📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় রাসূলে করীম (স)-এর তৎপরতা

📄 ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় রাসূলে করীম (স)-এর তৎপরতা


মক্কায় নবুয়‍্যাত লাভের পরবর্তীকালে তাঁর দাওয়াত প্রকাশ্যভাবে লোকদের নিকট পৌঁছাবার জন্য আদিষ্ট না হওয়া কালে-বলা যায়-একটি গোপন দল গড়ে তুলেছিলেন (অনেকেই হয়ত এ ব্যাখ্যা পছন্দ করবেন না)। তখন তিনি তাঁর উপস্থাপিত আদর্শের ভিত্তিতে আদর্শবাদী ব্যক্তি গঠনের কাজ সমাধা করেছেন। সেই পর্যায়ে ঈমান গ্রহণকারী লোকদের পরস্পরে গভীর যোগাযোগ ও অত্যন্ত প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। অত্যন্ত গোপনে তাদের পরস্পরে দেখা-সাক্ষাৎ ও ইসলামী জ্ঞান শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। আরকাম (রা)-এর ঘরই ছিল সেই সময়ের গোপন মিলনকেন্দ্র।

পরে তাঁর প্রতি যখন (فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ) (الحجر : ٩٤) 'তোমাকে যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে তা তুমি চতুর্দিকে ব্যাপকভাবে প্রচার করে দাও', নাযিল হল, তখন তিনি বিভিন্ন গোত্রপ্রধান ও মক্কায় বাইরে থেকে আগত বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের সরদারকে আহবান জানালেন দ্বীন-ইসলাম কবুল করার জন্য এবং তার গঠিত দলে শমিল হয়ে যাওয়ার জন্য। তিনি ঘোষিত আল্লাহর হুকুমাত কায়েম করার লক্ষ্যে নানা দিক থেকে মক্কায় আসা কোন কোন প্রতিনিধি দলের বায়'আত গ্রহণ করলেন এবং তাঁর এই মহান লক্ষ্যে তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসার আহ্বান জানালেন। এভাবে আকাবা'র প্রথম ও দ্বিতীয় 'বায়'আত' সম্পন্ন হয়। ১

পরে তিনি মদীনায় হিজরাত করে গেলেন। সেখানে স্বাধীন-উন্মুক্ত পরিবেশে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেন। প্রথমে তিনি মুহাজির ও আনসার-এর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করেন। তা-ই ছিল ইসলামী সমাজ-সংস্থার প্রথম প্রতিষ্ঠা। আর মসজিদ কায়েম করলেন মুসলিম উম্মতের একত্রিত হওয়ার কেন্দ্র হিসেবে। এই মসজিদে যেমন জামা'আতের সাথে সালাত কায়েম করা হতো, তেমনি ইসলামী সমাজ রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজ আঞ্জাম দেয়া হত।

এতদ্ব্যতীত তিনি একটি ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে করণীয় অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজও সম্পন্ন করেন। এখানে দৃষ্টান্তস্বরূপ কয়েকটি বড় বড় কাজের উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ

১. তিনি তাঁর সাহাবী ও মদীনায় বসবাসকারী ইয়াহুদী প্রভৃতি গোত্র বা জনগোষ্ঠীর সাথে একত্বের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ইতিহাসে তা-ই ইসলামী হুকুমাতের 'প্রথম লিখিত সংবিধান' নামে পরিচিত ও খ্যাত। (এ সংবিধানের ধারাসমূহ পরে উল্লেখ করা হবে।)

২. তিনি এ মসজিদ থেকেই সেনাবাহিনী ও সামরিক গোষ্ঠী উপদ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় প্রেরণ করেছেন। তিনি মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত করেছেন এবং কার্যত তা করেছেনও। তিনি রোমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। শত্রুদের ভীত-সন্ত্রস্ত করার নানা পন্থা অবলম্বন করেছেন। ঐতিহাসিকগণের হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে যে, রাসূলে করীম (স) তাঁর মদীনীয় জিন্দেগীর দশটি বছরে আশিটি যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন।

৩. মদীনায় স্থিতি লাভ এবং মক্কার দিক থেকে আক্রমণের ভয় তিরোহিত হলে উপদ্বীপের বাইরের দিকে লক্ষ্য নিবদ্ধ করেছেন। যে যে এলাকায় দাওয়াত তখন পর্যন্ত পৌছেনি, সেই সব এলাকায় দ্বীনের তওহীদী দাওয়াত পৌছাবার ব্যবস্থা করলেন। এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন, যার ফলে নিকট ও দূরের সকল লোকের নিকট এই দাওয়াত পৌছে যায়। তিনি বিভিন্ন গোত্রপতি, রাষ্ট্রপ্রধান ও শাসকদের নিকট সরাসরি পত্র পাঠিয়ে তওহীদী দাওয়াত কবুলের বলিষ্ঠ আহবান জানালেন। তাঁর এ প্রতিষ্ঠিত হুকুমাতে ইলাহীয়ার অধীন শামিল হওয়ার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে দিলেন।

তিনি পত্র পাঠালেন রোমান সম্রাট কাইজারের নিকট।
মিসরের কিবতী প্রধান মুকাউকাসের নিকট।
হাবশার বাদশাহ নাজাশীর নিকট।
এ ছাড়া সিরিয়া ও ইয়ামনের বড় বড় নেতা ও রাজন্যবর্গের নিকট, গোত্রপতি ও রাজা-বাদশাহদের নিকটও অনুরূপ পত্র পাঠালেন।
তাদের অনেকের সাথে চুক্তি সম্পাদিত হলো, সামরিক ও রাজনৈতিক মৈত্রী স্থাপিত হলো, অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়ীক আদান প্রদানের ব্যবস্থা সাব্যস্ত করা হলো।

