নিহিত যুক্তিধারা বুঝতেও প্রস্তুত নয়। হযরত মূসা ও হারুন (আ)-এর তওহীদী দাওয়াতের মর্ম বুঝতে না পেরে তারা নিজেরা যেমন ক্ষমতালোভী, তাঁদেরকেও তেমনি মনে করে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল এই বলেঃ
أَجِئْتَنَا لِتَلْفِتَنَا عَمَّا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا وَتَكُونَ لَكُمَا الْكِبْرِيَاءُ فِي الْأَرْضِ - وَمَا نَحْنُ لَكُمَا بِمُؤْمِنِينَ (يونس: ۷৮)
তোমরা কি আমার নিকট এ উদ্দেশ্যেই এসেছ যে, আমরা যে আমাদের পূর্বপুরুষ থেকে চলে আসা ধর্মমত ও কাজকর্ম অনুসরণ করে চলেছি তা থেকে তোমরা আমাদেরকে ভিন্ন দিকে ফিরিয়ে নেবে? আর দেশে সকল প্রকার শ্রেষ্ঠত্ব-প্রাধান্য-কর্তৃত্ব কেবল তোমাদের দু'জনারই প্রতিষ্ঠিত হবে?.....না, আমরা তোমাদের প্রতি বিশ্বাসী হতে পারছি না।
নবী-রাসূলগণের তওহীদী দাওয়াতের মুকাবিলা করার জন্য বাতিলপন্থী ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাসীন লোকেরা চিরদিনই এই ধরনের কথা বলেছে। ফিরাউন ও তার রাজন্যবর্গ যেমন মূসা ও হারুন (আ)-কে বলেছিল। তাদের এই কথা থেকে তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। তওহীদের বিপ্লবী দাওয়াৎ শোনামাত্র এই শ্রেণীর লোকদের মনে ভয় জেগে উঠে যে, আসলে ওরা আমাদের চলমান জীবনধারা, চরিত্র, নৈতিকতা, সামাজিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চায়। তার কারণ এই যে, ওরা হয় তওহীদী দাওয়াতের মর্ম বুঝতে পারে না অথবা তা বুঝতেই চায় না কিংবা ওরা শক্তি ও ক্ষমতার নেশায় এতই বুঁদ হয়ে থাকে যে, সামান্য ব্যতিক্রমধর্মী কথা শুনলেই ওদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। ভাবে, এই বুঝি গেল আমাদের বাপ-দাদার নিকট থেকে পাওয়া ধর্ম, এই বুঝি উৎখাত হতে হলো বহুকাল ধরে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা থেকে। এই কারণে তারা খুব দ্রুত জনগণের মনস্তাত্ত্বিক 'অপারেশন' করতে শুরু করে দেয়। এই তওহীদী দাওয়াত দাতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা করে জনমনে ঘৃণা ও বিদ্বেষ জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। তারা জনগণকে ভয় পাইয়ে দেয় এই বলে যে, আমি ক্ষমতায় আছি বলে তোমরা সুখে আছ। ওরা যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে তোমরা গোল্লায় যাবে, বাপ-দাদার ধর্ম নষ্ট হবে এবং তোমাদেরকে কঠিন দুর্দশার মধ্যে ফেলে দেবে। কাজেই ওদের কথা কখনই শুনবে না, ওদের দিকে ভ্রূক্ষেপই করবে না।
আসলে এ সব-ই হচ্ছে স্বৈর শাসকের মারাত্মক ধোঁকাবাজি। তখন জনগণকে ভুল বোঝানো ও প্রতারিত করা ছাড়া ওদের উপায়ও কিছু থাকে না। ফিরাউন এই ধোঁকাবাজির ধুম্রজাল সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই হযরত মূসা (আ)-কে লক্ষ্য করে বললঃ
اجِئْتَنَا لِتُخْرِجَنَا مِنْ أَرْضِنَا بِسِحْرِكَ يَمُوسى (طه: ٥٧)
হে মূসা! তুমি কি এ উদ্দেশ্যেই আমাদের কাছে এসেছ যে, তুমি তোমার যাদুবিদ্যার জোরে আমাদেরকে আমাদের দেশ-ঘর-বাড়ি-ক্ষমতা-প্রতিপত্তি থেকে বহিষ্কৃত ও উৎখাত করবে?
অপর আয়াতে কথাটি এইঃ
إِنْ هَذَانِ لَسْحَرَانِ يُرِيدَانِ أَنْ يُخْرِجُكُمْ مِنْ أَرْضِكُمْ بِسِحْرِهِمَا (طه: ٦৩)
আসলে এ দুজন (মূসা ও হারুন) মস্তবড় যাদুকর। ওরা দুজনই তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে উৎখাত করার মতলবে আছে।
স্বৈর শাসনের অধীন জনগণের যে চরম মাত্রার দুর্দশা ও দুরবস্থা হয়, তাকে স্বৈরতন্ত্রীরা খুবই উত্তম-উজ্জ্বল-সুন্দর প্রমাণ করতে প্রাণ-পণে চেষ্টা করে। তারা লোকদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে, আসলে তোমাদের বর্তমান জীবন-ধারা ও রীতি-ই অতীব উত্তম। কিন্তু ওরা তা খতম করে দিতে বদ্ধ পরিকর। ফিরাউন ও তার দল-বলের ভাষায় কথাটি এইঃ
إِنَّ هَذَانِ لَسْحِرَانِ يُرِيدَانِ أَنْ يُخْرِجُكُمْ مِنْ أَرْضِكُمْ بِسِحْرِهِمَا وَيَذْهَبَا بِطَرِيقَتِكُمُ المُثْلَى (طه: ٦৩)
এই দুই যাদুকর তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে উৎখাত করতে চায় তাদের যাদুবিদ্যার জোরে এবং তোমাদের সর্বোন্নত মানের আদর্শ জীবন-ধারা ও পদ্ধতিকে বিনষ্ট করতে বদ্ধপরিকর।
স্বৈর শাসকরা অনেক সময় নিজেদের নিরংকুশ কর্তৃত্বের সিংহাসনকে রক্ষা করার লক্ষ্যে শেষ অস্ত্র হিসেবে নিজেদের বড় ধার্মিক, আল্লাহ-ভীরু, রাসূল-প্রেমিক ও মানব দরদী রূপী মিথ্যামিথ্যি পেশ করতেও লজ্জা পায় না। অথচ তাদের আসল উদ্দেশ্য হয় নিজেদেরকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতাসীন রেখে দ্বীন-ধর্মকে সমূলে উৎপাটিত করা। আর যারা প্রকৃতই কোন কল্যাণকর বিধান নিয়ে মানুষের নিকট উপস্থিত হয়, তাদেরকেই স্বার্থপর অসদুদ্দেশ্যপরায়ণ এবং মানুষের জন্য বিপদজ্জনক রূপে চিহ্নিত করতে সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা চালায়। হযরত মূসা (আ) যখন ফিরাউনের নিকট এক আল্লাহর বন্দেগী কবুলের দাওয়াত দিলেন, তখনই ফিরাউন বলে উঠলঃ
