📘 আল কুরআনে নারী 📄 আল্লাহর হুকুমের অবাধ্যতায় নারী-পুরুষ উভয়কেই চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়

📄 আল্লাহর হুকুমের অবাধ্যতায় নারী-পুরুষ উভয়কেই চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়


وَيَادَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ فَكُلا مِنْ حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هُذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ (الاعراف : ১৯)
"ও আদম! তুমি আর তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর। তোমরা দু'জনেই যেখান থেকে ইচ্ছা খাও, কিন্তু এ গাছটির কাছেও যেয়ো না। তাহলে তো তোমরা যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।"-(সূরা আল আ'রাফ : ১৯)

আল্লাহর হুকুমের অবাধ্যতায় নারী-পুরুষ উভয়কেই চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়।

আলোচ্য আয়াতে পৃথিবীর প্রথম নর-নারীর বাসস্থান ও অন্ন সংস্থান সম্পর্কিত নির্দেশের উল্লেখ রয়েছে। পূর্ববর্তী কয়েকটি আয়াতে মানব সৃষ্টির ইতিহাস আলোচনা করা হয়েছে। এ প্রসংগে সূরা আ'রাফের এগার নম্বর আয়াত থেকে আঠার নম্বর আয়াত পর্যন্ত দেখা যেতে পারে। এ আয়াতগুলোতে মানব সৃষ্টির ইতিহাস ও শয়তানের শত্রুতার সূচনার বিষয় বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাতে বলেন, "আমি তোমাদের সৃষ্টির সূচনা করলাম, তারপর তোমাদের আকৃতি দান করলাম ; অতপর ফেরেশতাদের বললাম, আদমকে সিজদা করো। এ নির্দেশ অনুযায়ী সবাই সিজদা করলো কিন্তু ইবলীস করলো না-সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলো না। আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, আমি যখন তোকে সিজদা করতে হুকুম দিলাম তখন তোকে সিজদা করতে বাধা দিল কিসে?" সে বললো, "আমি তো ওর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমাকে সৃষ্টি করেছো আগুন থেকে আর ওকে সৃষ্টি করেছো মাটি থেকে।" তিনি বললেন, "ঠিক আছে তুই এখান থেকে নেমে যা। এখানে অহংকার করার অধিকার তোর নেই। বের হয়ে যা। তুই তো ওদেরই অন্তর্ভুক্ত যারা নিজেরাই নিজেদের লাঞ্ছিত করতে চায়।" সে বললো, "আমাকে সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দাও যেদিন ওদের উঠানো হবে।" তিনি বললেন, "তোকে অবকাশ দেয়া হলো।" সে বললো, "তুমি যেমন আমাকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করেছো, আমিও তেমনি তোমার সরল-সত্য পথে ওদের জন্য ওঁত পেতে বসে থাকবো, ওদের সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে সবদিক থেকে ঘিরে ধরবো- ওদের অধিকাংশকে তুমি শোকর-গুজার পাবে না।" আল্লাহ বললেন, "বের হয়ে যা তুই এখান থেকে লাঞ্ছিত ও ধিকৃত হয়ে। নিশ্চিত জেনে রাখ, এদের মধ্য থেকে যারাই তোর অনুসরণ করবে তাদেরকে এবং তোকে দিয়ে জাহান্নাম ভরে দেবো।"

আলোচ্য আয়াতের পূর্বের আয়াতগুলোতে আদম সৃষ্টি ও শয়তানের অবাধ্যতা এবং বনী আদমের সাথে শয়তানের শত্রুতার সূচনা সম্পর্কে উপরিউক্ত কথাগুলো বলা হয়েছে। অতপর এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ)-কে লক্ষ্য করে তার চির শত্রু শয়তানের চক্রান্ত থেকে বেঁচে থাকার জন্য সাবধানতা অবলম্বনের পথ বাতলে দিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন আদমের সাথী হিসেবে হাওয়া (আ)-কে সৃষ্টি করে তাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে জান্নাতে বসবাস করার নির্দেশ দিয়ে বললেন, "ও আদম! তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে জান্নাতে বসবাস কর। আর জান্নাতের যেখান থেকে ইচ্ছা পানাহার কর। কিন্তু এ গাছটির ধারেও যেয়ো না-তাহলে তোমরা উভয়ে যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বে।"

