📘 আল কুরআনে নারী 📄 মুনাফিক নর-নারী ও কাফিরদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জাহান্নাম

📄 মুনাফিক নর-নারী ও কাফিরদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জাহান্নাম


وَعَدَ اللَّهُ الْمُنْفِقِينَ وَالْمُنْفِقْتِ وَالْكُفَّارَ نَارَ جَهَنَّمَ خَلِدِينَ فِيهَا هِيَ حَسَبُهُمْ ، وَلَعَنَهُمُ اللَّهُ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ مُّقِيمٌ (التوبه : ৬৮)

"আল্লাহ ওয়াদা করেছেন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীদের এবং কাফিরদের জন্যে জাহান্নামের আগুনের। তাতে তারা চিরদিন থাকবে। তাই তাদের জন্য যথেষ্ট। তাদের উপর আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, আর তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী আযাব।" -(সূরা আত তাওবা : ৬৮)

আলোচ্য আয়াতে মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীর জন্য আখিরাতের জীবনে কি পরিণতি হবে, সেই হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে। মুনাফিক নর-নারী এবং কাফিরদের পরকালীন জীবনের শাস্তি হলো চিরস্থায়ী জাহান্নাম। তারা মূলতঃ এমনি ধরনের শাস্তির যোগ্য। বাস্তবে ইসলামের দাবীদার হওয়া সত্ত্বেও মুনাফিকরা কোনোভাবে বাহ্যিক দাবীর কারণে রেহাই পাবে না। বরং প্রকাশ্য কুফরীর কারণে কাফিররা যেমন চিরদিনের জন্য জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, ঠিক তেমনিভাবে ইসলামের দাবীদার এসব গাদ্দারদেরও চিরদিনের তরে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে।

এ জাহান্নামের শাস্তিই তাদের জন্য যথেষ্ট অথবা তারা জাহান্নামের এমনি শাস্তি পাওয়ারই যোগ্য। এটা হচ্ছে তাদের উপর আল্লাহর লা'নত- অভিসম্পাত। তাদের এ শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার যাবতীয় দ্বার রুদ্ধ হয়ে যাবে। এ মুনাফিকরা এমন এক স্থায়ী আযাবে গ্রেফতার হবে যা থেকে তারা কখনো মুক্তি পাবে না।

মুনাফিকরা প্রধানতঃ দু' ধরনের। এক, যারা প্রকৃতপক্ষে ইসলামের বিরোধী হলেও কোনো দুনিয়াবী স্বার্থে বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। এরা ইসলাম নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করতো আর নতুন নতুন অপবাদ রটাতো। দুই, দ্বিধা-সংকোচকারী, এরা ইসলামকে তো সত্য দ্বীন মনে করতো বটে কিন্তু প্রথম প্রকারের মুনাফিকদের সাথে মেলামেশা করতো আর তাদের কথা- বার্তায়ও অংশগ্রহণ করতো। অতপর তাদের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়লে তারা নানারূপ হীলা-বাহানা করে ওযর পেশ করতো; বলতো এটা এ কারণে, ওটা এভাবে হয়ে গেছে। তাদের জবাবে বলা হতো, আচ্ছা যদি তোমাদের এসব ওযর গ্রহণ করাও হয়, তাহলেও তো কেবল তারাই রেহাই পেতে পারে যারা অন্যদের কথায় এমনটি করতো। কিন্তু যারা এসব বিশৃঙ্খলা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে বেড়ায় এবং অন্তরে ইসলামের শত্রুতা পোষণ করে তারা তো অবশ্যই শাস্তির যোগ্য। সর্বাবস্থায় মুনাফিকীর মাধ্যমে মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক মহিলাদের সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ব্যাপারে পরস্পরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ওরা যেন একই নীতি-আদর্শের রঙ্গে রঞ্জিত। ওদের চিন্তা-চেতনা ও কার্যক্রমের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কাফির ও মুনাফিকদের মধ্যে কার্যতঃ কোনো পার্থক্য নেই বিধায় ওরা উভয় শ্রেণীই চিরস্থায়ী জাহান্নামী।

টিকাঃ
(তাদাব্বুরে কুরআন), (তাফসীরে হাক্কানী)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন মহিলা সমাজে সৎ ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করে...

