📘 আল কুরআনে নারী 📄 অনৈসলামী সমাজে নারী নিরাপত্তাহীনতার করুণ ইতিহাসের একটি দিক

📄 অনৈসলামী সমাজে নারী নিরাপত্তাহীনতার করুণ ইতিহাসের একটি দিক


إِنَّ فِرْعَوْنَ عَلَا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيَعًا يَسْتَضْعِفُ طَائِفَةً مِّنْهُمْ يُذَبِّحُ أَبْنَاءَ هُمْ وَيَسْتَحْيِ نِسَاءَ هُمْ ، إِنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ

"ফিরাউন পৃথিবীতে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে বসলো। সে দেশবাসীকে দলে দলে বিভক্ত করে রেখেছিল, যাদের একদলকে সে হীনবল করে রেখেছিল-ওদের পুত্র সন্তান হলে তাকে সে হত্যা করে ফেলতো, আর কন্যা সন্তান হলে তাকে জীবিত থাকতে দিতো। সে তো বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।"-সূরা আল কাসাস : ৪

তৎকালীন মিশরের বাদশাদের উপাধী ছিল 'ফিরাউন'। আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত বিষয়টি হযরত মূসা (আ) জন্মের সময়কার অবস্থা। সে সময়ে মিশরের যে অধিপতি ছিল, সে ছিল মিশরের দ্বিতীয় ফিরাউন একজন জালিম জঘন্য চরিত্রের রাজা। সে স্বপ্নে দেখলো যে, বনী ইসরাঈলের এক লোকের হাতে তার রাজত্ব শেষ হয়ে যাবে। এ স্বপ্ন দেখার পর জালিম বাদশাহ রাজ্যের নবজাত পুত্র সন্তানদের হত্যা করার নির্দেশ জারি করে দিলো, কিন্তু কন্যা সন্তানদের জীবিত রেখে দিত।

ফিরাউন পৃথিবীতে তার বড়ত্ব প্রদর্শন করে বসলো। সে অহংকারে মেতে উঠে পড়লো। সে রাজ্যের জনগণকে যিম্মি করে রেখেছিল। সে দেশবাসীকে বহু বিবাদমান দলে বিভক্ত করে রেখেছিল, যাতে তারা কোনো ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত হতে না পারে। তার অহংকার, যুলুম ও দমননীতির প্রধান শিকার ছিল বনী ইসরাঈলরা। শত নিষ্পেষণেও তারা ফিরাউনের 'সর্বময় ক্ষমতার মালিক' হওয়ার দাবীকে স্বীকার করতো না, সবাই তার শিরক ও পৌত্তলিকতার বিরোধী ছিল। ফিরাউন অনুভব করতে লাগলো যে, এ ভিন্ন মতাবলম্বী জাতির আকীদা-বিশ্বাস ও মিশরে তাদের স্বাধীন অস্তিত্ব তার ক্ষমতা ও রাজত্বের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সে এ অনমনীয় ও তার অবাধ্য জাতিকে দমন করার উদ্দেশ্যে নানা প্রকার জঘন্য ও নিপীড়নমূলক উপায় উদ্ভাবন করতে লেগে গেল। ফিরাউন তার প্রশাসনের প্রতি নির্দেশ জারি করলো, যখনি বনী ইসরাঈলীদের কোনো পুত্র সন্তান জন্ম নেয় তখনি যেন তাকে হত্যা করা হয়। আর কন্যা সন্তান হলে যেন তাকে জীবিত রেখে দেয়া হয়।

হযরত মূসা (আ)-এর জন্ম ও লালন-পালন হয়েছিল এমনি এক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে-সম্পূর্ণভাবে মহান আল্লাহর অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছার ফলে। মূসা (আ)-এর এ ইতিহাস প্রমাণ করে যে, আল্লাহ কোনো ব্যক্তি বা জাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইলে পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে বা তাদেরকে ধ্বংস করতে পারে না।

