📄 অসাধু নারী সাধু পুরুষের স্ত্রী হলেও তার নাজাত নেই
فَانْجَيْنَهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ وَكَانَتْ مِنَ الْغَبِرِينَ، وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا . فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ (الاعراف : ৮৩-৮৪)
"অতপর আমি তাকে লূত (আ)-কে] ও তার আহালকে নাজাত দিলাম। কিন্তু তার স্ত্রীকে নয়; সেতো পেছনের লোকদের সাথেই রয়ে গেল। আমি তাদের উপর পাথর বৃষ্টি বর্ষণ করলাম। তারপর দেখ, ওসব অপরাধীর পরিণতি কেমন হয়েছে।" -(সূরা আল আ'রাফ : ৮৩-৮৪)
অসাধু নারী সাধু পুরুষের স্ত্রী হলেও তার নাজাত নেই
আল্লাহ তা'আলা উপরিউক্ত আযাব দিয়ে লূত (আ)-এর পুরো অবাধ্য উচ্ছৃঙ্খল জাতিকে ধ্বংস করে দিলেন। লূত (আ)-এর জাতির লোকেরা যখন তাঁর অবাধ্য হয়ে কেবল সেই অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতায় ডুবেই রইলো না, অধিকন্তু তারা এহেন মারাত্মক নৈতিকতা বিধ্বংসী কাজের বাধা সৃষ্টিকারী লূত (আ) ও তাঁর কতিপয় সঙ্গী-সাথীকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করলো; তখন তাদের উপর আল্লাহর আযাব অবধারিত হয়ে গেল। তাদের আযাব থেকে দূত (আ) ও তাঁর অল্প কতক অনুসারীকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা'আলা লূত (আ)-কে নির্দেশ দিলেন তিনি যেন শেষ রাতে তাঁর এক স্ত্রী ছাড়া সকল আহল ও সংঙ্গী-সাথীদের নিয়ে ঐ স্থান ত্যাগ করেন। আর তারা যেন পেছনের দিকে ফিরে না তাকান। কারণ, লুত (আ) সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই মুহূর্ত বিলম্ব না করে আযাব এসে যাবে।
হযরত লূত (আ) আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক তাঁর এক স্ত্রী ছাড়া বাকী আহলদের নিয়ে শেষ রাতে সাদুম ত্যাগ করেন। তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে দু' রকমের কথা আছে। এক, সে তাঁদের সাথে রওয়ানাই করেনি। দুই, সে তাঁদের সাথে রওয়ানা করে কিছু দূর গিয়ে আল্লাহর হুকুমের বিপরীতে পেছনের দিকে অপরাধীদের দেখতে চেয়েছিল। অমনি ওদের সাথে তাকেও আযাব এসে পাকড়াও করলো। কুরআনে আল্লাহর বাণী, فَانْجَيْنَهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ ، (الاعراف : ৮৩) "তার স্ত্রী ছাড়া তাকে ও তার আহলকে আমি নাজাত দিলাম।" এখানে 'আহল' বলতে কাদের বুঝানো হয়েছে সে সম্পর্কে মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ) তাঁর তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআনে বলেন, 'আহল' পরিবারকে বলা হয়।
কোনো কোনো তাফসীরকারকের মতে তাঁর পরিবারে তখন মাত্র দু'টো কন্যা মুসলমান হয়েছিল। কিন্তু তাঁর স্ত্রী মুসলমান হয়নি। আল-কুরআনের অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে: فَمَا وَجَدْنَا فِيهَا غَيْرَبَيْتٍ مِّنَ الْمُسْلِمِينَ অর্থাৎ 'সমস্ত জনবসতির মধ্যে একটি ঘর ছাড়া কোনো মুসলমান ছিল না।' এতে বুঝা যায় যে লূত (আ)-এর ঘরের লোকই শুধু মুসলমান ছিল। সুতরাং তারাই আযাব থেকে মুক্তি পেল। অবশ্য তাদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কোনো কোনো তাফসীরবিদ বলেন: 'আহ্ল' অর্থ ব্যাপক। এতে পরিবারের লোকজন এবং অন্যান্য মুসলমানকেও বুঝানো হয়েছে। মোটকথা, মাত্র অল্প ক'জনই মুসলমান ছিল। তাদেরকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা'আলা লুত (আ)-কে শেষ রাতে বেরিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