📄 মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন মহিলা সমাজে সৎ ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করে...


وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَونَ عَنِ الْمُنْكَرَ وَيُقِيمُونَ الصَّلوةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكُوةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ . أُولَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ ، إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ( التوبة : ৭১)

"মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন মহিলাগণ পরস্পরের বন্ধু-সাথী। তারা সৎ ও কল্যাণের নির্দেশ দেয় আর অসৎ ও অকল্যাণ থেকে বিরত রাখে, সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এরা তো এমন লোক যাদের প্রতি আল্লাহ অবশ্যই রহমত নাযিল করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, বেশ হিকমত ওয়ালা।" -(সূরা আত তাওবা: ৭১)

নিষ্ঠাবান মু'মিন ও মুনাফিকরা বাহ্যিকভাবে একই ইসলামের অনুসারীরূপে সমাজে বসবাস করে। মুনাফিকরা এমনি তো ইসলামের বাহ্যিক অনুষ্ঠানাদি পালন করে থাকে কিন্তু বাস্তবে এবং প্রকৃতপক্ষে মু'মিন ও মুনাফিকদের আমল-আখলাকে বিরাট পার্থক্য বরং বৈপরিত্য বিরাজ করে। মু'মিনরা ভাল ও কল্যাণমূলক কাজে পরস্পরকে সহায়তা ও সহযোগিতা করে থাকে আর মন্দ ও অকল্যাণকর কাজ থেকে নিজেরা কেবল দূরেই থাকে না বরং সমাজে ওসব কাজে তারা বাধার সৃষ্টি করে। সমাজকে সুশৃঙ্খল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকে। পক্ষান্তরে, মুনাফিকরা প্রকৃতপক্ষে এর বিপরীত কাজ করে থাকে। তারা করে ন্যায় ও সত্যের প্রতিরোধ আর অসৎ ও অকল্যাণ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। তাদের বাহ্যিক রূপ সমাজকল্যাণধর্মী প্রদর্শিত হলেও প্রকৃতপক্ষে তা বয়ে আনে সমাজের জন্য চরম অকল্যাণ ও অমঙ্গল। এজন্যে সূরা তাওবার ৬৭নং আয়াত এবং এ ৭১নং আয়াতে মুনাফিক ও মু'মিনকে স্বতন্ত্র গোষ্ঠী বা পৃথক উম্মতরূপে বিভক্ত করে প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে।

এ দু'টো আয়াতে লক্ষ্য করা যায় যে, মুনাফিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক দেখাতে গিয়ে বলা হয়েছে, بَعْضُهُمْ مِنْ بَعْضٍ (পরস্পর একজন থেকে আরেকজন) আর মু'মিনদের সম্পর্ক আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ (পরস্পর একে অপরের বন্ধু-সাথী) এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মুনাফিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ শুধুমাত্র বংশগত সমন্বয় ও উদ্দেশ্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। কাজেই তার স্থায়িত্ব দীর্ঘ নয় আর না তাতে সেই ফল লাভ করা সম্ভব হতে পারে, যা সম্ভব হয় আন্তরিক ভালবাসা ও আত্মিক সহানুভূতির মাধ্যমে। পক্ষান্তরে মু'মিনগণ একে অপরের আন্তরিক বন্ধু এবং সত্যিকার সহানুভূতিশীল।

মুনাফিকদের পরিচিতি ও আচরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তাদের পুরুষ ও মহিলারা সবাই একই চিন্তা-চেতনা লালন করে থাকে। মুনাফিকীর লালনে উভয়ের চেষ্টা-সাধনা অভিন্ন। পক্ষান্তরে ঈমানদার তথা প্রকৃত মু'মিনদের ব্যাপারে বলা হয়েছে তারা ঈমানের দাবী পূরণে পরস্পর একে অপরের সাথী। বন্ধু, সহযোগী হিতাকাঙ্ক্ষী। মু'মিন বান্দারা যখন জান-মাল দিয়ে জিহাদে বের হয়, তখন মু'মিন স্ত্রীরা তাদের অন্তরায় হওয়ার চেষ্টা করে না, বরং তারা আন্তরিকতা সহকারে স্বামীদের উৎসাহিত করে এবং নিজে ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্তরিক দোয়া, নিজের অনাবিল আনুগত্য ও আমানতদারী দিয়ে জিহাদে সহযোগিতা করে থাকে। আর এভাবে নিজেও স্বামীর সাথে জিহাদের প্রতিদানের ভাগী হয়ে থাকে।

