📄 আল্লাহ ছাড়া কারো দাসত্ব করবে না, আর মাতা-পিতার সেবা-যত্নের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখবে
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ، إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلْهُمَا فَلَا تَقُلْ لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَّهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا، وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيْنِي صَغِيرًا
"তোমার রব আদেশ করেছেন, একমাত্র তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত না করতে; আর মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে। তাদের একজন অথবা দুজনই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে পৌঁছে যায়, তবে তাদেরকে 'উহ' শব্দটিও বলবে না, তাদেরকে ধমক দিবে না, তাদের উভয়ের সাথে সম্মানসূচক কথা বলবে। সহৃদয়তার সাথে নম্রভাবে তাঁদের সামনে নত থাকবে, আর এই বলে দুআ করবে, হে রব! তাঁদের উভয়ের প্রতি তুমি রহম করো, যেভাবে তাঁরা উভয়ে আমার শিশুকালে আমাকে লালন-পালন করেছেন।"-সূরা বনী ইসরাঈল : ২৩-২৪
মানব জাতির শান্তি, কল্যাণ ও সাফল্য কিসে ও কিভাবে—তা একমাত্র সে সত্তাই ভাল জানেন, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করে লালন-পালন করেন। সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা আল্লাহ তাআলা মানুষকে দুনিয়ার জীবনে ইচ্ছাশক্তি ও কর্মের স্বাধীনতা দিয়ে তার জীবনের চলার পথও বাতলে দিয়েছেন। আল কুরআনই হচ্ছে আল্লাহর সেই পথনির্দেশিকা। আলোচ্য আয়াতে মানবজাতির জন্যে দুটি মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে। এক. মানবজাতি তাদের রব আল্লাহ ছাড়া কারো দাসত্ব করবে না, দুই. মানুষ নিজ নিজ মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। বস্তুত রাব্বুল আলামীনের রহমত ও ইচ্ছায় মানুষ জীবনী শক্তি পেয়ে পৃথিবীতে বেঁচে আছে, আর মাতা-পিতার অকৃত্রিম স্নেহ-মমতা ও সীমাহীন সহিষ্ণুতার বদৌলতে মানুষ দুনিয়াতে টিকে থাকতে পারছে। যেন মানুষকে আল্লাহর লালন-পালন কাজটির বাস্তবায়ন মাতা-পিতার মাধ্যমে সমাধান করছেন। এজন্যেই আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মানুষকে তার দাসত্ব করার নির্দেশের সাথে মাতা-পিতার খিদমত আনজাম দানের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
আলোচ্য আয়াতের বাচনভঙ্গিতে একথা বেরিয়ে এসেছে, যদি আল্লাহর ইবাদাত বা দাসত্বে অন্য কাউকেও সামান্যতম অংশীদার করার ন্যূনতম অবকাশও থাকতো, তবে তার অধিকারী হতো মাতা-পিতা। কিন্তু যেহেতু আল্লাহ নিজেই যখন মাতা-পিতাকে তার শরীক সাব্যস্ত করেননি, তখন অন্য কাউকে আল্লাহর সাথে শরীক করার প্রশ্নই উঠতে পারে না।
“তিনি ছাড়া কারো ইবাদাত করবে না।” কথাটির অর্থ কেবল এতটুকুই নয় যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পূজা করো না; বরং তার সাথে একথাও আসবে যে, দাসত্ব ও আনুগত্য এবং নিশর্তে ও নিসংকোচে মান্য করবে একমাত্র আল্লাহকে। তাঁর আদেশকেই একমাত্র আদেশ, তাঁর আইনকেই একমাত্র আইন বলে স্বীকার করবে ও মেনে চলবে। তাঁকে ছাড়া আর কারো প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্ব মেনে নিবে না।
