📄 ইউসুফ আ.-এর চারিত্রিক স্বচ্ছতা সম্পর্কে মিশর সম্রাটের স্ত্রীর স্বীকারোক্তি
قَالَ مَا خَطْبُكُنَّ إِذْ رَاوَدْتُنَّ يُوسُفَ عَنْ نَفْسِهِ ، قُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا عَلِمْنَا عَلَيْهِ مِنْ سُوْءٍ ، قَالَتِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ الْفَـنَ حَصْحَصَ الْحَقُّ أَنَا رَا وَدْتُهُ عَنْ نَّفْسِهِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الصَّدِقِينَ
"বাদশাহ মহিলাদের বললো, তোমাদের অবস্থা কেমন যখন তোমরা ইউসুফকে দিয়ে নিজেদের মনষ্কামনা পূরণে তাকে ফুসলিয়েছিলে?" তারা বললো, "আল্লাহরই মহত্ব, আমরা তো তার মধ্যে সামান্যতম খারাপীও দেখিনি।” বাদশাহর স্ত্রী বলে উঠলো, "এখন তো সত্য প্রকাশিত হয়ে গেছে। আমিই তাকে ফুসলিয়েছিলাম, সে তো সত্যবাদী।” -সূরা ইউসুফ: ৫১
এ হচ্ছে মিশর সম্রাটের স্ত্রীর কাণ্ডের আরেক দিক। এখানে 'আযীযে মেছের'-এর স্ত্রীই নয় বরং সমাজের অন্যান্য মহিলারাও যে হযরত ইউসুফের চরিত্রের স্বচ্ছতা সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছিল সেকথা ফুটে উঠেছে। সংক্ষেপে ঘটনা হলো, মিশর সম্রাটের অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী ইউসুফকে নিজের কুমতলব চরিতার্থ করার জন্য ফুসলিয়েও ব্যর্থ হয়ে সম্রাটের সামনে উল্টো ইউসুফের ঘাড়েই সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মিশর সম্রাটও প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পেরে নিজের স্ত্রীকে ভর্ৎসনা করলেও লোক সমক্ষে স্ত্রীর মুখ বাঁচানোর জন্য ইউসুফকে জেলখানায় পাঠানো হলো। জেলখানায় তাঁকে বন্দী জীবনযাপন করতে হয়েছিল দীর্ঘ আট-নয় বছর।
ইউসুফ আ.-এর সাথে আরও দুই যুবকও জেলখানায় আটক ছিল। তারা হযরত ইউসুফকে অত্যন্ত সৎ, চরিত্রবান ও সুবিজ্ঞ জানতে পেরে তাঁর কাছে নিজ নিজ স্বপ্নের তা'বীর জানতে চাইলো। ইতিমধ্যে তাদের একজন স্বপ্নের ব্যাখ্যানুযায়ী জেলখানা থেকে মুক্তিও পেয়ে গেল। একদিন মিশর সম্রাট দরবারের লোকদের ডেকে তার এক আশ্চর্য স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলো। সে সময় সেখানে জেলখানা থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত যুবকটিও উপস্থিত ছিল। সে বললো, আমি আপনাদেরকে এ স্বপ্নের তা'বীর বলে দেব, আমাকে একটু জেলখানায় ইউসুফের কাছে পাঠিয়ে দিন। যুবকটিকে জেলখানায় পাঠানো হলো এবং ইউসুফ আ. বাদশাহর স্বপ্নের তা'বীর বলে দিলেন। বাদশাহ বললো, "তাকে আমার কাছে নিয়ে আস।" বাদশাহর পাঠানো লোক যখন ইউসুফের কাছে গিয়ে এ সুসংবাদ দিল, তখন ইউসুফ তাকে বললেন, আগে তুমি তোমার মালিকের কাছে ফিরে গিয়ে তার কাছ থেকে জেনে আস তো, ঐসব মহিলাদের কি অবস্থা, যারা নিজেদের হাত কেটেছিল?
