📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কারণ

📄 রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কারণ


এতদসত্ত্বেও দু'ধরনের লোক সমাজ-জীবনে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছে। এক, যারা নীতিগতভাবেই রাষ্ট্র-সরকারের পক্ষপাতী নয়। এরা হচ্ছে কার্লমার্ক্স ও তার মতের লোকেরা।
দুই, যারা নিছক মনস্তাত্ত্বিক কারণে তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে না। এরা আবার তিন ভাগে বিভক্ত।

বস্তুত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা মূলত কোন মতবিরোধের বিষয় ছিল না-এ ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টিরও কোন কারণ ছিল না। কেননা পূর্বে যেমন দেখিয়েছি ও প্রমাণ করেছি, মানব জীবনের প্রকৃত সৌভাগ্য, সভ্যতার অগ্রগতি স্থায়িত্ব ও দৃঢ়তা এরই উপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু লোক-সংখ্যায় তারা যত কম-ই হোক-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে একটা বিভীষিকা মনে করে। তার অস্তিত্বকেই ভয় পায় ও তার প্রয়োজনীয়তা মেনে নিতে রাযী হয় না। কেউ কেউ আবার এ-ও বলতে চায় যে, হ্যাঁ, রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা আছে বটে; তবে বিশেষ বিশেষ সময়ে মাত্র। সর্বসময়ে নয়, স্থানীয়ভাবেও নয়। চিরন্তনও নয়।

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 রাষ্ট্রের অপ্রয়োজনীয়তার চারটি মত

📄 রাষ্ট্রের অপ্রয়োজনীয়তার চারটি মত


এ মতের লোক চার ভাগে বিভক্ত।

প্রথম ভাগের লোক, কার্লমার্ক্স ও তার অনুসারীরা। তাদের মধ্যে রাষ্ট্র সরকারের প্রয়োজনীয়তা শুধু ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ সমাজে শ্রেণী-দ্বন্দু ও সংগ্রাম চলতে থাকে। কিন্তু বিভিন্ন শ্রেণীর জনগোষ্ঠীর মধ্যকার অর্থনৈতিক সমস্যাবলী দূরীভূত হয়ে যাবে-প্রকৃত কমিউনিজম যখন প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন কোন রাষ্ট্র বা সরকারের প্রয়োজন নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতার আলোকে এ মতের কোন যৌক্তিকতাই নেই।
কেননা রাষ্ট্র ও সরকারের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা কতগুলি বস্তুগত সমস্যা ও কার্যকারণের উপরই নির্ভরশীল নয়। নিছক অর্থনৈতিক কারণেই তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃতব্য নয়। শ্রেণীগত পার্থক্য দ্বন্দ্ব ও বিরোধ নিঃশেষ করার জন্যই তার প্রয়োজনীয়তা, এমন কথাও যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। শ্রেণী-দ্বন্দু নিঃশেষ হয়ে গেলেই রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাবে, এ কথার সমর্থনে অকাট্য কোন যুক্তিই পেশ করা যেতে পারে না। এসব বস্তুগত কারণ ছাড়াও নৈতিক ও স্বাভাবিক ভাবধারাগত এমন অনেক কারণই আছে, যা মানব-সমষ্টির জন্য রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠাকে একান্তই অপরিহার্য করে তোলে।

দ্বিতীয় ভাগের লোক হচ্ছে তারা, যারা প্রাচীনকালীন নৈরাজ্য ও শাসনহীন অবস্থাকেই পছন্দ করে নিজেদের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে। কেউ তাদের উপর শাসনকার্য চালাক, তাদের তৎপরতা ও কাজকর্মের উপর কোনরূপ বিধি-নিষেধ বা নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হোক, তা তারা আদৌ পছন্দ করে না। শুধু তাই নয়, তা তারা রীতিমত ভয় পায়। কেননা তাতে পাকড়াও হওয়ার কারণ ঘটে, নানা প্রকারের শাস্তি ও দণ্ড ভোগ করতে বাধ্য হওয়ার মত অবস্থাও দেখা দিতে পারে। এ কারণে তারা রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধতা করে, যেমন তাদের মনে যখন যা করার ইচ্ছা জাগবে তাই করার তারা অবাধ ও নির্বিঘ্ন সুযোগ পেয়ে যেতে পারে। কেউ যেন তাদের নিকট কোন কাজের জন্য কৈফিয়ত চাইতে না পারে, কেউ তাদেরকে কোন কাজের জন্য শাস্তি দিতে না পারে। তারা নিজেদের ইচ্ছামত বা কল্যাণ চিন্তায় যা-ই করবে বা করতে চাইবে, তার পথে যেন কোন প্রতিবন্ধকতা দেখা না দেয়। তাদের জোর-প্রয়োগ ও ছিনতাই কাজে কেউ বাধা দিতে না পারে।

