📄 নবী পত্নীদের দুনিয়ার স্বাচ্ছন্দ পরিত্যাগের অভিন্ন সিদ্ধান্ত
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ قُل لِّأَزْوَٰجِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ ٱلْحَيَوٰةَ ٱلدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأُسرِّحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا وَإِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَٱلدَّارَ ٱلْءَاخِرَةَ فَإِنَّ ٱللَّهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَـٰতِ مِنكُنَّ أَجْرًا عَظِيمًا .
"হে নবী! তোমার স্ত্রীদের বল, তোমরা যদি দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য পেতে চাও, তাহলে এসো, আমি তোমাদের ভোগ-সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দেই এবং সৌজন্যের সাথে তোমাদের বিদায় করে দেই। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আখিরাতের ঘর চাও, তবে জেনে রেখ; তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল, আল্লাহ তাদের জন্য মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।"-আল আহযাব: ২৮-২৯
আহযাব যুদ্ধের পর গনীমতের মাল বণ্টনের ফলে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে খানিকটা স্বাচ্ছন্দ ফিরে আসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুণ্যবতী স্ত্রীগণ (রা) ভাবলেন যে, মহানবী (স) হয়তো এসব গনীমতের মাল থেকে নিজস্ব অংশ রেখে দিয়েছেন। তাই তাঁরা মেহেরবানী করে তাঁদের জীবিকা ও অন্যান্য খরচাদির পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করার আবেদন জানান। রসূলুল্লাহ (স) পুণ্যবতী স্ত্রীগণের পক্ষ থেকে দুনিয়াদার ভোগ-বিলাসী রাজা-বাদশাদের পরিবেশে বিদ্যমান জৌলুস ও সুযোগ-সুবিধা কিছুটা হলেও প্রদানের দাবীতে উপস্থাপিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষভাবে মর্মাহত হন।
এই আয়াতে পুণ্যবতী স্ত্রীগণকে (রা) অধিকার প্রদান করা হয়েছে যে, তাঁরা নবী (স)-এর বর্তমান দারিদ্র পীড়িত চরম আর্থিক সংকটপূর্ণ অবস্থা বরণ করে হয় তাঁর (স) সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রেখে জীবনযাপন করবেন অথবা তালাকের মাধ্যমে তাঁর থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা) বলেন, যখন অধিকার প্রদান সংক্রান্ত এ আয়াত নাযিল হয় তখন রসূলুল্লাহ (স) আমাকে আয়াতটি শুনানোর পূর্বে বলেন, উত্তরটা কিন্তু তাড়াহুড়া করে দেবে না। বরং তোমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ করে দেবে। আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ এ ব্যাপারে আমার পিতা-মাতার পরামর্শ গ্রহণের জন্য আমি যেতে পারি কি? আমি তো আল্লাহ পাক, তাঁর রসূল ও পরকালকে বরণ করে নিচ্ছি।
আমার পরে অন্যান্য পুণ্যবতী স্ত্রীগণকে কুরআনের এ নির্দেশ শোনানো হলো। সবাই আমার মতই তাদের মত ব্যক্ত করলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে দাম্পত্য সম্পর্কের মুকাবিলায় দুনিয়ার প্রাচুর্য ও স্বাচ্ছন্দকে কেউ গ্রহণ করলেন না। এভাবে কুরআনুল কারীম একদিকে পুণ্যবতী নবী পত্নীদের ব্যাপারে মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রকে চিরদিনের জন্য ঠাণ্ডা করে দিল। অন্যদিকে এ পরীক্ষার মাধ্যমে একথা সাব্যস্ত হয়ে গেল যে, পুণ্যবতী নবী-পত্নীগণ সকলেই আল্লাহ, রসূল ও আখিরাতের অন্বেষী ছিলেন।
টিকাঃ
-(মাআরেফুল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন), (ফী যিলালিল কুরআন), (তাদাব্বুরে কুরআন)
📄 পর্দা ও নারী মর্যাদা সংরক্ষণে নবী পত্নীদের থেকে সূচনায় আল্লাহর কতিপয় নির্দেশ
يُنِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قُلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى وَأَقِمْنَ الصَّলوةَ وَاتِيْنَ الزَّكُوةَ وَأَطِعْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ ، إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَتِ اللَّهِ وَالْحِكْمَةِ ، إِنَّ اللَّهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا .
"হে নবী পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও। যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে। তোমরা সংগত কথাবার্তা বলবে। তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে, পূর্বতন জাহেলী যুগের মত সাজগোজ দেখিয়ে বেরুবে না। তোমরা সালাত কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে। হে নবী পরিবারের সদস্যবর্গ! আল্লাহ চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে- তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র রাখতে। আল্লাহর আয়াত ও হিকমত থেকে যাকিছু তোমাদের ঘরে পঠিত হয় তা স্মরণ রাখবে; আল্লাহ তো অতি সুক্ষ্মদর্শী সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত।"-সূরা আল আহযাব: ৩২-৩৪
নবী পত্নীদের শ্রেষ্ঠত্বের শর্ত হলো তাঁদের তাকওয়া এবং আহকামে ইলাহিয়্যার অনুসরণ অনুকরণ। আলোচ্য আয়াতসমূহে মুসলিম নারীকুলের সম্ভ্রম সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে পাঁচটি মৌলিক বিষয়ে হেদায়াত দেয়া হয়েছে।
এক. নারীদের কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রিত রাখা। অর্থাৎ যদি পর্দার মধ্যে থেকে কোনো পুরুষের সাথে কথা বলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তবে বাক্যালাপের সময় নারী কণ্ঠের স্বভাবসুলভ কোমলতা ও নাজুকতা পরিহার করবে।
দুই. নারীদের স্বাভাবিক অবস্থান হবে তাদের গৃহে। নারীগণ পারিবারিক দায়িত্ব পালন ব্যাপদেশে নিজ নিজ গৃহে অবস্থান করবে। এর অর্থ এ নয় যে, কোনো অবস্থাতেই তারা ঘরের বাইরে যেতে পারবে না। সংগত কারণে শরয়ী প্রয়োজনে তারা বাইরেও বের হতে পারবে। তবে বের হওয়াটা অবশ্যই শালীনতা ও শরয়ী পর্দা সহকারে হতে হবে।
তিন, চার ও পাঁচ নং হেদায়াত হলো সালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করা।
আয়াতে সাজগোজ করে সৌন্দর্য প্রদর্শন করে ঘোরাফেরাকে 'প্রাচীন জাহেলিয়াত' বলায় যা বুঝা যায় তাহলো, বাইরে বের হওয়ার সময় সাজগোজ করার অভ্যাসটি জাহেলিয়াতের পরিত্যক্ত সম্পত্তি। এটি একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ব্যবস্থা, এর পেছনে জীবনের এক নির্দিষ্ট চিন্তা-ভাবনা সক্রিয় রয়েছে।
টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন), (মাআরেফুল কুরআন), (তাদাব্বুরে কুরআন), (ফী যিলালিল কুরআন)
📄 যে নারীর অভিযোগ সপ্ত আকাশ পর্যন্ত পৌঁছেছে ও গৃহীত হয়েছে
قَدْ سَمِعَ اللهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْজِهَا وَتَشْتَكِى إِلَى اللَّهِ وَ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا طَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرَه
"আল্লাহ অবশ্যই শুনতে পেয়েছেন সেই নারীর কথা, যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে আর সে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছে। আল্লাহ তোমাদের উভয়ের কথোপকথন শুনেন, আল্লাহ সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।"-সূরা মুজাদালা : ১
যে মহিলার ব্যাপার সম্পর্কে এ আয়াত নাযিল হয়েছিল তিনি ছিলেন খাজরাজ গোত্রের খাওলাহ বিনতে সা'লাবা। তাঁর স্বামীর নাম ছিল আওস ইবনে সামেত আনসারী। হযরত আওস ইবনে সামেত একবার তাঁর স্ত্রী খাওলাকে বলে দিলেন, أَنْتِ عَلَى كَظَهْرٍ أُمِّيْ -তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মত। তৎকালীন আরব সমাজে এ ধরনের বাক্য তালাক-বরং তালাক থেকেও অধিক কঠিনভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা ঘোষণা করা হতো।