আজদ ও আম্মানের রাজার নামে লিখিত পত্রে তিনি যা লিখেছিলেন, তা এখানে উদ্ধৃত করা হচ্ছেঃ
بسم الله الرّحمنِ الرَّحِيمِ سَلاءٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى، أَمَّا بَعْدُ، فَإِنِّي أَدْعُوكُمْ بدعاية الإسلام أَسْلِمَا تَسْلِيمًا ، إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَى النَّاسِ كَافَّةً لَا نَذِرَ مَنْ كَانَ حَبًّا، وَيُحِقُّ الْقَوْلُ عَلَى الْكَفِرِينَ ، إِنَّكُمَا إِنْ أَقْرَرْتُمَا بِالْإِسْلَاءِ وَلَيْتَكُمَا وَإِنْ ابْنَتَهَا أَنْ تَقِرَّ بِالْإِسْلَام فَإِنَّ مُلْكَكُمَا رَائِلٌ عَنْكُما وخيلي تَحِلَّ بِسَاحَتِكُمَا وَتَظْهَرُ نَبُوتِي عَلَى مَلَكِكُما .
মহা দয়াময় ও অসীম করুণাশীল আল্লাহর নামে। শান্তি বর্ষিত হোক তার উপর, যে ইসলামের হেদায়েতকে অনুসরণ করেছে। অতঃপর আমি তোমাদেরকে ইসলামের আহবান অনুযায়ী আহবান করছি। তোমরা দু'জন ইসলাম কবুল কর, তাহলে দু'জনই রক্ষা পেয়ে যাবে। আমি সমগ্র মানবতার প্রতি আল্লাহর রাসূল, যেন আমি সব জীবনধারী মানুষকেই পরকাল সম্পর্কে সতর্ক করতে পারি এবং কাফিরদের সম্পর্কে চূড়ান্ত কথা তাদের উপর বাস্তবায়িত হয়। তোমরা দু'জন যদি ইসলামকে স্বীকার করে নাও তাহলে আমিই তোমাদেরকে ক্ষমতাসীন করে দেব, আর তোমরা যদি ইসলামকে মেনে নিতেই অস্বীকার কর, তাহলে তোমাদের দু'জনের রাজত্ব তোমাদের হাত থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। আর আমার অশ্ব তোমাদের দু'জনার আঙ্গিনায় উপস্থিত হবে ও দখল করে নেবে এবং তোমাদের দু'জনার দেশের উপর আমার নবুয়‍্যাত প্রকাশিত, বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। ২

আরব উপদ্বীপেরই এক অঞ্চলের শাসক রাফা'আত ইবনে জায়দ আল-জুজামীকে লিখিত পত্রে এইরূপ লেখা হয়েছিলঃ
بسم الله الرحمن الرحيم، هذا كتاب من محمد رسول الله الرفاعة بن زيد، اني قد بعثة الى قومه عامة ومن دخل فيهم يدعوهم الى الله ورسوله فمن اقبل منهم ففى حزب الله وحزب رسول و من دابر فله امان شهرین -
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে রাফা'আ ইবনে জায়দের প্রতি! আমি সেই ব্যক্তি, যাকে সাধারণভাবে তার সমস্ত জনগণের প্রতি প্রেরিত হয়েছে, তাদের প্রতিও যারা তাদের মধ্যে শামিল হবে। তিনি তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি আহবান জানাচ্ছেন। লোকদের মধ্য থেকে যারাই সে দাওয়াত কবুল করবে, সে আল্লাহ্ দল ও রাসূলের দলের মধ্যে গণ্য হবে। আর যে তা গ্রহণ করতে পশ্চাদপদ হবে, তার জন্য মাত্র দুই মাসের নিরাপত্তা। ৩

নাজরান-এর বিশপের নিকট প্রেরিত পত্রে লিখিত হয়েছিলঃ
بسم الله ابراهيم واسحاق ويعقوب من محمد النبى رسول الله إلى اسقف نجران اسلم انتم اى انتم سالمون اذا اسلمتم فاني احمد الله اليكم اله ابراهيم واسحاق ويعقوب . اما بعد فاني ادعوكم الى عبادة الله من عبادة العباد وادعوكم الى ولاية الله من ولاية العباد فان ابيتم فالجزية وان ابيتم اذدتكم بحرب والسلام -
ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের আল্লাহ্ নামে- আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের নিকট থেকে নাজরানের বিশপের নিকট এই পত্র প্রেরিত হল। তোমরা ইসলাম গ্রহণ করে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ কর। আমি আল্লাহ্ হাম্দ করছি তোমাদের নিকট, যিনি ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের ইলাহ্। অতঃপর, আমি বান্দাদের দাসত্ব পরিহার করে আল্লাহ্ দাসত্ব কবুল করার জন্য তোমাদেরকে আহবান জানাচ্ছি। তোমাদেরকে আহবান জানাচ্ছি বান্দাদের বন্ধুত্ব-কর্তৃত্ব-পৃষ্ঠপোষকতা পরিহার করে আল্লাহ্র বন্ধুত্ব-কর্তৃত্ব-পৃষ্ঠপোষকতা মেনে নেয়ার জন্য। তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে তোমাদেরকে জিযিয়া দিতে রাযী হতে হবে। আর তা দিতেও অস্বীকার করলে আমি তোমাদেরকে যুদ্ধের আগাম জানান দিচ্ছি..... শান্তি.....।

৪. রাসূলে করীম (স) রাষ্ট্রীয় দূত ও রাজনৈতিক প্রতিনিধি দল বিভিন্ন রাজা-বাদশাহদের ও বড় বড় রাজন্যবর্গের নিকট পাঠিয়েছেন। এ পর্যায়ে ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেনঃ
এভাবে দূত পাঠানো ও চিঠিপত্র প্রেরণ তদানীন্তন সময়ের প্রেক্ষিতে এক সম্পূর্ণ অভিনব কূটনৈতিক কার্যক্রম ছিল। বরং সত্য কথা হচ্ছে ইসলামই এ ক্ষেত্রে এরূপ কার্যক্রম সর্বপ্রথম শুরু করেছে।
রাসূলে করীম (স) তাঁর সময়ের বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ-শাসক ও রাজন্যবর্গের প্রতি এই বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ কূটনৈতিক কার্যক্রম সর্বতোভাবে নিষ্ফল যায়নি, যেমন আমরা দেখতে পাচ্ছি। ৪