মানব জাতির মুক্তি ও শান্তির একমাত্র ব্যবস্থা ইসলামী জীবন বিধান কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত না থাকলে সেখানে কি রকম নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করে তার কিছু বর্ণনাও আমরা আলোচ্য আয়াত থেকে উপলব্ধি করতে পারি। ফিরাউন যেমন তার বিরোধী ইসরাঈলীদের বংশ ধ্বংস করার লক্ষে রাজ্যের মধ্যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল; তেমনি যুগে যুগে আল্লাহদ্রোহী রাজ শক্তিসম্পন্ন ঔদ্ধ্যত ব্যক্তিবর্গ আল্লাহর যমীনে আল্লাহর বান্দাদের নানাবিধ কষ্ট-যন্ত্রনার অক্টোপাশে আবদ্ধ করে রাখার সকল প্রকার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে থাকে। এ জাতীয় জালিমদের হাতে অত্যাচারিত হয় অবলা-অসহায় নারী সমাজ সর্বাধিক। যেমন ফিরাউন ইসরাঈলীদের কন্যা সন্তানকে হত্যা না করে জীবিত রাখতো অথচ পুত্র সন্তানকে জন্মের সাথে সাথে হত্যা করতো। এতে করে সে আসলে নারী জাতিকে চরম অসহায়ত্বের মুখে ঠেলে দিতো। কারণ পুত্র সন্তানগুলোকে হত্যা করার ফলে ঐ সমাজ পুরুষ বিহীন সমাজে পরিণত হতো। ওরা নারীদের বানাতো নিজেদের দাসী, আর তাদের সাথে আচরণ করতো অমানবিক ও পাশবিক ধরনের।

ফিরাউনের সরকার প্রথমত, বনী ইসরাঈলকে তাদের শস্য-শ্যামল উর্বর ভূমি-ক্ষেত, তাদের ঘরবাড়ী ও বিত্ত-সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে দেয়। অতপর তাদেরকে সব ধরনের ও প্রানান্তকর পরিশ্রম করতে বাধ্য করে। কঠোর আযাব দিতো। ওদের এ আযাবের ধরণই ছিল অমানবিক। তার মধ্যে পুরুষদের নিপাত করে বংশ বৃদ্ধির পথ রুদ্ধ করা, নারীদেরকে নিজেদের দাসী বানিয়ে ইসরাঈলীদের নাম-নিশানা নিঃশেষ করতে গিয়ে বাস্তবে মহিলাদের উপরই চলতো মানসিক, দৈহিক এবং সাংস্কৃতিক যাতনা, সর্বোপরী তাদের জাতিসত্তার উপর চরম আঘাত।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 যে তিন নারীর মাধ্যমে আল্লাহ শিশু মূসাকে ফিরাউনের হাত থেকে বাঁচালেন

📄 যে তিন নারীর মাধ্যমে আল্লাহ শিশু মূসাকে ফিরাউনের হাত থেকে বাঁচালেন


وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ ، فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَالْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ فَالْتَقَطَهُ ال فِرْعَوْনَ لِيَكُونَ لَهُمْ عَدُوًّا وَحَزَنَا ، إِنَّ فِرْعَوْনَ وَهَا مَنَ وَجُنُودَهُمَا كَانُوا خَطِئِينَ وَقَالَتِ امْرَأَتُ فِرْعَوْনَ قُرَّتُ عَيْنٍ لَي وَلَكَ مَا لَا تَقْتُلُوهُ وَ عَسَى أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَى فَرِعًا ، إِنْ كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَوْলَا أَنْ رَبَطْنَا عَلَى قَلْبِهَا لِتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَقَالَتْ لأُخْتِهِ قُصِيْهِ ، فَبَصُرَتْ بِهِ عَنْ جُنُبٍ وَهُمْ لا يَشْعُرُونَ * وَحَرَّمْنَا عَلَيْهِ الْمَرَاضِعَ مِنْ قَبْلُ فَقَالَتْ هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى أَهْلِ بَيْتِ يَكْفُلُوْنَهُ لَكُمْ وَهُمْ لَهُ نُصِحُوْنَ فَرَدَدْتُهُ إِلَى أُمِّهِ كَيْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنَ وَلِتَعْلَمَ أَنَّ وَعْدَ اللهِ حَقٌّ وَلَكিনَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ

