📄 নরের জীবন-যাপনে নারীর আবশ্যকতা
وَقُلْنَا يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا مِن وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّلِمِينَ (البقرة : ৩৫)
“আমি আদমকে বললাম, হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাক। আর সেখান থেকে যা-ই ইচ্ছা, পূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্য ও তৃপ্তি সহকারে খেতে থাক। কিন্তু এ গাছটির ধারেও যেয়ো না। অন্যথা তোমরা যালেমদের মধ্যে গণ্য হয়ে যাবে।”-(সূরা আল বাকারা : ৩৫)
আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ)-কে সৃষ্টি করলেন মাটি থেকে। অতপর তারই সংগিনী স্ত্রী হিসেবে তার দেহাংশ থেকে তৈরী করলেন বিবি হাওয়া (আ)-কে এবং তাদের নির্দেশ দিলেন, জান্নাতে বসবাস করতে। এখানে আল্লাহ তা'আলা সরাসরি আদমকে নির্দেশ দিলেন যে, তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে বাস করতে থাক। জান্নাতের হাজারো রকমের নায-নেয়ামত ভোগ করার জন্যে আদমকে বলা হলো। কিন্তু এতসব নিয়ামতের মধ্যেও তাঁর সামগ্রিক প্রশান্তি ও পরিপূর্ণ তৃপ্তির জন্যে তাঁকে সস্ত্রীক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, স্ত্রী ছাড়া একজন পুরুষের জীবন যাপন অপূর্ণ থেকে যায়। তাই পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ)-কে তৈরী করার পর পূর্ণাঙ্গ জীবন-যাপনের জন্যে সংগিনী (স্ত্রী) হিসাবে সৃষ্টি করলেন হযরত হাওয়া (আ)-কে। পূর্বের আয়াতের মত এখানেও হযরত হাওয়া (আ)-কে আদম (আ)-এর যওজ রূপে আখ্যা দেয়া হয়েছে।
দুনিয়াতে মানব জাতিকে নর ও নারী রূপে সৃষ্টি করার পেছনে মহান আল্লাহর বিশেষ সুকৌশল ও সুনিপুনতা বিরাজিত রয়েছে। যেমন সূরা আর রূমে ২১নং আয়াতে রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেছেন: وَمِنْ أَيْتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا - অর্থাৎ "তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে এও একটি যে, তিনি তোমাদেরই মধ্য হতে তোমাদের জোড় সৃষ্টি করেছেন। যেন তোমরা তাদের কাছে পরম প্রশান্তি লাভ করতে পার।" রাব্বুল আলামীন এমন ব্যবস্থা করেছেন যে, নর নিজ প্রকৃতির দাবী পূরণ করতে পারে নারীর কাছে, আর নারী তার প্রকৃতির দাবী পূরণ করে নরের কাছে। উভয়ই পরস্পরের সাথে সংযুক্ত সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকবে আর একে অপরের কাছে লাভ করবে পরম শান্তি, তৃপ্তি, স্বস্তি ও আশ্বস্তি। এতে করে আল্লাহ তা'আলা একদিকে যেমন মানব বংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন, অপর দিকে তেমনি মানবীয় সভ্যতা ও তমদ্দুন সৃষ্টির মাধ্যমও বানিয়েছেন।
