📄 বেহেশতের নেয়ামতসমূহের মধ্যে নারীও অন্তর্ভূক্ত
قُلْ أُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرٍ مِنْ ذَلِكُمْ ، لِلَّذِينَ اتَّقُوا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خَلِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجُ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِنَ اللَّهِ -- "বল, আমি কি তোমাদের (দুনিয়ার) ওসবের চেয়েও উত্তম বিষয়ের সন্ধান দেব? (তা হচ্ছে) মুত্তাকীদের জন্যে তাদের রবের কাছে রয়েছে এমন জান্নাত যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে ঝর্ণাসমূহ, তারা সেখানে অনন্তকাল থাকবে। আর রয়েছে পবিত্র যুগল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি।" -(সূরা আলে ইমরান : ১৫)
বেহেশতের নেয়ামতসমূহের মধ্যে নারীও অন্তর্ভুক্ত
এ আয়াত অনুধাবন করার জন্যে অত্র গ্রন্থের প্রথম বিষয়সূচী "জান্নাতে নরের জন্য পবিত্র নারী আর নারীর জন্যে নিষ্কলুষ নর" দেখা যেতে পারে।
দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর দেয়া নেয়ামতসমূহের মধ্যে পূর্বোক্ত আয়াতে যে ছয়টি বস্তুর উল্লেখ করা হয়েছে পৃথিবীর মানুষ স্বভাবতই নগদ প্রিয় হওয়ায় ওসব বস্তুও আহরণে মত্ত থাকে। যারা ঈমানের মত অমূল্য ধন থেকে বঞ্চিত তারা তো দুনিয়ার জীবন ও বস্তু সামগ্রীকে প্রাধান্য দেয়। দুনিয়া উপার্জনের জন্যে মহামূল্যবান আয়ু পর্যন্ত শেষ করে দেয়। আল্লাহ দুনিয়ার মানুষকে এসব মোহ থেকে মুক্তির জন্যে এবং নশ্বর পৃথিবী থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে চিরস্থায়ী শান্তি সামগ্রীর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে উক্ত আয়াতে পরকালীন জীবনের স্থায়ী নিয়ামত ও প্রকৃত শান্তির সন্ধান দিয়েছেন। পূর্বে দুনিয়ার ছয়টি প্রধান নেয়ামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ আয়াতে তার বিপরীতে পরকালীন নেয়ামত সমূহের মধ্য থেকে প্রধান তিনটি নেয়ামতের উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে (১) জান্নাতের সবুজ বাগানসমূহ, (২) পবিত্র যুগল এবং (৩) আল্লাহর সন্তুষ্টি।
দুনিয়ার ছয়টি নেয়ামতের আলোচনার পরে আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেছেন। "বল, আমি কি তোমাদের এর চেয়ে উৎকৃষ্টতর নেয়ামতের সন্ধান দেব? যারা আল্লাহকে ভয় করে, তার আনুগত্য করে তাদের জন্যে তাদের রবের কাছে রয়েছে এমন সবুজ বাগিচা যার তলদেশে ঝর্ণাসমূহ প্রবাহিত থাকবে। আর থাকবে পবিত্র যুগল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি।
এখানে লক্ষণীয় যে পরকালীন নেয়ামতসমূহের মাঝেও পবিত্র যুগল তথা সকল প্রকার আবিলতা ও কলুষতা মুক্ত নারীর কথাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ পরকালীন জীবনে জান্নাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টির মত অতুলনীয় নেয়ামত-সমূহের সাথে দুনিয়ার নেয়ামতসমূহ থেকে যে একটি নেয়ামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা হচ্ছে পবিত্র নারী। আয়াতে পবিত্র যুগল বলা হয়েছে। যুগল নর-নারী উভয়কে বুঝায়। সে ক্ষেত্রে নরের পবিত্রতা হলো মানসিক আর নারীর পবিত্রতা হলো দৈহিক ও মানসিক। অবশ্য ঈমান ও আমল ছাড়া এ পবিত্রতা অর্জন সম্ভব নয়। যেমন সম্ভব নয় বেহেশত লাভ করা। وَاللَّهُ أَعْلَمُ
