📘 আল কুরআনে নারী 📄 কিয়ামতের দিন মুনাফিক নারী-পুরুষরা ঈমানদার নারী-পুরুষের কাছে নূর ভিক্ষা চাইবে

📄 কিয়ামতের দিন মুনাফিক নারী-পুরুষরা ঈমানদার নারী-পুরুষের কাছে নূর ভিক্ষা চাইবে


يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ يَسْعَى نُورُهُمْ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ بُشْرَكُمُ الْيَوْমِ جَنَّتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَرُ خَلِدِينَ فِيهَا وَ ذَلِكَ هُৱ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ، يَوْمَ يَقُولُ الْمُنْفِقُونَ وَالْمُنْفِقْتُ لِلَّذِينَ آمَنُوا انْظُرُونَا نَقْتَبِسْ مِنْ نُورِكُمْ ، قِيلَ ارْجِعُوا وَرَاءَكُمْ فَالْتَمِسُوا نُورًا ، فَضْرِبُ بَيْنَهُمْ بِسُورٍ لَّهُ بَابٌ ، بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ .

“সেদিন তুমি দেখবে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের সম্মুখে ও ডানদিকে তাদের নূর দৌড়াতে থাকবে। তাদের উদ্দেশ্যে বলা হবে, আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ জান্নাতের, যার তলদেশে ঝর্ণাসমূহ প্রবাহমান থাকবে, সেখানে তারা স্থায়ী হবে, এটাই হবে মহাসাফল্য। সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীরা মুমিনদের বলবে, আমাদের জন্য একটু থাম, আমরা তোমাদের নূর থেকে যেন একটু গ্রহণ করতে পারি। ওদের বলা হবে, পেছনে ফিরে গিয়ে নূর খোঁজ। তারপর উভয়ের মধ্যখানে স্থাপিত হবে একটা প্রাচীর যার একটা দরজা থাকবে, এর ভিতরে থাকবে রহমত আর বাইরে থাকবে আযাব।”-সূরা আল হাদীদ: ১২-১৩

কিয়ামতের কঠিন দিনে কেবল মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীগণই এমন অবস্থায় থাকবে যে, তাদের সম্মুখে ও ডানদিকে নূর চমকিতে থাকবে। কাফির-মুনাফিক, ফাসেক-ফাজির প্রভৃতি অন্ধকারে হাতড়িয়ে মরবে। যেভাবে এরা দুনিয়ার জীবনে দীন ইসলামের আলোতে জীবনযাপন না করে যথেচ্ছভাবে জীবন কাটিয়েছে। এদের দুনিয়ার জীবনটা নিজেরাই ইসলাম থেকে দূরে থেকে বিভ্রান্তিতে শেষ করে দিয়েছে। ঐ দিনের মুমিনগণের সেই নূর তো হবে তাদের ইসলামের সঠিক আকীদা-বিশ্বাস ও যথার্থ নেক আমলসমূহের ফল স্বরূপ। ঈমানের সত্যতা-যথার্থতা ও চরিত্র-নৈতিকতার স্বচ্ছতাই সেদিন নূর-এ পরিবর্তিত হয়ে যাবে। তাতে নেক বান্দাদের ব্যক্তিত্ব উজ্জ্বল-উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। যে ব্যক্তির আকীদা ও আমল যতটা আলোকময় ও স্বচ্ছ হবে, তার অস্তিত্বের নূর ততবেশী আলোময় ও তেজ স্বীরূপ ধারণ করবে। সে যখন হাশরের ময়দান থেকে বের হয়ে জান্নাতের দিকে যেতে থাকবে তখন তার নূর তার সামনে ও ডানে দৌড়াতে থাকবে।

হযরত কাতাদাহ বর্ণিত একটি মুরসাল হাদীস একথার সর্বোত্তম ব্যাখ্যা পেশ করে। তিনি বলেন, রসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেন, কারো নূর এতটা তেজস্বী হবে যে, মদীনা হতে 'এডেন' পর্যন্তকার দূরত্ব সমান স্থানে পৌঁছে যাবে। আর কারো নূর 'মদীনা' হতে 'সানা' পর্যন্ত এবং কারো তার চেয়ে আরও কম। এমনকি এমন মুমিনও হবে যার নূর তার পায়ের বেশী দূরত্বে পৌঁছবে না।