“আমি মূসার মায়ের অন্তরে ইংগিতে নির্দেশ করলাম যে, শিশুটিকে বুকের দুধ খাওয়াতে থাক। অতপর যখন তার ব্যাপারে আশংকা করবে তখন তাকে নদীতে ছেড়ে দিবে, তার জন্যে ভয় করবে না চিন্তিত হবে না, আমি তাকে অবশ্যই তোমার কাছে ফিরিয়ে দিব আর তাকে রসূলদের মধ্যে শামিল করে নেবো। শেষ পর্যন্ত ফিরাউনের লোকেরা তাকে নদী থেকে তুলে আনলো। পরে যেন সে ওদের দুশমন আর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নিশ্চয়ই ফিরাউন, হামান ও তাদের সৈন্য-সান্তরাই তো ছিল অপরাধী। ফিরাউনের স্ত্রী তাকে বললো, শিশুটি আমার ও তোমার চক্ষু শীতলকারী, একে হত্যা করো না। এতো আমাদের উপকারে আসতে পারে, আমরা তাকে আমাদের পুত্র বানিয়ে নিতেও পারি। প্রকৃতপক্ষে তারা পরিণামটা বুঝতেই পারেনি। এদিকে মূসার মায়ের অন্তর অস্থির হয়ে উঠলো। আমি তার অন্তরকে দৃঢ় করে না দিলে তো সে ওদের কাছে শিশুর পরিচয় প্রকাশ করেই দিতো। সে শিশুর ভগ্নিকে বললো, “এর পিছে পিছে যাও।” মেয়েটি দূরে থেকে শিশুকে এমনভাবে দেখতে লাগলো যে, শত্রুরা টেরও পেল না। আমি তো শিশুর জন্য ধাত্রীদের দুধ বন্ধ করে রেখেছি সে কারো স্তনে মুখ লাগাচ্ছিলো না। মূসার ভগ্নি বললো, আমি তোমাদেরকে এমন পরিবারের সন্ধান দেব কি, যারা তোমাদের জন্য একে লালন-পালন করবে এবং কল্যাণ-কামনা সহকারে এর রক্ষণাবেক্ষণ করবে? এভাবে আমি মূসাকে তার মার কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যেন তার চোখ জুড়ায় ও সে চিন্তায় কাতর না হয়ে পড়ে। এবং সে যেন জানতে পারে যে আল্লাহর ওয়াদা সত্য; যদিও অনেক লোকই তা জানে না।"-সূরা আল কাসাস : ৭-১৩

তিনজন মহিলা-১. মূসা (আ)-এর মা, ২. তাঁর বোন এবং ৩. খোদ ফিরাউনের স্ত্রী আছিয়া-এদের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা পূরণ হয় আর ফিরাউনের সকল নীলনকশা ব্যর্থ হয়ে যায়।

আল্লাহ তা'আলা মূসা (আ)-এর মায়ের অন্তরে স্বস্থিরতা ঢেলে দিলেন। নির্দেশ দিলেন যতদিন কোনো বিপদের আশংকা দেখা না দিবে ততদিন তাকে বুকের দুধ খাওয়াতে থাক। যখন ওর ব্যাপারে আশংকা ঘনীভূত হয়ে দেখা দেয়, তখন শিশুটিকে বিনা দ্বিধায় সিন্দুকে ভরে নদীতে ছেড়ে দেবে। কেবল আল্লাহর এ আশ্বাসবাণী ও নির্দেশনার প্রতি অবিচল বিশ্বাসই মূসা (আ)-এর মাকে নিজ শিশুকে নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার কাজে শক্তি-সাহস যুগিয়েছিল। মা মূসা (আ)-এর বোনকে বললেন, তুমি বাক্সটি দেখতে দেখতে এটির পেছনে পেছনে যেতে থাক। বাক্সটি ভেসে ভেসে ঠিক ফিরাউনের বাড়ীর দিকেই যাচ্ছিল। ফিরাউনের চাকর-বাকররা বাক্সটি ধরে ফেলে এবং তা ফিরাউনের স্ত্রীর কাছে নিয়ে যায়। ফিরাউনের স্ত্রী আছিয়া (রা) শিশু মূসাকে দেখে স্থির থাকতে পারলো না। সে বললো, "একে হত্যা করবে না, বরং ওকে লালন-পালন করা হবে। আমরা তাকে আমাদের পুত্র বানিয়ে নিতে পারি।"