📄 যৌন আকর্ষণ সৃষ্টির মূল্য লক্ষ্য মানব বংশের বিস্তার সাধন
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱتَّقُوا۟ رَبَّكُمُ ٱلَّذِى خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَٰحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَآءً ۚ - (النساء : ১)
“হে মানব সমাজ! তোমাদের রবের বিষয়ে সতর্ক থাক। যিনি তোমাদেরকে একটি প্রাণী থেকে সৃষ্টি করেছেন, এবং তার থেকে তৈরী করেছেন তার স্ত্রীকে। আর তাদের দু'জন থেকে বিস্তার করিয়েছেন অগণিত নারী পুরুষ।”-(সূরা আন নিসা: ১)
যৌন আকর্ষণ সৃষ্টির মূল্য লক্ষ্য মানব বংশের বিস্তার সাধন
পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ)। আর তারই দেহ থেকে সৃষ্টি তাঁর সংগিনী বিবি হাওয়া (আ)। আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ) তাঁর তাফসীরে ইবনে কাসীরে বলেন, হাওয়া (আ)-কে হযরত আদম (আ)-এর বাম পাঁজর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আদম (আ) তখন ঘুমে ছিলেন। জেগে দেখেন তাঁর পার্শ্বে এক মহিলা শায়িত আছে। তিনি আশ্চর্যান্বিত হন। অতপর জৈবিক চাহিদায় স্বাভাবিকভাবে একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, পুরুষ থেকে মহিলা সৃষ্টি করা হয়েছে। সুতরাং তার প্রয়োজনও রাখা হয়েছে পুরুষের প্রতি।
পৃথিবীর সকল মানুষের মূল উৎস হলো হযরত আদম (আ)। সকল মানুষ তাঁরই সন্তান। সুতরাং দুনিয়ার জীবনে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টি করা অসংগত ও অযৌক্তিক। ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা মারাত্মক গুনাহ। মানুষ মূলত জন্মসূত্রেই পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ। আত্মীয় স্বজনের পারস্পরিক সম্পর্কের বুনিয়াদকে ইসলামী পরিভাষায় 'সেলায়ে রেহমী' বলা হয়। হাদীস শরীফে আত্মীয়তার সম্পর্কের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। মহানবী (স) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার রিঝিকের প্রাচুর্য এবং দীর্ঘ জীবন প্রত্যাশা করে, তার উচিত আত্মীয়-স্বজনের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলা।
কুরআনের আয়াতে আদম (আ) থেকে তাঁর জুড়ি তৈরী করার কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। কিন্তু জুড়ি তৈরীর বিস্তারিত বিবরণ পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়নি। তাফসীরে ইবনে কাসীরের পূর্বোক্ত বর্ণনা অন্য কতিপয় তাফসীরেও বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া বাইবেলেও এ ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। পবিত্র কুরআন এ সম্পর্কে নিরব বিধায় অনেক তাফসীর কারক এ বিষয়ে নিরব থাকারই পক্ষপাতী। আর এটাই যুক্তিযুক্ত ও অধিকতর সত্যের নিকটবর্তী। আল্লাহই ভাল জানেন।