৫. রাসূলে করীম (স) বিচারপতি নিয়োজিত করেছিলেন, বিভিন্ন এলাকায় শাসক নিয়োগ করেছিলেন। তিনি তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক ও পলিসিগত কার্যসূচীও প্রদান করেছিলেন। তাদেরকে ইসলামী বিধান ও আইন-কানুনের ব্যাপক শিক্ষাদান করেছিলেন। ইসলাম উপস্থাপিত নৈতিক আদর্শ ও রীতিনীতি সম্পর্কে-যা কুরআনের মৌল শিক্ষা-তাদেরকে পূর্ণ মাত্রায় অবহিত করেছিলেন। যাকাত ও অন্যান্য সরকারী করসমূহ আদায় করা ও তা পাওয়ার যোগ্য অধিকারী লোকদের মধ্যে যথাযথ বন্টনের নিয়মাদি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল করে তুলেছিলেন। এক কথায় যাবতীয় জনকল্যাণমূলক কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজ নিজ দায়িত্বে বসিয়েছিলেন। লোকদের মধ্যে বিবাদ মীমাংসার, তাদের যাবতীয় সমস্যার সমাধানের এবং জুলুম ও সীমালংঘনমূলক কার্যক্রমের বিচার পদ্ধতি শিক্ষাদান করেছিলেন।

এ পর্যায়ে চূড়ান্ত কথা হচ্ছে, আধুনিক কালের রাষ্ট্রনেতা ও শাসন-কর্তৃপক্ষকে প্রতিষ্ঠানগতভাবে যে যে কাজ করতে হয়, নবী করীম (স) সেই সব কাজই করেছেন। কিন্তু তা তিনি করেছেন নিজের ইচ্ছা মত নয়, বরং আল্লাহ তা'আলার হেদায়েত ও নির্দেশ অনুযায়ী। তিনি যেমন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ করতেন, প্রয়োজনে পদচ্যুতও করতেন। বিভিন্ন লোকদের নিটক পত্র প্রেরণও করতেন। চুক্তি স্বাক্ষর করতেন। রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর ও সীলমোহরও লাগাতেন। এই সব কাজই তিনি সম্পন্ন করতেন ইসলামী কল্যাণের দৃষ্টিতে, সামষ্টিক কল্যাণের জন্য এবং রাষ্ট্রশক্তির বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

কুরআন মজীদের সূরা আল-আনফাল, আত-তওবা ও সূরা মুহাম্মাদ গভীর সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে অধ্যয়ন করলেই লক্ষ্য করা যায়, তাতে ইসলামী হুকুমাতের রাজনৈতিক কর্মধারা ও কার্যসূচী, দায়িত্ব, কর্তব্য ইত্যাদির মৌল নীতিসমূহ উপস্থাপিত হয়েছে। সূরা আল-মায়েদায়ও এ পর্যায়ের বহু বিধান সন্নিবেশিত হয়েছে। অনৈসলামী সমাজ-সমষ্টির সাথে কার্যক্রমের নীতি, জিহাদ, প্রতিরক্ষা ও ইসলামী ঐক্য একত্ব রক্ষার যাবতীয় বিধান বলে দেয়া হয়েছে। কেননা একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য এসব বিধান একান্তই অপরিহার্য। কুরআন মজীদে ইসলামী রাষ্ট্র সংক্রান্ত সকল প্রয়োজনীয় বিধান দেয়া হয়েছে, কুরআনের একনিষ্ঠ কোন পাঠকই তা অস্বীকার করতে পারবেন না। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলে করীম (স)-ই হচ্ছেন প্রথম ইসলামী হুকুমাতের প্রতিষ্ঠাতা। আর তিনি যে রাষ্ট্র ও হুকুমাতের ব্যবস্থা কার্যকর করেছিলেন, তা যেমন সর্বোত্তম, তেমনি তা-ই দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ রাষ্ট্র ব্যবস্থা।

একালে রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনেক রূপান্তর ঘটেছে, তার মূল কান্ড থেকে অনেক নতুন শাখা-প্রশাখাও উদ্ভাবিত হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। অনেক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ নতুন গড়ে উঠেছে। কিন্তু রাসূলে করীম (স) প্রতিষ্ঠিত সরকারযন্ত্র ও প্রতিষ্ঠান আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থারই প্রতিভূ, তা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। সেই সময়ের প্রয়োজনের দৃষ্টিতে কোন ক্ষেত্রেই একবিন্দু কমতি ছিল না তাতে।

টিকাঃ
১. السيرة النبوية ج : ١ ص : ٤٣١ .
২. السيرة الحلبية ج ۳، ص ٢٨٤ ، المواهب الدنية ج ۲، ص: ٤٤٠ ، مكاتب الرسول ص: ١٤٧
৩. السيرة الدخلية على هاش السيرة الحلبية ج: ۲، ص: ۱۳۱
৪. مواقف حاسمة في تاريخ الاسلام ص ۲۰۸ ۵۰

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ইসলামেরই ঐকান্তিক দাবি

📄 রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ইসলামেরই ঐকান্তিক দাবি


এই সব কথা নবী জীবন-চরিত ছাড়াও সীরাতে ইবনে হিশাম, তারীখে তাবারী, জজরীর তারীখুল কামিল, সূফীদের আল-ইরশাদ ও আরবেলীর কাশফুল গুম্মাহ প্রভৃতি প্রাচীন ও আধুনিক কালে লিখিত ইতিহাস গ্রন্থ থেকে নিঃসন্দেহে জানা যায়।

এছাড়া মূল দ্বীন-ইসলামের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করলেও জানা যায় যে, ইসলামের মৌল বিধান ও নিয়ম-পদ্ধতি এই ধরনেরই এক পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। অন্যথায় তা কখনই বাস্তবায়িত হতে পারে না। দুটি দিক দিয়ে তার বিবেচনা করা চলেঃ