আল্লাহ মানুষকে পুরুষ ও স্ত্রী দুটো লিংগে বিভক্ত করে সৃষ্টি করেছেন। এদের দেহ গঠনের মৌল ফর্মুলা একই রকম। তবুও তারা পরস্পর হতে ভিন্ন ধরনের দৈহিক গঠন, মানসিকতা, আবেগ ও ভাবধারা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে থাকে। এতদসত্ত্বেও তাদের মধ্যে বিস্ময়কর সাদৃশ্য ও সামঞ্জস্য রয়েছে। তারা সবাই পরস্পরের জন্যে পরিপূরক জুড়ি। সমস্ত পশু প্রজাতির মোকাবিলায় মানব জাতির মধ্যে সভ্যতা ও তমদ্দুন সৃষ্টির এটাই মূল কারণ যে, আল্লাহ এ নর-নারীকে পরস্পরের প্রতি এমন বাসনা-কামনা ও ব্যব্যগ্রতা-ব্যাকুলতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যে, একজন আরেক জনের সাথে মিলিত ও সংযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত কেউই প্রশান্তি লাভ করতে পারে না। এ প্রশান্তি প্রাপ্তি ও ভোগের আকাঙ্ক্ষা ও ভূমিকা উভয়েরই সমান। সুতরাং সভ্য জীবন-যাপনে নরের জন্যে যেমন নারী আবশ্যক, ঠিক তেমনিভাবে নারীর জন্যে আবশ্যক নরের।
মানব সৃষ্টির গোড়াতেই আল্লাহ তা'আলা নর-নারীকে পরস্পরের সান্নিধ্যে প্রশান্তি লাভের ব্যবস্থা করেছেন। জান্নাতে তাদের সামষ্টিক বাসস্থান নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট গাছের ফল ছাড়া যে কোনো স্থানের যে কোনো পাদ্য গ্রহণের অনুমতি দিয়ে দিলেন তাদের। উপরোক্ত আয়াতে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ বসবাসের ব্যাপারে বলেছেন, তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর। কিন্তু পরবর্তীতে খাদ্য ও অন্যান্য নির্দেশাদি পালনে বলেছেন তোমরা দু'জনে যা ইচ্ছা খেতে পারো; কিন্তু দু'জন এ গাছের ধারেও যাবে না। অর্থাৎ তোমাদের অবস্থানের দিক থেকে স্বাতন্ত্র থাকবে ঠিক কিন্তু তোমরা জীবন-যাপনে পরস্পরের সহায়ক ও পরিপূরক হয়ে থাকবে।
এ পৃথিবীতে মানব সৃষ্টির সূচনাতেই আল্লাহ তা'আলা এভাবে মানব সমাজ ও মানব সভ্যতার ভিত রচনা করেছিলেন। এখান থেকেই পরিবার ও পারিবারিক জীবনের সূচনা। পরিবার গঠন ও পারিবারিক জীবন-যাপন করা মানব জীবনের জন্য যেমন অত্যাবশ্যকীয়, তেমনি তা একটি উত্তম সমাজের জন্যও অপরিহার্য ভিত্তি স্বরূপ। পরিবারকে বাদ দিয়ে মানবতার বিকাশ ও মানবীয় চরিত্র অর্জন ও সংরক্ষণ-কিছুতেই সম্ভব নয়।
টিকাঃ
১. তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন: মুফতী মুহাম্মদ শফী (র) ২. তাফসীরে ইবনে কাছির: আল্লামা ইবনে কাছীর (র) ৩. তাফহীমুল কুরআন: সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী (র)
📄 মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার ও সকল মানুষের সাথে সদাচারের নির্দেশ...