ذَرُونِي اقْتُلْ مُوسَى وَلْيَدْعُ رَبَّهُ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُبْدِلَ دِينَكُمْ أَوَانٌ يُظْهِرَ فِي الْأَرْضِ الْفَسَادَ (المؤمن: ২৬)
আমাকে ছাড়ো তো। আমি এ মূসাকে হত্যা করে ফেলি! রক্ষা পাওয়ার জন্য সে তার আল্লাহকে ডাকুক না! (দেখা যাবে, সে কেমন করে আমার হাত থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে!) আমার আশঙ্কা হচ্ছে, এই লোকটি তোমাদের আবহমান কাল থেক অনুসৃত তোমাদের জীবন-বিধিকে বদলে দেবে অথবা দেশে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে।
স্বৈর শাসক যখন মনে করে, জনগণের মধ্যে ধর্মীয় ভাবধারা অত্যন্ত প্রবল, ধর্মের কথা শুনলে যখন বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়, তখন সে জনগণের সম্মুখে নিজেকে একজন বড় ধার্মিক, সত্য পথের পথিক ও সত্য পথ-প্রদর্শক রূপে পেশ করে। কুরআনে ফিরাউনের কথার উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছেঃ
مَا أُرِيكُمْ إِلَّا مَا أَرَى وَمَا أَهْدِيكُمْ إِلَّا سَبِيلَ الرَّشَادِ (المؤمن: (۲۹) ۱
আমি তো তোমাদেরকে তা-ই বলি, যা আমি সর্বোত্তম মনে করি। আর আমি নির্ভুল ও সত্য পথেরই সন্ধান দেই।
স্বৈরতান্ত্রিক-স্বেচ্ছাচারী শাসকরা স্বীয় ক্ষমতার 'ময়ূর সিংহাসন' অক্ষুণ্ণ ও স্থায়ী করে রাখার জন্য সুসংবদ্ধ ও সুবিন্যস্ত সমাজকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়ে থাকে। তার একটি ভাগে থাকে সমাজের সেসব লোক, যারা চূড়ান্ত পর্যায়ের বড় লোক, যারা 'Elite' বলে পরিচিত, যারা ধন-বল জন-বল ও বুদ্ধি-কৌশলের বলে সমাজের শীর্ষস্থানে আসীন হয়ে রয়েছে এবং সে সব কারণে চরম মাত্রার অহংকারী, দাম্ভিক! আর দ্বিতীয় ভাগে থাকে সেসব লোক, যারা দরিদ্র, দুর্বল, অক্ষম, অসহায়, মৌলিক মানবিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত, জীবন-ধারায় পশুর চাইতেও নিম্ন পর্যায়ে গণ্য। এজন্য সমাজকে নির্দিষ্টভাবে কেবল দুটি ভাগেই বিভক্ত করা হয় তা-ই নয়, প্রয়োজনবোধে ও অবস্থার অনুপাতে শত শত খণ্ডে বিভক্ত করতেও দ্বিধা বোধ করে না। তখন স্বৈরশাসক সেই অল্প সংখ্যক বড় লোকদের সহায়তা নিয়ে বিপুল সংখ্যক 'ছোট লোক'দের উপর স্বৈর শাসনের স্টীম রোলার চালাতে থাকে। ঐক্যবদ্ধতাকে খান খান করে দিয়ে জনতার মাথা তুলে দাঁড়াবার ক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে অবলুপ্ত করে দেয়। স্বৈর শাসকের এই নীতিকেই ইংরেজীতে বলা হয় Divide and Rule। আল্লাহ তা'আলা ফিরাউন সম্পর্কে ঠিক এ কথা-ই বলেছেনঃ
إِنَّ فِرْعَونَ عَلَا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيعًا (القصص: (٤)
ফিরাউন দেশে বিজয়ী ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসেছে এবং দেশের জনগণকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত করে দিয়েছে।
এইরূপ স্বৈর শাসক নিজেকে গোটা দেশের একচ্ছত্র মালিক ও মনিব বলে মনে করে। দেশের সব নৈসর্গিক ও মানবিক সম্পদের নিরংকুশ মালিকানা দাবি করে। ফিরাউনও তাই করেছিল। সে ঘোষণা দিয়েছিলঃ
يَقَوْمِ الْيَسَ لِي مُلْكُ مِصْرَ وَهَذِهِ الْأَنْهُرُ تَجْرِى مِنْ تَحْتِي أَفَلَا تُبْصِرُونَ (الزخرف: ٥١)
হে দেশের জনগণ! এই মিসর দেশের একচ্ছত্র মালিক কি আমি-ই নই? এই খাল-বিল-নদী-সমুদ্র কি আমার-ই নিরংকুশ কর্তৃত্বাধীন প্রবাহিত হচ্ছে না?... তোমরা কি দেখতে পাও না, লক্ষ্য করো না?
এভাবে স্বৈর শাসক যখন নিজেকে সকল প্রকার বিরুদ্ধতা-প্রতিরোধ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত মনে করতে শুরু করে, যখন দেখতে পায় প্রতিবাদী সমালোচক কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে গেছে, সকল মানুষ তারই অধীনতা স্বীকার করে তাকে পুরাপুরিভাবে মেনে নেয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত, তখন সে নিজেকে আইনদাতা-বিধানতাদারূপে ঘোষণা করে এবং জানিয়ে দেয় যে, কেবল তারই ঘোষিত নীতি ও তারই জারি করা আইন মানতে হবে। অন্যথায় কঠিন দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। তখন সে নিজ ইচ্ছা ও খাহেশে কোন জিনিসকে হালাল ঘোষণা করে আবার কোন জিনিসকে করে হারাম। অথচ আল্লাহর বিধানকে বাদ দিয়ে এরূপ করার কোন অধিকারই এ দুনিয়ার কারোরই থাকতে পারে না। আল্লাহ্ বলেছেনঃ
وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ الْسِنَتْكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلْلٌ وَهُذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ (النحل: ١١٦)
তোমাদের মুখে যেমন আসে মিথ্যামিথ্যি বলতে থেকো না যে, এটা হালাল আর এটা হারাম। কেননা তাতে মিথ্যামিথ্যি ভাবে স্বরচিত বিধানকে আল্লাহর নামে চালিয়ে দেয়ার অপরাধে তোমরা অপরাধী হয়ে পড়বে।
