📘 আল কুরআনে নারী 📄 দীনদার স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের জন্য ও সন্তানাদির জন্য মুত্তাকী হওয়ার দুআ করে

📄 দীনদার স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের জন্য ও সন্তানাদির জন্য মুত্তাকী হওয়ার দুআ করে


وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

"আর যারা দুআ করতে থাকে এই বলে যে, হে আমাদের রব! তুমি আমাদের এমন জোড় ও সন্তান-সন্ততি দান করো যারা আমাদের জন্য হবে চক্ষু শীতলকারী। আর তুমি আমাদেরকে মুত্তাকীগণের ইমাম বানাও।"-সূরা ফুরকান: ৭৪

আলোচ্য আয়াতে আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণের একটি বিশেষ গুণ-বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা ফুরকানের ৬৪ আয়াত থেকে ৭৪ আয়াত পর্যন্ত আল্লাহর বিশেষ ও প্রিয় বান্দাদের তেরটি গুণ-বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে তাদের সর্বশেষ বৈশিষ্ট্য প্রসংগে বলা হয়েছে যে, আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ কেবল নিজেদের সংশোধন ও সৎকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকে না, বরং তাদের সন্তান-সন্ততি এবং স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সংশোধন ও চরিত্র উন্নয়নের চেষ্টা করে থাকে। এ চেষ্টার চূড়ান্ত অংশ হলো তারা পরস্পরের জন্য ও সন্তান-সন্ততির জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করে থাকে। আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقَيْنَ آمَامًا আমাদেরকে মুত্তাকীগণের ইমাম বানিয়ে দিন। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ পরিবারের নেতা ও ইমাম স্বাভাবিকভাবেই হয়ে থাকেন। কাজেই এ দুআর সারমর্ম এই যে, আমাদের সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজনকে মুত্তাকী বানিয়ে দিন।

এখানে নিজের উন্নতির জন্য দুআ করা হয়নি; বরং সন্তান-সন্ততি ও নিজ নিজ জোড়ের (স্ত্রী স্বামীর জন্য এবং স্বামী স্ত্রীর) জন্যেও দুআ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত ইবরাহীম নখঈ বলেন, এ দুআয় নিজের জন্য কোনো সরদারী ও নেতৃত্বের প্রার্থনা করা উদ্দেশ্য নয়; বরং এতে উদ্দেশ্য এই যে, আমাদের এমন যোগ্য করে দিন, যাতে সবাই ধর্ম ও আমলের দিক থেকে আমাদের অনুসরণ করে এবং আমাদের ইল্ম ও আমল দ্বারা সবাই উপকৃত হতে পারে।

আলোচ্য আয়াতে আল্লাহর অনুগত বান্দাদের নিজেদের পরিণাম চিন্তার সাথে সাথে তারা যে পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্ততির পরিণামও চিন্তা করে থাকে সেকথা প্রতিভাত হয়েছে। তারা তো আল্লাহর নবীর বাণীর তাৎপর্য সম্পর্কে জ্ঞাত ও সচেতন থাকে। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের মধ্যে এ দায়িত্বানুভূতি পূর্ণভাবে বিরাজমান থাকার কারণে তারা নিজেদের পরিবার-সদস্যদের লাগামহীন জীবন যাপনকারীর ন্যায় জীবনযাপন করতে দেয় না। আল্লাহর পথের পথিকরা তো নিজের লোকদের জন্য দুনিয়ার সুখ শান্তির চেয়ে আখিরাতের সুখ-শান্তির প্রতি অধিক মনোযোগী হয়ে থাকে। সন্তান-সন্ততির কেউ যেন শয়তানের পদাংক অনুসরণে পথভ্রষ্ট না হয়ে পড়ে- এটাই হয় তাদের কাম্য। তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের রবের কাছে দুআ করতে থাকে-হে আমাদের রব! আমাদেরকে নিজেদের পরিবার-পরিজনের পক্ষ থেকে চক্ষুর শীতলতা দান করো; তাদের আমল-আখলাক তোমার পসন্দনীয় আর আমাদের আকাংখা মোতাবেক হোক; এবং আমরা যেন এ দুনিয়াতে সৎলোক ও মুত্তাকীগণের নেতারূপে উঠতে পারি।