আয়াতের শেষাংশে আদম-হাওয়ার মধ্য থেকে অসংখ্য নারী-পুরুষ সৃষ্টির কথা বর্ণিত হয়েছে। আর পৃথিবীর প্রথম যুগলের পরবর্তী যুগলসমূহ থেকেও ক্রমিক ধারায় মানব বংশ বিস্তার লাভ করেছে। মূলত নর-নারীর সৃষ্টি ও তাদের পরস্পরের প্রতি স্বভাবগত আকর্ষণ সৃষ্টির পেছনে রয়েছে পৃথিবীতে মানব বংশ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চালু রাখা। মহান রাব্বুল আলামীন ঐ স্বভাবগত আকর্ষণ নিয়ন্ত্রণে রেখে মানব সমাজে নিষ্কলুষ ও সুশৃংখলিত রাখার ব্যবস্থাও দিয়েছেন। কিন্তু স্থূল দৃষ্টির মানুষ স্রষ্টার দেয়া ভারসাম্য হারিয়ে নিছক পশুত্ব প্রবণতার প্রতি ঝুঁকে গিয়ে সমাজে নানাবিধ যৌন অনাচার সৃষ্টিতে মত্ত হয়ে পড়ে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো সভ্যতার নামে অনেকে এ ঝোঁক প্রবণতাকে প্রকাশ্যে লাইসেন্স দিয়ে পশুত্বের স্তরে নামিয়ে দিয়ে সেরা সৃষ্টির মর্যাদাকে ভুলুণ্ঠিত করেছে।
আল্লাহ তা'আলা সূরা আন নিসার উপরোক্ত প্রথম আয়াতে সমগ্র মানব জাতিকে সম্বোধন করে বলেছেন, হে মানব মণ্ডলী! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার বিরুদ্ধাচারণকে ভয় কর। এমন মহান সত্বাকে ভয় কর, যিনি তোমাদের সবাইকে একই মানুষ আদম (আ) থেকে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ প্রথমত আদম (আ) থেকে তাঁর স্ত্রীকে এবং পরবর্তীতে সেই যুগল থেকে পৃথিবীর সকল মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।
এখানে মানব মণ্ডলী বলে পুরুষ-স্ত্রী এবং রাসূল (সা)-এর সময়কার ও কিয়ামত পর্যন্ত আগত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষকে বুঝানো হয়েছে। সকল যুগের সকল মানুষকে আল্লাহর ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেহেতু তিনিই একমাত্র 'রব' বা প্রতিপালক। তাঁর রবুবিয়ত বা প্রতিপালন কার্যে অন্য কোনো শক্তির বিন্দুমাত্র দখল নেই। সুতরাং একমাত্র তাঁর ব্যাপারে তাকওয়া বা সতর্কতা অবলম্বন করে একই আদমের বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে সকল মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করার প্রতি উক্ত আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ আয়াতটি বিয়ের খুতবায় পাঠ করা সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ (স) বিয়ের খুতবায় এ আয়াতটি পাঠ করতেন। যেন আলোচ্য আদম সন্তানদ্বয় তাদের দাম্পত্য জীবনের শুরুতেই আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে।
📄 আল্লাহর হুকুমের অবাধ্যতায় নারী-পুরুষ উভয়কেই চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়
وَيَادَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ فَكُلا مِنْ حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هُذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ (الاعراف : ১৯)
"ও আদম! তুমি আর তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর। তোমরা দু'জনেই যেখান থেকে ইচ্ছা খাও, কিন্তু এ গাছটির কাছেও যেয়ো না। তাহলে তো তোমরা যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।"-(সূরা আল আ'রাফ : ১৯)
আল্লাহর হুকুমের অবাধ্যতায় নারী-পুরুষ উভয়কেই চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়।