স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এতই মারাত্মক নেশার মত যে, যে-লোকই এরূপ শাসন চালাতে শুরু করবে, সে নিজেকে সারাটি দেশের একচ্ছত্র মালিক মুখতার ঘোষণা দিয়ে ও নিজ ইচ্ছামত আইন-বিধান রচনা করে জনগণের উপর জারি করেই ক্ষান্ত হয় না, শেষ পর্যন্ত সে নিজেকে জনগণের জীবন-মরণেরও একমাত্র কর্তা রূপে পেশ করে। অথচ কোটি কোটি বছরের ইতিহাস নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, মানুষ এই দুনিয়ায় ক্ষমতার অনেক দাপট দেখিয়েছে বটে; কিন্তু নিজেকে মানুষের জীবন-মরণের নিরংকুশ কর্তা প্রমাণ করা কখনই সম্ভব হয়নি। কোন মানুষ বা জীবকে জীবন দেয়াও সম্ভব হয়নি, কারোর মৃত্যুর চূড়ান্ত ফয়সালা করাও কারোর সাধ্যে কুলায়নি। (যদিও মানুষ জীবন ও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে)। জীবন ও মরণের মালিক হওয়ার এই স্বৈরতান্ত্রিক আহমিকতা দেখিয়েছে ফিরাউনের-ই মত-ফিরাউনেরও বহু পূর্বে আর একজন স্বৈর শাসক, যার নাম নমরূদ। কুরআন মজীদে তার সম্পর্কে এভাবে বলা হয়েছেঃ
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِي حَاجَّ إِبْرَاهِيمَ فِي رَبِّهِ أَنْ آتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ - إِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّي الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ - قَالَ أَنَا أُحْيِي وَأُمِيتُ (البقرة: ٢٥٨)
তুমি কি সেই ব্যক্তির অবস্থা চিন্তা করনি, যে ব্যক্তি ইবরাহীমের সাথে তর্ক করেছিল এই নিয়ে যে, তার রব্ব কে? এবং সে তর্ক করেছিল এই কারণে যে, আল্লাহই তাকে বাদশাহী দিয়েছিলেন। ইবরাহীম যখন বলল, আমার রব্ব তিনিই যিনি জীবন ও মৃত্যু দানকারী। সে তখন বললঃ আমিই তো জীবন দেই ও মৃত্যু ঘটাই।
বস্তুত এরূপ স্বৈরশাসন মানব জীবনে কত যে লাঞ্ছনা, দুঃখ, অশান্তি সৃষ্টির প্রত্যক্ষ কারণ হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। বিশ্বমানবের ইতিহাস এই পর্যায়ের দুঃখময় কাহিনীতে ভরপুর হয়ে রয়েছে। মানুষকে এত কঠিন আযাবের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে, যা সহ্য করার কোন সাধ্যই মানুষের হতে পারে না। 'গর্তকর্তারা' কিছু সংখ্যক আল্লাহ্ অনুগত মানুষকে যে কঠিন আযাব দিয়েছিল, তা প্রাচীনকালীন ইতিহাস পাঠক মাত্রেরই জানা থাকার কথা। কুরআন মজীদে তাদের এই কীর্তিকলাপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওরা ছিল অত্যাচারী স্বৈরতান্ত্রিক শাসক। ওরা জোর করে জনগণকে নিজেদের শিরকী বিশ্বাস গ্রহণে বাধ্য করতে চেয়েছিল, কিন্তু লোকেরা তা গ্রহণ করতে যখন প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করল, তখন, তাদের জন্য বড় বড় ও গভীর গর্ত খুদলো। তাতে প্রচণ্ড অগ্নিকুণ্ড জ্বালালো এবং সে সব লোককে তার মধ্যে জীবন্ত নিক্ষেপ করল। কেবল তাদেরকেই নয়, সেই সাথে তাদের স্ত্রী-পুত্র ও বাচ্চা-কাচ্চাদেরও তার মধ্যে ফেলে দিল। ইতিহাসে স্বৈরতন্ত্রীরা মানুষকে যত আযাব দিয়েছে বলে উল্লিখিত হয়েছে, এটা ছিল তার মধ্যে একটি নির্মমতম ঘটনা। এজন্য কুরআন মজীদ তার বিশেষ গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছে। বলেছেঃ
قُتِلَ أَصْحَابُ الْأَخْدُودِ - النَّارِ ذَاتِ الْوَقُودِ - إِذْ هُمْ عَلَيْهَا قُعُودٌ ، وَهُمْ عَلَى مَا يَفْعَلُونَ بِالْمُؤْمِنِينَ شُهُودٌ ، وَمَا نَقَمُوا مِنْهُمْ إِلَّا أَنْ يُؤْمِنُوا بِاللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ (البروج : ٤-٨)
ধ্বংস হয়েছে গর্তকর্তারা। (সেই গর্তকর্তারা) যারা জ্বালিয়েছিল দাউ-দাউ করে জ্বলা ইন্ধনের আগুন। -যখন তারা সেই গর্তের মুখে উপবিষ্ট ছিল। আর তারা ঈমানদার লোকদের সাথে যে ব্যবহারটা করছিল, তা তারা প্রত্যক্ষ করছিল। এই ঈমানদার লোকদের সাথে তাদের শত্রুতার একমাত্র কারণ এই ছিল যে, তারা প্রবল পরাক্রান্ত ও স্ব-প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল।
প্রথম কথাটিঃ ধ্বংস হয়েছে গর্তকর্তারা অর্থ, যারা গর্ত খুড়ে অগ্নিকুণ্ডলি বানিয়ে সেই দাউ-দাউ করা আগুনের মধ্যে ঈমানদার লোকদেরকে জীবন্ত নিক্ষেপ করেছিল, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে। তারা আল্লাহর আযাব পাওয়ার যোগ্য প্রমাণিত হয়েছে।
ঈমানদার লোকদেরকে জ্বলন্ত দাউ দাউ করা অগ্নি গহ্বরে নিক্ষেপ করার ঘটনা হাদীসেও উল্লিখিত হয়েছে। তাতে মনে হয়, দুনিয়ার ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনা বহুবার সংঘটিত হয়েছে। মওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী এই কাহিনীর উপর ঐতিহাসিক প্রামাণ্য ও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এ পর্যায়ের বহু কয়টি ঘটনার মধ্য থেকে একটি ঘটনার সংক্ষিপ্ত উল্লেখ এখানে করা যাচ্ছে। ইয়েমন শাসক যু-নাওয়াস দক্ষিণ আরবের নাজরান দখল করে ও তথাকার সাইয়্যেদ হারিসা সুরিয়ানী (Arethas)-কে হত্যা করে। তার স্ত্রী রুমা'র চোখের সামনেই তার দুই ক্যনাকে হত্যা করে তাদের রক্ত পান করতে তাকে বাধ্য করল। শেষ পর্যন্ত তাকেও হত্যা করল। বিশপ পলের অস্থি কবর থেকে বের করে ভস্ম করা হলো এবং আগুন ভর্তি গর্তসমূহে নারী-পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ, পাদ্রী, পূজারী সকলকেই নিক্ষেপ করল। নিহতের সংখ্যা মোট ২০ থেকে ৪০ হাজার দাঁড়িয়েছিল। ৫২৩ খৃস্টাব্দের অক্টোবর মাসে এই ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। ১
হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে গর্তকর্তাদের এই ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে যে, একজন বাদশাহ মদ খেয়ে বেহুঁশ হয়ে নিজ ঔরসজাত কন্যার উপর (অথবা আপন ভগ্নীর উপর) বলাৎ করে। পরে তার মনে প্রশ্ন জাগে যে, অতঃপর যে দুর্নাম হবে তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় কি? কন্যা (বা ভগ্নী) পরামর্শ দিল যে, জনগণের এক মহাসম্মেলন আহ্বান করে এ কথা ঘোষণা করে দেয়া হোক যে, আপন কন্যা (বা বোন) বিয়ে করা আমার মতে সম্পূর্ণ বৈধ এবং একথা মেনে নিতে সকলকে বাধ্য করতে হবে। বাদশাহ তাই করল। কিন্তু তার এই মত জনতার কেউ-ই গ্রহণ করতে রাযী হলো না। তখন সে গর্ত খুড়ে তার মধ্যে কাষ্ঠের স্তূপ করে আগুন ধরিয়ে দিল এবং তার মত গ্রহণ করতে রাযী নয়- এমন সমস্ত মানুষকে তাতে নিক্ষেপ করল। ২
এ সব বিবরণ থেক অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, স্বৈর শাসকরা পশুত্বের নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছতে ও তা সকলকে অকপটে মেনে নিতে বাধ্য করতেও লজ্জা বোধ করে না। সকল প্রকার হারাম কাজ সে স্বীয় খাহেশ পূরণের জন্য করে এবং তা করতে বা তা করা হারাম নয় বলে মেনে নিতে বাধ্য করতে সচেষ্ট হয়ে থাকে। আর কেউ যদি স্বীয় সঠিক ঈমানের কারণে তা মেনে নিতে প্রস্তুত না হয়, তাহলে তার উপর অত্যাচারের পাহাড় ভাঙ্গতেও কুণ্ঠিত হয় না। কুরআন মজীদ ফিরাউন ও অন্যান্য স্বৈর শাসকদের যেসব চরিত্র ও কার্যকলাপের উল্লেখ করেছে তা কেবল সেই বিশেষ ব্যক্তিদেরই নয়, সকল স্বৈর শাসকেরই এই চরিত্র ও কার্যকলাপ। এই স্বৈর শাসন পদ্ধতিই শাসকের মধ্যে এরূপ চরিত্র সৃষ্টি করে ও অনুরূপ কার্যকলাপ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এ স্বৈর শাসনের আসল পরিচিতি হচ্ছে নিরংকুশ কর্তৃত্বের রাজতন্ত্র বাদশাহী বা অস্ত্র বলে দখল করা ক্ষমতা। তা যেমন আল্লাহ্র বিধান মেনে চলে না, তেমনি কোনরূপ মানবিকতারও ধার ধারে না। এক ব্যক্তিই হয়ে থাকে কোটি কোটি মানুষের উপর নিরংকুশ কর্তৃত্বের একচ্ছত্র অধিকারী। কুরআনে বিশেষভাবে ফিরাউন ও নমরূদের কথা বলা হয়েছে এজন্য যে, এরা দু'জন হচ্ছে মানবেতিহাসে স্বৈরতন্ত্রী শাসকের জীবন্ত প্রতীক।
তবে স্বৈরতন্ত্রের বিপর্যয় পরিমাণ ও পরিস্থিতির (quantity and quality) দিক দিয়ে যথেষ্ট পার্থক্য হয়ে থাকে। এ পার্থক্য হয় ব্যক্তির যোগ্যতা ও মন-মানসিকতার মাত্রা-পার্থক্যের কারণে। এ দিক দিয়ে ব্যক্তি ব্যক্তিতে যে পার্থক্য হয়ে থাকে, তা তো সর্বজনস্বীকৃত।
কোন কোন স্বৈরতন্ত্রী জনগণের কতিপয় মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করে, আর কতিপয় দিক দিয়ে তা হরণ করে না, রক্ষা করে। আবার কোন কোন স্বৈরতন্ত্রী প্রত্যেকটি নাগরিকের সমস্ত অধিকারই হরণ করে নেয়, ব্যক্তির স্বাধীনতা বলতে কিছুই থাকতে দেয়া হয় না। এক্ষেত্রে সে সাধারণ সীমা পর্যন্ত লংঘন করে যায়। জনগণের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জন করা সমস্ত ধন-সম্পদও নিঃশেষ লুটেপুটে নিয়ে যায়। আর শেষ পর্যন্ত সে শুধু রাজ্য সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসতেই রাযী হয় না, সেই সাথে সারা দেশের কোটি কোটি মানুষের যাবতীয় ধন-সম্পদের-এমন কি সেই লোকদেরও নিরংকুশ মালিক হয়ে বসার অহমিকতা বোধ করতে থাকে। এরূপ অবস্থায় স্বৈরতন্ত্র কতটা প্রচণ্ড হতে পারে, তা অনুমান করলেও রোমাঞ্চিত হতে হয়। এই সময় এ ধরনের স্বৈরতন্ত্রী মানুষের আল্লাহ্ হয়ে বসে আর মানুষের উপ্ন চলে স্বৈচ্ছাচারিতাজনিত সীমাহীন বর্বরতা। সে মানুষের খোদা হয়ে সকলকে একমাত্র তারই দাসত্ব করতে বাধ্য করে।
এইরূপ একটি শাসন ব্যবস্থার সাথে ইসলামের যে দূরতম সম্পর্ক-ও থাকতে পারে না, তা ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন হয় না। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে নাজিবাদ, ফ্যাসীবাদ ও বিপ্লবী সমাজতন্ত্রবাদ প্রভৃতি শাসন ব্যবস্থার সাথে তার পুরাপুরি সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। বলা যায়, প্রাচীনকালীন নমরূদী ফিরাউনী শাসনের এগুলিই হচ্ছে অতি আধুনিক সংস্করণ। অন্য কথায়, এই সব কয়টি শাসন ব্যবস্থাই আল্লাহদ্রোহী শাসন ব্যবস্থা, আল্লাহ্ আল্লাহ্ত্বকে অস্বীকার করে জনগণের উপর নিজেকে আল্লাহ্ বানিয়ে বসার শাসন ব্যবস্থা।
এ প্রসঙ্গে কুরআনে উল্লিখিত কতিপয় বাদশাহী ব্যবস্থা সম্পর্কেও আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করছি। কেননা পূর্ববর্তী আলোচনা পাঠান্তে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, বাদশাহী ব্যবস্থা যদি ইসলাম পরিপন্থী স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাই হবে, তাহলে কুরআনের কোন কোন নবী ও অ-নবীকে বাদশাহ বানানো ও তাকে ইসলামী মনে করার কথা বলা হলো কেমন করে? .....তা কি ইসলাম সম্মত?
বস্তুত ইসরাইলীদের ইতিহাসে বহু বাদশাহের উল্লেখ পাওয়া যায় এবং সে বাদশাহী আল্লাহ্ দিয়েছেন বলে তিনি নিজেই তাঁর কালামে-কুরআনে দাবি করেছেন। এই বাদশাহীগুলি কি ধরনের এবং তা আল্লাহ্ দিয়েছেন কেমন করে?