প্রথমঃ ইসলাম কুরআন-সুন্নাতের অকাট্য দলীলের ভিত্তিতে ইসলামের অনুসারী ও বিশ্বাসীদের ঐক্য ও একাত্মতা একান্তই অপরিহার্য বলে ঘোষণা করেছে। তাদের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন, পরস্পর সম্পর্কহীন ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যাওয়া ও পরস্পর মতপার্থক্যে লিপ্ত হওয়ার থেকে অত্যন্ত বলিষ্ঠতা সহকারে নিষেধ করেছে। ফলে ইসলাম সম্পর্কে একথা সকলেরই জানা হয়ে আছে যে, ইসলামের ভিত্তি দুটি কালেমার উপর প্রতিষ্ঠিতঃ তওহীদের কালেমা (ঐক্যের বাণী) ও কালেমা'র তওহীদ (বানীর একতা)। কুরআন মজীদ উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেঃ
وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ ذلِكُمْ وَصكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ (الانعام: ١٥٣)
জেনে রাখবে, এটাই আমার সুদৃঢ় ঋজু পথ। অতএব তোমরা সকলে এ পথ অনুসরণ করেই চলতে থাক। নানা পথ (তোমাদের সম্মুখে উন্মুক্ত; কিন্তু) তোমরা তা অনুসরণ করো না। করতে গেলে সে পথসমূহ তোমাদেরকে এই সঠিক দৃঢ় পথকে বিচ্ছিন্ন করে বিভিন্ন দিকে নিয়ে যাবে। আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর প্রদর্শিত পথ-ই অনুসরণ করবার নির্দেশ দিয়েছেন এই আশায় যে, তোমরা সেই বিভিন্ন পথ থেকে বাঁচতে পারবে।

বলেছেনঃ
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءُ فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا (ال عمران: ۱۰۳)
তোমরা সকলে মিলিত হয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধর আল্লাহর রজ্জু এবং তোমরা পরস্পর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হবে না। আর তোমরা সকলে তোমাদের প্রতি আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ কর, তোমরা যখন পরস্পরের শত্রু ছিলে তখন আল্লাহ-ই তোমাদের দিনগুলিকে পরস্পর মিলিত ও প্রীতিপূর্ণ করে দিয়েছিলেন। ফলে তোমরা তাঁরই মহা অনুগ্রহে পরস্পর ভাই হয়ে গিয়েছিলে।

বলেছেনঃ
وَالفَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ لَوْ أَنْفَقْتَ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مَّا الفَتَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ الف بينهم . إنه عَزِيزٌ حَكِيمٌ (الانفال : ٦٣)
আর আল্লাহই তাদের দিলসমূহের মধ্যে বন্ধুত্ব-প্রীতির সৃষ্টি করে দিয়েছেন। হে নবী! তুমি যদি দুনিয়ার সব কিছু ব্যয়ও কর, তবু তাদের দিলসমূহের মধ্যে সেই মিল ও প্রীতি সৃষ্টি করতে পারবে না, কিন্তু আল্লাহ্ তাদের মধ্যে সেই প্রীতি-বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছেন। বস্তুত তিনিই সর্বজয়ী মহাশক্তিমান সুবিজ্ঞানী।

এসব আয়াতে দুটি কথা স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে। একটি এই যে, মুসলমানরা পূর্বে পরস্পর ঐক্যবদ্ধ ও প্রীতি-বন্ধুত্ব সম্পন্ন ছিল না, আল্লাহ্ তা'আলাই তা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহ্ তা'আলার সর্বশেষ অনুগ্রহ ছাড়া আর কিছুই নয়।

আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আল্লাহ মুসলমানদের দিলে এই প্রেম-প্রীতি বন্ধুত্ব জাগিয়ে দিয়েছেন তাঁর বিধানের ভিত্তিতে। এই বিধানের প্রতি সকলের গভীর ঈমান গ্রহণের ফলেই তা সম্ভবপর হয়েছে। তা কোন বস্তুগত জিনিসের বা অর্থ সম্পদ ব্যয়ের ফলে হয়নি। সারা দুনিয়ার সকল সম্পদ ব্যয় করেও নবী (স) নিজে তা সৃষ্টি করতে পারতেন না। আল্লাহর সে বিধান হচ্ছে তওহীদের বিধান। আর তা-ই ইসলামের সারকথা-তা-ই ইসলামের চরম লক্ষ্য।

এক কথায় ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে মুসলিম উম্মতের ঐক্য ও একাত্মতা।

এ কথারই ব্যাখ্যা করে নবী করীম (স) নিজের ভাষায় বলেছেনঃ مَثَلُ الْمُؤْمِنِ مِنَ الْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ الْمَرْصُوصِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا . (المسند : ج ٤ ، اصحاب الصحاح والسنن)
একজন মু'মিনের সাথে অপর মু'মিনের সম্পর্কের দৃষ্টান্ত হচ্ছে সীসাঢালা সুদৃঢ় প্রাচীরের মত। একজন অপর জনকে শক্ত ও দৃঢ় করে। ১

মুসলমানদের এ ঐক্যবদ্ধ সামষ্টিক জীবন দুর্গের ন্যায় সুরক্ষিত রাখা আবশ্যক। সেই দিকে লক্ষ্য রেখে রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ مَنْ أَتَاكُمْ وَأَمْرُكُمْ جَمِيعٌ عَلَى رَجُلٍ وَاحِدٍ يُرِيدُ أَنْ يَشُقَّ عَصَاكُمْ أَوْ يُفَرِّقَ جَمَاعَتَكُمْ فَاقْتُلُوهُ (مسلم)
তোমরা যখন এক ব্যক্তির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ, তখন যদি কোন লোক তোমাদের অসিকে চূর্ণ করতে কিংবা তোমাদের সংঘবদ্ধতাকে ছিন্ন ভিন্ন করতে চেষ্টিত হয়, তাহলে তোমরা সকলে মিলে তাকে হত্যা কর।

কুরআন ও হাদীস-ইসলামের এই মৌল উৎস উম্মতে মুসলিমার যে ঐক্য ও একাত্মতার বলিষ্ঠ তাকীদ করছে, নিজেদের মধ্যে পূর্ণ শৃঙ্খলাবদ্ধতা ও গভীর একাত্মতা সৃষ্টি করার জোর তাকীদ জানাচ্ছে, কোনক্রমেই প্রতিষ্ঠিত ঐক্য ও একাত্মতা চূর্ণ করতে বা চূর্ণ করার সুযোগ দিতেও নিষেধ করা হয়েছে। এমনকি কোন লোক সেই ঐক্যকে চূর্ণ করার চেষ্টা করলে তাকে সকলে মিলে হত্যা করতে পর্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তা বাস্তবে কি করে সম্ভব হতে পারে? সকলেই স্বীকার করবেন যে, তা সম্ভব হতে পারে কেবলমাত্র ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে। অন্যথায় এ কাজ কখনই বাস্তবে সম্ভব হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব বিভিন্ন লোকের মধ্যে মতের ঐক্য সৃষ্টি করা ইসলামী আদর্শ সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে। ইসলামী রাষ্ট্রই পারে সকল নাগরিকের সমান মানের কল্যাণ বিধানের মাধ্যমে তাদের মধ্যে পরম একাত্মতা সৃষ্টি করতে, পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা করতে, বিভ্রান্ত ও বিচ্ছিন্নতাকারীকে ঐক্যের দিকে ফিরিয়ে আনতে ও পুনরায় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করতে। মোটকথা, রাষ্ট্রই হচ্ছে ঐক্য সৃষ্টিকারী, ঐক্য রক্ষাকারী, ঐক্য বিরোধী তৎপরতা প্রতিরোধকারী, পারস্পরিক মতবিরোধ ও পার্থক্য বিদূরণকারী।

