📄 আল্লাহ কাউকে দেন মেয়ে, কাউকে দেন ছেলে, কাউকে দেন দুটোই আর কাউকে রাখেন নিঃসন্তান
لِلَّهِ مُلْكُ السَّموتِ وَالْأَرْضِ ، يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا ويَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكুরَ أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا وَيَجْعَلُ مَنْ يَشَاءُ عَقِيمًا ، إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ
"আকাশজগত ও পৃথিবীর রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন, অথবা তিনি তাদেরকে পুত্র-কন্যা উভয়ই দান করেন। আর যাকে তিনি চান বন্ধ্যা করে রাখেন। তিনি সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান।" -সূরা আশ শূরা: ৪৯-৫০
আলোচ্য আয়াত দুটোতে ঘোষণা করে দেয়া হয়েছে যে, আকাশসমূহ ও পৃথিবীর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য একমাত্র আল্লাহর। সর্বময় ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার মালিক আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই সৃষ্টি করেন। এখানে ‘তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন’ বলে আল্লাহর কুদরতের একটি বিধি বর্ণনা করা হয়েছে। সৃষ্টি প্রসংগ তুলে বলা হয়েছে মানব সৃষ্টিতে কারও ইচ্ছা, ক্ষমতা এমনকি জ্ঞানেরও কোনো দখল নেই। পিতা-মাতা মানব সৃষ্টির বাহ্যিক মাধ্যম হয়ে থাকে মাত্র। আল্লাহ তাআলাই কাউকে কন্যা সন্তান, কাউকে পুত্র সন্তান, কাউকে পুত্র-কন্যা উভয়ই দান করেন, আর কাউকে রাখেন সম্পূর্ণ বন্ধ্যা করে—তার কোনো সন্তানই হয় না।
“আকাশজগত ও পৃথিবীর রাজত্ব আল্লাহরই।” যমীনের ও আসমানের বাদশাহী দুনিয়ার তথাকথিত ও নামকা ওয়াস্তে রাজা-বাদশাহ ও ডিকটেটরদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়নি। মানুষ যত বড় বৈষয়িক শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে বলে মনে করুক না কেন, নিজের ঘরে নিজের ইচ্ছামত সন্তান জন্মাবার ক্ষমতার অধিকারীও সে নয়- অন্য কাউকে ইচ্ছামত সন্তান দেয়া তো দূরের কথা। আল্লাহ যাকে বন্ধা বানিয়ে রেখেছেন, সে কোনো উপায়েই নিজের ঔরসে সন্তান জন্মাতে পারে না। যাকে আল্লাহ কেবল কন্যা সন্তানই দিয়েছেন সে কোনো তদবীরেই একটি পুত্র সন্তানও জন্মাতে পারে না। এ ব্যাপারে প্রতিটি মানুষ চূড়ান্তভাবে অক্ষম।
আকাশজগত ও পৃথিবীর বাদশাহী আল্লাহরই হাতে। কাজেই ধন- সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ইত্যাদি তো আল্লাহ রাব্বুল আলামীনেরই দান। এসব আল্লাহ তাআলার মেহেরবানীর প্রতীক, যাকে ইচ্ছা তিনি দেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা তিনি তুলে নেন। সবই তাঁর মেহেরবানী। আসমান ও যমীনের বাদশাহী আল্লাহ তাআলার মালিকানাধীন এবং সবকিছুর উপর রয়েছে আল্লাহ তাআলার নিরংকুশ বাদশাহী ও কর্তৃত্ব। এসব বিষয় নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ও ইখতিয়ার খাটানোর অধিকার তিনি ছাড়া আর কারো নেই। তিনি নিজের ইচ্ছা ও জ্ঞান মোতাবেক এসব কিছু সৃষ্টি ও পরিচালনা করেন।