হযরত লূত (আ)-এর স্ত্রী নবী স্বামীর অবাধ্য ও আল্লাহর নাফরমানদের আদর্শে বিশ্বাসী-তথা আল্লাহদ্রোহীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল বিধায় নবীর স্ত্রী হয়েও আল্লাহর অযাব থেকে রক্ষা পায়নি। আল্লাহর সামগ্রিক আযাব তাকেও গ্রাস করে নিয়েছিল। ইসলামের ইতিহাসে এমনি বহু নযীর রয়েছে। যেমন হযরত নূহ (আ)-এর ছেলে 'কেন্-আন্' নবী পিতার অবাধ্য ছিল বিধায় সর্বগ্রাসী প্লাবন তাকেও ধ্বংস করে দিয়েছিল। অবাধ্য হলেও তো আপন ছেলে। তাই নবী নূহ (আ) তার নাজাতের জন্য আল্লাহর কাছে আরয করে বলেছিলেন: رَبِّ إِنَّ ابْنِي مِنْ أَهْلِى 'আমার ছেলে তো আমার আহল'। উত্তরে রাব্বুল আলামীন বললেন: إِنَّهَ لَيْসَ مِنْ أَهْلِكَ 'সে তো তোমার আহল নয়।' এতে বুঝা যায় আল্লাহ ও রাসূলের অবাধ্য হয়ে নবী-রাসূলের একান্ত আপনজন হলেও নিস্তর পাওয়া সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে হযরত ইবরাহীম (আ) অগ্নি পূজক আযরের ছেলে হয়েও মুসলিম মিল্লাতের পিতা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। সুতরাং কোনো মানুষের সম্পর্ক নয় বরং আল্লাহ ও রাসূলের সম্পর্ক তাদের হুকুম ও আদর্শ মেনে চলার মধ্যে নাজাত এবং অমান্য করার মধ্যে আযাব ও শাস্তি অবধারিত পরিণতি।
টিকাঃ
-(মা'আরেফুল কুরআন)
📄 মুনাফিক পুরুষ-মহিলা উভয়ই সমাজে অপকর্ম ছড়ায়...
الْمُنْفِقُونَ وَالْمُنْفِقْتُ بَعْضُهُمْ مِّنْ بَعْضٍ يَا مُرُونَ بِالْمُنْكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيهِمْ ، نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنْفِقِينَ هُمُ الْفَسِقُونَ (التوبة : ৬৭)
"মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক মহিলা সকলেই পরস্পরের অনুরূপ ভাবাপন্ন। তারা অসৎকাজের প্ররোচনা দেয়, সৎকাজে বাধা দেয় এবং (আল্লাহর পথে ব্যয় করার ও কল্যাণজনক কাজে) তাদের হাত বন্ধ করে রাখে। তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহও তাদের ভুলে গেছেন। নিশ্চয় মুনাফিকরাই ফাসিক।"-(সূরা আত তাওবা : ৬৭)
মুনাফিক পুরুষ-মহিলা উভয়ই সমাজে অপকর্ম ছড়ায় আর ভাল ও ন্যায় কাজে বাধার সৃষ্টি করে
আলোচ্য আয়াতে মুনাফিক নারী-পুরুষের মনোভাব ও তাদের কার্যক্রমের সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে বলা হয়েছে। মুনাফিক ব্যক্তি চাই সে পুরুষ হোক, অথবা হোক স্ত্রী; তাদের উভয়ের স্বভাব স্বরূপ অভিন্ন। তাদের কার্যক্রমের বৈশিষ্ট্যই এমন যে, তারা সমাজে অন্যায় ও গর্হিত কার্যক্রম ছড়িয়ে দেয়- সমাজকে অন্যায় ও মন্দ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। অথচ সমাজ সদস্যদের ভাল ও ন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। মুনাফিক তো তাকেই বলা হয় যার মধ্যে 'নিফাক' বা 'দ্বিমুখিতা' থাকে। الَّذِي لَا يُطَابِقُ ظَاهِرَه بَاطِنُه অর্থাৎ যার ভিতরের অবস্থা তার বাহ্যিক অবস্থার অনুরূপ নয়। অর্থাৎ ভিতরের অবস্থাটা খারাপ। এর মানে যার মনের ভাবধারা ও বাহ্যিক অবস্থা একরূপ নয়। সে-ই মুনাফিক।