মুনাফিকদের অবস্থা হলো তারা অন্যায় ও অসত্যের প্রশিক্ষণ ও প্রতিষ্ঠা করে আর সত্য ও ন্যায়ের বিরোধিতা করে। তারা আল্লাহর পথে ব্যয় থেকে মুষ্টিবদ্ধ থাকে। পক্ষান্তরে মু'মিনরা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা-অন্যায়ের প্রতিরোধ করে আর যাকাত আদায় করে আল্লাহর পথে ব্যয়ের হাত খোলা রাখে। আল্-কুরআন বিভিন্ন স্থানে কাফির ও মুনাফিকদের একত্র করেই তাদের ব্যাপারে একই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। কুফুরী ও মুনাফিকীতে নারী ও পুরুষ যারাই জড়িত তাদের স্বভাব-চরিত্র ও কার্যক্রম একই রকম। পার্থক্য শুধু নামের ও বাহ্যিকতার। কাফিররা ইসলামের প্রকাশ্য শত্রু; আর মুনাফিকরা হলো ছদ্ম শত্রু। এতদোভয়ের পুরুষ বা নারীর আদর্শিক ও চারিত্রিক সার্বিক সামঞ্জস্য আছে বিধায় উভয়ের চেষ্টা ও কার্যক্রম যেমন অভিন্ন, উভয়ের পরিণামও সে কারণেই অভিন্ন। সমাজে জনকল্যাণমূলক কাজে যেমন ঈমানদার পুরুষদের যথেষ্ট ভূমিকা থাকে, তেমনি ঈমানদার মহিলাদেরও অনুরূপ ভূমিকা ও উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। পক্ষান্তরে কাফির ও মুনাফিক পুরুষরা যেমন—সমাজে অসৎ কার্যক্রম ছড়ায় তেমনি কাফির ও মুনাফিক নারীরাও অসৎ কার্যক্রম ছড়িয়ে সমাজকে কলুষিত করে ছাড়ে। সুতরাং সমাজকল্যাণ, সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক শান্তি নির্ভর করে মানুষের আকীদা-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা ও কার্যক্রমের উপর—মানুষের নারী বা পুরুষ হওয়ার উপর নয়।

টিকাঃ
-(মা'আরেফুল কুরআন-কুরতুবী থেকে), (তাদাব্বুরে কুরআন)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মুমিনগণকে আল্লাহ তাআলার মহাসাফিল্যদানের ওয়াদা

📄 নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মুমিনগণকে আল্লাহ তাআলার মহাসাফিল্যদানের ওয়াদা


وَعَدَ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ جَنَّتِ تَجْرِى مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَلِدِينَ فِيهَا وَمَسْكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّتِ عَدْنٍ ، وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ ، ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ٥ - التوبة : ৭২

“আল্লাহ ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার মহিলাদের এমন জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন যার নিম্নদেশে ঝর্ণাসমূহ প্রবাহিত থাকবে, তারা সেখানে চিরদিন থাকবে। এই স্থায়ী জান্নাতে থাকবে উত্তম বাসস্থান। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো সেখানে তারা লাভ করবে আল্লাহর সন্তুষ্টি—আর এটিই হচ্ছে মহাসাফল্য।”-সূরা আত তাওবা : ৭২