আলোচ্য আয়াতে পৃথিবীর প্রথম নর-নারীর বাসস্থান ও অন্ন সংস্থান সম্পর্কিত নির্দেশের উল্লেখ রয়েছে। পূর্ববর্তী কয়েকটি আয়াতে মানব সৃষ্টির ইতিহাস আলোচনা করা হয়েছে। এ প্রসংগে সূরা আ'রাফের এগার নম্বর আয়াত থেকে আঠার নম্বর আয়াত পর্যন্ত দেখা যেতে পারে। এ আয়াতগুলোতে মানব সৃষ্টির ইতিহাস ও শয়তানের শত্রুতার সূচনার বিষয় বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাতে বলেন, "আমি তোমাদের সৃষ্টির সূচনা করলাম, তারপর তোমাদের আকৃতি দান করলাম ; অতপর ফেরেশতাদের বললাম, আদমকে সিজদা করো। এ নির্দেশ অনুযায়ী সবাই সিজদা করলো কিন্তু ইবলীস করলো না-সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলো না। আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, আমি যখন তোকে সিজদা করতে হুকুম দিলাম তখন তোকে সিজদা করতে বাধা দিল কিসে?" সে বললো, "আমি তো ওর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমাকে সৃষ্টি করেছো আগুন থেকে আর ওকে সৃষ্টি করেছো মাটি থেকে।" তিনি বললেন, "ঠিক আছে তুই এখান থেকে নেমে যা। এখানে অহংকার করার অধিকার তোর নেই। বের হয়ে যা। তুই তো ওদেরই অন্তর্ভুক্ত যারা নিজেরাই নিজেদের লাঞ্ছিত করতে চায়।" সে বললো, "আমাকে সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দাও যেদিন ওদের উঠানো হবে।" তিনি বললেন, "তোকে অবকাশ দেয়া হলো।" সে বললো, "তুমি যেমন আমাকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করেছো, আমিও তেমনি তোমার সরল-সত্য পথে ওদের জন্য ওঁত পেতে বসে থাকবো, ওদের সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে সবদিক থেকে ঘিরে ধরবো- ওদের অধিকাংশকে তুমি শোকর-গুজার পাবে না।" আল্লাহ বললেন, "বের হয়ে যা তুই এখান থেকে লাঞ্ছিত ও ধিকৃত হয়ে। নিশ্চিত জেনে রাখ, এদের মধ্য থেকে যারাই তোর অনুসরণ করবে তাদেরকে এবং তোকে দিয়ে জাহান্নাম ভরে দেবো।"
আলোচ্য আয়াতের পূর্বের আয়াতগুলোতে আদম সৃষ্টি ও শয়তানের অবাধ্যতা এবং বনী আদমের সাথে শয়তানের শত্রুতার সূচনা সম্পর্কে উপরিউক্ত কথাগুলো বলা হয়েছে। অতপর এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ)-কে লক্ষ্য করে তার চির শত্রু শয়তানের চক্রান্ত থেকে বেঁচে থাকার জন্য সাবধানতা অবলম্বনের পথ বাতলে দিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন আদমের সাথী হিসেবে হাওয়া (আ)-কে সৃষ্টি করে তাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে জান্নাতে বসবাস করার নির্দেশ দিয়ে বললেন, "ও আদম! তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে জান্নাতে বসবাস কর। আর জান্নাতের যেখান থেকে ইচ্ছা পানাহার কর। কিন্তু এ গাছটির ধারেও যেয়ো না-তাহলে তোমরা উভয়ে যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বে।"
সূরা আল বাকারার ৪র্থ রুকূ'তেও বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সেখানে আলোচ্য আয়াতটির সাথে এ আয়াতের হুবহু মিল রয়েছে। সূরা আল বাকারার ৩৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে: وَقُلْنَا يَآدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هٰذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظّٰلِمِينَ(البقرة:৩৫) "আর আমি বললাম, "ও আদম! তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে জান্নাতে বসবাস করো, আর দু'জনে এ থেকে স্বাচ্ছন্দে পানাহার করো। তবে এ গাছটির ধারেও যেয়ো না-তাহলে তোমরা উভয়েই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বে।"-(সূরা আল বাকারা: ৩৫)