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا اللَّهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَمَى وَالْمَسْكِينِ وَقُولُو اللنَّاسِ حُسْنًا وَأَقِيمُوا الصَّلوةَ واتو الزكوة (البقرة : ৮৩)
"স্মরণ করো, যখন ইসরাঈল সন্তানদের অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করবে না, আর মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে; আর ইয়াতীম ও মিসকীনের সাথেও। তাছাড়া মানুষের সাথে ভাল কথা বলবে। নামায কায়েম করবে ও যাকাত দিবে।" -(সূরা আল বাকারা: ৮৩)
মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার ও সকল মানুষের সাথে সদাচারের নির্দেশ পূর্ববর্তী শরীয়তসমূহেও বিদ্যমান ছিল
উপরোক্ত আয়াতে প্রতীয়মান হয় যে, তাওহীদ পন্থী হওয়া, মাতা ও পিতার সেবাযত্ন করা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, বালক-বালিকা ও দীন দরিদ্রের সাথে সদ্ব্যবহার করা, সকল মানুষের সাথে নম্র ব্যবহার করা এবং নামায কায়েম করা ও যাকাত আদায় করা বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বের শরীয়তসমূহেরও নির্দেশ ছিল। এখানে এসব বিষয়ে বনী ইসরাঈলের সাথে তাওরাতে এ অঙ্গীকারও পাকা-পোক্ত ওয়াদা নেয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল কুরআনের বহু স্থানে মানব জাতিকে আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদ মেনে নেয়ার নির্দেশের পর পরই নিজের মাতা ও পিতার সেবাযত্ন করার প্রতি তাগিদ দেয়া হয়েছে। বরং বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ সরাসরি তাওহীদের পরেই মাতা ও পিতার প্রতি ইহসান করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন ইরশাদ হচ্ছে: وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا -
"তোমার প্রভু নির্দেশ দিয়েছেন যে তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করো না, আর মাতা-পিতার সাথে ইহসান বা সদাচার করো।" -(সূরা বনী ইসরাঈল : ২৩)
সূরা লোকমানে বলেছেন : أن شُكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ - (لقمان : ১৪)
"তুমি আমার প্রতি ও তোমার মাতা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।"
এভাবে সৃষ্টিকর্তা রাব্বুল আলামীন নারীকেও অর্থাৎ মাতাকেও পিতার সাথে মর্যাদা দিয়ে নর-নারী সবাইকে নিজ নিজ মাতা ও পিতার খিদমত ও শোকর আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আর এ নির্দেশ হচ্ছে আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকৃতির সাথে সাথে মাতা-পিতার প্রতি कर्तव्य পালন করার।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এক বাণীতে পিতার তুলনায় মাতা অর্থাৎ নারী জাতির সেবা শুশ্রূষার প্রতি অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। একদা জনৈক সাহাবী তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কার প্রতি সদাচার প্রদর্শন করবো? তিনি বললেন, তোমার মায়ের প্রতি। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর? তিনি বললেন, তোমার মায়ের প্রতি। তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর? তিনি এবারও জবাব দিলেন তোমার মায়ের প্রতি। ৪র্থবার জিজ্ঞাসিত হলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, "তোমার পিতার প্রতি।" অন্য হাদীসে কিছু সংযোজন করা হয়েছে যে, অতপর তোমার রক্ত সম্পর্কের নিকটাত্মীয়ের প্রতি।