পূর্বের আয়াতে অর্থাৎ এ সূরার ৭১ আয়াতে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর কতিপয় বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করা হয়েছে। যেসব বৈশিষ্ট্যের ফলে তারা আল্লাহর রহমতের যোগ্য হবেন। আয়াতে বর্ণিত বৈশিষ্ট্যগুলো হলো, ‘তারা ঈমান রূপ মহা নিয়ামতের তাওফীক পাওয়ার কারণে একে অপরের হিতাকাংখী বন্ধু, তারা পরস্পরকে ন্যায় ও সৎ কাজের নির্দেশ দেয় আর অন্যায় ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখে। তারা নামায কায়েম করে আর যাকাত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে। এসব লোকেরাই এমন, যাদের ওপর আল্লাহ রহমত নাযিল করেন।

এসব গুণবৈশিষ্ট্যের কারণে আল্লাহ তাদের জন্য ওয়াদা করেছেন জান্নাতের, যার তলদেশে ঝর্ণাসমূহ প্রবাহিত থাকবে, এটা কিন্তু স্বল্প সময়ের জন্য নয়, বরং তাদেরকে এসব নিয়ামত দেয়া হবে স্থায়ীভাবে—চিরদিনের জন্য। ওসব চিরস্থায়ী জান্নাতে তাদের জন্য থাকবে উত্তম বাসস্থান। তারা সেখানে আরও পাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রেজামন্দির মত দুর্লভ নিয়ামত— আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ দান। প্রকৃতপক্ষে এটাই জীবনের একমাত্র মহাসাফল্য, যথার্থ কামিয়াবী।

উপরোক্ত নিয়ামতসমূহ, আল্লাহর বিশেষ দান কারা পাবে? আলোচ্য আয়াতে সে কথাই বলা হয়েছে। উল্লেখিত গুণবৈশিষ্ট্যের অধিকারীরাই ওসব পুরস্কারের ভাগী হবে। বস্তুত ওসব পুরস্কার পাবে ঈমানদার নারী পুরুষগণ। অন্য কথায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ঈমান, আমল ও আখলাকের বদৌলতে তারা ওসব মহা নিয়ামত লাভে সমর্থ হবে। আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আখিরাতের প্রতি ঈমান; ঈমান অনুযায়ী আমল তথা দুনিয়ার জীবন অতিবাহিত করলো এবং সেই ঈমান ও আমলের অনুশীলনের মাধ্যমে পূত-পবিত্র আখলাক বা চরিত্র গঠন করতে পারলে, মানুষ আল্লাহর রহমতের যোগ্য হতে পারে। আর আল্লাহর রহমতের ভাগী হতে পারলেই তারা আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত-তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করতে সমর্থ হতে পারবে।

আসলে ঈমানের প্রভাবে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে যেমন স্বচ্ছতা ও সততার অধিকারী হয়ে থাকে, তেমনি তাদের আমল ও আখলাকের ফলে সমাজেও শান্তি শৃংখলা বিরাজ করে। সাহচর্য প্রভাবের কারণে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আচরণ পরস্পরকে যেমন প্রভাবিত করে তেমনি এর সফলও সমাজে প্রতিবিম্বিত হয়ে থাকে। পুরুষদের আল্লাহর পথে চলতে স্ত্রীরা বাধা না দিয়ে বরং সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে থাকে। আবার স্ত্রীদের সতীত্ব রক্ষায় সৎ জীবন যাপনে স্বামীরা তাদের সহায়ক ও পরিপুরক শক্তি হিসেবে কাজ করে থাকে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বস্ততা, আমানতদারী, আন্তরিকতা, ত্যাগ ও সহানুভূতির সুমধুর ভাব ও সম্পর্ক বিরাজ করে। এভাবে সমাজে নর-নারীর ঈমানী শক্তি তাদের দুনিয়ার জীবনে শান্তিময় পরিবেশ সৃষ্টির নিয়ামক হিসেবে কার্যকর হয়ে থাকে। নামায-রোযার মাধ্যমে যেমন তাদের আত্মিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুণ সৃষ্টি হয়, তেমনি যাকাত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের দিয়ে সামাজিক সৌহার্দ-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। সমাজে ন্যায় ও সৎকাজের প্রতিষ্ঠা আর অন্যায় ও অসৎকাজের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠে।

