📄 মুশরিক সমাজে কন্যা সন্তানের জন্ম অসহনীয় ও মনস্তাপে ক্লিষ্ট হওয়ার কারণ
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأنْثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ كَظِيمٌ ، يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوْءِ مَا بُشِّرَبِهِ ، أَيُمْসِكُهُ عَلَى هُوْنٍ أَمْ يَدُسُهُ فِي التَّرَابِ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
"যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তান হওয়ার সুসংবাদ দেয়া হয় তখন তার চেহারা কাল হয়ে যায়। আর সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে তার কওম থেকে আত্মগোপন করে। সে ভাবে, এ অপমান সহ্য করে ওকে থাকতে দেবে, না ওকে মাটিতে পুতে ফেলবে। দেখ, তাদের সিদ্ধান্ত কতইনা নিকৃষ্ট।" -সূরা আন নহল: ৫৮-৫৯
আলোচ্য আয়াতে রসূলের সময়ে আরবের মুশরিকদের কতিপয় ভ্রান্ত চিন্তা ও আচরণের মধ্যে একটির উল্লেখ করা হয়েছে। আর তাহলো যখন ওদের কোনো ব্যক্তির কন্যা সন্তানের জন্ম হওয়ার খবর পিতার কানে পৌঁছতো, তখন পিতার চেহারা কালো হয়ে যেতো, রাগে ও ক্ষোভে তার মন অস্থির হয়ে উঠতো আর সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতো। এর গ্লানি হেতু সে তার কওম থেকে আত্মগোপন করতো- সমাজের লোকদের মুখ দেখাবে কিভাবে-এ ছিল তার মানসিক প্রতিক্রিয়া। মেয়ে বড় হলে তাকে অন্য কোনো ছেলের কাছে বিয়ে দিতে হবে ভেবে সে লজ্জায় অস্থির হয়ে পড়তো। এ হীনতা সত্ত্বেও সে কন্যাটাকে রাখবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে-এ ছিল তার দুঃচিন্তা।
তারা তো আল্লাহর ফেরেশতাদের আল্লাহর কন্যা বলে বিশ্বাস করে কন্যাদের আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে রেখেছে। অথচ কন্যা সম্পর্কে তাদের নিজেদের অবস্থা এই যে, কাউকে কন্যা হওয়ার খবর দিলে তার চেহারা কালো হয়ে যায়, আর তখন থেকে সে মনের ক্ষোভে মনের জ্বালায় অস্থির হয়ে পড়ে। কন্যা হওয়াটাকে নিজের জন্য লজ্জার বিষয় মনে করে সমাজ থেকে সে আত্মগোপন করতে থাকে আর সর্বক্ষণ এ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকে যে, এ অপমান সহ্য করে কন্যাটাকে জীবিত রাখবে, নাকি ওকে মাটিতে দাফন করে সেই অপমান থেকে নিস্তার লাভ করবে।
জাহেলী যুগে অনেক নিষ্ঠুর পিতা কন্যাদের হত্যা করতো অথবা যমীনে জীবন্ত দাফন করতো। ইসলাম এসব মন্দ প্রথার উচ্ছেদ করে এবং এমনভাবে তার মূলোৎপাটন করে ফেলে যে ইসলামের স্বর্ণযুগে এ নিষ্ঠুরতার একটি দৃষ্টান্তও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কন্যাদের সম্পর্কে তাদের যে নির্যাতনমূলক সিদ্ধান্ত ছিল, তার চেয়ে অধিক নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত হলো এই যে, তারা আল্লাহর সন্তান সাব্যস্ত করে থাকে। তাও আবার কন্যা সন্তান, যার ব্যাপারে নিজেদের অবস্থা হলো অসহনীয় অপমানবোধ। যেন তাদের জন্য চাই উত্তম বস্তু, আর আল্লাহর জন্যে নিকৃষ্ট বস্তু!