একই বিষয়ের বর্ণনায় উপরোক্ত সূরা আল বাকারা, সূরা আল আরাফের দু'টো আয়াতেই জান্নাতে বসবাসের নির্দেশনায় আল্লাহ তা'আলা সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন হযরত আদম (আ)-কে; আর এ নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত করেছেন তার স্ত্রীকে। বলেছেন: اُسْكُنْ اَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ "তুমি বসবাস করো তোমার স্ত্রীকে নিয়ে জান্নাতে” লক্ষণীয় যে, এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বসবাসের ব্যাপারে কেবল আদম (আ)-কেই সম্বোধন করেছেন। এ ব্যাপারে উভয়কে সম্বোধন করা হয়নি। আয়াতে বসবাসের ও জীবন ধারণের ক্ষেত্রে আদমকেই উদ্দেশ্য করে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কারণ, হাওয়া (আ) ছিলেন আদম (আ)-এর অধীন। আয়াতের পরবর্তী অংশে খানা-পিনার বিষয়ে উভকেই সম্বোধন করা হয়েছে। আয়াতের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, স্ত্রীগণের থাকার ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে স্বামীর উপর, কিন্তু আল্লাহর বিধি-নিষেধ মেনে চলার ব্যাপারে উভয়ই স্বতন্ত্রভাবে দায়ী। স্ত্রীর অবস্থান সংক্রান্ত যাবতীয় দায়-দায়িত্ব স্বামীর উপর ন্যস্ত হলেও আল্লাহর হুকুম-আহকাম পালনের ব্যাপারে উভয়কেই সম্বোধন করা হয়েছে বিধায় এ বিষয়ে স্বামী-স্ত্রী স্বতন্ত্রভাবে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে দায়ী।
আল্লাহ তা'আলা আদম-হাওয়ার বাসস্থান ব্যবস্থার সমাধান স্বরূপ এ নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও এতে বলে দেয়া হয়েছে। আর বলে দেয়া হয়েছে এসবের সীমারেখাও। আল্লাহর দেয়া সীমারেখা লংঘন করা হলে তার পরিণতি সম্পর্কেও সাবধান করে দেয়া হয়েছে। তারপর শয়তান তাদের উভয়কে (আদম-হাওয়া) ওয়াসওয়াসা দিল, যাতে তাদের সামনে প্রকাশ করে দেয় (তাদের লজ্জাস্থান), যা তাদের কাছে গোপন ছিল। অর্থাৎ এমন ওয়াসওয়াসা দিল যাতে করে আদম-হাওয়াকে তাদের বেহেশতী লেবাস থেকে বঞ্চিত করা হয়। তারা বিবস্ত্র হয়ে পড়লো। সে বললো, "তোমাদের রব এ গাছ থেকে নিষেধ করার কারণ একমাত্র এই যে, এতে তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাবে অথবা, চিরন্তন জীবন লাভ করে বসবে। সে তাদের উভয়কে কসম করে বললো, "আমি তোমাদের জন্য অবশ্যই কল্যাণকামী" এভাবে সে তাদের প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে ফেললো। শেষ পর্যন্ত যখন তারা উভয়ে ঐ গাছের স্বাদ আস্বাদন করলো, তাদের গোপন অঙ্গসমূহ তাদের সামনে খুলে গেল। তারা নিজেদের অঙ্গ জান্নাতের পাতা দিয়ে ঢাকতে লাগলো। তখন তাদের রব তাদের ডেকে বললেন, আমি কি তোমাদের ঐ গাছটি থেকে নিষেধ করিনি? আর তোমাদের বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?"