ঈমানদার নারী-পুরুষ ঈমানের বদৌলতে এমনি এক পর্যায়ে উন্নীত হয়ে আল্লাহর রহমতের ভাগী হতে পারে, তারা আল্লাহ সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। সর্বোপরি এভাবে তাদের জীবনের প্রকৃত সফলতা নিশ্চিত হতে পারে বলে আলোচ্য আয়াতে স্বয়ং রাব্বুল আলামীনই ঈমানাদার নারী ও ঈমানাদার পুরুষকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলার এ প্রতিশ্রুতি পুরুষের জন্য যতটুকু ঠিক ততটুকু নারীর জন্যেও। এখানে বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে ঈমান ও কুফর—পুরুষ বা নারী হওয়া নয়। আলোচ্য আয়াতে নারী-পুরুষদের যারাই সত্যিকারভাবে দীনকে বুঝে শুনে ঈমান আনবে তাদের পুরো জীবনে প্রকৃত সাফল্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তাদান করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর জীবনে মহাসাফল্যের ওয়াদা করে বলেছেন, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর জন্য আল্লাহ তাআলা চিরস্থায়ীভাবে জান্নাত দানের ওয়াদা করেছেন। দ্বিতীয়ত, তাদের প্রদত্ত জান্নাতে বাসোপযুগী উত্তম বাসস্থান দেয়ারও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সর্বোপরি, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টির মহান ঘোষণা। আল্লাহর দেয়া উল্লিখিত নিয়ামতসমূহের মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টিই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও মহান।

টিকাঃ
[তাফহীমুল কুরআন ও তাদাব্বুরে কুরআনের আলোকে]

📘 আল কুরআনে নারী 📄 আল্লাহ ছাড়া কারো দাসত্ব করবে না, আর মাতা-পিতার সেবা-যত্নের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখবে

📄 আল্লাহ ছাড়া কারো দাসত্ব করবে না, আর মাতা-পিতার সেবা-যত্নের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখবে


وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ، إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلْهُمَا فَلَا تَقُلْ لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَّهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا، وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيْنِي صَغِيرًا

"তোমার রব আদেশ করেছেন, একমাত্র তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত না করতে; আর মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে। তাদের একজন অথবা দুজনই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে পৌঁছে যায়, তবে তাদেরকে 'উহ' শব্দটিও বলবে না, তাদেরকে ধমক দিবে না, তাদের উভয়ের সাথে সম্মানসূচক কথা বলবে। সহৃদয়তার সাথে নম্রভাবে তাঁদের সামনে নত থাকবে, আর এই বলে দুআ করবে, হে রব! তাঁদের উভয়ের প্রতি তুমি রহম করো, যেভাবে তাঁরা উভয়ে আমার শিশুকালে আমাকে লালন-পালন করেছেন।"-সূরা বনী ইসরাঈল : ২৩-২৪

মানব জাতির শান্তি, কল্যাণ ও সাফল্য কিসে ও কিভাবে—তা একমাত্র সে সত্তাই ভাল জানেন, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করে লালন-পালন করেন। সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা আল্লাহ তাআলা মানুষকে দুনিয়ার জীবনে ইচ্ছাশক্তি ও কর্মের স্বাধীনতা দিয়ে তার জীবনের চলার পথও বাতলে দিয়েছেন। আল কুরআনই হচ্ছে আল্লাহর সেই পথনির্দেশিকা। আলোচ্য আয়াতে মানবজাতির জন্যে দুটি মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে। এক. মানবজাতি তাদের রব আল্লাহ ছাড়া কারো দাসত্ব করবে না, দুই. মানুষ নিজ নিজ মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। বস্তুত রাব্বুল আলামীনের রহমত ও ইচ্ছায় মানুষ জীবনী শক্তি পেয়ে পৃথিবীতে বেঁচে আছে, আর মাতা-পিতার অকৃত্রিম স্নেহ-মমতা ও সীমাহীন সহিষ্ণুতার বদৌলতে মানুষ দুনিয়াতে টিকে থাকতে পারছে। যেন মানুষকে আল্লাহর লালন-পালন কাজটির বাস্তবায়ন মাতা-পিতার মাধ্যমে সমাধান করছেন। এজন্যেই আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মানুষকে তার দাসত্ব করার নির্দেশের সাথে মাতা-পিতার খিদমত আনজাম দানের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