আল কুরআন জাহেলী যুগ তথা মুশরেকী সমাজের কুপ্রথা—কন্যা সন্তানের জন্ম সংবাদে স্বয়ং জন্মদাতা পিতার প্রতিক্রিয়া ও ভূমিকা সম্পর্কে এখানে আলোকপাত করেছে। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ফলে কন্যা সন্তানের সেই ভয়াবহ অবস্থার অবসান ঘটে। আল্লাহর নবী কন্যা সন্তানের লালন-পালন করাকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেছেন। ইসলাম মানব জাতিকে মান-সম্ভ্রম নিয়ে নর-নারীর সেই সম্পর্ক স্থাপন ও রক্ষার ব্যবস্থাও শিখিয়েছে। কিন্তু যুগে যুগে মানুষ তাদের রব আল্লাহ তা'আলার সেই কল্যাণকর বিধান থেকে বিচ্যুত হয়ে বহুমুখী সমস্যা ও যন্ত্রনার শিকার হয়ে আসছে।
জাহেলী যুগের জাহেলী ধ্যান-ধারণা আধুনিক যুগেও বিরাজমান রয়েছে। হয়তো ধরণ কিছুটা পাল্টিয়েছে। তখনকার যুগে কেবল কন্যার জন্ম হওয়াকে গ্লানি ও অপমানকর মনে করা হতো কিন্তু আজকের বিশ্বের উন্নয়নমুখী দেশে তো সন্তানের আগমনকেই অসহনীয় ভাবা হচ্ছে। বিশ্বসমাজে দেখা যায় প্রাচুর্যের দেশ (Affluent Country) বলে কথিতরা উন্নয়নমুখী জাতি (Developing Nations) সমূহকে জন্মনিরোধের সবক দিয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে ইসলামী জীবন বিধান বিশ্বের বুকে নারী মুক্তির ব্যবস্থা করেছে, সেই জীবন বিধানকেই তো কেউ কেউ নারী মুক্তির অন্তরায় ভাবছে।
বস্তুত প্রাচীন জাহেলিয়াত ও আধুনিক জাহেলিয়াতের ইসলাম দ্রোহীতার ব্যাপারে রয়েছে এক আত্যাশ্চর্য সামঞ্জস্য। প্রাচীন জাহেলিয়াতে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো আর নব্য জাহেলিয়াতে কন্যা বা ছেলে নির্বিশেষে যে কোনো সন্তানের জন্মনিরোধের ব্যবস্থা নেয়া হয়। প্রাচীন জাহেলিয়াতে শুধু কন্যার জন্মকে লজ্জাকর মনে করা হতো আর নব্য জাহেলিয়াতে যে কোনো প্রকারের সন্তানই অকাম্য ও অনভিপ্রেত। প্রাচীন জাহেলিয়াতে সন্তান দুনিয়াতে আসার পর ব্যবস্থা নেয়া হতো আর আধুনিক জাহেলিয়াতে সন্তান যাতে জন্মই নিতে না পারে সে ব্যবস্থাই করা হয়। প্রাচীন জাহেলিয়াতের যুক্তি ছিল অভাব-অনটন, মান-মর্যাদা ও সামাজিক রীতিপ্রথা; আধুনিক জাহেলিয়াতের যুক্তি জীবনযাত্রার মান সংরক্ষণের নামে প্রাচীন জাহেলিয়াতেরই অনুরূপ।
📄 বন্ধা স্ত্রী ও বুড়ো স্বামীর সন্তান লাভের দুআ কবুলের ইতিহাস
قَالَ رَبِّ أَنِي يَكُونُ لِي غُلْمٌ وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا وَقَدْ بَلَغْتُ مِنَ الْكِبَرِ عِتِيًّا قَالَ كَذَلِكَ ، قَالَ رَبُّكَ هُوَ عَلَى هَيِّنٌ وَقَدْ خُلَقْتُكَ مِنْ قَبْلُ وَلَمْ تَكُ شَيْئًاه
"সে বললো, রব! আমার ছেলে হবে কিভাবে? যে অবস্থায় আমার স্ত্রী বন্ধা আর আমিও তো বার্ধক্যের শেষপ্রান্তে পৌঁছে গেছি!” তিনি বললেন এ অবস্থাই হবে। তোমার রব বলেছেন, "এটা তো আমার পক্ষে খুবই সহজ। আমি ইতিপূর্বে তোমাকেও তো সৃষ্টি করেছি, যখন তুমি কিছুই ছিলে না।"-সূরা মারইয়াম : ৮-৯