হাদীস শরীফে মুনাফিকের তিনটি লক্ষণ বলে দেয়া হয়েছে। ১. কথা বলবে তো মিথ্যা বলবে, ২. ওয়াদা করলে তার বিপরীত কাজ করবে, ৩. তাকে কোনো কিছুর আমানতদার বানানো হলে সে তাতে খিয়ানত করবে। এ লক্ষণগুলো মুনাফিক পুরুষের মধ্যে যেমন লক্ষ্য করা যাবে, তেমনি মুনাফিক নারীর মধ্যেও এগুলো পাওয়া যাবে। সূরা আত তাওবার উক্ত আয়াতে বর্ণিত চরিত্র সকল মুনাফিকের মধ্যে সমানভাবে বর্তমান। অন্যায় ও অসত্যের প্রতি আকর্ষণ এবং সত্য ও ন্যায়ের সাথে শত্রুতা তাদের সকলের। কোনো খারাপ কাজ করতে চাইলে তাদের সহানুভূতি, পরামর্শ, সাহস ও সহযোগিতা, সুপারিশ ও প্রশংসা সবকিছুই তারা নিয়োজিত ও উৎসর্গকৃত করবে। তারা আন্তরিকভাবে সেই খারাপ কাজে শরীক হবে, অন্যদেরকেও তাতে শরীক হওয়ার জন্য উৎসাহিত করবে। পক্ষান্তরে সমাজে কেউ কোনো ভাল কাজ করতে শুরু করলে যেন এ খবরটাই তাদের জন্য দুঃসহ হয়ে পড়ে। তারা তখন সম্ভাব্য সকল পথেই তার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এই ভাল কাজ থেকে তাকে বিরত রাখার জন্য যে কোনো পথ ধরতে বা যে কোনো ব্যবস্থা নিতে তারা মোটেই কুণ্ঠিত হয় না।
الْمُنْفِقُونَ وَالْمُنْفِقْتُ بَعْضُهُمْ مِّنْ بَعْضٍ
এখানে মুনাফিক পুরুষদের সাথে মুনাফিক স্ত্রীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর উভয়কেই সমান অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এতে করে যেন তাদের এ বিষয়ে সাবধানতা আসে যে, তাদের পুরুষদের যে করুণ পরিণতি হবে তাদের মহিলাদেরও একই পরিণতি হবে। যদি তারা (নারীরা) স্বতন্ত্রভাবে নিজেদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে। দ্বীনের ব্যাপারে অধীনস্থ হওয়ার ওযর মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং নর-নারী নির্বিশেষে সকলকেই নিজ নিজ মুক্তির জন্য নিজেকেই চেষ্টা-সাধনা চালিয়ে যেতে হবে। এতে বুঝা যায়, মুনাফিকির খেলায় মহিলাদেরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।
টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন), (তাদাব্বুরে কুরআন- মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী)
📄 মুনাফিক নর-নারী ও কাফিরদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জাহান্নাম
وَعَدَ اللَّهُ الْمُنْفِقِينَ وَالْمُنْفِقْتِ وَالْكُفَّارَ نَارَ جَهَنَّمَ خَلِدِينَ فِيهَا هِيَ حَسَبُهُمْ ، وَلَعَنَهُمُ اللَّهُ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ مُّقِيمٌ (التوبه : ৬৮)
"আল্লাহ ওয়াদা করেছেন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীদের এবং কাফিরদের জন্যে জাহান্নামের আগুনের। তাতে তারা চিরদিন থাকবে। তাই তাদের জন্য যথেষ্ট। তাদের উপর আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, আর তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী আযাব।" -(সূরা আত তাওবা : ৬৮)
আলোচ্য আয়াতে মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীর জন্য আখিরাতের জীবনে কি পরিণতি হবে, সেই হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে। মুনাফিক নর-নারী এবং কাফিরদের পরকালীন জীবনের শাস্তি হলো চিরস্থায়ী জাহান্নাম। তারা মূলতঃ এমনি ধরনের শাস্তির যোগ্য। বাস্তবে ইসলামের দাবীদার হওয়া সত্ত্বেও মুনাফিকরা কোনোভাবে বাহ্যিক দাবীর কারণে রেহাই পাবে না। বরং প্রকাশ্য কুফরীর কারণে কাফিররা যেমন চিরদিনের জন্য জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, ঠিক তেমনিভাবে ইসলামের দাবীদার এসব গাদ্দারদেরও চিরদিনের তরে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে।
এ জাহান্নামের শাস্তিই তাদের জন্য যথেষ্ট অথবা তারা জাহান্নামের এমনি শাস্তি পাওয়ারই যোগ্য। এটা হচ্ছে তাদের উপর আল্লাহর লা'নত- অভিসম্পাত। তাদের এ শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার যাবতীয় দ্বার রুদ্ধ হয়ে যাবে। এ মুনাফিকরা এমন এক স্থায়ী আযাবে গ্রেফতার হবে যা থেকে তারা কখনো মুক্তি পাবে না।