মানুষের চির শত্রু শয়তান আদম-হাওয়াকে প্রতারিত করে বিপদে ফেলার জন্য তাদের হিতাকাঙ্ক্ষী হয়ে কসম করে তাদেরকে আল্লাহর কথা অমান্য করাতে সক্ষম হলো। তারা উভয়ে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেলেন। অমনি তাঁদের বেহেশতী লেবাস খুলে গেলে তাঁরা লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য জান্নাতী গাছের পাতা শরীরে ধারণ করলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, সাধারণত একথা প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত যে, শয়তান প্রথমে বিবি হাওয়াকে প্রতারিত করতে সক্ষম হয়েছিল। পরে তাকে দিয়ে আদম (আ) -কে প্রতারিত করা হয়েছিল। কিন্তু কুরআন থেকে জানা যায় যে, আদম-হাওয়া উভয়কেই একই সময়ে শয়তান প্রতারিত করেছিল। কুরআন বলে: فَدَلَّهُمَا بِغُرُورِ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوَاتُهُمَا "সে দু'জনকেই প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে ফেললো, আর যখন দু'জনেই গাছটির স্বাদ আস্বাদন করলো তখন তাদের উভয়ের সামনে উভয়ের লজ্জাস্থান খুলে গেল।"-(সূরা আল আ'রাফ: ২২)
শয়তান কর্তৃক আদম-হাওয়ার প্রতারিত হওয়ার ইতিহাসের একথাটি কুরআনে সুস্পষ্টভাবেই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু শয়তান প্রথমে বিবি হাওয়াকে প্রতারিত করেছে, অতপর তারই মাধ্যমে আদম (আ)-কে প্রতারিত করা হয়েছে। একথাটি গুরুত্ব সহকারে লক্ষ্য করার বিষয়। কারণ এতে করে নারী জাতির নৈতিক, আইনগত ও সামাজিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করার ব্যাপারে সাংঘাতিক কাজ করেছে। আর এতে করে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, মানুষের যাবতীয় বিপর্যয়ের দ্বার উন্মুক্ত হওয়ার পেছনে নারীরা দায়ী। আল-কুরআনের উপরোক্ত আয়াতে মূলতঃ এ ধরনের কাল্পনিক কথার প্রতিবাদ করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে আল্লাহর নাফরমানী করলে নারী-পুরুষ উভয়কেই চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়।
টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন অবলম্বনে), (তাফসীরে মাযহারী অবলম্বনে)
📄 অসাধু নারী সাধু পুরুষের স্ত্রী হলেও তার নাজাত নেই
فَانْجَيْنَهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ وَكَانَتْ مِنَ الْغَبِرِينَ، وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا . فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ (الاعراف : ৮৩-৮৪)
"অতপর আমি তাকে লূত (আ)-কে] ও তার আহালকে নাজাত দিলাম। কিন্তু তার স্ত্রীকে নয়; সেতো পেছনের লোকদের সাথেই রয়ে গেল। আমি তাদের উপর পাথর বৃষ্টি বর্ষণ করলাম। তারপর দেখ, ওসব অপরাধীর পরিণতি কেমন হয়েছে।" -(সূরা আল আ'রাফ : ৮৩-৮৪)
অসাধু নারী সাধু পুরুষের স্ত্রী হলেও তার নাজাত নেই
আল্লাহ তা'আলা উপরিউক্ত আযাব দিয়ে লূত (আ)-এর পুরো অবাধ্য উচ্ছৃঙ্খল জাতিকে ধ্বংস করে দিলেন। লূত (আ)-এর জাতির লোকেরা যখন তাঁর অবাধ্য হয়ে কেবল সেই অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতায় ডুবেই রইলো না, অধিকন্তু তারা এহেন মারাত্মক নৈতিকতা বিধ্বংসী কাজের বাধা সৃষ্টিকারী লূত (আ) ও তাঁর কতিপয় সঙ্গী-সাথীকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করলো; তখন তাদের উপর আল্লাহর আযাব অবধারিত হয়ে গেল। তাদের আযাব থেকে দূত (আ) ও তাঁর অল্প কতক অনুসারীকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা'আলা লূত (আ)-কে নির্দেশ দিলেন তিনি যেন শেষ রাতে তাঁর এক স্ত্রী ছাড়া সকল আহল ও সংঙ্গী-সাথীদের নিয়ে ঐ স্থান ত্যাগ করেন। আর তারা যেন পেছনের দিকে ফিরে না তাকান। কারণ, লুত (আ) সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই মুহূর্ত বিলম্ব না করে আযাব এসে যাবে।