তৃতীয় হচ্ছে সেই জনগোষ্ঠী, যারা রাষ্ট্র-সরকারের নিকট থেকে কেবল শাসন ও শোষণ, রুঢ়তা, নির্যাতন-নিষ্পেষণ, স্বৈরতান্ত্রিকতা ও শক্তিমানদের পক্ষপাতিত্বই দেখতে পেয়েছে চিরকাল। যা সকল কালের দুর্বলদের উপর চরম অত্যাচারই চালিয়েছে, তাদের- এমনকি-মৌলিক মানবিক অধিকারও হরণ করেছে, তাদের তাজা-তপ্ত রক্ত নির্মমভাবে শুষে নিয়েছে, তাদের কল্যাণের সকল পথ ও উপায় সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে, তাদের মানবিক মর্যাদাটুকুকেও পদদলিত ও ধুলি-লুণ্ঠিত করেছে।
এসব লোকের সম্মুখে রাষ্ট্র ও সরকারের নাম উচ্চারণ করলেই তারা সেই বিভীষিকায় সন্ত্রস্ত ও কম্পিত হয়ে উঠে, বিচার ও শাসনের নামে সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন ও নির্যাতনে ভরপুর কারাগারের কথা স্মরণ করে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠে, যা তারা সর্বত্র দাঁড়িয়ে থাকতে ও তাদেরকে গ্রাস করার জন্য মুখ ব্যাদান করে থাকতে দেখতে পায়। এ কারণে তারা রাষ্ট্র ব্যবস্থা সরকার-প্রশাসনকে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে। তার নাম শুনতেও তারা প্রস্তুত নয়। তা না থাকলে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হোক, তা তারা চায় না, বরং সবচাইতে বেশী আতংকিত হয়ে উঠে। জুলুম, স্বৈরতন্ত্র ও নির্মমতা কোন্ মানুষ-ই বা পছন্দ করতে পারে!

তবে সেই সাথে এ কথাও সত্য যে, এই লোকদেরকে যদি ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকারের মানবিক কল্যাণময় আদর্শের কথা, জনগণের অব্যাহত খেদমতের কথা সাধারণ মানুষের প্রয়োজনপূর্ণ ন্যায়পরতা সহকারে পুরিপূরণ করার, নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের মধ্যে ইনসাফ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার কথা যখন বলা হবে, তখন এই লোকেরা হয়ত এমন এক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উক্তরূপ নেতিবাচক মনোভাব গ্রহণ করতে পারবে না। বরং তারা ঐকান্তিক আগ্রহ সহকারে সেরূপ একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দেবে এবং সেজন্য চেষ্টা-সাধনা ও সংগ্রাম করতে কিছু মাত্র নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতে পারবে না।

চতুর্থ হচ্ছে সেসব লোক, যারা নিরংকুশ ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষপাতী, যারা সে স্বাধীনতা কোন সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ হোক, কোন প্রশাসন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও সংকুচিত হোক, তা চায় না। এরা মনে করে রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং ব্যক্তি-স্বাধীনতা- এ দুটি পরস্পর বিরোধী-একটি ক্ষেত্র। এ দুটি কখনই একত্রিত হতে পারে না। কেননা রাষ্ট্র ও সরকার ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত ও সংকুচিত করবে, তাতে তাদের কোনই সন্দেহ নেই।

স্পষ্ট মনে হচ্ছে, মানুষের উপযোগী ব্যক্তি-স্বাধীনতা-মানুষের জন্য যা একান্তই প্রয়োজন-আর বন্য স্বাধীনতা এ দুটিকে এই লোকেরা এক করে দেখেছে। এই দুটির মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, হয় তারা তা বুঝে না বা বুঝতে চায় না অথবা তারা বুঝে-শুনেই সে পার্থক্যের কথা স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়।

বন্য স্বাধীনতা বলতে বোঝায় যেখানে কোন বিবেকসম্মত নিয়ম-নীতিরও নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। সকলের অধিকার রক্ষার জন্য কোন আইনের বালাই থাকবে না। মানুষের মর্যাদা রক্ষার জন্য কোন সীমাই চিহ্নিত হবে না। বনে-জঙ্গলে যেমন পশুকূল যা-ইচ্ছা তাই করে-করতে পারে, যার শক্তি অন্যদের তুলনায় বেশী, তারই কর্তৃত্ব স্বীকৃত, অন্য কথায় Might is Right-এর নীতি, যার আক্রমণের ক্ষমতা বেশী, যে অন্যদের অপেক্ষা বেশী জোরে হুংকার চালাতে পারে, দাপট দেখাতে পারে, রোষ ও আক্রোশ প্রকাশ করতে পারে, অন্যান্য সবাই তার ভয়তেই কম্পমান।