খাওলা রা. এর শরীয়ত সম্মত বিধান জানার জন্য রসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে উপস্থিত হলেন। তখন পর্যন্ত এ বিষয়ে রসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি কোনো বিধান নাযিল হয়নি। তাই তিনি প্রচলিত রীতি অনুযায়ী খাওলাকে বলে দিলেন, "আমার মতে তুমি তোমার স্বামীর জন্য হারাম হয়ে গেছো।” একথা শুনামাত্র খাওলা রা. বিলাপ শুরু করে দিলেন এবং আল্লাহ তা'আলার কাছে ফরিয়াদ করে বললেন, আয় আল্লাহ! আমি তোমার কাছে ফরিয়াদ করছি। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়েছে।
হযরত ওমর (রা) একবার কতিপয় সংগী-সাথীসহ কোথায়ও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে এই বৃদ্ধা মহিলা এসে দাঁড়ালে হযরত ওমর (রা) থেমে গেলেন এবং দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত তার বক্তব্য শুনতে থাকলেন। সাথীদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠলেন, আপনি এ বৃদ্ধার কারণে কুরাইশ বংশের নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে এত সময় এখানে দাঁড় করিয়ে রাখলেন? তখন হযরত ওমর (রা) বললেন, তোমরা কি জানো, কে এই মহিলা? ইনি খাওলা বিনতে সা'লাবা। ইনি এমন এক মহিলা যার অভিযোগ সপ্ত আকাশের উপর শোনা হয়েছে। আল্লাহর কসম, ইনি যদি আমাকে রাত পর্যন্তও দাঁড় করিয়ে রাখতেন, তাহলেও আমি দাঁড়িয়ে থাকতাম।
টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন), (তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন), (দুররে মানছুর ও ইবনে কাসীর)
📄 দুজন নেক বান্দার স্ত্রী ছিলেন দুজন বিশ্বাসঘাতক নারী
ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلاً لِّلَّذِينَ كَفَرُوا امْرَأَتَ نُوحٍ وَامْرَأَتَ لُوطٍ كَانَتَا تَحْتَ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِنَا صَالِحَيْنِ فَخَانَتْهُمَا فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمَا مِنَ اللَّهِ شَيْئًا وَقিলَ ادْخُلَا النَّارَ مَعَ الدَّاخِلِينَ
"আল্লাহ কাফিরদের জন্য নূহের স্ত্রী ও লূতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন। এ দুজন ছিল আমার দুজন নেক বান্দার অধীন। কিন্তু তারা উভয়ই নিজ নিজ স্বামীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ফলে নূহ ও লূত ওদেরকে 'আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারলো না। ওদের দুজনকেই বলা হলো, যাও আগুনে প্রবেশকারীদের সাথে তোমরাও প্রবেশ করো।" -সূরা তাহরীম : ১০
হযরত নূহ (আ)-এর স্ত্রী 'ওয়াগেলা' আর হযরত লূত (আ)-এর স্ত্রীর নাম 'ওয়ালেহা'। এ দুজন মহিলা তাদের স্বামীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এর মানে এ নয় যে, তারা ব্যভিচারিণী ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, কোনো নবীর কোনো স্ত্রীই ব্যভিচারিণী হয়নি। এ দুজনের বিশ্বাসঘাতকতা (خيانت) ছিল দীনের ব্যাপারে। তারা নবী স্বামীর দীন গ্রহণ করেনি।
হযরত নূহ (আ)-এর স্ত্রী ঈমানদারগণের গোপন তথ্যাদি শত্রুদের পৌঁছে দিতো। আর হযরত লূত (আ)-এর স্ত্রী তার ঘরে আসা নতুন নতুন লোকদের সম্পর্কে জাতির চরিত্রহীন লোকদেরকে খবর জানিয়ে দিতো। ওরা নবী স্বামীর আনুগত্য ত্যাগ করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি, অধিকন্তু ওরা নবীগণের শত্রুর সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ রাখতো। ওদের নিজেদের এ বদ-আমল ওদের জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিলো। নবীর স্ত্রী হিসেবে কোনো নাজাত পায়নি ওরা।
এসব দৃষ্টান্ত দিয়ে যে সত্যকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তাহলো একজন মুমিনের ঈমান তার কোনো কাফির স্বজন ও আত্মীয়ের উপকারে আসতে পারে না। বড় কোনো ব্যক্তির সাথে বিশেষ কোনো সম্পর্ক কাউকেও বিশেষ ফায়দা দিতে পারে না। প্রত্যেকে শুধু তাই পাবে, যা সে নিজের ঈমান আমলের ভিত্তিতে পাওয়ার যোগ্য ও অধিকারী।
টিকাঃ
-(ইবনে জারীর), (তাফহীমুল কুরআন), (আল কুরআনুল করীম- মাওলানা সালাহুদ্দীন ইউসুফ)