মুনাফিকরা প্রধানতঃ দু' ধরনের। এক, যারা প্রকৃতপক্ষে ইসলামের বিরোধী হলেও কোনো দুনিয়াবী স্বার্থে বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। এরা ইসলাম নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করতো আর নতুন নতুন অপবাদ রটাতো। দুই, দ্বিধা-সংকোচকারী, এরা ইসলামকে তো সত্য দ্বীন মনে করতো বটে কিন্তু প্রথম প্রকারের মুনাফিকদের সাথে মেলামেশা করতো আর তাদের কথা- বার্তায়ও অংশগ্রহণ করতো। অতপর তাদের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়লে তারা নানারূপ হীলা-বাহানা করে ওযর পেশ করতো; বলতো এটা এ কারণে, ওটা এভাবে হয়ে গেছে। তাদের জবাবে বলা হতো, আচ্ছা যদি তোমাদের এসব ওযর গ্রহণ করাও হয়, তাহলেও তো কেবল তারাই রেহাই পেতে পারে যারা অন্যদের কথায় এমনটি করতো। কিন্তু যারা এসব বিশৃঙ্খলা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে বেড়ায় এবং অন্তরে ইসলামের শত্রুতা পোষণ করে তারা তো অবশ্যই শাস্তির যোগ্য। সর্বাবস্থায় মুনাফিকীর মাধ্যমে মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক মহিলাদের সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ব্যাপারে পরস্পরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ওরা যেন একই নীতি-আদর্শের রঙ্গে রঞ্জিত। ওদের চিন্তা-চেতনা ও কার্যক্রমের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কাফির ও মুনাফিকদের মধ্যে কার্যতঃ কোনো পার্থক্য নেই বিধায় ওরা উভয় শ্রেণীই চিরস্থায়ী জাহান্নামী।
টিকাঃ
(তাদাব্বুরে কুরআন), (তাফসীরে হাক্কানী)
📄 মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন মহিলা সমাজে সৎ ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করে...
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَونَ عَنِ الْمُنْكَرَ وَيُقِيمُونَ الصَّلوةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكُوةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ . أُولَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ ، إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ( التوبة : ৭১)
"মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন মহিলাগণ পরস্পরের বন্ধু-সাথী। তারা সৎ ও কল্যাণের নির্দেশ দেয় আর অসৎ ও অকল্যাণ থেকে বিরত রাখে, সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এরা তো এমন লোক যাদের প্রতি আল্লাহ অবশ্যই রহমত নাযিল করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, বেশ হিকমত ওয়ালা।" -(সূরা আত তাওবা: ৭১)
নিষ্ঠাবান মু'মিন ও মুনাফিকরা বাহ্যিকভাবে একই ইসলামের অনুসারীরূপে সমাজে বসবাস করে। মুনাফিকরা এমনি তো ইসলামের বাহ্যিক অনুষ্ঠানাদি পালন করে থাকে কিন্তু বাস্তবে এবং প্রকৃতপক্ষে মু'মিন ও মুনাফিকদের আমল-আখলাকে বিরাট পার্থক্য বরং বৈপরিত্য বিরাজ করে। মু'মিনরা ভাল ও কল্যাণমূলক কাজে পরস্পরকে সহায়তা ও সহযোগিতা করে থাকে আর মন্দ ও অকল্যাণকর কাজ থেকে নিজেরা কেবল দূরেই থাকে না বরং সমাজে ওসব কাজে তারা বাধার সৃষ্টি করে। সমাজকে সুশৃঙ্খল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকে। পক্ষান্তরে, মুনাফিকরা প্রকৃতপক্ষে এর বিপরীত কাজ করে থাকে। তারা করে ন্যায় ও সত্যের প্রতিরোধ আর অসৎ ও অকল্যাণ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। তাদের বাহ্যিক রূপ সমাজকল্যাণধর্মী প্রদর্শিত হলেও প্রকৃতপক্ষে তা বয়ে আনে সমাজের জন্য চরম অকল্যাণ ও অমঙ্গল। এজন্যে সূরা তাওবার ৬৭নং আয়াত এবং এ ৭১নং আয়াতে মুনাফিক ও মু'মিনকে স্বতন্ত্র গোষ্ঠী বা পৃথক উম্মতরূপে বিভক্ত করে প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে।