হযরত আদম (আ) তথা পৃথিবীর প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী থেকে শুরু হয় মানব জাতির প্রতি আল্লাহর হুকুম-আহকাম ও বিধানাবলীর নির্দেশনা। মানব জাতির প্রতি আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশে নিহিত রয়েছে মানুষের কল্যাণ আর প্রতিটি নিষেধের মধ্যে তাদের ধ্বংস ও ক্ষতির কারণ। তাওহীদ বা একত্ববাদে বিশ্বাস ও আমল মানুষের স্বার্থেই আবশ্যকীয়। মাতা-পিতা হচ্ছে পৃথিবীতে মানুষের বংশের সিন্সিলা জারী থাকার একমাত্র কার্যকর মাধ্যম। এজন্যে তাওহীদী আকীদার পাশাপাশি মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার জন্য রাব্বুল আলামীন নির্দেশ দিয়েছেন। আবার মৌলিক ইবাদাতের পাশাপাশি মানুষের সাথে সদাচার তথা আল্লাহর মাখলুকাতের হক আদায় করাও কর্তব্য। ইয়াতীম, মিসকীন, আত্মীয় স্বজন-সকলের সাথে সদ্ব্যবহার করার, সকল মানুষের সাথে ভাল কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ তা'আলা।
মানবেতিহাসের সকল অধ্যায়েও নবী রাসূলগণের যুগে আল্লাহর মৌলিক বিধান অপরিবর্তনীয়। সকল যুগের মানুষের জন্যই কল্যাণ ও অকল্যাণের মৌলিক আমল অভিন্ন। বরং ইবাদাতের মৌল কাঠামোতে সংযোজন এবং পরিবর্তন হলেও তাওহীদী আকীদা, মাতা-পিতার প্রতি সদাচার, মানুষ তথা সকল সৃষ্টিকে ভালবাসার নির্দেশ রয়েছে অপরিবর্তনীয়। কারণ, এযে মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজন।
টিকাঃ
১. কুরআনুল কারীম: ইসলামিক ফাউণ্ডেশন ২. কুরআনুল হাকীম : শাহ রফিউদ্দীন (র) ও আশরাফ আলী থানবী (র) ৩. মাআরেফুল কুরআন-মুফতী মুহাম্মদ শফী (র) ৪. তাফহীমুল কুরআন: সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী (র) ৫. তাফসীরে ইবনে কাসির-আল্লামা ইবনে কাসির (র)
📄 স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি জঘন্যতম কাজ
فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ - - (البقرة : ১০২)
"তারা (ফেরেশতাদের কাছে) এমন তদবীর শিখতো যাতে তারা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতো।"-(সূরা আল বাকারা: ১০২)
স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি জঘন্যতম কাজ
হযরত সোলায়মান আলাইহিস সালামের যুগের একটি ঘটনা এখানে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে। তখন লোকদের নিকট অধিকতর চাহিদার বিষয় ছিল তাবিজ-তুমার বা যাদুর প্রভাবে অন্যের স্ত্রীকে তার থেকে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে নিজের দিকে আকৃষ্ট করা। হারূত ও মারূত নামের দু'জন ফেরেশতাকে আল্লাহ তা'আলা পরীক্ষার জন্যে দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা পরীক্ষায় টিকতে পারেনি। ঘটনাটি সংক্ষেপে এই : একদা কতিপয় ফেরেশতা মানব জাতির আমল নিয়ে সমালোচনা করে আল্লাহকে বললো, যেই মানব জাতিকে তোমার ইবাদাতের জন্যে সৃষ্টি করেছ, তারাই তো তোমার নাফরমানীতে লিপ্ত। আল্লাহ বললেন, মানুষ আমাকে দেখছে না বিধায় এমনটি করছে। কোনো কোনো বর্ণনা মতে ফেরেশতাদের অভিযোগ ছিল মানুষ দুনিয়াতে ন্যায় বিচার করে না। আল্লাহ বললেন : তোমাদের মধ্য থেকে দু'জন ফেরেশতাকে আন। অধিক সদাচারী দু'জন ফেরেশতা হারূত ও মারূতকে নফসের খাহেশ দিয়ে পরীক্ষার জন্যে দুনিয়াতে পাঠানো হলো। জোহরা নাম্নী একটি অতি সুন্দরী মহিলাকে দেখে তারা ঠিক থাকতে পারলো না। কোনো কোনো বর্ণনা মতে মহিলাটি হযরত হারূত ও মারূতের আদালতে তার স্বামীর বিরুদ্ধে এক মোকদ্দমা নিয়ে এসেছিল। অবশেষে হত্যা করা, শরাব পান করা ও মূর্তিপূজা করার মধ্যে যে কোনো একটি শর্ত পূরণ করলে ঐ মহিলা ফেরেশতাদ্বয়কে তাদের বাসনা পূরণ করতে দেবে বলে সম্মতি জানালো। কিন্তু আল্লাহ তো তাদের পাঠানোর সময় ঐসব কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাদের প্রবৃত্তির