আলোচ্য আয়াতের বাচনভঙ্গিতে একথা বেরিয়ে এসেছে, যদি আল্লাহর ইবাদাত বা দাসত্বে অন্য কাউকেও সামান্যতম অংশীদার করার ন্যূনতম অবকাশও থাকতো, তবে তার অধিকারী হতো মাতা-পিতা। কিন্তু যেহেতু আল্লাহ নিজেই যখন মাতা-পিতাকে তার শরীক সাব্যস্ত করেননি, তখন অন্য কাউকে আল্লাহর সাথে শরীক করার প্রশ্নই উঠতে পারে না।

“তিনি ছাড়া কারো ইবাদাত করবে না।” কথাটির অর্থ কেবল এতটুকুই নয় যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পূজা করো না; বরং তার সাথে একথাও আসবে যে, দাসত্ব ও আনুগত্য এবং নিশর্তে ও নিসংকোচে মান্য করবে একমাত্র আল্লাহকে। তাঁর আদেশকেই একমাত্র আদেশ, তাঁর আইনকেই একমাত্র আইন বলে স্বীকার করবে ও মেনে চলবে। তাঁকে ছাড়া আর কারো প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্ব মেনে নিবে না।

ইমাম কুরতুবী র. বলেন, এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার প্রতি আদব-সম্মান এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করাকে নিজের ইবাদাতের সাথে একত্রিত করে ফরয করে দিয়েছেন। যেমন সূরা লুকমানে নিজের শোকরের সাথে মাতা-পিতার শোকরকে একত্রিত করে অপরিহার্য করে দিয়েছেন। বলা হয়েছে أن اشْكُرْلِي وَلِوَالِدَيْكَ অর্থাৎ আমার শোকর করো আর পিতা-মাতারও। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তাআলার ইবাদাতের পর পিতা-মাতার আনুগত্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার ন্যায় পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া ওয়াজিব। সহীহ বুখারীর একটি হাদীসও এর পক্ষে সাক্ষ দেয়। হাদীসে রয়েছে কোনো এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহকে প্রশ্ন করলো: আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় কাজ কোন্টি? তিনি বললেন, সময় হলে নামায পড়া। সে আবার প্রশ্ন করলো: এরপর কোন্ কাজটি সর্বাধিক প্রিয়? তিনি বললেন, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার।

পিতা-মাতা থেকে প্রতিশোধ নেয়ার অধিকার সন্তানের নেই। তাঁরা যুল্ম করলেও সন্তান তাদের সেবা-যত্ন ও আনুগত্যে হাত গুটিয়ে নিতে পারে না। বায়হাকী হযরত ইবনে আব্বাসের বাচনিক উদ্ধৃত করেছেন যে, রসূলুল্লাহ স. বলেন, "যে সেবা-যত্নকারী পুত্র পিতা-মাতার দিকে দয়া ও ভালবাসা সহকারে দৃষ্টিপাত করে তার প্রত্যেক দৃষ্টিপাতের বিনিময়ে সে একটি মকবুল হজ্জের সওয়াব পায়।" বায়হাকী শোআবুল ঈমানে আবু বকরা রা.-এর বাচনিক বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ স. বলেন, সকল গোনাহর শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা যেগুলোকে ইচ্ছা করেন কিয়ামত পর্যন্ত পিছিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু পিতা-মাতার হক নষ্ট করা এবং তাঁদের প্রতি অবাধ্য আচরণ করা এর ব্যতিক্রম। এর শাস্তি আখিরাতের পূর্বে দুনিয়াতেও দেয়া হয়।

