📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 অত্যাচারী সরকার

📄 অত্যাচারী সরকার


‘গভর্নমেন্ট’ বা সরকার-এর নাম শুনলেই কিছু লোকের চোখের সম্মুখে অত্যাচারী সরকার ও শাসকদের ভয়াবহ ও বীভৎস চেহারা ভেসে উঠতে পারে, তা কিছুমাত্র বিস্ময়ের ব্যাপার নয়। কেননা বিশেষ করে প্রাচ্য দেশীয় নাগরিকগণ সাম্রাজ্যবাদী বা ঔপনিবেশিক শাসকদের নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতন-নিষ্পেষণ নিতান্ত অসহায়ভাবে ভোগ করে দীর্ঘকাল পর্যন্ত। ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেও ভয় পায়’ কথাটিতে যা বোঝায়, এক্ষেত্রেও তা পুরাপুরি প্রযোজ্য। কেননা তারা অসহায় নাগরিকদের প্রতি কোনরূপ দয়া অনুগ্রহ দেখাতে দেখতে পায়নি, তারা দেখেছে কিভাবে সহায়-সম্বলহীন মানুষগুলোকে দুর্বল পেয়ে তাদের উপর অমানবিকভাবে পীড়ন চালানো হয়েছে, তাদের দেহের শেষ রক্তবিন্দুও শুষে নিয়েছে। লুটে নিয়েছে তাদের ঘর-বাড়ি, ভাঙ্গা-চোড়া হাড়ি-পাতিলও। তাদের উপর দাপট চালাবার জন্য তারা তাদেরই মত অন্যান্য শক্তিধর অত্যাচারী লোকদের সাথে মৈত্রী গড়ে তুলেছে, যেন এই নিপীড়িত অসহায় লোকগুলি কারোর নিকট ফরিয়াদও না জানাতে পারে।

কিন্তু ইসলাম এই ধরনের কোন অত্যাচারী নির্মম সরকার কখনই গঠন করেনি। বরং ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে গঠিত সরকার তো সর্বোত্তম, সর্বাধিক মানবতাবাদী ও সর্বাধিক কল্যাণকামী হয়ে থাকে, ইতিহাসে তা-ই হয়েছে। সে সরকার সর্বক্ষণ জনগণের পক্ষে কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত রয়েছে, জনগণকে সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত রাখতে চেষ্টারত হয়েছে। সর্বোপরি, মহান আল্লাহ্র দেয়া সুবিচারক আইনসমূহই জনগণের উপর জারি করেছে, নিজেদের মনগড়াভাবে রচিত আইন নয়।

বস্তুত এ ধরনের সরকার ও প্রশাসনের একটি মাত্র লক্ষ্যই হতে পারে। আর তা হচ্ছে জনগণের নিঃস্বার্থ খেদমত, জনগণের অধিকারসমূহ যথাযথ আদায় করা, তাদের মান-মর্যাদা রক্ষা করা, তাদের ইজ্জত-আবরুর হেফাযত করা, তাদের সৌভাগ্য রচনা করা। ফলে এ ধরনের সরকার ও প্রশাসনের ভিত্তি কেবল যমীনের উপরই প্রতিষ্ঠিত হয় না, হয় জনগণের হৃদয় ফলকের উপর। আর তার শিকড় জনগণের মাংসের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত ও রক্তের সাথে মিলে-মিশে একাকার হয়ে যায়।

আসলে কেবলমাত্র ইসলামই পারে একটি ন্যায়নিষ্ঠ সুবিচারকারী ও নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের জন্য কল্যাণকর একটি সরকার গঠন করতে। মিসরের শাসনকর্তা মালিক আশতারকে লক্ষ্য করে চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রা) লিখেছেনঃ

প্রয়োজনশীল লোকদের জন্য তুমি একটা সময় নির্দিষ্ট রাখবে, যেন তারা তোমাকে পুরাপুরি পায়। তুমি তাদের নিয়ে সাধারণ ও খোলা বৈঠক করবে। তখন তুমি তোমার স্রষ্টা আল্লাহর নিকট বিনয়াবনত হয়ে থাকবে। তোমার সৈন্যবাহিনীকে তখন তাদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। তোমার পাহারাদার পুলিশ ইত্যাদিকেও দূরে সরিয়ে দেবে, যেন তারা তোমার সাথে প্রাণখোলা কথা-বার্তা বলতে পারে এবং এই কথা-বলায় কোনরূপ বাধাগ্রস্ত না হয়। ১