এভাবে হযরত মূসা (আ) শিশু অবস্থায় স্বয়ং ফিরাউনের স্ত্রীর আন্তরিকতা ও স্নেহ-মমতায় ফিরাউনেরই ঘরে লালিত-পালিত হওয়ার সুযোগ লাভ করবে। শিশুটিকে ঘরে এনে দুধ পান করানোর জন্য ধাত্রী নিযুক্তির পালা এলো। কিন্তু কি আশ্চর্য! শিশুটি কোনো ধাত্রীর স্তনই যে মুখে নিচ্ছে না! মূসা (আ)-এর বোন অতি সুকৌশলে ভাইয়ের কোনো ধাত্রীর দুধ পান না করার কথা জেনে গেল। সে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলো এবং বললো আমি এমন এক ভাল পরিবারের খবর দেব কি, যে এ শিশুটিকে অতি যত্ন সহকারে লালন-পালন করবে। এ বলে মূসার বোন তার মায়ের সন্ধান দিলে শেষ পর্যন্ত মূসার মা-ই ধাত্রী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়।

হযরত মূসা (আ) তাঁর জন্মকালের সেই অতি ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হওয়া থেকে মহান রাব্বুল আলামীন তাকে বাঁচিয়ে রাখলেন। আল্লাহর এ হিকমতময় ব্যবস্থার ফলে আরও যে ফায়দা পাওয়া গেল, তাহলো হযরত মূসাকে ফিরাউন তার শাহজাদা বানাতে পারলো না। বরং হযরত মূসা (আ) নিজেরই মাতা-পিতা ও ভাই-বোনের মধ্য থেকে লালিত-পালিত হয়ে নিজ বংশের বৈশিষ্ট্য ও মৌলিকতা সম্পর্কে ভালভাবে ওয়াকিফহাল হয়েছিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে বলেন: যে ব্যক্তি নিজের রুজী-রোজগারের জন্য কাজ করে এবং এ কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভ করাই হয় তার লক্ষ্য; সে তো মূসার মায়ের মত—সে নিজেরই সন্তানকে দুধ খাওয়ায়, আর তার বিনিময়ে মজুরীও গ্রহণ করে।

টিকাঃ
-(তাদাব্বুরে কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 কওমে লূতের অভূতপূর্ব নাফরমানী সমর্থন করায় নবী পত্নী আল্লাহর গযবে পতিত হলো যেভাবে

📄 কওমে লূতের অভূতপূর্ব নাফরমানী সমর্থন করায় নবী পত্নী আল্লাহর গযবে পতিত হলো যেভাবে


وَلَمَّا أَنْ جَاءَتْ رُسُلُنَا لُوْطًا سَئَ بِهِمْ وَضَاقَ بِهِمْ ذَرْعًا وَقَالُوا لَا تَخَفْ وَلَا تَحْزَنْ قف إِنَّا مُنَجُوكَ وَأَهْلَكَ إِلَّا امْرَاتَكَ كَانَتْ مِنَ الْغُبِرِينَ إِنَّا مُنْزِلُوْনَ عَلَى أَهْلِ هَذِهِ الْقَرْيَةِ رِجْزًا مِّنَ السَّمَاءِ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ

"যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা দূতের কাছে এলো, তখন তাদের আগমনে সে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো এবং নিজেকে তাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করলো। তারা বললো, ভয় করো না, দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ো না। আমরা তোমাকে ও তোমার পরিজনবর্গকে রক্ষা করবোই; তবে তোমার স্ত্রীকে নয়। সে তো ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত। আমরা এ জনপদের ওপর আকাশ থেকে শান্তি নাযিল করবো। কেননা এরা পাপাচার করছিল।"-সূরা আনকাবূত : ৩৩-৩৪