সূরা মারইয়ামের শুরু থেকেই হযরত যাকারিয়া (আ)-এর কিছু ইতিহাস বিবৃত হয়েছে। যাকারিয়া (আ) তাঁর রবের কাছে গোপনে দুআ করেছিলেন। দুআয় তিনি বলেছিলেন, হে পরওয়ারদিগার! বার্ধক্যের কারণে তো আমার অস্থি দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমার মাথার চুলও সাদা হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় বাহ্যিক দৃষ্টিতে তো সন্তান কামনা করাটাই অযৌক্তিক। কিন্তু রব! তুমি তো অসীম কুদরত ও রহমতের মালিক। আর আমার মৃত্যুর পর অলি-ওয়ারিশগণের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন যে, তারা শরীয়তের বিষয়ে আমার যথার্থ প্রতিনিধিত্ব করবে না। এদিকে আমার স্ত্রী বন্ধা। কাজেই তুমি তোমার বিশেষ অনুগ্রহে আমাকে এক উত্তরাধিকারী দান করো। আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদের মাধ্যমে বললেন, হে যাকারিয়া! আমি তোমাকে এক পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি, যার নাম হবে ইয়াহ্ইয়া।
এখানে বলা হয়েছে إِذْ نَادَى رَبَّهُ نَدَاءً خَفِيًّا যখন তিনি (যাকারিয়া) তার রবকে নিভৃতে দুআ করেছিলেন সন্তানের জন্য। হযরত যাকারিয়া গোপনে নিভৃতে আল্লাহর কাছে সন্তান পাওয়ার দুআ করেছিলেন কয়েকটি কারণে। এক. যেহেতু চুপে চুপে গোপনে আল্লাহর কাছে চাওয়া তিনি পসন্দ করেন, কারণ এতে নম্রতা, একাগ্রতা, খুশুখুজু বেশী হয়ে থাকে। দুই. মানুষ তাকে এই বলে যেন বেওকুফ না বলে যে, তিনি চরম বার্ধক্যে পৌঁছেও নির্লজ্জভাবে সন্তান কামনা করছেন। তিন. বার্ধক্যের কারণে তার গলার আওয়াযও ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল।
হযরত যাকারিয়া (আ) তার মৃত্যুর পরে উত্তরাধিকারীগণের বিষয়ে উদ্বিগ্ন থাকার কারণ তিনি তার পরবর্তী ভাই বন্ধুদের মধ্যে এমন কাউকে দেখছিলেন না, যারা দীন ও নৈতিকতায় তার পদমর্যাদাসম্পন্ন হতে পারে। তার আশংকা ও উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ কোনো বৈষয়িক ধন-সম্পদের উত্তরাধিকারীত্বের বিষয় ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর কোনো ছেলে এমন উপযুক্ত হোক যে তার বাপ-দাদাদের পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাদের ইলম ও হিকমতের ভাণ্ডার সামলাতে পারে এবং নবুওয়াতের ওয়ারিস হতে পারে। সহীহ হাদীস থেকে প্রমাণিত নবীগণের মাল-সম্পদে মীরাস জারি হয় না। তাদের মীরাস জারি হয়ে থাকে ইলমের সম্পদে।
আল্লাহ তার পরিকল্পনা অনুযায়ীই পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টি করে থাকেন। কোনো দম্পতিকে সন্তান দানের ব্যাপারে আল্লাহর ঘোষণা হলো, "যাকে চান তিনি ছেলে দেন, যাকে ইচ্ছা মেয়ে দেন, কখনো কাউকে ছেলেমেয়ে দুটোই দান করেন, আবার কাউকে ছেলেমেয়ের কোনোটিই দেন না।" দয়াময় আল্লাহ যাকারিয়া (আ)-কে সেই সময় জান্নাতে তার স্থান দেখিয়ে দিলেন। তাকে জানিয়ে দেয়া হলো যে, অবস্থা এমনই থাকবে। আর এ অবস্থাতেই আল্লাহ সন্তান দিবেন। এটা আল্লাহর জন্য মোটেই কোনো কঠিন কাজ নয়। আল্লাহর এ কুদরতের উপর বিশ্বাস থাকলে মানুষ সন্তানলাভের জন্য শিরক-বিদআতের পথ ধরতে পারে না। ইসলামে চেষ্টা-তদবীরের পথ তো খোলা-তবে তা হতে হবে বৈধ উপায়ে।