ওয়াসওয়াসায় তারা শরাব পান করাকে অপেক্ষাকৃত কম জঘন্য মনে করে শরাব পান করলো। অতপর যেই একজন ফেরেশতা তার বাসনা পূরণে উদ্যত হলো তখনি মহিলাটি বললো, আচ্ছা তোমরা কি পড়ে আকাশে উঠে যাও তা আমাকে বলো। তবে তোমাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করবো। তারা তাকে ওটা শিক্ষা দিল। মহিলাটি তা পড়ে আকাশে উঠে গেল। সেখানে সে অগ্নিপিণ্ডে পরিণত হয়ে স্থবীর হয়ে গেল। আজকেও জোহরা সেতারা নামে মানুষ তাকে জানে। তাফসীরকারকদের এ ঘটনাকে অনেক মুহাক্কিক আলেম ইসরাঈলী রেওয়ায়াতের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন। হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী তাঁর তাফসীরে বলেছেন: যে এ ঘটনাটি কোনো নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েত দ্বারা সমর্থিত নয়। ইবনে কাসীরের উদ্ধৃত এ ঘটনাকে তিনি আয়াতের ব্যাখ্যার ভিত্তি নয় বলে উল্লেখ করেছেন।
উপরোক্ত আয়াতে তখনকার মানুষ যে ঐ দু'জন ফেরেশতা থেকে স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর তদবীর বা যাদু শিখতো; তাদের নৈতিক অধঃপতনের সেই জঘন্যতম অবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে। ফেরেশতাদ্বয় মানুষকে স্পষ্ট ভাষায় সাবধান করে দিতো যে, আমরা তো পরীক্ষার জন্যে এসেছি। সুতরাং তোমরা এসব করে-নিজের পরকাল ধ্বংস করো না। এতদসত্ত্বেও মানুষ তাদের কাছ থেকে তাবীজ-তুমার বা আমালিয়াত গ্রহণের জন্যে পাগল হয়ে গেল।
মুফতী মুহাম্মদ শফী (র) তাঁর "তাফসীরে মাআরেফুল কুরআনে" হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর বায়ানুল কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, এক সময়ে বাবেল শহরে যাদু বিদ্যার খুব প্রচলন ছিল। যাদুর অত্যাশ্চার্য ক্রিয়া দেখে মূর্খ লোকদের মধ্যে যাদু ও মোজেযার মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। কেউ কেউ যাদুকরদের সজ্জন ও অনুসরণ যোগ্য মনে করতে থাকে, আবার কেউ কেউ যাদুকে পূন্য কাজ মনে করে তা শিখতে ও আমল করতে থাকে। যেমন আজকাল মেমারিজমের বেলায়ও তাই হচ্ছে। এ বিভ্রান্তি দূর করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা'আলা বাবেল শহরে হারূত ও মারূত দুজন ফেরেশতা পাঠান। তাদের দায়িত্ব ছিল যাদুর স্বরূপ ও ভেল্কিবাজী সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা-যাতে বিভ্রান্তি দূর হয় এবং মানুষ যাদুর আমল ও যাদুকরদের থেকে দূরে থাকে। নবীদের নবুওয়াতের জন্য যেমন মুজেযা দেয়া হয় তেমনি হারূত ও মারূতের ফেরেশতা হওয়ার প্রমাণ সহ তাদের পাঠানো হলো। ফেরেশতাদ্বয় বাবেল শহরে তাদের কাজ শুরু করে দিলেন। তারা যাদুর মূল ও শাখা-প্রশাখা বর্ণনা করে জনগণকে এ কু-কর্ম থেকে বিরত থাকার ও যাদুকরদের ঘৃণা করার উপদেশ দিলেন। এ সময় বিভিন্ন লোক বিভিন্ন সময়ে ফেরেশতাদের কাছে আসা-যাওয়া করতে থাকে। পরে এসব যাতায়াতকারীগণ অনুরোধ করতে থাকে যে, তাদেরকেও যাদুর মূল ও শাখা-প্রশাখা শিখিয়ে দেয়া হোক যেন তারা অজ্ঞতাবশতঃ এতে বিশ্বাসী না হয়ে পড়ে অথবা কোনো অপকর্মে লিপ্ত হয়ে না পড়ে। ফেরেশতাগণ তাদের অনুরোধ রক্ষা করে যাদু শিখিয়ে তাদের সাবধান করে দিতো, "দেখ! আমাদের উপদেশ এই যে, তোমরা যেন যাদু বিদ্যা শিখেও সুনিয়্যাতের উপর কায়েম থাক। এমন যেন না হয় যে আত্মরক্ষার অজহাতে আমাদের থেকে যাদু শিখে নিজেই অপকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়! আর দ্বীন ও ঈমান বরবাদ করে বসো। এভাবে যারা ওয়াদা অঙ্গীকার করতো তাদের যাদুর মূল ও শাখা-প্রশাখা বলে দেয়া হতো। অতপর কেউ কেউ ওয়াদা ভংগ করে সৃষ্টজীবের অনিষ্ট করতো। এটা নিশ্চিতরূপেই একটি দুষ্কর্ম ছিল।