ইমাম কুরতুবী র. বলেন, এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার প্রতি আদব-সম্মান এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করাকে নিজের ইবাদাতের সাথে একত্রিত করে ফরয করে দিয়েছেন। যেমন সূরা লুকমানে নিজের শোকরের সাথে মাতা-পিতার শোকরকে একত্রিত করে অপরিহার্য করে দিয়েছেন। বলা হয়েছে أن اشْكُرْلِي وَلِوَالِدَيْكَ অর্থাৎ আমার শোকর করো আর পিতা-মাতারও। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তাআলার ইবাদাতের পর পিতা-মাতার আনুগত্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার ন্যায় পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া ওয়াজিব। সহীহ বুখারীর একটি হাদীসও এর পক্ষে সাক্ষ দেয়। হাদীসে রয়েছে কোনো এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহকে প্রশ্ন করলো: আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় কাজ কোন্টি? তিনি বললেন, সময় হলে নামায পড়া। সে আবার প্রশ্ন করলো: এরপর কোন্ কাজটি সর্বাধিক প্রিয়? তিনি বললেন, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার।
পিতা-মাতা থেকে প্রতিশোধ নেয়ার অধিকার সন্তানের নেই। তাঁরা যুল্ম করলেও সন্তান তাদের সেবা-যত্ন ও আনুগত্যে হাত গুটিয়ে নিতে পারে না। বায়হাকী হযরত ইবনে আব্বাসের বাচনিক উদ্ধৃত করেছেন যে, রসূলুল্লাহ স. বলেন, "যে সেবা-যত্নকারী পুত্র পিতা-মাতার দিকে দয়া ও ভালবাসা সহকারে দৃষ্টিপাত করে তার প্রত্যেক দৃষ্টিপাতের বিনিময়ে সে একটি মকবুল হজ্জের সওয়াব পায়।" বায়হাকী শোআবুল ঈমানে আবু বকরা রা.-এর বাচনিক বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ স. বলেন, সকল গোনাহর শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা যেগুলোকে ইচ্ছা করেন কিয়ামত পর্যন্ত পিছিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু পিতা-মাতার হক নষ্ট করা এবং তাঁদের প্রতি অবাধ্য আচরণ করা এর ব্যতিক্রম। এর শাস্তি আখিরাতের পূর্বে দুনিয়াতেও দেয়া হয়।
পিতা-মাতার খিদমত সম্পর্কে কতিপয় জরুরী জ্ঞাতব্য:
১. সাধারণত পিতা-মাতার আনুগত্য সন্তানের উপর ওয়াজিব। এমনকি তারা কোনো সন্তানের প্রতি যুল্ম করলেও তাদের আনুগত্য, সেবা-খিদমত করা সেই সন্তানের কর্তব্য। তবে তারা যদি সন্তানকে শিরক বা আল্লাহর নাফরমানীর কাজে বাধ্য করে তাহলে কেবল সেই নির্দিষ্ট কাজে তাদের আনুগত্য করা যাবে না।
২. পিতা-মাতা অমুসলিম হলেও তাদের সেবা-যত্ন করতে হবে। হযরত আসমা রা. রসূলুল্লাহ স.-কে জিজ্ঞেস করেন, "আমার জননী মুশরিক। তিনি আমাকে দেখতে আসেন। তাঁকে আদর আপ্যায়ন করা জায়েয হবে কি?" তিনি বললেন, صِلِي أُمَّكِ তোমার জননীকে আদর-আপ্যায়ন করো।
৩. যে পর্যন্ত 'জিহাদ' ফরযে আইন পর্যায়ে না পৌঁছে-ফরযে কেফায়ার পর্যায়ে থেকে যায়, সে পর্যন্ত পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া সন্তানের জিহাদে যাওয়া জায়েয নয়।
৪. পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার যে নির্দেশ কুরআন ও হাদীসে উক্ত হয়েছে পিতা-মাতার আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবের সাথে সদ্ব্যবহার করাও এর অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে পিতা-মাতার ইন্তিকালের পর।
৫. পিতা-মাতার বার্ধক্য অবস্থায় তাঁদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে ও তাদের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। বার্ধক্যে উপনীত হলে পিতা-মাতা সন্তানের সেবা-যত্নের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে এবং তাঁদের জীবন সন্তানের দয়া ও কৃপার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আল কুরআন মানবজাতিকে এ দোয়া শিখিয়ে উক্ত বিষয়টির প্রতিই ইংগিত করেছে।