📄 আল্লাহর অবাধ্য হওয়ায় নবীর স্ত্রী হয়েও রক্ষা পেল না যে নারী
وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ وَأَنْتُمْ تُبْصِرُونَ أَئِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِّنْ دُونِ النِّسَاءِ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ فَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا أَخْرِجُوا آلَ لُوْطٍ مِّنْ قَرْيَتِكُمْ إِنَّهُمْ أَنَاسٌ يَتَطَهَّرُونَ ، فَأَنْجَيْنَهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ وَ قَدَّرْتُهَا مِنَ الْغُبِرِينَ وَأَم্টَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا فَسَاءَ مَطَرُ الْمُنْذِرِينَ
"আর দূতকে পাঠালাম, সে তার কওমকে বলেছিল: তোমরা কি দেখেশুনে এমন কুকাজ করছো? তোমরা কি যৌন তৃপ্তির জন্য নারীদের ছেড়ে পুরুষদের কাছে গমন করছো? তবে তো তোমরা এক বর্বর সম্প্রদায়! উত্তরে তার কওম একথাই বললো, নিজেদের লোকালয় থেকে ভূতের লোকদেরকে বের করে দাও। এরাতো বড্ড পবিত্রতা দেখাচ্ছে। অতপর আমরা তাকে ও তার পরিজনকে নাজাত দিলাম; কিন্তু তার স্ত্রীকে নয়—তাকে তো আমরা পেছনে পড়ে থাকা লোকদের অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছি। তাদের উপর আমরা ভয়ংকর বৃষ্টি' বর্ষণ করলাম। সেই সতর্ককৃত লোকদের উপর বর্ষিত বৃষ্টি কতই না মারাত্মক ছিল।” -সূরা আন নামল: ৫৪-৫৭
হযরত লূত (আ) ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ভাই 'বারান.-এর ছেলে। অসভ্য গ্রামবাসীরা হিংসার বশবর্তী হয়ে একটা অতি খারাপ ফন্দি আঁটলো। তারা কাম-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য স্বাভাবিক নিয়ম-নীতির বিপরীত নারীর পরিবর্তে পুরুষের কাছে গমন করার জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়লো। তাদের এহেন চরিত্র বিধ্বংসী অমানুসিক কাজ থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা করার জন্য আল্লাহ তা'আলা তাদের হেদায়াতের জন্য হযরত লূত (আ)-কে পাঠালেন।
তাদের বিকৃতির এ প্রতিবাদের জবাবে হযরত লূতের জাতি সঠিক জবাবদানের পরিবর্তে কেবল একথাই বলেছিল যে, লূত ও তার অনুসারীরা খুব সৎ ও পবিত্র মানুষ সাজতে চায়। ওদেরকে এদেশ থেকে বের করে দিতে হবে। হযরত লূত (আ)-এর অনুসারীরা তাঁর পরিবার-পরিজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, কেবল তাঁর স্ত্রী ছাড়া। নবীর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও এ মহিলাটি ছিল চরিত্রহীনা, সে তৎকালীন সমাজে প্রচলিত সমকামিতাকে সমর্থন করতো। তাই আল্লাহর ইনসাফের বিধান অনুযায়ী অন্যান্য দুশ্চরিত্রের লোকদের সাথে লূত (আ)-এর স্ত্রীকেও ধ্বংস করে দেয়া হলো।