এ খবর বাদশাহর কাছে গেলে তিনি সেসব মহিলাদের একত্র করে তাদের কাছ থেকে ইউসুফ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আলোচ্য আয়াতে বাদশাহর সেই জিজ্ঞাসা ও মহিলাগণ থেকে সেই জিজ্ঞাসার জবাব এবং মিশর বাদশাহর স্ত্রীর স্বীকৃতি কুরআনের ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে। জবাবে মহিলারা একবাক্যে বললো, "আল্লাহরই মহত্ব, আমরা তার মধ্যে খারাপির লেশমাত্রও দেখতে পাইনি। বাদশাহর স্ত্রী যখন দেখলো প্রকৃত সত্য বেরিয়ে এসেছে, তখন সেও মূল ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত করলো। সে স্বীকার করলো যে আসলে দোষী তো সে নিজে। সে বলে উঠলো, আমিই তাকে দিয়ে আমার মনষ্কামনা পূরণের চেষ্টা করেছিলাম। সে নিশ্চয়ই পবিত্র চরিত্রের অধিকারী।
ইউসুফ আ. ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন। যখন তাঁকে জেলখানা থেকে নিয়ে আসতে বলা হলো, ইউসুফ তা প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি চাইলেন তাঁর নির্দোষ হওয়ার বিষয়টি আগে জনসমক্ষে আসতে হবে, তারপর তিনি জেল থেকে বেরুবেন। এখানে প্রসংগত এ বিষয়টিও প্রনিধানযোগ্য যে, ইউসুফকে মুক্তির কথা শুনালে তিনি হাত কর্তনকারীনী মহিলাদের কথা বললেন, অথচ ঘটনার মূল কেন্দ্রবিন্দু বাদশার স্ত্রীর কথা বলেননি। তিনি যেভাবে নিজের পবিত্রতা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, তাতে বাদশাহর স্ত্রীর কথা বললে সরাসরি তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ বুঝা যেতো। তিনি এভাবে বাদশাহকে অপমানিত করতে চাননি। মোটকথা; বাদশাহর জিজ্ঞাসার উত্তরে এলাকার সকল মহিলাই ইউসুফের পবিত্রতা ও নির্দোষিতার বিষয় স্বীকার করল। সেই পরিস্থিতিতে বাদশাহর স্ত্রী যুলায়খাও নিজের দোষী হওয়ার কথা স্বীকার করে ইউসুফের নিষ্কলুষ ও চরিত্রবান হওয়ার কথা প্রকাশ করল।
📄 পুরুষ বিহীন সমাজ নারীদের জন্য বিপজ্জনক ও শাস্তিতুল্য
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ أَنْجَكُمْ مِّنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَسُومُونَكُمْ سُوءَ الْعَذَابِ وَيُذَبِّحُوْنَ أَبْنَاءَكُمْ وَيَسْتَحْيُونَ نِسَاءَكُمْ ، وَفِي ذَلِكُمْ بَلَاءٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ عَظِيمٌ
"আর স্মরণ করো, মূসা যখন তার জাতির লোকদের বলেছিল, তোমরা আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করো যে তিনি তোমাদেরকে ফেরাউনের সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিয়েছেন। যারা তোমাদের অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দিচ্ছিল। আর তারা তোমাদের ছেলেদের হত্যা করতো এবং মেয়েদের জীবিত রাখতো। এতে তোমাদের জন্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে ছিল কঠিন পরীক্ষা।"-সূরা ইবরাহীম: ৬