পিতা-মাতার বার্ধক্যাবস্থায় সন্তানের আচরণ বিধি:
আলোচ্য আয়াতে পিতা-মাতা বার্ধক্যে উপনীত হলে তাঁদের সাথে কিরূপ আচরণ করতে হবে সে বিষয়ে পাঁচটি আদেশ দেয়া হয়েছে :
এক. "তাদেরকে 'উহ্' শব্দটিও বলবে না।" তাঁদের দুজন অথবা একজন বার্ধক্যে পৌঁছলে তাঁদের কোনো কথায় বা আচরণে বিরক্তি প্রকাশক শব্দ 'উহ্' বলতে পারবে না।
দুই. "তাঁদেরকে ধমক দিবে না।" তাঁদের অসহায় অবস্থায় সন্তানদের ধমক শুনলে বড়ই মনোকষ্ট হওয়া স্বাভাবিক।
তিন. "তাঁদের উভয়ের সাথে সম্মানসূচক নম্রভাষায় কথা বলবে।" অতি নম্রস্বরে ভালবাসা ও ভক্তিশ্রদ্ধা প্রকাশক শব্দে কথা বলবে।
চার. "সহৃদয়তার সাথে নম্রভাবে তাঁদের সামনে নত থাকবে। অর্থাৎ তাঁদের সাথে অকৃত্রিম বিনয়সুলভ সদয় ব্যবহার প্রদর্শন করবে।
পাঁচ. তাঁদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করবে এই বলে যে, "হে রব! তাঁদের উভয়ের প্রতি তেমনি রহম করো যেমনি তাঁরা শিশুকালে আমাকে লালন-পালন করেছেন।"
পিতা-মাতার ষোলআনা হক আদায় করা কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই রাব্বুল আলামীনের দরবারে তাঁদের জন্য এ দুআ করবে। তাছাড়া তাঁদের ইন্তিকালের পরেও এ দুআ করে তাঁদের ঋণ শোধের চেষ্টা করা যায়।
টিকাঃ
(তাদাব্বুরে কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন), (কুরতুবী থেকে মাআরেফুল কুরআন), (তাফসীরে মাযহারী থেকে মাআরেফুল কুরআন), (মাআরেফুল কুরআন-কুরতুবী থেকে)
📄 দীনদার স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের জন্য ও সন্তানাদির জন্য মুত্তাকী হওয়ার দুআ করে
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
"আর যারা দুআ করতে থাকে এই বলে যে, হে আমাদের রব! তুমি আমাদের এমন জোড় ও সন্তান-সন্ততি দান করো যারা আমাদের জন্য হবে চক্ষু শীতলকারী। আর তুমি আমাদেরকে মুত্তাকীগণের ইমাম বানাও।"-সূরা ফুরকান: ৭৪
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণের একটি বিশেষ গুণ-বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা ফুরকানের ৬৪ আয়াত থেকে ৭৪ আয়াত পর্যন্ত আল্লাহর বিশেষ ও প্রিয় বান্দাদের তেরটি গুণ-বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে তাদের সর্বশেষ বৈশিষ্ট্য প্রসংগে বলা হয়েছে যে, আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ কেবল নিজেদের সংশোধন ও সৎকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকে না, বরং তাদের সন্তান-সন্ততি এবং স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সংশোধন ও চরিত্র উন্নয়নের চেষ্টা করে থাকে। এ চেষ্টার চূড়ান্ত অংশ হলো তারা পরস্পরের জন্য ও সন্তান-সন্ততির জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করে থাকে। আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقَيْنَ آمَامًا আমাদেরকে মুত্তাকীগণের ইমাম বানিয়ে দিন। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ পরিবারের নেতা ও ইমাম স্বাভাবিকভাবেই হয়ে থাকেন। কাজেই এ দুআর সারমর্ম এই যে, আমাদের সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজনকে মুত্তাকী বানিয়ে দিন।
এখানে নিজের উন্নতির জন্য দুআ করা হয়নি; বরং সন্তান-সন্ততি ও নিজ নিজ জোড়ের (স্ত্রী স্বামীর জন্য এবং স্বামী স্ত্রীর) জন্যেও দুআ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত ইবরাহীম নখঈ বলেন, এ দুআয় নিজের জন্য কোনো সরদারী ও নেতৃত্বের প্রার্থনা করা উদ্দেশ্য নয়; বরং এতে উদ্দেশ্য এই যে, আমাদের এমন যোগ্য করে দিন, যাতে সবাই ধর্ম ও আমলের দিক থেকে আমাদের অনুসরণ করে এবং আমাদের ইল্ম ও আমল দ্বারা সবাই উপকৃত হতে পারে।