দ্বিতীয়ঃ নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায্য প্রাপ্য পর্যায়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ইসলামের আইন-বিধানসমূহ অধ্যয়ন ও পর্যালোচনা করলেও বোঝা যায় যে, এ সবের প্রকৃতিই একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থার দাবিদার। ইসলাম জিহাদের আহবান জানিয়েছে, প্রতিরক্ষার পূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণের স্পষ্ট বলিষ্ঠ নির্দেশ দিয়েছে, হদ্দসমূহ কার্যকর করার হুকুম দিয়েছে, অপরাধের শাস্তি বিধান করেছে ও তা প্রয়োজন অনুযায়ী প্রয়োগ করার হুকুম দিয়েছে অপরাধীদের উপর, মজলুমের প্রতি ইনসাফ করার আহবান জানিয়েছে, জালিমকে প্রতিরোধ করতে বলেছে এবং অর্থ ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বিধানও উপস্থাপিত করেছে। এ সবের প্রতি লক্ষ্য দিলে এতে আর কোনই সংশয় থাকতে পারে না যে, আল্লাহ তা'আলা এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করতে বলেছেন, যা এই সব আইন-বিধান-নির্দেশ পুরাপুরি ও যথাযথভাবে কার্যকর করবে। কেননা ইসলাম তো অন্তঃসারশূন্য দোয়া-তাবিজ বা দাবি-দাওয়ার ধর্ম নয়। বিউগল বাজানো বা নিছক ব্যক্তিগতভাবে পালনীয় কতগুলি সওয়াব কামাই করার বিধান নয়। ব্যক্তির ব্যক্তিগতভাবে নিজের ঘরে বা উপাসনালয়ে পালন করার কোন ধর্ম নয়। ইসলাম তো এক পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, অধিকার প্রতিষ্ঠার বিধান-সে অধিকার ব্যক্তির যেমন, তেমনি সমষ্টিরও। তা ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ। এই পর্যায়ে যে সব আইন-কানুন ও বিধি-বিধান এসেছে, তা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, এ সবের রচয়িতা ও নাযিলকারী মহান আল্লাহ্ তাঁর ও তাঁর বিধানের প্রতি ঈমানদার লোকদের জন্য এ সবের বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি সক্ষম ও শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন। যেহেতু এ ধরনের আইন বিধান দেয়া ও তার বাস্তবায়নের একমাত্র উপায় রাষ্ট্র। তাই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নির্দেশ না দেয়া খুবই হাস্যকর ব্যাপার, যা আল্লাহ্ সম্পর্কে প্রয়োগ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। কাউকে গাছ কাটতে বলা অথচ গাছ কাটার জন্য একমাত্র হাতিয়ার কুঠার না দেয়ার মত বোকামী দুনিয়ার মানুষ করলেও করতে পারে, কিন্তু আল্লাহ্ সম্পর্কে তা ভাবাও যায় না।

বস্তুত সৃষ্টিলোকের জীবন ও স্থিতি যে কয়টি বিষয়ের উপর নির্ভর করে, আদেশ ও নিষেধ হচ্ছে তন্মধ্যে প্রধান বিষয়। আদেশ, যেমন আল্লাহ্ বলেছেনঃ يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ (الانفال : ٢٤) হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহ্ ও রাসূলের আহ্বানের সাড়া দাও যখন তোমাদেরকে তোমাদের জীবনদায়িনী বিষয়ের দিকে ডাকবেন। এ আহ্বান তো আল্লাহ্ ও রাসূলের আদেশ ও নিষেধে পর্যবসিত।

বলেছেনঃ وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةً يَأُولِي الْأَلْبَابِ (البقرة: (۱۷۹) হে বুদ্ধিমান লোকেরা! কিসাসে তোমাদের জীবন নিহিত।'
এ আয়াতে ভালো কাজের আদেশ হত্যাকারীর কিসাস করায় প্রতিবিম্বিত, যা জীবনের উৎস।

এসব আয়াত দ্বারা যদি আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধই জীবনের উৎস প্রমাণিত হয়, তাহলে জনগণের জন্য এমন একজন সর্বজনমান্য ইমামের প্রয়োজন, যে এই আদেশ ও নিষেধের বিধান বাস্তবে কার্যকর করবে, 'হদ্দ' সমূহ কায়েম করবে, শুক্রর বিরুদ্ধে জিহাদ করবে, জাতীয় সম্পদ জনগণের মধ্যে বন্টন করবে। এমন কাজেই জনগণের কল্যাণ নিহিত। আর যাবতীয় ক্ষতিকর জিনিস ও কাজ থেকে লোকদের বিরত রাখবে। এ কারণে 'আমর বিল মারূফ' মানব সমাজের স্থিতির অন্যতম উপায় সাব্যস্ত হয়েছে। কেননা এসব না হলে কোন লোকই দুষ্কৃতি থেকে বিরত হবে না। বিপর্যয় বন্ধ হবে না। ব্যবস্থাপনাসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। আর তাহলে জনগণের ধ্বংস হওয়া অনিবার্য হয়ে পড়বে। ইসলামের যাবতীয় হুকুম-আহকাম যে বাস্তবায়িত হওয়ার লক্ষ্যেই বিধিবদ্ধ হয়েছে, তা চিন্তা করলেই একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়।