সূরা আল বাকারার ৪র্থ রুকূ'তেও বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সেখানে আলোচ্য আয়াতটির সাথে এ আয়াতের হুবহু মিল রয়েছে। সূরা আল বাকারার ৩৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে: وَقُلْنَا يَآدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هٰذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظّٰلِمِينَ(البقرة:৩৫) "আর আমি বললাম, "ও আদম! তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে জান্নাতে বসবাস করো, আর দু'জনে এ থেকে স্বাচ্ছন্দে পানাহার করো। তবে এ গাছটির ধারেও যেয়ো না-তাহলে তোমরা উভয়েই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বে।"-(সূরা আল বাকারা: ৩৫)

একই বিষয়ের বর্ণনায় উপরোক্ত সূরা আল বাকারা, সূরা আল আরাফের দু'টো আয়াতেই জান্নাতে বসবাসের নির্দেশনায় আল্লাহ তা'আলা সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন হযরত আদম (আ)-কে; আর এ নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত করেছেন তার স্ত্রীকে। বলেছেন: اُسْكُنْ اَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ "তুমি বসবাস করো তোমার স্ত্রীকে নিয়ে জান্নাতে” লক্ষণীয় যে, এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বসবাসের ব্যাপারে কেবল আদম (আ)-কেই সম্বোধন করেছেন। এ ব্যাপারে উভয়কে সম্বোধন করা হয়নি। আয়াতে বসবাসের ও জীবন ধারণের ক্ষেত্রে আদমকেই উদ্দেশ্য করে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কারণ, হাওয়া (আ) ছিলেন আদম (আ)-এর অধীন। আয়াতের পরবর্তী অংশে খানা-পিনার বিষয়ে উভকেই সম্বোধন করা হয়েছে। আয়াতের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, স্ত্রীগণের থাকার ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে স্বামীর উপর, কিন্তু আল্লাহর বিধি-নিষেধ মেনে চলার ব্যাপারে উভয়ই স্বতন্ত্রভাবে দায়ী। স্ত্রীর অবস্থান সংক্রান্ত যাবতীয় দায়-দায়িত্ব স্বামীর উপর ন্যস্ত হলেও আল্লাহর হুকুম-আহকাম পালনের ব্যাপারে উভয়কেই সম্বোধন করা হয়েছে বিধায় এ বিষয়ে স্বামী-স্ত্রী স্বতন্ত্রভাবে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে দায়ী।

আল্লাহ তা'আলা আদম-হাওয়ার বাসস্থান ব্যবস্থার সমাধান স্বরূপ এ নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও এতে বলে দেয়া হয়েছে। আর বলে দেয়া হয়েছে এসবের সীমারেখাও। আল্লাহর দেয়া সীমারেখা লংঘন করা হলে তার পরিণতি সম্পর্কেও সাবধান করে দেয়া হয়েছে। তারপর শয়তান তাদের উভয়কে (আদম-হাওয়া) ওয়াসওয়াসা দিল, যাতে তাদের সামনে প্রকাশ করে দেয় (তাদের লজ্জাস্থান), যা তাদের কাছে গোপন ছিল। অর্থাৎ এমন ওয়াসওয়াসা দিল যাতে করে আদম-হাওয়াকে তাদের বেহেশতী লেবাস থেকে বঞ্চিত করা হয়। তারা বিবস্ত্র হয়ে পড়লো। সে বললো, "তোমাদের রব এ গাছ থেকে নিষেধ করার কারণ একমাত্র এই যে, এতে তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাবে অথবা, চিরন্তন জীবন লাভ করে বসবে। সে তাদের উভয়কে কসম করে বললো, "আমি তোমাদের জন্য অবশ্যই কল্যাণকামী" এভাবে সে তাদের প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে ফেললো। শেষ পর্যন্ত যখন তারা উভয়ে ঐ গাছের স্বাদ আস্বাদন করলো, তাদের গোপন অঙ্গসমূহ তাদের সামনে খুলে গেল। তারা নিজেদের অঙ্গ জান্নাতের পাতা দিয়ে ঢাকতে লাগলো। তখন তাদের রব তাদের ডেকে বললেন, আমি কি তোমাদের ঐ গাছটি থেকে নিষেধ করিনি? আর তোমাদের বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?"