ইসলামের দৃষ্টিতে ন্যায়বাদী সুবিচারক শাসক হচ্ছে সে, যে জনগণের সুখে সুখী ও জনগণের দুঃখে দুঃখিত হয়। সে কখনই সুরক্ষিত দুর্ভেদ্য পাহারা প্রাচীর বেষ্টিত হয়ে থাকবে না। জনগণ রসাতলে ভেসে যাবে আর সে সুখের নিদ্রায় অচেতন হয়ে থাকবে, তা অন্তত ইসলামী শাসক সম্পর্কে চিন্তাই করা যায় না। অথবা সে নিজের সুখ-শান্তি উন্নতি-উর্ধ্বগতি (Promotion) নিয়েই চিন্তামগ্ন হয়ে থাকবে, জনগণের কল্যাণের চিন্তা করবে না, তাও অকল্পনীয়।

ইসলাম রাষ্ট্রের পরিচালক বা কোন পর্যায়ের প্রশাসক হওয়ার জন্য যেসব শর্ত আরোপ করেছে, যেসব দায়িত্ব ও কঠিন কর্তব্যের কথা বলেছে, আধুনিক কালের রাষ্ট্রজ্ঞানীরা তা চিন্তাও করতে পারে না। তাকে তার যাবতীয় কাজে-কর্মে ইসলামী আইন-বিধানকে অনুসরণ করে চলতে হবে বাধ্যতামূলকভাবে। কোন একটি ক্ষেত্রে বা কোন একটি মুহূর্তেও তাকে জনগণের ব্যাপারে গাফিল হতে দেয় না ইসলাম। বরং প্রতটি মুহূর্তে তাকে এ কাজেই অতিবাহত করতে হবে। তা করলেই ইসলামের দৃষ্টিতে সে যোগ্য শাসক বিবেচিত হতে পারবে। পক্ষান্তরে যে শাসক স্বীয় গদি রক্ষার চিন্তায় দিন-রাত মশগুল থাকে, জনগণের দুঃখ-কষ্ট ও অভাব-অনটন দূর করার জন্য কোন চিন্তা-ভাবনা করে না, কোন বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে না, ইসলামের দৃষ্টিতে সে কোন পর্যায়েরই শাসক হতে পারে না।

টিকাঃ
১. نهج البلاغة - الرسالة رقم ٥٣ ..

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 সরকারের প্রতি জনগণের কর্তব্য

📄 সরকারের প্রতি জনগণের কর্তব্য


উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, ইসলামী সরকার ও প্রশাসন জনগণের সর্বাত্মক কল্যাণ সাধনের কঠিন দায়িত্বে স্বয়ং আল্লাহ্ পক্ষ থেকেই নিযুক্ত হয়ে থাকে এবং এসব দায়িত্ব পালনে তা একান্তই বাধ্য। মানবতাকে পূর্ণত্বের উচ্চতম শিখরে পৌছিয়ে দেয়ার লক্ষ্যেই তাকে এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। অতএব এরূপ একটি ইসলামী সরকার ও প্রশাসন গড়ে তোলা মুসলিম উম্মতের জন্য একান্তই কর্তব্য। এরূপ একটি সরকার গঠনের ব্যাপারে কোনরূপ মতপার্থক্যের সৃষ্টি না করা, তা গড়ে তোলার পর তার সাথে সর্বপ্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং তার প্রতি কোনরূপ বিশ্বাসঘাতকতা না করা জনগণের সেই কর্তব্যেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেনঃ
شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ (الشورى: (۱۳)
হে মুসলমানগণ! আল্লাহ্ তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই বিধানই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যার হুকুম তিনি নূহকে দিয়েছিলেন, আর যা-হে নবী! এখন তোমার প্রতি ওহীর মাধ্যমে পাঠিয়েছি, আর যার হেদায়েত আমরা ইবরাহীম-মূসা-ঈসাকে দিয়েছিলাম এই তাকীদ সহকারে যে, এই দ্বীনকে তোমরা কায়েম কর এবং এ ব্যাপরে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যেও না।

এ আয়াত স্পষ্ট করে বলেছে যে, দ্বীন কায়েম করার নির্দেশ পূর্ববর্তী নূহ-ইবরাহীম-মূসা-ঈসা (আ) প্রমুখ সকল নবী-রাসূলকেই দেয়া হয়েছে। তারই নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ্ হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে। আর এ কাজেরই নির্দেশ দেয়া হয়েছে- হে মুসলমানগণ- তোমাদেরকে।