আল কুরআন ঈমানদার নারী-পুরুষের সামনে ও ডানে তার নূর চমকাতে থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। তাহলে বামদিক কি অন্ধকারে থেকে যাবে? ব্যাপারটি এমন না। বরং ডানদিক আলোকোদ্ভাসিত হয়ে উঠলে বামদিকও উজ্জ্বল হয়ে যাবে। অর্থাৎ আলো তার ডান হাতেই ঝুলতে থাকবে। আর এর উজ্জ্বলতা চতুর্দিক উদ্ভাসিত করবে। নবী করীম (স)-এর এক হাদীস থেকে এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। হযরত আবু যর ও হযরত আবু দারদা (রা) বর্ণনা করেছেন রসূলে করীম (স) বলেছেন: "আমি তাদের চিনতে পারবো তাদের সেই নূরের দ্বারা, যা তাদের সামনে ডানে ও বামে দৌড়াতে থাকবে।"

এ নূর দেয়ার ব্যাপারটি পুলসিরাত চলার কিছু পূর্বে সংঘটিত হবে। হাশরের বিভিন্ন মনযিল ও স্থান অতিক্রম করতে হবে। এক মনযিল আল্লাহ তাআলার হুকুমে কিছু মুখাবয়বকে সাদা ও উজ্জ্বল করে দেয়া হবে। আর কিছু চেহারাকে করে দেয়া হবে গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ। আরেক মনযিলে সমবেত সকল মুমিন ও কাফিরকে গভীর অন্ধকার আচ্ছন্ন করে ফেলবে। এরপর নূর বণ্টন করা হবে। প্রত্যেক মুমিনকে তার আমল পরিমাণে নূর দেয়া হবে। ফলে কারো নূর পর্বত পরিমাণ, কারো খেজুর বৃক্ষ পরিমাণ, আর কারো হবে মানবদেহ পরিমাণ। সর্বাপেক্ষা কম নূর সেই ব্যক্তির হবে যার কেবল বৃদ্ধাঙ্গুলিতে নূর থাকবে। তাও আবার কখনও জ্বলে উঠবে এবং কখনও নিভে যাবে।

পুলসিরাতের ঘটনাটি ঘটবে এভাবে যে, কাফিররা তো পুলসিরাতে যাবে না বরং প্রথমেই জাহান্নামের দরজা দিয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। হাঁ যারা কোনো নবীর উম্মতভুক্ত হবে তাদের পুলসিরাতের উপর দিয়ে পার হতে হবে। পুলসিরাতের উঠার আগে এক গাঢ় অন্ধকার লোকদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। সেই সময় ঈমানদারদের সাথে উক্ত নূর থাকবে। মুনাফিকরাও সেই নূরের আলোতে ঈমানদারগণের পেছনে পেছনে চলতে চাইবে। কিন্তু মুমিনগণ দ্রুত সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে তাদের আলো মুনাফিকদের থেকে দূরে সরে যাবে। তখন মুনাফিকরা চিৎকার দিয়ে বলবে, আরে একটু থাম না, আমাদেরকে পেছনে অন্ধকারে ফেলে চলে যেয়ো না। সামান্য অপেক্ষা কর যেন আমরাও তোমাদের আলোতে চলতে পারি। আর তোমাদের নূর থেকে উপকৃত হতে পারি। উত্তর আসবে, পেছনে ফিরে গিয়ে নূর অনুসন্ধান করো। একথা শুনে তারা পেছনে হটবে। ইত্যবসরে উভয়ের মধ্যখানে দেওয়াল স্থাপিত হয়ে আড়াল হয়ে যাবে। “পেছনে গিয়ে নূর অনুসন্ধান কর" বলার অর্থ এ নূর তো ঈমান ও নেক আমলের মাধ্যমে দুনিয়াতে অর্জন করা যায়।

হাশরের ময়দানে পুলসিরাত পার হওয়ার প্রাক্কালে অত্যন্ত অন্ধকার হবে। তখন প্রত্যেকের ঈমান ও আমালে সালেহ তার সাথে থাকবে এবং এর আলোকে তারা চলতে থাকবে। মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যখানে দেওয়াল দিয়ে আড়াল করে দেয়া হবে। সেই দেওয়ালের একটা দরজা হবে। সেই দরজা দিয়ে মুমিন জান্নাতে প্রবেশ করে মুনাফিক থেকে আড়ালে চলে যাবে। সেই দরজার ভেতরে গিয়ে মুমিনগণ জান্নাতের শান্তি পাবে আর তার বাইরের দিকে থাকে আল্লাহর আযাবের দৃশ্য।

টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন), (ইবনে কাসীর থেকে মাআরেফুল কুরআন), (আল কুরআনুল করীম- মাওলানা মাহমুদুল হাসান ও মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 রসূলুল্লাহ স.-এর কাছে নারীদের আনুগত্যের শপথ