এটাই হচ্ছে স্বভাবজাত অনুভূতি যা গভীর ঈমান থেকে উৎসারিত। একজন প্রকৃত মুমিন স্বভাবতই কামনা করবে যেন আল্লাহর পথের পথিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আর এ পথিকদের প্রথম সারিতে তার স্ত্রী বা স্বামী ও সন্তান সন্ততিরা থাকুক। কারণ তারা হচ্ছে তার আপনজন ও তাদের কাছে আল্লাহর আমানত স্বরূপ। যাদের ব্যাপারে তার কাছে অবশ্যই কৈফিয়ত তলব করা হবে। একজন প্রকৃত ও খাঁটি মুমিন এটা কামনা করবে সে যেন সত্য ও কল্যাণের দিশারী হতে পারে এবং আল্লাহর পথের পথিকদের নেতৃত্ব দিতে পারে। এ কামনার মধ্যে নিজেকে বড় মনে করার কিছুই নেই। কারণ, তারা সবাই তো একই কাফেলার লোক। তারা সবাই আল্লাহর পথের পথিক।

টিকাঃ
(মাআরেফুল কুরআন), (তাদাব্বুরে কুরআন), (ফী যিলালিল কুরআন)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 মাতা-পিতার সাথে অবশ্যই সদ্ব্যবহার করে যেতে হবে এমন কি শিরক করতে বাধ্য করলেও

📄 মাতা-পিতার সাথে অবশ্যই সদ্ব্যবহার করে যেতে হবে এমন কি শিরক করতে বাধ্য করলেও


وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوالِدَيْهِ : حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَلُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ وَإِنْ جَاهَدُكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ لا فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا :

“আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট করে তাকে পেটে বহন করেছে। তার দুধ ছাড়াতে লেগেছে দু বছর। সুতরাং আমার ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। শেষ পর্যন্ত আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসতে হবে। আর যদি তারা আমার সাথে শরীক করার জন্য চাপ দেয়, যে সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তুমি তাদের সে কথা কিছুতেই মেনে নেবে না। অবশ্য দুনিয়ার জীবনে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে যাবে।”-সূরা লুকমান : ১৪-১৫

পিতা-মাতার সাথে সদাচারণ করা সন্তানের অপরিহার্য কর্তব্য। এমনকি তাঁরা যদি সন্তানকে শিরকের প্রতি বিশেষ চাপ প্রয়োগও করে, তখন তো তাদের সেই কথা মেনে নেয়া যাবে না ঠিক, কিন্তু এজন্যে তাদের সাথে কোনোরূপ অসদাচারণ করা যাবে না। মাতা-পিতা যদি মুশরিক-কাফেরও হন, তবুও তাদের সাথে দুনিয়ার জীবনে সদাচারণ করতে হবে। তাঁরা নিজেরা শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়লে অথবা সন্তানকে শিরক করতে বাধ্য করলে তাঁদের একথা মেনে নেয়া ঈমানের পরিপন্থী বিধায় তা কখনো মানা যাবে না।

পিতার ইহসানসমূহ তো বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পরে দেখা যায়। তিনি সন্তানকে খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করেন, শিক্ষার ব্যবস্থা করেন ইত্যাদি। আর মাতা তো সন্তানের অচেতন অবস্থা থেকেই তার প্রতি ইহসান করতে থাকেন। আলোচ্য আয়াতে মায়ের কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করা এবং সন্তানের জন্য অকাতরে সর্বশক্তি ব্যয় করে দেয়ার বিষয় স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাব্বুল আলামীন মায়ের প্রতি ইহসান করার জোর তাগিদ দিচ্ছেন। তার মা তাকে পেটে বহন করেছে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে। কারণ সন্তান পেটে থাকাবস্থায় সময় যত অতিবাহিত হয়েছে শিশুর দেহ ততই বৃদ্ধি পেয়েছে। আর মায়ের কষ্ট ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেও দীর্ঘ দু আড়াই বছর মা তাকে সাথেই রেখেছে। মা তাকে দুধ পান করিয়েছে, নিজের সাথে রেখে ঘুমাতে দিয়েছে। এক মুহূর্তের জন্য শিশুর কোনো কষ্ট দেখলে অস্থির হয়ে মা তার কষ্ট বিদূরণে পেরেশান হয়ে যেতো।

হাদীসে রসূল থেকে জানা যায় যে, রসূলে করীম স.-কে এক ব্যক্তি 'খিদমত ও সদ্ব্যবহারের কে অধিক হকদার' প্রশ্ন করলে রসূলুল্লাহ স. বললেন, তোমার মা, লোকটি বললো তারপর কে? রসূলুল্লাহ স. বললেন, তোমার মা। লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করলে রসূলুল্লাহ স. এবারও জবাব দিলেন তোমার মা। অতপর চতুর্থ বারের একই প্রশ্নের জবাবে রসূল স. জবাব দিলেন, তোমার পিতা।