এর জবাবে বলা যায়, আল্লাহ্ তা'আলার দেয়া রাজত্ব-বাদশাহী এ সব রাজত্ব-বাদশাহী থেকে চরিত্র-বৈশিষ্ট্য ও রীতি-নীতি সর্ব দিক দিয়েই সম্পূর্ণ ভিন্নতর। কেননা আল্লাহর দেয়া বাদশাহী হয় নবুয়্যাতের সাথে জড়িত, না হয় বিশেষ অবস্থায় আল্লাহ্র এক বিশেষ দান। তাতে ফিরাউনিয়ত হতে পারে না, গর্ব-অহংকার-অহমিকতা, আল্লাহদ্রোহিতা ও মানব জীবনে কোনরূপ বিপর্যয় সৃষ্টির কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। এ রাজতন্ত্র নয়, এ বাদশাহী প্রকৃতই বাদশাহী নয়, বরং তা হচ্ছে নবুয়্যাতের দায়িত্ব পালন এবং পরিভাষার দিক দিয়ে তা আল্লাহ্ মহান খিলাফত। তা সম্পূর্ণরূপে ও সর্বতোভাবে আল্লাহ্ বিধানের ভিত্তিতে চলে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা হযরত দাউদ (আ)-কে সম্বোধন করে বলেছেনঃ
يُدَاوُدُ إِنَّا جَعَلْنَكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمُ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلُّكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ - إِنَّ الَّذِينَ يُضِلُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ (ص: ٢٦)
হে দাউদ! আমরাই তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছি। অতএব তুমি লোকদের উপর শাসন চালাও-লোকদের পরস্পরের মধ্যে বিচার কার্য সম্পাদন কর পরম সত্য নীতি অবলম্বন ও ইনসাফ সহকারে। আর নিজের স্বেচ্ছাচারিতাকে অনুসরণ করো না। তা হলে তোমার এই স্বেচ্ছাচারিতাই তোমাকে আল্লাহ্ পথ থেকে ভ্রষ্ট করে দেবে।
এ আয়াত অনুযায়ী আল্লাহর দেয়া শাসন ক্ষমতা খিলাফত নামে অভিহিত। যাকে এই শাসন ক্ষমতা দেয়া হয়, সে আল্লাহ্র খলীফা।
এ খিলাফতী শাসন ব্যবস্থায় লোকদের উপর শাসনকার্য পরিচালিত হয় পরম সত্য নীতি আদর্শ-আল্লাহ্ দেয়া বিধান-অনুযায়ী।
এখানে বাদশাহর ব্যক্তিগত খামখেয়ালী, স্বেচ্ছাচারিতা ও খাহেশ অনুসরণের একবিন্দু অবকাশ থাকতে পারে না। যদি তা হয়, তাহলে সে বাদশাহী আল্লাহ্ সমর্থন হারিয়ে ফেলবে। তখনই তা হবে চরম স্বৈরতন্ত্র, যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।
হযরত মুহাম্মাদ (স)-ও মদীনায় প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন। তাঁকেও অনুরূপ নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ্ বলেছিলেনঃ
وَأَنِ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ (المائدة: ٤٩)
এবং শাসন কার্য পরিচালনা কর লোকদের মধ্যে আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী এবং লোকদের কামনা বাসনা কে অনুসরণ করো না।
এ শাসনকার্য মূলত কোন ব্যক্তির শাসন নয়, ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতাও চলে না তাতে। বরং তা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর বিধান-ভিত্তিক শাসন। অতএব এ শাসন কখনই স্বৈরতন্ত্রী হয় না।
বনি ইসরাইলীদের মধ্যে এরূপ বাদশাহী গড়ে তোলা হয়েছিল এবং তা-ও অনুরূপ শাসন ব্যবস্থা ছিল। ফলে তা কখনই স্বৈরতান্ত্রিক নয়। যেমন কুরআনে বলা হয়েছেঃ
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ بِقَوْمِ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَعَلَ فِيكُمْ أَنْبِيَاءَ وَجَعَلَكُمْ مُلُوكًا (المائدة: ٢٠)
মূসা যখন তার জনগণকে ডেকে বললঃ হে জনগণ! তোমরা স্মরণ কর তোমাদের প্রতি আল্লাহর দেয়া সেই নিয়ামতের কথা, যার ফলে তিনি তোমাদের নবী বানিয়েছেন এবং তোমাদেরকে বাদশাহ বানিয়েছেন।
এই বাদশাহগণ আসলে নবী-রাসূল। যেমন হযরত ইউসুফ, হযরত দাউদ, হযরত সুলায়মান (আ)- তাঁদের সম্পর্কেই কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ
أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَى مَا أَتَهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ - فَقَدْ أَتَيْنَا أَنَّ إِبْرَهِيمُ الْكِتَبُ وَالْحِكْمَةَ وَآتَيْنَهُمْ مُلْكًا عَظِيمًا (النساء: ٥٤)
আল্লাহ্ তাদেরকে তাঁর বিশেষ অনুগ্রহের ফলে যা কিছু দান করেছেন, তা দেখে এ লোকদের প্রতি তারা হিংসা পোষণ করে?..... বস্তুত আমরা তো ইবরাহীম ও তাঁর বংশধরদেরকে কিতাব ও হিকমাত দিয়েছি, আমরা তাদেরকে বিরাট রাজত্বও দিয়েছি। ১
হযরত ইউসুফ ও দাউদ (আ) যে হযরত ইবরাহীমের বংশধর ছিলেন, তা সর্বজনজ্ঞাত। আর তাঁরাই ছিলেন বনি ইসরাইলের শীর্ষস্থানীয় নবী-রাসূল।
এক পর্যায়ে বনি ইসরাইলের জন্য একজন বাদশাহ্ নিয়োগ করার দাবি জানানো হয় আল্লাহ্র নিকট এবং তিনি তা নিয়োগ করেন একজন অ-নবী ব্যক্তিকে। কুরআন মজীদেই বলা হয়েছেঃ
وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ اللهَ قَدْ بَعَثَ لَكُمْ طَالُوتَ مَلِكًا - قَالُوا أَنِّي يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةً مِّنَ الْمَالِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَةً بَسْطَةٌ فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ - وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ (البقرة: ٢٤٧)
তাদের নবী তাদেরকে ডেকে বললঃ বস্তুতই আল্লাহ তালূতকে তোমাদের জন্য বাদশাহ বানিয়ে পাঠিয়েছেন। লোকেরা বললঃ সে কি করে আমাদের বাদশাহ্ হতে পারে, তার তুলনায় আমরাই বরং বাদশাহীর বেশী অধিকারী। তাকে তো বিপুল ধন-মালও দেয়া হয়নি! নবী বললঃ নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তাকেই তোমাদের উপর বাদশাহ বাছাই করে নিয়োগ করেছেন এবং তাকে ইলম ও দেহের দিক দিয়ে বিপুলতা বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা তার বাদশাহী দান করেন। আল্লাহ্ তো বিপুল-বিশাল, সর্বজ্ঞ।
তালূত নবী ছিলেন না বটে; তবে তার সঙ্গে ছিলেন একজন নবী। আর সে ব্যক্তিও কোন সীমালংঘনকারী ব্যক্তি ছিল না। সে আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থাধীন লালন ও প্রশিক্ষণ লাভ করেছিল। শাসন ক্ষমতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা তার মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বর্তমান ছিল। উপরোদ্ধৃত আয়াতের শেষ ভাগে তা-ই বলা হয়েছে।
সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ এ আয়াতের তাফসীরে লিখেছেনঃ বনি-ইসরাইলের বাদশাহী প্রাপ্তিতে তাদের অগ্রাধিকার লাভের কথা বলে তাদের প্রকৃত মনোবৃত্তিই প্রকাশ করেছে। তাদের বক্তব্য ছিল, তাদের একজন বাদশাহ হবে, যার পতাকাতলে মিলিত হয়ে তারা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করবে। তারা তা বলেই দিয়েছে যে, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করতে ইচ্ছুক এবং প্রস্তুত। নবীর নিকট তারা একজন বাদশাহের দাবিও জানিয়েছিল। সেই অনুযায়ী নবী আল্লাহর পক্ষ ‘থেকে তাদের খবর দিলেন যে, আল্লাহ্ তালূতকে বাদশাহ রূপে নিযুক্ত করেছেন। কিন্তু তারা আল্লাহর এ বাছাই ও নিয়োগ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে। বলে, তালূত কি করে বাদশাহ হতে পারে; ওর তো ধন-মালের বিপুলতাই নেই, আমরাই বরং বাদশাহী পাওয়ার বেশী অধিকারী, বিশেষ করে বংশানুক্রমিকতার দৃষ্টিতে, উত্তরাধিকার নীতির ভিত্তিতে। ও তো বাদশাহদের বংশের সন্তান নয়। এ হচ্ছে বাদশাহ সংক্রান্ত ধারণার অনিবার্য পরিণতি। বনি ইসরাইলের বংশীয় গৌরব ও বিদ্বেষের কথা কে না জানে?