মানুষের চির শত্রু শয়তান আদম-হাওয়াকে প্রতারিত করে বিপদে ফেলার জন্য তাদের হিতাকাঙ্ক্ষী হয়ে কসম করে তাদেরকে আল্লাহর কথা অমান্য করাতে সক্ষম হলো। তারা উভয়ে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেলেন। অমনি তাঁদের বেহেশতী লেবাস খুলে গেলে তাঁরা লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য জান্নাতী গাছের পাতা শরীরে ধারণ করলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, সাধারণত একথা প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত যে, শয়তান প্রথমে বিবি হাওয়াকে প্রতারিত করতে সক্ষম হয়েছিল। পরে তাকে দিয়ে আদম (আ) -কে প্রতারিত করা হয়েছিল। কিন্তু কুরআন থেকে জানা যায় যে, আদম-হাওয়া উভয়কেই একই সময়ে শয়তান প্রতারিত করেছিল। কুরআন বলে: فَدَلَّهُمَا بِغُرُورِ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوَاتُهُمَا "সে দু'জনকেই প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে ফেললো, আর যখন দু'জনেই গাছটির স্বাদ আস্বাদন করলো তখন তাদের উভয়ের সামনে উভয়ের লজ্জাস্থান খুলে গেল।"-(সূরা আল আ'রাফ: ২২)

শয়তান কর্তৃক আদম-হাওয়ার প্রতারিত হওয়ার ইতিহাসের একথাটি কুরআনে সুস্পষ্টভাবেই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু শয়তান প্রথমে বিবি হাওয়াকে প্রতারিত করেছে, অতপর তারই মাধ্যমে আদম (আ)-কে প্রতারিত করা হয়েছে। একথাটি গুরুত্ব সহকারে লক্ষ্য করার বিষয়। কারণ এতে করে নারী জাতির নৈতিক, আইনগত ও সামাজিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করার ব্যাপারে সাংঘাতিক কাজ করেছে। আর এতে করে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, মানুষের যাবতীয় বিপর্যয়ের দ্বার উন্মুক্ত হওয়ার পেছনে নারীরা দায়ী। আল-কুরআনের উপরোক্ত আয়াতে মূলতঃ এ ধরনের কাল্পনিক কথার প্রতিবাদ করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে আল্লাহর নাফরমানী করলে নারী-পুরুষ উভয়কেই চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়।

টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন অবলম্বনে), (তাফসীরে মাযহারী অবলম্বনে)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 অসাধু নারী সাধু পুরুষের স্ত্রী হলেও তার নাজাত নেই

📄 অসাধু নারী সাধু পুরুষের স্ত্রী হলেও তার নাজাত নেই


فَانْجَيْنَهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ وَكَانَتْ مِنَ الْغَبِرِينَ، وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا . فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ (الاعراف : ৮৩-৮৪)
"অতপর আমি তাকে লূত (আ)-কে] ও তার আহালকে নাজাত দিলাম। কিন্তু তার স্ত্রীকে নয়; সেতো পেছনের লোকদের সাথেই রয়ে গেল। আমি তাদের উপর পাথর বৃষ্টি বর্ষণ করলাম। তারপর দেখ, ওসব অপরাধীর পরিণতি কেমন হয়েছে।" -(সূরা আল আ'রাফ : ৮৩-৮৪)

অসাধু নারী সাধু পুরুষের স্ত্রী হলেও তার নাজাত নেই

আল্লাহ তা'আলা উপরিউক্ত আযাব দিয়ে লূত (আ)-এর পুরো অবাধ্য উচ্ছৃঙ্খল জাতিকে ধ্বংস করে দিলেন। লূত (আ)-এর জাতির লোকেরা যখন তাঁর অবাধ্য হয়ে কেবল সেই অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতায় ডুবেই রইলো না, অধিকন্তু তারা এহেন মারাত্মক নৈতিকতা বিধ্বংসী কাজের বাধা সৃষ্টিকারী লূত (আ) ও তাঁর কতিপয় সঙ্গী-সাথীকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করলো; তখন তাদের উপর আল্লাহর আযাব অবধারিত হয়ে গেল। তাদের আযাব থেকে দূত (আ) ও তাঁর অল্প কতক অনুসারীকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা'আলা লূত (আ)-কে নির্দেশ দিলেন তিনি যেন শেষ রাতে তাঁর এক স্ত্রী ছাড়া সকল আহল ও সংঙ্গী-সাথীদের নিয়ে ঐ স্থান ত্যাগ করেন। আর তারা যেন পেছনের দিকে ফিরে না তাকান। কারণ, লুত (আ) সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই মুহূর্ত বিলম্ব না করে আযাব এসে যাবে।