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা প্রমাণে ইসলাম উপস্থাপিত অকাট্য দলীলসমূহ যে কত, তা গুণে শেষ করা যাবে না। সহজেই বোঝা যায়, একটা প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও তার একজন দায়িত্বশীল পরিচালক ব্যতীত কোন জনসমষ্টিই চলতে পারে না-বাঁচতে পারে না। বিশেষ করে দ্বীন-ইসলামের আইন-বিধানসমূহ একটি রাষ্ট্র ছাড়া কিছুতেই এবং কোনক্রমেই বাস্তবায়িত হতে পারে না। মহান স্রষ্টা তা খুব ভালোভাবেই জানতেন বলেই মানব সমাজে রাষ্ট্রের ব্যবস্থা করেছেন এবং সে রাষ্ট্রের সুষ্ঠুরূপে চলবার জন্য প্রয়োজনীয় আইন-বিধানও দিয়েছেন। ফলে সে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায় একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ লোকদের জীবন পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে, তেমনি সে জনসমষ্টির উপর শত্রুর আক্রমণকে প্রতিহত করা, ওদেরকে বৈদেশিক বিজাতীয় শক্তির গোলামী থেকে রক্ষা করাও সম্ভবপর হচ্ছে। ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব এত বেশী যে, রাসূলে করীম (স)-এর হাদীসে একটি জনসমষ্টির কল্যাণ ও অকল্যাণ-সুষ্ঠুতা ও বিপর্যয় একান্তভাবে নির্ভরশীল বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছেঃ
صِنْفَانِ مِنْ أُمَّتِي إِذَا صَلُحَا صَلُحَتْ أُمَّتِي وَإِذَا فَسَدَا فَسَدَتْ أُمَّتِي ..... قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَنْ هُمْ ؟ قَالَ الْفُقَهَاءِ وَالْأَمْرَاءُ .
আমার উম্মতের মধ্যে দুটি শ্রেণী এমন যে, তারা ঠিক হলে গোটা উম্মত ঠিক হয়ে যাবে আর তারাই বিপর্যস্ত হলে গোটা উম্মত বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। জিজ্ঞাসা করা হলোঃ তারা কারা হে রাসূল! বললেনঃ তারা ফিকহবিদ ও প্রশাসকবৃন্দ। ২

বস্তুত মানুষের বিশেষ করে সামষ্টিক জীবনে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা বিবেক-বুদ্ধি ও শরীয়াত উভয়ের দৃষ্টিতেই অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ঐতিহাসিক বিচারেও মানব সমাজের বিকাশে কোন একটি সময় অতীতে ছিল না .... ভবিষ্যতেও থাকতে পারে না যখন রাষ্ট্র ও সরকারের কোন প্রয়োজনীয়তা ছিল না বা হবে না। কাজেই তার প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে আরও দীর্ঘ ও বিস্তারিত কোন আলোচনার আবশ্যকতা আছে বলে মনে হয় না।

রাষ্ট্র ও সরকারের এ গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাই ইসলামের মনীষীবৃন্দের উপর কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় যে, তাঁরা তার রূপরেখা, কার্যপদ্ধতি, নিয়মনীতি বিশেষত বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট করে লোকদের সম্মুখে উপস্থাপিত করবেন এবং কাল ও সময়ের প্রতিটি অধ্যায়ে তা সেই সব রূপরেখা, পদ্ধতি-নিয়ম-নীতি ও বিশেষত্ব-বৈশিষ্ট্য সহকারে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা চালাবেন।

টিকাঃ
১. المسند : ج ٤ ، اصحاب الصحاح والسنن
২. معالم الحكومة الاسلامية ص ١٥. تحف العقول ص ٤٢

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কারণ

📄 রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কারণ


এতদসত্ত্বেও দু'ধরনের লোক সমাজ-জীবনে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছে। এক, যারা নীতিগতভাবেই রাষ্ট্র-সরকারের পক্ষপাতী নয়। এরা হচ্ছে কার্লমার্ক্স ও তার মতের লোকেরা।
দুই, যারা নিছক মনস্তাত্ত্বিক কারণে তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে না। এরা আবার তিন ভাগে বিভক্ত।

বস্তুত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা মূলত কোন মতবিরোধের বিষয় ছিল না-এ ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টিরও কোন কারণ ছিল না। কেননা পূর্বে যেমন দেখিয়েছি ও প্রমাণ করেছি, মানব জীবনের প্রকৃত সৌভাগ্য, সভ্যতার অগ্রগতি স্থায়িত্ব ও দৃঢ়তা এরই উপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু লোক-সংখ্যায় তারা যত কম-ই হোক-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে একটা বিভীষিকা মনে করে। তার অস্তিত্বকেই ভয় পায় ও তার প্রয়োজনীয়তা মেনে নিতে রাযী হয় না। কেউ কেউ আবার এ-ও বলতে চায় যে, হ্যাঁ, রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা আছে বটে; তবে বিশেষ বিশেষ সময়ে মাত্র। সর্বসময়ে নয়, স্থানীয়ভাবেও নয়। চিরন্তনও নয়।

📘 আল কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার > 📄 রাষ্ট্রের অপ্রয়োজনীয়তার চারটি মত

📄 রাষ্ট্রের অপ্রয়োজনীয়তার চারটি মত


এ মতের লোক চার ভাগে বিভক্ত।

প্রথম ভাগের লোক, কার্লমার্ক্স ও তার অনুসারীরা। তাদের মধ্যে রাষ্ট্র সরকারের প্রয়োজনীয়তা শুধু ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ সমাজে শ্রেণী-দ্বন্দু ও সংগ্রাম চলতে থাকে। কিন্তু বিভিন্ন শ্রেণীর জনগোষ্ঠীর মধ্যকার অর্থনৈতিক সমস্যাবলী দূরীভূত হয়ে যাবে-প্রকৃত কমিউনিজম যখন প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন কোন রাষ্ট্র বা সরকারের প্রয়োজন নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতার আলোকে এ মতের কোন যৌক্তিকতাই নেই।
কেননা রাষ্ট্র ও সরকারের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা কতগুলি বস্তুগত সমস্যা ও কার্যকারণের উপরই নির্ভরশীল নয়। নিছক অর্থনৈতিক কারণেই তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃতব্য নয়। শ্রেণীগত পার্থক্য দ্বন্দ্ব ও বিরোধ নিঃশেষ করার জন্যই তার প্রয়োজনীয়তা, এমন কথাও যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। শ্রেণী-দ্বন্দু নিঃশেষ হয়ে গেলেই রাষ্ট্র ও সরকারের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাবে, এ কথার সমর্থনে অকাট্য কোন যুক্তিই পেশ করা যেতে পারে না। এসব বস্তুগত কারণ ছাড়াও নৈতিক ও স্বাভাবিক ভাবধারাগত এমন অনেক কারণই আছে, যা মানব-সমষ্টির জন্য রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠাকে একান্তই অপরিহার্য করে তোলে।