কিন্তু এ স্বাধীনতা বনে-জঙ্গলে থাকলেও-সেখানে শোভা পেলেও-মানব সমাজে তা কখনই শোভন হতে পারে না-বাঞ্ছনীয়ও নয়। মানুষের জন্য যে স্বাধীনতা কাম্য তা অবশ্যই আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। সে জন্য সচেতনভাবে গৃহীত কিছু নিয়ম-নীতি থাকতে হবে। এমন কিছু মৌল মূল্যমান (Values) থাকতে হবে, যা মানুষের মধ্যে নিহিত স্বাভাবিক শক্তি ও প্রতিভার বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি সাধন করবে। মানবীয় গুণ-গরিমা পূর্ণত্বপ্রাপ্ত হবে ও নির্ভুল কল্যাণময় দিকে পরিচালিত হবে। সম্ভাব্য সম্পূর্ণতা কোন দিকেই কারোর নাগালের বাইরে থাকবে না। এরূপ এক স্বাধীনতা, বিবেকসম্মত ও যুক্তিসম্মত নিয়ম-নীতি ভিত্তিক হওয়া ছাড়া পাওয়ার কল্পনাও করা যায় না।

অন্য কথায়, মানুষের জন্য নির্ভুল ও শোভন স্বাধীনতা তাই হতে পারে, যার দরুন ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে নিহিত স্বাভাবিক যোগ্যতা কর্মক্ষমতা বিকাশ লাভের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও আনুকূল্য পাবে। তাহলেই তা স্বাভাবিকতার পর্যায় থেকে বাস্তবতার পর্যায়ে উন্নীত হতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত তা পূর্ণত্বের মাত্রায় পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাব্য পথ নির্দেশ লাভ করতে পারবে।

কিন্তু এই বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি লাভ অরাজক পরিবেশে পাওয়া যেতে পারে না। সেজন্য কিছু শর্ত ও সীমা একান্তই অপরিহার্য। উপযুক্ত কতিপয় নিয়ম-নীতিই সেই শর্তের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। তার বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি নিষিদ্ধ করবে বা তার পথ বন্ধ করে দেবে, এমন কথা তো নয়।

প্রকৃত ও শোভন ব্যক্তি-স্বাধীনতা হচ্ছে, মানুষ একটি বিশ্বাস গ্রহণ করবে, তার কর্মের মাধ্যমে সে বিশ্বাসকে বাস্তবায়িত করার অবাধ সুযোগ পাবে। তাও হবে তখন যখন ব্যক্তি অজ্ঞাত-মুর্খতার অন্ধকার থেকে বের হয়ে নির্ভুল জ্ঞান ও সমঝ-বুঝের আলোকোজ্জ্বল পরিবেশের মধ্যে এসে যেতে পারবে। তাহলেই সে স্বীয় বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করে একদিকে স্বীয় বিশ্বাসকে সত্যতা, যথার্থতা ও একনিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারবে, আর সেই সাথে তার স্বভাবগত কর্মপ্রতিভা ও দক্ষতাকে বিকশিত ও প্রবৃদ্ধ করতে সমর্থ হবে। আর মানুষ যে এভাবেই পূর্ণত্ব অর্জন করতে পারে, পারে জীবনের সার্থকতা লাভ করতে, তাতে কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না। বস্তুত মানুষের জন্য এই স্বাধীনতাই কাম্য।

তবে মানব সমাজের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, অন্ধ জাতীয়তাবোধ প্রসূত রাষ্ট্র সরকার উপরে বর্ণিত শোভন স্বাধীনতাকে পর্যুদস্ত করে। যুক্তিসঙ্গত ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে কঠিনভাবে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখে। কিন্তু ইসলাম উপস্থাপিত রাষ্ট্র-সরকার কখনই তা করে না। ইসলামী সরকার বা তার প্রশাসক জনগণের উপর কেবলমাত্র সে সব আদেশ-নিষেধই কার্যত করে, যা মানুষ ও বিশ্বলোকের মহান স্রষ্টা মানুষের সার্বিক কল্যাণের দৃষ্টিতেই নাযিল করেছেন। সে সরকার বা প্রশাসক নিজ ইচ্ছামত কোন কাজের আদেশও করে না, কোন কাজ করতে নিষেধাজ্ঞাও জারি করে না। তা করার অধিকার সেখানে কাউকেই দেয়া হয় না। আর আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ সামগ্রিকভাবে গোটা মানবতার জন্যই কল্যাণকর, তা যে মানুষের পূর্ণত্ব বিধান করে, মানুষের স্বভাব নিহিত প্রতিভা ও কর্মক্ষমতাকে বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি দান করে, মানুষের জন্য সার্বিকভাবে যাবতীয় অকল্যাণ ও ক্ষতির প্রতিরোধ করে ও মানুষকে উত্তরোত্তর উন্নতির দিকে নিয়ে যায়, তাতে কারোর কি একবিন্দু সংশয় থাকতে পারে?

বস্তুত, ইসলাম মানুষের জন্য রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা উদাত্ত কণ্ঠে প্রকাশ করেছে, কিন্তু সে রাষ্ট্র ও সরকার নিশ্চয়ই তা নয় যার কিছুটা আভাষ এই মাত্র দেয়া হলো। ইসলাম উপস্থাপিত রাষ্ট্র ও সরকারের কিছু রূপরেখা কুরআন মজীদের আয়াতের ভিত্তিতে এখানে পেশ করা হচ্ছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00