হযরত লূত (আ) আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক তাঁর এক স্ত্রী ছাড়া বাকী আহলদের নিয়ে শেষ রাতে সাদুম ত্যাগ করেন। তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে দু' রকমের কথা আছে। এক, সে তাঁদের সাথে রওয়ানাই করেনি। দুই, সে তাঁদের সাথে রওয়ানা করে কিছু দূর গিয়ে আল্লাহর হুকুমের বিপরীতে পেছনের দিকে অপরাধীদের দেখতে চেয়েছিল। অমনি ওদের সাথে তাকেও আযাব এসে পাকড়াও করলো। কুরআনে আল্লাহর বাণী, فَانْجَيْنَهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ ، (الاعراف : ৮৩) "তার স্ত্রী ছাড়া তাকে ও তার আহলকে আমি নাজাত দিলাম।" এখানে 'আহল' বলতে কাদের বুঝানো হয়েছে সে সম্পর্কে মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ) তাঁর তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআনে বলেন, 'আহল' পরিবারকে বলা হয়।

কোনো কোনো তাফসীরকারকের মতে তাঁর পরিবারে তখন মাত্র দু'টো কন্যা মুসলমান হয়েছিল। কিন্তু তাঁর স্ত্রী মুসলমান হয়নি। আল-কুরআনের অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে: فَمَا وَجَدْنَا فِيهَا غَيْرَبَيْتٍ مِّنَ الْمُسْلِمِينَ অর্থাৎ 'সমস্ত জনবসতির মধ্যে একটি ঘর ছাড়া কোনো মুসলমান ছিল না।' এতে বুঝা যায় যে লূত (আ)-এর ঘরের লোকই শুধু মুসলমান ছিল। সুতরাং তারাই আযাব থেকে মুক্তি পেল। অবশ্য তাদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কোনো কোনো তাফসীরবিদ বলেন: 'আহ্ল' অর্থ ব্যাপক। এতে পরিবারের লোকজন এবং অন্যান্য মুসলমানকেও বুঝানো হয়েছে। মোটকথা, মাত্র অল্প ক'জনই মুসলমান ছিল। তাদেরকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা'আলা লুত (আ)-কে শেষ রাতে বেরিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

হযরত লূত (আ)-এর স্ত্রী নবী স্বামীর অবাধ্য ও আল্লাহর নাফরমানদের আদর্শে বিশ্বাসী-তথা আল্লাহদ্রোহীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল বিধায় নবীর স্ত্রী হয়েও আল্লাহর অযাব থেকে রক্ষা পায়নি। আল্লাহর সামগ্রিক আযাব তাকেও গ্রাস করে নিয়েছিল। ইসলামের ইতিহাসে এমনি বহু নযীর রয়েছে। যেমন হযরত নূহ (আ)-এর ছেলে 'কেন্-আন্' নবী পিতার অবাধ্য ছিল বিধায় সর্বগ্রাসী প্লাবন তাকেও ধ্বংস করে দিয়েছিল। অবাধ্য হলেও তো আপন ছেলে। তাই নবী নূহ (আ) তার নাজাতের জন্য আল্লাহর কাছে আরয করে বলেছিলেন: رَبِّ إِنَّ ابْنِي مِنْ أَهْلِى 'আমার ছেলে তো আমার আহল'। উত্তরে রাব্বুল আলামীন বললেন: إِنَّهَ لَيْসَ مِنْ أَهْلِكَ 'সে তো তোমার আহল নয়।' এতে বুঝা যায় আল্লাহ ও রাসূলের অবাধ্য হয়ে নবী-রাসূলের একান্ত আপনজন হলেও নিস্তর পাওয়া সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে হযরত ইবরাহীম (আ) অগ্নি পূজক আযরের ছেলে হয়েও মুসলিম মিল্লাতের পিতা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। সুতরাং কোনো মানুষের সম্পর্ক নয় বরং আল্লাহ ও রাসূলের সম্পর্ক তাদের হুকুম ও আদর্শ মেনে চলার মধ্যে নাজাত এবং অমান্য করার মধ্যে আযাব ও শাস্তি অবধারিত পরিণতি।

টিকাঃ
-(মা'আরেফুল কুরআন)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 মুনাফিক পুরুষ-মহিলা উভয়ই সমাজে অপকর্ম ছড়ায়...

📄 মুনাফিক পুরুষ-মহিলা উভয়ই সমাজে অপকর্ম ছড়ায়...