আয়াতে কারিমায় উপরোক্ত বিষয়ে আল্লাহর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বর্ণনা করতে গিয়ে বাক্যটি শুরু করা হয়েছে ‘আল্লাহ’ শব্দ দিয়ে। বুঝানো হয়েছে পৃথিবীতে মানুষ এসবের হাকীকত না বুঝে শুধু বাহ্যিক অবস্থার উপর ধারণা নিয়ে বসে আছে। তারা বাহ্যত দেখছে দুনিয়ার রাজা-বাদশাহ ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও শক্তি কত কিছুই না করতে পারে। অথচ নিরংকুশ ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি তো একমাত্র আল্লাহই। কিন্তু মানুষ এতই অজ্ঞ যে তারা এসব সৃষ্টি ও ধ্বংস অন্য মানুষের ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করে নিজেকে অপমানিত করে আর সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাথে মানুষকে শরীক করে বসে।
এহেন ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস যেমন বর্তমান মুসলিম উম্মাহর কোনো কোনো অংশে বিরাজ করছে, ঠিক তেমনি আকীদা-বিশ্বাস পূর্ববর্তী জাতিসমূহেও বিরাজিত ছিল। আল কুরআন আমাদের সে ইতিহাসও জানিয়ে দিয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে : "অনেক আলিম-দরবেশ মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করে অন্যায়ভাবে বাতিলপন্থায় আর তারা ওদের আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।” ইহুদী-খৃস্টান পণ্ডিত ও দরবেশগণ সাধারণ জনগণকে নিজেদের গোলামে পরিণত করে রেখেছিল। আল কুরআন সে বিষয়েও সুস্পস্ট ঘোষণা দিয়েছে: "ওরা ওদের পণ্ডিত-দরবেশদের 'রব' বানিয়ে নিয়েছে আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে।"
আলোচ্য আয়াত দুটোতে কোনো দম্পতিকে সন্তান দান করা ও না করার ভিত্তিতে মানুষকে চার শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন : এক. যাদের কেবল ছেলে সন্তান দেন, দ্বিতীয়, যাদের কেবল কন্যা সন্তান দেন, তৃতীয় যাদের ছেলেমেয়ে উভয় প্রকার সন্তানই দান করেন এবং চতুর্থ যাদের ছেলেমেয়ের কোনোটিই দেন না—বন্ধ্যা রাখেন।
টিকাঃ
(মাআরেফুল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন), (ফী যিলালিল কুরআন)
📄 কিয়ামতের দিন মুনাফিক নারী-পুরুষরা ঈমানদার নারী-পুরুষের কাছে নূর ভিক্ষা চাইবে
يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ يَسْعَى نُورُهُمْ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ بُشْرَكُمُ الْيَوْমِ جَنَّتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَرُ خَلِدِينَ فِيهَا وَ ذَلِكَ هُৱ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ، يَوْمَ يَقُولُ الْمُنْفِقُونَ وَالْمُنْفِقْتُ لِلَّذِينَ آمَنُوا انْظُرُونَا نَقْتَبِسْ مِنْ نُورِكُمْ ، قِيلَ ارْجِعُوا وَرَاءَكُمْ فَالْتَمِسُوا نُورًا ، فَضْرِبُ بَيْنَهُمْ بِسُورٍ لَّهُ بَابٌ ، بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ .
“সেদিন তুমি দেখবে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের সম্মুখে ও ডানদিকে তাদের নূর দৌড়াতে থাকবে। তাদের উদ্দেশ্যে বলা হবে, আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ জান্নাতের, যার তলদেশে ঝর্ণাসমূহ প্রবাহমান থাকবে, সেখানে তারা স্থায়ী হবে, এটাই হবে মহাসাফল্য। সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীরা মুমিনদের বলবে, আমাদের জন্য একটু থাম, আমরা তোমাদের নূর থেকে যেন একটু গ্রহণ করতে পারি। ওদের বলা হবে, পেছনে ফিরে গিয়ে নূর খোঁজ। তারপর উভয়ের মধ্যখানে স্থাপিত হবে একটা প্রাচীর যার একটা দরজা থাকবে, এর ভিতরে থাকবে রহমত আর বাইরে থাকবে আযাব।”-সূরা আল হাদীদ: ১২-১৩
কিয়ামতের কঠিন দিনে কেবল মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীগণই এমন অবস্থায় থাকবে যে, তাদের সম্মুখে ও ডানদিকে নূর চমকিতে থাকবে। কাফির-মুনাফিক, ফাসেক-ফাজির প্রভৃতি অন্ধকারে হাতড়িয়ে মরবে। যেভাবে এরা দুনিয়ার জীবনে দীন ইসলামের আলোতে জীবনযাপন না করে যথেচ্ছভাবে জীবন কাটিয়েছে। এদের দুনিয়ার জীবনটা নিজেরাই ইসলাম থেকে দূরে থেকে বিভ্রান্তিতে শেষ করে দিয়েছে। ঐ দিনের মুমিনগণের সেই নূর তো হবে তাদের ইসলামের সঠিক আকীদা-বিশ্বাস ও যথার্থ নেক আমলসমূহের ফল স্বরূপ। ঈমানের সত্যতা-যথার্থতা ও চরিত্র-নৈতিকতার স্বচ্ছতাই সেদিন নূর-এ পরিবর্তিত হয়ে যাবে। তাতে নেক বান্দাদের ব্যক্তিত্ব উজ্জ্বল-উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। যে ব্যক্তির আকীদা ও আমল যতটা আলোকময় ও স্বচ্ছ হবে, তার অস্তিত্বের নূর ততবেশী আলোময় ও তেজ স্বীরূপ ধারণ করবে। সে যখন হাশরের ময়দান থেকে বের হয়ে জান্নাতের দিকে যেতে থাকবে তখন তার নূর তার সামনে ও ডানে দৌড়াতে থাকবে।
হযরত কাতাদাহ বর্ণিত একটি মুরসাল হাদীস একথার সর্বোত্তম ব্যাখ্যা পেশ করে। তিনি বলেন, রসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেন, কারো নূর এতটা তেজস্বী হবে যে, মদীনা হতে 'এডেন' পর্যন্তকার দূরত্ব সমান স্থানে পৌঁছে যাবে। আর কারো নূর 'মদীনা' হতে 'সানা' পর্যন্ত এবং কারো তার চেয়ে আরও কম। এমনকি এমন মুমিনও হবে যার নূর তার পায়ের বেশী দূরত্বে পৌঁছবে না।
আল কুরআন ঈমানদার নারী-পুরুষের সামনে ও ডানে তার নূর চমকাতে থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। তাহলে বামদিক কি অন্ধকারে থেকে যাবে? ব্যাপারটি এমন না। বরং ডানদিক আলোকোদ্ভাসিত হয়ে উঠলে বামদিকও উজ্জ্বল হয়ে যাবে। অর্থাৎ আলো তার ডান হাতেই ঝুলতে থাকবে। আর এর উজ্জ্বলতা চতুর্দিক উদ্ভাসিত করবে। নবী করীম (স)-এর এক হাদীস থেকে এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। হযরত আবু যর ও হযরত আবু দারদা (রা) বর্ণনা করেছেন রসূলে করীম (স) বলেছেন: "আমি তাদের চিনতে পারবো তাদের সেই নূরের দ্বারা, যা তাদের সামনে ডানে ও বামে দৌড়াতে থাকবে।"
এ নূর দেয়ার ব্যাপারটি পুলসিরাত চলার কিছু পূর্বে সংঘটিত হবে। হাশরের বিভিন্ন মনযিল ও স্থান অতিক্রম করতে হবে। এক মনযিল আল্লাহ তাআলার হুকুমে কিছু মুখাবয়বকে সাদা ও উজ্জ্বল করে দেয়া হবে। আর কিছু চেহারাকে করে দেয়া হবে গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ। আরেক মনযিলে সমবেত সকল মুমিন ও কাফিরকে গভীর অন্ধকার আচ্ছন্ন করে ফেলবে। এরপর নূর বণ্টন করা হবে। প্রত্যেক মুমিনকে তার আমল পরিমাণে নূর দেয়া হবে। ফলে কারো নূর পর্বত পরিমাণ, কারো খেজুর বৃক্ষ পরিমাণ, আর কারো হবে মানবদেহ পরিমাণ। সর্বাপেক্ষা কম নূর সেই ব্যক্তির হবে যার কেবল বৃদ্ধাঙ্গুলিতে নূর থাকবে। তাও আবার কখনও জ্বলে উঠবে এবং কখনও নিভে যাবে।