📄 রসূলুল্লাহ স.-এর কাছে নারীদের আনুগত্যের শপথ


يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ إِذَا جَآءَكَ ٱلْمُؤْمِنَٰتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَىٰٓ أَن لَّا يُشْرِكْنَ بِٱللَّهِ شَيْـًٔا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَٰدَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَٰنٍ يَفْتَرِينَهُۥ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِى مَعْرُوفٍ فَبَايِعْهُنَّ وَٱسْتَغْفِرْ لَهُنَّ ٱللَّهَ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

“হে নবী! মুমিন নারীগণ যখন তোমার কাছে এসে একথার উপর বাইয়াত করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যিনা করবে না, নিজেদের সন্তান হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোনো অপবাদ রচনা করে রটাবে না, আর সৎকাজে তোমাকে অমান্য করবে না। তখন তুমি তাদের বাইয়াত গ্রহণ করবে এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।”-সূরা মুমতাহিনা : ১২

এ আয়াতে মুসলিম নারীদের থেকে একটি বিস্তারিত আনুগত্যের শপথ নেয়ার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এ শপথ ছিল ঈমান ও আকায়িদ সহ শরীয়তের বিধান পালনের ব্যাপারে সুস্পষ্ট অংগীকার। ভাষার ব্যাপকতার কারণে এটা সকল মুসলিম নারীর জন্য ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। এ শপথ কেবল হুদাইবিয়ার ঘটনার পরেই নয়, বরং বার বার হয়েছে। মক্কা বিজয়ের দিনও রসূলুল্লাহ (স) পুরুষদের কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করে সাফা পর্বতের উপর নারীদের কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করেন।

হযরত আয়েশা (রা) এ শপথ সম্পর্কে বলেন, মহিলাদের এ শপথ কেবল কথাবার্তার মাধ্যমে হয়েছে— হাতের উপর হাত রেখে শপথ হয়নি। রসূলুল্লাহ (স) আমাদের কাছ থেকে শরীয়তের বিধি-বিধান পালনের অংগীকার নেন এবং সাথে সাথে এ বাক্যও উচ্চারণ করেন, 'ফিমা আসতাতাতুননা ওয়া আতাকাতুননা' (আমরা এসব বিষয়ে অংগীকার করি যে পর্যন্ত আমাদের সাধ্যে কুলায়)। রসূলুল্লাহ (স)-এর এ শিক্ষা ছিল আমাদের প্রতি তাঁর অপার দয়া, যাতে অপারগ অবস্থায় বিরুদ্ধাচরণ হয়ে গেলে তা অংগীকার ভংগের শামিল না হয়।

মক্কা বিজয়ের পর কুরাইশ বংশের মহিলারা যখন বাইয়াত হওয়ার জন্য উপস্থিত হতে লাগলো, তখন হযরত ওমর (রা) রসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে তাঁদের কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণ করেন। ঈদের দিনেও ভাষণ দানকালে রসূলুল্লাহ (স) এ আয়াত পাঠ করে এ কথাগুলোর প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছিলেন।

রসূল (স)-এর যুগের মুসলিম নারীগণ তাঁর কাছে যেসব বিষয়ে শপথ করেছিলেন, আয়াতে বর্ণিত সেসব বিষয়াবলী নিম্নরূপ:
এক. আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করা।
দুই. চুরি না করা।
তিন. যিনা বা ব্যভিচার না করা।
চার. নিজেদের সন্তানকে হত্যা না করা।
পাঁচ. মিথ্যা অপবাদ ও কলংক আরোপ থেকে বিরত থাকা। কোনো স্ত্রীলোকের অপর নারীর প্রতি পর-পুরুষের সাথে গোপন প্রণয়ের দোষারোপ রচনা করা এবং এ ধরনের মিথ্যা গল্প সমাজে প্রচার করে বেড়ানো এক ধরনের মিথ্যা দোষারোপ।
ছয়. 'ওয়ালা ইয়াছিনাকা ফী মারূফ'—অর্থাৎ ভাল কাজে আপনার আদেশ অমান্য করবে না। রসূলুল্লাহ (স) যে কোনো কাজের আদেশ দিবেন তা কিছুতেই ভাল না হয়ে পারে না। মুসলমানরা যেন ভাল করেই বুঝে নিতে পারে যে, আল্লাহর আদেশের বিপরীতে কোনো মানুষের আনুগত্য করা জায়েয নয়, সেজন্যই রসূলের আনুগত্যের সাথে এ শর্তটি যুক্ত করে দেয়া হয়েছে।