হযরত লূত (আ)-এর কওম চরিত্রহীনতার এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল যা ইতিপূর্বে পৃথিবীর কেউ কোনোদিন করেনি। তারা কাম-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য স্বাভাবিক নিয়ম-নীতির বিপরীত নারীর পরিবর্তে পুরুষের কাছে গমন করার জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়লো। তাদের হেদায়াতের জন্য আল্লাহ তা'আলা হযরত লূত (আ)-কে পাঠালেন। হযরত লূত (আ) তাদের অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য চরম চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। অবশেষে আল্লাহর ফায়সালা হলো, অবাধ্য কাওমে লূতকে ধ্বংস করে দেয়ার।

একদা আল্লাহ তা'আলা একদল ফেরেশতা পাঠালেন ওদের শান্তি দেয়ার জন্যে। ফেরেশতারা সুশ্রী বালকের ছবি ধরে হযরত লূত (আ)-এর বাড়ীতে গেলেন। ইতিমধ্যে ঐসব ফেরেশতাদের গ্রামের দুষ্ট লোকেরা মানুষ ভেবে দৌড়ে আসলো তাদের কুমতলব চরিতার্থ করার মানসে। হযরত লূত (আ) তো ফেরেশতাদের দেখেই চরম অস্থিরতায় পড়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন এ মেহমানদের যদি সেখানে থাকতে দেয়া হয়, তাহলে সেই চরিত্রহীন দুষ্ট জাতির লোকদের হাত থেকে ওদের রক্ষা করাই কঠিন হয়ে পড়বে। পক্ষান্তরে মেহমানদের সেখানে থাকতে দেয়া না হলেও তা হবে নিতান্ত অভদ্রতা ও সৌজন্য পরিপন্থী। তাছাড়া এ বিদেশী মুসাফিরদেরকে নিজের ঘরে থাকতে না দিলে, তাদেরকে অন্য কোথায়ও রাত যাপন করতে দিতে হবে। আর সেটা হবে নিজের হাতেই তাদেরকে বাঘের মুখে ঠেলে দেয়ার মতো।

ফেরেশতারা লূত (আ)-কে টেনে ভেতরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আর ওদেরকে অন্ধ করে দিলেন। ওরা দরজা খুঁজতে খুঁজতে থেমে গেল। তখন মেহমানরা লূত (আ)-কে বললেন, আপনি ভীতসন্ত্রস্ত হবেন না, আমরা তো ফেরেশতা। আমরা এসেছি এ শহরকে ধ্বংস করার জন্যে। আপনি ভোর হওয়ার পূর্বেই নিজের লোকদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। লূত (আ) ভোর হওয়ার পূর্বেই বেরিয়ে পড়লেন। সূর্যোদয়ের সময় সাদুম ও আমুরায় গন্ধক ও আগুন বর্ষণ করা হলো। তাঁর স্ত্রী পেছনে ফিরে গেলে ওখানেই জমে গেল।

হযরত লূত (আ)-এর স্ত্রী তাঁর থেকে পৃথক ছিল। ফলে সেও অন্যান্য ধ্বংসপ্রাপ্তদের সাথে ধ্বংস হয়ে গেছে। কারণ লূত (আ)-এর স্ত্রীর অভিরুচী ছিল সে দেশের দুষ্কৃতকারী লোকদের মত। সে ওদের যাবতীয় অন্যায়, অনাচার, অপরাধ ও বিকৃতির সমর্থক ছিল। লূত (আ)-এর কাছে কোনো মেহমান আসলে সেই মহিলাই এলাকাবাসীকে জানিয়ে দিতো এবং ওদেরকে কুকর্মের উৎসাহ যোগাতো।

টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন), (তাফসীরে হাক্কানী), (ফী যিলালিল কুরআন), (আল কুরআন করীম, শায়খুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 নবী পত্নীদের দুনিয়ার স্বাচ্ছন্দ পরিত্যাগের অভিন্ন সিদ্ধান্ত

📄 নবী পত্নীদের দুনিয়ার স্বাচ্ছন্দ পরিত্যাগের অভিন্ন সিদ্ধান্ত


يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ قُل لِّأَزْوَٰجِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ ٱلْحَيَوٰةَ ٱلدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأُسرِّحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا وَإِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَٱلدَّارَ ٱلْءَاخِرَةَ فَإِنَّ ٱللَّهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَـٰতِ مِنكُنَّ أَجْرًا عَظِيمًا .