অবশ্য মাতা-পিতা আল্লাহর হুকুমের বিপরীত কোনো নির্দেশ দিলে তা মান্য করা যাবে না। এতে মা-বাপ যতই চাপ প্রয়োগ করুক, অথবা যতই নাখোশ হোন না কেন তাতে কিছু আসে যায় না। আলোচ্য আয়াত থেকে জানা যায় যে, আল্লাহ তাআলার নির্দেশের বিপরীত কাজে মাতা-পিতার হুকুম মানা ফরয নয় বরং এমতাবস্থায় তাঁদের হুকুম অমান্য করা কর্তব্য। কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে যে, সেই অবস্থায়ও দুনিয়ার জীবনে তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার করা কর্তব্য। তাঁরা কাফির-মুশরিক হলেও অবশ্যই তাঁদের সেবা-শুশ্রূষা, খানা-পিনার ব্যবস্থা ইত্যাদিতে কোনো ত্রুটি করা যাবে না।

মুফাসসিরীন এ ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন যে, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. যখন মুসলমান হলেন, তখন তাঁর মা কসম করে বললেন, আমি রোদ থেকে উঠে যাব না আর খানা খাব না-যতক্ষণ না সাদ ইসলাম ত্যাগ না করে। তখন সাদ রা. বললেন, আমি কখনো ইসলাম ত্যাগ করবো না। বিষয়টি নবী করীম স.-এর কর্ণগোচর করা হলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে যে, মায়ের এ হুকুম পালন করা যাবে না। এ ধরনের অবস্থা অর্থাৎ ইসলাম পরিপন্থী বিষয়ে মাতা-পিতার হুকুম মানা যাবে না।

টিকাঃ
(তাফসীরে হাক্কানী)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে কষ্ট দেয়ার পরিণতি

📄 মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে কষ্ট দেয়ার পরিণতি


وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوْا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًاه

"যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।" -সূরা আল আহযাব : ৫৮

আলোচ্য আয়াতে কোনো মুমিন পুরুষ অথবা মুমিন নারীকে শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া তোহমত বা মিথ্যা অপবাদ দেয়ার চরম পরিণতি সম্পর্কে সাবধান করা হয়েছে। মদীনায় এক শ্রেণীর লোকেরা মুসলিম নর-নারীর বিরুদ্ধে এ ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকতো। মুসলিম নারী-পুরুষ সম্পর্কে তারা এমন মিথ্যা অপবাদ আরোপ করতো যা প্রকৃতপক্ষে মুসলিম নর-নারীগণ করতেন না। ওরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানা কুৎসা ও অপবাদ রটাতো এবং নানা রকম ফন্দি আঁটতো। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ওদের যাবতীয় ষড়যন্ত্র ও দুরভিসন্ধির জবাব দেন এবং ওদের অপবাদ খণ্ডন করেন।

মুনাফিকদের ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্রের এ হচ্ছে এক জঘন্যতম আচরণ। মদীনার ঐসব মুনাফিকদের অন্তরে সার্বক্ষণিক জ্বালা এই ছিল যে, মুসলিম নারী-পুরুষের নৈতিক মান অন্য সকল জাতির তুলনায় ছিল মহান ও সুউচ্চে। ওরা হিংসার বশবর্তী হয়ে মুসলিম নারী-পুরুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাতে আরম্ভ করলো। এভাবে মুসলিম জাহানের নৈতিক ও চারিত্রিক ভিত ভেংগে দিতে পারলেই ওদের কলিজা ঠাণ্ডা হতো। এখানে ওদের এহেন মিথ্যা ষড়যন্ত্রকারীদের কঠোর শাস্তি ও করুণ পরিণতির কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