আলোচ্য আয়াতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হযরত মূসা (আ)-এর যামানার এক জঘন্য ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। এ আয়াতটি হযরত মূসা (আ) তার জাতিকে যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেই ভাষণের মমার্থস্বরূপ। এ ভাষণে মূসা (আ) তাঁর কওমকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, ফিরাউন ও তার সম্প্রদায় থেকে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে ও দয়ায় তোমাদের নাজাত দিয়েছিলেন। হযরত মূসা (আ)-এর সময়কার ইতিহাস মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানার ইসরাঈলীদের শুনিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্য হলো, সমসাময়িক ইসরাঈলীরা যে মূসা (আ)-এর সেই শিক্ষা ভুলে গিয়ে শয়তানের পথে পা দিচ্ছে এবং ইসলামের বিরোধীতায় মত্ত হয়ে নতুন করে নিজেদের দুর্ভাগ্যই ডেকে আনছে- সে কথা তাদের স্মরণ করিয়ে দেয়া।
সূরা ইবরাহীমের এ হচ্ছে ষষ্ঠ আয়াত। শব্দের সামান্য পার্থক্য সহ এ আয়াতটি সূরা আল বাকারার ৪৯ আয়াতে এবং সূরা আল আরাফের ১৪১ আয়াতেও উল্লেখ করা হয়েছে। ফিরাউন স্বপ্নে দেখলো যে, বনী ইসরাঈল বংশে এমন এক লোক জন্মগ্রহণ করবে যে তার কর্ম ও রাজত্ব ধ্বংস করে দেবে। তখন ফিরাউন এক ফরমান জারি করে বলে দিল যে, বনী ইসরাঈলের ঘরে কোনো ছেলের জন্ম হলে তাকে হত্যা করে দিবে আর মেয়ে জন্ম নিলে তাকে খিদমতের জন্য জীবিত রাখবে। কিন্তু আল্লাহ হযরত মূসা (আ)-কে সৃষ্টি করে জীবিত রাখলেন।
আল্লাহ তা'আলা প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ)-কে সৃষ্টি করে তাঁর থেকে তাঁর জোড়া হিসেবে সৃষ্টি করলেন বিবি হাওয়া (আ)-কে। অতপর মানব সমাজের বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নারী-পুরুষ সৃষ্টির ধারা জারি করেন। নারী বিহীন পুরুষের জীবন অসম্পূর্ণ তেমনি পুরুষ বিহীন নারীর জীবন বৃথা। বরং নারী-পুরুষ পরস্পরের সম্পূরক বিধায় উভয়েই একে অন্যের অভাবে অসার জীবনযাপন করে। শক্তি-সামর্থ ও দায়িত্ব-কর্তব্যের প্রাকৃতিক বিভাজন অনুযায়ী পুরুষ বিহীন সমাজ নারী-জীবনের জন্য বিপজ্জনক। ফিরাউন সেই প্রাকৃতিক বিভাজন বিনষ্টকারী ও সমাজ শৃংখলা ধ্বংসকারী পদক্ষেপ নিয়েছিল।
📄 মুশরিক সমাজে কন্যা সন্তানের জন্ম অসহনীয় ও মনস্তাপে ক্লিষ্ট হওয়ার কারণ
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأنْثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ كَظِيمٌ ، يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوْءِ مَا بُشِّرَبِهِ ، أَيُمْসِكُهُ عَلَى هُوْنٍ أَمْ يَدُسُهُ فِي التَّرَابِ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
"যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তান হওয়ার সুসংবাদ দেয়া হয় তখন তার চেহারা কাল হয়ে যায়। আর সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে তার কওম থেকে আত্মগোপন করে। সে ভাবে, এ অপমান সহ্য করে ওকে থাকতে দেবে, না ওকে মাটিতে পুতে ফেলবে। দেখ, তাদের সিদ্ধান্ত কতইনা নিকৃষ্ট।" -সূরা আন নহল: ৫৮-৫৯
আলোচ্য আয়াতে রসূলের সময়ে আরবের মুশরিকদের কতিপয় ভ্রান্ত চিন্তা ও আচরণের মধ্যে একটির উল্লেখ করা হয়েছে। আর তাহলো যখন ওদের কোনো ব্যক্তির কন্যা সন্তানের জন্ম হওয়ার খবর পিতার কানে পৌঁছতো, তখন পিতার চেহারা কালো হয়ে যেতো, রাগে ও ক্ষোভে তার মন অস্থির হয়ে উঠতো আর সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতো। এর গ্লানি হেতু সে তার কওম থেকে আত্মগোপন করতো- সমাজের লোকদের মুখ দেখাবে কিভাবে-এ ছিল তার মানসিক প্রতিক্রিয়া। মেয়ে বড় হলে তাকে অন্য কোনো ছেলের কাছে বিয়ে দিতে হবে ভেবে সে লজ্জায় অস্থির হয়ে পড়তো। এ হীনতা সত্ত্বেও সে কন্যাটাকে রাখবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে-এ ছিল তার দুঃচিন্তা।
তারা তো আল্লাহর ফেরেশতাদের আল্লাহর কন্যা বলে বিশ্বাস করে কন্যাদের আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে রেখেছে। অথচ কন্যা সম্পর্কে তাদের নিজেদের অবস্থা এই যে, কাউকে কন্যা হওয়ার খবর দিলে তার চেহারা কালো হয়ে যায়, আর তখন থেকে সে মনের ক্ষোভে মনের জ্বালায় অস্থির হয়ে পড়ে। কন্যা হওয়াটাকে নিজের জন্য লজ্জার বিষয় মনে করে সমাজ থেকে সে আত্মগোপন করতে থাকে আর সর্বক্ষণ এ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকে যে, এ অপমান সহ্য করে কন্যাটাকে জীবিত রাখবে, নাকি ওকে মাটিতে দাফন করে সেই অপমান থেকে নিস্তার লাভ করবে।
জাহেলী যুগে অনেক নিষ্ঠুর পিতা কন্যাদের হত্যা করতো অথবা যমীনে জীবন্ত দাফন করতো। ইসলাম এসব মন্দ প্রথার উচ্ছেদ করে এবং এমনভাবে তার মূলোৎপাটন করে ফেলে যে ইসলামের স্বর্ণযুগে এ নিষ্ঠুরতার একটি দৃষ্টান্তও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কন্যাদের সম্পর্কে তাদের যে নির্যাতনমূলক সিদ্ধান্ত ছিল, তার চেয়ে অধিক নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত হলো এই যে, তারা আল্লাহর সন্তান সাব্যস্ত করে থাকে। তাও আবার কন্যা সন্তান, যার ব্যাপারে নিজেদের অবস্থা হলো অসহনীয় অপমানবোধ। যেন তাদের জন্য চাই উত্তম বস্তু, আর আল্লাহর জন্যে নিকৃষ্ট বস্তু!