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহর অনুগত বান্দাদের নিজেদের পরিণাম চিন্তার সাথে সাথে তারা যে পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্ততির পরিণামও চিন্তা করে থাকে সেকথা প্রতিভাত হয়েছে। তারা তো আল্লাহর নবীর বাণীর তাৎপর্য সম্পর্কে জ্ঞাত ও সচেতন থাকে। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের মধ্যে এ দায়িত্বানুভূতি পূর্ণভাবে বিরাজমান থাকার কারণে তারা নিজেদের পরিবার-সদস্যদের লাগামহীন জীবন যাপনকারীর ন্যায় জীবনযাপন করতে দেয় না। আল্লাহর পথের পথিকরা তো নিজের লোকদের জন্য দুনিয়ার সুখ শান্তির চেয়ে আখিরাতের সুখ-শান্তির প্রতি অধিক মনোযোগী হয়ে থাকে। সন্তান-সন্ততির কেউ যেন শয়তানের পদাংক অনুসরণে পথভ্রষ্ট না হয়ে পড়ে- এটাই হয় তাদের কাম্য। তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের রবের কাছে দুআ করতে থাকে-হে আমাদের রব! আমাদেরকে নিজেদের পরিবার-পরিজনের পক্ষ থেকে চক্ষুর শীতলতা দান করো; তাদের আমল-আখলাক তোমার পসন্দনীয় আর আমাদের আকাংখা মোতাবেক হোক; এবং আমরা যেন এ দুনিয়াতে সৎলোক ও মুত্তাকীগণের নেতারূপে উঠতে পারি।
এটাই হচ্ছে স্বভাবজাত অনুভূতি যা গভীর ঈমান থেকে উৎসারিত। একজন প্রকৃত মুমিন স্বভাবতই কামনা করবে যেন আল্লাহর পথের পথিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আর এ পথিকদের প্রথম সারিতে তার স্ত্রী বা স্বামী ও সন্তান সন্ততিরা থাকুক। কারণ তারা হচ্ছে তার আপনজন ও তাদের কাছে আল্লাহর আমানত স্বরূপ। যাদের ব্যাপারে তার কাছে অবশ্যই কৈফিয়ত তলব করা হবে। একজন প্রকৃত ও খাঁটি মুমিন এটা কামনা করবে সে যেন সত্য ও কল্যাণের দিশারী হতে পারে এবং আল্লাহর পথের পথিকদের নেতৃত্ব দিতে পারে। এ কামনার মধ্যে নিজেকে বড় মনে করার কিছুই নেই। কারণ, তারা সবাই তো একই কাফেলার লোক। তারা সবাই আল্লাহর পথের পথিক।
টিকাঃ
(মাআরেফুল কুরআন), (তাদাব্বুরে কুরআন), (ফী যিলালিল কুরআন)
📄 মাতা-পিতার সাথে অবশ্যই সদ্ব্যবহার করে যেতে হবে এমন কি শিরক করতে বাধ্য করলেও
وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوالِدَيْهِ : حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَلُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ وَإِنْ جَاهَدُكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ لا فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا :
“আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট করে তাকে পেটে বহন করেছে। তার দুধ ছাড়াতে লেগেছে দু বছর। সুতরাং আমার ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। শেষ পর্যন্ত আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসতে হবে। আর যদি তারা আমার সাথে শরীক করার জন্য চাপ দেয়, যে সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তুমি তাদের সে কথা কিছুতেই মেনে নেবে না। অবশ্য দুনিয়ার জীবনে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে যাবে।”-সূরা লুকমান : ১৪-১৫
পিতা-মাতার সাথে সদাচারণ করা সন্তানের অপরিহার্য কর্তব্য। এমনকি তাঁরা যদি সন্তানকে শিরকের প্রতি বিশেষ চাপ প্রয়োগও করে, তখন তো তাদের সেই কথা মেনে নেয়া যাবে না ঠিক, কিন্তু এজন্যে তাদের সাথে কোনোরূপ অসদাচারণ করা যাবে না। মাতা-পিতা যদি মুশরিক-কাফেরও হন, তবুও তাদের সাথে দুনিয়ার জীবনে সদাচারণ করতে হবে। তাঁরা নিজেরা শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়লে অথবা সন্তানকে শিরক করতে বাধ্য করলে তাঁদের একথা মেনে নেয়া ঈমানের পরিপন্থী বিধায় তা কখনো মানা যাবে না।