'বুহতান' (মিথ্যা অপবাদ) কাকে বলে তা এ আয়াত থেকে জানা যায়। কারো মধ্যে যে দোষ প্রকৃতই নেই বা যে লোক যে অপরাধ আদৌ করেনি, তা সেই ব্যক্তি করেছে বলে প্রচার করাই হলো 'বুহতান'। নবী করীম স.ও বুহুতান-এর এ অর্থই বুঝিয়েছেন। নবী করীম স.-এর নিকট জিজ্ঞেস করা হলো 'গীবত' কাকে বলে? তিনি বললেন, তোমার ভাইয়ের কথা এমনভাবে বলা, যা তার পক্ষে অসহ্য-অপসন্দনীয়। বলা হলো, “আমার ভাইয়ের মধ্যে যদি সে দোষত্রুটি বর্তমান থাকে তবুও?” নবী করীম স. বললেনঃ “তার মধ্যে সে দোষ বর্তমান থাকলে তো তুমি তার গীবত করলে, আর যদি তার মধ্যে ঐ স্বভাব না থাকে তবে, তুমি বুহতান অর্থাৎ মিথ্যা দোষারোপ করলে।"

আলোচ্য আয়াত দ্বারা কোনো মুসলমানকে শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া কষ্টদানের সম্পর্কে অবৈধতা প্রমাণিত হয়েছে। রসূলুল্লাহ স. বলেন, “সে লোকই প্রকৃত মুসলিম যার হাত ও যবান থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদে থাকে আর কেউ কষ্ট না পায়।” মুনাফিকদের পক্ষ থেকে সকল মুসলমান ও রসূলুল্লাহ স. দুই প্রকারে কষ্ট পেতেন। তাদের দ্বিবিধ নির্যাতনের একটি ছিল এই যে, মুসলমানদের দাসীরা কাজকর্মের জন্য বাইরে গেলে দুষ্ট প্রকৃতির মুনাফিকরা তাদেরকে উত্যক্ত করতো। তাদের দ্বিতীয় নির্যাতন ছিল, তারা সর্বদা মিথ্যা খবর রটনা করতো।

মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে কষ্ট দেয়া ও নিপীড়ন করা সম্পর্কে সূরা বুরুজে নিপীড়নকারীদের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক শাস্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আল কুরআনের সেই ঘোষণা হলো: "যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে নিপীড়ন করেছে। অতপর তাওবা করেনি, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি, তাদের জন্য আরও রয়েছে ভস্মকারী শাস্তি।" আয়াতটির তরজমা মাআরেফুল কুরআনে করা হয়েছে এভাবে-যারা মুমিন পুরুষ ও নারীকে নিপীড়ন করেছে। অতপর তাওবা করেনি, তাদের জন্য আছে জাহান্নামের শাস্তি, আর আছে দহন যন্ত্রণা।

টিকাঃ
(ফী যিলালিল কুরআন), (তাদাব্বুরে কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন), (মাআরেফুল কুরআন, তাফসীরে মাযহারী থেকে)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 আল্লাহ কাউকে দেন মেয়ে, কাউকে দেন ছেলে, কাউকে দেন দুটোই আর কাউকে রাখেন নিঃসন্তান

📄 আল্লাহ কাউকে দেন মেয়ে, কাউকে দেন ছেলে, কাউকে দেন দুটোই আর কাউকে রাখেন নিঃসন্তান


لِلَّهِ مُلْكُ السَّموتِ وَالْأَرْضِ ، يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا ويَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكুরَ أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا وَيَجْعَلُ مَنْ يَشَاءُ عَقِيمًا ، إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ

"আকাশজগত ও পৃথিবীর রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন, অথবা তিনি তাদেরকে পুত্র-কন্যা উভয়ই দান করেন। আর যাকে তিনি চান বন্ধ্যা করে রাখেন। তিনি সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান।" -সূরা আশ শূরা: ৪৯-৫০

আলোচ্য আয়াত দুটোতে ঘোষণা করে দেয়া হয়েছে যে, আকাশসমূহ ও পৃথিবীর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য একমাত্র আল্লাহর। সর্বময় ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার মালিক আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই সৃষ্টি করেন। এখানে ‘তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন’ বলে আল্লাহর কুদরতের একটি বিধি বর্ণনা করা হয়েছে। সৃষ্টি প্রসংগ তুলে বলা হয়েছে মানব সৃষ্টিতে কারও ইচ্ছা, ক্ষমতা এমনকি জ্ঞানেরও কোনো দখল নেই। পিতা-মাতা মানব সৃষ্টির বাহ্যিক মাধ্যম হয়ে থাকে মাত্র। আল্লাহ তাআলাই কাউকে কন্যা সন্তান, কাউকে পুত্র সন্তান, কাউকে পুত্র-কন্যা উভয়ই দান করেন, আর কাউকে রাখেন সম্পূর্ণ বন্ধ্যা করে—তার কোনো সন্তানই হয় না।