পিতা-মাতার খিদমত সম্পর্কে কতিপয় জরুরী জ্ঞাতব্য:
১. সাধারণত পিতা-মাতার আনুগত্য সন্তানের উপর ওয়াজিব। এমনকি তারা কোনো সন্তানের প্রতি যুল্ম করলেও তাদের আনুগত্য, সেবা-খিদমত করা সেই সন্তানের কর্তব্য। তবে তারা যদি সন্তানকে শিরক বা আল্লাহর নাফরমানীর কাজে বাধ্য করে তাহলে কেবল সেই নির্দিষ্ট কাজে তাদের আনুগত্য করা যাবে না।
২. পিতা-মাতা অমুসলিম হলেও তাদের সেবা-যত্ন করতে হবে। হযরত আসমা রা. রসূলুল্লাহ স.-কে জিজ্ঞেস করেন, "আমার জননী মুশরিক। তিনি আমাকে দেখতে আসেন। তাঁকে আদর আপ্যায়ন করা জায়েয হবে কি?" তিনি বললেন, صِلِي أُمَّكِ তোমার জননীকে আদর-আপ্যায়ন করো।
৩. যে পর্যন্ত 'জিহাদ' ফরযে আইন পর্যায়ে না পৌঁছে-ফরযে কেফায়ার পর্যায়ে থেকে যায়, সে পর্যন্ত পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া সন্তানের জিহাদে যাওয়া জায়েয নয়।
৪. পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার যে নির্দেশ কুরআন ও হাদীসে উক্ত হয়েছে পিতা-মাতার আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবের সাথে সদ্ব্যবহার করাও এর অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে পিতা-মাতার ইন্তিকালের পর।
৫. পিতা-মাতার বার্ধক্য অবস্থায় তাঁদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে ও তাদের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। বার্ধক্যে উপনীত হলে পিতা-মাতা সন্তানের সেবা-যত্নের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে এবং তাঁদের জীবন সন্তানের দয়া ও কৃপার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আল কুরআন মানবজাতিকে এ দোয়া শিখিয়ে উক্ত বিষয়টির প্রতিই ইংগিত করেছে।

পিতা-মাতার বার্ধক্যাবস্থায় সন্তানের আচরণ বিধি:
আলোচ্য আয়াতে পিতা-মাতা বার্ধক্যে উপনীত হলে তাঁদের সাথে কিরূপ আচরণ করতে হবে সে বিষয়ে পাঁচটি আদেশ দেয়া হয়েছে :
এক. "তাদেরকে 'উহ্' শব্দটিও বলবে না।" তাঁদের দুজন অথবা একজন বার্ধক্যে পৌঁছলে তাঁদের কোনো কথায় বা আচরণে বিরক্তি প্রকাশক শব্দ 'উহ্' বলতে পারবে না।
দুই. "তাঁদেরকে ধমক দিবে না।" তাঁদের অসহায় অবস্থায় সন্তানদের ধমক শুনলে বড়ই মনোকষ্ট হওয়া স্বাভাবিক।
তিন. "তাঁদের উভয়ের সাথে সম্মানসূচক নম্রভাষায় কথা বলবে।" অতি নম্রস্বরে ভালবাসা ও ভক্তিশ্রদ্ধা প্রকাশক শব্দে কথা বলবে।
চার. "সহৃদয়তার সাথে নম্রভাবে তাঁদের সামনে নত থাকবে। অর্থাৎ তাঁদের সাথে অকৃত্রিম বিনয়সুলভ সদয় ব্যবহার প্রদর্শন করবে।
পাঁচ. তাঁদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করবে এই বলে যে, "হে রব! তাঁদের উভয়ের প্রতি তেমনি রহম করো যেমনি তাঁরা শিশুকালে আমাকে লালন-পালন করেছেন।"
পিতা-মাতার ষোলআনা হক আদায় করা কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই রাব্বুল আলামীনের দরবারে তাঁদের জন্য এ দুআ করবে। তাছাড়া তাঁদের ইন্তিকালের পরেও এ দুআ করে তাঁদের ঋণ শোধের চেষ্টা করা যায়।

টিকাঃ
(তাদাব্বুরে কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন), (কুরতুবী থেকে মাআরেফুল কুরআন), (তাফসীরে মাযহারী থেকে মাআরেফুল কুরআন), (মাআরেফুল কুরআন-কুরতুবী থেকে)

ফন্ট সাইজ
15px
17px