পিতার ইহসানসমূহ তো বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পরে দেখা যায়। তিনি সন্তানকে খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করেন, শিক্ষার ব্যবস্থা করেন ইত্যাদি। আর মাতা তো সন্তানের অচেতন অবস্থা থেকেই তার প্রতি ইহসান করতে থাকেন। আলোচ্য আয়াতে মায়ের কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করা এবং সন্তানের জন্য অকাতরে সর্বশক্তি ব্যয় করে দেয়ার বিষয় স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাব্বুল আলামীন মায়ের প্রতি ইহসান করার জোর তাগিদ দিচ্ছেন। তার মা তাকে পেটে বহন করেছে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে। কারণ সন্তান পেটে থাকাবস্থায় সময় যত অতিবাহিত হয়েছে শিশুর দেহ ততই বৃদ্ধি পেয়েছে। আর মায়ের কষ্ট ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেও দীর্ঘ দু আড়াই বছর মা তাকে সাথেই রেখেছে। মা তাকে দুধ পান করিয়েছে, নিজের সাথে রেখে ঘুমাতে দিয়েছে। এক মুহূর্তের জন্য শিশুর কোনো কষ্ট দেখলে অস্থির হয়ে মা তার কষ্ট বিদূরণে পেরেশান হয়ে যেতো।
হাদীসে রসূল থেকে জানা যায় যে, রসূলে করীম স.-কে এক ব্যক্তি 'খিদমত ও সদ্ব্যবহারের কে অধিক হকদার' প্রশ্ন করলে রসূলুল্লাহ স. বললেন, তোমার মা, লোকটি বললো তারপর কে? রসূলুল্লাহ স. বললেন, তোমার মা। লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করলে রসূলুল্লাহ স. এবারও জবাব দিলেন তোমার মা। অতপর চতুর্থ বারের একই প্রশ্নের জবাবে রসূল স. জবাব দিলেন, তোমার পিতা।
অবশ্য মাতা-পিতা আল্লাহর হুকুমের বিপরীত কোনো নির্দেশ দিলে তা মান্য করা যাবে না। এতে মা-বাপ যতই চাপ প্রয়োগ করুক, অথবা যতই নাখোশ হোন না কেন তাতে কিছু আসে যায় না। আলোচ্য আয়াত থেকে জানা যায় যে, আল্লাহ তাআলার নির্দেশের বিপরীত কাজে মাতা-পিতার হুকুম মানা ফরয নয় বরং এমতাবস্থায় তাঁদের হুকুম অমান্য করা কর্তব্য। কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে যে, সেই অবস্থায়ও দুনিয়ার জীবনে তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার করা কর্তব্য। তাঁরা কাফির-মুশরিক হলেও অবশ্যই তাঁদের সেবা-শুশ্রূষা, খানা-পিনার ব্যবস্থা ইত্যাদিতে কোনো ত্রুটি করা যাবে না।
মুফাসসিরীন এ ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন যে, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. যখন মুসলমান হলেন, তখন তাঁর মা কসম করে বললেন, আমি রোদ থেকে উঠে যাব না আর খানা খাব না-যতক্ষণ না সাদ ইসলাম ত্যাগ না করে। তখন সাদ রা. বললেন, আমি কখনো ইসলাম ত্যাগ করবো না। বিষয়টি নবী করীম স.-এর কর্ণগোচর করা হলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে যে, মায়ের এ হুকুম পালন করা যাবে না। এ ধরনের অবস্থা অর্থাৎ ইসলাম পরিপন্থী বিষয়ে মাতা-পিতার হুকুম মানা যাবে না।
টিকাঃ
(তাফসীরে হাক্কানী)
📄 মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে কষ্ট দেয়ার পরিণতি
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوْا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًاه
"যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।" -সূরা আল আহযাব : ৫৮