“আকাশজগত ও পৃথিবীর রাজত্ব আল্লাহরই।” যমীনের ও আসমানের বাদশাহী দুনিয়ার তথাকথিত ও নামকা ওয়াস্তে রাজা-বাদশাহ ও ডিকটেটরদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়নি। মানুষ যত বড় বৈষয়িক শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে বলে মনে করুক না কেন, নিজের ঘরে নিজের ইচ্ছামত সন্তান জন্মাবার ক্ষমতার অধিকারীও সে নয়- অন্য কাউকে ইচ্ছামত সন্তান দেয়া তো দূরের কথা। আল্লাহ যাকে বন্ধা বানিয়ে রেখেছেন, সে কোনো উপায়েই নিজের ঔরসে সন্তান জন্মাতে পারে না। যাকে আল্লাহ কেবল কন্যা সন্তানই দিয়েছেন সে কোনো তদবীরেই একটি পুত্র সন্তানও জন্মাতে পারে না। এ ব্যাপারে প্রতিটি মানুষ চূড়ান্তভাবে অক্ষম।

আকাশজগত ও পৃথিবীর বাদশাহী আল্লাহরই হাতে। কাজেই ধন- সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ইত্যাদি তো আল্লাহ রাব্বুল আলামীনেরই দান। এসব আল্লাহ তাআলার মেহেরবানীর প্রতীক, যাকে ইচ্ছা তিনি দেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা তিনি তুলে নেন। সবই তাঁর মেহেরবানী। আসমান ও যমীনের বাদশাহী আল্লাহ তাআলার মালিকানাধীন এবং সবকিছুর উপর রয়েছে আল্লাহ তাআলার নিরংকুশ বাদশাহী ও কর্তৃত্ব। এসব বিষয় নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ও ইখতিয়ার খাটানোর অধিকার তিনি ছাড়া আর কারো নেই। তিনি নিজের ইচ্ছা ও জ্ঞান মোতাবেক এসব কিছু সৃষ্টি ও পরিচালনা করেন।

আয়াতে কারিমায় উপরোক্ত বিষয়ে আল্লাহর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বর্ণনা করতে গিয়ে বাক্যটি শুরু করা হয়েছে ‘আল্লাহ’ শব্দ দিয়ে। বুঝানো হয়েছে পৃথিবীতে মানুষ এসবের হাকীকত না বুঝে শুধু বাহ্যিক অবস্থার উপর ধারণা নিয়ে বসে আছে। তারা বাহ্যত দেখছে দুনিয়ার রাজা-বাদশাহ ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও শক্তি কত কিছুই না করতে পারে। অথচ নিরংকুশ ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি তো একমাত্র আল্লাহই। কিন্তু মানুষ এতই অজ্ঞ যে তারা এসব সৃষ্টি ও ধ্বংস অন্য মানুষের ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করে নিজেকে অপমানিত করে আর সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাথে মানুষকে শরীক করে বসে।

এহেন ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস যেমন বর্তমান মুসলিম উম্মাহর কোনো কোনো অংশে বিরাজ করছে, ঠিক তেমনি আকীদা-বিশ্বাস পূর্ববর্তী জাতিসমূহেও বিরাজিত ছিল। আল কুরআন আমাদের সে ইতিহাসও জানিয়ে দিয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে : "অনেক আলিম-দরবেশ মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করে অন্যায়ভাবে বাতিলপন্থায় আর তারা ওদের আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।” ইহুদী-খৃস্টান পণ্ডিত ও দরবেশগণ সাধারণ জনগণকে নিজেদের গোলামে পরিণত করে রেখেছিল। আল কুরআন সে বিষয়েও সুস্পস্ট ঘোষণা দিয়েছে: "ওরা ওদের পণ্ডিত-দরবেশদের 'রব' বানিয়ে নিয়েছে আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে।"

আলোচ্য আয়াত দুটোতে কোনো দম্পতিকে সন্তান দান করা ও না করার ভিত্তিতে মানুষকে চার শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন : এক. যাদের কেবল ছেলে সন্তান দেন, দ্বিতীয়, যাদের কেবল কন্যা সন্তান দেন, তৃতীয় যাদের ছেলেমেয়ে উভয় প্রকার সন্তানই দান করেন এবং চতুর্থ যাদের ছেলেমেয়ের কোনোটিই দেন না—বন্ধ্যা রাখেন।

টিকাঃ
(মাআরেফুল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন), (ফী যিলালিল কুরআন)

ফন্ট সাইজ
15px
17px