আল্লাহর বাণী قَدَّرْنَهَا مِنَ الْغبرين তাকে পেছনে পড়ে 'থাকা লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেছি' কথা দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, এ পাথর বৃষ্টির শাস্তি তার জন্য বিশেষভাবে নির্ধারণ করা ছিল। নবীর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও যখন তার সহানুভূতি ছিল সেই অযোগ্য জাতির প্রতি তখন অন্যদের তুলনায় আল্লাহর আযাব তার প্রতি অধিক হওয়াই উচিত। কারণ আল্লাহর অবাধ্যদের প্রতি তার অনুকম্পা তাকে আল্লাহর গযবের অধিকতর যোগ্য করে তুলেছে।
কোনো কোনো বর্ণনানুযায়ী কওমে লূতের প্রতি আল্লাহর আযাব নাযিল হওয়ার পূর্বেই নবীর সাথীগণকে লোকালয় থেকে দৌড়ে বেরিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। আর নির্দেশ ছিল কেউ যেন পেছনের দিকে না তাকায়। এ নির্দেশ সবাই যথাযথ মেনে চলেছিল। কিন্তু হযরত লূত (আ)-এর স্ত্রী সকলের পেছনে থেকে পেছনের দিকে তাকাতে ছিল। পরিণামে সেও আল্লাহর আযাবগ্রস্তদের সাথে ধ্বংস হয়ে গেল। সে তো একদিকে নবীর আদর্শ বিরোধীদের সহযোগী ছিল। আবার আল্লাহর আযাব থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় পেছনের দিকে তাকিয়ে না দেখার আল্লাহর নির্দেশও অমান্য করেছিল। সুতরাং নবী স্বামীর আদর্শ বিচ্যুতির অপরাধের শাস্তি থেকে তাকে নবী স্বামীর স্ত্রী হওয়ার সম্পর্ক আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
📄 অনৈসলামী সমাজে নারী নিরাপত্তাহীনতার করুণ ইতিহাসের একটি দিক
إِنَّ فِرْعَوْنَ عَلَا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيَعًا يَسْتَضْعِفُ طَائِفَةً مِّنْهُمْ يُذَبِّحُ أَبْنَاءَ هُمْ وَيَسْتَحْيِ نِسَاءَ هُمْ ، إِنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ
"ফিরাউন পৃথিবীতে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে বসলো। সে দেশবাসীকে দলে দলে বিভক্ত করে রেখেছিল, যাদের একদলকে সে হীনবল করে রেখেছিল-ওদের পুত্র সন্তান হলে তাকে সে হত্যা করে ফেলতো, আর কন্যা সন্তান হলে তাকে জীবিত থাকতে দিতো। সে তো বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।"-সূরা আল কাসাস : ৪
তৎকালীন মিশরের বাদশাদের উপাধী ছিল 'ফিরাউন'। আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত বিষয়টি হযরত মূসা (আ) জন্মের সময়কার অবস্থা। সে সময়ে মিশরের যে অধিপতি ছিল, সে ছিল মিশরের দ্বিতীয় ফিরাউন একজন জালিম জঘন্য চরিত্রের রাজা। সে স্বপ্নে দেখলো যে, বনী ইসরাঈলের এক লোকের হাতে তার রাজত্ব শেষ হয়ে যাবে। এ স্বপ্ন দেখার পর জালিম বাদশাহ রাজ্যের নবজাত পুত্র সন্তানদের হত্যা করার নির্দেশ জারি করে দিলো, কিন্তু কন্যা সন্তানদের জীবিত রেখে দিত।