নবী তাদের এই দুই ভিত্তিক দাবিকে অগ্রাহ্য করলেন। তিনি বাদশাহ হওয়ার জন্য বিপুল ধন-মালের মালিক হওয়ার ভিত্তিকেও মানলেন না, মানলেন না বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের দোহাই। এ দুটিকে অস্বীকার করে বাদশাহীর জন্য প্রয়োজনীয় গুণকে ভিত্তিরূপে ঘোষণা করলেন। সে ভিত্তি হচ্ছে ইল্ম ও সুস্বাস্থ্য। এ দুটি দিক নিয়ে সে-ই বাদশাহ হওয়ার অধিক উপযুক্ত প্রমাণিত হয়েছে। আর সর্বোপরি স্বয়ং আল্লাহর বাছাই- মনোনয়ন নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। বললেনঃ
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةً فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ .
নিঃসন্দেহে আল্লাহই তাকে তোমাদের উপর মনোনীত করেছেন এবং তাকে ইলম ও স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে আধিক্য দিয়েছেন। ১
তালুতের বাদশাহ হওয়ার অকাট্য প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহর মনোনয়ন। কিন্তু আল্লাহ্ তাকে মনোনীত করলেন কেন? তার কারণ হচ্ছে, সে রাজা-বাদশাহর বংশধর বা বেশী ধন-মালের মালিক না হলেও সে ইলম ও সুস্বাস্থ্যের-দৈহিক ক্ষমতার দিক দিয়ে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। ইলম হচ্ছে মানুষের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব ও বৈশিষ্ট্য আর রাষ্ট্র পরিচালনা ও যুদ্ধ-জিহাদ চালাবার কঠিন অবিশ্রান্ত কষ্ট স্বীকারের জন্য স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা শুধু সাহায্যকারী-ই নয়, অপরিহার্য শর্ত।
প্রমাণিত হলো যে, তালুতের বাদশাহ হওয়ার অধিকার দ্বীন সম্পর্কিত ইলমের কারণে এবং দৈহিক শক্তি-সামর্থ্যের কারণে। বংশের দরুন নয়। ২
সেই সাথে এ কথাও বলা যায় যে, কুরআন যে রাজতন্ত্র বা বাদশাহীকে হারাম করেছে, তা হচ্ছে জনগণের উপর নিরংকুশ কর্তৃত্বসম্পন্ন রাজতন্ত্র বা বাদশাহী। নবী-রাসূলগণ যে বাদশাহী পেয়েছিলেন, তা সে রকমের নয়। তা নিছক জনগণের ব্যাপারাদির ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা আল্লাহ্ বিধান অনুযায়ী। এখানে নিরংকুশতার কোন অবকাশ নেই।
তা সত্ত্বেও তাঁদের ক্ষমতাসীনতাকে 'শাসক' ও মালিক বা বাদশাহ নামে অভিহিত করার কারণ কি? মনে হয় শাসন-প্রশাসনের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে পরিচিত ও প্রচলিত শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে, যেন কথা জনগণের বোধগম্য হয়। কেননা বিশ্ব ইতিহাসের যে যে অধ্যায়ের এই সব কাহিনী, তখন বলতে গেলে দুনিয়ার সর্বত্রই এই বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র ও বাদশাহী অথবা ক্ষমতা দখল ছাড়া অন্য কোন পদ্ধতি প্রচলিত ও জনগণের নিকট পরিচিত ছিল না। যদিও আল্লাহ্ তা'আলা নবী-রাসূলগণকে বা কোন অ-নবীকে প্রচলিত ধরনের রাজা বা বাদশাহ বানান নি, তার বিপরীত আল্লাহর বিধান অনুসরণ করে প্রশাসক হিসেবেই তাঁদের নিযুক্ত করেছিলেন। তা সত্ত্বেও তাদের জন্যও প্রচলিত পরিভাষাই ব্যবহার করা জরুরী হয়ে পড়েছিল, যদিও এ দু'ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে নীতি-আদর্শ ও আচার-আচরণের দিক দিয়ে আসমান-যমীনের পার্থক্য রয়েছে।
উপরন্তু আল্লাহ্ যে অল্প সংখ্যক নবীকে 'বাদশাহ' বা 'শাসক' নামে অভিহিত করেছেন, তাদের শাসন-প্রশাসন আমাদের এখানে আলোচ্য রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও স্বৈরতন্ত্র থেকে মৌলিকভাবেই ভিন্নতর। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীগণের মধ্য থেকে যে নেক বান্দাকে বাদশাহ বানিয়েছিলেন বলে কুরআনের আলোচ্য আয়াতসমূহে বলা হয়েছে, তা কখনও শক্তি প্রয়োগ, জবরদস্তি সহকারে ও গায়ের জোরে জনগণের মালিক-মুখতার হয়ে বসার নীতিতে অর্জিত হয়নি। অথচ দুনিয়ার প্রায় সব রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও নিরংকুশ শাসকর্তার মূলে এ জিনিসই ছিল প্রধান হাতিয়ার।
এ দুই ধরনের বাদশাহী ও শাসনকর্তার মধ্যকার পার্থক্য আরও দুটি দিক দিয়ে দেখানো যেতে পারেঃ
প্রথম, নবী-রাসূলগণ শাসক-প্রশাসক হলেও তাঁরা ছিলেন মা'সুম এবং মহান পবিত্র গুণের অধিকারী। দুনিয়ার অন্যান্য রাজা-বাদশাহ-স্বৈরতন্ত্রীরা সে রূপ ছিল না, হতেও পারে না।
দ্বিতীয়, নবী-রাসূলগণ যে রাজত্ব-বাদশাহী পেয়েছিলেন মূলত তা মহান আল্লাহর দান বিশেষ। তাঁরা তা কখনই ক্ষমতাবলে-শক্তি প্রয়োগে অর্জন করেন নি। শক্তি বলে বা প্রতারণা ইত্যাদির মাধ্যমে রাজত্ব লাভ তো আল্লাহদ্রোহী ব্যক্তিদের চিরন্তনী চরিত্র।
এ দুটি দিক বাদ দিয়ে যে রাজতন্ত্র ও বাদশাহী, তা-ই হচ্ছে স্বৈরতন্ত্র। তা অনিবার্যভাবে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টির কারণ ঘটাবে এবং এই শাসকরাই নমরূদ ফিরাউন হয়ে বসতে পারে। ইতিহাস তা-ই প্রমাণ করে।
কোন কোন নবী-রাসূলকে আল্লাহ্ তা'আলা 'মালিক'-বাদশাহ নামে অভিহিত করেছেন বটে; কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, সাধারণভাবে রাজা-বাদশাহরা অহংকারী, প্রতাপান্বিত ও স্বৈরতন্ত্রী হলেও কুরআন নাযিল হওয়ার সময় নবী-রাসূলগণকে 'বাদশাহ' ইত্যাদি বলার দরুণ তাঁদেরকে সে ধরনের রাজা-বাদশাহরূপে কেউ-ই মনে করতে পারেনি। কারো-ই মনে রাজা-বাদশাহদের সম্পর্কিত খারাপ ধারণা নবী-রাসূল সম্পর্কে জেগে উঠেনি আর আজও তা কখনই মনে হয় না।