দ্বিতীয় ভাগের লোক হচ্ছে তারা, যারা প্রাচীনকালীন নৈরাজ্য ও শাসনহীন অবস্থাকেই পছন্দ করে নিজেদের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে। কেউ তাদের উপর শাসনকার্য চালাক, তাদের তৎপরতা ও কাজকর্মের উপর কোনরূপ বিধি-নিষেধ বা নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হোক, তা তারা আদৌ পছন্দ করে না। শুধু তাই নয়, তা তারা রীতিমত ভয় পায়। কেননা তাতে পাকড়াও হওয়ার কারণ ঘটে, নানা প্রকারের শাস্তি ও দণ্ড ভোগ করতে বাধ্য হওয়ার মত অবস্থাও দেখা দিতে পারে। এ কারণে তারা রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধতা করে, যেমন তাদের মনে যখন যা করার ইচ্ছা জাগবে তাই করার তারা অবাধ ও নির্বিঘ্ন সুযোগ পেয়ে যেতে পারে। কেউ যেন তাদের নিকট কোন কাজের জন্য কৈফিয়ত চাইতে না পারে, কেউ তাদেরকে কোন কাজের জন্য শাস্তি দিতে না পারে। তারা নিজেদের ইচ্ছামত বা কল্যাণ চিন্তায় যা-ই করবে বা করতে চাইবে, তার পথে যেন কোন প্রতিবন্ধকতা দেখা না দেয়। তাদের জোর-প্রয়োগ ও ছিনতাই কাজে কেউ বাধা দিতে না পারে।

তৃতীয় হচ্ছে সেই জনগোষ্ঠী, যারা রাষ্ট্র-সরকারের নিকট থেকে কেবল শাসন ও শোষণ, রুঢ়তা, নির্যাতন-নিষ্পেষণ, স্বৈরতান্ত্রিকতা ও শক্তিমানদের পক্ষপাতিত্বই দেখতে পেয়েছে চিরকাল। যা সকল কালের দুর্বলদের উপর চরম অত্যাচারই চালিয়েছে, তাদের- এমনকি-মৌলিক মানবিক অধিকারও হরণ করেছে, তাদের তাজা-তপ্ত রক্ত নির্মমভাবে শুষে নিয়েছে, তাদের কল্যাণের সকল পথ ও উপায় সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে, তাদের মানবিক মর্যাদাটুকুকেও পদদলিত ও ধুলি-লুণ্ঠিত করেছে।
এসব লোকের সম্মুখে রাষ্ট্র ও সরকারের নাম উচ্চারণ করলেই তারা সেই বিভীষিকায় সন্ত্রস্ত ও কম্পিত হয়ে উঠে, বিচার ও শাসনের নামে সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন ও নির্যাতনে ভরপুর কারাগারের কথা স্মরণ করে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠে, যা তারা সর্বত্র দাঁড়িয়ে থাকতে ও তাদেরকে গ্রাস করার জন্য মুখ ব্যাদান করে থাকতে দেখতে পায়। এ কারণে তারা রাষ্ট্র ব্যবস্থা সরকার-প্রশাসনকে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে। তার নাম শুনতেও তারা প্রস্তুত নয়। তা না থাকলে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হোক, তা তারা চায় না, বরং সবচাইতে বেশী আতংকিত হয়ে উঠে। জুলুম, স্বৈরতন্ত্র ও নির্মমতা কোন্ মানুষ-ই বা পছন্দ করতে পারে!

তবে সেই সাথে এ কথাও সত্য যে, এই লোকদেরকে যদি ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকারের মানবিক কল্যাণময় আদর্শের কথা, জনগণের অব্যাহত খেদমতের কথা সাধারণ মানুষের প্রয়োজনপূর্ণ ন্যায়পরতা সহকারে পুরিপূরণ করার, নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের মধ্যে ইনসাফ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার কথা যখন বলা হবে, তখন এই লোকেরা হয়ত এমন এক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উক্তরূপ নেতিবাচক মনোভাব গ্রহণ করতে পারবে না। বরং তারা ঐকান্তিক আগ্রহ সহকারে সেরূপ একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দেবে এবং সেজন্য চেষ্টা-সাধনা ও সংগ্রাম করতে কিছু মাত্র নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতে পারবে না।

চতুর্থ হচ্ছে সেসব লোক, যারা নিরংকুশ ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষপাতী, যারা সে স্বাধীনতা কোন সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ হোক, কোন প্রশাসন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও সংকুচিত হোক, তা চায় না। এরা মনে করে রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং ব্যক্তি-স্বাধীনতা- এ দুটি পরস্পর বিরোধী-একটি ক্ষেত্র। এ দুটি কখনই একত্রিত হতে পারে না। কেননা রাষ্ট্র ও সরকার ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত ও সংকুচিত করবে, তাতে তাদের কোনই সন্দেহ নেই।

স্পষ্ট মনে হচ্ছে, মানুষের উপযোগী ব্যক্তি-স্বাধীনতা-মানুষের জন্য যা একান্তই প্রয়োজন-আর বন্য স্বাধীনতা এ দুটিকে এই লোকেরা এক করে দেখেছে। এই দুটির মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, হয় তারা তা বুঝে না বা বুঝতে চায় না অথবা তারা বুঝে-শুনেই সে পার্থক্যের কথা স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়।