الْمُنْفِقُونَ وَالْمُنْفِقْتُ بَعْضُهُمْ مِّنْ بَعْضٍ يَا مُرُونَ بِالْمُنْكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيهِمْ ، نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنْفِقِينَ هُمُ الْفَسِقُونَ (التوبة : ৬৭)
"মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক মহিলা সকলেই পরস্পরের অনুরূপ ভাবাপন্ন। তারা অসৎকাজের প্ররোচনা দেয়, সৎকাজে বাধা দেয় এবং (আল্লাহর পথে ব্যয় করার ও কল্যাণজনক কাজে) তাদের হাত বন্ধ করে রাখে। তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহও তাদের ভুলে গেছেন। নিশ্চয় মুনাফিকরাই ফাসিক।"-(সূরা আত তাওবা : ৬৭)

মুনাফিক পুরুষ-মহিলা উভয়ই সমাজে অপকর্ম ছড়ায় আর ভাল ও ন্যায় কাজে বাধার সৃষ্টি করে

আলোচ্য আয়াতে মুনাফিক নারী-পুরুষের মনোভাব ও তাদের কার্যক্রমের সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে বলা হয়েছে। মুনাফিক ব্যক্তি চাই সে পুরুষ হোক, অথবা হোক স্ত্রী; তাদের উভয়ের স্বভাব স্বরূপ অভিন্ন। তাদের কার্যক্রমের বৈশিষ্ট্যই এমন যে, তারা সমাজে অন্যায় ও গর্হিত কার্যক্রম ছড়িয়ে দেয়- সমাজকে অন্যায় ও মন্দ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। অথচ সমাজ সদস্যদের ভাল ও ন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। মুনাফিক তো তাকেই বলা হয় যার মধ্যে 'নিফাক' বা 'দ্বিমুখিতা' থাকে। الَّذِي لَا يُطَابِقُ ظَاهِرَه بَاطِنُه অর্থাৎ যার ভিতরের অবস্থা তার বাহ্যিক অবস্থার অনুরূপ নয়। অর্থাৎ ভিতরের অবস্থাটা খারাপ। এর মানে যার মনের ভাবধারা ও বাহ্যিক অবস্থা একরূপ নয়। সে-ই মুনাফিক।

হাদীস শরীফে মুনাফিকের তিনটি লক্ষণ বলে দেয়া হয়েছে। ১. কথা বলবে তো মিথ্যা বলবে, ২. ওয়াদা করলে তার বিপরীত কাজ করবে, ৩. তাকে কোনো কিছুর আমানতদার বানানো হলে সে তাতে খিয়ানত করবে। এ লক্ষণগুলো মুনাফিক পুরুষের মধ্যে যেমন লক্ষ্য করা যাবে, তেমনি মুনাফিক নারীর মধ্যেও এগুলো পাওয়া যাবে। সূরা আত তাওবার উক্ত আয়াতে বর্ণিত চরিত্র সকল মুনাফিকের মধ্যে সমানভাবে বর্তমান। অন্যায় ও অসত্যের প্রতি আকর্ষণ এবং সত্য ও ন্যায়ের সাথে শত্রুতা তাদের সকলের। কোনো খারাপ কাজ করতে চাইলে তাদের সহানুভূতি, পরামর্শ, সাহস ও সহযোগিতা, সুপারিশ ও প্রশংসা সবকিছুই তারা নিয়োজিত ও উৎসর্গকৃত করবে। তারা আন্তরিকভাবে সেই খারাপ কাজে শরীক হবে, অন্যদেরকেও তাতে শরীক হওয়ার জন্য উৎসাহিত করবে। পক্ষান্তরে সমাজে কেউ কোনো ভাল কাজ করতে শুরু করলে যেন এ খবরটাই তাদের জন্য দুঃসহ হয়ে পড়ে। তারা তখন সম্ভাব্য সকল পথেই তার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এই ভাল কাজ থেকে তাকে বিরত রাখার জন্য যে কোনো পথ ধরতে বা যে কোনো ব্যবস্থা নিতে তারা মোটেই কুণ্ঠিত হয় না।

الْمُنْفِقُونَ وَالْمُنْفِقْتُ بَعْضُهُمْ مِّنْ بَعْضٍ
এখানে মুনাফিক পুরুষদের সাথে মুনাফিক স্ত্রীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর উভয়কেই সমান অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এতে করে যেন তাদের এ বিষয়ে সাবধানতা আসে যে, তাদের পুরুষদের যে করুণ পরিণতি হবে তাদের মহিলাদেরও একই পরিণতি হবে। যদি তারা (নারীরা) স্বতন্ত্রভাবে নিজেদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে। দ্বীনের ব্যাপারে অধীনস্থ হওয়ার ওযর মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং নর-নারী নির্বিশেষে সকলকেই নিজ নিজ মুক্তির জন্য নিজেকেই চেষ্টা-সাধনা চালিয়ে যেতে হবে। এতে বুঝা যায়, মুনাফিকির খেলায় মহিলাদেরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।

টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন), (তাদাব্বুরে কুরআন- মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 মুনাফিক নর-নারী ও কাফিরদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জাহান্নাম

📄 মুনাফিক নর-নারী ও কাফিরদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জাহান্নাম


وَعَدَ اللَّهُ الْمُنْفِقِينَ وَالْمُنْفِقْتِ وَالْكُفَّارَ نَارَ جَهَنَّمَ خَلِدِينَ فِيهَا هِيَ حَسَبُهُمْ ، وَلَعَنَهُمُ اللَّهُ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ مُّقِيمٌ (التوبه : ৬৮)

"আল্লাহ ওয়াদা করেছেন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীদের এবং কাফিরদের জন্যে জাহান্নামের আগুনের। তাতে তারা চিরদিন থাকবে। তাই তাদের জন্য যথেষ্ট। তাদের উপর আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, আর তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী আযাব।" -(সূরা আত তাওবা : ৬৮)

আলোচ্য আয়াতে মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীর জন্য আখিরাতের জীবনে কি পরিণতি হবে, সেই হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে। মুনাফিক নর-নারী এবং কাফিরদের পরকালীন জীবনের শাস্তি হলো চিরস্থায়ী জাহান্নাম। তারা মূলতঃ এমনি ধরনের শাস্তির যোগ্য। বাস্তবে ইসলামের দাবীদার হওয়া সত্ত্বেও মুনাফিকরা কোনোভাবে বাহ্যিক দাবীর কারণে রেহাই পাবে না। বরং প্রকাশ্য কুফরীর কারণে কাফিররা যেমন চিরদিনের জন্য জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, ঠিক তেমনিভাবে ইসলামের দাবীদার এসব গাদ্দারদেরও চিরদিনের তরে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে।

এ জাহান্নামের শাস্তিই তাদের জন্য যথেষ্ট অথবা তারা জাহান্নামের এমনি শাস্তি পাওয়ারই যোগ্য। এটা হচ্ছে তাদের উপর আল্লাহর লা'নত- অভিসম্পাত। তাদের এ শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার যাবতীয় দ্বার রুদ্ধ হয়ে যাবে। এ মুনাফিকরা এমন এক স্থায়ী আযাবে গ্রেফতার হবে যা থেকে তারা কখনো মুক্তি পাবে না।

মুনাফিকরা প্রধানতঃ দু' ধরনের। এক, যারা প্রকৃতপক্ষে ইসলামের বিরোধী হলেও কোনো দুনিয়াবী স্বার্থে বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। এরা ইসলাম নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করতো আর নতুন নতুন অপবাদ রটাতো। দুই, দ্বিধা-সংকোচকারী, এরা ইসলামকে তো সত্য দ্বীন মনে করতো বটে কিন্তু প্রথম প্রকারের মুনাফিকদের সাথে মেলামেশা করতো আর তাদের কথা- বার্তায়ও অংশগ্রহণ করতো। অতপর তাদের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়লে তারা নানারূপ হীলা-বাহানা করে ওযর পেশ করতো; বলতো এটা এ কারণে, ওটা এভাবে হয়ে গেছে। তাদের জবাবে বলা হতো, আচ্ছা যদি তোমাদের এসব ওযর গ্রহণ করাও হয়, তাহলেও তো কেবল তারাই রেহাই পেতে পারে যারা অন্যদের কথায় এমনটি করতো। কিন্তু যারা এসব বিশৃঙ্খলা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে বেড়ায় এবং অন্তরে ইসলামের শত্রুতা পোষণ করে তারা তো অবশ্যই শাস্তির যোগ্য। সর্বাবস্থায় মুনাফিকীর মাধ্যমে মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক মহিলাদের সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ব্যাপারে পরস্পরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ওরা যেন একই নীতি-আদর্শের রঙ্গে রঞ্জিত। ওদের চিন্তা-চেতনা ও কার্যক্রমের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কাফির ও মুনাফিকদের মধ্যে কার্যতঃ কোনো পার্থক্য নেই বিধায় ওরা উভয় শ্রেণীই চিরস্থায়ী জাহান্নামী।

টিকাঃ
(তাদাব্বুরে কুরআন), (তাফসীরে হাক্কানী)

ফন্ট সাইজ
15px
17px