পুলসিরাতের ঘটনাটি ঘটবে এভাবে যে, কাফিররা তো পুলসিরাতে যাবে না বরং প্রথমেই জাহান্নামের দরজা দিয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। হাঁ যারা কোনো নবীর উম্মতভুক্ত হবে তাদের পুলসিরাতের উপর দিয়ে পার হতে হবে। পুলসিরাতের উঠার আগে এক গাঢ় অন্ধকার লোকদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। সেই সময় ঈমানদারদের সাথে উক্ত নূর থাকবে। মুনাফিকরাও সেই নূরের আলোতে ঈমানদারগণের পেছনে পেছনে চলতে চাইবে। কিন্তু মুমিনগণ দ্রুত সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে তাদের আলো মুনাফিকদের থেকে দূরে সরে যাবে। তখন মুনাফিকরা চিৎকার দিয়ে বলবে, আরে একটু থাম না, আমাদেরকে পেছনে অন্ধকারে ফেলে চলে যেয়ো না। সামান্য অপেক্ষা কর যেন আমরাও তোমাদের আলোতে চলতে পারি। আর তোমাদের নূর থেকে উপকৃত হতে পারি। উত্তর আসবে, পেছনে ফিরে গিয়ে নূর অনুসন্ধান করো। একথা শুনে তারা পেছনে হটবে। ইত্যবসরে উভয়ের মধ্যখানে দেওয়াল স্থাপিত হয়ে আড়াল হয়ে যাবে। “পেছনে গিয়ে নূর অনুসন্ধান কর" বলার অর্থ এ নূর তো ঈমান ও নেক আমলের মাধ্যমে দুনিয়াতে অর্জন করা যায়।
হাশরের ময়দানে পুলসিরাত পার হওয়ার প্রাক্কালে অত্যন্ত অন্ধকার হবে। তখন প্রত্যেকের ঈমান ও আমালে সালেহ তার সাথে থাকবে এবং এর আলোকে তারা চলতে থাকবে। মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যখানে দেওয়াল দিয়ে আড়াল করে দেয়া হবে। সেই দেওয়ালের একটা দরজা হবে। সেই দরজা দিয়ে মুমিন জান্নাতে প্রবেশ করে মুনাফিক থেকে আড়ালে চলে যাবে। সেই দরজার ভেতরে গিয়ে মুমিনগণ জান্নাতের শান্তি পাবে আর তার বাইরের দিকে থাকে আল্লাহর আযাবের দৃশ্য।
টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন), (ইবনে কাসীর থেকে মাআরেফুল কুরআন), (আল কুরআনুল করীম- মাওলানা মাহমুদুল হাসান ও মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী)
📄 রসূলুল্লাহ স.-এর কাছে নারীদের আনুগত্যের শপথ
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ إِذَا جَآءَكَ ٱلْمُؤْمِنَٰتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَىٰٓ أَن لَّا يُشْرِكْنَ بِٱللَّهِ شَيْـًٔا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَٰدَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَٰنٍ يَفْتَرِينَهُۥ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِى مَعْرُوفٍ فَبَايِعْهُنَّ وَٱسْتَغْفِرْ لَهُنَّ ٱللَّهَ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“হে নবী! মুমিন নারীগণ যখন তোমার কাছে এসে একথার উপর বাইয়াত করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যিনা করবে না, নিজেদের সন্তান হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোনো অপবাদ রচনা করে রটাবে না, আর সৎকাজে তোমাকে অমান্য করবে না। তখন তুমি তাদের বাইয়াত গ্রহণ করবে এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।”-সূরা মুমতাহিনা : ১২