এ দু'টো আয়াতে লক্ষ্য করা যায় যে, মুনাফিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক দেখাতে গিয়ে বলা হয়েছে, بَعْضُهُمْ مِنْ بَعْضٍ (পরস্পর একজন থেকে আরেকজন) আর মু'মিনদের সম্পর্ক আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ (পরস্পর একে অপরের বন্ধু-সাথী) এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মুনাফিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ শুধুমাত্র বংশগত সমন্বয় ও উদ্দেশ্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। কাজেই তার স্থায়িত্ব দীর্ঘ নয় আর না তাতে সেই ফল লাভ করা সম্ভব হতে পারে, যা সম্ভব হয় আন্তরিক ভালবাসা ও আত্মিক সহানুভূতির মাধ্যমে। পক্ষান্তরে মু'মিনগণ একে অপরের আন্তরিক বন্ধু এবং সত্যিকার সহানুভূতিশীল।
মুনাফিকদের পরিচিতি ও আচরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তাদের পুরুষ ও মহিলারা সবাই একই চিন্তা-চেতনা লালন করে থাকে। মুনাফিকীর লালনে উভয়ের চেষ্টা-সাধনা অভিন্ন। পক্ষান্তরে ঈমানদার তথা প্রকৃত মু'মিনদের ব্যাপারে বলা হয়েছে তারা ঈমানের দাবী পূরণে পরস্পর একে অপরের সাথী। বন্ধু, সহযোগী হিতাকাঙ্ক্ষী। মু'মিন বান্দারা যখন জান-মাল দিয়ে জিহাদে বের হয়, তখন মু'মিন স্ত্রীরা তাদের অন্তরায় হওয়ার চেষ্টা করে না, বরং তারা আন্তরিকতা সহকারে স্বামীদের উৎসাহিত করে এবং নিজে ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্তরিক দোয়া, নিজের অনাবিল আনুগত্য ও আমানতদারী দিয়ে জিহাদে সহযোগিতা করে থাকে। আর এভাবে নিজেও স্বামীর সাথে জিহাদের প্রতিদানের ভাগী হয়ে থাকে।
মুনাফিকদের অবস্থা হলো তারা অন্যায় ও অসত্যের প্রশিক্ষণ ও প্রতিষ্ঠা করে আর সত্য ও ন্যায়ের বিরোধিতা করে। তারা আল্লাহর পথে ব্যয় থেকে মুষ্টিবদ্ধ থাকে। পক্ষান্তরে মু'মিনরা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা-অন্যায়ের প্রতিরোধ করে আর যাকাত আদায় করে আল্লাহর পথে ব্যয়ের হাত খোলা রাখে। আল্-কুরআন বিভিন্ন স্থানে কাফির ও মুনাফিকদের একত্র করেই তাদের ব্যাপারে একই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। কুফুরী ও মুনাফিকীতে নারী ও পুরুষ যারাই জড়িত তাদের স্বভাব-চরিত্র ও কার্যক্রম একই রকম। পার্থক্য শুধু নামের ও বাহ্যিকতার। কাফিররা ইসলামের প্রকাশ্য শত্রু; আর মুনাফিকরা হলো ছদ্ম শত্রু। এতদোভয়ের পুরুষ বা নারীর আদর্শিক ও চারিত্রিক সার্বিক সামঞ্জস্য আছে বিধায় উভয়ের চেষ্টা ও কার্যক্রম যেমন অভিন্ন, উভয়ের পরিণামও সে কারণেই অভিন্ন। সমাজে জনকল্যাণমূলক কাজে যেমন ঈমানদার পুরুষদের যথেষ্ট ভূমিকা থাকে, তেমনি ঈমানদার মহিলাদেরও অনুরূপ ভূমিকা ও উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। পক্ষান্তরে কাফির ও মুনাফিক পুরুষরা যেমন—সমাজে অসৎ কার্যক্রম ছড়ায় তেমনি কাফির ও মুনাফিক নারীরাও অসৎ কার্যক্রম ছড়িয়ে সমাজকে কলুষিত করে ছাড়ে। সুতরাং সমাজকল্যাণ, সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক শান্তি নির্ভর করে মানুষের আকীদা-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা ও কার্যক্রমের উপর—মানুষের নারী বা পুরুষ হওয়ার উপর নয়।
টিকাঃ
-(মা'আরেফুল কুরআন-কুরতুবী থেকে), (তাদাব্বুরে কুরআন)