ফিরাউন পৃথিবীতে তার বড়ত্ব প্রদর্শন করে বসলো। সে অহংকারে মেতে উঠে পড়লো। সে রাজ্যের জনগণকে যিম্মি করে রেখেছিল। সে দেশবাসীকে বহু বিবাদমান দলে বিভক্ত করে রেখেছিল, যাতে তারা কোনো ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত হতে না পারে। তার অহংকার, যুলুম ও দমননীতির প্রধান শিকার ছিল বনী ইসরাঈলরা। শত নিষ্পেষণেও তারা ফিরাউনের 'সর্বময় ক্ষমতার মালিক' হওয়ার দাবীকে স্বীকার করতো না, সবাই তার শিরক ও পৌত্তলিকতার বিরোধী ছিল। ফিরাউন অনুভব করতে লাগলো যে, এ ভিন্ন মতাবলম্বী জাতির আকীদা-বিশ্বাস ও মিশরে তাদের স্বাধীন অস্তিত্ব তার ক্ষমতা ও রাজত্বের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সে এ অনমনীয় ও তার অবাধ্য জাতিকে দমন করার উদ্দেশ্যে নানা প্রকার জঘন্য ও নিপীড়নমূলক উপায় উদ্ভাবন করতে লেগে গেল। ফিরাউন তার প্রশাসনের প্রতি নির্দেশ জারি করলো, যখনি বনী ইসরাঈলীদের কোনো পুত্র সন্তান জন্ম নেয় তখনি যেন তাকে হত্যা করা হয়। আর কন্যা সন্তান হলে যেন তাকে জীবিত রেখে দেয়া হয়।
হযরত মূসা (আ)-এর জন্ম ও লালন-পালন হয়েছিল এমনি এক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে-সম্পূর্ণভাবে মহান আল্লাহর অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছার ফলে। মূসা (আ)-এর এ ইতিহাস প্রমাণ করে যে, আল্লাহ কোনো ব্যক্তি বা জাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইলে পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে বা তাদেরকে ধ্বংস করতে পারে না।
মানব জাতির মুক্তি ও শান্তির একমাত্র ব্যবস্থা ইসলামী জীবন বিধান কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত না থাকলে সেখানে কি রকম নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করে তার কিছু বর্ণনাও আমরা আলোচ্য আয়াত থেকে উপলব্ধি করতে পারি। ফিরাউন যেমন তার বিরোধী ইসরাঈলীদের বংশ ধ্বংস করার লক্ষে রাজ্যের মধ্যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল; তেমনি যুগে যুগে আল্লাহদ্রোহী রাজ শক্তিসম্পন্ন ঔদ্ধ্যত ব্যক্তিবর্গ আল্লাহর যমীনে আল্লাহর বান্দাদের নানাবিধ কষ্ট-যন্ত্রনার অক্টোপাশে আবদ্ধ করে রাখার সকল প্রকার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে থাকে। এ জাতীয় জালিমদের হাতে অত্যাচারিত হয় অবলা-অসহায় নারী সমাজ সর্বাধিক। যেমন ফিরাউন ইসরাঈলীদের কন্যা সন্তানকে হত্যা না করে জীবিত রাখতো অথচ পুত্র সন্তানকে জন্মের সাথে সাথে হত্যা করতো। এতে করে সে আসলে নারী জাতিকে চরম অসহায়ত্বের মুখে ঠেলে দিতো। কারণ পুত্র সন্তানগুলোকে হত্যা করার ফলে ঐ সমাজ পুরুষ বিহীন সমাজে পরিণত হতো। ওরা নারীদের বানাতো নিজেদের দাসী, আর তাদের সাথে আচরণ করতো অমানবিক ও পাশবিক ধরনের।
ফিরাউনের সরকার প্রথমত, বনী ইসরাঈলকে তাদের শস্য-শ্যামল উর্বর ভূমি-ক্ষেত, তাদের ঘরবাড়ী ও বিত্ত-সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে দেয়। অতপর তাদেরকে সব ধরনের ও প্রানান্তকর পরিশ্রম করতে বাধ্য করে। কঠোর আযাব দিতো। ওদের এ আযাবের ধরণই ছিল অমানবিক। তার মধ্যে পুরুষদের নিপাত করে বংশ বৃদ্ধির পথ রুদ্ধ করা, নারীদেরকে নিজেদের দাসী বানিয়ে ইসরাঈলীদের নাম-নিশানা নিঃশেষ করতে গিয়ে বাস্তবে মহিলাদের উপরই চলতো মানসিক, দৈহিক এবং সাংস্কৃতিক যাতনা, সর্বোপরী তাদের জাতিসত্তার উপর চরম আঘাত।