এ আয়াতে মুসলিম নারীদের থেকে একটি বিস্তারিত আনুগত্যের শপথ নেয়ার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এ শপথ ছিল ঈমান ও আকায়িদ সহ শরীয়তের বিধান পালনের ব্যাপারে সুস্পষ্ট অংগীকার। ভাষার ব্যাপকতার কারণে এটা সকল মুসলিম নারীর জন্য ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। এ শপথ কেবল হুদাইবিয়ার ঘটনার পরেই নয়, বরং বার বার হয়েছে। মক্কা বিজয়ের দিনও রসূলুল্লাহ (স) পুরুষদের কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করে সাফা পর্বতের উপর নারীদের কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করেন।
হযরত আয়েশা (রা) এ শপথ সম্পর্কে বলেন, মহিলাদের এ শপথ কেবল কথাবার্তার মাধ্যমে হয়েছে— হাতের উপর হাত রেখে শপথ হয়নি। রসূলুল্লাহ (স) আমাদের কাছ থেকে শরীয়তের বিধি-বিধান পালনের অংগীকার নেন এবং সাথে সাথে এ বাক্যও উচ্চারণ করেন, 'ফিমা আসতাতাতুননা ওয়া আতাকাতুননা' (আমরা এসব বিষয়ে অংগীকার করি যে পর্যন্ত আমাদের সাধ্যে কুলায়)। রসূলুল্লাহ (স)-এর এ শিক্ষা ছিল আমাদের প্রতি তাঁর অপার দয়া, যাতে অপারগ অবস্থায় বিরুদ্ধাচরণ হয়ে গেলে তা অংগীকার ভংগের শামিল না হয়।
মক্কা বিজয়ের পর কুরাইশ বংশের মহিলারা যখন বাইয়াত হওয়ার জন্য উপস্থিত হতে লাগলো, তখন হযরত ওমর (রা) রসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে তাঁদের কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণ করেন। ঈদের দিনেও ভাষণ দানকালে রসূলুল্লাহ (স) এ আয়াত পাঠ করে এ কথাগুলোর প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছিলেন।
রসূল (স)-এর যুগের মুসলিম নারীগণ তাঁর কাছে যেসব বিষয়ে শপথ করেছিলেন, আয়াতে বর্ণিত সেসব বিষয়াবলী নিম্নরূপ:
এক. আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করা।
দুই. চুরি না করা।
তিন. যিনা বা ব্যভিচার না করা।
চার. নিজেদের সন্তানকে হত্যা না করা।
পাঁচ. মিথ্যা অপবাদ ও কলংক আরোপ থেকে বিরত থাকা। কোনো স্ত্রীলোকের অপর নারীর প্রতি পর-পুরুষের সাথে গোপন প্রণয়ের দোষারোপ রচনা করা এবং এ ধরনের মিথ্যা গল্প সমাজে প্রচার করে বেড়ানো এক ধরনের মিথ্যা দোষারোপ।
ছয়. 'ওয়ালা ইয়াছিনাকা ফী মারূফ'—অর্থাৎ ভাল কাজে আপনার আদেশ অমান্য করবে না। রসূলুল্লাহ (স) যে কোনো কাজের আদেশ দিবেন তা কিছুতেই ভাল না হয়ে পারে না। মুসলমানরা যেন ভাল করেই বুঝে নিতে পারে যে, আল্লাহর আদেশের বিপরীতে কোনো মানুষের আনুগত্য করা জায়েয নয়, সেজন্যই রসূলের আনুগত্যের সাথে এ শর্তটি যুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
রসূলুল্লাহ (স) আল্লাহর নির্দেশে কেবল সেসব বিষয়ের বাইয়াত নিয়েছেন, যেসব কাজ সাধারণত নারীদের থেকে প্রকাশ পেতো। যাতে করে নারীগণ দীনের স্তম্ভগুলোর প্রতি আমল করার সাথে সাথে এসব বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকতে পারে।
টিকাঃ
-(তাফসীরে মাযহারী), (মাআরেফুল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন)
📄 কোন্ কোন্ স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের শত্রু
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوا لَّكُمْ فَاح્ذَرُوهُمْ ۚ وَإِنْ تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ ۚ وَاللَّهُ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ
“হে তোমরা যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের স্ত্রীগণ ও সন্তান-সন্ততিগণের কেউ কেউ তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক থাকবে। আর তোমরা যদি ওদের মার্জনা করো, ওদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করো এবং ওদের ক্ষমা করে দাও; তাহলে জেনে রেখ আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল অতিশয় দয়ালু। তোমাদের ধন-সম্পদ, তোমাদের সন্তান-সন্ততি তো একটা পরীক্ষা বিশেষ; আর আল্লাহ, তাঁরই কাছে রয়েছে মহাপুরুস্কার।”-সূরা তাগাবুন : ১৪-১৫
এ আয়াতগুলোর শানেনুযুল সম্পর্কে জানা যায়, মক্কা থেকে অনেক মুসলমান হিজরত করতে চাইলেও তাদের স্ত্রী ও সন্তানগণ এ পথে বাধার সৃষ্টি করে বসেছিল। পরে যখন তারা মদীনায় রসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছলেন এবং দেখলেন যে অন্যরা ইলম ও আমলে অনেক অগ্রগামী হয়ে গেছে, তখন তারা রাগান্বিত হয়ে বাধাদানকারী স্ত্রী ও সন্তানদের শাস্তি দিতে চাইলেন। তখন এ আয়াত নাযিল হয়, যেখানে আল্লাহ তাআলা মার্জনা ও ক্ষমা করে দেয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।
আয়াতে 'ফাহযারুহুম' (তাদের সম্পর্কে সতর্ক থেকো) বলে বুঝানো হয়েছে যে, তাদের বৈষয়িক সুখ-সুবিধা বিধান করতে গিয়ে তোমরা স্বীয় পরিণতি বা পরকাল বরবাদ করো না। তাদের প্রতি স্নেহ-ভালবাসা এতবেশী পোষণ করো না যাতে করে আল্লাহ ও রসূলের সাথে সম্পর্ক রক্ষার পথে তারা প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়াতে পারে। রসূলে করীম (স) বলেছেন: “কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে হাজির করা হবে, আর বলা হবে এর সন্তানরা এর সব নেক আমল খেয়ে ফেলেছে।”
মাফ ও ক্ষমা করে দেয়ার নির্দেশের অর্থ এই যে, তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানাদি সম্পর্কে তোমাদের সাবধান করা হচ্ছে কেবল তোমাদের সতর্ক করার উদ্দেশ্যে। এর মানে এই নয় যে তোমরা তাদের মারপিট করবে কিংবা রূঢ় আচরণ করবে। কারণ তাতে পারিবারিক জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠবে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে সাধারণ বিরোধিতা সৃষ্টি হতে পারে।
ইসলামের শুরুতে অনেক ক্ষেত্রে পিতা-মাতা কাফের থেকে যেতো এবং সন্তানদের ওপর ইসলাম ত্যাগের চাপ দিত। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুমিন স্ত্রী এমন স্বামীর পাল্লায় পড়তো যে তার শরীয়ত পালন সহ্য করতো না। কুফর ও ঈমানের দ্বন্দ্বে মুমিনের দায়িত্ব হলো আল্লাহ ও দীনের খাতিরে সবর করা।
“তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষা বিশেষ।” এখানে ফিতনা শব্দের অর্থ পরীক্ষা। এর উদ্দেশ্য হলো ধন-সম্পদ ও সন্তানাদির মোহে পড়ে মানুষ যেন আল্লাহর বিধানকে উপেক্ষা না করে। রসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেন, তোমার বড় শত্রু হচ্ছে তোমার সেই ধন-সম্পদ যেগুলোর তুমি মালিক হয়ে আছো এবং হতে পারে তোমার সেই সন্তানও। মুমিনদের উচিত ধন-সম্পদ ও সন্তানের ভালবাসার ওপর আল্লাহর ভালবাসাকে বিজয়ী রাখা।
টিকাঃ
-(তিরমিযী), (আল কুরআনুল করীম: মাওলানা সালাহুদ্দীন ইউসুফ), (তাফহীমুল কুরআন), (রুহুল মাআনী-মাআরেফুল কুরআন)