আর এ কারনেই আল্লাহ্ তা'আলা তালুতকেও মালিক-বাদশাহ নামে অভিহিত করতে দ্বিধা করেন নি। উদাত্ত কণ্ঠে তিনি বলেছেনঃ
إِنَّ اللَّهَ قَدْ بَعَثَ لَكُمْ طَالُوتَ مَلِكًا (البقرة: २४৭)
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তালূতকে একজন বাদশাহ করেই তোমাদের জন্য পাঠিয়েছেন।
আর বনি ইসরাইলীদের প্রতি এই বলে অনুগ্রহ দেখিয়েছেন যে, আল্লাহ্ তাদের মধ্যে নবী বানিয়েছেন, রাজা-বাদশাহ বানিয়েছেন। আর এটা স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলারই একটি অতি বড় নিয়ামত বিশেষ। বলেছেনঃ
اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَعَلَ فِيكُمْ أَنْبِيَاءَ وَجَعَلَكُمْ مُلُوكًا (المائدة: ٢٠).
স্মরণ কর তোমাদের প্রতি আল্লাহ্ সেই নিয়ামতকে যে তিনি তোমাদের মধ্যে নবীও বানিয়েছেন, তোমাদেরকে রাজা-বাদশাহ্ও বানিয়েছেন।
ইবরাহীমী বংশধরদের কিতাব হিকমাত এবং বিরাট রাজ্য-রাজত্ব দেয়ার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। (আন্-নিসাঃ ৫৪) শেষ পর্যন্ত হযরত দাউদ (আ)-এর এ কথাটিরও উল্লেখ করেছেন যে, তিনি আল্লাহর নিকট রাজত্ব মালিকত্ব চেয়েছিলেন, যা তাঁর পর আর কারোর ভাগ্যে জুটবে না।
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِّنْ بَعْدِي (ص: ٣٥)
হে আমার পরওয়ারদিগার, আমাকে ক্ষমা কর এবং আমাকে এমন এক রাজত্ব দাও, যা আমার পরে আর কারোর জন্যই বাঞ্ছনীয় হবে না।
মোটকথা, আল্লাহ্র দেয়া ও আল্লাহর নিকট থেকে চেয়ে পাওয়া এসব রাজত্ব ছাড়া অন্যান্য সকল প্রকারের রাজত্ব বাদশাহী-যার পেছনে আল্লাহর অনুমতি বা সমর্থন নেই-ইসলামে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। বিশেষত উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রাজত্ব, মালিকত্ব ও বাদশাহী।
তার কারণ, এই ধরনের রাজত্ব বাদশাহীতে ব্যাপক বিপর্যয়, জনগণের হক্ বিনষ্ট, মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং সুবিচার-ন্যায়পরতা-নিরপেক্ষ ইনসাফ পদদলিত হওয়া একান্তই অপরিহার্য। মানুষের ইতিহাসের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতাই তার অকাট্য প্রমাণ।
প্রখ্যাত ইতিহাস-দার্শনিক আল্লামা ইবনে খালদূন তাঁর গ্রন্থের ভূমিকা অংশে লিখেছেনঃ
কোন জাতি বা কোন গোত্রের বিশেষ একটি পরিবারে বা ঘরে রাজত্ব যখন স্থিতি লাভ করে, সমস্ত বিজয়ী জাতির মধ্যে যখন তা এককভাবে দেশের ও রাজত্বের একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসে এবং অন্যান্য পরিবারগুলিকে পেছনে ফেলে দেয়, পরে রাজত্ব ক্রমাগতভাবে একই বংশের লোকদের মধ্যে হস্তান্তরিত হয়ে চলতে থাকে, তখন বাদশাহের বেশীর ভাগ রাজন্য ও পরিষদবর্গের পক্ষ থেকে বাদশাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ভাব জেগে উঠে। আর সরকার পরিচালন ক্ষমতা সে পরিবারের হাত থেকে কেড়ে নেয়া হয়। আর তার মূলে প্রায়ই এই কারণ হয় যে, বংশের কোন অযোগ্য কিংবা কম বয়সের বালক নিজের পিতার জীবদ্দশা থেকেই প্রিন্স বা পরবর্তী বাদশাহ নিযুক্ত হয়। কিংবা তার মৃত্যুর পর আপনজনের চেষ্টা-সহযোগিতার বলে রাজসিংহাসনে আরোহণ করে। যখন অনুভব করা যায় যে, রাজত্বের নতুন উত্তরাধিকারী স্বীয় অল্প বয়স্কতা বা অযোগ্যতার কারণে শাসনকার্য চালাতে অক্ষম, তখন তার অভিভাবক রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ধারণ করে-সে তার পিতার উজীর বা পরিষদ হোক বা গোত্রেরই কোন ব্যক্তি। দেশ শাসনের পূর্ণ কর্তৃত্ব নিজ হাতে নিয়ে রাজত্ব চালাতে থাকে। তখন অল্প বয়স্ক বাদশাহকে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারাদি থেকে অনেক দূরে রেখে সুখ-সম্ভোগ, বিলাস-ব্যসন ও আনন্দ স্ফূর্তির মধ্যে ডুবিয়া রেখে দেয়। রাষ্ট্রীয় ব্যাপারাদির প্রতি তাকে চোখ তুলে তাকাতেও দেয় না। ফলে দেশ ও রাষ্ট্রের একচ্ছত্র স্বাধীন মালিক সে-ই হয়ে যায়। অতঃপর বাদশাহী-সাম্রাজ্যকতার গন্ধ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তখন তার মনে এই খেয়াল জাগে যে, 'শাহান শাহী'র অর্থ শুধু এতটুকুই যে, কখনও কখনও সিংহাসনে আরোহণ করে লোকদের প্রতি উপহার উপঢৌকন, সম্মান-প্রদর্শন ও উপাধি বিতরণ করা ও স্ত্রীলোকদের নিয়ে ঘরের চার প্রাচীরের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করা মাত্র। আর দেশের শাসন-শৃঙ্খলা, তার সমস্যাবলীর সমাধান, তার আইন-কানুন জারী করা, রাষ্ট্রীয় ব্যাপারাদি দেখা-শুনা করা, দেশের সামরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা বা তার অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা, সীমান্তসমূহের ব্যবস্থাপনা-ইত্যাদি বাদশাহের মতে উজীর-নাজীর বা মন্ত্রীমণ্ডলের কাজ। এজন্য এ সব ব্যাপারই সে উজীরের উপর ন্যস্ত করে দেয়। এভাবেই বাদশাহ'র একটা স্বৈরতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে যায়। পরে তা তার পুত্র দৌহিত্রদের মধ্যে চলতে থাকে।........ দুনিয়ার বিভিন্ন বংশের রাজত্বের ইতিহাসে তা-ই দেখা যায়।.......