আল কুরআন জাহেলী যুগ তথা মুশরেকী সমাজের কুপ্রথা—কন্যা সন্তানের জন্ম সংবাদে স্বয়ং জন্মদাতা পিতার প্রতিক্রিয়া ও ভূমিকা সম্পর্কে এখানে আলোকপাত করেছে। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ফলে কন্যা সন্তানের সেই ভয়াবহ অবস্থার অবসান ঘটে। আল্লাহর নবী কন্যা সন্তানের লালন-পালন করাকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেছেন। ইসলাম মানব জাতিকে মান-সম্ভ্রম নিয়ে নর-নারীর সেই সম্পর্ক স্থাপন ও রক্ষার ব্যবস্থাও শিখিয়েছে। কিন্তু যুগে যুগে মানুষ তাদের রব আল্লাহ তা'আলার সেই কল্যাণকর বিধান থেকে বিচ্যুত হয়ে বহুমুখী সমস্যা ও যন্ত্রনার শিকার হয়ে আসছে।
জাহেলী যুগের জাহেলী ধ্যান-ধারণা আধুনিক যুগেও বিরাজমান রয়েছে। হয়তো ধরণ কিছুটা পাল্টিয়েছে। তখনকার যুগে কেবল কন্যার জন্ম হওয়াকে গ্লানি ও অপমানকর মনে করা হতো কিন্তু আজকের বিশ্বের উন্নয়নমুখী দেশে তো সন্তানের আগমনকেই অসহনীয় ভাবা হচ্ছে। বিশ্বসমাজে দেখা যায় প্রাচুর্যের দেশ (Affluent Country) বলে কথিতরা উন্নয়নমুখী জাতি (Developing Nations) সমূহকে জন্মনিরোধের সবক দিয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে ইসলামী জীবন বিধান বিশ্বের বুকে নারী মুক্তির ব্যবস্থা করেছে, সেই জীবন বিধানকেই তো কেউ কেউ নারী মুক্তির অন্তরায় ভাবছে।
বস্তুত প্রাচীন জাহেলিয়াত ও আধুনিক জাহেলিয়াতের ইসলাম দ্রোহীতার ব্যাপারে রয়েছে এক আত্যাশ্চর্য সামঞ্জস্য। প্রাচীন জাহেলিয়াতে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো আর নব্য জাহেলিয়াতে কন্যা বা ছেলে নির্বিশেষে যে কোনো সন্তানের জন্মনিরোধের ব্যবস্থা নেয়া হয়। প্রাচীন জাহেলিয়াতে শুধু কন্যার জন্মকে লজ্জাকর মনে করা হতো আর নব্য জাহেলিয়াতে যে কোনো প্রকারের সন্তানই অকাম্য ও অনভিপ্রেত। প্রাচীন জাহেলিয়াতে সন্তান দুনিয়াতে আসার পর ব্যবস্থা নেয়া হতো আর আধুনিক জাহেলিয়াতে সন্তান যাতে জন্মই নিতে না পারে সে ব্যবস্থাই করা হয়। প্রাচীন জাহেলিয়াতের যুক্তি ছিল অভাব-অনটন, মান-মর্যাদা ও সামাজিক রীতিপ্রথা; আধুনিক জাহেলিয়াতের যুক্তি জীবনযাত্রার মান সংরক্ষণের নামে প্রাচীন জাহেলিয়াতেরই অনুরূপ।
📄 বন্ধা স্ত্রী ও বুড়ো স্বামীর সন্তান লাভের দুআ কবুলের ইতিহাস
قَالَ رَبِّ أَنِي يَكُونُ لِي غُلْمٌ وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا وَقَدْ بَلَغْتُ مِنَ الْكِبَرِ عِتِيًّا قَالَ كَذَلِكَ ، قَالَ رَبُّكَ هُوَ عَلَى هَيِّنٌ وَقَدْ خُلَقْتُكَ مِنْ قَبْلُ وَلَمْ تَكُ شَيْئًاه
"সে বললো, রব! আমার ছেলে হবে কিভাবে? যে অবস্থায় আমার স্ত্রী বন্ধা আর আমিও তো বার্ধক্যের শেষপ্রান্তে পৌঁছে গেছি!” তিনি বললেন এ অবস্থাই হবে। তোমার রব বলেছেন, "এটা তো আমার পক্ষে খুবই সহজ। আমি ইতিপূর্বে তোমাকেও তো সৃষ্টি করেছি, যখন তুমি কিছুই ছিলে না।"-সূরা মারইয়াম : ৮-৯