রসূলুল্লাহ (স) আল্লাহর নির্দেশে কেবল সেসব বিষয়ের বাইয়াত নিয়েছেন, যেসব কাজ সাধারণত নারীদের থেকে প্রকাশ পেতো। যাতে করে নারীগণ দীনের স্তম্ভগুলোর প্রতি আমল করার সাথে সাথে এসব বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকতে পারে।

টিকাঃ
-(তাফসীরে মাযহারী), (মাআরেফুল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 কোন্ কোন্ স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের শত্রু

📄 কোন্ কোন্ স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের শত্রু


يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوا لَّكُمْ فَاح્ذَرُوهُمْ ۚ وَإِنْ تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ ۚ وَاللَّهُ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ

“হে তোমরা যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের স্ত্রীগণ ও সন্তান-সন্ততিগণের কেউ কেউ তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক থাকবে। আর তোমরা যদি ওদের মার্জনা করো, ওদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করো এবং ওদের ক্ষমা করে দাও; তাহলে জেনে রেখ আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল অতিশয় দয়ালু। তোমাদের ধন-সম্পদ, তোমাদের সন্তান-সন্ততি তো একটা পরীক্ষা বিশেষ; আর আল্লাহ, তাঁরই কাছে রয়েছে মহাপুরুস্কার।”-সূরা তাগাবুন : ১৪-১৫

এ আয়াতগুলোর শানেনুযুল সম্পর্কে জানা যায়, মক্কা থেকে অনেক মুসলমান হিজরত করতে চাইলেও তাদের স্ত্রী ও সন্তানগণ এ পথে বাধার সৃষ্টি করে বসেছিল। পরে যখন তারা মদীনায় রসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছলেন এবং দেখলেন যে অন্যরা ইলম ও আমলে অনেক অগ্রগামী হয়ে গেছে, তখন তারা রাগান্বিত হয়ে বাধাদানকারী স্ত্রী ও সন্তানদের শাস্তি দিতে চাইলেন। তখন এ আয়াত নাযিল হয়, যেখানে আল্লাহ তাআলা মার্জনা ও ক্ষমা করে দেয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।

আয়াতে 'ফাহযারুহুম' (তাদের সম্পর্কে সতর্ক থেকো) বলে বুঝানো হয়েছে যে, তাদের বৈষয়িক সুখ-সুবিধা বিধান করতে গিয়ে তোমরা স্বীয় পরিণতি বা পরকাল বরবাদ করো না। তাদের প্রতি স্নেহ-ভালবাসা এতবেশী পোষণ করো না যাতে করে আল্লাহ ও রসূলের সাথে সম্পর্ক রক্ষার পথে তারা প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়াতে পারে। রসূলে করীম (স) বলেছেন: “কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে হাজির করা হবে, আর বলা হবে এর সন্তানরা এর সব নেক আমল খেয়ে ফেলেছে।”

মাফ ও ক্ষমা করে দেয়ার নির্দেশের অর্থ এই যে, তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানাদি সম্পর্কে তোমাদের সাবধান করা হচ্ছে কেবল তোমাদের সতর্ক করার উদ্দেশ্যে। এর মানে এই নয় যে তোমরা তাদের মারপিট করবে কিংবা রূঢ় আচরণ করবে। কারণ তাতে পারিবারিক জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠবে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে সাধারণ বিরোধিতা সৃষ্টি হতে পারে।

ইসলামের শুরুতে অনেক ক্ষেত্রে পিতা-মাতা কাফের থেকে যেতো এবং সন্তানদের ওপর ইসলাম ত্যাগের চাপ দিত। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুমিন স্ত্রী এমন স্বামীর পাল্লায় পড়তো যে তার শরীয়ত পালন সহ্য করতো না। কুফর ও ঈমানের দ্বন্দ্বে মুমিনের দায়িত্ব হলো আল্লাহ ও দীনের খাতিরে সবর করা।

“তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষা বিশেষ।” এখানে ফিতনা শব্দের অর্থ পরীক্ষা। এর উদ্দেশ্য হলো ধন-সম্পদ ও সন্তানাদির মোহে পড়ে মানুষ যেন আল্লাহর বিধানকে উপেক্ষা না করে। রসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেন, তোমার বড় শত্রু হচ্ছে তোমার সেই ধন-সম্পদ যেগুলোর তুমি মালিক হয়ে আছো এবং হতে পারে তোমার সেই সন্তানও। মুমিনদের উচিত ধন-সম্পদ ও সন্তানের ভালবাসার ওপর আল্লাহর ভালবাসাকে বিজয়ী রাখা।