কখনও এমনও হয় যে, ক্ষমতাহীন বাদশাহ খাবে গাফলত থেকে জেগে উঠে নিজের অবস্থার যথার্থ পর্যালোচনা করে। আর চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়ে হারানো ক্ষমতা ও স্বাধীনতা পুনরায় করায়ত্ত করে নেয় এবং স্বাধীন ক্ষমতার মালিক হয়ে কর্তৃত্বশীলরা বিদ্রোহীদের মস্তক চূর্ণ করে দেয়। কখনও তরবারির দ্বারা তাদের হত্যা করে। আবার কখনও তাদেরকে তাদের দখল করা ক্ষমতা বা পদ থেকে বিচ্যুত করে....... ১
সারকথা হচ্ছে, নিরংকুশ রাজতান্ত্রিক বা বাদশাহী ও উত্তরাধিকার মূলক শাসন ব্যবস্থা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া আর কিছুই নয়。
টিকাঃ
১. তাফহীমুল কোরআন, সূরা আল-বুরুজ।
২. তাফসীর মাজমাউল বায়ান, দূররে মনসুর।
১. এই এ বা রাজত্ব বলতে বস্তুগত ও আদর্শগত উভয় পর্যায়ের ব্যাপারাদির উপর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বোঝায়। তাতে নবুয়্যাত, নেতৃত্ব ও ধন-সম্পদ-সব কিছুর মালিকত্ব সামিল রয়েছে। এর পূর্ববর্তী আয়াতের দৃষ্টিতে এর অর্থ তা-ই বোঝা যায়।
২. تفسير الميزان للعلامة الطباطبائی ج: ٤، ص: ٢٧٥
১. في ظلال القرآن ج ۲، ص: ۲۲۸
২. الجامع لاحكام القرآن ج ۲، ص: ٢٤٦
১. মুকাদ্দমাঃ ইবনে খালদুন
📄 বড় লোকদের শাসন
সমাজের বড় লোকদের হাতে যখন শাসনযন্ত্র সমর্পিত হয়, তখন এক ভিন্ন ধরনের শাসন-অবস্থা দেখা দেয়। বলা হয়, যেহেতু তারা শিক্ষা, জ্ঞান, সংস্কৃতি, ধন-সম্পদের মালিকানা বা বংশীয় আভিজাত্যের অন্যান্যদের অপেক্ষা অনেক উঁচু, শ্রেষ্ঠ, তাই তাদের হাতে শাসনকার্য সুষ্ঠুরূপে পরিচালিত হতে পারবে। এরূপ শাসন ব্যবস্থাকে আধুনিক ভাষায় বলা হয়, 'এ্যারিস্টোক্র্যসী' বা বড় লোকদের-অভিজাত লোকদের শাসন।
কিন্তু এ শাসন-ব্যবস্থার মূলে কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এর যৌক্তিকতা কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এক শ্রেণীর লোক সর্বসাধারণের তুলনায় অধিক শিক্ষিত, অধিক সংস্কৃতিবান, অধিক বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন বা অধিক ঊশ্বর্যশালী হলেই যে তারা রাষ্ট্র পরিচালনার দিক দিয়েও অধিক যোগ্যতা, দূরদৃষ্টি ও ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন হবে, তা বলা যায় না। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব দানের যোগ্যতা একটা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জিনিস। তা ওসব দিক দিয়ে অগ্রসর লোকদের মধ্যেই পাওয়া যাবে অন্যত্র পাওয়া যাবে না, এ কথার কোন যুক্তি নেই। কাজেই অভিজাত শ্রেণীর বা ভদ্র লোকদের শাসন বাস্তবিকই ভিত্তিহীন ব্যাপার। অনেকে এসব দিক দিয়ে 'বড় লোক' হওয়ার দাবি করা সত্ত্বেও বাস্তবে দেখা গেছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা চরম অযোগ্যতা, অপদার্থতার প্রমাণ দিয়েছে। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় তার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত রয়েছে。
সমাজের বড় লোকদের হাতে যখন শাসনযন্ত্র সমর্পিত হয়, তখন এক ভিন্ন ধরনের শাসন-অবস্থা দেখা দেয়। বলা হয়, যেহেতু তারা শিক্ষা, জ্ঞান, সংস্কৃতি, ধন-সম্পদের মালিকানা বা বংশীয় আভিজাত্যের অন্যান্যদের অপেক্ষা অনেক উঁচু, শ্রেষ্ঠ, তাই তাদের হাতে শাসনকার্য সুষ্ঠুরূপে পরিচালিত হতে পারবে। এরূপ শাসন ব্যবস্থাকে আধুনিক ভাষায় বলা হয়, 'এ্যারিস্টোক্র্যসী' বা বড় লোকদের-অভিজাত লোকদের শাসন।
কিন্তু এ শাসন-ব্যবস্থার মূলে কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এর যৌক্তিকতা কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এক শ্রেণীর লোক সর্বসাধারণের তুলনায় অধিক শিক্ষিত, অধিক সংস্কৃতিবান, অধিক বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন বা অধিক ঊশ্বর্যশালী হলেই যে তারা রাষ্ট্র পরিচালনার দিক দিয়েও অধিক যোগ্যতা, দূরদৃষ্টি ও ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন হবে, তা বলা যায় না। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব দানের যোগ্যতা একটা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জিনিস। তা ওসব দিক দিয়ে অগ্রসর লোকদের মধ্যেই পাওয়া যাবে অন্যত্র পাওয়া যাবে না, এ কথার কোন যুক্তি নেই। কাজেই অভিজাত শ্রেণীর বা ভদ্র লোকদের শাসন বাস্তবিকই ভিত্তিহীন ব্যাপার। অনেকে এসব দিক দিয়ে 'বড় লোক' হওয়ার দাবি করা সত্ত্বেও বাস্তবে দেখা গেছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা চরম অযোগ্যতা, অপদার্থতার প্রমাণ দিয়েছে। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় তার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত রয়েছে。