দাম্পত্য সম্পর্ক মানব সভ্যতার ভিত্তি স্বরূপ। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুষ্ঠু ও সঠিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার উপরই গোটা মানব সমাজের সুষ্ঠুতা একান্তভাবে নির্ভর করে। অন্যথা পুরো সমাজটিই চূর্ণবিচূর্ণ হতে বাধ্য। হাদীস শরীফে আছে, ইবলীস তার কর্মকেন্দ্র থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তার এজেন্ট প্রেরণ করে। তারা ফিরে এসে নিজ নিজ রিপোর্ট পেশ করে থাকে। কেউ বলে আমি অমুক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছি, কেউ বলে আমি অমুক অশান্তি ঘটিয়েছি, কেউ বলে আমি অমুক পাপাচার সংঘটিত করেছি। কিন্তু তাদেরই রিপোর্টের জবাবে ইবলীস মন্তব্য করে যে, তোমরা কিছুই তো করনি। অবশেষে একটা এজেন্ট এসে বলে আমি একটি দম্পতির মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করেছি। একথা শুনে ইবলীস তার সাথে আলিংগন করে বলে, "তুমিই তো একটা কাজের মত কাজ করেছ।"
মানুষের প্রকাশ্য শত্রু শয়তান মানব জীবন, মানব পরিবার ও মানব সভ্যতার ভিত্ স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক বিনষ্ট করতে পারলেই খুশী হয়। আর এ সম্পর্ক স্থাপিত হয় বিবাহের পবিত্র বন্ধন দিয়ে। আজকের সমাজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে পর্যালোচনা করলে ঐ সময়ের শয়তানের চরিত্রের সাথে সামঞ্জস্য দেখা যায়। সে যুগের লোকদের নৈতিক ও চারিত্রিক অধপতনের গভীরতা যেমন উক্ত অবস্থা থেকে জানা যায়, তেমনি তার সাথে তুলনা করে বর্তমান সমাজকেও মূল্যায়ন করা সহজ হয়। আমাদের সমাজের প্রত্যেক আনাচে-কানাচে আজকে যেন হযরত সোলায়মান (আ)-এর যুগের লোকদের চারিত্রিক অধঃপতনের চূড়ান্ত রূপায়ণ ঘটছে। কথায় কথায় তাবীয-তুমার ও যাদু-বিছট করে সামাজিক অশান্তি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। তাবীয করে অন্যের স্ত্রীকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করা, অন্যের কন্যাকে অবৈধভাবে নিয়ে যাওয়া আজকের নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আর সে পথ সহজ করে দিয়েছে বেপর্দায় মহিলাদের চলাফেরা, তাদের বেপরোয়া যত্রতত্র বিচরণ, সহশিক্ষার প্রচলন ও সিনেমা টি. ভি.র অশ্লীল ছবি প্রদর্শন। একশ্রেণীর বিকৃতমনা তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অদূরদর্শিতা ঘেরা অজ্ঞতা আমাদের সমাজের এহেন বিরূপ পরিবেশ সৃষ্টির সহায়ক ও লালনকারীর ভূমিকায় তৎপর থাকায় এ অধপতিত সমাজের বিশুদ্ধতা লাভের সম্ভাবনার বিলুপ্তি ঘটেছে।
আজকের সমাজে মানুষ যে কোনো হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার মানসে তারই মত আরেকজন লোককে যথাযথ কারণ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত এমনকি হত্যা পর্যন্ত করে বসে। আর গ্রামে-গঞ্জে পর্যন্ত খনার-খলীফা দিয়ে তাবীজ-তুমার করে মানুষের ক্ষতি করতে এমনকি জানে শেষ করে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না। সামান্য স্বার্থ হাসিলের জন্যও মানুষ মানুষকে প্রতারিত করতে এমনকি জীবনে শেষ করে দিতে এতটুকুও ইতঃস্তুত করে না।
টিকাঃ
-(তাফসীরে ইবনে কাসীর ও মা'আরেফুল কুরআন)
📄 মাতৃগর্ভে আল্লাহই নিজের ইচ্ছানুযায়ী মানুষের আকৃতি গঠন করেন
إِنَّ اللَّهَ لاَ يَخْفَى عَلَيْهِ شَيءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَامِنْ هُوَ الَّذِي يُصَوِّرُكُمْ فِي الْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَاءُ ، لَاإِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ .
"নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে পৃথিবী ও আকাশের কোনো কিছুই গোপন নেই। তিনি তোমাদেরকে মাতৃগর্ভে যেমন ইচ্ছা আকৃতিদান করেন। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই তিনি প্রবল পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।” -(সূরা আলে ইমরান: ৫-৬)
মাতৃগর্ভে আল্লাহই নিজের ইচ্ছানুযায়ী মানুষের আকৃতি গঠন করেন
আলোচ্য আয়াতদ্বয়ে আল্লাহর সর্বশক্তিমান হওয়ার বিষয় বর্ণনা প্রসংগে মানব সৃষ্টির ব্যাপারে তার সৃষ্টি নৈপুণ্যের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি মানুষকে মায়ের উদরে তিনটি অন্ধকার পর্যায়ে অত্যন্ত সুনিপুণতার সাথে সৃষ্টি করেন। মানুষের আকার-আকৃতি ও বর্ণনা বিন্যাসে তিনি এমন সুদক্ষ শিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন যা মানুষের ধারণার অতীত। একই অংগ-প্রত্যঙ্গ হলেও একজনের সাথে অন্যজনের মিল নেই। সর্বাংগে সামগ্রিক মিলের কোনো দু'জন মানুষ কোথায়ও পাওয়া যাবে না।
কোনো মানব সন্তান মাতা-পিতার ইচ্ছায় যেমন জন্মগ্রহণ করে না তেমনি আকার-আকৃতিতেও মাতা-পিতার কোনো হাত নেই। নারী জাতির উদর থেকে আল্লাহ নিজ ক্ষমতায় ও স্ব-ইচ্ছায় মানব জাতির রূপরেখা, স্বভাব-চরিত্র, স্থায়িত্ব, আয়ু ইত্যাদি নির্ধারণ করে থাকেন। অতএব যার হাতে এসব কিছুই নিবন্ধ একমাত্র তিনিই মানব জাতির ইলাহ মাবুদ হওয়ার যোগ্য। অন্য আয়াতে রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন। তিনি কাউকে ছেলে দান করেন কাউকে দিয়ে থাকেন মেয়ে, আর কাউকে রাখেন আকীম অর্থাৎ বন্ধা- নিঃসন্তান। আবার তিনি কাউকে দু' ধরনের সন্তান—ছেলে ও মেয়ে উভয়টিই দিয়ে থাকেন।
যদিও মাতা-পিতার যৌন মিলনের ফলে সন্তান জন্মগ্রহণ করে কিন্তু এমন অনেক দম্পতি আছেন যারা শেষ বয়সে উপনীত হয়েও কোনো সন্তান লাভে সক্ষম হন না। অনেকে অনেক চেষ্টা-তদবীর করেও সন্তান লাভ করতে পারেন না। অথচ অনেক দম্পতি এমন আছে তারা আর সন্তান কামনা করে না—জন্ম নিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের পরেও দেখা যায় স্বামী-স্ত্রীর অজান্তে গর্ভে সন্তান এসে গেছে। মোটকথা সন্তান হওয়া না হওয়ার মূল চাবিকাঠি রাব্বুল আলামীনের কুদরতি হাতে।