সূরা মারইয়ামের শুরু থেকেই হযরত যাকারিয়া (আ)-এর কিছু ইতিহাস বিবৃত হয়েছে। যাকারিয়া (আ) তাঁর রবের কাছে গোপনে দুআ করেছিলেন। দুআয় তিনি বলেছিলেন, হে পরওয়ারদিগার! বার্ধক্যের কারণে তো আমার অস্থি দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমার মাথার চুলও সাদা হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় বাহ্যিক দৃষ্টিতে তো সন্তান কামনা করাটাই অযৌক্তিক। কিন্তু রব! তুমি তো অসীম কুদরত ও রহমতের মালিক। আর আমার মৃত্যুর পর অলি-ওয়ারিশগণের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন যে, তারা শরীয়তের বিষয়ে আমার যথার্থ প্রতিনিধিত্ব করবে না। এদিকে আমার স্ত্রী বন্ধা। কাজেই তুমি তোমার বিশেষ অনুগ্রহে আমাকে এক উত্তরাধিকারী দান করো। আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদের মাধ্যমে বললেন, হে যাকারিয়া! আমি তোমাকে এক পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি, যার নাম হবে ইয়াহ্ইয়া।
এখানে বলা হয়েছে إِذْ نَادَى رَبَّهُ نَدَاءً خَفِيًّا যখন তিনি (যাকারিয়া) তার রবকে নিভৃতে দুআ করেছিলেন সন্তানের জন্য। হযরত যাকারিয়া গোপনে নিভৃতে আল্লাহর কাছে সন্তান পাওয়ার দুআ করেছিলেন কয়েকটি কারণে। এক. যেহেতু চুপে চুপে গোপনে আল্লাহর কাছে চাওয়া তিনি পসন্দ করেন, কারণ এতে নম্রতা, একাগ্রতা, খুশুখুজু বেশী হয়ে থাকে। দুই. মানুষ তাকে এই বলে যেন বেওকুফ না বলে যে, তিনি চরম বার্ধক্যে পৌঁছেও নির্লজ্জভাবে সন্তান কামনা করছেন। তিন. বার্ধক্যের কারণে তার গলার আওয়াযও ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল।
হযরত যাকারিয়া (আ) তার মৃত্যুর পরে উত্তরাধিকারীগণের বিষয়ে উদ্বিগ্ন থাকার কারণ তিনি তার পরবর্তী ভাই বন্ধুদের মধ্যে এমন কাউকে দেখছিলেন না, যারা দীন ও নৈতিকতায় তার পদমর্যাদাসম্পন্ন হতে পারে। তার আশংকা ও উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ কোনো বৈষয়িক ধন-সম্পদের উত্তরাধিকারীত্বের বিষয় ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর কোনো ছেলে এমন উপযুক্ত হোক যে তার বাপ-দাদাদের পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাদের ইলম ও হিকমতের ভাণ্ডার সামলাতে পারে এবং নবুওয়াতের ওয়ারিস হতে পারে। সহীহ হাদীস থেকে প্রমাণিত নবীগণের মাল-সম্পদে মীরাস জারি হয় না। তাদের মীরাস জারি হয়ে থাকে ইলমের সম্পদে।
আল্লাহ তার পরিকল্পনা অনুযায়ীই পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টি করে থাকেন। কোনো দম্পতিকে সন্তান দানের ব্যাপারে আল্লাহর ঘোষণা হলো, "যাকে চান তিনি ছেলে দেন, যাকে ইচ্ছা মেয়ে দেন, কখনো কাউকে ছেলেমেয়ে দুটোই দান করেন, আবার কাউকে ছেলেমেয়ের কোনোটিই দেন না।" দয়াময় আল্লাহ যাকারিয়া (আ)-কে সেই সময় জান্নাতে তার স্থান দেখিয়ে দিলেন। তাকে জানিয়ে দেয়া হলো যে, অবস্থা এমনই থাকবে। আর এ অবস্থাতেই আল্লাহ সন্তান দিবেন। এটা আল্লাহর জন্য মোটেই কোনো কঠিন কাজ নয়। আল্লাহর এ কুদরতের উপর বিশ্বাস থাকলে মানুষ সন্তানলাভের জন্য শিরক-বিদআতের পথ ধরতে পারে না। ইসলামে চেষ্টা-তদবীরের পথ তো খোলা-তবে তা হতে হবে বৈধ উপায়ে।