হযরত লূত (আ) আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক তাঁর এক স্ত্রী ছাড়া বাকী আহলদের নিয়ে শেষ রাতে সাদুম ত্যাগ করেন। তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে দু' রকমের কথা আছে। এক, সে তাঁদের সাথে রওয়ানাই করেনি। দুই, সে তাঁদের সাথে রওয়ানা করে কিছু দূর গিয়ে আল্লাহর হুকুমের বিপরীতে পেছনের দিকে অপরাধীদের দেখতে চেয়েছিল। অমনি ওদের সাথে তাকেও আযাব এসে পাকড়াও করলো। কুরআনে আল্লাহর বাণী, فَانْجَيْنَهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ ، (الاعراف : ৮৩) "তার স্ত্রী ছাড়া তাকে ও তার আহলকে আমি নাজাত দিলাম।" এখানে 'আহল' বলতে কাদের বুঝানো হয়েছে সে সম্পর্কে মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ) তাঁর তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআনে বলেন, 'আহল' পরিবারকে বলা হয়।
কোনো কোনো তাফসীরকারকের মতে তাঁর পরিবারে তখন মাত্র দু'টো কন্যা মুসলমান হয়েছিল। কিন্তু তাঁর স্ত্রী মুসলমান হয়নি। আল-কুরআনের অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে: فَمَا وَجَدْنَا فِيهَا غَيْرَبَيْتٍ مِّنَ الْمُسْلِمِينَ অর্থাৎ 'সমস্ত জনবসতির মধ্যে একটি ঘর ছাড়া কোনো মুসলমান ছিল না।' এতে বুঝা যায় যে লূত (আ)-এর ঘরের লোকই শুধু মুসলমান ছিল। সুতরাং তারাই আযাব থেকে মুক্তি পেল। অবশ্য তাদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কোনো কোনো তাফসীরবিদ বলেন: 'আহ্ল' অর্থ ব্যাপক। এতে পরিবারের লোকজন এবং অন্যান্য মুসলমানকেও বুঝানো হয়েছে। মোটকথা, মাত্র অল্প ক'জনই মুসলমান ছিল। তাদেরকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা'আলা লুত (আ)-কে শেষ রাতে বেরিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
হযরত লূত (আ)-এর স্ত্রী নবী স্বামীর অবাধ্য ও আল্লাহর নাফরমানদের আদর্শে বিশ্বাসী-তথা আল্লাহদ্রোহীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল বিধায় নবীর স্ত্রী হয়েও আল্লাহর অযাব থেকে রক্ষা পায়নি। আল্লাহর সামগ্রিক আযাব তাকেও গ্রাস করে নিয়েছিল। ইসলামের ইতিহাসে এমনি বহু নযীর রয়েছে। যেমন হযরত নূহ (আ)-এর ছেলে 'কেন্-আন্' নবী পিতার অবাধ্য ছিল বিধায় সর্বগ্রাসী প্লাবন তাকেও ধ্বংস করে দিয়েছিল। অবাধ্য হলেও তো আপন ছেলে। তাই নবী নূহ (আ) তার নাজাতের জন্য আল্লাহর কাছে আরয করে বলেছিলেন: رَبِّ إِنَّ ابْنِي مِنْ أَهْلِى 'আমার ছেলে তো আমার আহল'। উত্তরে রাব্বুল আলামীন বললেন: إِنَّهَ لَيْসَ مِنْ أَهْلِكَ 'সে তো তোমার আহল নয়।' এতে বুঝা যায় আল্লাহ ও রাসূলের অবাধ্য হয়ে নবী-রাসূলের একান্ত আপনজন হলেও নিস্তর পাওয়া সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে হযরত ইবরাহীম (আ) অগ্নি পূজক আযরের ছেলে হয়েও মুসলিম মিল্লাতের পিতা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। সুতরাং কোনো মানুষের সম্পর্ক নয় বরং আল্লাহ ও রাসূলের সম্পর্ক তাদের হুকুম ও আদর্শ মেনে চলার মধ্যে নাজাত এবং অমান্য করার মধ্যে আযাব ও শাস্তি অবধারিত পরিণতি।
টিকাঃ
-(মা'আরেফুল কুরআন)