টিকাঃ
-(তিরমিযী), (আল কুরআনুল করীম: মাওলানা সালাহুদ্দীন ইউসুফ), (তাফহীমুল কুরআন), (রুহুল মাআনী-মাআরেফুল কুরআন)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 যেদিন মানুষ তার একান্ত আপনজন এমনকি স্ত্রী থেকেও পলায়ন করবে

📄 যেদিন মানুষ তার একান্ত আপনজন এমনকি স্ত্রী থেকেও পলায়ন করবে


فَإِذَا جَاءَتِ الصَّاخَةُ يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ وَأُمِّهِ وَآبِيْهِ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيْهِ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ

"যখন কিয়ামত উপস্থিত হবে, সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তাঁর ভাই থেকে, তার মাতা আর তার পিতা থেকে এবং তার স্ত্রী ও সন্তানাদি থেকে। সেদিন প্রত্যেকেরই নিজের এক চিন্তা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে।"-সূরা আবাসা : ৩৩-৩৭

আলোচ্য আয়াতসমূহে হাশরের ময়দানের ভয়াবহতার তীব্রতা সম্পর্কে বলা হয়েছে। 'সাখখাহ' মানে কান বধিরকারী আওয়ায অর্থাৎ ইসরাফিলের শিংগার কঠোর আওয়ায যাতে কিয়ামত সংঘটিত হবে। সেদিন প্রত্যেক মানুষ আপন চিন্তায় বিভোর হবে। দুনিয়ার জীবনে যেসব আত্মীয়তার জন্য মানুষ জীবন দিতে কুণ্ঠিত হয় না, হাশরের ময়দানে তারাই নিজ নিজ চিন্তায় এমন নিমগ্ন হবে যে, কেউ কারো খবর নিতে পারবে না। প্রত্যেকেই তার ভাই, মা-বাপ, এমনকি অর্ধাংগিনী স্ত্রী ও সন্তানাদি থেকেও পলায়ন করবে।

দুনিয়ার জীবনে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা ভাইদের মধ্যে হয়ে থাকে, তার চেয়ে বেশী পিতা-মাতাকে এবং সবচেয়ে বেশী স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে সম্পর্ক থাকে। আয়াতগুলোতে নীচ থেকে উপরের সম্পর্ক যথাক্রমে উল্লেখ করা হয়েছে। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, প্রত্যেক মানুষ হাশরের ময়দানে নগ্নদেহ, খালী পা ও খাতনাবিহীন হয়ে উঠবে। হযরত আয়েশা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে অন্যের লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টি পড়বে না? রসূলুল্লাহ (স) জবাবে এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে শুনালেন।

মানুষের পলায়ন করার একটি কারণ হলো সে যেন স্বজনদের কষ্ট-মুসিবত দেখতে না পায়। আরেকটি অর্থ হতে পারে যে, মানুষ তার নিকটতম স্বজনদের কঠিন বিপদে দেখেও সাহায্য করতে পারবে না বিধায় দূরে সরে যাবে। অথবা দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর ভয় ভুলে গিয়ে একে অপরকে যে গোমরাহ করেছিল, তার খারাপ পরিণতি দেখে প্রত্যেকে অপরের থেকে পালাবে যাতে কেউ কাউকে দায়ী করতে না পারে। ভাই ভাইকে, সন্তান পিতাকে, স্বামী স্ত্রীকে ভয় করবে যে সে হয়তো তার বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে সাক্ষ্য দিয়ে বসবে।

হাশরের ময়দানে সকল মানুষ সম্পূর্ণ নগ্ন ও উলংগ অবস্থায় উত্থিত হবে—এমন কথা শুনে রসূলুল্লাহ (স)-এর বেগমদের কেউ ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমাদের গোপন অংগসমূহ সেদিন কি সকলের সম্মুখে উন্মুক্ত হবে? জবাবে নবী করীম (স) এ আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে বলে দিয়েছিলেন, "সেদিন কারো প্রতি তাকাবার মত হুশজ্ঞান কারো থাকবে না।"

টিকাঃ
-(তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন), (তিরমিযী), (ফতহুল কাদীর থেকে মাওলানা সালাহুদ্দীন ইউসুফ), (তাফহীমুল কুরআন)

ফন্ট সাইজ
15px
17px