আলোচ্য আয়াতে কোনো মুমিন পুরুষ অথবা মুমিন নারীকে শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া তোহমত বা মিথ্যা অপবাদ দেয়ার চরম পরিণতি সম্পর্কে সাবধান করা হয়েছে। মদীনায় এক শ্রেণীর লোকেরা মুসলিম নর-নারীর বিরুদ্ধে এ ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকতো। মুসলিম নারী-পুরুষ সম্পর্কে তারা এমন মিথ্যা অপবাদ আরোপ করতো যা প্রকৃতপক্ষে মুসলিম নর-নারীগণ করতেন না। ওরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানা কুৎসা ও অপবাদ রটাতো এবং নানা রকম ফন্দি আঁটতো। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ওদের যাবতীয় ষড়যন্ত্র ও দুরভিসন্ধির জবাব দেন এবং ওদের অপবাদ খণ্ডন করেন।
মুনাফিকদের ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্রের এ হচ্ছে এক জঘন্যতম আচরণ। মদীনার ঐসব মুনাফিকদের অন্তরে সার্বক্ষণিক জ্বালা এই ছিল যে, মুসলিম নারী-পুরুষের নৈতিক মান অন্য সকল জাতির তুলনায় ছিল মহান ও সুউচ্চে। ওরা হিংসার বশবর্তী হয়ে মুসলিম নারী-পুরুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাতে আরম্ভ করলো। এভাবে মুসলিম জাহানের নৈতিক ও চারিত্রিক ভিত ভেংগে দিতে পারলেই ওদের কলিজা ঠাণ্ডা হতো। এখানে ওদের এহেন মিথ্যা ষড়যন্ত্রকারীদের কঠোর শাস্তি ও করুণ পরিণতির কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
'বুহতান' (মিথ্যা অপবাদ) কাকে বলে তা এ আয়াত থেকে জানা যায়। কারো মধ্যে যে দোষ প্রকৃতই নেই বা যে লোক যে অপরাধ আদৌ করেনি, তা সেই ব্যক্তি করেছে বলে প্রচার করাই হলো 'বুহতান'। নবী করীম স.ও বুহুতান-এর এ অর্থই বুঝিয়েছেন। নবী করীম স.-এর নিকট জিজ্ঞেস করা হলো 'গীবত' কাকে বলে? তিনি বললেন, তোমার ভাইয়ের কথা এমনভাবে বলা, যা তার পক্ষে অসহ্য-অপসন্দনীয়। বলা হলো, “আমার ভাইয়ের মধ্যে যদি সে দোষত্রুটি বর্তমান থাকে তবুও?” নবী করীম স. বললেনঃ “তার মধ্যে সে দোষ বর্তমান থাকলে তো তুমি তার গীবত করলে, আর যদি তার মধ্যে ঐ স্বভাব না থাকে তবে, তুমি বুহতান অর্থাৎ মিথ্যা দোষারোপ করলে।"
আলোচ্য আয়াত দ্বারা কোনো মুসলমানকে শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া কষ্টদানের সম্পর্কে অবৈধতা প্রমাণিত হয়েছে। রসূলুল্লাহ স. বলেন, “সে লোকই প্রকৃত মুসলিম যার হাত ও যবান থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদে থাকে আর কেউ কষ্ট না পায়।” মুনাফিকদের পক্ষ থেকে সকল মুসলমান ও রসূলুল্লাহ স. দুই প্রকারে কষ্ট পেতেন। তাদের দ্বিবিধ নির্যাতনের একটি ছিল এই যে, মুসলমানদের দাসীরা কাজকর্মের জন্য বাইরে গেলে দুষ্ট প্রকৃতির মুনাফিকরা তাদেরকে উত্যক্ত করতো। তাদের দ্বিতীয় নির্যাতন ছিল, তারা সর্বদা মিথ্যা খবর রটনা করতো।
মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে কষ্ট দেয়া ও নিপীড়ন করা সম্পর্কে সূরা বুরুজে নিপীড়নকারীদের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক শাস্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আল কুরআনের সেই ঘোষণা হলো: "যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে নিপীড়ন করেছে। অতপর তাওবা করেনি, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি, তাদের জন্য আরও রয়েছে ভস্মকারী শাস্তি।" আয়াতটির তরজমা মাআরেফুল কুরআনে করা হয়েছে এভাবে-যারা মুমিন পুরুষ ও নারীকে নিপীড়ন করেছে। অতপর তাওবা করেনি, তাদের জন্য আছে জাহান্নামের শাস্তি, আর আছে দহন যন্ত্রণা।
টিকাঃ
(ফী যিলালিল কুরআন), (তাদাব্বুরে কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন), (মাআরেফুল কুরআন, তাফসীরে মাযহারী থেকে)