বন্য স্বাধীনতা বলতে বোঝায় যেখানে কোন বিবেকসম্মত নিয়ম-নীতিরও নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। সকলের অধিকার রক্ষার জন্য কোন আইনের বালাই থাকবে না। মানুষের মর্যাদা রক্ষার জন্য কোন সীমাই চিহ্নিত হবে না। বনে-জঙ্গলে যেমন পশুকূল যা-ইচ্ছা তাই করে-করতে পারে, যার শক্তি অন্যদের তুলনায় বেশী, তারই কর্তৃত্ব স্বীকৃত, অন্য কথায় Might is Right-এর নীতি, যার আক্রমণের ক্ষমতা বেশী, যে অন্যদের অপেক্ষা বেশী জোরে হুংকার চালাতে পারে, দাপট দেখাতে পারে, রোষ ও আক্রোশ প্রকাশ করতে পারে, অন্যান্য সবাই তার ভয়তেই কম্পমান।

কিন্তু এ স্বাধীনতা বনে-জঙ্গলে থাকলেও-সেখানে শোভা পেলেও-মানব সমাজে তা কখনই শোভন হতে পারে না-বাঞ্ছনীয়ও নয়। মানুষের জন্য যে স্বাধীনতা কাম্য তা অবশ্যই আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। সে জন্য সচেতনভাবে গৃহীত কিছু নিয়ম-নীতি থাকতে হবে। এমন কিছু মৌল মূল্যমান (Values) থাকতে হবে, যা মানুষের মধ্যে নিহিত স্বাভাবিক শক্তি ও প্রতিভার বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি সাধন করবে। মানবীয় গুণ-গরিমা পূর্ণত্বপ্রাপ্ত হবে ও নির্ভুল কল্যাণময় দিকে পরিচালিত হবে। সম্ভাব্য সম্পূর্ণতা কোন দিকেই কারোর নাগালের বাইরে থাকবে না। এরূপ এক স্বাধীনতা, বিবেকসম্মত ও যুক্তিসম্মত নিয়ম-নীতি ভিত্তিক হওয়া ছাড়া পাওয়ার কল্পনাও করা যায় না।

অন্য কথায়, মানুষের জন্য নির্ভুল ও শোভন স্বাধীনতা তাই হতে পারে, যার দরুন ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে নিহিত স্বাভাবিক যোগ্যতা কর্মক্ষমতা বিকাশ লাভের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও আনুকূল্য পাবে। তাহলেই তা স্বাভাবিকতার পর্যায় থেকে বাস্তবতার পর্যায়ে উন্নীত হতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত তা পূর্ণত্বের মাত্রায় পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাব্য পথ নির্দেশ লাভ করতে পারবে।

কিন্তু এই বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি লাভ অরাজক পরিবেশে পাওয়া যেতে পারে না। সেজন্য কিছু শর্ত ও সীমা একান্তই অপরিহার্য। উপযুক্ত কতিপয় নিয়ম-নীতিই সেই শর্তের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। তার বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি নিষিদ্ধ করবে বা তার পথ বন্ধ করে দেবে, এমন কথা তো নয়।

প্রকৃত ও শোভন ব্যক্তি-স্বাধীনতা হচ্ছে, মানুষ একটি বিশ্বাস গ্রহণ করবে, তার কর্মের মাধ্যমে সে বিশ্বাসকে বাস্তবায়িত করার অবাধ সুযোগ পাবে। তাও হবে তখন যখন ব্যক্তি অজ্ঞাত-মুর্খতার অন্ধকার থেকে বের হয়ে নির্ভুল জ্ঞান ও সমঝ-বুঝের আলোকোজ্জ্বল পরিবেশের মধ্যে এসে যেতে পারবে। তাহলেই সে স্বীয় বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করে একদিকে স্বীয় বিশ্বাসকে সত্যতা, যথার্থতা ও একনিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারবে, আর সেই সাথে তার স্বভাবগত কর্মপ্রতিভা ও দক্ষতাকে বিকশিত ও প্রবৃদ্ধ করতে সমর্থ হবে। আর মানুষ যে এভাবেই পূর্ণত্ব অর্জন করতে পারে, পারে জীবনের সার্থকতা লাভ করতে, তাতে কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না। বস্তুত মানুষের জন্য এই স্বাধীনতাই কাম্য।

তবে মানব সমাজের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, অন্ধ জাতীয়তাবোধ প্রসূত রাষ্ট্র সরকার উপরে বর্ণিত শোভন স্বাধীনতাকে পর্যুদস্ত করে। যুক্তিসঙ্গত ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে কঠিনভাবে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখে। কিন্তু ইসলাম উপস্থাপিত রাষ্ট্র-সরকার কখনই তা করে না। ইসলামী সরকার বা তার প্রশাসক জনগণের উপর কেবলমাত্র সে সব আদেশ-নিষেধই কার্যত করে, যা মানুষ ও বিশ্বলোকের মহান স্রষ্টা মানুষের সার্বিক কল্যাণের দৃষ্টিতেই নাযিল করেছেন। সে সরকার বা প্রশাসক নিজ ইচ্ছামত কোন কাজের আদেশও করে না, কোন কাজ করতে নিষেধাজ্ঞাও জারি করে না। তা করার অধিকার সেখানে কাউকেই দেয়া হয় না। আর আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ সামগ্রিকভাবে গোটা মানবতার জন্যই কল্যাণকর, তা যে মানুষের পূর্ণত্ব বিধান করে, মানুষের স্বভাব নিহিত প্রতিভা ও কর্মক্ষমতাকে বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি দান করে, মানুষের জন্য সার্বিকভাবে যাবতীয় অকল্যাণ ও ক্ষতির প্রতিরোধ করে ও মানুষকে উত্তরোত্তর উন্নতির দিকে নিয়ে যায়, তাতে কারোর কি একবিন্দু সংশয় থাকতে পারে?

বস্তুত, ইসলাম মানুষের জন্য রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা উদাত্ত কণ্ঠে প্রকাশ করেছে, কিন্তু সে রাষ্ট্র ও সরকার নিশ্চয়ই তা নয় যার কিছুটা আভাষ এই মাত্র দেয়া হলো। ইসলাম উপস্থাপিত রাষ্ট্র ও সরকারের কিছু রূপরেখা কুরআন মজীদের আয়াতের ভিত্তিতে এখানে পেশ করা হচ্ছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00