ইমাম কুরতুবী লিখেছেনঃ
أَي شَرَعَ لَكُمْ إِقَامَةَ الدِّينِ .
হে মুসলিমগণ! তোমাদের জন্য দ্বীন কায়েমের কাজকে বিধিবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। ১
অন্য কথায়ঃ দ্বীনকে কায়েম-প্রতিষ্ঠিত রাখো অর্থাৎ স্থায়ী, ধারাবাহিক-অব্যাহত সুরক্ষিত দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত, কোনরূপ মতপার্থক্য নেই, কোন অস্থিরতা নেই। ২

বস্তুত এ আয়াতটিতে দ্বীন কায়েম করার যে নির্দেশ নবী-রাসূলগণকে দেয়া হয়েছে, তা শুধু দ্বীনের কতিপয় আকীদা-বিশ্বাস ও নৈতিক বিধানের প্রচার দ্বারাই পালিত হয় না, সে জন্য দ্বীন-ইসলামকে চিন্তা-বিশ্বাস মতবাদ-মতাদর্শ, সংস্কৃতি-সভ্যতা, আইন-শাসন রাষ্ট্রীয়ভাবে পূর্ণ মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকর করারই নির্দেশ রয়েছে এবং সেভাবেই তা পালন করতে হবে। এরূপ একটি সরকার গড়ে তোলা, প্রতিষ্ঠিত করা যেমন কর্তব্য, তেমনিভাবে রক্ষা করা ও তার কল্যাণ বিধানে সক্রিয় তৎপরতা অবলম্বন মুসলিম মাত্রেরই কর্তব্য। কেননা উপরোদ্ধৃত আয়াতে اقيموا الدين এর একটি অর্থ যেমন দ্বীন কায়েম কর, তেমনি তার অপর একটি অর্থ হচ্ছে 'দ্বীন কায়েম রাখো'। অর্থাৎ যেখানে তা কায়েম নেই সেখানে তা কায়েম করতে হবে। আর যেখানে তা কায়েম রয়েছে, সেখানে তাকে কায়েম ও প্রতিষ্ঠা রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে। ৩

একটি হাদীসের বর্ণনায় রাসূলে করীম (স)-এর উক্তি উদ্ধৃত হয়েছেঃ
الدين النَّصِيحَةُ
দ্বীন হচ্ছে ঐকান্তিক ও নিস্বার্থ কল্যাণ কামনা।
জিজ্ঞাসা করা হলোঃ কল্যাণ কামনা কার জন্য হে রাসূল? বললেনঃ
তা আল্লাহর জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, রাষ্ট্রনেতাগণের জন্য এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য। ১

হযরত আলী (রা) বলেছেনঃ
اللهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِلْآئِمَةِ وَالجَمَاعَةِ الْمُسْلِمِينَ
রাষ্ট্রনেতার দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো আল্লাহ্ নাযিল করা বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা, তার নিকট সোপর্দ করা আমানতের হক্ আদায় করা। রাষ্ট্রনেতা যদি তা করে তাহলে তার কথা শোনা, তার আনুগত্য করা এবং সে আহ্বান করলে তাতে সাড়া দেয়া জনগণের কর্তব্য। ২

বস্তুত ইসলামী হুকুমাত যদি তার দায়িত্বসমূহ ইসলামী বিধান অনুযায়ী পালন করে এবং মুসলিম জনগণ যদি সরকারের প্রতি তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ যথাযথভাবে পালন করে, তাহলে তথায় সুবিচার ও ন্যায়পরতা পূর্ণ মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হবে, শান্তি ও নিরাপত্তা বিরাজিত হবে, সার্বিক কল্যাণের প্রস্রবণ প্রবাহিত হবে, সমগ্র দেশে সৌভাগ্য ও উন্নতি উৎকর্ষ ক্রমবৃদ্ধিমান হবে। আর তা-তো মানুষের কাম্য অতি স্বাভাবিকভাবে।

টিকাঃ
১. আল জামে' লা-আহকামিল কুরআন ১৬, পৃঃ ১০।
২. ঐ, পৃঃ ১১।
৩. তাফহীমুল কুরআন, আবুল 'আলা মওদুদী, ৫ম খণ্ড পৃঃ ৪৯২।
১. كتاب الاموال ص: ۵۰۹ (হাফেজ আবু উবাইদ সালাম ইবনুল কাসেম রচিত থেকে এসব হাদীস গৃহীত; পৃঃ ১০।)
২. كتاب الاموال ص ۲۰۱۲

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00