"হে নবী! তোমার স্ত্রীদের বল, তোমরা যদি দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য পেতে চাও, তাহলে এসো, আমি তোমাদের ভোগ-সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দেই এবং সৌজন্যের সাথে তোমাদের বিদায় করে দেই। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আখিরাতের ঘর চাও, তবে জেনে রেখ; তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল, আল্লাহ তাদের জন্য মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।"-আল আহযাব: ২৮-২৯

আহযাব যুদ্ধের পর গনীমতের মাল বণ্টনের ফলে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে খানিকটা স্বাচ্ছন্দ ফিরে আসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুণ্যবতী স্ত্রীগণ (রা) ভাবলেন যে, মহানবী (স) হয়তো এসব গনীমতের মাল থেকে নিজস্ব অংশ রেখে দিয়েছেন। তাই তাঁরা মেহেরবানী করে তাঁদের জীবিকা ও অন্যান্য খরচাদির পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করার আবেদন জানান। রসূলুল্লাহ (স) পুণ্যবতী স্ত্রীগণের পক্ষ থেকে দুনিয়াদার ভোগ-বিলাসী রাজা-বাদশাদের পরিবেশে বিদ্যমান জৌলুস ও সুযোগ-সুবিধা কিছুটা হলেও প্রদানের দাবীতে উপস্থাপিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষভাবে মর্মাহত হন।

এই আয়াতে পুণ্যবতী স্ত্রীগণকে (রা) অধিকার প্রদান করা হয়েছে যে, তাঁরা নবী (স)-এর বর্তমান দারিদ্র পীড়িত চরম আর্থিক সংকটপূর্ণ অবস্থা বরণ করে হয় তাঁর (স) সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রেখে জীবনযাপন করবেন অথবা তালাকের মাধ্যমে তাঁর থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা) বলেন, যখন অধিকার প্রদান সংক্রান্ত এ আয়াত নাযিল হয় তখন রসূলুল্লাহ (স) আমাকে আয়াতটি শুনানোর পূর্বে বলেন, উত্তরটা কিন্তু তাড়াহুড়া করে দেবে না। বরং তোমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ করে দেবে। আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ এ ব্যাপারে আমার পিতা-মাতার পরামর্শ গ্রহণের জন্য আমি যেতে পারি কি? আমি তো আল্লাহ পাক, তাঁর রসূল ও পরকালকে বরণ করে নিচ্ছি।

আমার পরে অন্যান্য পুণ্যবতী স্ত্রীগণকে কুরআনের এ নির্দেশ শোনানো হলো। সবাই আমার মতই তাদের মত ব্যক্ত করলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে দাম্পত্য সম্পর্কের মুকাবিলায় দুনিয়ার প্রাচুর্য ও স্বাচ্ছন্দকে কেউ গ্রহণ করলেন না। এভাবে কুরআনুল কারীম একদিকে পুণ্যবতী নবী পত্নীদের ব্যাপারে মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রকে চিরদিনের জন্য ঠাণ্ডা করে দিল। অন্যদিকে এ পরীক্ষার মাধ্যমে একথা সাব্যস্ত হয়ে গেল যে, পুণ্যবতী নবী-পত্নীগণ সকলেই আল্লাহ, রসূল ও আখিরাতের অন্বেষী ছিলেন।

টিকাঃ
-(মাআরেফুল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন), (ফী যিলালিল কুরআন), (তাদাব্বুরে কুরআন)

ফন্ট সাইজ
15px
17px